কোথায় আমাদের ঘৃণার উৎস?

 

 

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামীদের ফাঁসি হলোসংবাদপত্রগুলো পারলো না শুধু দিনে দুটো করে এডিশান বের করে, সেই মহা আনন্দের সংবাদ তারায় তারায় রটিয়ে দিতেআকাশে বাতাসে শুধু আনন্দ, বাংলার ঘরে ঘরে আনন্দবিভিন্ন দলের নেতা কর্মীরা মিষ্টি বিতরণ করে উৎসব করলোকিশোর-যুবক-তরুণ-বৃদ্ধ সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো, যেন তাদের বুকের উপর থেকে বিশাল এক পাথর সরে গেলতাহলে এতদিন কি বিশাল সেই যন্ত্রণার পাথর বুকে চেপে ধরে তারা জীবন-যাপন করছিলো? সত্যিই কি তাই? না-কি রাজনীতি আর ইতিহাসের তীব্র খেলায় পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে অভিনয় করে যাওয়া জনগন নামের সস্তা অভিনেতা-অভিনেত্রীরা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হয়ে যাচ্ছে নির্দেশকের নির্দেশে? না-কি আমাদের আবেগ-অনুভূতি আমাদের অজান্তেই নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে রঙ্গমঞ্চের পরিচালক-পরিচালিকাদের ইচ্ছায়?

 

অপরাধের শাস্তি হবে, যে-কোন সভ্য সমাজেই সেটা হয়ে থাকেকিন্তু যে উচ্ছ্বাস আমরা প্রকাশ করছি সেটা কি আমাদের ভেতর থেকে আসছে? না-কি আর সবার মত উচ্ছ্বসিত হবে বলে, টিভি চ্যানেলের গৃহপালিত লোকগুলো, যারা আলোচনা অনুষ্ঠান করে থাকে, তাদেরকে উচ্ছ্বসিত দেখে আমরাও উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়বো? আমরা কি একবারও ঘুমিয়ে পড়বার আগে ধীরে-সুস্থে চিন্তা করে দেখেছি, আমরা কি চাই? বৃদ্ধ লোকগুলোকে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ফাঁসির মঞ্চে, দেয়া হচ্ছে ফাঁসি, তাতে কি আমাদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা উচিৎ? প্রচলিত বিচার-বিধান অনুযায়ী তাদের ফাঁসি হবে, আপত্তি নেই, কিন্তু তারা কি একটুও সমবেদনা পেতে পারতোনা আমাদের কাছ থেকেতাহলে কি অর্থ রইল বঙ্কিমের সেই বাক্যেতুমি অধম, তাই বলিইয়া আমি উত্তম হইবো না কেন?” “দণ্ডিতের সাথে দণ্ডদাতা কাঁদে, সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার”- কি অর্থ রইলো এই বাক্যের।

 

আমরা কি নিজেদের জিজ্ঞেস করে দেখেছি, আমরা কি সত্যিই তাদেরকে ঘৃণা করতাম? নাকি আমরা অন্ধভাবে বিশ্বাস করে গিয়েছিলাম, মুখস্ত করে রেখেছিলাম,আমরা তোমাদের ঘৃণা করিআজকাল মিডিয়া আমাদের জীবনকে এত বেশি পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে যে, আমাদের আবেগ-অনুভূতি-ঘৃণা-ভালোবাসা কবে হবে কোথায় হবে, ১৪ই ফেব্রুয়ারী না ১৫ই আগস্ট হবে, সেটাও তারা ঠিক করে দেয়প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় খবর আসছে বখাটেদের অত্যাচারে আত্মহত্যা করেছে স্কুলছাত্রীএকের পর একআমাদের এত এত মেজর, কর্নেল, এসপি, সাদা-কালো পুলিশ, বুদ্ধিজীবী, কলামিস্ট, সুশাসনকামী নাগরিক কেউই কি কিছু করতে পারছেন নাকিছু মানুষের ফাঁসির জন্য আমাদের বুকে ঘৃণার পাথর জমে উঠেছিলো, তাদের ফাঁসি হবার পর সেই পাথর সরে গেলে আমরা উল্লাস করেছি, সোল্লাসে গর্জে উঠেছি, আমাদের অবুঝ শিশুরা আমাদের জিজ্ঞেস করেছে, ‘কেন তোমরা উল্লাস করছো?আমরা বলেছি, ‘ওদের ফাঁসি হয়েছে তাইতার পর অবুঝ শিশু জিজ্ঞেস করেছে, ‘ফাঁসি কি?আমরা আর বলতে পারি নিসেই অবুঝ শিশুর কাছ থেকে হঠাৎ কি একটু লজ্জাও পাইনি আমরা? বখাটেদের অত্যাচারে নিতান্তই অর্থহীণভাবে যখন কিশোরী মেয়েগুলো একের পর এক আত্মহত্যা করে যাচ্ছে, তখন কতটুকু ঘৃণার সঞ্চার হচ্ছে আমাদের ভিতর? নাকি এখনো আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আমাদের নেতা-নেত্রীদের জন্য, তাদের মনে ঘৃণার উদ্ভব ঘটলে তারপর আমরাও ঘৃণা করতে শুরু করবোজগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিবাহিতা ছাত্রী, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে, বিশ্ববিদ্যালইয়ের মূল ফটকে সবার সামনে প্রকাশ্যে, এক ছাত্রলীগ কর্মী চুলের মুঠি ধরে তাকে চড়, থাপ্পড় মারে (প্রথম আলো, এপ্রিল ০৪, ২০১০)শুধু এই ঘটনার জন্যই বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় এক সাথে বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিৎ ছিলতারেক জিয়ার মুক্তির দাবীতে যদি দিনের পর দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থা চলতে পারে, তবে এই ঘটনায় কেন পারবেনা? পারবেনা, জানি পারবেনাকারণ তারেক জিয়া কিংবা জয় মামার কিছু হলে আমাদের ঘরে ঘরে আগুন জ্বলে, আমাদের গায়ে জ্বালা ধরে যায়, ঘেন্না ধরে যায় দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি, সমাজের প্রতিকিন্তু একটা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ের চুলের মুঠি ধরে চড়, থাপ্পড় মারলে কি এমন ক্ষতি হয় রাষ্ট্রের কিংবা সমাজের? বড় জোর কাজটা ঠিক হয়নিএরকম একটা মত প্রকাশ করেই আমরা দায়িত্ব শেষ করি  

 

যুদ্ধাপরাধী! ব্যাক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, কিছু কিছু যুদ্ধাপরাধীদেকে মানুষ ঘৃণা করে না, ঈর্ষা করেতাদের প্রতি মানুষের ক্ষোভ যুদ্ধাপরাধের জন্য নয়, বরং এই জন্য যে, তারা ভালো অবস্থানে আছে, এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদেও অধিষ্ঠিত আছেবস্তুতঃ, এই যুদ্ধাপরাধীরা যদি অত্যন্ত মানবেতর জীবন-যাপন তথা দুঃখ-কষ্টে দিনাতিপাত করত, তাহলে তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া যেতকিন্তু যেহেতু তার বহাল তবিয়তে আছে , সেহেতু তাদেরকে ক্ষমা করা যায় না, ক্ষমা করার যে আর কোন উপায় নেই, তাদের বিচার হওয়া উচিৎআপনি যুদ্ধের সময় অপরাধও করবেন, আবার সুখেও থাকবেন তা-তো হবে নাজিততে যদিও না পারি, তবু আমরা হারবো নাতাই তাদের প্রতি ঘৃণায় আমাদের নাওয়া-খাওয়া হারাম হয়ে গেছেমনে রাখবেন, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে বেড়ালেও আমাদের অনুভূতির কোন পরিবর্তন হয় না; আমাদের অনুভূতির সাইক্লোন শুরু হয় যুদ্ধাপরাধীদের টয়োটা গাড়িতে চড়তে কিংবা সুখের সংসার করতে দেখলে

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ কর্মী হত্যার ঘটনায় সমস্ত দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলোকারণে-অকারণে ছাত্রশিবির এবং জামায়াত নেতা কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হতে থাকলো; কোন রকমের বাচ-বিচার ছাড়াইএটা সম্ভব হলো তারা অপেক্ষাকৃত দূর্বল দল বলেছাত্রদলের কেউ যদি একই ঘটনা ঘটাতো তাহলে রাষ্ট্রের বাবারও ক্ষমতা ছিলো না এভাবে ঢালাওভাবে গ্রেপ্তার কিংবা হয়রানি করবারযে বা যারা খুনি, তাদেরতো দল নেই, থাকতে পারে নাছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাও খুন করছে, ছাত্রদলের নেতা কর্মীরাও করছে, ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরাও করছেকিন্তু খুন করবার পর তাদের সবাই একই গোত্রেরতাদের পরিচয় খুনীকোন দলের মূলনীতিতেতো মানুষ খুন করবার কথা লেখা থাকে নাখুনীদের কর্মের জন্য একটা দলকে দায়ী করা যায় কি করে? দলের প্রধান জড়িত থাকলেও দলকেতো দায়ী করা যায় না, দলের প্রধানকে দায়ী করা যায়যদি দায়ী করা যায়, তাহলে একইভাবে বি,এন,পি কিংবা আওয়ামীলীগকেও দায়ী করা যাবেএকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে, সেটাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে, সমস্ত দেশে অভিযান চালিয়ে হয়রানি করাটা নিশ্চিত করে অন্যায়কোনো একটি দল বা গোত্র যদি বুঝতে পারে তাদের উপর অন্যায় করা হচ্ছে, তাদের ব্যাপারে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে, তারা যদি বুঝতে পারে তাদেরকে দমন করার চেষ্টা করা হচ্ছে; তাহলে তাদের হিংস্র হয়ে উঠবার সম্ভাবনা থাকে, যেটা রাষ্ট্র সমাজ জনগণ কারো জন্যই শুভকর নয়

 

ধর্মভিত্তিক রাজনীতি! আমি যতদূর বুঝতে পারি, কিছু ধর্মে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইঙ্গিত দেয়া আছেঅতএব, সে-ধর্ম পালনকারীদের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা অযৌক্তিক কিছু নয়সমস্যাটা রাজনীতিতে নয়, সমস্যাটা হয়তো ধর্ম জিনিসটার মধ্যেতাই নিষিদ্ধ কোনটা হওয়া উচিৎ সেটা বুঝবার জন্য মহাজ্ঞানী হবার প্রয়োজন নেইআপনি যদি বলেন ধর্ম থাকুক, কিন্তু ধর্মভিত্তিক রীতিনীতি না থাকুকসেটা খানিকটা বাংলাদেশ ক্রিকেট টীম থাকুক, কিন্তু ক্রিকেট খেলাটা না থাকুকএরকম হয়ে যায়তবে ধর্ম থাকবে কি থাকবে না সেটা যদি খানিকের তরে আমরা ভুলে যাই, তাহলে যে-কোন বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন লোকই চাইবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হোকধর্মের রাজনীতি দিয়ে রাষ্ট্র চলতে পারে নাকিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নির্মূল করার জন্য যদি অসভ্য পন্থা অবলম্বন করতে হয়, তবে কি হবে আপনার অবস্থান?

 

 

[email protected]

April 06, 2010

[10 বার পঠিত]