একটি সুন্দর ষড়যন্ত্র হচ্ছে এক শ্রেনীর নারীকে অপর শ্রেণীর নারীর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে। এইভাবে কর্মজীবি নারীর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া হয় গৃহিণীকে । পুরুষ বিচরণ করে ঘরে বাইরে—দু’জগতেই। আর নিজের ক্ষমতা দিয়ে নারীকে দু’দলে লিপ্ত রাখে চিরশত্রুতায়।

বাড়ীর প্রগতিশীল পরিবেশে আমি বড় হবার কারণেই ছোটোবড় সবার কথার যথেষ্ট মূল্য দেয়া হতো। বিভিন্ন ঘটনাবলী, নানা ব্যপার, যা অনেকেই পাশ কাটিয়ে যেত আমি তা পারতাম না। সে কথা থাক।

গত ২১ জুন বুধবার রাত আটটায় এক ঘটনা (দৈনিক প্রথম আলো ) জানলাম আলমডাঙ্গা বলে এক ছোট অঞ্চলে ক্লাস টু’তে পড়া এক মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে মা ভালো রান্নার আয়োজনে ব্যস্ত। মেয়েটির পিতা কাজি অফিসে গেল হবু জামাইটিকে সাথে নিয়ে। কর্মরত নির্বাহী কর্মকর্তা খবরটি রিপোর্টারের মাধ্যমে জানার পরই নির্বাহী কর্মকর্তা কাজি অফিসে যাবার পথে তাদের আটক করেন। কন্যাটির মাতা এই খবর পেয়ে বিলাপ শুরু করেন: কেন মেয়েটির বিয়ে ভেঙ্গে দেয়া হল? মেয়ের মায়ের বক্তব্য হল- দুইদিন আগে হোক বা পরে হোক, মেয়ের বিয়ে দিতে হবে; অতএব এখন বিয়ে দিতে সমস্যা কোথায় ? বাল্য বিবাহের কু-ফল এবংশাস্তি যাই হোক, এসব বিষয়ে তাদের মাথা ব্যথা নাই। বিয়ে ভাঙ্গার পর মেয়েটির মুখ হাস্যজ্জল হল।তার প্রথম কথা“ কাল থেকে আবার স্কুলে যাবো পড়াশোনা করব।”

দেখা যাচ্ছে, সচেতনতার অভাব ও নানা প্রতিবন্ধকতার কারনে এখনো মেয়েদের অবস্থান কোথায় ? যুগযুগ ধরে এ ঘটনা ঘটে আসছে।

নারীর প্রতি সহিংস আচরনের উৎপত্তি আজ নয় । যুগযুগ ধরে এ ঘটনা ঘটে আসছে। গত কয়েক দশকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সমাজ ব্যবস্থার আমূ্ল পরিবর্তণ হলেও আমাদের নারীরা আজো নিগৃহীত।

দেখুন এই ঘটনাটি: ( ২০০০ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারী বেলা ১টা ) ফেরদৌসী আক্তার (দিনাজপুর) তার সহপাঠীর বিয়ের প্রস্তাবে রাজী না হওয়ায় ছেলেটি বাড়ীর পেছন দিক দিয়ে ঢুকে এসিড নিক্ষেপ করে মেয়েটির প্রতি। ঝলসে যায় মেয়েটির হাত, পা। গলে গেল তার দুই চোখ। দেড় মাস চিকিৎসা শেষেও দৃষ্টি শক্তি আর ফিরে পায়নি মেয়েটি। এর পরও মেয়েটি ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়াশোনা চালিয়ে যায়। বাধা বিপত্তি পেরিয়ে ২০০৬ সালে এইচ এস সি পাশ করে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষনা ইন্সটিটিউটে(সম্মান) পড়াশোনা করছে মেয়েটি।

২০ এপ্রিল ২০০৭ একটি টেলিভিশনের ক্যামেরাম্যান আপ্রান চেষ্টা করছিল একজন মেয়ের পোড়া মুখখানি যেনো দর্শকের নজরে না পড়ে। কিন্তু মাইক্রোফোনটা মুখের কাছে ধরতেই অনেক জাগা জুড়ে বিভৎস মুখখানি নজরে এলো। মেয়েটি কফিন সদৃশ সাদা বিছানায় পড়ে আছে। মেয়েটির জীবনই ভ্রাম্যমান কফিন। ছয় মাসের গর্ভবতী এই নারীকে ৫০ হাজার টাকার জন্য কেরোসিনের আগুনে পুড়তে হল। কেবল তাই নয়, সেই সাথে অর্ধেক বেড়ে ওঠা ভ্রুণটিকেও মেরে ফেলা হোল।

এই বাংলাদেশেই তো কত বিখ্যাত গুনীজন আছেন। উঠতে বসতে তাঁরা নারী উন্নয়নের কথা বলেন। নির্বিঘ্নে আমরা এসব দেখি। কতো মিটিং, মিছিল হচ্ছে নারীদের ভাগ্যের উন্নতির জন্যে। কিন্তু এসব কিছুর ফলাফল শূন্য।

এখন আবার আস যাক, যে কথা শুরুতে বলেছিলাম।
এক শ্রেনীর বিরুদ্ধে অপর শ্রেনী নারীকে কলহে লিপ্ত করার চেষ্টা বহু কূফল বয়ে বেড়াতে হচ্ছে নারী সমাজকেই।

পুরুষের শরীর পেশল হয়। এটা জৈবিক, তবে আধুনিক কালে পেশীর মুল্য একেবারেই কমে গেছে। এখনও নারী যেহেতু আর্থিকভাবে পুরুষ নির্ভর, তাই যে কোন শ্রেনীর সাথে তার সম্পর্ক হয় অস্থির ও অনিশ্চিত। এই জন্যেই কোটিপতির স্ত্রী একদিনে দাসী হয়ে যেতে পারে। তাই তারা পরগাছার মত জীবন ধারন করে হয় পরগাছার পরগাছা। নিজেদের রক্ষার জন্যে এই সব হতভাগীনিরা হয়ে ওঠে প্রচন্ড সংরক্ষনশীল। এই নারীরা মেনে নেয় যেমন দাস প্রভুর সমৃদ্ধিকে মনে করে নিজের সমৃদ্ধি। এই জন্যেই পুরুষ শানীত নারী অপেক্ষা নির্বোধ নারীকে পছন্দ করে। আর নির্বুদ্ধিতাকে রমণীয় বলে প্রশংসা করে।

যখনই সেই শানিত নারীটি প্রতিবাদী হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে সচেতন, তখন তার ভাগ্যে নেমে আসে অন্ধকারের অমানিশা, এসিড নিক্ষেপ, দৈহিক নির্যাতন, ধর্ষণ ইত্যাদি। কোনো মেয়ে অত্যাচারিত হলে আমরা মেয়েরাই প্রায়শঃ বলি যে মেয়েটারই দোষ। আমরা মেয়েরাই দু’দলে বিভক্ত হয়ে কলহ করি। কেননা, এ কলহের সূ্ত্রধর পুরুষ দ্বারা তৈরী এবং তারা তখন নিরাপদ দূ্রত্বে বসে কেবল কলহে লিপ্ত নারীদের তামাশা উপভোগ করে।

নারীর প্রতি সহিংস আচরনের উৎপত্তি আজ নতুন নয়। যুগ যুগ ধরে ঘটে আসছে নানা ঘটনা। কোন মেয়ে হোস্টেলে একা থাকলে প্রতিবেশীরা তাকে বাঁকা চোখে দেখে। এদের মাঝে দেখা গেছে মহিলা, বা গৃহিনীর সংখ্যাই বেশী। একা থাকে এক মেয়ে যার নাম মৌ (ছদ্বনাম)। সপ্তাহের তিন দিনই দেখা যায় কেউ না কেউ—ভাই, বোন আসে তাকে দেখার জন্যে। তথাপি প্রতিবেশী মহিলারা মৌকে “পতিতা” বলতেও বাকী রাখেনা।

মায়েরা তাদের নিজেদের কন্যাকে মিশতে দেয়না হস্টেলে থাকা ঐ মেয়েটির সাথে।

আজ যে শাশুড়ী, কোন এক সময় সেও যে বউ ছিল ভুলে যায় তা। কিন্তু চিরন্তন রীতি আজও বদলায়নি। আজও দেখা যায় শাশুড়ী দ্বারা বহু বউ নিগৃহীত হচ্ছে। অথবা শাশুড়ীর নিপীড়ন হয় আধুনিক বউএর নিকট হতে।

নারী দ্বারা নারী নির্যাতনের বহু ঘটনাই আছে যা ছোট আকারে বলে শেষ করা যায়না। তাই দেখা যায় যে নারীর শত্রু শুধু পুরুষই নয়। তাদের শত্রু হিসেবে রয়েছে পুরুষ মন্ত্রে দীক্ষিতা একপাল নারীও। এরা পূ্রুষের চর হিসেবে কাজ করে নারীর সাংঘাতিক ক্ষতি করে।

তথ্য সূত্র – হমায়ূন আজাদ (নারী )

[228 বার পঠিত]