রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের ব্যাপ্তীকাল ছিল ১৮৬১-১৯৪১ পর্যন্ত। বাংলা সাহিত্যে কবিতা, উপন্যাস, নাটক, গান, ও প্রবন্ধে তাঁর মেধা ও গভীর জীবন দর্শনের যে পূর্ণতা ঘটেছিল তা তাঁর ছোট গল্পে এসে অনেকখানি উপচে পড়েছে। প্রায় ১১৯ টির মত ছোট গল্প লিখেছেন তিনি, যার মধ্যে ‘পোস্টমাস্টার’ পাঠকদের মনে আলাদাভাবে জায়গা করে নিয়েছে।

অন্যদিকে গভীর জীবন বোধ সম্পন্ন আমেরিকান আরেক গল্পকার মারজোরি কিনান রোলিং Marjorie Kinnan Rawlings, ১৮৯৬-১৯৫৩) সাহিত্যের সব শাখায় পদচারণা না করলেও গল্প ও উপন্যাস (The Yearling) লিখে বিশ্ব সাহিত্যে বেশ সম্মানের সাথে ঠাঁই পেয়েছেন। তাঁর রচিত গল্পের সংখ্যা ২৮ টি; যা রবীন্দ্রনাথের তুলনায় বেশ কম। বহুদিক থেকে অমিল থাকা সত্বেও মারজোরি কিনান রোলিং এর ছোটগল্প ‘এ মাদার ইন ম্যানভিল’ (A Mother in Mannville) এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পোস্টমাস্টার’ উভয়ের মধ্যে এ-নে দিয়েছে চিন্তা, চেতনা ও অনুভবের এক অসম্ভব ঐক্য।

রোলিং ইংরেজি সাহিত্যে ছোটগল্পের এক দক্ষ কারিগর হিসেবে সুপরিচিত। এবং তাঁর গল্পের বিশেষত্ব হচ্ছে : মানুষের সাথে পরিবেশ ও পরিস্থিতির মধ্যেকার দ্বন্দের শৈল্পিক উপস্থিতি। তিনি প্রকৃতির মাঝে থাকতে বেশি পছন্দ করতেন; তাইতো প্রায়ই দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করে ফ্লোরিডা থেকে ছুটে যেতেন দক্ষিন ক্যারোলিনা দ্বীপপুঞ্জের নিশ্চুপ-ছন্দময় প্রকৃতির মাঝে। অনেকে মনে করেন, লেখিকা এখানে জেরি নামক একটি অনাথ শিশুর সাক্ষাৎ পান এবং যার জন্য তিনি খুব কষ্ট অনুভব করেন। ‘এ মাদার ইন ম্যানভিল’ গল্পে একজন শিল্পীর দায়িত্ববোধ থেকেই লেখিকা জেরির আবেগ-অনুভূতির স্বার্থক বহি:প্রকাশ ঘটান।

জমিদারি তদারকি উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙলার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে বেড়ান, পরিচিত হন বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি ও মানুষের সাথে; যার নির্যাস পাওয়া যায় তাঁর প্রতিটি গল্পে। ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পটিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিছক মনগড়া কাহিনী নয়- বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি পেয়েছেন এই গল্পের চরিত্রগুলোর পরিচয়। যে অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি নিজে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে লিখেছিলেন, “পোস্ট মাস্টারটি আমার বজরায় এসে বসে থাকত। ফটিককে দেখেছি পদ্মার ঘাটে। ছিদামদের দেখেছি আমাদের কাছারিতে। ওই যারা কাছে এসেছে তাদের কতকটা দেখেছি, কতকটা বানিয়ে নিয়েছি।” অন্যত্রে লিখেছিলেন, ‘আমার গল্পে বাস্তবের অভাব কখন ঘটে নি। যা কিছু লিখেছি, নিজে দেখেছি, মর্মে অনুভব করেছি, সে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।’ একই মনোভাব তাঁর আরও একটি উক্তিতে ফুটে ওঠে, ‘আমি একটা কথা বুঝতে পারি নে, আমার গল্পগুলোকে কেন গীতিধর্মী বলা হয়। এগুলো নেহাত বাস্তব জিনিস। যা দেখেছি, তাই বলেছি। ভেবে বা কল্পনা করে আর কিছু বলা যেত, কিন্তু তা তো করি নে আমি।’ বাস-বতার স্পর্শ থাকে বলেই ‘পোস্টমাস্টার’ ও ‘এ মাদার ইন ম্যানভিল’ গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র রতন ও জেরির আবেগ-অনুভূতি পাঠকদের বিশেষভাবে নাড়া দেয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পটি লেখেন ১৮৯১ সালে আর ‘এ মাদার ইন ম্যানভিল’ গল্পটি লেখা হয় ১৯৩৬ সালে।
দুটি গল্পে পরিবেশ, কাল ও পাত্র ভিন্ন হলেও পরিসীমা, প্রকাশভঙ্গি, ঘটনার প্রবাহ, চরিত্রের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও বোঝাপড়া, জীবনদর্শন এবং সর্বোপরি পাঠকের বেদনা ও আত্মপোলব্ধিতে আশ্চর্যরকমের ছন্দ খুঁজে পাওয়া যায়। গল্পদুটি শুরু হয় দুটি চরিত্রের নতুন পরিবেশে আগমনের মধ্যে দিয়ে। ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পে পোস্টমাস্টার কলকাতার ছেলে, নিতান্তই কাজের প্রয়োজনে উলাপুর নামক ছোট্ট একটি গ্রামে এসে তাকে থাকতে হয়। এখানে তার সঙ্গী বলতে পিতৃ-মাতৃহীনা অনাথ বালিকা রতন ছাড়া আর বিশেষ কেউ হয়ে ওঠে না।

‘এ মাদার ইন ম্যানভিল’ গল্পে লেখিকা ক্যারোলিনা দ্বীপপুঞ্জে কয়েকটি লেখা শেষ করার উদ্দেশ্যে ছুটি কাটাতে যান; যেখানে জীবনের আনাগোনা খুবই কম, কান পাতলে শোনা যায় প্রকৃতির ফিসফাস। এখানে এসে লেখিকা জেরি নামক এক বালকের সাথে পরিচিত হন; জেরি হয়ে ওঠে লেখিকার খুব কাছের একজন।

দুটি গল্পে চারপাশের চিত্র ও চরিত্রকে স্বল্প পরিসরে স্পষ্ট ভাবে অংকন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকে নিয়ামক হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পে প্রকৃতির মাঝে ডুব দিয়ে অনুভব করতে হয় গল্পের প্রধান চরিত্র- পোস্টমাস্টার আর রতনের অনুভূতি। গল্পের কাহিনীর শুরু এবং সমাপ্তি ঘটে উলাপুর নামক ছোট্ট একটি গ্রামে। পোস্টমাস্টার শহরের ছেলে তাই নিতান্তই কাজের প্রয়োজনে এখানে থাকতে হয়। অন্ধকার আটচালার মধ্যে তার অফিস; দূরে একটি পানা পুকুর আছে যার চারিধার জঙ্গলে ঘেরা। পর্যাপ্ত আলো বাতাসের অভাব না ঘটলেও পোস্টমাস্টারের অবস্থা ডাঙায় তোলা মাছের মতন। গ্রামের মানুষজনের ভদ্রসমাজের আচার-রীতি জানা নেই, এছাড়াও নিকটে নীল কুঠি থাকায় অনুমান করা যেতে পারে, গ্রামে ইংরেজদের শাসন ও শোষণ দুটোই বিদ্যমান। তাইতো পোস্টমাস্টারের সাথে বাইরের জগতের কোন যোগসূত্র থাকে না। হাতে কাজ না থাকলে কবিতা লেখার চেষ্টা করেন, তাতে প্রকৃতির স্তব গান রচিত হয় ঠিকই- “কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস- গাছগুলো কাটিয়া পাকা রাস্তা বানাইয়া দেয়, এবং সারি সারি অট্টালিকা আকাশের মেঘকে দৃষ্টিপথ হইতে রুদ্ধ করিয়া রাখে, তাহা হইলে এই আধমরা ভদ্রসন্তানটি পুনশ্চ নবজীবন লাভ করিতে পারে।”
সন্ধ্যায় যখন গ্রামের গোয়ালঘর থেকে ধূপের ধোঁয়া রাজ্যভ্রমণে বের হয়, ঝোপে ঝাড়ে ঝিল্লি ডাকে, নেশাখোর বাউলের দল উচ্চস্বরে গেয়ে ওঠে; আবার যখন- বর্ষায় ‘মেঘমুক্ত দ্বিপ্রহরে ঈষৎ-তপ্ত সুকোমল বাতাস’ বইতে থাকে এবং ভেজা প্রকৃতির গন্ধে মাতাল হয়ে একটি পাখি তার ‘একটানা সুরের নালিশ …করুন সুরে বার বার আবৃতি’ করে তখন পোস্টমাস্টারের মন প্রিয়জনদের জন্য আনচান করে ওঠে। এ যেন প্রকৃতির সাথে ব্যথার আত্মার আত্মীয়তা !

আবার পোস্টমাস্টার যখন রতনকে বলে, ‘আর আসব না’। তখন তাদের গভীর নিরবতা ভেঙ্গে, ঘরের জীর্ণ চাল ভেদ করে একটি মাটির সরার উপর টপটপ করে বৃষ্টির জল পড়তে থাকে। প্রকৃতি আর মানব হৃদয় যেন একই সুরে গাঁথা! তাইতো পোস্টমাস্টার যখন রতনকে রেখে নৌকায় ওঠে- বর্ষায় প্লাবিত জলরাশি পোস্টমাস্টারের চোখের অশ্রুর মতো ছলছল করতে থাকে, পোস্টমাস্টারকে জানিয়ে দেয় রতনকে সঙ্গে আনার কথা, একইসাথে পালের হাওয়া ও অনুকূল স্রোতধারা নদীকূলের শ্মশান ঘাট দেখিয়ে পোস্টমাস্টারের বেদনাহত হৃদয়কে জানান দেয়- বিচ্ছেদই জীবনের চিরন্তন সত্য।

দুটি গল্পেই, বিদায়ী যাত্রায় প্রকৃতি পোস্টমাস্টার ও লেখিকার জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে। পোস্টমাস্টারের নৌকা অনুকূল স্রোত ও পালের হাওয়ায় দ্রুততার সাথে গন্তব্যের দিকে ধাবিত হয়। এবং লেখিকা গাড়িতে চড়ে অনুধাবন করেন-

“The sun was in the west and I should do well to be out of the mountains by nightfall”

‘এ মাদার ইন ম্যানভিল’ গল্পে প্রকৃতিকে তুলে ধরা হয়েছে উপমা (Simile) ও রূপকের (Mataphor) মাধ্যমে। গল্পের শুরুতে ক্যারোলিনা দ্বীপপুঞ্জের চিত্র আঁকা হয়েছে এ ভাবে-

fog hides the Mountain peaks, the snow swirls down the valleys, and wind blows so bitterly that the orphanage boys…reach the door with fingers stiff in an agony of mumbness..”

লেখিকা জেরির শৈল্পিকভাবে কাঠ কাটার শব্দকে তুলে ধরেছেন এভাবে-

“The sounds no more of an interruption than a consistence rain.”

এবং জেরি যখন কাঠ চেরাই শেষ করে লেখিকার কেবিনের দিকে উঠে আসে তখন প্রকৃতির অবস্থা তুলে আনা হয় এভাবে-

“The sun was dropping behind the farthest mountain and valleys were purple with something deeper than the asters.”

লেখিকা জেরির স্বরূপ বর্ণনাতেও রূপকের ও উপমার আশ্রয় নেন-“ His hair was the colour of the corn shocks, and his eyes, very direct, were like the mountain sky when rain is pending-gray…” এবং light came over him, as though the setting sun had touched him with the same suffused glory with which it touched the mountains.” Ges “A curtain lifted, so that I saw deep into the clean well of his eyes and gratitude was there, and affection, soft over the firm granite of his character.”এছাড়াও লেখিকার চলে যাবার কথা শুনে জেরির নিরবে চলে যাবার দৃশ্যটি বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে-“… a new moon hung over the mountain, and I watched him go in silence up the hill.” এমনিভাবে লেখিকা রোলিং “এ মাদার ইন ম্যানভিল গল্পে” দক্ষতার সাথে শৈল্পিক উপায়ে প্রকৃতিকে ফুটিয়ে তুলেছেন।

অনাথ শিশু রতন ও জেরি- এই দুটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে গল্পদুটি আবর্তিত হয়। রতন নিজের সম্পর্কে খুব বেশি বলে না, চাইলেও বাবার সন্ধ্যাবেলার ঘরে ফেরার দৃশ্য ও ছোটভাইয়ের সঙ্গে মিছামিছি মাছ ধরার খেলা ছাড়া আর বিশেষ কিছু স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে না তার; তাইতো পোস্টমাস্টারের পারিবারিক গল্প শোনার জন্য অধীর আগ্রহে বসে থাকে এবং আলাপচারিতায় চিরপরিচিতের ন্যায় পোস্টমাস্টারের পরিবারের সকলকে ‘মা দিদি দাদা’ বলেই সম্বোধন করে। রতন আর পোস্টমাস্টারের সম্পর্ক তখন আর কাজের মেয়ে ও প্রভুর সম্পর্ক থাকে না; বয়সের পার্থক্য ও শ্রেণীবৈষম্য ঘুঁচে গড়ে ওঠে মানবিক সম্পর্ক। লেখিকা ও জেরির মধ্যেও অভিন্ন সমীকরণ লক্ষ্য করা যায়। তবে ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু মাত্র গল্প কথকের ভূমিকায় অবতীর্ণ (3rd person narrative) হওয়াই রতনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তেমন করে ফুটে ওঠে না যেমন করে “এ মাদার ইন ম্যানভিল” গল্পে জেরির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। “এ মাদার ইন ম্যানভিল” গল্পে মারজোরি কিনান নিজেই অন্যতম প্রধান চরিত্র (1st person narrative) তাই জেরিকে খুব কাছ থেকে অনুভব করতে পারেন- গল্পটি অনেকাংশে হয়ে ওঠে চরিত্র নির্ভর।

জেরির তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় মেলে যখন জেরি লেখিকার confusion দূর করতে বলে-“ Size don’t matter chopping wood.” এবং জেরির সততা ও স্বাধীনচেতার পরিচয় পাওয়া যায় যখন হাতল ভাঙ্গা কুড়াল দেখিয়ে লেখিকাকে বলে- I’ll pay for it, I broke it. I brought the axe down careless.” তখন লেখিকার ব্যবহৃত ‘ Integrity’ শব্দটি জেরির ক্ষেত্রে যথার্থই মনে হয়। এছাড়াও উপহার পেলে জেরি একবার উপহার, একবার লেখিকার দিকে তাকায়-ধন্যবাদ শব্দটির উপস্স্থিতি যেন তার অভিধানে নেই; লেখিকা তার চোখের দিকে তাকিয়ে অনুধাবন করেন কৃতজ্ঞতা ও মুগ্ধতার এক মিশ্র অনুভূতি।

শিশুদের সাথে পরিবারের সম্পর্ক শক্তিশালী ও অবিচ্ছেদ্য। মা-বাবা ও ভাই-বোনের অকৃত্রিম ভালোবাসা তাদের শিরা উপশিরায় বয়ে আনে অপার আনন্দ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এবং রোলিং তাঁদের গল্পের উপজীব্য হিসেবে তুলে নিয়েছেন অনাথ শিশু -রতন আর জেরিকে। গল্পে দুজনের পরিচয় দেওয়া হয়েছে এভাবে-

‘মেয়েটির নাম রতন বয়স বারো-তেরো।’(পোস্টমাস্টার )

এবং

‘his name was Jerry; he was about twelve years old and he had been at the orphanage since he was four.’ (এ মাদার ইন ম্যানভিল )।

পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ও ভালোবাসার কাঙাল হওয়ার দরুন রতন ও জেরি খুব সহজে তাদের মনিব পোস্টমাস্টার ও লেখিকাকে আপন করে নিয়েছে।

রতন তার দাদাবাবু অর্থ্যাৎ পোস্টমাস্টারের পরিবারের গল্প শুনে নিজেকে সেই পরিবারের একজন হিসেবে ভাবতে থাকে। পোস্টমাস্টারের সেবায় সে তার বালিকা হৃদয় উজাড় করে দেয়। রান্না করা, গোসলের পানি আনা, তামাক সাজার কাজগুলো এত মনোযোগ ও ভালোলাগার সাথে করে যে কাজগুলো করে এতটুকু ক্লান্তি বোধ করে না। পোস্টমাস্টার রতনকে পড়ালে রতন বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়তে থাকে; রতন পড়াশুনার মর্ম উপলব্ধি না করলেও দাদার আগ্রহে যাতে কমতি না ঘটে সে জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে। পোস্টমাস্টার অসুস্থ হলে রতন তার সেবায় নিজেকে উজাড় করে দেয়। বালিকা রতন আর তখন বালিকা থাকে না। ‘সেই মুহূর্তে সে জননীর পদ অধিকার করিয়া বসিল’। রতন ডাক্তার ডেকে আনে, যথাসময়ে ঔষধ খাওয়ায়, সারারাত শিয়রে জেগে থাকে আর থেকে থেকে জানতে চাই, ‘হাঁগো দাদাবাবু, একটুখানি ভালো বোধ হচ্ছে কি?’ রতন দাদাবাবুর সান্নিধ্য পাবার জন্য ঘরের বাইরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। সুযোগ পেলেই একজন যথার্থ শ্রোতার বেশে দাদাবাবুর হাটুর কাছে বসে পড়ে। এই সখ্যতার সূত্র ধরে গল্পের শেষের দিকে পোস্টমাস্টার চলে যেতে চাইলে রতন একবুক আশা নিয়ে পোস্টমাস্টারের সঙ্গী হবার আশা ব্যক্ত করে।

একইভাবে, জেরি এবং লেখিকার সম্পর্কও তথাকথিত মনিব ও কাজের ছেলের সম্পর্ক ভেঙ্গে নতুন এক সম্পর্কের জন্ম দেয়। কাঠ চেরাই করার জন্য জেরিকে ঠিক করা হলেও সে সার্বিকভাবে লেখিকা ও তাঁর কুকুরটির খোঁজখবর রাখে। লেখিকা যাতে বৃষ্টির মৌসুমে শুকনো কাঠ পায় সে জন্যে কিছু কাঠ র্গতে সরিয়ে রাখে, এছাড়াও লেখিকার হাঁটার পথে একটি পাথর পড়ে থাকলে জেরি গর্ত করে সেঁটে দেয়, যে কাজগুলোকে লেখিকা বলেছেন ‘..unnecessary things…done only by the great of heart.’ সময়ের পরিক্রমায় জেরি ও লেখিকা পরস্পরের খুব কাছের মানুষ হয়ে ওঠে। জেরিও রতনের মতন লেখিকার সান্নিধ্য পাবার জন্য কেবিনের বাইরে ঘোরাফেরা করে এবং সুযোগ পেলেই লেখিকার পাশে বসে পড়ে। গল্পে বেশ কয়েকবার এই দৃশ্যের বর্নণা দেওয়া হয়েছে –

“He made simple excuses to come and sit with.”
“He sat by fire with me.”
“He came everyday…and stayed to talk.”
“He would lie on the floor…and wait quietly for me.”

একরাতে জেরি খুব আবেগপ্রবন হয়ে লেখিকাকে বলে – ‘you look a little bit like my mother; যে ম্যানভিলে বাস করে এবং প্রতি বড়দিন ও জন্মদিনে তাকে উপহার পাঠায়। জেরি গর্বের সাথে বলে, গত বড়দিনের আগেরবার তার মা তাকে একজোড়া জুতা উপহার দিয়েছে এবং আরো জানায়, লেখিকার দেওয়া এক ডলার টাকা দিয়ে সে তার মাকে একজোড়া হাত মোজা কিনে দেবে। গল্পের শেষে লেখিকার প্রতি জেরির ভালোবাসা আরো তীব্রভাবে ধরা দেয় যখন মিস ক্লার্ক বলেন, ‘He has no mother. He has no skates.’ জেরি লেখিকাকে তার ম্যানভিলে বসবাসরত মায়ের গল্প শোনায়, যে প্রকৃতপক্ষে তার স্বপ্নে বাস করে, কারণ সে লেখিকার মধ্যে তার মায়ের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পায়। জেরি লেখিকার ভেতরের মাতৃত্বকে ছুঁতে চায় সর্বাঙ্গে। জেরি লেখিকা ও তাঁর পোষা প্রাণীটিকে জীবনের একটি পরিপূর্ণ অধ্যায়রূপে ভাবতে শুরু করে এবং লেখিকাকে তা অবগত করাতে সাধ্যমত চেষ্টা করে।

একইভাবে, পোস্টমাস্টার গল্পে রতন তার নারীসুলভ আচরন দিয়ে পোস্টমাস্টারের হৃদয়ে পাকাপক্ব আসন গেড়ে নিতে চায়।

এখানে রতন ও জেরির প্রতি পোস্টমাস্টার ও লেখিকার ভালোবাসা দায়িত্ববোধ ও করুনা থেকে নিঃসৃত কিন্তু তাঁদের প্রতি রতন আর জেরির যে ভালোবাসা তাতে কোন খাদ নেই; অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে এ ভালোবাসার স্রোতধারা প্রবাহিত হয় – সমাজের চিরন্তন কোন নিয়মের ছাঁচে পিষ্ট হয়ে নয়।


‘পোস্টমাস্টার’ ও ‘এ মাদার ইন ম্যানভিল’ গল্পের সমাপ্তির দিকে এসে পাঠকদের হৃদয়ে একই ব্যথার সুর অনুরণিত হয়। পোস্টমাস্টার যখন রতনকে বলে, ‘রতন, কালই আমি যাচ্ছি।’ এবং লেখিকা জেরিকে, ‘I am leaving tomorrow’ রতন আর জেরি যেন বাক হারিয়ে প্রাচীন বৃক্ষের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকে নির্লিপ্তভাবে। নিজেদের ভেতর আর থাকেনা তারা, নিমিষে পৃথিবীর সবখানে কি যেন হাতড়ে আসে! রতন পোস্টমাস্টারের সাথে যাবার ইচ্ছা পোষণ করে বলে, “দাদাবাবু, আমাকে তোমাদের বাড়ি নিয়ে যাবে?” কিন্তু জেরি আর কোন কথাই বলেনা। সে হয়ত বুঝতে পেরেছিল পোস্টমাস্টারের মত লেখিকাও বলবে, “সে কী করে হবে।”

পোস্টমাস্টার চলে যাবার সময় বলে, “রতন, আমার জায়গায় যে লোকটি আসবে তাঁকে বলে দিয়ে যাব, তিনি তোকে আমারই মতন যত্ন করবেন; আমি যাচ্ছি বলে তোকে কিছু ভাবতে হবে না।” এবং “রতন, তোকে আমি কখনো কিছু দিতে পারি নি। আজ যাবার সময় তোকে কিছু দিয়ে গেলুম, এতে তোর দিন কয়েক চলবে।” তাঁর কথাগুলো রতনের গায়ে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতন বিঁধে। বালিকা রতন আর আবেগকে দমিয়ে রাখতে পারে না; পোস্টমাস্টারের পা জড়িয়ে ধরে বলে,

“দাদাবাবু, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, আমাকে কিছু দিতে হবে না; তোমার দুটি পায়ে পড়ি, আমার জন্য কাউকে কিছু ভাবতে হবে না।”

একইভাবে, লেখিকার অনুভূতি –

‘You have been my good friend, Jerry. I shall often miss you. Pat will miss you too.’ এবং “but here’s some money I’d like to leave with you to buy things for him…”

জেরির কাছে আরো অসহনীয় হয়ে ওঠে। সে দুপুরের খাবার না খেয়ে সবার আড়াল হয়ে যায়।

বিদায়ী মুহূর্তে পোস্টমাস্টারের সাথে রতনের এবং লেখিকার সাথে জেরির আর দেখা হয় না। নৌকা ছাড়লে পোস্টমাস্টার রতনের জন্য গভীর ব্যথা অনুভব করে; ইচ্ছা করে – “ফিরিয়া যাই, জগতের ক্রোড়বিচ্যুত সেই অনাথিনীকে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসি।” কিন্তু ততক্ষণে সময় পেরিয়ে গেছে অনেক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন নদীকূলের শ্মশান ঘাট দেখিয়ে পোস্টমাস্টারকে আত্ম সান্ত্বনার গভীর দর্শন উপলব্ধি করান – “জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া ফল কী। পৃথিবীতে কে কাহার।” সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে। একইভাবে, ‘এ মাদার ইন ম্যানভিল’ গল্পে লেখিকা জেরির শেষ দর্শন না পেয়ে আত্ম-সান্ত্বনার দর্শন আওড়ায়- “I was almost relieved for I knew I should never see him again, and it would be easier not to say good-bye to him”. কিন্তু রতন আর জেরি আত্ম সান্ত্বনার কোন উপলক্ষ দাঁড় করাতে পারে না। আত্মসমর্পন করে মানব জীবনের সহজ ও সাধারণ মূর্খতার কাছে, তা হল আশা করা। রতন অফিস কক্ষের চতুর্দিকে ঘুরতে থাকে তার “দাদাবাবু যদি ফিরিয়া আসে” এই আশাতে।
জেরি কতদিন লেখিকার Cabin এর চারপাশে আশা নিয়ে ছুটে গেছে কে জানে!


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পে কলকাতার উলাপুর গ্রামে ভরা বর্ষার আবহে যে বার বর্ষীয়াণ অনাথা বালিকার স্বপ্ন ভঙ্গের ইতিহাস রচনা করেছেন তার-ই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে মারজোরি কিনান রোলিং এর ‘এ মাদার ইন ম্যানভিল’ গল্পে ক্যারোলিনা দ্বীপপুঞ্জে অসহনীয় শীতের মাঝে বসবাসরত আরেক বার বর্ষীয়ান অনাথ বালক জেরির মধ্য দিয়ে। দুটি গল্প ভিন্ন দুটি আবহ ও ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র নিয়ে গড়ে উঠলেও বেশ কয়েকটি দিক থেকে অভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। রবীন্দ্রনাথ ও রোলিং তাঁদের গল্পের উপজীব্য হিসেবে দুটি বার বছর বয়সের অনাথ শিশুকে বেছে নিয়েছেন। এক্ষেত্রে, রবীন্দ্রনাথ য়ুংয়ের (Jung) ‘ইলেক্টা কমপ্লেক্স’(Electra Complex) ও রোলিং ফ্রয়েডের (Freud) ‘ইডিপাস কমপ্লেক্স’ (Oedipus Complex) কে চরিত্র চয়নের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিয়েছেন। ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পের প্রধান চরিত্র পুরুষ হওয়ায় রবীন্দ্রনাথ অন্য একটি প্রধান চরিত্র হিসাবে রতন নামের একটি বালিকাকে দাঁড় করিয়েছেন। একইভাবে, রোলিং তাঁর ‘এ মাদার ইন ম্যানভিল’ গল্পে দুটি বিপরীত লিঙ্গের সহাবস্থান দেখান ঃ লেখিকা ও জেরি। ছেলেরা মাকে বেশি ভালোবাসে, মেয়েরা বাবাকে – প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম এটাই। তাইতো জেরি খুব সহজেই লেখিকাকে মায়ের সন্তানে ভাবতে পারে, রতন পোস্টমাস্টারকে দাদা ডেকে আপন করে নেয় নিমিষে। ভালোবাসার দুর্বোধ্য এই জালে জড়িয়ে পড়ে লেখিকা এবং পোস্টমাস্টারও।

প্রকাশ : ভোরের কাগজ, শাশ্বতিকী, প্রাঙ্গণ।

[120 বার পঠিত]