হজরত আয়েশার (রাঃ) সাথে এক রজনী

আকাশ মালিক

৪র্থ পর্ব-

– আয়েশা আপনি বলেছেন, তেরো সতীনের ঘরে আপনিই একমাত্র মহিলা, যার নবীজীর সাথে বিয়ের আগে অন্য কারো সাথে বিয়ে হয়নি। কোরানের আত-তাহরিম সুরাটি যার কারণে রচনা করা হলো, তাঁকে আপনি নিশ্চয়ই চিনেন।
– কে? সেই ক্রীতদাসীর কথা বলছেন? ওর নাম শুনলে আমার গা ঘিনঘিন করে। একটা কেনা বাঁদী। দাসী হয়ে কোরায়েশ বংশের বউ হওয়ার সাধ জেগেছিল।
– তার নামটা কি ছিল?
– ম্যারিয়া কিবতিয়া। মিশরের বাদশাহর একজন খৃষ্টান দাসী।
– তিনিও কি আপনার মতো সতী, অবিবাহিত ছিলেন, বিধবা কিংবা তালাক প্রাপ্তা ছিলেন না?
– ওর আবার সতী-অসতীর কী আছে? ওরা তো যার কাছে বিক্রী হয় তারই সম্পদ। ম্যারিয়া খুবই অহংকারী ছিল, বলতো- তার কুঁকড়ো চুলের মতো সুন্দর চুল নাকি আর কারো নেই। ১৮ বছর বয়সে এসেছিল ৬০ বছরের মানুষের ঘর করতে। হাফসার মুখ থেকে তার কেলেংকারী ঘটনা শুনার পর বমি করতে ইচ্ছে হয়। আমি হলে তো আত্মহত্যা করতাম। সংসারে এসে একটা বাচ্চাও দিয়ে দিল।
– আয়েশা, এখানে ম্যারিয়ার কী দোষ? বেচারী ম্যারিয়া একজন ক্রীতদাসী, তার তো কিছু করার ক্ষমতা নেই। আপনি খামোখাই তার উপর রাগ করছেন।
– তো, আমি কি আল্লাহ, আল্লাহর রাসুলের উপর রাগ করবো? আল্লাহ, আল্লাহর রাসুলকে দোষারুপ করবো?
– না, না, তওবাহ, তওবাহ, নায়ুজুবিল্লাহ, তা করবেন কেন? আচ্ছা বলুন, তাঁর মধ্যে এমন কী বিশেষ ব্যক্তিত্ব ছিল যে তাঁকে নিয়ে আল্লাহকে কোরানের পাতায় দু-কলম লিখতে হলো?
– আল্লাহর মুখ থেকে শুনতে চান, না আমার কাছ থেকে?
– আল্লাহর মুখ থেকেই শুনা যাক।
– কোরানের ৬৬ নং সুরা আত-তাহরিমের ১ থেকে ৫ পর্যন্ত আয়াতগুলো দেখুন-(আয়াত ১)- হে নবী, আপনি কেন তা হারাম মনে করবেন, যা আল্লাহ আপনার জন্যে হালাল করে দিয়েছেন, আপনি কেন আপনার স্ত্রীগনকে খুশী রাখতে চান? আর আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়াময়।
– বুঝলাম না, এই আয়াতের সাথে ম্যারিয়ার কী সম্পর্ক? এখানে বলা হচ্ছে, নবীজী প্রথমে একটা হারাম জিনিসকে হারামই মনে করেছিলেন, শেষে আল্লাহর কথায় মাইন্ড চেইঞ্জ করেছেন।
– প্রথমে হারাম মনে করেছিলেন আমাদের প্রতিবাদে।
– কিন্তু বস্তুটা কী? নবী মনে করেন হারাম, আর আল্লাহ মনে করেন হালাল, সে জিনিসটা কী? আর আপনারাই বা কিসের প্রতিবাদ করেন?
– জিনিসটা ঐ দাসী ম্যারিয়া কিবতিয়া।
– তো, এখানে হালাল হারামের কী আছে?
– ম্যারিয়ার সাথে নবীজীর সম্পর্ক হালাল না হারাম তা দেখতে হবে না? আল্লাহ এসে এ সম্পর্ক হালাল না করে দিলে তো আমরা কোন সময়ই চুপ থাকতাম না।
– আচ্ছা, শেষ পর্যন্ত আপনারা তাদের সম্পর্ক মেনে নিয়েছিলেন বুঝি?
– নাহ। আমি মানি নাই। শুধু আমি নয়, নবীর সকল স্ত্রীগনের সম্মিলিত প্রতিবাদের মুখে নবী বাধ্য হয়েছিলেন ম্যারিয়াকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে। লোকমুখে রটনা আছে সেই জায়গার সাথে তার বাচ্চা জন্ম দেয়ার সম্পর্ক আছে।
– কী ছিল বাচ্চাটার নাম?
– ইব্রাহিম।
– আচ্ছা বাচ্চাটার কথা পরে শুনবো, আগে বলুন তারপর কী হলো?
– দেখুন (আয়াত ২)- আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন তোমাদের জন্যে শপথ থেকে মুক্তির উপায়, আর আল্লাহ তোমাদের রক্ষাকারী আর তিনি সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।
– ‘শপথ থেকে মুক্তি’ কথাটার শানে নুজুল কী? কিসের শপথ আর কার সাথে শপথ ভাঙ্গাভাঙ্গি?
– হ্যাঁ, এখানেই তো আসল ঘটনা। পরের আয়াতগুলো পড়ে নিন, তখন ঘটনা বুঝতে সুবিধে হবে। (আয়াত ৩)- নবী যখন তাঁর এক স্ত্রীকে গোপনে একটি কথা বললেন, আর সে নবীর গোপন কথা অন্যকে বলে দিল, আল্লাহ নবীকে সে কথা জানিয়ে দিলেন। নবী তার স্ত্রীকে সে কথার কিছু বললেন আর কিছু গোপন রাখলেন। স্ত্রী বললো আপনাকে কে বলেছে, নবী বললেন, তিনি বলেছেন যিনি সর্বজ্ঞ, সবজান্তা।
– নবী কার কাছে গোপন কথা বললেন, সে’ই বা কার কাছে কী বলে দিল, কোনো নাম ধাম নাই কেন? আর গোপন কথাটাই বা কী? আয়েশা এখনো ঘটনার কিছুই তো বুঝলাম না।
– নবী যার কাছে গোপন কথা বলেছিলেন, তার নাম হাফসা। হাফসা যার কাছে নবীর গোপন কথা বলে দিয়েছিলেন, সে আমি আয়েশা। আর গোপন কথাটা হলো দ্বিতীয় আয়াতে উল্লেখিত শপথ। এক কাজ করুন, বাকি দুটো আয়াত একসাথে পড়ে নিন। কোরান পড়ে আপনি এ ভাবে ঘটনা বুঝবেন না, কারণ আপনি তো আর ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন না। আর কোরানে ব্যক্তির নাম, ঘটনার স্থান, সময় সাধারণত উল্লেখ থাকেনা। আমি পরে আপনাকে সবগুলো আয়াতের তাফসির বলে দেবো। পড়ুন (আয়াত ৪)- তোমরা দুজনে ইতোমধ্যে অন্যায় করে ফেলেছো, যদি তওবাহ করে সংশোধন হয়ে যাও তবে ভাল, আর যদি তোমরা নবীর বিরুদ্ধাচরণ করো, নবীর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনায় একে অপরকে সাহায্য করো, তবে মনে রেখো নবীর সাহায্যকারী আছেন আল্লাহ, মুমিনগণ, জিব্রাইল ও আসমানের সকল ফেরেস্তা। (আয়াত ৫)- আজ যদি নবী তোমাদেরকে তালাক দেন, কাল হয়তো আল্লাহ নবীকে তোমাদের চেয়ে উৎকৃষ্ট, আত্মসমর্পিতা, বিশ্বাসিনী, অনুতাপকারিণী, বিনয়বণিতা, উপাসনাকারিণী, আজ্ঞাবহ, বিবাহিতা কিংবা কুমারী নারী দিবেন।
– আয়েশা, শেষের আয়াত পড়ে আমার মনে হচ্ছে ঘটনাটা তো মারাত্বক। আল্লাহ আপনাকে অন্যায়কারী বললেন? পরে একেবারে তালাক দেয়ার হুমকি, আমার তো ভয় লাগছে, বিষয়টা কী?
– সম্পূর্ণ ঘটনাটাই তাহলে শুনুন- আমার স্বামী মুহাম্মদ মাঝেমাঝে বিভিন্ন দেশের বাদশাহ বা শাসনকর্তার কাছে ইসলাম গ্রহনের দাওয়াতপত্র পাঠাতেন। এমনি একখানি পত্র, হাতেব বিন আবি বালতাহ’র মারফত মিশরের বাদশাহ আল্ মোকাকাস এর কাছে পাঠালেন। বাদশাহ পত্র উত্তরে জানালেন যে, তাদের নিজস্ব ধর্ম আছে, আপাতত অন্য কোন ধর্ম গ্রহন করার ইচ্ছে নেই তবে পরে বিবেচনা করা যেতে পারে। দাওয়াত-নামার সৌজন্য স্বরুপ বাদশাহ মোকাকাস, নবীকে অল্প বয়সী সুন্দরী যুবতি দুই সহোদর বোন ক্রীতদাসী উপহার দিলেন। একজনের নাম ম্যারিয়া অপরজন শিরীন। ম্যারিয়া ছিল শিরীনের চেয়ে অপেক্ষাকৃত সুন্দরী। শিরীনকে নবীজী তাঁর ফেভারেইট কবি হাসান বিন তাহবিত আল্ আনসারীকে দিয়ে দিলেন আর ম্যারিয়াকে রাখলেন নিজের জন্যে। প্রথমে দাসী ম্যারিয়াকে নবীজী ঘরে না তুলে হারিতা বিন আল্ নোমানের ঘরে রেখেছিলেন। সেই ঘরে নবীজীর ঘন ঘন যাওয়া আসা যে, আমার গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে আমি তা সকলকে জানিয়ে দিয়েছিলাম। একদিন নবী হাফসাকে বললেন যে, তার বাবা ওমর নাকি তার সাথে দেখা করতে চেয়েছেন। হাফসা তার বাবার সাথে দেখা করতে বাপের বাড়ি চলে গেলেন, আর ঐ দিন ম্যারিয়া হাফসার ঘরে আসে। হাফসা বাপের বাড়ি গিয়ে জানতে পারেন, তার পিতা তার সাথে সাক্ষাতের আশা করেন নি এবং তিনি বাড়িতেও নেই। হাফসা ততক্ষনাৎ নিজ ঘরে ফিরে আসেন। উল্লেখ্য, ঐ দিন রাতে নবীকে হাফসার ঘরে রাত কাটানোর তারিখ ছিল। ঘরে ফিরে হাফসা ম্যারিয়াকে তার বিছানায় দেখতে পান। নবীজী দরজার সামনে বেরিয়ে এলেন। হাফসার মাথায় ততক্ষণে আগুন চড়ে গেছে। চিৎকার করে নবীকে ধমক দিয়ে হাফসা বলেন, ‘আমার বিছানায় এ সব হচ্ছেটা কী’? নবীজী হাফসাকে শান্ত থাকার অনুরুধ করে বলেন, ‘হাফসা তুমি যদি ঘটনা কারো কাছে প্রকাশ না করো, তাহলে আমি শপথ নিলাম এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর হবেনা’। হাফসা সবকিছু বিস্তারিত আমার কাছে বলে দেন। ঘটনার এখানেই সমাপ্তি হয়ে যেতো, কিন্তু পরে শুনা গেলো কুঁকড়ো চুলি অত্যাধিক ফর্সা রঙ্গের ম্যারিয়াকে আল্লাহর পছন্দ লেগে গেছে। আল্লাহ নবীকে শপথ ভাঙ্গার আদেশ দিলেন। তারপর যা হবার তা’ই হলো। আমাদেরকে অন্যায়কারী বলা হলো, তালাকের ধমক দেয়া হলো। এই হলো হারাম হালাল ও শপথ ভাঙ্গাভাঙ্গির শানে নুজুল।
– এতো তাড়াতাড়ি একটা হারাম জিনিস হালাল হয়ে গেলো, আর আপনি কিছু বললেন না?
– আমার সেই বয়সে, সেই সময়ের বাস্তবতায়, সেই অবরোদ্ধ পরিবেশে, সেই সীমাবদ্ধতায় আমার কতোটুকু করারই ছিল? তবুও বলেছি, ‘নবীজী আপনাকে খুশী করতে দেখছি আকাশ থেকে আপনার আল্লাহর ওহী পাঠাতে খুব একটা দেরী হয়না ’।
– অথচ আপনার ব্যাপারে আল্লাহর ওহী পাঠাতে কতোই না দেরী হলো।
– আমার ব্যাপারে মা’নে?
– ঐ যে, লোকে আপনাকে অসতীর অপবাদ দিয়েছিল। থাক, আমরা তা নিয়ে একটু পরে আলোচনা করবো। ম্যারিয়ার বিষয়ে আরেকটু জানার বাকী রয়ে গেছে। আয়েশা, আপনি বলেছিলেন, আপনাদের প্রতিবাদের মুখে ম্যারিয়াকে নবীজী অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছিলেন এবং লোকমুখে রটনা আছে যে, সেই জায়গার সাথে তার বাচ্চার জন্মের সম্পর্ক আছে। বিষয়টা একটু খোলাসা করবেন?
– শুনা যায় ম্যারিয়ার এক ক্রীতদাস বয়ফ্রেন্ড ছিল। ম্যারিয়া যে জায়গায় থাকতো, ক্রীতদাস যুবকটাও সে জায়গায় যাওয়া আসা করতো। খবরটা যখন নবীজীর কানে পৌছুলো, তিনি তাঁর জামাতা আলীকে নির্দেশ দিলেন ঐ যুবককে মেরে ফেলতে। আদেশ পেয়ে আলী তলোয়ার হাতে ঐ জায়গায় উপস্থিত হলেন। আলীকে দেখে যুবকটি একটি খেজুর বৃক্ষের উপরে উঠে যায়। সে পরনের কাপড় উপরে উঠিয়ে আলীকে তার লিঙ্গ দেখায়ে ইশারায় বলে যে, সে নপুংষক। তা দেখে আলী তাকে ক্ষমা করে দেন।
– সর্বনাশ! এ তো দেখি আরেক গুরুতর অবস্থা। তাহলে নবীর একমাত্র ছেলে ইব্রাহিমের পিতা নিয়ে মানুষের সন্দেহ ছিল? এখানে একটা পারসোন্যাল প্রশ্ন করি আয়েশা, মনে কিছু নিবেন না। বিবি খাদিজার পরে কমপক্ষে বারোজন নারী নবীর সংসারে এসেছিলেন। আপনার কি মনে হয় তারা সকলেই বন্দ্যা বা সন্তান জন্ম দানে অক্ষম ছিলেন?
– না, তাদের অনেকেরই একাধিক সন্তান ছিল।
– আচ্ছা ম্যারিয়ার বয়ফ্রেন্ড ঐ যুবক বুঝলো কি ভাবে যে, আলী তাকে হত্যা করতে আসছেন? আলীই বা কিভাবে খেজুর গাছের উপরে বসা তার লিঙ্গ দেখে বুঝলেন যে সে নপুংষক? আর কোন কারণ ছাড়া নবীজী যুবকটাকে হত্যার আদেশ দিবেন কেন?
– আপনার এ সকল প্রশ্নের উত্তর দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা শুনেছি, নবী বলেছেন, একদিন জিব্রাইল এসে নবীকে এ ভাবে সম্বোধন করেছিলেন- ‘আসসালামু আলাইকুম ইয়া আবি ইব্রাহিম ‘ – ইব্রাহিমের বাবা, আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হউক’। এর চেয়ে ভাল বার্থ সার্টিফিকেট আর কী হতে পারে?
– আয়েশা আপনি এক্রোমগালী (Acromegaly) বা Hormonal disorder রোগের নাম শুনেছেন?
– না তো। ওটা কী?
– আমার মনে হয় আপনার স্বামী মুহাম্মদ, খাদিজা পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ শেষ বয়সে ঐ রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
– আমাদের সময়ে তো চিকিৎসা বিজ্ঞান এতো অগ্রসর হয়নি। আমরা তা পরীক্ষা করতাম কী ভাবে?
– ঠিকই বলেছেন। আয়েশা এবার আমরা কোরানের সুরা আহ্জাব নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করবো।
– বিবি জয়নাবের কাহিনী?
– জ্বী, আপনার বাবার মতো জ্ঞাণী গুণী বুদ্ধিমান পুরুষ নবীজীর জীবনে এবং ইসলামের ইতিহাসে অনেক অনেক খ্যাতিমান পুরুষ এসেছেন, কারো নাম কোরানে স্থান পায়নি। জয়নাবের স্বামী যায়েদের নাম আল্লাহর পাক মুখে উচ্চারিত হলো কোরানে, এর কোন নির্দিষ্ট কারণ কি আছে?

চলবে-
৫ম পর্ব
১ম পর্ব-
২য় পর্ব-
৩য় পর্ব-

[662 বার পঠিত]