জেরি কোয়েন –এর ‘বিবর্তন কেন বাস্তব’ অবলম্বনে
(Coyne, J. Why Evolution is True, Viking, 2009)

প্রথম পর্বের পর

একশত পঞ্চাশ বছর আগে চার্লস ডারউইন লিখেছিলেন তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘অরিজিন অব স্পিশিজ’। সাধারণ পূর্বসুরি থেকে জীবজগতের উৎপত্তি আর প্রজাতি-গঠনের ধারণা সেই গ্রন্থের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর তত্ত্ব যে সঠিক তার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে এখন আধুনিক জেনেটিক্স বা বংশগতিবিদ্যা থেকে। সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে, ফসিলের সাহায্য না নিয়ে, শুধু জেনেটিক্সের মাধ্যমেই বিবর্তন তত্ত্ব এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাকে সুদৃঢ় বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপরে দাঁড় করানো সম্ভব।

বংশগতিবিদ্যা আসলেই আধুনিক। ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে (১৮৬৬) গ্রেগ মেন্ডেলের বংশানুক্রমিক বৈশিষ্ট্যের ওপরে গবেষণা দিয়ে এর শুরু। কিন্তু তারপর কেটে গেছে আরো প্রায় তিন দশক, মেন্ডেলের গবেষণার গুরুত্ব বুঝতেই। ১৯০০ সাল থেকে বিজ্ঞানীদের টনক নড়তে শুরু করে। তারপর একে একে রোগের সাথে জিনের সম্পর্ক, বংশানুক্রমের ক্রোমোজম থিওরি, এবং আরো অনেক তত্ত্ব-তথ্য আবিষ্কৃত হতে থাকে। ‘জেনেটিক্স’ শব্দটা প্রথম চালু করেন উইলিয়ম বেইটসন, ১৯০৫-এ (১)

আরো প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে, ১৯৫৩ সালে ওয়াটসন আর ক্রিকের গবেষণায় ডাবল হেলিক্স আকৃতির ডিএনএ কাঠামো আবিষ্কারের মাধ্যমে বিজ্ঞানের এই শাখার আরেক যুগান্তকারী অধ্যায়ের শুরু। আর মাত্র তেত্রিশ বছর আগে (১৯৭৭) ফ্রেড স্যাঙ্গার ডিএনএ ধারাক্রম প্রযুক্তি (DNA sequencing technology) আবিষ্কার করেন। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন সরাসরি বিভিন্ন প্রজাতির জিন-এর গঠন দেখা সম্ভব। ঈস্ট (yeast) নামক ছত্রাক থেকে শুরু করে মানব প্রজাতির জিনোম সংস্লেষণ করা হয়ে গেছে ইতোমধ্যে (২)

ঊনিশশো নব্বই-এ শুরু হয়ে মানব জিনোম প্রকল্পের কাজ শেষ হলো, এই তো সেদিন, ২০০৩ সালে। এই শতককে তাই এখন ‘জিনোমোত্তর যুগ’ (post-genomic era) নামে অভিহিত করা হচ্ছে (৩)

কথা হচ্ছে, বিবর্তনের সাথে এর সম্পর্ক কি? কি নয়? বিবর্তনের সব সাক্ষ্যপ্রমাণ রয়ে গেছে জেনেটিক কোডেই। লক্ষ-কোটি বছরের ফসিল ঘেটে যা জানা গেছে, তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি তথ্য আর সাক্ষ্য পাওয়া যাচ্ছে বিবর্তন তত্ত্বের পক্ষে ক্রোমোজোম-জিন-ডিএনএ থেকে (ছবি এক) (৪)


ছবি এক। ক্রোমোজোম-জিন-ডিএনএ

কিভাবে? ডিএনএ-হচ্ছে ব্যাপক তথ্যের আধার – এতে রয়েছে প্রোটিন-বিন্যাসের পুঙ্খানুপুঙ্খ সূত্র-নির্দেশ, যাকে বলা হয় জেনেটিক কোড। সব প্রাণীরই জেনেটিক কোড মূলতঃ সেই এক নিউক্লিক এসিড দিয়ে গড়া। তাই বলা যায়, ডিএনএ-র অস্তিত্বই তো বিবর্তনের একটা বিরাট সাক্ষ্য। এতেই প্রমাণ হয় যে সব প্রজাতির উদ্ভব ঘটেছে একটা সাধারণ পূর্বসুরি থেকে। দুটো প্রজাতির ডিএনএ তুলনা করে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক নির্ধারণ করা যায়, জানা যায় তাদের সাধারণ পূর্বসুরির কথা। অনেকটা পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণের কাজে যেমন আজকাল আকছার ডিএনএ ব্যাবহার করা হচ্ছে। পার্থক্য, বিবর্তন বিজ্ঞানীরা এক প্রজন্মের সাথে আরেক প্রজন্মের সম্পর্ক শুধু নয়, পাশাপাশি এক প্রজাতির সাথে আরেক প্রজাতির সম্পর্কও নির্ধারণের কাজে লাগাচ্ছেন ডিএনএ প্রযুক্তিকে।

এভাবেই তাঁরা জানতে পেরেছেন, আমাদের মানব প্রজাতির ডিএনএ গরিলার ডিএনএর খুব কাছাকাছি। শিম্পাঞ্জীর সাথে আমাদের ডিএনএ-র মিল রয়েছে শতকরা ৯৯.৪ ভাগ। মানব প্রজাতি ও অন্যান্য বানরজাতীয় প্রজাতির ক্রোমোজমের তুলনামূলক চিত্র দেখা যাবে এখানে। বিজ্ঞানীদেরতো বটেই, সাধারণ মানুষের চোখেও কিন্তু মিলগুলো ধরা পড়ে (ছবি দুই) (৫)

pic2_part2

ছবি দুই। বাঁদিক থেকে যথাক্রমে মানুষ, শিম্পঞ্জী, গরিলা আর ওরাংওটাং-এর পাঁচ আর ছয় নম্বর ক্রোমোজমের প্রতীকচিত্র।

এই ধারাক্রমগুলো পর্যবেক্ষন করেই বিজ্ঞানীরা এখন বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে বিবর্তনীয় সম্পর্ক নির্ধারণ করতে পারছেন। দুটো প্রজাতির ডিএনএ ধারাক্রম একই রকমের বা কাছাকাছি হলে প্রজাতি দুটোও কাছাকাছি হবে এটাইতো স্বাভাবিক। তাদের সাধারণ পুর্বসুরির অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যাবে অপেক্ষাকৃত কাছাকাছি অতীতে; এবং তাই পাওয়া যাচ্ছে।

পাখী আর সরীসৃপের কথাই ধরা যাক। তাদের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য এক রকমের (যেমন উভয়েই ডিম পাড়ে), আর তাদের ডিএনএ ধারাক্রমের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে বেশ মিল, তাহলে তাদের সাধারণ পূর্বসুরি কোন প্রজাতির অস্তিত্ব ফসিলে থাকাটা মোটেও বিচিত্র নয়। ঠিক তাই, তাদের সাধারণ পূর্বসুরি প্রজাতির অস্তিত্বের নিদর্শন ফসিলে পাওয়া গেছে (ছবি তিন) (৬)

pic3_part2ছবি তিন। পাখীর পূর্বসুরি

ফসিলের সাক্ষ্য আর ডিএনএ বিশ্লেষণ, এ দু’য়ের মধ্যে দেখা যাচ্ছে আশ্চর্য রকমের মিল। ভুল বললাম, আসলে আশ্চর্যের কিছু নেই, এরকমই হওয়ার কথা। সাধারণ পূর্বসুরি আর প্রজাতি-গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আগের পর্বে যা বলেছি, তার সাথেও ডিএনএ বিশ্লেষণের ফলাফল পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ। এদের মধ্যে কোন দ্বন্দতো নেইই, বরং দেখা যাচ্ছে একে অপরের সম্পুরক; সামঞ্জস্য প্রশ্নাতীত। ডারউইনের ধারণা অনুযায়ী গাছের শাখার মতোই প্রজাতিরা একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। আধুনিক বংশগতিবিদ্যাও সেই একই কথা বলছে। বিবর্তন যে একটা বাস্তব প্রক্রিয়া এ নিয়ে সন্দেহের আর কোন অবকাশ রইলো না (৭)

এবারে আসা যাক বিবর্তনের পঞ্চম বিষয়, প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রসঙ্গে। এখানেই ডারউইনের মুল কৃতিত্ব। প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রক্রিয়াই মুলতঃ বিবর্তনের জন্য দায়ী। প্রকৃতিবিজ্ঞানী আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস প্রায় একই সময়ে প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছিলেন। তবুও ডারউইনকে এই যুগান্তকারী তত্ত্বের জনক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এমন কি, ওয়ালেসও এ নিয়ে লেখা তাঁর বইয়ের নাম দিয়েছিলেন, ‘ডারউইনিজম’ (৮)

ডারউইন তাঁর ‘অরিজিন অব স্পিশিজ’-এ প্রাকৃতিক নির্বাচনের তত্ত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন। দিয়েছেন বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত, দেখিয়েছেন এর যৌক্তিকতা। বিশ বছর ধরে চিন্তাভাবনা আর গবেষণা করার পরে তিনি বইটা লেখার সিদ্ধান্ত নেন।

প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটা চট করে কারো মাথায় আসে না। এমন কি ডারউইনের ব্যাখ্যার পরেও অনেকেই একে সহজে মেনে নিতে পারেন নি। ঠিক যেমন সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বব্রহ্মান্ডের ধারণা এক সময়ে মানুষের মেনে নিতে কষ্ট হয়েছিল।

এই তত্ত্ব সাধারণ মানুষের শুধু নয়, বিজ্ঞানীদেরও চিন্তাচেতনায় বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটাতে পারে তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। তাই বলেছিলেন, “সূর্য স্থির এবং পৃথিবী তার চারপাশে ঘুরছে, এই কথাটা প্রথমে যখন শোনা যায়, মানুষ তার সাধারণ কান্ডজ্ঞান অনুযায়ী তা মানতে চাইলো না; কিন্তু যে কোন দার্শনিকই জানেন, সাধারণ্যে প্রচলিত আপ্তবাক্য ‘মানুষের কণ্ঠস্বরই ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর’ বিজ্ঞানে চলে না” (৯)

আসলেই, প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলে এত বিচিত্র সব প্রজাতির, আর বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে তার চেয়েও বিচিত্র সব বৈশিষ্ট্যের, উদ্ভব হয়েছে যে, দেখলে মনে হয়, কেউ ইচ্ছে করে তাদেরকে এভাবে বানিয়েছে। জিরাফের গলা, হাতীর শূঁড়, পাখির পাখা – এসবের উদ্ভব কেমন করে হলো? পাতার মতো দেখতে পোকা বা পাথরের সাথে মিশে থাকা পাথরের মতোই দেখতে প্রাণীর উৎপত্তি হলো কিভাবে? যাদুকরি সব ছদ্মবেশ নিতে (camouflage) আর অবিশ্বাস্য রকমের (প্রতারণামূলক) অনুকরণ (mimicry) করতে শিখলো কি করে এই সব পোকা-মাকড়গুলো (ছবি চার) (১০)? কারো ইচ্ছা বা পরিকল্পনা নাই এসবের পেছনে? মেনে নিতে কষ্ট হয় বৈ কি!


(ক)


(খ)


(গ)
ছবি চার। (ক) ধানের শীষের মতো দেখতে পোকা, (খ) মাটির সাথে মিশে যাওয়া ব্যাঙ, (গ) প্রজাপতির পাখায় নকল চোখ।

তবে একটু ভিন্ন ভাবে চিন্তা করলে প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রক্রিয়াটাকে আর অসম্ভব মনে হবে না। প্রকৃতিকে জীবজগতের জন্য বানানো হয় নি, সৃষ্টিবাদীদের কল্পনা অনু্যায়ী ‘সৃষ্টির সেরা’ মানুষের জন্যতো নয়ই। জীবজগতই প্রকৃতির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়েছে, ধীরে ধীরে।

ব্যাখ্যাটা কঠিন কিছু নয়। জনপুঞ্জের (population) যে সদস্যরা (individuals) অন্যদের তুলনায় প্রকৃতির সাথে বেশি খাপ খাইয়ে টিকে থাকতে পারে তারাই বেশি বেশি বংশধর রেখে যায়। তারা এটা পারে পরিবেশের সাথে মানানসই বিশেষ প্রকারণ (variation) ঘটে থাকলে। প্রাকৃতিক নির্বাচন বেছে নেয় সেই প্রকারণগুলোকে যেগুলো পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করে। এই খাপ খাওয়া ব্যাপারটার একটা পোষাকী নাম আছে, অভিযোজন (ইংরেজিতে adaptation)। আর তার ফলেই ঘটে বিবর্তন। দেখা যাচ্ছে প্রকারণ না ঘটলে বেশি খাপ খাইয়ে চলার মতো সুবিধা অর্জন সম্ভব হয় না। (আগের পর্বে বলা হয়েছে, প্রকারণ ঘটে মিউটেশনের ফলে।)

পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে পূর্ববর্তী প্রজন্মের যে বৈশিষ্ট্যগুলো টিকে থাকতে এবং বংশবিস্তার করতে বেশি কাজে লাগে সেগুলোকেই বেশি বেশি দেখা যায়। যে ‘ভালো’ জিন এই বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী সেগুলো আরো বেশি করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হতে থাকে। আর যে বৈশিষ্ট্য টিকে থাকতে সাহায্য করছে না, সেগুলোর জন্য দায়ী ‘অত ভালো নয়’ জিনগুলো আর পরবর্তী প্রজন্মে বিস্তার লাভ করতে পারছে না।

অপেক্ষাকৃত ভালো জিনের কারণে পাওয়া যাচ্ছে অভিযোজনের অতিরিক্ত সুবিধা, আর তা থেকে আসছে বংশবিস্তারের অতিরিক্ত সক্ষমতা। বংশবিস্তারের অতিরিক্ত সক্ষমতাকে differential reproductive success বলা হয়েছে – যাকে বাংলায় ‘ভিন্নতাজনিত প্রজনন সাফল্য’ বলা যেতে পারে। এই সাফল্য ছাড়া বিবর্তন সম্ভব নয়। আর এই প্রক্রিয়ার নামই হলো প্রাকৃতিক নির্বাচন বা natural selection।

এই কারণেই লম্বা গলাওয়ালা জিরাফের সংখ্যা বাড়তে থাকে খাটো গলাওয়ালা জিরাফের সংখ্যার তুলনায়। জিরাফের গলা কেউ টেনে লম্বা করে দেয়নি। বরং প্রকারণের কারণে যে জিরাফগুলোর ‘জিন’-এর মধ্যে গলা লম্বা হওয়ার মতো ‘সুবিধাজনক’ বৈশিষ্ট্য ছিল সেগুলোই টিকে থাকতে পেরেছে বেশি এবং খাটো গলার জিরাফের চাইতে বংশবিস্তার করতে পেরেছেও বেশি। কিছু কাল পরে দেখা গেল প্রকৃতির এহেন পক্ষপাতমুলক নির্বাচনের ফলে শুধু লম্বা গলাওয়ালা জিরাফেরাই টিকে থাকলো।

একই প্রক্রিয়ায় উত্তর আমেরিকায় এককালে বসবাসকারী বর্তমানে বিলুপ্ত হাতীর মতো দেখতে প্রানী উলি ম্যামথদের (wooly mammoth)গায়ে লোম গজিয়েছিল। প্রচন্ড শীতে যাদের শরীর একটু রোমশ ছিল তারা বেঁচেছিল একটু বেশি, বংশবিস্তারও করেছিল একটু বেশি। ধীরে ধীরে রোমশ ম্যমথদের সংখ্যা বাড়তে থাকলো। এবারে চিন্তা করুন, এই প্রক্রিয়াটা হাজার হাজার প্রজন্ম ধরে চলতে থাকলে কি হতে পারে। ঠিকই ধরেছেন, লোমহীন ম্যামথ আর দেখা যাবে না, পরিবর্তে দেখা যাবে ভারী ফার কোটের মতো কোট পরা অত্যন্ত রোমশ ম্যমথদের। এদের নামও তাই উলি ম্যামথ।

সংক্ষেপে এই হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের প্রক্রিয়া।

কোন ডিজাইন বা নক্সা নয়, কারো সুচিন্তিত পরিকল্পনার ফলশ্রুতি নয় – প্রাকৃতিক নির্বাচন একটা নিছক বস্তুবাদী প্রক্রিয়া। কোন অতিপ্রাকৃতিক শক্তির নির্দেশ ছাড়াই প্রকৃতি তার কাজ করে যাচ্ছে, জীবজগতে প্রতিনিয়ত ঘটিয়ে চলছে রূপান্তর।

বিবর্তিত হওয়া মানেই কিন্তু উন্নততর হওয়া নয়। অনেক ‘উন্নীত’ জনপুঞ্জ নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে অবলুপ্ত হয়ে গেছে। টিকে থাকার যোগ্যতা পরিবেশের সাথে সম্পর্কিত, সুচিন্তিত কিংবা সুসমন্বিত অগ্রগতির কোন নিদর্শন এতে নেই। তাই বিবর্তিত হওয়া মানে যোগ্যতর হওয়া, যোগ্যতম নয়।

ঠিক এ কারণেই কোন প্রানীই নিখুঁত ডিজাইনের ফল নয়। প্রাকৃতিক নির্বাচন কোন দক্ষ কারিগর নয়। তাই একে বড়জোর ক্রমোন্নয়নের প্রক্রিয়া বলা যেতে পারে। যা আছে তার ওপরেই প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করে, যা নেই তা বানাতে পারে না। সুবিধাজনক মিউটেশন ঘটলে অভিযোজন কাজ করতে পারে, নইলে নয়।

সামুদ্রিক কচ্ছপের কথাই ধরুন না। এদের পাখনা সাঁতার কাটতে যতটা সুবিধাজনক, বালি খোঁড়ার কাজে ততটা নয়। অথচ, ডিম পাড়ার জন্য তাদেরকে এই কাজটাও করতে হয়। কিন্তু কাজটা খুব একটা ভালোভাবে করা যায় না, উপযুক্ত পাখনার অভাবে।
এমন আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে প্রকৃতিতে, জীবজগতে। বস্তুতঃ ঠিকমতো অভিযোজন ঘটে নি বলে অনেক প্রজাতিতো বিলুপ্তই হয়ে গেছে। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রজাতির পরিমাণ আনুপাতিক হারে প্রায় শতকরা নিরানব্বই ভাগ। বিধাতা কেন এত প্রজাতি বানিয়ে আবার বেশির ভাগই গায়েব করে দিলেন – সৃষ্টিবাদীদের জিগ্যেস করলে এই প্রশ্নের কোন উত্তর পাওয়া যাবে না। পেলেও হয়তো তা হবে এই ধরনের, “বিধাতার লীলাখেলা বোঝার সাধ্য মানুষের নাই”।

আবার অনেকেই প্রাকৃতিক নির্বাচনকে র‌্যন্ডম প্রক্রিয়া মনে করেন। এটিও ভুল। মিউটেশনের মাধ্যমে কোন জনপুঞ্জের মধ্যে যে জেনেটিক প্রকারণ ঘটে তা র‌্যান্ডম প্রক্রিয়ার ফল হতে পারে, কিন্তু প্রাকৃতিক নির্বাচন এই প্রকারণের ওপরে কাজ করে নিয়ম অনুযায়ী। লম্বা গলাওয়ালা জিরাফেরা উঁচু গাছের পাতা খাওয়ার যে সুবিধাটুকু পেয়ে বেশি বেশি বংশবিস্তার করতে পারলো তা কোনক্রমেই র‌্যান্ডম প্রক্রিয়া নয়।

প্রকারণ, ভিন্নতাজনিত প্রজনন আর বংশবিস্তার – এই হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের বস্তুবাদী প্রক্রিয়া। এর পেছেন কোন উদ্দেশ্য নেই, উন্নতির কোন আকাঙ্ক্ষা নেই, নেই ভারসাম্য রক্ষার কোন পরিকল্পনা। প্রাকৃতিক নির্বাচন কারো দরকার হচ্ছে তাই, বা কারো ইচ্ছায় ঘটে না। কোন জনপুঞ্জের বা জনপুঞ্জের কোন সদস্যের চাহিদায় বা চেষ্টায় বিবর্তন ঘটে না। প্রাকৃতিক নির্বাচন যা দরকার তা সরবরাহ করতে পারে না। প্রাকৃতিক নির্বাচন জনপুঞ্জের মধ্যে থাকা প্রকারণগুলো থেকেই বেছে নেয়, নিজে প্রকারণ তৈরি করতে পারে না।

এবারে দেখা যাক, প্রাকৃতিক নির্বাচন ছাড়া অন্য আর কোন উপায়ে বিবর্তন হতে পারে কিনা। এটাই এই আলোচনার ষষ্ঠ এবং শেষ বিষয়।

জনপুঞ্জে পরিবর্তন ঘটার আর একটা প্রক্রিয়াকে নাম দেয়া হয়েছে ‘জেনেটিক ড্রিফট’ (genetic drift)। ধরা যাক, দৈবক্রমে দূর্ঘটনা বশতঃ একটা ছোট জনপুঞ্জের সব প্রাণী মরে গেল। একটাও বেঁচে রইলো না। ফলে এরা আর বংশবিস্তারও করতে পারলো না। অন্যদিকে এক ই কারণে আরেকটা ভিন্ন জনপুঞ্জে (হয়তো আগের জনপুঞ্জটা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ফলে) বংশবিস্তারের মাত্রা বেড়ে গেল। এই উদাহরণে কিন্তু সুবিধাজনক অভিযোজনের কোন ভূমিকা নেই। এখানে প্রাকৃতিক নির্বাচন বা অভিযোজনের ফলে বিবর্তন হচ্ছে না, তবুও বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় এই ধরনের ঘটনা প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ, প্রাকৃতিক নির্বাচন ছাড়াও কোন জনপুঞ্জে বিশেষ ধরনের জিন-এর সংখ্যায় বাড়তি-কমতি হতে পারে। একে বলা হয় এলিল ফ্রিকোয়েন্সির (Allele frequency) বাড়া-কমা। এলিল ফ্রিকোয়েন্সি হচ্ছে জনপুঞ্জে কোন একটা বিশেষ ধরনের জিন-এর সংখ্যানুপাত। যেমন, ‘এবি’ (AB)রক্তের টাইপে ‘এ’ একটা এলিল, ‘বি’ আরেকটা। যদি আপনার রক্তের টাইপ ‘এবি’ হয়, আপনার সন্তান আপনার কাছ থেকে হয় ‘এ’ এলিল নয়তো ‘বি’ এলিল পাবে। যে কোন একটা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে শতকরা পঞ্চাশ ভাগ। আপনার সন্তানসংখ্যা যদি হয় মাত্র একজন, যে কোন একটা এলিল হারবার সম্ভাবনা শতকরা শতভাগ – অবধারিতভাবে আপনি একটা এলিল হারাচ্ছেন।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, একটা বিশেষ ধরনের জিন কোন জনপুঞ্জে বেড়ে যেতে পারে বা কমে যেতে পারে, সন্তানসংখ্যায় তারতম্যের জন্য। পরিণতিতে, জনপুঞ্জের জিন প্রবাহ অভিযোজন ছাড়া অন্য কোন কারণেও প্রভাবান্বিত হতে পারে। এই তারতম্য ঘটার প্রক্রিয়া র‌্যান্ডম। পরিসংখ্যানের ভাষায় একে বলে ‘স্যাম্পলিং এরর’ (sampling error)। একটা ছোট স্যাম্পল বা নমুনা (নমুনা ছোট হওয়ারই কথা) পুরো জনপুঞ্জ থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে পারে। ফলে, এই নমুনায় একটা বিশেষ এলিলের প্রাধান্য থাকার সম্ভাবনাও বেশি।

আমেরিকান বা রেড ইন্ডিয়ানদের রক্তের গ্রুপে ‘বি’ টাইপ দেখা যায় না বললেই চলে। এটি জেনেটিক ড্রিফটের একটা উদাহরণ। ধারণা করা হয়, প্রায় দশ হাজার বছর আগে তাদের পূর্বপুরুষদের ছোট্ট একটা জনগোষ্ঠী এশিয়া থেকে আমেরিকায় পাড়ি দেয় (১১) – এদের মধ্যে ‘বি’ এলিলের প্রাধান্য ছিল না। ঠিক একইভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার ওলন্দাজ বংশোদ্ভুত ‘আফ্রিকানার’ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘হান্টিংটন’ রোগের প্রকোপ দেখা যায় খুব বেশি। কারণ, তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে হান্টিংটন রোগের বাহক জিনটার প্রাধান্য ছিল (১২)

সাধারণতঃ ছোট জনপুঞ্জে এই বাড়া-কমার জন্য বিবর্তনের প্রক্রিয়া প্রভাবান্বিত হয়। অপেক্ষাকৃত বড় আকারের জনপুঞ্জে জেনেটিক ড্রিফট-এর প্রভাব অপেক্ষাকৃত কম (১৩)

খেয়াল করা দরকার, ‘জেনেটিক’ প্রকারণ ছাড়া প্রাকৃতিক নির্বাচন বা জেনেটিক ড্রিফট কাজ করতে পারতো না। জনপুঞ্জে কিছু সদস্য শুরু থেকে ভিন্ন রকমের না হলে এই দুটি প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে না।

(চলছে.. .)

তথ্যসূত্র:

(১) http://www.bio.davidson.edu/people/kahales/301Genetics/timeline.html
(২) http://www.sanger.ac.uk/about/history/hgp/
(৩) http://rarediseases.about.com/od/geneticdisorders/a/genesbasics.htm
(৪) ছবি এক। http://www.sgvworks.com/tom/TOM/pic/dna2.gif
(৫) ছবি দুই। Diagrams of late prophase chromosomes (1000-band stage) of hunan, chimpanzee, gorilla, and orangutan (left to right for each number). Courtesy of Jorge Yunis. From ‘The Origin of Man: A Chromosomical Pictorial Legacy” by J.J. Yunis and O. Prakash, in Science, 19 March 1982, vol. 215: 1525-1530.
(৬) ছবি তিন। http://en.wikipedia.org/wiki/Origin_of_birds
(৭) http://news.bbc.co.uk/2/hi/science/nature/3042781.stm
(৮) http://www.gutenberg.org/etext/14558  
(৯) http://www.positiveatheism.org/hist/quotes/darwin.htm
“When it was first said that the sun stood still and world turned round, the common sense of mankind declared the doctrine false; but the old saying of Vox populi, vox Dei [the voice of the people is the voice of God], as every philosopher knows, cannot be trusted in science.” (Charles Darwin, reminding his readers that they should always treat “obvious” truths with skepticism, in the context of the apparent absurdity of evolving a complex eye through a long series of gradual steps, in the famous passage added to later editions of the Origin of Species (1872, p. 134), quoted from Stephen Jay Gould, The Structure of Evolutionary Theory (2002), chapter 1, “Defining and Revising the Structure of Evolutionary Theory,” p. 1 (the bracketed translation is Gould’s)
(১০) ছবি চার।
(ক) http://animals.howstuffworks.com/animal-facts/animal-camouflage-pictures1.htm
(খ)…pictures11.htm
(গ)…pictures8.htm
(১১) http://www.talkorigins.org/faqs/genetic-drift.html
(১২) http://evolution.berkeley.edu/evosite/evo101/IIID3Bottlenecks.shtml
(১৩) Zimmer, Carl (2002). Evolution : The Triumph of an Idea. New York, NY: Perennial. pp. 364. ISBN 0-06-095850-2.

[185 বার পঠিত]