আইনস্টাইনের ভুবন

আইনস্টাইনের ভুবন


১৮ এপ্রিল আলবার্ট আইনস্টাইনের মৃত্যুদিন। ১৯৫৫ সালের এ দিনে ৭৬ বছর বয়সে আলবার্ট আইনস্টাইন মারা যান। ১৮৭৯ সালের ১৪ মার্চ থেকে ১৯৫৫ সালের ১৮ এপ্রিল। ছিয়াত্তর বছর এক মাস চারদিনের বায়োলজিক্যাল লাইফ আইনস্টাইনের। কিন্তু কিছু কিছু জীবন থাকে – শারীরিক মৃত্যুতে শেষ হয় না, যার কীর্তি থেকে যায় অনন্তকাল। আইনস্টাইনের জীবন ঠিক সেরকম। বিজ্ঞানের জগতে আলবার্ট আইনস্টাইন মৃত্যুহীন।


জীবনের শেষ বছরটি একদম ভালো কাটেনি আইনস্টাইনের। শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি মনের ওপর পড়েছে প্রচন্ড চাপ। ১৯৫৪ সালের শুরু থেকেই রক্তস্বল্পতায় ভুগছিলেন আইনস্টাইন। অসুস্থ শরীরেও কাজ করে যাচ্ছিলেন যতটুকু পারেন। তখন আমেরিকান সিনেটর ম্যাক্‌কারথির নেতৃত্বে কমিউনিস্ট শিকার জোরেশোরেই চলছে। বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষণারত অধ্যাপক ও বিজ্ঞানীরা সবাই তটস্থ হয়ে আছেন, কখন ডাক আসে ‘হাউজ অব আন-আমেরিকান অ্যাক্টিভিটিজ কমিটি’ থেকে। কমিটি তখন লস আলামোস ন্যাশনাল ল্যাবোরেটরির ডাইরেক্টর, আমেরিকার প্রথম পারমাণবিক বোমার জনক রবার্ট ওপেনহেইমারকে জেরা করছে। কমিটির ধারণা, কমিউনিস্টদের প্রতি সমর্থন আছে ওপেনহেইমারের। ওপেনহেইমারের সিকিউরিটি ক্লিয়ারেনস বাতিল করে দেয়া হলো, সব ধরণের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে তাঁকে। যে মানুষটি পারমাণবিক বোমার বৈজ্ঞানিক প্রকল্পে নেতৃত্ব দিয়ে আমেরিকাকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী (বা ভয়ঙ্কর) দেশে পরিণত করেছেন সেই ওপেনহেইমারকে ছুঁড়ে ফেলে দিলো আমেরিকা।

আইনস্টাইন প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত ওপেনহেইমারকে সমর্থন করেছেন। তিনি প্রকাশ্যে কঠোর ভাষায় কমিটির সমালোচনা করেছেন। আইনস্টাইন দেশের সব বিজ্ঞানীদের আহ্বান জানিয়ে চলেছেন যেন কমিটির সামনে কেউ না যায়। আমেরিকান বামপন্থী ও উদারপন্থীরা আইনস্টাইনের সাহসের প্রশংসা করলেন। তাঁদের কাছে আইনস্টাইন তখন ‘হিরো’। অন্যদিকে রক্ষণশীল ডানপন্থী ও উগ্রপন্থী আমেরিকানদের চোখে আইনস্টাইন একজন দেশদ্রোহী। তাঁরা আইনস্টাইনের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে তাঁকে আমেরিকা থেকে বের করে দেবার দাবী তুলছেন। দেশদ্রোহী আইনস্টাইনের বিচার চেয়ে মিছিল মিটিং হচ্ছে। আইনস্টাইন জ্ঞানবিজ্ঞান ও নাগরিক অধিকারের এরকম অপমান জার্মানিতে দেখেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে। এখন আমেরিকায় আবার একই রকম অপমান দেখে ভীষণ হতাশ হয়ে পড়লেন।

এই হতাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে নিউ-ইয়র্ক টাইম্‌স এ প্রকশিত তাঁর একটি চিঠিতে।

einstein-001-a

অক্টোবরের ১৩ তারিখে ‘দি রিপোর্টার’-এর সম্পাদকের কাছে লেখা চিঠির ওপর ভিত্তি করে নিউইয়র্ক টাইমস নভেম্বরের ১০ তারিখে “If Einstein Were Young Again, He Says He’d Become a Plumber” প্রবন্ধটি প্রকাশ করে। আবার যদি জন্ম হয় – আইনস্টাইন কী হতে চান সেজন্মে? আইনস্টাইন লিখেছেন, পরবর্তী জন্মে তিনি আর বৈজ্ঞানিক বা শিক্ষক বা স্কলার হতে চান না। তিনি হতে চান মিস্ত্রী বা ফেরিওয়ালা। তিনি দেখতে চান মিস্ত্রী বা ফেরিওয়ালার কাজে বর্তমানে যে স্বাধীনতা আছে, তখনো সে স্বাধীনতা থাকে কিনা। যদি থাকে, তখন হয়তো পূর্ণ-স্বাধীনতায় পদার্থবিজ্ঞানচর্চা করা যাবে। কারণ আইনস্টাইন বিশ্বাস করেন, চাকরি করে গবেষণা করতে হলে সে গবেষণা স্বাধীন নয়।


জনপ্রিয়তার বিড়ম্বনা কম নয়। আইনস্টাইনের মত মানুষ যা বলেন – তা নিয়েই আলোচনা হয়। তার প্রভাব পড়ে অনেকের মাঝেই। আইনস্টাইন প্লাম্বার হতে চান জেনে নিউইয়র্কের স্ট্যানলি প্লাম্বিং এন্ড হিটিং কোম্পানি আইনস্টাইনকে তাদের পার্টনার হবার প্রস্তাব দিলো। কোম্পানির মালিক স্ট্যানলি মওরে এও বললেন যে তিনি কোম্পানির নাম বদলে ‘আইনস্টাইন এন্ড স্ট্যানলি প্লাম্বিং কোম্পানি’ রাখার জন্য তৈরি।

einstein-002


১৯৫৫ সালের মার্চের ১৪ তারিখ আইনস্টাইন ছিয়াত্তরতম জন্মদিন পালন করলেন। তাঁর বন্ধুরা চেয়েছিলেন বেশ জাঁকজমক করে জন্মদিনের অনুষ্ঠান করতে। কিন্তু আইনস্টাইন রাজী হননি। কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সাথে ঘরোয়াভাবে সাদামাটা একটি অনুষ্ঠান হলো। এক সপ্তাহ পরে তিনি খবর পেলেন, তাঁর প্রিয় বন্ধু মাইকেল বেসো মারা গেছেন। আইনস্টাইনের সুখে দুঃখে সবসময় পাশে থাকতেন মাইকেল বেসো। স্পেশাল রিলেটিভির সময় থেকে শুরু করে মিলেইভার সাথে বিচ্ছেদের সময়ও মাইকেল বেসোই ছিলেন আইনস্টাইনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ভীষণ মুষড়ে পড়লেন আইনস্টাইন।

সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক বোমা তৈরি করে ফেলেছে। আমেরিকা ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকবার হাইড্রোজেন বোমা বিস্ফোরণ করে শক্তির আস্ফালন করেছে। আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল আইনস্টাইনের কাছে অনুরোধ করেছেন পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ করার আহবান জানিয়ে বিশ্বনেতাদের কাছে আবেদন করার জন্য। বার্ট্রান্ড রাসেল আবেদনের খসড়া তৈরি করেছেন। এগারোই এপ্রিল আইনস্টাইন আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করে পাঠিয়ে দিলেন বার্ট্রান্ড রাসেলের কাছে।

ইসরায়েল রাষ্ট্রের সপ্তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট হবার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন আইনস্টাইন। এবার ইসরায়েল সরকার চাচ্ছে আইনস্টাইনকে প্রধান অতিথি করে নিয়ে যেতে ইসরায়েলে। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে আইনস্টাইনের পক্ষে ইসরায়েল ভ্রমণ করা সম্ভব নয়। ঠিক হলো আইনস্টাইনের বক্তৃতা রেকর্ড করে নিয়ে যাওয়া হবে ইসরায়েলের রেডিওতে প্রচার করার জন্য। আইনস্টাইন বক্তৃতার খসড়া তৈরি করতে শুরু করলেন।

এপ্রিলের ১৩ তারিখে পেটে প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করলেন আইনস্টাইন। এরকম ব্যথা তাঁর আগেও হয়েছে। বেশ কয়েকবছর আগে তাঁর পেটের একটি ধমনীর দেয়ালে ফোঁড়া হয়েছে এবং তা দিনে দিনে বড় হচ্ছে। যে কোনদিন সেটি ফেটে যেতে পারে। ব্যথা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এরকম তীব্র ব্যথা আগে কোনদিন লাগেনি। সেক্রেটারি হেলেন ডুকাস ডাক্তারকে ফোন করলেন। আইনস্টাইনের ব্যক্তিগত ডাক্তার পরামর্শ দিলেন হাসপাতালে ভর্তি হতে। কিন্তু আইনস্টাইন কিছুতেই হাসপাতালে যেতে রাজী নন। কিন্তু ব্যথা ক্রমশ বাড়ছে দেখে ১৫ তারিখে একপ্রকার জোর করেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। ডাক্তাররা বললেন, অপারেশান করাতে হবে। আইনস্টাইন কিছুতেই রাজী নন। তিনি বলেন, মৃত্যু যত সংক্ষেপে হয় ততোই ভালো, অপারেশান ইত্যাদি করে আড়ম্বর সহকারে মরার কোন অর্থ হয়না। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে বড়ছেলে হ্যান্স এলেন, নিউইয়র্ক থেকে ওয়ালটার বাকি, অটো নাথান সহ আরো অনেক ডাক্তার বন্ধু এলেন। সবাই চেষ্টা করলেন আইনস্টাইনকে অপারেশানে রাজী করাতে। কিন্তু আইনস্টাইন কিছুতেই অপারেশান করাবেন না। ব্যথা কিছুটা কমে গেলো
কয়েকদিনের মধ্যে।

এপ্রিলের ১৭ তারিখ রাতে কিছুটা সুস্থ বোধ করার পর ইসরায়েলের বক্তৃতার খসড়া নিয়ে কিছুক্ষণ কাজ করে ঘুমিয়ে পড়লেন আইনস্টাইন। কিন্তু কয়েকঘন্টা পরেই ১৮ তারিখ ভোর একটার দিকে প্রচন্ড ব্যথায় ঘুম ভেঙে গেলো তাঁর। পেটের ফোঁড়া ফেটে গেছে। কর্তব্যরত নার্স অ্যালবার্টা রোজেল ছুটে এলেন। আইনস্টাইন তখন বিড়বিড় করে জার্মান ভাষায় কিছু বললেন। নার্স তার কিছুই বুঝতে পারলেন না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই মারা গেলেন আইনস্টাইন।

খবর পেয়ে ডাক্তার নার্স বন্ধুরা সবাই ছুটে এলেন হাসপাতালে। হাসপাতালের প্যাথোলজিস্ট ডাক্তার টমাস হার্ভি আইনস্টাইনের মরদেহের অটোপ্‌সি করার সময় কারো কোন অনুমতি ছাড়াই ব্রেনটি খুলে রেখে দিলেন। আরেকজন প্যাথোলজিস্ট ডাক্তার হেনরি অ্যাব্রাম্‌স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে আইনস্টাইনের চোখদুটো তুলে নিলেন। অনেকদিন আগেই আইনস্টাইন বলেছিলেন, মৃত্যুর পরে যেন তাঁর শরীর পুড়িয়ে ফেলা হয়। কোন ধরণের শোকসভা, শোকমিছিল, শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করতে নিষেধ করেছিলেন তিনি। এমনকি তাঁর সমাধির চিহ্নও না রাখার জন্য বলেছেন আইনস্টাইন।

১৮ এপ্রিল, ১৯৫৫, সোমবার বিকেলে কোনধরণের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান ছাড়াই আইনস্টাইনের মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলা হলো। কিছু পোড়াছাই ভাসিয়ে দেয়া হলো ডেলাওয়ার নদীতে। পৃথিবীর সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লো আইনস্টাইনের মৃত্যুসংবাদ।


আইনস্টাইন নিজের প্রসঙ্গে লিখেছেন, “আমার নিজস্ব প্রকৃতি আমাকে যা করতে বলে আমি তাই করি। এক জীবনে এত ভালবাসা এত প্রশংসা অর্জন করা আমার পক্ষে কিছুটা বিব্রতকর। ঘৃণার তীরও আমার দিকে ছোড়া হয়েছে। কিন্তু তা আমার গায়ে লাগেনি। কারণ ঘৃণা অন্য ভুবনের বাসিন্দা যার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আমি এমন একটা নির্জন ভুবনে বাস করি যেটা কমবয়সে যন্ত্রণাদায়ক – কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে যার স্বাদ বেড়ে যায়”।

কেমন ছিল আইনস্টাইনের ভুবন? বাংলায় ‘ভুবন’ শব্দটির অনেক অর্থ হয়। আইনস্টাইনের ভুবন বললেও সেই সবগুলো অর্থকেই বোঝানো সম্ভব আলাদা আলাদা ভাবে। আইনস্টাইনের ব্যক্তিগত ভুবন – বহুমাত্রিক। সন্তান আইনস্টাইন, ছাত্র-আইনস্টাইন, প্রেমিক আইনস্টাইন, স্বামী আইনস্টাইন, পিতা-আইনস্টাইন, বিজ্ঞানী আইনস্টাইন, দার্শনিক আইনস্টাইন, রাজনীতিবিদ আইনস্টাইন – মাঝে মাঝে মনে হয় কেমন যেন আলাদা আলাদা স্বত্ত্বা সব।

আবার ১৯৮৭ সালের আগের আইনস্টাইন আর ১৯৮৭ সালের পরের আইনস্টাইনের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য। ১৯৮৭ সালের আগ পর্যন্ত আইনস্টাইনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যত জীবনী লেখা হয়েছে তার কোথাও আইনস্টাইনের সাথে অনেক নারীর সম্পর্ক, নিজের স্ত্রীর সাথে তার মানসিক অশান্তি, প্রথম স্ত্রী মিলেইভার সাথে ডিভোর্স ইত্যাদি সব বিষয়ের কিছুই প্রকাশিত হয়নি। আইনস্টাইনের সেক্রেটারি হেলেন ডুকাসের প্রাণপন চেষ্টায় আইনস্টাইনের ব্যক্তিগত জীবনের যত ঋণাত্মক দিক আছে সব গোপন রাখা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৮৭ সালে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি ও ইসরায়েলের হিব্রু ইউনিভার্সিটির আইনস্টাইন আর্কাইভ সবার জন্য উন্মুক্ত হলে ব্যক্তি আইনস্টাইনের অনেক অজানা দিক প্রকাশিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ১৯৯৩ সালে রজার হাইফিল্ড ও পল কার্টারের ‘the private lives of Albert Einstein’ প্রকাশিত হবার পর ‘সাধু’ আইনস্টাইন অনেকের চোখেই হয়ে গেলেন ‘শয়তান’ আইনস্টাইন- যে কিনা নিজের বউয়ের গায়ে পর্যন্ত হাত তুলেছে!

einstein-074-a

১৯৯৩ সালের ৩১ অক্টোবর নিউইয়র্ক টাইমস আইনস্টাইনের কপালে দুটো শিং এঁকে দিয়ে আইনস্টাইকে একেবারে দানবের সাথে তুলনা করে। কিন্তু টাইম ম্যাগাজিন আইনস্টাইনকে বিংশ শতাব্দীর সেরা মানুষের স্বীকৃতি দিয়েছে।

timepersonofthecentury


বিজ্ঞানী ফ্রিম্যান ডাইসন আইনস্টাইনের জীবনকে দেখেছেন এভাবে “Albert Einstein’s life was full of paradoxes”। তার অনেক কারণ আছে। ব্যক্তিগত জীবনে নানাকারণেই স্ব-বিরোধীতা দেখা দিতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানে স্ববিরোধীতা গ্রহণযোগ্য নয়। দেখা যাক বিজ্ঞানী আইনস্টাইন কীভাবে স্ববিরোধী নিজের ভুবনে – মানে নিজের মহাবিশ্বে। কেমন ছিল আইনস্টাইনের মহাবিশ্ব?

আইনস্টাইনের মহাবিশ্বের ধারণা প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে। কিন্তু তিনি মহাবিশ্ব সম্পর্কে বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেন যখন তাঁর জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি সম্পর্কিত গবেষণাপত্র প্রকাশিত হতে শুরু করে। ১৯১৫ সালে বার্লিনে প্রকাশিত হয় তাঁর তিনটি পেপারঃ “On the General Theory of Relativity”, “Explanation of the Perihelion Motion of Mercury from the General Theory of Relativity”, এবং “The Field Equations of Gravitation”.

১৯১৬ সালে এনালেন ডার ফিজিকের ৪৯ সংখ্যায় প্রকাশিত হলো “The Foundations of the General Theory of Relativity”. এই পেপারটি আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ পেপার। জেনারেল রিলেটিভিটির ওপর ১৯১৫ সালে প্রকাশিত তিনটি ধারাবাহিক গবেষণাপত্রের পর এ পেপারে আইনস্টাইন জেনারেল রিলেটিভিটির চূড়ান্তরূপ প্রকাশ করেন। যে টেনসর এনালাইসিসের মাধ্যমে জেনারেল রিলেটিভিটিতে অভিকর্ষজ ক্ষেত্রসমীকরণগুলোকে নন-ইউক্লিডিয়ান স্পেসটাইমে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে তার বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে এ গবেষণাপত্রে। অভিকর্ষজ ক্ষেত্রের টানে আলোক রশ্মির বেঁকে যাওয়ার ঘটনা ব্যাখ্যা করতে পারে জেনারেল রিলেটিভিটি। নিউটনের ক্ল্যাসিক্যাল থিওরি এরকম ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে পারেনা। এখানেই জেনারেল রিলেটিভিটির শ্রেষ্টত্ব। এতদিন যে বিশ্বব্রক্ষ্মান্ডকে দেখা হতো নিউটনের ক্ল্যাসিক্যাল তত্ত্বের মাধ্যমে, এখন থেকে তা দেখা হবে আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটির মাধ্যমে।

কিন্তু শুধু সায়েন্টিফিক পেপার লিখলেই তো হলো না। তার পরীক্ষামূলক প্রমাণ চাই। প্রমাণ করতে হলে বিশাল বাজেটের বিশাল পরীক্ষা দরকার। আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করতে হয় প্রায় তিন বছর।

১৯১৯ সালের জুনের দুই তারিখে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সত্যতা প্রমাণীত হয়। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি অবজারভেটরির পরিচালক, ইংল্যান্ডের বিখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী স্যার আর্থার এডিংটন সূর্যের অভিকর্ষজ ক্ষেত্রের টানে তারার আলো যে বেঁকে যায় তা পর্যবেক্ষণ করেন। সূর্যের পূর্ণগ্রহণের ছবি থেকে প্রমাণীত হয় যে অভিকর্ষজ ক্ষেত্রের টানে আলোর গতিপথ পরিবর্তিত হয়। নভেম্বর মাসে রয়েল সোসাইটি এডিংটনের পরীক্ষালব্ধ ফল প্রকাশ করলে আইনস্টাইন রাতারাতি বিশ্ববিখ্যাত হয়ে যান। কারণ আইনস্টাইনের তত্ত্বটি সাধারণ মানুষের কাছে এতই দুর্বোধ্য যে জনসাধারণের কাছে মনে হতে শুরু করেছে যে একমাত্র আইনস্টাইনই অন্যরকম একটি পৃথিবীকে দেখার ক্ষমতা রাখেন, একমাত্র আইনস্টাইনই পারেন সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি বুঝতে। সেদিন থেকে সবাই ধরে নিলেন যে আইনস্টাইন বিশ্বব্রহ্মান্ডের ধারণা বদলে দিয়েছেন।

আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি কাজে লাগিয়ে ‘স্পেস-টাইম’ বা স্থান-কালের ধারণার যে বিবর্তন ঘটে গেল তার হাত ধরেই মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও ভবিষ্যৎ পরিণতির একটা যুক্তিপূর্ণ ধারণা পাওয়া গেল। প্রতিষ্ঠিত হলো ব্ল্যাকহোল থিওরি। এখন মহাবিশ্ব সম্পর্কে সামান্য ধারণা আছে এরকম যে কোন মানুষকে মহাবিশ্বের সাধারণ গঠনের কথা জিজ্ঞেস করলে জানা যাবে যে ‘ব্ল্যাক-হোল’ মহাবিশ্বের একটি আবশ্যিক উপাদান। ‘ব্ল্যাক-হোল’ ছাড়া আধুনিক মহাবিশ্বের ধারণাই করা যায় না। আমাদের গ্যালাক্সিতে অনেকগুলো ব্ল্যাক-হোল আছে। অন্যান্য সব জানা গ্যালাক্সির কেন্দ্রেও ব্ল্যাক-হোল রয়েছে।

এই ব্ল্যাক-হোলের ধারণা হঠাৎ করে আসে নি। ১৭৮৩ সালে ইংরেজ এস্ট্রোনমার জন মিশেল সর্বপ্রথম ব্ল্যাক-হোলের ধারণা দেন। প্রচন্ড মাধ্যাকর্ষণ বল সমৃদ্ধ ব্ল্যাক-হোলের চারপাশে নক্ষত্ররা প্রচন্ড বেগে ঘুরতে থাকে। ফ্রিম্যান ডাইসন এ অবস্থার তুলনা করেছেন আগুনের চারপাশে ঘূর্ণায়মান পোকার সাথে। পোকার মত নক্ষত্ররা ব্ল্যাক-হোলের চারপাশে ঘুরতে থাকে এবং মাঝে মাঝে অর্থাৎ গড়ে প্রায় দশ হাজার বছর পর পর এক একটা নক্ষত্র ব্ল্যাক-হোলে পড়ে যায়। নক্ষত্রের তখন মৃত্যু ঘটে। এই নক্ষত্রের শক্তির বেশির ভাগ ব্ল্যাক-হোলেই থেকে যায় – খুব সামান্য অংশ এক্স-রে বা তেজস্ক্রিয় বিকিরণ হিসেবে বেরিয়ে আসে। এই সামান্য অংশের শক্তিও একশ’টা পারমাণবিক বোমার শক্তির চেয়ে বেশি। ব্ল্যাক-হোলের ভেতরই স্পেস-টাইম বা স্থান-কাল মিশে যায়। যেহেতু সময়ের আলাদা কোন অস্তিত্ব থাকে না সেখানে – তাই সময় শেষ হয়ে যাবারও কোন ব্যাপার থাকে না। ফলে যা একবার ঢোকে তা চিরদিন পড়তেই থাকে পড়তেই থাকে। আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটির সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বস্ত প্রমাণ হলো এই ব্ল্যাক-হোল। স্টিফেন হকিং এবং রজার পেনরোজ আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি থেকে প্রমাণ করেছেন যে ব্ল্যাক-হোলে স্পেস-টাইম একাকার হয়ে যায়।

এখন কেউ যদি বলে যে ব্ল্যাক-হোল বলে কিছু থাকতে পারে না, মেনে নেয়া যায়? অবশ্যই না। কিন্তু স্বয়ং আইনস্টাইন যদি বলেন যে ব্ল্যাক-হোল থাকতে পারে না, তখন? বিশ্বাস হতে না চাইলেও সত্যি যে আইনস্টাইন কখনো ব্ল্যাক-হোলের ধারণা মেনে নেননি। এখানেই তাঁর স্ববিরোধীতা। ১৯৩৯ সালে এনাল্‌স অব ম্যাথম্যাথিক্‌স এর ৪০ সংখ্যার ৯২২-৯৩৬ পৃষ্ঠায় আইনস্টাইনের “Stationary Systems with Spherical Symmetry Consisting of Many Gravitating Masses” প্রবন্ধে আইনস্টাইন প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে ব্ল্যাক-হোল থাকতে পারে না। তিনি একটা গাণিতিক ব্ল্যাক-হোল মডেল তৈরি করে সেখানে অনেকগুলো ভর ও তাদের পারস্পরিক অভিকর্ষজ বলের হিসেব করে দেখিয়েছেন যে ওরকম একটা মডেল অসম্ভব। কারণ তাতে ব্ল্যাক-হোলের ভেতরের বস্তুগুলোকে আলোর বেগের চেয়েও বেশি বেগে ছুটতে হবে – যা কিছুতেই সম্ভব নয়। সুতরাং ব্ল্যাক-হোল থাকতে পারে না। কিন্তু আইনস্টাইনের এই মডেলের প্রধান ভুলটি ছিল অন্য জায়গায়। তিনি ধরে নিয়েছিলেন ব্ল্যাক-হোলটি স্ট্যাটিক – বা স্থির। কিন্তু কোন ব্ল্যাক-হোলই স্ট্যাটিক নয়, সবগুলোই ডায়নামিক বা গতিশীল। Gravitational collapse of massive objects বা প্রকান্ড ভরের কোন বস্তুর মাধ্যাকর্ষণ বলের ধ্বংস হয়ে যাওয়া থেকেই গতিশীল ব্ল্যাক-হোলের সৃষ্টি।

আইনস্টাইন কি এই ব্যাপারটি বোঝেন নি নাকি বুঝতে চান নি? তাঁর মত মানুষ বুঝতে চাইলে বুঝবেন না তা হতে পারে না। তিনি বুঝতে চান নি। তিনি মনে করেছেন ব্ল্যাক-হোল থাকতে পারে না, তাই ধরেই নিয়েছেন ব্ল্যাক-হোল থাকবে না। থাকলেও তিনি মেনে নেবেন না, যেমন কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে তিনি মেনে নেননি কখনো। ব্ল্যাক-হোল প্রসঙ্গে তিনি কোন আলোচনাও করতে চান নি কখনো। ১৯৩৯ সালে যখন তিনি ব্ল্যাক-হোল বিরোধী পেপারটি প্রকাশ করেন, সে বছরই রবার্ট ওপেনহেইমার ও হার্টল্যান্ড স্নেইডার একটা গবেষণা পত্রে বিশদ-ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন – কীভাবে একটা প্রকান্ড নক্ষত্র ক্রমাগত তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ঘটাতে ঘটাতে এক সময় শেষ হয়ে যায় এবং ব্ল্যাক-হোলে পড়ে যায়। বলাবাহুল্য এটা প্রমাণের জন্য এই গবেষণা-পত্রে আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি ব্যবহার করা হয়েছে। আইনস্টাইন এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করেন নি। শুধু তাই নয় – এর কয়েক বছর পর ওপেনহাইমার প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ইন্সটিটিউট অব এডভান্স স্টাডির পরিচালক পদে যোগ দিয়েছেন। আইনস্টাইন তখন সেখানে কাজ করছেন। প্রায়ই দেখা হচ্ছে দু’জনের। অথচ কখনো ব্ল্যাক-হোল বিষয়ে আলোচনা হয়নি তাঁদের মধ্যে। তবে কি আমাদের ধরে নিতে হবে যে – আইনস্টাইন নিজের বিজ্ঞানের সাথে বিশ্বাসকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন কোন কোন সময় – যা নিজেই অতিক্রম করতে চান নি?

তথ্যসূত্রঃ

১। Albert Einstein, The Einstein Reader, Citadel Press, New York, 2006
২। প্রদীপ দেব, “আইনস্টাইনের কাল”, মীরা প্রকাশন, ঢাকা, ২০০৬ ( এবং এই বইয়ের তথ্যসূত্র)।
৩। Freeman Dyson, in Einstein Hundred years of relativity, ed, Andrew Robinson, ABC Books, Sydney, 2005
৪। Stephen Hawking, in Einstein Hundred years of relativity, ed, Andrew Robinson, ABC Books, Sydney, 2005

About the Author:

মন্তব্যসমূহ

  1. Dr. Shivnarayan Singha Roy , Central Nano Technology Research Institute, India মে 3, 2016 at 12:44 পূর্বাহ্ন - Reply

    I am impressed reading comments of Bangladeshis. I knew that only Asian Hindustanis , Chinese and Japanese is interested on science and they are developing their motherlands scientifically. But, Bangladeshis are getting changed gradually. They begin to believe that science is better than God.

  2. ভাস্কর মে 7, 2010 at 10:59 অপরাহ্ন - Reply

    ভারত থেকে এ লেখা পড়ে মুগ্ধ হলাম । ভাল লাগল ।

  3. অভিজিৎ এপ্রিল 20, 2010 at 10:12 অপরাহ্ন - Reply

    অসামান্য লেখা।

    উপরে ইরতশাদ ভাইয়ের সাথে একমত পোষণ করে বলছি – বিবর্তন নিয়ে তো মুক্তমনায় প্রচুর লেখা হচ্ছে। পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞানের অগ্রগতি নিয়েও লেখা দরকার। আর প্রদীপ দেব সেই কাজটি করলে খুব ভাল হয়। মুক্তমনায় এ ব্যাপারে তিনিই দুর্দান্তভাবে যোগ্য এ ব্যাপারে।

    মুক্তমনা হয়ে উঠুক জ্ঞান-বিজ্ঞানের দুর্বার এক আর্কাইভ।

  4. মুহাইমীন এপ্রিল 18, 2010 at 11:16 অপরাহ্ন - Reply

    শ্রদ্ধেয় প্রদীব দেব,
    আপনার লেখা পড়ে আমি অনেক নতুন কিছুই শিখছি। আইনষ্টাইন সম্পর্কে আমার জ্ঞান বেশির ভাগই আপনার “আইনষ্টাইনের কাল” পড়ে। যাই হোক একটা কথা বলি, আপনার এই লেখাগুলোতে ইংরেজী পরিভাষার অত্যাচার বেশী লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আপনার ঐ বইটিতে আপনি ব্যপক হারে ইংরেজী পরিবাষার ব্যবহার করেছেন যা বইটির এবং সাথে এই লেখাটির সর্বসাধারণের প্রবেশগোম্যতার ক্ষেত্রে এক বিরাট বাধা বৈকি। এই যেমন আপনার লেখায়ঃ
    স্পেশাল রিলেটিভি,অপারেশান,‌প্যাথোলজিস্ট্‌,অটোপ্‌সি,ব্রেন,সেক্রেটারি , ইউনিভার্সিটি , আর্কাইভ , স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি , জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি , পেপার , সায়েন্টিফিক পেপার , কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি অবজারভেটরি , রয়েল সোসাইটি , ব্ল্যাকহোল থিওরি , গ্যালাক্সি , এস্ট্রোনমার , এক্স-রে , স্ট্যাটিক , ডায়নামিক , কোয়ান্টাম মেকানিক্স , প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিইন্সটিটিউট অব এডভান্স স্টাডি। – এই পরিভাষাগুলোর বাংলা ব্যবহার করলে আপনার লেখাটি হয়তো ইংরেজী না জানা অনেক বাংলা ভাষাভাষীর দ্বোরগোড়ায় আমি পৌছে দিতে পারতাম( যে কেউ ই পারত ) ফলে লেখাটি সর্বজন পাঠ্য যেমন একদিকে হত তেমনি এর সহজ বোধ্যতাও মানুষের উপকারে আসত। আর আপনি কিছু সাময়িকীর প্রবন্ধের শিরোনাম ব্যবহার করেছেনঃ“If Einstein Were Young Again, He Says He’d Become a Plumber” , ‘the private lives of Albert Einstein’ , “Albert Einstein’s life was full of paradoxes” , “On the General Theory of Relativity” , “Explanation of the Perihelion Motion of Mercury from the General Theory of Relativity” , “The Field Equations of Gravitation” , “The Foundations of the General Theory of Relativity” , “Stationary Systems with Spherical Symmetry Consisting of Many Gravitating Masses” , Gravitational collapse of massive objects , স্ট্যানলি প্লাম্বিং এন্ড হিটিং কোম্পানি যেগুলোর ক্ষেত্রে বাংলা অনুবাদ করে বন্ধনীর ভেতর মূল ইংরেজীটা দেওয়া যেত। এই যেমনঃ ‘সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের ভিত্তি সমূহ'(The Foundations of the General Theory of Relativity) – এরকম। তাহলে জিনিষগুলো পাঠক খুব সহজেই কল্পনায় আনতে পারত ও একপ্রকার মূলানুগ ধারণা তৈরী করতে পারত বিষয়গুলো সম্পর্কে।
    আমার এরকম বেয়াদবী ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করি। অনেক ব্লগারেরই এরকম বাজে অভ্যেস দেখেছি যার কারণে তাদের লেখা সবস্তরের পাঠক পড়তে পারে না, ফলে তারা এরকম তথ্যবহুল লেখা থেকে একপ্রকার বঞ্চিতই হয় বলতে গেলে। তাদের ক্ষেত্রে কোন কারণে বলা না হলেও আপনার ক্ষেত্রে বল্লাম এই কারণে যে আপনার ঐ ‘আইনস্টাইনের কাল’ পড়ার সময়ই জিনিষটা আমার নজরে প্রকটভাবে আসে। আপনি চাইলে উক্ত বইয়ের সকল পরিভাষাগত ত্রুটি আমি সংশোধন করে তার কপি আপনার কাছে পাঠাতে পারি । বিষয়টা নজরে আনবেন এই প্রত্যাশা রাখি। আপনার প্রতি রইল একরাশ শুভকামনা :rose2:

    • প্রদীপ দেব এপ্রিল 19, 2010 at 7:39 অপরাহ্ন - Reply

      @মুহাইমীন, অনেক ধন্যবাদ। আইনস্টাইনের কাল – এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের সময় হয়ে গেছে। জানি অনেক কিছু বদলাতে হবে , হয়তো প্রকাশকও। আপনার পরিভাষা সংক্রান্ত পরামর্শ অবশ্যই মাথায় রাখবো। তবে এ ব্যাপারে আমার সামান্য একটু দ্বিমত আছে।

      প্রমিত বাংলায় বিজ্ঞান লেখাটা খুবই জরুরি তা আমি মানি। কিন্তু বিজ্ঞান বোধগম্যতার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ‘ভাষা’ প্রধান বাধা বলে আমি মনে করি না। আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি – হয়তো আপনার অভিজ্ঞতার সাথেও তা মিলতে পারে। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বাংলা ভাষায় পদার্থবিজ্ঞান পড়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি মাধ্যমে পড়তে গিয়ে দেখেছি উচ্চমাধ্যমিকে যে সব শিখেছিলাম – প্রায় সব কিছুই নতুন করে শিখতে হচ্ছে। যেমন – তাপগ্রাহিতা বা আপেক্ষিক তাপ, তাপগতিবিদ্যা, তাপসংবহন সূচক, ধ্রুপদী বলবিজ্ঞান, প্রতিসরণাংক ইত্যাদি ইত্যাদি। দেশের বাইরে পড়তে এসে অন্যান্য অ-ইংরেজী ভাষাভাষী বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের দেখে এবং পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সুযোগে একটা জিনিস শিখেছি তা হলো – বিজ্ঞানের কিছু কিছু ব্যাপার – বিশেষ করে যেগুলো আমরা আবিষ্কার করিনি – সেগুলোর প্রচলিত নামই আমাদের ব্যবহার করা উচিত। আপনি যেসব শব্দ ও বাক্যাংশের উল্লেখ করেছেন –

      স্পেশাল রিলেটিভি,অপারেশান,‌প্যাথোলজিস্ট্‌,অটোপ্‌সি,ব্রেন,সেক্রেটারি , ইউনিভার্সিটি , আর্কাইভ , স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি , জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি , পেপার , সায়েন্টিফিক পেপার , কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি অবজারভেটরি , রয়েল সোসাইটি , ব্ল্যাকহোল থিওরি , গ্যালাক্সি , এস্ট্রোনমার , এক্স-রে , স্ট্যাটিক , ডায়নামিক , কোয়ান্টাম মেকানিক্স , প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ইন্সটিটিউট অব এডভান্স স্টাডি।

      এগুলোর কয়েকটি প্রমিত বাংলায় অনুবাদ করে দেয়া যেতো মানছি। অপারেশান – অস্ত্রোপচার, ব্রেন – মস্তিষ্ক বা মগজ, পেপার, সায়েন্টিফিক পেপার – বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র মানলাম। কিন্তু স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি এবং জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটিকে যথাক্রমে আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব এবং আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব বললেই কি সর্ব-সাধারণের বোধগম্য হয়ে যাবে? কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কী পরিভাষা ব্যবহার করবেন? ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স কে আপনি যতই ধ্রুপদী বলবিজ্ঞান বা চিরায়ত বলবিজ্ঞান বা উচ্চাঙ্গ বলবিজ্ঞান নামে ডাকুন না কেন – বিষয়টা সম্পর্কে কোন ধারণা না থাকলে শুধু বাংলা শব্দ বা শব্দগুচ্ছ দিয়ে ক্ল্যাসিক্যাল মেকানিক্স বোঝানো যাবে বলে আমি মনে করি না।

      আপনি কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি অবজারভেটরি , রয়েল সোসাইটি, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ইন্সটিটিউট অব এডভান্স স্টাডি – এগুলোর বাংলা পরিভাষা ব্যবহার করার কথা বলেছেন। এগুলো কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম। আমরা নামেরও অনুবাদ করে ফেলবো? যেমন করে চায়নিজরা? তাদের কাছে ‘বাংলাদেশ’ বলে কিছু নেই – আছে ‘মইন্‌ জালা’। আমি মনে করি তাতে আমাদের বাংলা ভাষা হয়তো কিছুটা সমৃদ্ধ হবে কিন্তু আমাদের বিজ্ঞান কি খুব এগিয়ে যাবে? এক্স-রে শব্দটিও আপনার কাছে ইংরেজি শব্দ মনে হয়েছে। বাংলায় এটাকে রঞ্জন-রশ্মি বলতে দেখেছি অনেক বইতে। এখন আপনিই বলুন যিনি সামান্যতম বিজ্ঞানও জানেন না তিনি ‘রঞ্জন রশ্মি’ বললে বুঝবেন – নাকি ‘এক্স-রে’ বললে বুঝবেন? তাছাড়া যে এক্স-রে কে আমরা রজন রশ্মি বলছি – কীসের ভিত্তিতে বলছি? যিনি আবিষ্কার করেছেন তাঁর নাম উইলহেল্‌ম রন্টগেন। তিনি নিজে এর নাম দিয়েছেন এক্স-রে। তাঁকে সম্মান জানানোর জন্য অনেকে এক্স-রে কে রন্টগেন রে নামে ডাকার প্রস্তাব করেছিলেন। জার্মানিতে কেউ কেউ তা করেনও। তাঁরা যেটা আবিষ্কার করেছেন – সেটাকে তাঁরা যে-নাম দেবেন আমরা তা মেনে নেবো। কিন্তু আমরা করলাম কি – রন্টগেনকে করে ফেললাম – রঞ্জন। একজন মানুষের নাম বদলে ফেলার অধিকার কি আমাদের আছে? চিকিৎসা বিজ্ঞানে মানবদেহের প্রায় সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গের নাম কিন্তু ল্যাটিন। ওগুলো ইংরেজিতে ঢুকে গেছে। তাতে ইংরেজি সমৃদ্ধ হয়েছে। “ব্রেমহাস্টার্লাং এক্স-রে” – জার্মান শব্দ ইংরেজিতে হরদম ব্যবহার করা হ্চছে। ইংরেজি পরিভাষা আছে এর – কিন্তু তাতে সঠিক বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞ্যা বোঝা যায় না। এসব শব্দ বাংলায় ঢুকে গেলে কোন দোষ আছে? একসময় পড়েছি “দুই পরমাণু উদ্‌যান ও এক পরমাণু অম্লযান মিলে এক অণু পানি হয়” “গাছ সালোকসংশ্লেষণে অঙ্গার-দ্বি-অম্লজ নির্গমন করে”। এই সুন্দর প্রমিত বাংলা বাক্যদুটো কি সর্বসাধারণের কাছে বোধগম্য? নাকি এগুলো বোঝার জন্য একটা ন্যূনতম ভিত্তি দরকার? যদি তাই হয় তাহলে আমরা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কোন সর্বসাধারণের কথা বলছি? সাহিত্য, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বাণিজ্য সব ক্ষেত্রেই বাংলা ব্যবহার করা হলেই কি সবকিছু সহজে বোধগম্য হবে? এখানে আমি এটুকুই শুধু বলতে চাচ্ছি যে প্রত্যেক বিষয়েরই একটা নিজস্ব ভাষা আছে যা না বুঝলে বিষয়টা বোঝা যাবে না। ফাইনম্যান যেমন বলেছেন – ইলেকট্রনকে আমরা যে নামেই ডাকি না কেন – ওটা শুধু নাম। নাম দিয়ে কিছু বোঝা যায় না। বুঝতে হলে ইলেকট্রনের ধর্ম বুঝতে হবে। আমার মতও তাই। বিজ্ঞানের ধর্ম যত সহজে বোঝা যাবে ততই ভালো। এরজন্য যদি কিছু ইংরেজি শব্দ শিখতে হয় তাতে আমাদের বিজ্ঞান আরো সমৃদ্ধ হবে।

      মুহাইমীন, আমি আশা করছি আপনি আমার মূল বক্তব্যটি বুঝতে পেরেছেন। আমি অবশ্যই বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের পক্ষে। বাংলায় যে সকল শব্দ আছে যা দিয়ে বিজ্ঞানের ক্রিয়াগুলো বোঝানো যায় – আমি অবশ্যই তা ব্যবহার করবো। কিন্তু যেগুলো নাম-বাচক, যেগুলো বিজ্ঞানে প্রচলিত এবং প্রতিষ্ঠিত তা নতুন করে বাংলা পরিভাষা করলে আমার মনে হয় ব্যাপারটা আরো জটিল হয়ে উঠবে। ১টি উদাহরণ দিয়ে লেখা শেষ করছিঃ

      “আলোক কোয়ান্টার দশাস্থান কোন প্রদত্ত আয়তনের প্রেক্ষিতে h3 মানের কোষে বিভক্ত করা যায়। এই সকল কোষের অন্তর্ভুক্ত আলোককণা যা দিয়ে স্থূল-সংজ্ঞার বিকিরণ তৈরি, তার সম্ভাবনা বিন্যাস-সংখ্যাই সৃষ্টি করে এন্ট্রপি এবং সর্বপ্রকার তাপগতি সম্পর্কিত গুণ”। কিছু বোঝা গেল কি? লেখাটি কার নিশ্চয় বুঝতে পারছেন। এটা সত্যেন বসুর পৃথিবী বিখ্যাত গবেষণাপত্র “প্ল্যাংকের সূত্র ও আলোক কোয়ান্টামতত্ত্ব” এর প্রথম অনুচ্ছেদ – যা আলবার্ট আইনস্টাইন ইংরেজি থেকে জার্মানিতে অনুবাদ করেছিলেন। আর আইনস্টাইনের জার্মানি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন প্রফেসর আনোয়ারুল আজিম চৌধুরি।

      মুহাইমীন, আবারো ধন্যবাদ আলোচনার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।

      • আকাশ মালিক এপ্রিল 19, 2010 at 9:33 অপরাহ্ন - Reply

        @প্রদীপ দেব,

        দারুণ একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রদীপ দা। আমার হয়েছে মুহাইমিনের উল্টো অবস্থা। এমনিতেই বিজ্ঞানের ও বুঝিনা ( ইন্টারনেটের একজন খুব বড় আলেম আমাকে এ খেতাব দিয়েছেন) তার উপর কঠিন বাংলা ব্যবহার হলে তো উপায় নেই। ইন্টারনেটের বদৌলতে বাংলা লেখায় পদার্থ বিজ্ঞানের নামবাচক, ক্রীয়াবাচক বা গুনবাচক ইংরেজী শব্দগুলোর সঙ্গা, ব্যাখ্যা বর্ণনা পেতে মোটেই অসুবিধে হয়না। কিন্তু বাংলায় তা দুর্লভ। আসল কথা হলো সাধারণ পাঠকের কথা মনে রেখে যতদূর সম্ভব সহজ বোধগম্য ভাষায় লেখা চাই। এই যে “দুই পরমাণু উদ্‌যান ও এক পরমাণু অম্লযান মিলে এক অণু পানি হয়” “গাছ সালোকসংশ্লেষণে অঙ্গার-দ্বি-অম্লজ নির্গমন করে”।
        অথবা “আলোক কোয়ান্টার দশাস্থান কোন প্রদত্ত আয়তনের প্রেক্ষিতে h3 মানের কোষে বিভক্ত করা যায়। এই সকল কোষের অন্তর্ভুক্ত আলোককণা যা দিয়ে স্থূল-সংজ্ঞার বিকিরণ তৈরি, তার সম্ভাবনা বিন্যাস-সংখ্যাই সৃষ্টি করে এন্ট্রপি এবং সর্বপ্রকার তাপগতি সম্পর্কিত গুণ”। কিছু তো বুঝলামই না, কী যে বুঝি নাই তাও বুঝি নাই।

      • মুহাইমীন মে 7, 2010 at 9:52 অপরাহ্ন - Reply

        @প্রদীপ দেব,
        আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার মন্তব্যে সাড়া দেবার জন্যে। আপনার কথার প্রেক্ষিতে একে একে কথাগুলো বলিঃ

        দেশের বাইরে পড়তে এসে অন্যান্য অ-ইংরেজী ভাষাভাষী বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের দেখে এবং পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সুযোগে একটা জিনিস শিখেছি তা হলো – বিজ্ঞানের কিছু কিছু ব্যাপার – বিশেষ করে যেগুলো আমরা আবিষ্কার করিনি – সেগুলোর প্রচলিত নামই আমাদের ব্যবহার করা উচিত।

        এখানে আপনার কথা একশো ভাগ যুক্তিযুক্ত, তবে সেই প্রচলিত নামগুলোর যদি নিজভাষায় আরও সুন্দর ও সাবলীলভাবে কল্পনাযোগ্য কোন প্রতিশব্দ থেকে থাকে তবে অবশ্যই তা ব্যবহার করা উচিত, কারণ এক্ষেত্রে পাঠকের তা কল্পনা করা কিছুটা কম আয়াশলব্ধ হয়। বোঝাতে পেরেছি বোধ হয় ব্যাপারটা।

        ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স কে আপনি যতই ধ্রুপদী বলবিজ্ঞান বা চিরায়ত বলবিজ্ঞান বা উচ্চাঙ্গ বলবিজ্ঞান নামে ডাকুন না কেন – বিষয়টা সম্পর্কে কোন ধারণা না থাকলে শুধু বাংলা শব্দ বা শব্দগুচ্ছ দিয়ে ক্ল্যাসিক্যাল মেকানিক্স বোঝানো যাবে বলে আমি মনে করি না।

        কথা শতভাগ ঠিক। তবে পাঠকের যদি পূর্বধারণা বিষয়টি সম্পর্কে থেকে থাকে তবে বোধ করি, মাতৃভাষার শব্দ তার মর্মকে অধিকতর স্পর্শ করার শক্তি রাখে।

        আপনি কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি অবজারভেটরি , রয়েল সোসাইটি, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ইন্সটিটিউট অব এডভান্স স্টাডি – এগুলোর বাংলা পরিভাষা ব্যবহার করার কথা বলেছেন। এগুলো কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম। আমরা নামেরও অনুবাদ করে ফেলবো?

        দেখুন, আমি বলিঃ ‘বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়’ এর ইংরেজী বলেঃ ‘বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি’ । আমরা কিন্তু এর ঠিকই বাংলা অনুবাদ করে নিচ্ছি আমাদের সুবিধার্থে , তবে অন্যগুলো কেন করব না? তা করলে তো প্রতিষ্ঠানটি কি এ বিষয়ে ইংরেজী না জানা মানুষগুলো জানতে পারে ; আমার বক্তব্য হলঃ আমরা যখন কোন কিছু লিখব তা কেন বৃহত্তর জনসাধারণের কথা চিন্তা করে লিখব না? এমনও তো হতে পারে আপনার এই লেখাটা পড়ে কোন চাষার, কোন চামাড়ের, কোন মুচির উপকারে- তাঁর কল্যাণে আসছে কিন্তু ইংরেজী না জানার কারণে তাঁর কাছে লেখাটা কিছুটা দূর্বোধ্য ঠেকছে? আমার কথায় যদি কোন সার না থেকে থাকে তবে অবশ্যই বলবেন।

        আমি মনে করি তাতে আমাদের বাংলা ভাষা হয়তো কিছুটা সমৃদ্ধ হবে কিন্তু আমাদের বিজ্ঞান কি খুব এগিয়ে যাবে?

        এখানে বিজ্ঞান এগিয়ে গেল কি পিছিয়ে গেল তা আমার আলোচ্য বিষয় নয়, আমি শুধু এটুকু নিশ্চিত হলেই খুশি যে, কোন সাহিত্যকর্ম একটি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর সকল সদস্যের কাছে পৌছাচ্ছে। যদি সবার কল্যাণেই প্রবন্ধটি লিখে থাকেন তবে সেটা যেন সবার কাছে পৌছায় তা নিশ্চিত করাটা কি কর্তব্য নয়? তা লেখকের দায়িত্ব বলে মনে করি।

        তিনি নিজে এর নাম দিয়েছেন এক্স-রে।

        তিনি যেহেতু নিজে এর নাম দিয়েছেন আর যেহেতু এখানে ‘এক্স’ বলতে একটি নির্দিষ্ট ভাবার্থ বোঝানো হয়েছে তাই এক্ষেত্রে মনে করি তা পাল্টানোর কোন অবকাশ নেই।

        “ব্রেমহাস্টার্লাং এক্স-রে” – জার্মান শব্দ ইংরেজিতে হরদম ব্যবহার করা হ্চছে। ইংরেজি পরিভাষা আছে এর – কিন্তু তাতে সঠিক বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞ্যা বোঝা যায় না।

        হ্যা, এক্ষেত্রে যদি সমস্যাটা এরকম হয় যে, মাতৃভাষায় জিনিষটা বোঝাতে সক্ষম এমন শব্দের অভাব রয়েছে তবে সেক্ষেত্রে দুটি কাজ করা যেতে পারেঃ
        এক। জিনিষটিকে আমাদের মানষপটে সহজে চিত্রিত করে মাতৃভাষায় এমন সৃজনশীল নতুন শব্দের প্রচলন করা ; অথবা,
        দুই। যদি বিদেশী শব্দটির পূর্ব থেকেই ব্যপক জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি থেকে থাকে তবে তারই ব্যবহার।

        একসময় পড়েছি “দুই পরমাণু উদ্‌যান ও এক পরমাণু অম্লযান মিলে এক অণু পানি হয়” “গাছ সালোকসংশ্লেষণে অঙ্গার-দ্বি-অম্লজ নির্গমন করে”। এই সুন্দর প্রমিত বাংলা বাক্যদুটো কি সর্বসাধারণের কাছে বোধগম্য? নাকি এগুলো বোঝার জন্য একটা ন্যূনতম ভিত্তি দরকার?

        অবশ্যই নূন্যতম ভিত্তি থাকা দরকার তা না হলে তো অভিব্যক্তি অর্থহীন , আমার এ ব্যপারে কোন দ্বিমত নেই। যদি আপনি দশম শ্রেনীর পড়া দ্বিতীয় শ্রেনীর বাচ্চাকে বুঝান তা হলে নিশ্চয় তা তার কাছে পর্বতপ্রমাণ বোঝা মনে হবার কথা। আমি এটা অবশ্যই বুঝতে পেরেছি। ধন্যবাদ।

        ইলেকট্রনকে আমরা যে নামেই ডাকি না কেন – ওটা শুধু নাম। নাম দিয়ে কিছু বোঝা যায় না। বুঝতে হলে ইলেকট্রনের ধর্ম বুঝতে হবে।

        একশোভাগ একমত। কোন দ্বিমত নেই।

        মুহাইমীন, আমি আশা করছি আপনি আমার মূল বক্তব্যটি বুঝতে পেরেছেন।

        আপনার কথা আমি খুব ভালোভাবেই ধরতে পেরেছি, আমার বক্তব্য ও মনে হয় আপনার কাছে পরিষ্কার হয়েছে।

        কিন্তু যেগুলো নাম-বাচক, যেগুলো বিজ্ঞানে প্রচলিত এবং প্রতিষ্ঠিত তা নতুন করে বাংলা পরিভাষা করলে আমার মনে হয় ব্যাপারটা আরো জটিল হয়ে উঠবে।

        প্রচলিত এবং প্রতিষ্ঠিত হলে কোন বিষয়ের নতুন পরিভাষা ব্যবহারের দরকার বোধকরি না করাটাই ভাল।

        “আলোক কোয়ান্টার দশাস্থান কোন প্রদত্ত আয়তনের প্রেক্ষিতে h3 মানের কোষে বিভক্ত করা যায়। এই সকল কোষের অন্তর্ভুক্ত আলোককণা যা দিয়ে স্থূল-সংজ্ঞার বিকিরণ তৈরি, তার সম্ভাবনা বিন্যাস-সংখ্যাই সৃষ্টি করে এন্ট্রপি এবং সর্বপ্রকার তাপগতি সম্পর্কিত গুণ”। কিছু বোঝা গেল কি?

        না, কিছুই বুঝতে পারি নাই, ধন্যবাদ উদাহরণটি দিয়ে ব্যপারটি ভালভাবে বুঝিয়ে দেবার জন্য।

        লেখাটি কার নিশ্চয় বুঝতে পারছেন।

        না, এ বিষয়ে আমার পূর্বজ্ঞান ছিল না বৈকি, ধন্যবাদ বিষয়টি জানানোর জন্য।

        মুহাইমীন, আবারো ধন্যবাদ আলোচনার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।

        আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ আমাকেও আমার কথাটা পরিষ্কার করে বলতে দেবার অবকাশটুকু করে দেবার জন্য। আপনাকে লাল গোলাপের শুভেচ্ছা। :rose2:

        • মুহাইমীন মে 7, 2010 at 10:01 অপরাহ্ন - Reply

          @মুহাইমীন, আর একটি কথা বাংলা ব্লগ তৈরীর উদ্দেশ্য কিন্তু মাতৃভাষা ভাষী সকল স্তরের জনসাধারণের কাছে জ্ঞান চর্চাটা সহজ লব্ধ করা সেই কথাটা মাথায় রেখে অবশ্যই লেখককে কোন সাহিত্য কর্ম সৃষ্টির পিছনে শ্রম ঢালা উচিত। আমাদের লক্ষ্য থাকা উচিত সকল জনসাধারণ, গুটিকয় শহরবাসী শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত জনগণের তরে তা সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয় তা না হলে সমাজ থেকে কখনোই জ্ঞান বৈষম্য দূর হবে না। যে সাহিত্য কর্ম সবার কাছে পৌছানোর ক্ষমতা না রাখে তা সাহিত্য কর্ম হিসেবে কতটা স্বার্থক? বলবেন কি?
          ধন্যবাদ।

  5. ইরতিশাদ এপ্রিল 18, 2010 at 9:16 অপরাহ্ন - Reply

    খুবই চমৎকার, তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। একটানে পড়ে শেষ করলাম। মনে হলো আরো কিছু জানার ছিলো। বিবর্তন নিয়ে তো মুক্তমনায় অনেক লেখাই হচ্ছে। প্রদীপ দেবকে অনুরোধ জানাবো পদার্থবিদ্যার অগ্রগতি নিয়ে আরো লেখার জন্য। এ নিয়ে লেখার সামর্থ্য শুধু নয়, অসাধারণ যোগ্যতা আপনার আছে। আপনার ‘মেলবোর্ন’ সিরিজটাও উপভোগ করছি।
    ধন্যবাদ প্রদীপ দেবকে সুন্দর এই লেখাটার জন্য।
    আরেকটা কথা, মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয় যদিও, নিউইইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিন আর সাপ্তাহিক টাইম ম্যাগাজিনের মধ্যে আমি যতটুকু জানি মালিকানা সূত্রে কোন সম্পর্ক নেই।

    • প্রদীপ দেব এপ্রিল 19, 2010 at 6:20 অপরাহ্ন - Reply

      @ইরতিশাদ ভাই, অনেক ধন্যবাদ উৎসাহ দেয়ার জন্য। নিউইয়র্ক টাইম্‌স ম্যাগাজিন আর সাপ্তাহিক টাইম ম্যাগাজিনের মালিক যে আলাদা – এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি আমি গুলিয়ে ফেলেছিলাম। অনেক ধন্যবাদ ভুলটি ধরিয়ে দেয়ার জন্য। ইতোমধ্যে তা সংশোধন করে নিয়েছি।

  6. সৈকত চৌধুরী এপ্রিল 18, 2010 at 8:43 অপরাহ্ন - Reply

    লেখাটি পড়ে আইনস্টাইন সম্পর্কে নতুনভাবে আগ্রহী হয়ে উঠলাম। বেশ সুন্দর আর সাবলীল হয়েছে। এ বিষয়ে যদি একটা সিরিজ লেখতেন ।

    • প্রদীপ দেব এপ্রিল 19, 2010 at 6:14 অপরাহ্ন - Reply

      @সৈকত চৌধুরী, অনেক ধন্যবাদ। আইনস্টাইনের ওপর অনেক লেখা দরকার। বাংলা সাহিত্যে যেমন রবীন্দ্রনাথ তেমনি বিজ্ঞানে আইনস্টাইন। “একটি সমীকরণের জন্ম” নামে একটি রচনা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে মাথার মধ্যে।

  7. আশরাফ আহমেদ এপ্রিল 18, 2010 at 6:09 অপরাহ্ন - Reply

    আপনার আর সব বিখ্যাত লোকের জীবনী লেখার মতোই এটি চমৎকার একটি লেখা। আইনষ্টাইনের মাথায় দুটো শিং ও ব্ল্যাক হোল বিরোধিতার ব্যাপার গুলো আমার জানা ছিল না। প্রায় তিরিশ বছর থেকে অতিথি হয়ে কেউ এলে আমি অবশ্যই তাকে ওয়াশিংটন ডিসি তে US National Academy of Science বিল্ডিং এর সামনে আইনষ্টাইনের বিশাল মূর্তির কাছে নিয়ে নিয়ে যাই ও তাঁর কোলে বসিয়ে একটি ছবি তুলে উপহার দেই। সমাধি চিহ্ন না রাখার অনুরোধ (হয়তো) রাখলেও এই মূর্তিটি তাঁর প্রতি অপার ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

    • প্রদীপ দেব এপ্রিল 19, 2010 at 6:11 অপরাহ্ন - Reply

      @আশরাফ আহমেদ, অনেক ধন্যবাদ। অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরাতেও ন্যাশনাল সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি সেন্টারের সামনে আইনস্টাইনের একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। তবে ওটা ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্স বিল্ডিং এর সামনের মূর্তিটার মত অত বড় নয়।

  8. সুব্রত এপ্রিল 18, 2010 at 5:59 অপরাহ্ন - Reply

    শুভ জন্মদিন, মিঃ দেব 🙂

মন্তব্য করুন