হজরত আয়েশার (রাঃ) সাথে এক রজনী

আকাশ মালিক

তৃতীয় পর্ব-

– আয়েশা, উম্মে হাবিবার ভাই মুয়াবিয়া আপনার ভাই মুহাম্মদকে খুন করেছিলেন, আপনি তা মেনে নিতে পারছেন না, আর উম্মে হাবিবার ভাই হানজালাকে যখন খুন করা হয় তখন আপনি আর আপনার বাবা কী করছিলেন?
– বদরের যুদ্ধের কথা বলছেন?
– হ্যাঁ, শুনা যায় বদরের যুদ্ধের কারণেই উম্মে হাবিবা তার ভাই মুয়াবিয়া, বাবা আবু সুফিয়ান তারা কোনদিনই আবুবকর পরিবারকে ক্ষমা করতে পারেন নি।
– জানি, আমি তখন খুব ছোট ছিলাম। পরে শুনেছি আবু সুফিয়ান সারা জীবন আমার বাবাকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি সফল হতে পারেন নি, বৃদ্ধ বয়সে তার সুপুত্র মুয়াবিয়াকে তার মতোই সন্ত্রাসী বানিয়ে বদর যুদ্ধের প্রতিশোধ নিতে বলে গিয়েছিলেন। আমাদের প্রতি এতোই যদি শত্রুতা, আমার উপর, আমার বাবার উপর তাদের এতোই যদি দুঃখ ছিল, তাহলে যে ঘরে আমি আছি সেই ঘরে উম্মে হাবিবা বউ হয়ে আসার কী দরকার ছিল? মদীনায় কি পুরুষের——-
– আয়েশা, আপনাকে থামাতে হচ্ছে এ জন্যে যে, বদরের যুদ্ধের সময়ে যেহেতু আপনার বয়স কম ছিল, সম্ভবত দশ/এগারো হবে তাই না?
– জ্বী, এ রকমই হবে।
– আচ্ছা, আমাদের সময় স্বল্পতার কারণে এবং তখনকার সময়ে যেহেতু আপনার বয়স কম ছিল আমরা সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছিনা। টুকটাক ইম্পোর্টেন্ট কিছু বিষয় জেনে নিয়ে আমরা কোরান বিষয়ে চলে যেতে চাই। তো আপনি বলছিলেন, হজরত আলী জোরপূর্বক অগণতান্ত্রিক ভাবে ক্ষমতা দখল করেছিলেন, আপনার কাছে এর প্রমাণ আছে?
– প্রমাণ সাহাবী হজরত তালহা (রাঃ) ও হজরত জুবায়ের (রাঃ)। আলী যখন এই দুই সাহাবীকে ডেকে নিয়ে তার খেলাফত মেনে নিতে প্রস্তাব করেন, আলীর সেনাপতি মালিক আশতার তখন খোলা তলোয়ার নিয়ে তাদের মাথার উপর দন্ডায়মান ছিলেন। হজরত জুবায়ের (রাঃ) আলীর প্রস্তাবে সম্মতি জানাতে যখন দেরী করছিলেন, সেনাপতি আশতার তখন হুংকার দিয়ে বলেছিলেন- ‘আলী, জুবায়ারকে একবার আমার কাছে আসতে দাও, আমি এককোপে তার মস্তক দ্বিখন্ডিত করে দেই’। বসোরা থেকে তদন্ত কমিটি পাঠিয়ে আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি। শুধু তালহা (রাঃ) ও জুবায়েরই (রাঃ) নয়, আলী আরো অনেককেই জোরপূর্বক তার খেলাফত মানতে বাধ্য করেছিলেন। এমনকি জামাল যুদ্ধে হজরত তালহার (রাঃ) খুনের হুকুমদায়ীও এই আলীই ছিলেন।
– আয়েশা ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ইসলামের চার খলিফার সকলেই অগণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা দখল করেছিলেন, সকলেই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অন্য কারো হাতে ক্ষমতা হস্থানতর করেন নি, আর চার জনের তিনজনই মুসলমানের হাতে খুন হয়েছিলেন। আপনার বাবাও তো আলীর মতো একই পন্থায় ক্ষমতা দখল করেছিলেন, তিনিও খুনের দায়ী হতেন, যদি না তখন নবীর মেয়ে হজরত ফাতিমা (রাঃ) জীবিত থাকতেন।
– আপনার কাছে এর কী প্রমাণ আছে?
– আপনার বাবাকে হজরত আলী এবং ফাতিমা খলিফা মানতে অস্বীকার করায়, আপনার বাবা হজরত ওমরকে (রাঃ) রাতের অন্ধকারে ফাতিমার ঘরে পাঠিয়েছিলেন। আর ওমর মানুষ সহ ফাতিমার ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন, এই ঘটনাটা কি সত্য নয়?
– আলী ও ফাতিমা রাষ্ট্রদ্রোহী ছিলেন। প্রত্যেকদিন সন্ধ্যার পরেই ফাতিমার ঘরে বিদ্রোহীদের বৈঠক বসতো। ফাতিমার ঘরে বসে খলিফার বিরুদ্ধে ষঢ়যন্ত্র করা হতো। বাবা ইচ্ছে করলে তাদের উপর রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগ এনে তাদেরকে বন্দী করতে পারতেন। আমার বাবাকে নবী নিজেই খলিফা মনোনীত করে গিয়েছিলেন। আলী জানেন, একমাত্র আমার বাবাই নবীর জীবদ্দশায় ইমামতি করতে পেরেছিলেন। আলী ও ফাতিমা বাবাকে খলিফা না মানার আরো বহু কারণ আছে। বাবার সাথে তাদের মনোমালিন্য হয় নবীর মালিকানায় কিছু জায়গার অংশীদারিত্ব নিয়ে। নবীর মেয়ে হিসেবে ফাতিমা এসে বাবার কাছে ভাতা দাবী করতেন, অথচ আমি নবীর স্ত্রী হিসেবে ভাতা দাবী করলে ফাতিমা বাধা দিতেন। আমার উপর কথিপয় লোকে যখন অসতীর অপবাদ এনেছিল, আলী এসে নবীকে পরামর্শ দিয়েছিলেন- ‘নবীজী অসতী আয়েশাকে আপনি তালাক দিয়ে দিন’। সে অনেক লম্বা দুঃখের কাহিনি।
– এ সকল দুঃখের কাহিনিই কি জামাল যুদ্ধের প্রক্ষাপট তৈ্রী করে রেখেছিল? আচ্ছা আয়েশা, আপনি কি চান নি আপনার দুই দুলা ভাই সাহাবী হজরত তালহা (রাঃ) ও হজরত জুবায়ের (রাঃ) থেকে যে কোন একজন উসমান পরবর্তি মদীনার খলিফা হন?
– হ্যাঁ, চেয়েছিলাম। আমার এই চাওয়াটা অযৌক্তিক ছিলনা।
– আপনি কি খলিফা উসমানকে প্রস্তাব করেছিলেন, আপনার ভাই মুহাম্মদকে মিশরের গভর্ণর বানাতে?
– হ্যাঁ, করেছিলাম।
– উসমান রাজী হয়েছিলেন?
– জ্বী না।
– আপনার ভাই মুহাম্মদকে হত্যা করার জন্যে খলিফা উসমান গুপ্তচরের মাধ্যমে মিশরের গভর্ণরের কাছে চিঠি দিয়েছিলেন, কথাটা কি সত্য?
– জ্বী সত্য।
– অনেকেই মনে করেন, খলিফা উসমান হত্যার সময় আপনি ইচ্ছে করেই নীরবতা অবলম্বন করেছিলেন, এমনকি উসমান হত্যার পেছনে আপনার পরোক্ষ সমর্থনও ছিল। কারণ উসমানকে আপনিও ভাল চোখে দেখতেন না। বিদ্রোহীরা উসমানকে হত্যা করার জন্যে উসমানের ঘর অবরোধ করেছে জেনেও আপনি মদীনা ছেড়ে চলে এসেছিলেন, এর অনেক প্রমাণ আছে। আচ্ছা রাজনীতি ছেড়ে চলুন আমরা এবার কোরান থেকে কিছু আলোচনা করি। নবীর মৃত্যুর পর নবীর বিধবা পত্নীগণের পুনঃবিবাহ নিষিদ্ধ, নারীর জন্যে পর্দা করা এবং নারীকে গৃহে অবরোধ রাখা, এই আইন তিনটির মূল কারণ না কি খাদিজা পরবর্তি নবীর স্ত্রীগণ, বিশেষ করে আপনি? আপনাদের পূর্বে অর্থাৎ খাদিজার আমলে এই আইনগুলো ছিলনা। কোরানের তিনটি সুরা, অর্থাৎ সুরা নূর, সুরা আহজাব, ও সুরা তাহরিম যেন তিনটি নারী কেলেংকারী কাহিনি। সুরা নূর তো শুধু আপনারই কারণে নাজিল হয়েছিল, ঠিক না?
– তাই তো বলছিলাম, সে অনেক লম্বা দুঃখের কাহিনি। দেখুন আমি খুবই আত্মসচেতন স্পষ্টবাদী মানুষ। নীরবে অন্যায় সহ্য করতে পারিনা। অনেকে আমাকে অহংকারীর অপবাদ দেন। আসলে নবীজীর অনেক লোভাতুর, পরশ্রীকাতর সাহাবী ও আত্বীয়স্বজন আমার রূপ ও মেধায় সাংঘাতিক হিংসাপরায়ণ ছিলেন। তেরো সতীনের ঘরে আমিই একমাত্র মহিলা, যার নবীজীর সাথে বিয়ের আগে অন্য কারো সাথে বিয়ে হয়নি। আমার সংসার ছিল সকল বিধবা তালাক প্রাপ্তা নারীদের আস্তানা। হাফসার মতো মানুষ, মাত্র আটারো বছর বয়স, ছাপ্পান্ন বছরের মানুষের ঘর করতে এলো, আমার সাথে রাত ভাগাভাগি করতে। অবশ্য সে ইচ্ছে করে আসেনি, তাকে জোর করে নবীর কাছে বিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাদের পরিবারটাই ছিল সন্ত্রাসী টাইপের। ঝগড়া বিবাদ সব সময় লেগেই থাকতো। হাফসার পিতা ওমর জানেন, আমি আবুবকরের মেয়ে নবী মুহাম্মদের স্ত্রী, তারপরও কোন্ বিবেকে হাফসাকে নিয়ে এলেন আমার বাবার কাছে বিয়ে দিতে? বাবা রাজী হলেন না, হাফসাকে নিয়ে গেলেন উসমানের কাছে, উসমান রাজী হলেন না, নিয়ে এলেন আমার স্বামীর কাছে। কেন, মদীনায় কি যুবক পুরুষের আকাল পড়েছিল? হাফসাকে তিন সতীনের ঘরে দিয়ে ওমর বলে গেলেন- ‘মা হাফসা, রূপের গরবিনী আয়েশার ব্যবহারে তুমি মনে দুঃখ নিওনা’। কেন? আমি ওমরের কী ক্ষতিটা করেছিলাম? আমার রূপে তাঁর এতো ঈর্ষা কেন?
– আয়েশা একটা মিনিট দাঁড়ান, এখানে কিছু কথা আছে। ওমর কিন্তু হাফসাকে আপনার স্বামী মুহাম্মদের কাছে নিয়ে যান নি। মুহাম্মদ নিজেই হাফসাকে বিয়ে করার বাসনা আপনার পিতা ও উসমানের কাছে আগেই ব্যক্ত করেছিলেন, যা ওমর জানতেন না।
– তাতে কী হয়েছে? ওমরের বিবেক বুদ্ধি নাই?
– হ্যাঁ হ্যাঁ কথাটা ঠিক, কিন্তু যেখানে আল্লাহর নবী স্বয়ং—-আচ্ছা যাক, আপনি রাগ করবেন না। আপনাকে রাগান্বিত করার কোন অভিপ্রায় আমার নেই। তা কি যেন বলছিলেন? না থাক, এবার পর্দার ব্যাপারে কিছু বলুন, এই পর্দা নিয়ে আজকাল সারা দুনিয়া জুড়ে যে হুলুস্থুল হচ্ছে তার শুরুটা কোথায়?
– ওটাও ঐ হাফসার বাবা ওমরের নারীর প্রতি ঘৃণার ফসল। বাড়ির পাহারাদার চতুষ্পদ জন্তুটিও মাঝে মাঝে ঘুমায়, কিন্তু উনি ঘুমাতেন না। নিশাচরের মতো সারা রাত বাড়িবাড়ি চষে বেড়াতেন আর দেখতেন, কে কোথায় হাগা মুতা করলো। মোটা সাইজের ৫৪ বছর বয়সের আমার এক পেটলী সতীন ছিলেন, নাম তাঁর সওদা। আমি তাঁকে মাঝে মাঝে জৌক করে ফাট-কাও ডাকতাম। বয়সে তাঁর চেয়ে অনেক ছোট ছিলাম বিধায় তিনি মাইন্ড করতেন না। আমার কিশোরসুলভ ব্যবহারে তিনি বিরক্ত হতেন না বরং মুচকি মুচকি হাসতেন। তিনি আমার প্রতি খুব দরদী ছিলেন এবং আমার চোখের ভাষা বুঝতেন। একদিন স্বামীকে বললেন- ‘নবীজী, আমার বিছানায় আপনার রাত কাটাবার দরকার নেই, আপনাকে আমার চেয়ে আয়েশার বেশী প্রয়োজন, আমার রাত আমি আয়েশাকে দান করে দিলাম’। আনন্দে আমার চোখে জল আসলো আর আমার সতীনদের গায়ে লাগলো আগুন। প্রসঙ্গত এখানে একটা ঘটনার কথা বলি- ঘটনাটা একদিকে আমার জন্যে যেমন গৌরবের তেমনি লজ্জার ব্যাপার। আমার স্বামী যে রাত আমার ঘরে থাকতেন, ঐ রাতে নবীর বন্ধু-বান্ধবগণ আমার জন্যে উপহার পাঠাতেন। শুনতে খারাপ লাগছে, সাত গেরামের মানুষকে জানিয়ে ঢাকঢোল বাজিয়ে কেউ তা করেনা, তাই না? কিন্তু আপনাদের যুগে যত খারাপ লাগুক, আমাদের যুগে তত খারাপ মনে হতোনা। সে যুগের নারী আর এ যুগের নারী তো আর সমান নয়। দশ বারোজন সতীনের ঘর করার মানসিকতা আপনাদের যুগের কয়জন নারীর আছে? সে যাক, আমার কয়েকজন হিংসুক সতীন উম্মে সালমার ঘরে বসে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তারা নবীকে বলবেন, রাত্রি বন্টনের সাথে যেন উপহার বন্টনও সমভাবে হয়। একটা বিশ্রী কারবার না? এর অর্থ হলো সারা দুনিয়া জেনে রাখুক নবী কোন্ রাতে কোন্ স্ত্রীর সাথে ঘুমাচ্ছেন। সে অনুসারে নবীর বন্ধু-বান্ধবগণকে সঠিক স্ত্রীর ঘরে উপহার পাঠাতে হবে। লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে আমার সতীনগণ সত্যি সত্যিই তাদের দাবী নবীকে জানিয়ে দিলেন। এর আগেও তারা আমার সাথে রাত ভাগাভাগি নিয়ে নবীকে বিরক্ত করেছিলেন। সেই সময় নবী তাদেরকে বুঝিয়েছিলেন যে, পরিবারে অবিবাহিত নারী আর তালাক প্রাপ্তা বা বিধবা নারীর অধিকার সমান নয়। সতীনদের দাবী শুনে নবী একটু বেকায়দায় পড়ে গেলেন। আকাশে জরুরী মিটিং ডাকা হলো, জিব্রাইল ইমার্জেন্সী ফ্লাইটে সমাধান পত্র হাতে নিয়ে রাসুলের সামনে এসে হাজির হলেন। নবীজী আমার সতীনদেরকে শুনিয়ে দিলেন- ‘তোমরা আয়েশার কথা বলে আমাকে বারবার বিরক্ত করোনা, আল্লাহর কাছে আয়েশার মর্যাদা তোমাদের সকলের চেয়ে বেশী। একমাত্র আয়েশার বিছানায় জিব্রাইল অহী নিয়ে আসেন, আর কারো নয়’ । ব্যস, সুপার গ্লু লাগিয়ে তাদের মুখ চিরদিনের জন্যে বন্ধ করে দেয়া হলো। সে যা’ই হউক, আমার ঐ রিসপেক্টেবল ফাট-লেডী সওদা বেগম একরাতে পেশাব করতে বাইরে গেলেন। আমাদের সময়ে টয়লেট ইন্ডাস্ট্রী উন্নতমানের ছিলনা, আমরা মুক্ত খোলা আকাশের নিচে বসে বাহ্য-মুত্র ত্যাগ করতাম। সওদা বেগমের বটগাছ মার্কা দেহ হজরত ওমরের দৃষ্টি এড়াতে পারলোনা। বিড়ালের চোখের চেয়েও অধিক পাওয়ারফুল ছিল ওমরের চোখ। ওমর হাক দিয়ে বলেন- ‘হে, সওদা, পেশাব করার আর জায়গা পেলিনা একেবারে চোখের সামনে এসে বসে গেলি’? বেচারী সওদা কোনরকম শরীরটাকে টেনে টেনে হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ফিরে গেলেন। পরের দিন সাত সকালে ঘুম থেকে উঠেই ওমর নবীপত্নীগণের সামনে এসে বলে গেলেন- ‘রাত-বিয়ালে নবীর স্ত্রীগণ যেন ঘোমটা ঘামটা দিয়ে পেশাব পায়খানা করেন’। আকাশে ইমার্জেন্সী মিটিং ডাকা হলো, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পর্দার আইন পাস হয়ে গেলো।

চলবে-

১ম পর্ব-

২য় পর্ব-

৪র্থ পর্ব

[1098 বার পঠিত]