আগের পর্ব… … … তারও আগের পর্ব… … …

আর্গুমেণ্ট ফ্রম ব্যাড ডিজাইন

সৃষ্টির সুনিপুন নকশা বা ইন্টেলিজেণ্ট ডিজাইন নিয়ে মানুষের কী মাতামাতি! এই মাজেজা তারা স্কুল, কলেজের পাঠ্যপুস্তকেও অন্তর্ভুক্ত করতে চায়। আরে ভাই, নিজের শরীরের দিকেই একটু তাকিয়ে দেখুন না। এটা কী ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের কোনো নমুনা? একজন ইন্টেলিজেণ্ট ডিজাইনার কি তাঁর ডিজাইনে কখনও বিনোদন স্থানের পাশে পয়নিষ্কাশণ পাম্প রাখবেন? 1

কথাটা বলেছিলেন কৌতুকভিনেতা রবিন উইলিয়াম তাঁর অভিনিত চলচ্চিত্র “ম্যান অব দ্য ইয়ার” এ। চলচ্চিত্রে রবিন একজন নগণ্য টেলিভিশন টক-শো অনুষ্ঠানের উপস্থাপক থেকে নানা ঘটনা, দূর্ঘটনার মাধ্যমে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হয়ে যান। প্রথা অনুযায়ী প্রাক-নির্বাচন বিতর্কে তাঁকে যখন ইণ্টেলিজেন্ট ডিজাইন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয় তখন এই ছিলো তাঁর উত্তর। কৌতুক করে বললেও কথাটা গুরুত্বপূর্ণ। যদিও মানুষের শরীরের সব অংগ-প্রত্যংগ আপাতদৃষ্টিতে ভালোভাবেই কাজ করছে এবং আমাদেরও বিনোদনের জায়গায় কাছাকাছি অন্যকিছুর সহাবস্থানের ব্যপারে তেমন কোনো অভিযোগ নেই, তবুও আমাদের আজন্ম লালন করা “সুনিপুন নকশা” প্রবাদটি মানসিক ভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। ঠিক মতো বিচার করলে প্রতিটি প্রজাতির নকশায় কিছু না কিছু ত্রুটি আছে। কিউইর (Kiwi) অব্যবহৃত ডানা, তিমির ভেস্টিজিয়াল পেলভিস, আমাদের এপেণ্ডিক্স যা শুধু আকামের না বরঞ্চ পাপিষ্ট কারণ কারও ক্ষেত্রে এটি মৃত্যুর কারণও হয়ে দাঁড়ায় 2।

এই লেখার শুরুতে আমরা দেখেছি ইন্টেলিজেণ্ট ডিজাইনের প্রবক্তা প্যালে, বিহেরা মানুষের শরীরের বিভিন্ন অংগের সাথে তুলনা করেছিলেন ডিজাইন করা একটি ঘড়ি বা ইঁদুর মারা কলের সাথে। বিহের ইঁদুর মারার কলে প্রতিটি যন্ত্রাংশ- কাঠের পাটাতন, ধাতব হাতুড়ি, স্প্রিং, ফাঁদ, ধাতব দণ্ড খুব সতর্কভাবে এমনভাবে জোড়া দেওয়া হয়েছে যেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এটি ইঁদুর মারার কাজটি করতে পারে। এখন প্রতিটা যন্ত্রাংশ আরও ভালোভাবে তৈরী করতে গেলে ইঁদুর মারার যন্ত্র বলুন আর ঘড়ির কথা বলুন মূল ডিজাইনে নতুন করে কিছু করার থাকেনা। এবং আরও মনে রাখা দরকার ঘড়ি, ইঁদুর মারার কল সহ মানুষের তৈরী প্রতিটি যন্ত্রে কখনও অপ্রোয়জনীয় যন্ত্রাংশের উপস্থিতি দেখা যায়না। আমাদের গবেষণাগারে চা বানানোর জন্য পানি গরম করার হিটার আছে। কিন্তু এই হিটারে পানি দিয়ে আমি, আমার তত্ত্বাবধায়ক স্যার সবসময়ই সেটা বন্ধ করার করার কথা ভুলে যাই। পরে ঠিক করা হলো, আমরা একটা টাইমার সার্কিট তৈরী করে হিটারের সাথে সংযুক্ত করে দিবো- সেটিতে তিনটি সুবিধা থাকবে। পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট, পনের মিনিট এই তিন সময়ে এটি বন্ধ করা যাবে। ফলে পানি দিয়ে আমাদের আর চিন্তা করতে হবেনা। যদি পাঁচ মিনিট দরকার হয় তাহলে আমরা একটা সুইচ টিপে দিয়ে বসে থাকবো, আর যদি অনেক পানি থাকে এবং সেটি গরম করার জন্য পাঁচ, দশ মিনিট পর্যাপ্ত নয় তাহলে আমরা পনের মিনিটের সুইচটি টিপ দিয়ে অন্যকাজে মন দিতে পারবো- কাজ শেষ হলে এটি নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে আমাদের জানান দিবে। স্যার আমাকে দায়িত্ব দিলেন সার্কিট তৈরি করে সেটির কার্যক্রম পরীক্ষা করে দেখতে। আমি মোটামুটি একটা উপায়ের কথা চিন্তা করে একটা সার্কিট তৈরী করলাম। ব্রেড বোর্ডে সেটি লাগানো হলো। তারপর দেখা গেলো, ঠিক পাঁচ, দশ, পনেরও মিনিটের টাইমিং সার্কিট না হলেও মোটামুটি কাজ চালানোর মতো হয়েছে। স্যারকে সেটা দেখানো মাত্র উনি একটি মুচকি হাসি দিলেন। কারণ আমার সার্কিটটা কাজ করলেও পুরা সিস্টেমটি বিশাল আকার ধারণ করেছে, অসংখ্য ক্যাপাসিটর, রেজিস্টেন্স। এই আইডিয়ায় টাইমার সার্কিট তৈরী করলে সেটা মোটামুটি মশা মারতে কামান দাগার মতো খরুচে ব্যাপার হয়ে যাবে। তারপর উনি কাগজ কলম দিয়ে একটা চমৎকার ডিজাইন এঁকে দিলেন। যেই সিস্টেমে মাথা খাটানো হয়েছে বেশি, তাই খরচ কমে গিয়েছে, মূল যন্ত্রটি সরল এবং আমারটার চেয়েও দক্ষ হয়েছে। স্যারও একজন ইঞ্জিনিয়ার, আমিও তাই। আমার সাথে তাঁর পার্থক্য হচ্ছে তিনি দক্ষ আর আমি শিক্ষানবিস। তিনি এমনভাবে একটি সিস্টেমের ডিজাইন করতে সক্ষম যেটার খরচ কম হবে, হাবিজাবি অপ্রয়োজনীয় জিনিসে ভরপুর থাকবেনা, সর্বোপরী সবচেয়ে ভালো কাজ করবে। এতদিন আমরা ঈশ্বরকে স্যারের মতোই চৌকস ডিজাইনার বলে মনে করতাম। কিন্তু এখন নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা হলো তিনি তা নন। প্রকৃতিতে তার হাতে যেসব জিনিসপত্র ছিলো তা দিয়ে তিনি চাইলে আরও সুনিপুন নকশা করতে পারতেন। অপরদিকে বিবর্তন জ্ঞানে আমরা জানি, প্রকৃতিতে বিভিন্ন প্রানীদেহের এক অংগ বিবর্তনের পথ ধরে অন্য অংগে পরিবর্তিত হয়েছে। এভাবে পরিবর্তিত হলে স্বাভাবিক ভাবেই কিছু সমঝোতা করা আবশ্যক। প্রকৃতি জুড়ে আমরা তাই সুনিপুন ডিজাইনের পরিবর্তনে অসংখ্য সমঝোতা দেখতে পাই। যেহেতু আমার অজ্ঞতার সুযোগে এতোদিন স্রষ্ঠার অস্তিত্ত্বের প্রমানের হাতিয়ার হিসেবে আর্গুমেণ্ট ফ্রম ডিজাইন এতোদিন ব্যবহৃত হয়ে আসছিলো, তাই সেটির অনুকরণে বিবর্তন হবার প্রমান হিসেবে আমাদের আর্গুমেণ্ট ফ্রম ব্যাড ডিজাইন।

প্রজাতির ডিজাইনের ত্রুটি নিয়ে আলচনায় সবার আগেই আসবে স্তন্যপায়ী প্রানীদের বাকযন্ত্রের স্নায়ুর (recurrent Laryngeal nerve) কথা। মস্তিষ্ক থেকে বাকযন্ত্র পর্যন্ত আবর্তিত এই স্নায়ুটি আমাদের কথা বলতে এবং খাবার হজম করতে সাহায্য করে। মানুষের ক্ষেত্রে এই স্নায়ুর মস্তিষ্ক থেকে বাকযন্ত্র পর্যন্ত আসতে একফুটের মতো দুরত্ব অতিক্রম করা প্রয়োজন। কিন্তু কৌতুহল উদ্দীপক ব্যপার হলো, এটি সরাসরি মস্তিষ্ক থেকে বাকযন্ত্রে যাওয়ার রাস্তা গ্রহণ করেনি। মস্তিষ্ক থেকে বের হয়ে এটি প্রথমে চলে যায় বুক পর্যন্ত। সেখানে হৃদপৃণ্ডের বাম অলিন্দের প্রধান ধমনী এবং ধমনী থেকে বের হওয়া লিগামেণ্টকে পেঁচিয়ে আবার উপরে উঠতে থাকে। উপরে উঠে তারপর সে যাত্রাপথে ফেলে আসা বাকযন্ত্রের সাথে সংযুক্ত হয়। হাত মাথার পেছন দিয়ে ঘুরিয়ে ভাত খাওয়ার ব্যাপারের মতো এই যাত্রাপথে স্নায়ুটি তিনফুটের চেয়েও বেশি দুরত্ব অতিক্রম করে। আরেক স্তন্যপায়ী জিরাফের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। মস্তিষ্ক থেকে বের হয়ে সে লম্বা গলা পেরিয়ে বুকের মধ্যে ঘোরাঘুরি শেষে আবার লম্বা গলা পেরিয়ে উপরে উঠে বাকযন্ত্রে সংযুক্ত হয়। সরাসরি সংযুক্ত হলে যে দুরত্ব তাকে অতিক্রম করতে হতো, তার থেকে প্রায় পনের ফুট বেশি দুরত্ব সে অতিক্রম করে।

বাকযন্ত্রের স্নায়ুর এই আবর্তিত পথ শুধু মাত্র খুব বাজে ডিজাইনই নয় এটি ভয়ংকরও। স্নায়ুটির এই অতিরিক্ত দৈর্ঘ্যের কারণে এর আঘাত পাবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ধরা যাক, কেউ আপনাকে বুকে আঘাত করলো। এই ব্যাটার বুকে থাকার কথা ছিলোনা, কিন্তু আছে এবং যার ফলে ঠিকমতো আঘাত পেলে আমাদের গলার স্বর বন্ধ হয়ে আসে। যদি কেউ বুকে ছুরিকাহত হয় তাহলে কথাবলার ক্ষমতা নষ্টের পাশাপাশি খাবার হজম করার ক্ষমতাও ধ্বংস হয়ে যায়। বুঝা যায় কোনো মহাপরিকল্পক এই স্নায়ুটির ডিজাইন করেননি, করলে তিনি এই কাজ করতেন না। তবে স্নায়ুর এই অতিরিক্ত ভ্রমণ বিবর্তনের কারণে আমরা যা আশা করি ঠিক তাই।

bad design

মানুষ তথা স্তন্যপায়ীদের বাকযন্ত্রের এই চক্রাকার পথ আমরা যে মাছের মতো প্রানী হতে বিবর্তীত হয়েছি তার এক চমৎকার প্রমান। মাছের শরীরের নাড়ি-ভুড়ি ঢেকে রাখার কাঠামোর ষষ্ঠ শাখাটি (6th branchial arch) ফুলকায় রুপান্তরিত হয়েছিল। ফুলকায় রক্ত সরবাহ করতো হৃদপিণ্ডের বাম দিকের প্রধান ধমনীর দ্বিতীয় ভাগ যা Aortic Arch নামে পরিচিত। এই ধমনীর পেছনে ছিলো ভেগাস স্নায়ুর (Vagus Nerve) এর চতুর্থ শাখা। প্রাপ্ত বয়স্ক প্রত্যেকটা মাছের ফুলকা সামগ্রিক ভাবে এগুলো নিয়েই ছিল। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে মাছের নাড়ি ভুড়ি ঢেকে রাখার ষষ্ঠ শাখার একটি অংশ বিবর্তিত হয়ে বাকযন্ত্রে রুপান্তরিত হয়েছিল। সেই সময় যেহেতু ফুলকাই বিলুপ্ত, সুতরাং ফুলকাকে রক্ত সরবরাহকারী, হৃদপিন্ডের বামদিকের প্রধান ধমনীর প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে গিয়েছিল। কাজ না থাকায় এটি মূল গঠন থেকে একটু নীচে নেমে বুকের কাছে চলে এসেছিলো। আর যেহেতু এই ধমনীর পেছনে ছিলো স্নায়ুটি, তাই একেও বাধ্য হয়ে নেমে যেতে হয়েছিলো বুকের দিকে। তারপর বুকে থাকা বাম অলিন্দের প্রধান ধমনী এবং ধমনী থেকে বের হওয়া লিগামেণ্টকে পেঁচানো শেষ করে সে আবার উপরে উঠে এসে বিবর্তিত বাকযন্ত্রের সাথে সংযুক্ত হয়েছিলো। বাকযন্ত্রের স্নায়ুর অতিরিক্ত ভ্রমনের কারণ এটাই। বোঝা গেলো, বাকযন্ত্রের স্নায়ুর এই চক্রাকার ভ্রমন কোনো মহাপরাক্রমশালীর সৃষ্টিকর্তার ইংগিতের পরিবর্তে আমাদের বলছে আমাদের পূর্বপুরুষদের কথা।

এই লেখার শুরুতেই প্যালের করা মানব দেহের সাথে ঘড়ির তুলনা সম্পর্কে আমরা জেনেছি। যুক্তিগত ফ্যালাসিতে এই তুলনার মাধ্যমে অনেক মানুষকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব হলেও সত্যিকার অর্থে মানব দেহের সাথে ঘড়ির কোনও ধরনের তুলনাই হয়না। সায়েন্টিফিক আমেরিকায় প্রকাশিত “If Humans Were Built to Last” প্রবন্ধে লেখক এস. যে. ওলসানস্কি, ব্রুস কারনস এবং রবার্ট এন. বাটলার বিস্তারিত আলোচনা মাধ্যমে মানব দেহের ডিজাইন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন 3। এই বিস্তারিত আলোচনায় আমাদের ডিজাইনের নানা ত্রুটি তুলে ধরার মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, যদি একজন দেহ প্রকৌশলী সত্যিকার অর্থেই আমাদের দেহের ডিজাইনার হয়ে থাকেন, তাহলে সামান্য একটু মাথা খাটানোর মাধ্যমে তিনি ডিজাইনটিকে কীভাবে সুনিপুন করতে পারতেন। আর এই সুনিপুনতা করা হলে লাভ হতো আমাদের, অত্যন্ত সু- স্বাস্থ্য বজায় রেখে আমরা শতবছর আরাম করে বেঁচে থাকতে পারতাম।

বস্তুত প্রাকৃতিক নির্বাচন নিপুনতা এবং সুস্বাস্থ্যের সাথে দীর্ঘদিন টিকে থাকাকে থোরাই কেয়ার করে। একটা প্রজাতি বংশধর রেখে যাবার মতো সময় টিকে থাকলেই হলো। হারিয়ে যাওয়ারা হারিয়ে গেছে কারণ তারা বংশধর রেখে যেতে পারেনি, টিকে থাকারা টিকে আছে কারণ তারা বংশধর রেখে যেতে সমর্থ হয়েছিলো প্রকৃতির সাথে খাপ খাওয়ানোর মাধ্যমে। দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার সাথে এর কোনও সম্পর্ক নেই। এবার দেখা যাক, সায়েন্টিফিক আমেরিকানের লেখকরা মানব যন্ত্রের ডিজাইনের কী কী ক্রুটির কথা আলোচনা করেছেন। আমাদের হাড়গুলো বয়স ত্রিশ হবার পর মিনারেল হারাতে থাকে যার ফলে খুব অল্পতেই হাড় ভেঙ্গে যাবার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। আমাদের বুকের খাঁচা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়না এবং সকল অভ্যন্তরিন অংগ-প্রত্যংগকে রক্ষা করেনা। আমাদের পেশী ক্রমশ ক্ষয় হয়। আমাদের পায়ের শিরা সময়ের সাথে বড় হয়। হাড় গোড়ের সংযোগস্থল লুব্রিকেণ্টের অভাবে সংকুচিত হতে থাকে। পুরুষের প্রস্টেট বড় হয়, সংকুচিত হয় এবং মূত্র বের হওয়ায় প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে। ওলসানস্কি, কারনেস এবং বাটলার দেখিয়েছেন একজন সুনিপুন ডিজাইন করা মানুষ দেখতে হওয়া উচিত ছিল এমন- বড় বড় কান, বাঁকানো ঘাড়, স্বল্প দৈর্ঘ্যের অংগ-প্রত্যংগ, প্রতিটি সংযোগ স্থলে অতিরিক্ত প্যাডিং, অতিরিক্ত পেশি এবং চর্বি, পুরু মেরুদন্ড, বিপরীতমুখী হাঁটুর সংযোগ ইত্যাদি, ইত্যাদি।

আদম- হাওয়া ও নূহের মহাপ্লাবন

আমার খুব প্রিয় একটা উদ্দৃতি আছে। ইয়ুটিউবে এক ব্লগার নিজের পাতায় লিখে রেখেছিলেন কথাটি। “সত্য কখনই কাউকে আঘাত করে না যদিনা সেখানে আগে থেকেই একটা মিথ্যা অবস্থান করে।” বিবর্তনের জন্য কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৫৯ সালে ডারউইন এবং ওয়ালেস যখন বিবর্তন তত্ত্বটি প্রকাশ করেন তখন চার্চের বিশপের স্ত্রী আর্তনাদ করে বলেছিলেন, 4

“বন মানুষ থেকে আমাদের বিবর্তন ঘটেছে। আশাকরি সেটা যেন কখনই সত্য না হয়। আর যদি তা একান্তই সত্য হয়ে থাকে তবে চলো আমরা সবাই মিলে প্রার্থনা করি সাধারণ মানুষ যেন কখনই এই কথা জানতে না পারে। ”

যে প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই সেই প্রশ্নগুলোর মনগড়া উত্তর দেওয়া এবং তা মানুষকে বিশ্বাস করানোই ধর্মের কাজ। বিবর্তনের ফলে প্রজাতির ক্রমবিকাশ হয়েছে এই কথা মানুষ জানতে পেরেছে দুই শতকও হয়নি। উত্তরটা যদিও একেবারে নতুন কিন্তু প্রশ্নটা নয়। তাই দীর্ঘসময় ধরে মানুষ নানা উত্তর কল্পনা করে নিয়েছে। আর ধর্ম এসে সেই উত্তরগুলোকে খোদার উত্তর বা খোদা থেকে প্রাপ্ত উত্তর বলে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধর্মগুলো, ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং মুসলমানদের বিশ্বাস করা সৃষ্টিবাদ সেইরকমই একটি জিনিস। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের লাইন উদ্ধৃত করে লেখাটা দীর্ঘ করবো না, কারণ মূল কাহিনী আমাদের কমবেশি সবারই জানা। বর্ণনাভেদে ধর্মগ্রন্থগুলোতে পার্থক্য থাকলেও মূল কাহিনী মোটামুটি একইরকম এবং এই দুই ক্ষেত্রেই সৃষ্টিবাদ দুটি অংশে বিভক্ত।

১। আল্লাহ প্রথম মানুষ হিসেবে আদমকে সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর পাজরের হাঁড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছিলো বিবি হাওয়াকে। অতঃপর শয়তানের প্ররোচনায় ঈশ্বরের আদেশ অমান্য করায় তাঁদের বেহেশত থেকে পৃথিবীতে নিক্ষেপ করা হয়। তারপর তাঁদের থেকেই সৃষ্টি হয় মানব সভ্যতা। (জেনেসিস ১), কুরআন- আল- আরাফ ৭:১৮৯, আল- ইমরান ৩:৫৯, আল- আরাফ ৭:১১-২৭।

২। মানব সভ্যতার এক পর্যায়ে হযরত নূহ- নবীর নবীর পৃথিবীর সকল মানুষ পাপে নিমজ্জিত হয়, ভুলে যায় ইশ্বরকে। ঈশ্বর ক্রোধান্বিত হয়ে নূহকে একটি নৌকা বানানোর হুমুক দেন। সেই নৌকায় নির্বাচিত কয়েকজন মানুষ এবং পৃথিবীর সকল ধরণের প্রজাতির এক জোড়া তুলে নেওয়া হয়। বাকীদের মহাপ্লাবনের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়। পাপের দায়ে ধ্বংস করা হয় মহাপ্লাবনের আগের রাতে জন্মগ্রহণ করা শিশুকেও। (জেনেসিস ৭-৮)

এই ঈশ্বর ইব্রাহিমের ঈশ্বর বা গড অফ আব্রাহাম। পৃথিবীর প্রধান তিনটি ধর্ম এই ঈশ্বরের পুজারি। বিবর্তন বিজ্ঞানী এবং এর লেখকরা বিবর্তন এবং নানা ধরণের সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম ব্যাপার নিয়ে অসংখ্য বই, নিবন্ধ লিখলেও এই সৃষ্টিবাদকে অযৌক্তিক ব্যাখ্যা করতে খুব একটা সময় দেননি। কিন্তু সময় দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁদের কাছে একটি একটি পৌরানিক কাহিনী হলেও পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ আক্ষরিক ভবে এই গল্পে বিশ্বাস করে। আর এই গল্পে অগাধ বিশ্বাস তাদের মনের কপাট বন্ধ করে রাখে ফলে বিবর্তনের হাজারো প্রমান তাদের মাথায় ঢুকেনা।

ধর্মগ্রন্থে আমরা আদম হাওয়ার কথা পড়েছি, পড়েছি তাঁদের দুই সন্তান হাবিল, কাবিলের কথা। তবে আমাদের পড়াশোনা ঠিক এখানেই শেষ, আমরা ধরে নিয়েছি দুটো মানুষ, তাঁদের সন্তানরা মিলে সারা পৃথিবী মানুষে মানুষে ছেয়ে ফেলেছে। তবে এখানেই থেমে না যেয়ে আরেকটু সামনে আগালে, আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই একটা গভীর প্রশ্নের সন্মুখীন আমাদের হতে হয়। সন্তান উৎপাদনটা ঠিক কীভাবে হলো?

20091210_22

গুগল ডিকশেনারী ইনসেস্ট বা অজাচার এর অর্থ বলছে এটি ভাই-বোন, পিতা- কন্যা, মাতা- ছেলের মধ্যে যৌন সংগমের দরুন একটি অপরাধ। ধর্ম নিজেকে নৈতিকতার প্রশাসন হিসেবে পরিচয় দেয়, অথচ তারা আমাদের যে গল্প শোনায় তা মারাত্মক রকমের অনৈতিক। আদম হাওয়ার গল্প সত্যি হয়ে থাকলে পৃথিবীতে আমরা এসেছে মারাত্মক এক পাপের মধ্য দিয়ে।

পাপ- পূন্যের কথা থাক। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোন থেকে ব্যাপারটি বিবেচনা করা যাক। ইনসেস্ট বা অজাচারকে বৈজ্ঞানিক ভাবে অভিহিত করা হয়ে থাকে ইন-ব্রিডিং হিসেবে। নারী ও পুরুষের আত্মীয় হওয়া মানে তাদের মধ্যে জিনেটিক গঠনে পার্থক্য কম। এখন তারা যদি একে অন্যের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে সন্তান উৎপাদন করে তাহলে সেই সন্তানের মধ্যে ব্যাড মিউটেশনের সম্ভাবনা প্রবল। এর ফলে সন্তানটি বেশিরভাগ সময়ই হবে বিকলাংগ। আর এই কারণেই প্রকৃতিতে আমরা ইন-ব্রিডিং দেখতে পাইনা। কারণ ইন- ব্রিডিং হলে প্রজাতির টিকে থাকার সম্ভাবনা কমে যায়, তারা খুব দ্রুত প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু যদি ভিন্ন পরিবার থেকে এসে দুইজন সন্তান উৎপাদন করে তাহলে সন্তানের মধ্যে যথেষ্ট পরিমান জিনেটিক ভ্যারিয়েশন হবে। আর যথেষ্ট পরিমান জিনেটিক ভ্যারিয়েশন প্রজাতির টিকে থাকার জন্য অবশ্য দরকার। প্রাকৃতিক দূর্যোগের ফলে পৃথিবীর চিতাবাঘের সংখ্যা নেমে এসেছিল ত্রিশ হাজারে। ত্রিশ হাজারকে একটা বড় সংখ্যা হলেও জনপুঞ্জের জনসংখ্যা হিসেব করলে সেটা খুব একটা বড় নয়। আর এই কারণেই চিতাবাঘকে ইনব্রিডিং এর আশ্রয় নিতে হয়েছিল। যার পরিমান আজকে আমরা দেখতে পাই, প্রকৃতিতে চিতাবাঘ বিলুপ্ত প্রায়। সুতরাং দুইটি মানুষ থেকে সমগ্র মানব জাতির সৃষ্টি হয়েছিল এটার মতো হাস্যকর কথা নেই। পৃথিবীতে কখনই আদম, হাওয়া নামে দুইটি মানুষ ছিলোনা।

এবার আশা যাক নূহের মহাপ্লাবন নিয়ে। সিলেট থেকে প্রকাশিত যুক্তি পত্রিকার সম্পাদক এবং ২০০৬ সালে মুক্তমনা ড়্যাশনালিস্ট এওয়ার্ড পাওয়া অনন্ত বিজয় দাশ “মহাপ্লাবনের বাস্তবতা” নামে একটি সুলিখিত প্রবন্ধে বিভিন্ন ধর্ম গ্রন্থে বর্নিত নূহের মহাপ্লাবন সম্পর্কিত আয়াত লিপিবদ্ধ করেছেন 5। আলোচনার সুবিধার্থে সেখান থেকে কয়েকটি তুলে ধরা হলো।

ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেল-এর ওল্ড টেস্টামেন্টের (পুরাতন নিয়ম) অন্তর্গত তৌরাত শরিফে হযরত নুহ্ (আঃ) সম্পর্কে বলা হয়েছে-

এই অবস্থা দেখে ঈশ্বর নোয়া কে বললেন, “গোটা মানুষজাতটাকেই আমি ধ্বংস করে ফেলব বলে ঠিক করেছি। মানুষের জন্যই দুনিয়া জোরজুলুমে ভরে উঠেছে। মানুষের সঙ্গে দুনিয়ার সবকিছুই আমি ধ্বংস করতে যাচ্ছি। তুমি গোফর কাঠ দিয়ে তোমার নিজরে জন্য একটা জাহাজ তৈরি কর। তার মধ্যে কতগুলো কামরা থাকবে; আর সেই জাহাজের বাইরে এবং ভিতরে আল্কাত্রা দিয়ে লেপে দিবে। জাহাজটা তুমি এইভাবে তৈরি করবে; সেটা লম্বায় হবে তিনশো হাত, চওড়ায় পশ্চাশ হাত, আর উচ্চতা হতে ত্রিশ হাত। জাহাজটার ছাদ থেকে নীচে এক হাত পর্যন্ত চারদিকে একটা খোলা জায়গা রাখবে আর দরজাটা হবে জাহাজের একপাশে। জাহাজটাতে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা থাকবে। আর দেখ, আমি দুনিয়াতে এমন একটা বন্যার সৃষ্টি করব যাতে আসমানের নীচে যে সব প্রাণী শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে বেঁচে আছে তারা সব ধ্বংস হয়ে যায়। দুনিয়ার সমস্ত প্রাণীই তাতে মারা যাবে (পয়দায়েশ, ৬:১৩-১৭)।

“কিন্তু আমি তোমার জন্য আমার ব্যবস্থা স্থাপন করব। তুমি গিয়ে জাহাজে উঠবে আর তোমার সঙ্গে থাকবে তোমার ছেলেরা, তোমার স্ত্রী ও তোমার ছেলেদের স্ত্রীরা। তোমার সঙ্গে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য তুমি প্রত্যেক জাতের প্রাণী থেকে স্ত্রী-পুরুষ মিলিয়ে এক এক জোড়া করে জাহাজে তুলে নেবে। প্রত্যেক জাতের পাখী, জীবজন্তু ও বুকে-হাঁটা প্রাণী এক এক জোড়া করে তোমার কাছে আসবে যাতে তুমি তাদের বাঁচিয়ে রাখতে পার; আর তুমি সব রকমের খাবার জিনিস জোগাড় মজুদ করে রাখবে। সেগুলোই হবে তোমার ও তাদের খাবার।” নুহ্ তা-ই করলেন। আল্লাহ্র হুকুম মত তিনি সবকিছুই করলেন (পয়দায়েশ, ৬:১৮-২২)।

কোরান শরিফে হযরত নুহ্ এবং মহাপ্লাবন সম্পর্কে বর্ণিত তথ্য

অতপর আমি তার কাছে ওহি পাঠালাম যে, তুমি আমার তত্ত্বাবধানে আমারই ওহি অনুযায়ী একটি নৌকা প্রস্তুত করো। তারপর যখন আমার (আজাবের) আদেশ আসবে এবং (জামিনের) চুল্লি প্লাবিত হয়ে যাবে, তখন (সব কিছু থেকে) এক এক জোড়া করে নৌকায় উঠিয়ে নাও, তোমার পরিবার পরিজনদেরও (উঠিয়ে নেবে, তবে) তাদের মধ্যে যার ব্যাপারে আল্লাহতায়ালার সিদ্ধান্ত এসে গেছে সে ছাড়া (দেখো), যারা জুলুম করেছে তাদের ব্যাপারে আমার কাছে কোনো আরজি পেশ করো না, কেননা (মহাপ্লাবনে আজ) তারা নিমজ্জিত হবেই (সুরা আল মোমেনুন, ২৩:২৭)।

তুমি আমারই তত্ত্বাবধানে আমারই ওহির আদেশে একটি নৌকা বানাও এবং যারা জুলুম করেছে, তাদের ব্যাপারে তুমি আমার কাছে (কোনো আবেদন নিয়ে) হাজির হয়ো না, নিশ্চয়ই তারা নিমজ্জিত হবে (সুরা হুদ, ১১:৩৭)।

(পরিকল্পনা মোতাবেক) সে নৌকা বানাতে শুরু করলো। যখনই তার জাতির নেতৃস্থানীয় লোকেরা তার পাশ দিয়ে আসা-যাওয়া করতো, তখন (নূহকে নৌকা বানাতে দেখে) তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি শুরু করে দিতো; সে বললো (আজ) তোমরা যদি আমাদের উপহাস করো (তাহলে মনে রেখো), যেভাবে (আজ) তোমরা আমাদের ওপর হাসছো (একদিন) আমরাও তোমাদের ওপর হাসবো (সুরা হুদ, ১১:৩৮)।

অবশেষে (তাদের কাছে আজাব সম্পর্কিত) আমার আদেশ এসে পৌঁছল এবং চুলো (থেকে একদিন পানি) উথলে উঠলো, আমি (নুহকে) বললাম, (সম্ভাব্য) প্রত্যেক জীবের (পুরুষ-স্ত্রীর) এক একজোড়া এতে উঠিয়ে নাও, (সাথে) তোমার পরিবার-পরিজনদেরও (ওঠাও) তাদের বাদ দিয়ে, যাদের ব্যাপারে আগেই সিদ্ধান্ত (ঘোষিত) হয়েছে এবং (তাদেরও নৌকায় উঠিয়ে নাও) যারা ঈমান এনেছে; (মূলত) তার সাথে (আল্লাহর ওপর) খুব কম সংখ্যক মানুষই ঈমান এনেছিলো (সুরা হুদ, ১১:৪০)।

নূহের মহাপ্লাবন সম্পর্কিত পৌরানিক গল্পের সূচনা এই ধর্মগ্রন্থগুলো থেকে নয়। এই গল্পের শেকড় খুঁজতে যেয়ে আমরা সবচেয়ে পুরাতন যে ভাষ্য বা বর্ননা পাই সেটা ২৮০০ খ্রিস্টপূর্ব সময়কার। সুমিরিয়ান পুরানে এমন এক বন্যার বর্ননা পাওয়া যায় যার নায়ক ছিল রাজা জিউশুদ্র, যিনি একটি নৌকা তৈরীর মাধ্যমে একটি ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে অনেককে রক্ষা করেছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৮০০ এর মধ্য বিখ্যাত বেবেলনিয়ান পৌরানিক চরিত্র গিলগামেশ তার এক পূর্বপুরুষের য়ুতনাপিসটিমের কাছ থেকে একই রকম এক বন্যার কথা শুনতে পান। সেই গল্পানুসারে পৃথিবীর দেবতা আ (Ea) রাগান্বিত হয়ে পৃথিবীর সকল জীবন ধ্বংস করে ফেলার অভিপ্রায়ের কথা য়ুতনাপিসটিমকে জানান। তিনি য়ুতনাপিসটিমকে ১৮০ ফুট লম্বা, সাততলা বিশিষ্ট এবং প্রতিটি তলায় নয়টি কক্ষ থাকবে এমন একটি নৌকা তৈরী করে তাতে পৃথিবীর সকল প্রজাতির এক জোড়া করে তুলে নেবার আদেশ দেন। 6

গিলগামেশের এই মহাপ্লাবন মিথটিই লোকেমুখে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়ে। আব্রাহামিক গডের আবিষ্কারক এবং পুজারি হিব্রুরা প্যালেস্টাইনে আসার অনেক থেকেই সেখানকার মানুষদের কাছে এই গল্প প্রচলিত ছিলো। আর সেই গল্পের প্রভাবই আমরা দেখতে পাই, পরবর্তীতে হিব্রুদের গড অফ আব্রাহামের বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ তৌরাত, বাইবেলে। আর এই তৌরাত, বাইবেলের গল্প থেকেই অনুপ্রানিত হয়েছে আরবের ইসলাম ধর্মের কুরআনের নূহের মহাপ্লাবন কাহিনী।

একটা সংস্কৃতিকে এর ভৌগোলিক অবস্থান বেশ প্রভাবিত করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি সংস্কৃতি যাদের ভৌগলিক অবস্থান নদ-নদী বিধৌত, যেগুলো প্রায়শই বন্যার ঘটিয়ে জনপদ গিলে ফেলে সেইসব সংস্কৃতিতে নদ-নদী সম্পর্কিত কিংবা বন্যা সম্পর্কিত বিভিন্ন গল্প চালু থাকে। সুমেরিয়া এবং ব্যবিলনিয়া জনপদ টাইগ্রিস এবং ইউফ্রাটিস নদী দিয়ে আবৃত ছিল। এইসব অঞ্চলে প্রায়শই বন্যা হতো। এখন এর মানে কী এই তৌরাত, বাইবেল, কুরআনের সকল গল্প মিথ্যা? অবশ্য এই প্রশ্ন করা মানেই পৌরানিক কাহিনীর সত্যিকারে বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশ করা। জোসেফ ক্যাম্পবেল (১৯৪৯, ১৮৮৮) তাঁর সারাজীবন অতিবাহিত করেছেন এই বৈশিষ্ট্য সঠিকভাবে মানুষের কাছে ব্যাখ্যা করতে 7। তাঁর মতে, মহাপ্লাবন সম্পর্কিত পৌরানিক কাহিনীগুলোকে আমরা যেভাবে দেখি তার থেকে এর অনেক গভীর মর্মার্থ রয়েছে। পৌরানিক কাহিনী কোন ঐতিহাসিক সত্যকাহিনী নয়, এটি হলো মানব সভ্যতার প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার সংগ্রাম। প্রতিটা মানুষের মনেই তাঁর জন্মের উদ্দেশ্য, সে কীভাবে এলো, কেমন করে এলো এইসব প্রশ্ন ঘুরে ফিরে। আর এই প্রশ্ন থেকে মুক্তি পেতে সে বিভিন্ন উত্তর দাঁড়া করায়। আর তা থেকেই জন্ম নেয় পৌরানিক কাহিনীর। পৌরানিক কাহিনীর সাথে বিজ্ঞানের বিন্দুমাত্র কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু ধর্ম এসে এই শ্বাশত কাহিনীগুলোকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে যেয়ে একে বিজ্ঞান বলে প্রচার করেছে। এটা বিজ্ঞান এবং পৌরানিক কাহিনী দু’টির জন্যই অপমানজনক। সৃষ্টিবাদীরা পৌরানিক কাহিনীর চমৎকার সব গল্পকে গ্রহণ করেছে, তারপর সেটাকে ধ্বংস করেছে।

পৌরানিক কাহিনীকে বিজ্ঞানে রূপান্তর করার আহাম্মকীর উদাহরণ দিতে গেলে নূহের মহাপ্লাবনই যথেষ্ট। ৪৫০ (৭৫* ৪৫) বর্গফুটের একটি নৌকায় কয়েক কোটি প্রজাতিকে জায়গা দিতে হবে। তাদের খাবারের ব্যবস্থা কী হবে? পয়নিষ্কাশন, পানি? ডায়নোসোররা কোথায় থাকবে, কিংবা সামুদ্রিক প্রানীরা। এক প্রাণীর হাত থেকে অন্যপ্রানীকে রক্ষার উপায় কী? আর সমুদ্রে থাকা প্রানীরা বন্যায় মারা যাবে কীভাবে? এই সকল প্রশ্নের উত্তর বিশ্বাসীদের কাছে একটাই। ঈশ্বর চাইলে সব হবে। তবে সেক্ষেত্রে ঈশ্বরের নূহকে দিয়ে নৌকা বানিয়ে খেলাটা খেলার দরকার কী ছিলো? তিনি চাইলেই তো এক হুকুমেই পৃথিবীর তাবত পাপীকে মেরে ফেলতে পারতেন। তাতে করে অন্তত আগের দিন জন্ম নেওয়া নিষ্পাপ শিশুগুলো বেঁচে যেতো।

ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত ইন্সটিউট অফ ক্রিয়েশন রিসার্চ মিউজিয়ামে নূহের নৌকার ছবি। মানুষকে জোর করে গালগল্প বিশ্বাস করানোর জন্য আলাদা আলাদা কম্পার্টমেন্টের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তরদানের চেষ্টা (!!) করা হয়েছে। ছবি সূত্রঃ বার্নাড লে কাইন্ড যে।

ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত ইন্সটিউট অফ ক্রিয়েশন রিসার্চ মিউজিয়ামে নূহের নৌকার ছবি। মানুষকে জোর করে গালগল্প বিশ্বাস করানোর জন্য আলাদা আলাদা কম্পার্টমেন্টের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তরদানের চেষ্টা (!!) করা হয়েছে। ছবি সূত্রঃ বার্নাড লে কাইন্ড যে।

নৌকার কথা বাদ দিলেও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে পৃথিবীতে এমন কোনও মহাপ্লাবন হয়নি, যাতে করে বাড়ি- ঘর থেকে শুরু করে সকল উঁচু পর্বত ডুবে গিয়েছিলো। এছাড়া মহাপ্লাবন এর ফলে মৃত প্রাণীদের জীবাশ্মগুলো সব মাটির একই স্তরে থাকার কথা ছিল (যেহেতু তারা সবাই একই সময়ে মৃত্যু বরণ করেছে) তেমন প্রমানও খুঁজে পাননি ভূ-তত্ত্ব বিদরা। দেখা যাচ্ছে সৃষ্টিবাদীরা শুধু বিবর্তনীয় জীবনবিজ্ঞানকে অস্বীকার করছেন না, তারা অস্বীকার করছেন পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, ইতিহাস, ভূ-তত্ত্ব, ফসিল বিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রানীবিদ্যা সহ সকল বিষয়কে।

নূহের মহাপ্লাবনের অসাড়তা আব্রাহামিক গডকে বেশ বিড়ম্বনায় ফেলে দেবার জন্য যথেষ্ঠ। এমন ঘটনা যেহেতু কোনোদিনও ঘটেনি এবং তিন দাবী করেছেন ঘটেছে তাই আমরা সহজের সিদ্ধান্তে আসতে পারি আব্রাহামিক গড বলে আসলে কেউ নেই, এটা মানুষের মন গড়া কল্পনা, ধর্মগ্রন্থগুলো মানুষের লিখিত।

মগজ ধোলাই

ঈশ্বরের ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখার জন্য সৃষ্টিবাদীদের বিবর্তন তত্ত্ব নিয়ে প্রচারিত সন্দেহ (!) নিয়ে আলোচনা আর দীর্ঘায়িত করে লাভ নেই। কারণ ডারউইন তাঁর “অরিজিন অফ স্পেসিজ” বইটিতেই সকল ভুল ধারণা কবর দিয়েছিলেন। তারপর আরও শত জীববিজ্ঞানী সেগুলো আলোচনা করেছেন। এর কোনোটিই সৃষ্টিবাদীদের এবং ইণ্টেলিজেণ্ট ডিজাইন সমর্থকদের চোখে পড়েনি, তারা একই জিনিস বারবার চর্বন করে যাচ্ছেন। লেখার এই পর্যায়ে পাঠকদের উদ্দেশ্যে মুক্তবাজার অর্থনীতির সাথে প্রাকৃতিক নির্বাচন পক্রিয়ার সাথে সাদৃশ্য তুলে ধরার মাধ্যমে তাদের মনকে এই তত্ত্ব গ্রহণে কিংবা বাস্তবতা গ্রহণে প্রস্তুত করার চেষ্টা করবো। কারণ আদতে বিবর্তনকে কোয়াণ্টাম মেকানিক্সের মতো বিমূর্ত মনে হলেও বিবর্তন তত্ত্ব তা নয়। সৃষ্টিবাদীদের হাজার বছরের মিথ্যার কারণে আমাদের মাথায় প্রলেপ পড়েছে, তাই সেখানে একটি শিরিষ কাগজের ঘষা বাঞ্চনীয়। একবার মন প্রস্তুত হয়ে গেলে বিবর্তন তত্ত্বকে সঠিক ও যৌক্তিক মনে করাটাই স্বাভাবিক হয়ে পড়বে। বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী এবং অক্সফোর্ড প্রফেসর রিচার্ড ডকিন্স বলেন, একবার ভালোভাবে বুঝতে পারলে এই পথটাকেই (বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা) অধিক যুক্তিসঙ্গত মনে হতে বাধ্য 8 । ডারউইনের বুলডগ নামে খ্যাত টমাস হাক্সলি ‘অরিজিন অব স্পিসিজ’ পড়ে মন্তব্য করেছিলেন, “আমি কতবড় গাধা, এই ব্যাপারটা আগে চিন্তাই করি নি”। 9

কলেজে থাকাকালীন সময়ে বিতর্কের ঝোঁক ছিল প্রচুর। এবং আদতে যা হয়, কলেজে পর্যায়ের বিতর্কে সাধারণত কয়েকটি বিষয়ই ঘুরে ফিরে বক্তব্যদানের জন্য নির্বাচিত হয়। আর এই কয়েকটি বিষয়ের মধ্যে সেরা এবং সর্বাধিক বিতর্কিত বিষয়ের নাম ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’। কলেজে আমার শেষ বিতর্কের বিষয় ছিল “মুক্তবাজার অর্থনীতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়”। স্ক্রিপ্টের বেশ কিছু লাইন এখনো মুখস্ত আছে। পাঁচ মিনিটের বক্তব্য আমি সূচনা করেছিলাম এই বলে, “যোগ্যরা স্থায়ী চিরকাল, অযোগ্যরা বিতাড়িত সর্বকাল”- এ নীতির উপর ভিত্তি করে অর্থনৈতিক পরিভাষায় যুক্ত হয়েছে ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’ শব্দদয়। এছাড়া মুক্তবাজারের সবচেয়ে বোধগম্য সংজ্ঞা আমার কাছে- সাধারণত কোনো প্রতিকূলতা বা বাধা-বিপত্তি ছাড়াই একটি দেশের অভ্যন্তরে বা বাইরে যে কোনো ধরনের পন্য বা সেবা বেচাকেনার সুযোগ-সুবিধা বা বিধি-ব্যবস্থা বজার রাখার নাম মুক্তবাজার বা খোলা বাজার।
ধরা যাক, একটি ভারতীয় জামার বাজার। এখানে ক্রেতারা সকলেই ভারতীয় এবং তাঁরা জামা কিনবেন। এখন দুনিয়ার ত্রিশটি দেশ ভারতীয় ক্রেতাদের জন্য জামা তৈরী করে সেই বাজারে পসরা সাজিয়েছেন। এদের মধ্যে বাংলাদেশের দোকানে রয়েছে অসংখ্য ডিজাইনের জামাকাপড়। আমেরিকা, জাপানের দোকানেও পাওয়া যাবে বৈচিত্রময় ফ্যাশানেবল অংসখ্য জামা। কিন্তু বাংলাদেশে আমেরিকা ও জাপানের তুলনায় শ্রমের দাম কম বিধায়, উৎপাদন খরচ কম সুতরাং তাদের জামা অন্যান্যদের মতো দেখতে একই হলেও দাম অনেক কম। এখন ভারতীয় একজন ক্রেতা কাদের জামাটি কিনবেন? যেহেতু কোনো কিছু কেনার সময় ক্রেতারা সর্বনিম্মমূল্যে সবচেয়ে ভালো পন্যটি পেতে চান, তাই তাদের পছন্দ হবে বাংলাদেশি পন্য। এখন বাংলাদেশ তার সকল পন্য বেচে দেশে বস্তাভর্তি টাকা নিয়ে যাবে, তা দিয়ে জামা উৎপাদন আরও বৃদ্ধি করবে। অপরদিকে ধীরে ধীরে ধসে পড়বে জাপান ও আমেরিকার পোশাক শিল্প। এটাই মুক্তবাজার অর্থনীতি। খোলা বাজার, খোলা প্রতিযোগীতা। তুমি যোগ্য হলে, বাজার উপযোগী হলে টিকে থাকবে, নতুবা হারিয়ে যাবে।

আমার বাবা একটি টেক্সটাইল কোম্পানীতে কাজ করেন। সেদিন তিনি বললেন, আগে চিঠি চালাচালির মাধ্যমে একটি চুক্তি সাইন করতে প্রায় মাস খানেক লেগে যেতো। এখন ই-মেইলের কল্যাণে থাইল্যাণ্ডের বায়ারের সাথে চুক্তি সম্পাদন করতে সময় লাগে কয়েক ঘণ্টা। বাজার জটিল হচ্ছে, এবং তা হচ্ছে ধীরে ধীরে প্রয়োজনের সাথে খাপ খাওয়াতে। এখন কোন কোম্পানীর জেনারেল ম্যানেজার যদি ই-মেইল ব্যবহার না করেন, তাহলে তিনি কী কারও সাথে কোনও চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবেন? পারবেন না, কারণ তাঁর সাথে চুক্তি করতে যতটা সময় লাগবে সেই সময়ে বায়াররা ত্রিশজনের সাথে চুক্তি করতে পারবেন। সুতরাং পর্যাপ্ত অর্ডারের অভাবে সেই কোম্পানীর লাটে উঠতে খুব বেশিদিন লাগবেনা। কিংবা ধরুন, পথে প্রান্তরে এই যে এতো কথা, মুক্তবাজার অর্থনীতি বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়, মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে আমাদের কুটির শিল্প ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এই কথাগুলোর মানে কী? ঘর সাজিয়ে রাখার জন্য, বিশেষ অনুষ্ঠানে উপহার দেবার জন্য ব্যবহৃত শো-পিসের কথা ধরুন। আগে আমরা গ্রামাঞ্চলের মানুষদের হাতে তৈরী বিভিন্ন শো-পিস ক্রয় করতাম। কিন্তু এখন মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে বাংলাদেশে স্বল্পদামে বিভিন্ন দেশের তৈরী শো-পিস পাওয়া যাচ্ছে। বাইরের দেশের মানুষেরা শো-পিসগুলো তৈরী করতে এখন আর মানুষের হাতের আশ্রয় নেয় না, তারা মেশিনের মাধ্যমে একদিনে কয়েকহাজার পন্য উৎপাদন করে সেগুলো চালান দেয়। যত বেশি উৎপাদন হবে, গড় উৎপাদন খরচ তত কম হবে। এখন সেই পণ্যের যা দাম তার চেয়ে বাংলাদেশের গ্রামে হাতে বানানো জিনিসটির দাম বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। বাজারে গিয়ে আপনি এখন কোনটা ক্রয় করবেন। আবেগের বশে প্রথমদিকে নিজেদের জিনিস ক্রয় করলেও দীর্ঘমেয়াদে আপনি খরচ কমানোর স্বার্থে ঝুকে পড়বেন বিদেশী পন্যের দিকেই। এখন বাংলাদেশের কুটির শিল্পীরা যদি মেশিন ক্রয় করে নিজেরাও এইভাবে উৎপাদন শুরু করে তাহলে আর আবেগ দেখানো প্রয়োজন হবেনা, বাজার প্রতিযোগীতায় যোগ্য হয়েই তারা টিকে থাকতে পারবে। কিন্তু যদি সেটা না পারে, তাকে হারিয়ে যেতে হবে অচিরেই। প্রকৃতিতে যোগ্যরাই টিকে থাকে।

উপরের উদাহরণটা সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলেও মুক্তবাজার অর্থনীতি একটি জটিল পক্রিয়া। চিন্তা করে দেখুন, একটি কোম্পানী শুধু একটি পন্য তৈরী করেই বসে থাকেননা, এদের এই পন্যটি বিভিন্ন দেশে পৌঁছাতে হয়, দেশভেদে প্রতিযোগীতায় টিকে থাকার জন্য পন্যের মান নির্ধারণ করতে হয়। আপনি মার্কস চকলেটটি খুব পছন্দ করেন। গিয়ে দেখুন সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারের ইংল্যাণ্ডে উৎপাদিত মার্কস চকলেটটি ঠিকই আপনার বাসার পাশের দোকানে আছে। আপনার পছন্দের স্প্যাগাটি ফ্লেবারটিও পাবেন বাসার পাশের সুপার স্টোরে। আপনি নীচের দিকে চাপা আর উপরের দিকে ঢোলা মডেলের জিন্সের প্যান্ট পড়তে স্বচ্ছন্দবোধ করেন, সেটাও আছে বংগবাজারে।

তবে আজ থেকে একশ বছর আগেও বাজার এমন ছিলোনা। কিন্তু ধীরে ধীর সব কিছু জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে, পণ্য ও সেবা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রাকৃতিক ব্যাপারটি সর্বপ্রথম আলোচনা করেছিলেন এডাম স্মিথ এবং পরবর্তীতে ফ্রেডরিক হায়েক এবং কার্ল পুপার 10 । অর্থনীতির সর্বোচ্চ চেয়ারে আসন গেড়ে কে এই মহাপরিকল্পনা করছেন? কে নির্ধারণ করছেন একটি শপিং মলে একটি নির্দিষ্ট ক্যাণ্ডি সংখ্যা, এই দেশে এই মডেলের জিন্সের প্যাণ্টের সংখ্যা? কোন অর্থনৈতিক ইশ্বর? অবশ্যই না। একটি কোনও অর্থনৈতিক ইশ্বরের মহাপরিকল্পনা নয়। সম্পূর্ণ সিস্টেমটি ক্ষুদ্র থেকে নিজে নিজে গড়ে উঠেছে, চাহিদা সাথে তাল মিলিয়ে এটি নিজে নিজেই ক্রমান্বয়ে জটিল হচ্ছে, বিবর্তিত হচ্ছে। এই বিষয়ে কেউই সন্দেহ পোষণ করেন না। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, অর্থনীতির এই নিজে নিজে তৈরী হওয়া, ধীরে ধীরে বিবর্তনের মাধ্যমে জটিলতর হওয়াকে একবাক্যে মেনে নিলেও প্রানীজগতের বেলায় একই ঘটনা আমরা মেনে নিচ্ছিনা। প্রানীজগতের জটিলতা ব্যাখ্যায় আমরা বসাচ্ছি একজন ঈশ্বরকে। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর অন্যান্য সকল প্রাণীকে মানুষের উপকারী করে সৃষ্টি করেছেন। এমন কয়েক লক্ষ প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যাবে যারা শুধুমাত্র মানুষের ক্ষতি করে, এমন কয়েক লক্ষ প্রজাতি পাওয়া যাবে যাদের থাকা না থাকার সাথে মানুষের কোনও সম্পর্ক নেই।

আবার উল্লেখকরি, র‌্যান্ডব জিনেটিক মিউটেশন ও জিনেটিক ড্রিফটের কারণে প্রানীজগতে অসংখ্য প্রকরণ বা ভ্যারিয়েশন তৈরী হয়। তৈরী হওয়া এই ভ্যারিয়েশন সমৃদ্ধ প্রানীদের উপর ক্রিয়া করে প্রাকৃতিক নির্বাচন। প্রাকৃতিক নির্বাচন নিজে একটি নন র‌্যাণ্ডম পক্রিয়া। এটি বলতে বোঝানো হয় প্রানীর উপর পারিপার্শ্বিক পরিবেশের ক্রিয়াকে। অসংখ্য ভ্যারিয়েশনের মধ্যে অল্প সংখ্যক পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর উপযোগী থাকে, এরা টিকে থাকে, বাকিরা ঝরে পড়ে। টিকে থাকাদের থেকে আরও ভ্যারিয়েশন তৈরী হয়, তাদের মধ্যে থেকে যারা পরিবেশে আরও ভালোভাবে টিকে থাকার উপযোগী তারা টিকে থাকে, সন্তান জন্ম দেয়, বাকিরা ঝরে পড়ে। এভাবেই প্রানীরা জটিল হতে থাকে। ঠিক মুক্তবাজার অর্থনীতির বাজার ব্যবস্থার মতো। বলে রাখা প্রয়োজন প্রাকৃতিক নির্বাচনের কারণে বানররা একদিন সকালে উঠে দেখবেনা যে তাদের মধ্যে দুইজন হঠাৎ করে মানুষ হয়ে গিয়েছে। পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য প্রানীজগতে পরিবর্তন হয়, এই পরিবর্তন খুব ধীর, নির্ভর করে সম্পূর্ণ পরিবেশের চাহিদার উপর (বাজার ব্যবস্থায় ভোক্তার চাহিদা)।

এই আলোচনার পর পাঠকের উদ্দেশ্যে দু’টো প্রশ্ন রেখে যাবো আমি। বাজার ব্যবস্থার এমন জটিলতা, বিভিন্ন জিনিসের সাথে পারষ্পরিক সম্পর্ক, এই বিশাল ব্যবস্থা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠার পেছনে যে বাস্তব কারণ, যুক্তি ও প্রমান রয়েছে সেগুলো সব অস্বীকার করে কেউ যদি এটিকে এক মহাপরাক্রমশালী, ক্ষমতার মোহে অন্ধ, অর্থনৈতিক আইন প্রয়োগকারী ব্যক্তির কাজ বলে অভিহিত করে তাহলে তাকে আমরা কী বলবো? বলবো, পাগল কিংবা নিদেনপক্ষে গর্দভ কন্সপাইরেসি থিওরিস্ট।

আচ্ছা তাহলে জীব বৈচিত্র, এর উদ্ভব, জটিল থেকে জটিলতর হবার পেছনে যে পূর্নাংগ যৌক্তিক ব্যাখ্যা রয়েছে সেটিকে অস্বীকার করে পুরো বিষয়টিকে একটি মহাপরাক্রমশালী, ক্ষমতার মোহে অন্ধ ঈশ্বরের কাজ বলে জাহির করার চেষ্টাকারীকে তাহলে আমাদের কী বলা উচিত?

তথ্য সূত্রঃ

১। Why Evolution is True? Jerry A. Coyne. পৃষ্ঠা নং ৮৬

২। একই বই, একই পৃষ্ঠা।

৩। সায়েন্টিফিক এমেরিকান, মার্চ ২০০১ সংখ্যা

৪। (Skybreak, A.2006, The Science of Evolution and The Myth of Creationism, Insight Press, Illinois, USA)

৫। http://www.mukto-mona.com/project/muktanwesa/1st_issue/mohaplaban_ananta.htm

৬। Why People Believe Weird Things, মাইকেল সারমার। পৃষ্ঠা নং ১৩০।

৭। একই বই, একই পৃষ্ঠা।

৮। রিচার্ড ডকিন্স “…there is another way and, once you have understood it, a far more plausible way, for complex “design” to arise out of primeval simplicity.” The Blind Watchmaker, W. W. Norton & Company, Inc. New York, 1987, (Preface).

৯। টমাস হাক্সলি। “How extremely stupid for me not to have thought of that!”
(Thomas Huxley’s first reflection after mastering, in 1859, the central idea of Darwin’s Origin of Species))!”

১০। Irreligion, John Allen Paulos. পৃষ্ঠা নং ২০

[314 বার পঠিত]