গজব ও প্রতিকার

গজব ও প্রতিকার
-মোকছেদ আলী*

….. আমি তো অধার্মিক, আমার উপর আল্লাহ নাখোশ হতেই পারেন। কিন্তু ……. কোন্ কারণে গোস্বা হয়ে রহমত তুলে নিলেন?

রোজার অর্ধেক চলে গেছে। রোজা না রাখলেও, তারাবী না পড়লেও আগামী ঈদের আনন্দ আমাদের করতেই হবে। ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে হলে চাই অর্থ। ছেলেমেয়ের নতুন জামা। সেই সঙ্গে গিন্নির নতুন একটা শাড়ী। নইলে ঈদের আনন্দটাই একেবারে মাটি হয়ে যাবে। আবার মেয়ে জামাইও আনতে হবে। তাদের পিছনেও যথেষ্ট অর্থ ব্যয় আছে। মেয়েকে জামা কাপড়, জামাইকে কিছু না দিলেও তো একটা লুঙ্গি; তাও ১৫০ কমে পাওয়া যায় না। আমার জামাইকে তো ছেলের মত ৬০/৭০ টাকার লুঙ্গি দেয়া যায় না। ছেলে নিবে ইচ্ছামত, যখন যা খুশি। কিন্তু জামাইতো আর পারে না। তাই তার দেনাটা শোধ করতে হলে দেখে শুনেই দিতে হয়। এরপর আছে ঈদের খাদ্য খানা। নেহাত গরীব হলেও তো একটু সেমাই, একটু খিচুরী আর সঙ্গে কিছু মাংশ হবে। ঈদের আনন্দ কি সকলেই উপভোগ করতে পারে?
তাই তো কবি নজরুল ইসলাম গভীর বেদনাকে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে জিজ্ঞাসা করেছে-

‘জীবনে যাদের হর রোজ রোজা, ক্ষুধায় আসে না নিদ।
দরিদ্র সেই চাষীদের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?’

এই জিজ্ঞাসার উত্তর কে দেবে?
আমাদের দেশের অধিকাংশ চাষীর উপর আসে চারদিক থেকেই জুলুম। খরার পর খরায় মাঠের ফসল পুড়ে শেষ হয়ে যায়। নয়ত অতি বৃষ্টির কবলে উঠতি ফসল ডুবে যায়। গবাদি পশু ঘাসের অভাবে মরে যায়; না হয় দূর্বল হয়ে কর্মক্ষমতা আর থাকে না। আবার কোন কোন বৎসর ভয়াবহ বন্যায় সব শেষ হয়ে যায়। এ তো গেল প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কোন কোন বৎসর মাঠের দিকে তাকিয়ে দেখা গেল ফসল ভাল হবে, কিন্তু পোকার আক্রমণে সেই ফসল আর গোলায় উঠলো না।

আমি তো কৃষক। আমার কথায় বলি- ৪ বিঘা ধান। সব ফুলে এমন সুন্দর শীষ বের হয়েছে, দেখলেই চোখ জুড়ায়। কোন রোগ বালাই নাই। কত আশা করে আছি ৪ বিঘায় কম করে হলেও ১০০ মন ধান তো পাবই। দেনা দায়িক শোধ করেও অনেক প্রয়োজনীয় কাজে খরচ করা যাবে। কিন্তু হায়! শীষগুলির ভেতর দানা নেই। প্রতিটি ধান চিটা হয়ে গেল। ৪ বিঘার ধানই এরূপ। কৃষি অফিসে গিয়ে অফিসারদের ব্যাপারটা জানালাম। ২ জন অফিসার আমার সঙ্গেই মাঠে এলেন। দেখে শুনে বললেন- এক ধরনের গান্ধি পোকা দুধ চুষে খেয়েছে। চালটা তো প্রথমে দুধের আকারে থাকে। তারপর আলো হাওয়ায় শক্ত হয়ে পূর্ণাঙ্গ চালে পরিণত হয়। কিন্তু দুধ চুষে খাওয়ায় আর চাল হতে সুযোগ পায়নি। প্রথমে যদি লক্ষ্য কোরতেন যে গান্ধি পোকা লেগেছে। ডাইমেক্রন তরল বিষ স্প্রে করে দিলে গান্ধি পোকা সব মরে যেত। এত বিরাট ক্ষতি হতো না। ক্ষতি যা হবার হয়েই গেছে। এর এখন আর কোন প্রতিকার নাই।

অন্য একজন চাষী বলল- “এটা আল্লাহর গজব। আপনারা যাকে বলেন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়।”

আবার দুঃখের কথা কি বলব। সেই ধানের গাছগুলি কেটে শুকায়ে বিচালী খড় করলাম। আমরা ভাতে মরি, দুঃখ নেই। কিন্তু গরু বাছুরগুলি তো না খেয়ে থাকবে না। কি দুর্ভোগ! গরু বাছুর ঐ খড় মুখেও করে না। শেষে কুচি কুচি করে কেটে খৈল ভূষি দিয়ে মাখিয়ে দিলাম। নাহ্ মুখটা চারীর কাছে নিয়ে শুকে সরিয়ে নেয়। কয়েকজন মুরুব্বী বললেন- ঐ খড় হয়ত ওদের নাকে দুর্গন্ধযুক্ত হয়েছে। অথবা কোন বিষাক্ত বস্তু হয়ে গেছে। যার জন্য গরু বাছুরকে খৈল ভুষি দিয়ে মাখিয়ে দেয়ার পরও খাচ্ছে না। একেই বলে প্রাকৃতিক জুলুম।
এখন কথা হল- চাষীদের উপর এই এই সব বালা মুসিবৎ বা প্রাকৃতিক জুলুম কেন আসে? এর গুরুতত্ত্ব কি? কারণ খুঁজে কি কেউ এর মূল কারণ উদঘাটন করতে পেরেছে?
ইসলাম সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে, এমন কথা আজকাল অহরহ শোনা যাচ্ছে। শ্লোগানও শোনা যায়- সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে আল কোরান। তাহলে কোরান হাদিস খুঁজে দেখতে হয়। কেন শান্ত প্রকৃতি ভয়াল মূর্তিধারণ করে কেড়ে নেয় অগণিত জীব ও সম্পদ। ইসলামী পণ্ডিতগণ বলেন- এসব প্রশ্নের উত্তর নাকি বস্তুবাদী বুদ্ধিচর্চায় খুঁজে পাওয়া বাতুলতামাত্র। সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তির যেখানে ইতি হয়, সেখান থেকেই শুরু হয় নবুওতী জ্ঞানের সীমান্ত। বিশ্ব প্রকৃতির মধ্যে যে-সব অজানা রহস্য লুকিয়ে আছে, নবী রসুলগণ তাই জানতে পারতেন ওহীর মাধ্যমে। সেই জ্ঞানের আলোকেই আল্লাহর নবী (সা) উম্মতকে বলে গেছেন প্রকৃতির অজানা রহস্যের কথা। প্রকৃতির মধ্যে এই সব অজানা রহস্য লুকিয়ে থেকে হঠাৎ রুদ্ররোষে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেন তার কারণও নাকি নবীজী স্পষ্ট করেই বলে গেছেন। বলে গেছেন পানি বাতাস সাগর নদী প্রভৃতি সৃষ্টি করা হয়েছে সৃষ্ট জীবের কল্যাণের জন্য।

কিন্তু সেইগুলি কেন কিসের ইঙ্গিতে বা কার আদেশে প্রলয় হুংকারে ঝাপিয়ে পড়ে সৃষ্ট জীবকূলের উপর। কেন সব লন্ডভন্ড চুর্ণ বিচূর্ণ করে দেয় সৃষ্টিকূলকে?
মসজিদের ইমাম সাহেব বললেন: সাহাবী হযরত আবু হোরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রসুলে মকবুল সা. এরশাদ করেছেন- যুদ্ধলব্ধ সামগ্রী যখন ব্যক্তি মালিকানায় চলে যায়, আমানত যখন গনিমতের মাল হিসাবে গণ্য করা হয়, জাকাত যখন জরিমানা বিবেচনা করা হয়, শিক্ষা যখন আল্লাহর দ্বীনকে জানার উদ্দেশ্য থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। তখনি আসে আল্লাহর গজব।
রোজার শেষে ঈদ আসতে বেশী দেরী নাই। রমজান চলে যাবে। রমজানের ভিতর যে, দুস্প্রাপ্য ফজিলত ছিল, তাতো আমরা সংগ্রহ করার চেষ্টাও করিনি। রোজার ফজিলত সম্পর্কে ইতিপূর্বে সারা রমজান ধরেই বিভিন্নভাবে রেডিও টিভিতে শোনানো হয়েছে, যার সারমর্ম অনেকটা এইরূপ:
এখন আমাদের দায়িত্ব হল, ওলামায়ে কেরামগণ যা শুনালো, আর আমরা যা শুনলাম। শোনা কথাগুলিকে কার্য্যে পরিণত করতে হবে। বাস্তবে রূপ দিতে হবে। এক কথায় পূর্ণভাবে আমল করতে হবে, তবেই তো যারা বক্তব্য রেখেছেন তাদের বক্তব্য সার্থক হবে। আর আমরা যারা শুনলাম, আমাদের শোনাও সার্থক হবে। শুধু রোজা সম্পর্কেই নয়, ধর্মীয় যে কোন বিষয়ে হোক, মনোযোগ দিয়ে শুনে তা আমলে আনতে হবে। আমাদের পরিবারেও সেই আমলের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আমার আপনার পরিবারের সকল সদস্যই যদি শরিয়তের বিধি বিধান পালন করি, পূর্ণভাবে আমল করি, তবেই আমার আপনার পরিবারকে সত্যিকারের মুসলিম পরিবার বলা যাবে। আর যদি সেই পরিবারের কোন সদস্যই, বিধিমত নামাজ কালাম আদায় না করি, তাহলে তাকে মুসলিম পরিবার বলা যাবে কিরূপে? সুতরাং আমাদের কর্তব্য হবে, আলেমদের কথা মত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা। আর ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হলে শিশুর প্রতি যত্ন নিতে হবে। প্রথম থেকেই শিশুকে ইসলামী আদব কায়দা শিক্ষা দিতে হবে। শিশুকে আদব কায়দা শিক্ষা দিতে হলে আমাদের নিজেদেরও ইসলামী আদব সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তা না হলে শিশুকে কিরূপে শিক্ষা দিবেন? ইসলামী আদবের মূল ভিত্তি হল, হযরত রাসুল্লাহ সা. এর আদর্শ অনুসরণ করা। লাকাদ কানা লাকুম ফি রাসুলুল্লাহি উসওয়াতুন হাসানা। আর তা করলেই গজবের আজাব থেকে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব হবে।

আমি ভাই মুখ্য সুখ্য মানুষ। এত গভীর তত্ব বুঝার ক্ষমতা আমার নেই। সারাদিন মাঠের কাম করি, মাথার ঘাম পায়ে ফেলি, সন্তানের মুখে আহার জোগাই। আমি সবকিছু দেখি সাধারণ চোখে। পাশের জমি হাজী সাহেবের। নামাজ পড়তে পড়তে কপাল থেকে নূর বের হবার স্থান সৃষ্টি হয়েছে। তার উপর এই গজব এলো কেন? আমি তো অধার্মিক, আমার উপর আল্লাহ নাখোশ হতেই পারেন। কিন্তু হাজী সাহেব তো আর আমার মত অধার্মিক নন, আমার মত রোজা, তারাবী ফাঁকি দেন নাই। আল্লাহর তো উচিত ছিল, তার জমির ফসল রক্ষা করা। আল্লাহ হাজী সাহেবের উপর কোন্ কারণে গোস্বা হয়ে রহমত তুলে নিলেন?

অনুলেখক- মাহফুজ
*মোকছেদ আলী (১৯২২-২০০৯)। স্বশিক্ষিত।

About the Author:

বাংলাদেশ নিবাসী মুক্তমনা সদস্য। নিজে মুক্তবুদ্ধির চর্চ্চা করা ও অন্যকে এ বিষয়ে জানানো।

মন্তব্যসমূহ

  1. আদিল মাহমুদ এপ্রিল 24, 2010 at 7:10 পূর্বাহ্ন - Reply

    ত্যাড়া ত্যাড়া কথা ছেড়ে আগে আমলের সাথে ঈমান আনেন তারপরে বুঝবেন 🙂 ।

    আপনের গজবের কেচ্ছা শুনে স্কুল জীবনের এক স্যারের কথা মনে পড়ল। উনি এম্নিতে ভাল মানুষ, কিন্তু সামান্য কারনেও খেপে গেলেও কেন যেন আমাদের উপর আল্লাহর গজব দিতেন। “আল্লাহর গজব লাগে তোদের উপর”। যথারীতি ওনার নামই হয়ে গেল গজব আলী স্যার বলে। উনি একবার আমাদেরই এক বন্ধুর উপর কি কারনে যেন প্রচন্ড রেগে অভিশাপ দিলেন, “আমি শিক্ষক বলে দিলাম, তুই কোনদিন মানুষ হতে পারবি না, তোর পড়াশুনা হবে না”। সেই বন্ধুও এখন ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার, কানাডায় চাকরি ও পার্ট টাইম মাষ্টার্স করছে।

    দোয়া, বদদোয়া, গজব এসবের কি কোন ব্যাখ্যা হতে পারে? কোন মানুষ জানেন দাবী করলে বুঝতে হবে হয় তিনি উন্মাদ শ্রেনীর আর নয়ত ধান্ধাল।

    আপনার সাহায্যে দেখেন এই খবরটি হয়ত কিছুটা আলোকপাত করতে পারে। ইরানের এক মুফতী সাহেব দাবী করেছেন যে অবাধ যৌনতা বেড়ে গেলে ভয়াবহ ভূমিকম্প জাতীয় প্রাকৃতিক দূর্যোগ বৃদ্বি পায়। গজবের কারন এবার নিশ্চয়ই পরিষ্কার হচ্ছে।

    • আফরোজা আলম এপ্রিল 25, 2010 at 11:02 পূর্বাহ্ন - Reply

      আপনার লেখায় অনেক কিছু জানার থাকে । খুব ই ভালো লাগল ।

  2. মাহফুজ এপ্রিল 23, 2010 at 9:24 পূর্বাহ্ন - Reply

    লেখাটি আগে একবার পোষ্ট করা হয়েছিল, কিন্তু মুক্তমনার নীতিমালার বহির্ভূত হওয়ার কারণে মুছে ফেলা হয়েছিল। লেখাটি পড়ে কেউ মনে করবেন না যে, রমজান মাস চলছে। লেখক মোকছেদ আলী ১৯৭৮ সালে লেখাটি লিখেছিলেন। – অনুলেখক।

মন্তব্য করুন