৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি যেভাবে রেডিওতে প্রচার হলো…

.

১৯৭১ এর মার্চ মাসের সময়টা ছিলো ভয়ঙ্কর। তারপরও সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলোতে পাকিস্তান রেডিওর ঢাকা কেন্দ্রের কয়েক জন দুঃসাহসী কর্মকর্তা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক সে ভাষণ সম্প্রচার করেছিলেন।

পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় শেখ মুজিব যে ভাষণ দেন তা সম্প্রচারের জন্য দুঃসাহসী সেসব কর্মকর্তাদের কাছে জাতি চীর কৃতজ্ঞ।

অগ্নিঝরা সেই ভাষণের বিষয়বস্তু পৌঁছে গিয়েছিলো বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে। এ ভাষণের মধ্য দিয়েই বাঙালির নেতা পাকিস্তান সরকারের সাথে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা করেন। এ ভাষণের বাঙালির স্বাধিকারের আকাঙ্খাকে আরও উস্কে দিয়েছিলো। আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলো জনগণের মনে।

পাকিস্তান রেডিওর শাহবাগ কেন্দ্রে প্রবেশ করাটাও কর্মকর্তাদের জন্য ছিল কঠিন এক ব্যাপার। সম্প্রচারের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল সামরিক সরকার। এসব সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহারের দাবিতে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদে রেডিওর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এক ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন।

যে আট-দশজন বেতারকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ‘৭১ এ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র থেকে প্রচার করেন, তাদের একজন আশফাকুর রহমান খান। রেডিও পাকিস্তান ছেড়ে পরবর্তীতে তিনি যোগ দিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে।

বছর পাঁচেক আগে আমি এই অকুতোভয় সৈনিক আশাফাকুর রহমানের সন্ধান পাই আমারই আরেক সহকর্মী নজরুল ইসলামের মাধ্যমে। তিনিও একসময় বাংলাদেশ বেতারে কাজ করার সময় এই ব্যক্তিত্ব সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন।

ধানমণ্ডির বাসায় আলাপকালে এই মুক্তিযোদ্ধা বারুদঝরা সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন । তার কথোপকথন থেকে সে সময় আমি বাংলাদেশের প্রথম অনলাইন দৈনিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এর জন্য তৈরি করি একটি বিশেষ প্রতিবেদন।

সে সময় আশফাকুর রহমান খান বলেন, ‘তখন আমার বয়স মাত্র ২৮। রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রে অনুষ্ঠান সংগঠক হিসেবে সদ্য যোগ দিয়েছি। মার্চের শুরুতেই পাকিস্তানের সেনা সদস্যরা সশস্ত্র অবস্থান নেয় শাহবাগের ওই বেতার কেন্দ্রে। কোন অনুষ্ঠান যাবে আর কোনটি যাবে না, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মেজর সিদ্দিক সালেক এটি নিয়মিত তদারকি করতেন । এরই মধ্যে আমরা আন্দোলন-সংগ্রামের খবর, শ্লোগান, গণসঙ্গীত, দেশাত্নকবোধক গান, নাটক — ইত্যাদি অনুষ্ঠান প্রচার করতাম।’

‘আমাদের নেতৃত্ব দিতেন রেডিওর আঞ্চলিক পরিচালক আশফাকুজ্জামান খান। তিনিই গোপনে আমাদের জানান, আমরা সেনা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রেডিওতে সরাসরি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করবো। সে-কি উত্তেজনা আমাদের মধ্যে! ৬ মার্চ রাতেই রেডিওর প্রকৌশলীরা রমনা রেসকোর্স মাঠে যে মঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেবেন, সেখানে টেলিফোনের তার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি বসায়।’

আশফাকুর রহমান খান বলেন, ‘৭ মার্চ বেলা ২টায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দেওয়ার কথা। বেলা ১২টা থেকে আমরা রেডিওতে কিছুক্ষণ পর পর ঘোষণা দিতে থাকি, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সরাসরি প্রচার করা কথা। বঙ্গবন্ধু একটু দেরিতে বেলা ২টা ২০মিনিটের দিকে মঞ্চে আসেন।

এদিকে একই সময় রেডিও অফিসে মেজর সিদ্দিক সালেক টেলিফোনে মেসেজ পাঠান: নাথিং অব শেখ মুজিবুর রহমান উইল গো অন দ্য এয়ার আনটিল ফারদার অর্ডার।…

এই মেসেজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা প্রতিবাদ হিসেবে রেডিওর সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ করে দিয়ে অফিস ছেড়ে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে চলে যাই। ওই দিন আমরা রেডিওর অনুষ্ঠান বয়কট করি। সাভারে একটি বিকল্প শক্তিশালী ট্রান্সমিটার ছিলো। সেখান থেকে যেনো আবার অনুষ্ঠান প্রচার করা না হয়, সে জন্য সেখানে ট্রাংকল করে খবর দেওয়া হয় সকল রেডিও কর্মীকে আত্নগোপন করার জন্য। ওইদিন রেডিওতে আর কোনো অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়নি ।’

তিনি স্মৃতি হাতড়ে বলে চলেন, ‘ওই সন্ধ্যায় আমরা এলিফ্যান্ট রোডের এক বাসায় গোপন বৈঠকে বসি। রাতে আমাদের নেতা আঞ্চলিক পরিচালক আশফাকুজ্জামান খবর নিয়ে আসেন, সেনাবাহিনী রাজি হয়েছে রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করতে। তবে শর্ত হচ্ছে, সবাইকে কাজে ফিরে যেতে হবে। পরদিন ৮ মার্চ সকাল ৭টায় আমরা আবার কাজে যোগ দেই। রেডিওতে প্রচার করা হয় রেকর্ড করা বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ, …এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম!’…

ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

পাহাড়, ঘাস, ফুল, নদী খুব পছন্দ। লিখতে ও পড়তে ভালবাসি। পেশায় সাংবাদিক। * কপিরাইট (C) : লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত।

মন্তব্যসমূহ

  1. আদিল মাহমুদ মার্চ 9, 2010 at 8:19 পূর্বাহ্ন - Reply

    ভাশাভাসা জানতাম, তবে এত বিস্তারিত জানতাম না।
    আমাদের বেতারের লোকজন সেসময় অনেক বড় বড় ঝুকি নিয়েছিলেন দেশের স্বার্থে। ২৩ শে মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় দিবসেও এই দূর্জয় বেতার কর্মীড়া চরম সাহস দেখিয়ে পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত খুবই কায়দা করে বাজাতে দেননি।

    • বিপ্লব রহমান মার্চ 15, 2010 at 7:42 অপরাহ্ন - Reply

      @আদিল মাহমুদ,

      এই সব অকুতভয় বীরদের ‘শব্দ-সৈনিক’ বলাই ঠিক হবে। একজন সহকর্মী তাদের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্রও তৈরি করেছেন। ব্যস্ততার জন্য ওই ছবিটি এখনো দেখা হয়নি। অনেক ধন্যবাদ। :yes:

      • আদিল মাহমুদ মার্চ 15, 2010 at 9:57 অপরাহ্ন - Reply

        @বিপ্লব রহমান,

        কোনভাবে যদি পারেন তবে সেই প্রামান্যচিত্র ইউটিউবে দেবার ব্যাবস্থা করবেন। দারুন একটা কাজ হবে।

  2. রাহাত খান মার্চ 9, 2010 at 8:12 পূর্বাহ্ন - Reply

    ধন্যবাদ বিপ্লব রহমান, এই সাক্ষাতকারটি নিয়ে লেখার জন্য। এর অনেক কিছুই আগে জানতাম না।

    • বিপ্লব রহমান মার্চ 15, 2010 at 7:39 অপরাহ্ন - Reply

      @রাহাত খান,

      আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। আসলে মুক্তিযুদ্ধের অনেক অজানা সৈনিকরা এখনো নেপথ্যেই রয়ে গেছেন। তারা অবশ্য খ্যাতি বা বীরের সন্মান কোনোটার জন্যই যুদ্ধ করেননি। যা কিছু করেছেন, তা নি:স্বার্থভাবে দেশকে ভালোবেসেই করেছেন।

  3. অভিজিৎ মার্চ 8, 2010 at 10:42 অপরাহ্ন - Reply

    ধন্যবাদ বিপ্লব, বিষয়টি নিয়ে লিখবার জন্যে। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি যেভাবে রেডিওতে প্রচার হলো শিরোনাম দেখে একটু কনফিউজড হয়ে গিয়েছিলাম – কারণ আমি জানতাম ৭ই মার্চের ভাষণ ওই দিন রেডিও পাকিস্তানে প্রচার করতে দেয়া হয়নি। পরে আবারো শিরোনামে চোখ বুলিয়ে নিশ্চিত হলাম আপনি কোথাও রেডিওতে ‘সরাসরি’ প্রচার হলো, বলেননি। সে হিসেবে ঠিকই আছে।

    • বিপ্লব রহমান মার্চ 15, 2010 at 7:35 অপরাহ্ন - Reply

      @অভিজিৎ দা, পাঠের জন্য আপনাকেও ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন