ঢাকা শিকাগো

পর্বঃ প্রথমার্ধ

 

 

মালিবাগ মোড়ের একটু আগে, ঠিক টুইন টাওয়াররের সামনেভাবুনতো কি হতে পারে? কি আর হবে? এই জায়গাটাতে একটা জিনিসইতো হওয়া সম্ভবজ্যামের মধ্যে আটকা পড়ে রিক্সায় বসে থাকাব্যস্ত ঢাকা শহরের ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত মানুষগুলো ফুটপাতের ভীড় সরিয়ে যত দ্রুত সম্ভব ঘরে ফেরার চেষ্টা করছেঘর, ছোট্র ঘর; পানি নেই, গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই; তবু কিছু আছে, আছে ভালোবাসা; তার টানেই সব পাখি ঘরে ফিরে, সব মানুষ ঘরে ফিরে, জীবনের সব লেনদেন ফুরিয়ে দিয়ে, মিটিয়ে দিয়েসন্ধ্যার একটু আগে, দিনের আলো তখনো পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নিরাস্তার একপাশ থেকে উস্কোখুস্কো চেহারার কয়েকটা ছেলে থেমে থাকা বাসের সামনে দিয়ে রাস্তার অন্যপাশে যাচ্ছেযেমন করে অন্য আর আট-দশটা মানুষ প্রতিনিয়ত ঢাকা শহরের রাস্তা পার হয়, তারাও তেমন করে পার হয়ে যাচ্ছেআমার রিক্সার সামনে এসে একটা ছেলে পিছন ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে দেখলোমুহূর্তের মধ্যে দুইটা ছেলে আমার ঠিক সামনের সিএনজির দুইপাশে উঠে গেলোথেমে আছে সিএনজিপ্রকাশ্যে আরেকজন ধারালো ছুরি নিয়ে ড্রাইভারের পাশের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকলোসিএনজির ভিতর থেকে শুধু শুনতে পাচ্ছি, কেউ একজন ভয়ে কাতরাচ্ছে; আতঙ্কের এক তীব্র যাতনা যেন বের হয়ে আসছে মৃত্যুপথযাত্রী কোন মুমূর্ষু রোগীর ভিতর থেকে

 

আমাকে যদি স্বাভাবিক সময়ে জিজ্ঞেস করা হতো, এমন পরিস্থিতিতে আমি কি করবোআমি অবশ্যই বলতাম, যে-করেই হোক সাহায্য করবার চেষ্টা করবো, চিৎকার করে আশপাশের লোকজনকে জানাতে চেষ্টা করবকিন্তু বাস্তবতা একদমই ভিন্নকেন জানি নিজেকে খুব অসহায় মনে হলোঘটনার আকস্মিকতায় নিজেও হতবাক হয়ে যাইঅস্ত্রের মুখে হয়তো কোন যুক্তিই কাজ করে নাবুঝতে পারি আমার ভিতরে ভয় কাজ করছেকিছুক্ষণের মধ্যে রিক্সা, বাস, সিএনজি সব কিছুই আগের মত করে চলতে শুরু করলোকেউ জানতেও পারলো না, এই একটু সময়ের মাঝেই কত বড় এক অপরাধ হয়ে গেলোহয়তো একটু পরেই সেই একই ছিনতাইকারীর দল, একই জায়গায় একই ঘটনা ঘটাবে, নয়তো একটু দূরে গিয়ে ঘটাবেঘটনার বেশ কিছুক্ষণ পরও আমি আমার ভেতরকার অস্বস্তি কাটিয়ে উঠতে পারিনিঅন্যদিকে, ভুক্তভোগীরতো আসল যন্ত্রণা শুরু হয় ঘটনার পরভুক্তভোগী ব্যাক্তি খুব ভালো করেই জানে, কিছুই করবার নেইকোথাও থেকে কোনো সাহায্য পাবার আশা নেইপুলিশি সহায়তা পাবার আশা করাটাতো হাস্যকরতাই ব্যর্থতা আর অসহায়ত্ত্বের গ্লানি বুকে নিয়ে প্রতিনিয়ত মানুষজন ফিরে যায় ঘরে, ঢাকা শহরের বুকে তাদের ছোট্ট বাসায়পানি ছিল না, গ্যাস ছিল না, বিদ্যুৎ ছিল না; তবু কিছু ছিল, ছিল ভালোবাসাএমন গ্লানি আর কষ্টকর সব অভিজ্ঞতায় তিক্ত হয়ে উঠে সে অবশিষ্ট ভালোবাসাটুকুও

 

১৫ই মার্চ, ২০১০, শিকাগোবিকাল ৫টার ক্লাস করবার জন্য আমি বাসা থেকে বের হয়ে ইউনিভার্সিটি যাচ্ছিঢাকা শহরে সম্ভাব্য বিপদ এড়াতে আমরা অন্ধকার রাস্তা হয়তো এড়িয়ে চলি, ছিনতাই এর ভয় থাকে বলেকিন্তু গ্যাংস্টারদের জন্য বিশ্ববিখ্যাত বা কুখ্যাত অ্যামেরিকার শিকাগো শহর এখনো পুরোনো অভ্যাস থেকে বের হয়ে আসতে পারেনিক্রাইম অর্থাৎ অপরাধ সংঘটিত হবার জন্য এখানে দিন-রাত কিংবা আলো-অন্ধকার ব্যাপার নয়সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তার লালসালুতে লিখেছিলেন, ‘শস্যের চেয়ে টুপি বেশিশিকাগো শহরে থাকলে হয়তো তিনি লিখতেন, ‘মানুষের চেয়ে পুলিশ বেশিআমেরিকার অন্য শহরগুলোর মত এখানেও বেশিরভাগ অপরাধের কেন্দ্রবিন্দুতে তথাকথিত ব্ল্যাকমানুষগুলোএখানকার বাঙ্গালিরা এখন আর এদেরকে কালোকিংবা ব্ল্যাকবলে নাকারণ তারা ইতিমধ্যে এই শব্দগুলো শিখে ফেলেছেব্ল্যাক এর বাংলা এখন শ্যামলতাই যখন শুনবেন, ‘শ্যামলকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেলো’ –তখন চিন্তিত হবার কোন কারণ নেইকারণ এই শ্যামল আপনার দেশের সহজ সরল ভদ্র ছেলেটি নয়, ব্ল্যাকদের মধ্যকার কোন এক গর্বিত মানুষ

 

গর্বিত ব্ল্যাক বলবার কারণ আছে; কথিত আছে যে, এখানকার প্রতি চার জন ব্ল্যাকএর মাঝে তিনজনই জীবনের কোন না কোন সময় কয়েদখানায় কাটিয়েছেজীবনের কোন একটা সময় কয়েদখানায় না কাটালে সমাজে তাদের মাথা হেঁট হয়ে যায়; অনেকে ঠাট্টা করে বলেন, তারা বিয়ের জন্য পাত্রীও খুঁজে পায় নাকি-জানি, সবাই হয়তো ভাবে, ক্রাইম করতে না পারলে সংসার চালাবে কি করে? তবে যেহেতু একটা বিশেষ বর্ণের মানুষকে নিয়ে লিখছি -যদিও আমি লিখতে চাই বা না চাই এ-সত্য এড়ানো সম্ভব নয় -তাই এখানে আমি শ্রদ্ধার সাথে ব্ল্যাকদের মধ্যকার সে-সমস্ত মানুষের কথা স্মরণ করছি, যাদের কাছে সমস্ত মানবজাতিই ঋণীবস্তুত গায়ের রঙের মাঝে কিংবা একটা বিশেষ গোত্র বা বর্ণ দিয়ে ভালো-খারাপ বিচার করা যায় নাকিন্তু আমি এখানে যা বলছি সেটা কেবলমাত্র পরিসংখ্যানের বিচারে    

 

আমার বাসার পাশের স্কুলের সামনে মহামান্যদের মধ্যকার তিনজন হাঁটাচলা করছেপুলিশকে দেয়া আমার পরবর্তী বর্ণনা অনুযায়ীই আনুমানিক একজনের বয়স ২২, আরেকজনের ১৮ এবং অবিশ্বাস্যভাবে একজনের বয়স ১২১২ বছরের এক বালককে দেখে আমার ভাববার যথেষ্ট কারণ ছিলো যে, এই স্কুলছাত্রকে বাসায় নিয়ে যাবার জন্য তার অভিভাবকদের কেউই এখানে এসেছেকিন্তু সেটা ছিলো একটা বিভ্রান্ত করবার কৌশল মাত্রস্কুলছাত্র হলে শুধুমাত্র একজন স্কুলছাত্র থাকতো নাকিছুক্ষণ গলির মধ্যে হাঁটবার পরই, ১৮ বছরের ছেলেটি পিছন থেকে দৌড়ে এসে আমার সামনেক্ষণিকের জন্য আমার মনে হলো, কি ব্যাপার কানা-মাছি খেলা শুরু হয়ে গেলো না কিকিছু বুঝে উঠবার আগেই তার ছোট্ট পিস্তলটি আমার সামনে ধরে কি সব যে বলতে শুরু করলোএদের ভাষা কিছুটা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিশেষ কিছু এলাকার আঞ্চলিক ভাষার মতওদের মধ্যকার কেউ না হলে বুঝাটা কষ্টকরকিন্তু তাতে কি, বিশ্বজুড়ে অস্ত্রের ভাষাতো একটাই

 

প্রথমে পিস্তলের দিকে তাকিয়ে দেখে নিলাম খেলনা কি-না, বাংলা সিনেমায় অনেক সময় দেখেছি পিস্তলের ট্রিগার চাপ দিলে লাইটারের কাজ করছে, আর মহানায়ক সেটা দিয়ে সিগারেট ধরাচ্ছেইদানিংতো আবার দেখি পিস্তলের ট্রিগার চাপলো, আর সাথে সাথে বের হয়ে আসলো কাঁটালাগা…’, এমপিথ্রি প্লেয়ারকিন্তু সেটা হবার কোন কারণ নেই, এখানে অনলাইনে পিস্তলের বিজ্ঞাপণ দেখেছি, মাত্র ২৫ ডলারঅতএব চালাকি করবার চিন্তা করাটাই বোকামিখুব দ্রুত চিন্তা করে বের করার চেষ্টা করলাম, এমন পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ কি করণীয় হতে পারেচিন্তা ভাবনা করে বীরপুরুষের মত তাকে বললাম, ‘সবকিছু দিয়ে দিচ্ছি, একেবারেই কোন সমস্যা নেই, শুধু আমার আইডি গুলো নেবার দরকার নেইবারবার বললাম, ‘তোমার কোন সমস্যাই নেই, আমি কোন ধরণের সমস্যাই সৃষ্টি করবো নাআসলে সত্যিকারের অনুবাদ করলে কোনভাবেই বাক্যটা তোমার কোন সমস্যাই নেইহবে না, বাক্যটা হবে মহারাজ, আপনার কোন সমস্যাই নেই, সব নিয়ে যান, চাইলে আমি আপনার বাসায়ও দিয়ে আসতে পারিঅত্যন্ত উচ্চবংশীয় এবং কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন এই মহান ছিনতাইকারী আমার মানিব্যাগ থেকে খুঁজে শুধু ৩৭ ডলার নিয়ে নিলোসে পকেটে খুঁজে দেখবার আগেই আমি কিন্ডার গার্টেনের বালকের মত আমার নিজের মোবাইল সেট খানা হুজুরের নিকট সমর্পণ করলামমনে পড়ে গেল, আমার পরিচত এক বড়ভাইকে উস্কো খুস্কো চেহারার এক যুবক গ্রিন রোডের ফুটপাথে জিজ্ঞেস করেছিলো, “ভাই, কয়টা বাজে?” সেই বুদ্ধিমান বড়ভাই কথা না বাড়িয়ে, কালক্ষেপণ না করে, নিজ হাতে ঘড়ি খুলে সেই যুবকের হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘ধরেন নিয়ে যানসেই যুবক কিছুই বুঝতে না পেরে শুধু বোকার মত তাকিয়ে থেকেছিলোকারণটা কিছুই নয়; এই বড়ভাই আরো বেশ কয়েকবার ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিলো যার প্রতিটা ঘটনার শুরুই, ‘ভাই কয়টা বাজেদিয়ে    

 

বড়জোর ১৮বছরের বালক এমনসব করছে, আমার কিছুটা হাসিই পেলসে আমার সবগুলো পকেট, আমার ব্যাগের ভিতরে সব কিছু খুঁজে দেখলোবাকী দুজন সামনেই আসলো নাপুরো ঘটনার পর, তিনজন মহান ছিনতাইকারী বীরের মত হেঁটে চলে যাচ্ছিলোযাওয়ার সময় আমি শুধু বললাম, ‘সেল ফোনটা তোমাদের কোন কাজে আসবে না, সেটা কি দিয়ে দেয়া যায়বিনিময়ে তারা এফদিয়ে শুরু বিখ্যাত সেই চার অক্ষরের ইংরেজী শব্দটা দিয়ে হরেক রকমের বাক্য রচনা করে আমাকে উপহার দিতে লাগলতারা যাচ্ছে আমি পিছন থেকে তাকিয়ে আছি, কিছুক্ষণ পর দেখলাম ১২ বছরের বালক শুধু পিছনে ফিরে তাকালো, কি ছিলো তার মনে? কি সে ভাবলো? শৈশব পার হতে না হতেই তার ক্রাইমের সাথে জড়িয়ে পড়াঅপরদিকে এই তিনজন জানতেও পারলো না, ঘটনার পর-পরই অনাবিল আনন্দে আমার মন ভরে গেলোকারণ প্রতিদিন আমার ব্যাগে ল্যাপটপ থাকলেও সেদিন বাসা থেকে বের হবার সময় নিব নিব করেও ব্যাগে করে ল্যাপটপটা নেওয়া হয়নিদ্বিতীয়ত, ব্যাগের ভিতরে থাকা ছোট পকেটে সনি ডিজিটাল ক্যামেরা সমস্ত ব্যাগ খুঁজেও মহান অন্ধ ছিনতাইকারী পায় নিঅবধারিতভাবেই পরবর্তী পদক্ষেপই হচ্ছে ৯১১-এ কল করা, পুলিশি সাহায্য চাওয়া, যেটা বাংলাদেশে নেই

 

আমি হিসেব করে দেখলাম সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ কি করে আরো কমানো যায়পুলিশকে ডাকা মানে আমার ক্লাসটা মিস্ক্লাস মিস্ করা কোন ঘটনা না, বরং আমার অন্যতম প্রিয় শখগুলোর মধ্যে একটিঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি ৬০% সময় ক্লাস করে নষ্ট করেছিএ ভুল যত পারা যায় কম করা উচিৎক্লাসটা আবার আমার পিএইচডি তত্ত্বাবধায়কেরযেই প্রফেসরের তত্ত্বাবধানে আমি পিএইচডি করবার অপচেষ্টায় লিপ্ত আছিতিনি নিজে পিএইচডি সম্পন্ন করেন আমার জন্মেরও দশ বছর আগেজোর সম্ভাবনা আছে আমার পিএইচডি সম্পন্ন হবার আগেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করবেনএখানকার একদল সিনিয়র ঠাট্টা করে বলেন, আমার নাকি পিএইচডির একটা ইন্স্যুরেন্স করিয়ে রাখা উচিৎ, কখন তিনি নাই হয়ে যানকিন্তু অন্যদল আবার মনে করেন যেহেতু চাইনিজ লোকজনের কই মাছের প্রাণ সেহেতু বরং সম্ভাবনা আছে তাঁর আগে আমার ইহলোক ত্যাগ করবারকে কখন ইহলোক ত্যাগ করি, সেই আশংকায় আমার ক্লাসটা মিস্ করতে ইচ্ছে হলো না

 

 

ভদ্রলোক প্রফেসর ক্লাসে এসে বোর্ডের এপাশ থেকে ওপাশে লিখতে শুরু করেন; আমাদের কাজ হচ্ছে সেগুলো খাতায় তুলে খাতা ভরিয়ে ফেলাক্লাস শেষ করে আমার ভিয়েতনামী বন্ধু অ্যান হুই বুই’, এর কাছ থেকে সেল ফোনটা নিলামতারপর ৯১১ কল করে ঘটনার হালকা বর্ণনা আর নিজের অবস্থান জানানোক্ষণিকেই দেখি, বিকালের শান্ত-সৌম্য পরিবেশটা নস্যাৎ করে দিয়ে, লাল-নীল বাতির নাচন তুলে, আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে, চতুর্দিকের সব রাস্তার সমস্ত গাড়ী দাঁড় করিয়ে দিয়ে, তারা আসছে আসছে সমস্ত অ্যামেরিকার বিখ্যাত শিকাগো পুলিশ

 

দ্বিতীয়ার্ধ

(চলবে…)

     

[email protected]

April 09, 2010

 

[55 বার পঠিত]