বিবর্তনের সাক্ষ্যপ্রমাণ

(প্রথম পর্ব)

ইরতিশাদ আহ

 

জেরি কোয়েন এর বিবর্তন কেন বাস্তব অবলম্বনে

(Coyne, J. Why Evolution is True, Viking, 2009)

 

 

উপক্রমণিকা। 

আমি জীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম না।  হাইস্কুলের শেষ দুবছরে আমাদের তিনটা ঐচ্ছিক বিষয়ের মধ্য থেকে একটা বেছে নেয়ার বিধান ছিল।  ভূগোল, জীববিজ্ঞান অথবা ইসলামী শিক্ষা এই তিনটার মধ্যে যে কোন একটা।  আমি পড়তাম সরকারী মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ে।  স্বাভাবিকভাবেই ইসলামী শিক্ষা পড়ানোর জন্য প্রচুর শিক্ষক ছিলেন আমাদের স্কুলে।  কিন্তু ভূগোল পড়ানোর কোন শিক্ষক ছিলেন না।  তাই জীববিজ্ঞান বা ইসলামিয়াত, এ দুটোর একটা বেছে নিতে হবে।  স্কুল কর্তৃপক্ষ মনে হয় নিজেদের অজান্তেই আমাদের এই দুই মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ বিষয় থেকে একটা বেছে নিতে বাধ্য করেছিলেন।  পড়াশোনার ব্যাপারে আমি সেই ছোটবেলা থেকেই নুন্যতম পরিশ্রম পন্থা (path of least resistance নীতি দ্বারা অনুপ্রাণিত) বেছে নেয়ার পক্ষপাতী ছিলাম।  কম পড়াশোনা করে বেশি নম্বর ওঠানো ছিল উদ্দেশ্য।  কৌশলটা যদিও শেষ পর্যন্ত কার্যকরী হয় নি।  তবে সে আরেক কাহিনী, আজ থাক।  যাই হোক, নিজের দুর্বুদ্ধি আর কিছু কিছু সতীর্থের কুবুদ্ধিতে ইসলামী শিক্ষা বেছে নিয়েছিলাম ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে।  আমার জনক খুবই ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন।  আমার বিষয়-বাছাইয়ে তিনি বেশ সন্তুষ্ট। ডাক্তার না হলেও ছেলে আল্লাওয়ালা হবে এই ছিল তাঁর বাসনা। হয়েছিল অবশ্য ঠিক উল্টোটাই।  পরবর্তীতে আমার সেক্যুলার আদর্শ আর বস্তুবাদী দর্শনের দিকে ঝুঁকে পড়ার পেছনে হাইস্কুলের ইসলামী শিক্ষার কিছুটা হলেও অবদান (!) আছে । 

 

হাইস্কুলে জীববিজ্ঞান না পড়াটা বিরাট ভুল ছিল।  আমার ধারণা,  বিজ্ঞানের অন্য যে কোন শাখার তুলনায় মানুষের মনে, চিন্তা-চেতনায়, আর দর্শনে জীববিজ্ঞানই সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখতে পারে।  তাই আমি মনে করি বিজ্ঞানের অন্য কোন শাখা না হলেও অন্তত জীববিজ্ঞানের ওপরে সবারই মৌলিক জ্ঞান থাকা দরকার।  আর আমার নিজের মাঝে এখন বিজ্ঞানের এই শাখাটা সম্পর্কে জানতে অদম্য কৌতুহল।  কারণ হচ্ছে বিবর্তনের প্রতি আমার আগ্রহ। আমার কাছে বিবর্তনের ব্যাপার-স্যাপারগুলো রহস্যোপন্যাসের মতোই মনে হয়।  মনে হয়, বিবর্তনের ক্লু-গুলো সব রয়েছে ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে। কিছু প্রাচীন পাথরের স্তরে, কিছু আমাদের নিজেদের শরীরে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে, জিনে।  আবার কিছুর দেখা মিলতে পারে আমাদের আচারে, আচরণে, অভ্যাসে।  সবকিছু মিলিয়ে নিলেই অবধারিতভাবে অঙ্গুলি নির্দেশিত হবে এক অবশ্যম্ভাবী কালপ্রিট-এর দিকে, সে হচ্ছে বিবর্তন। 

 

মুশকিল হলো মৌলিক ব্যাপারগুলো বুঝতেই আমাকে অনেক সময় দিতে হচ্ছে এই বয়সে।  বিবর্তন বিজ্ঞান বোঝার জন্য জীববিজ্ঞানের মৌলিক জ্ঞান অপরিহার্য।  তাই জেরি কোয়েন (Jerry Coyne) এর  Why Evolution is True বা বিবর্তন কেন বাস্তব হাতে পেয়ে এবং কিছুটা পড়ে আমি বিমোহিত।  অত্যন্ত সহজ ইংরেজিতে, বৈজ্ঞানিক  এবং টেকনিক্যাল শব্দগুলো যথাসম্ভব পরিহার করে তিনি এই বইটা লিখেছেন।  হয়তো আমার মতো পাঠকদের কথা চিন্তা করেই।  ভাষা সহজ হলেও যুক্তি কিন্তু যেমন জোরালো, তেমনই ধারালো। 

 

বিবর্তনতত্ত্ব শুধু একটা থিওরি, তাই এটাকে সত্য বলে মেনে যায় না, এই পুরনো যুক্তি আমরা শুনেছি।  যুক্তিটা যে অসার সে নিয়েও অনেক কথা বলা হয়েছে।  বিজ্ঞানে থিওরি আর সাধারণ কথায় ব্যবহৃত থিওরি এই দুয়ের মধ্যে যে বিরাট পার্থক্য আছে, এটা অভিধান দেখেও জেনে নেয়া যায়।  কিন্তু আই, ডি (ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন)-র প্রবক্তারা চাতুরীর সাথে এই পার্থক্যটাকে এড়িয়ে যান।  জেরি কোয়েন-এর এই বইটা বিবর্তন মেনে নিতে যারা দ্বিধাগ্রস্ত তাদের দ্বিধামুক্ত হতে সাহায্য করবে নিঃসন্দেহে।  কারণ, তিনি বিবর্তনকে আর বিজ্ঞানের ভাষায়ও থিওরি বলার দরকার আছে বলে মনে করেন না।  তাই তাঁর বই-এর নাম দিয়েছেন, Why Evolution is True

 

বিজ্ঞানীরা সাধারণতঃ ট্রু বা ফ্যাক্ট শব্দগুলো ব্যবহার করেন না।  কিন্তু বিবর্তনের ব্যাপারে এখন জেরি কোয়েনের মতো বিজ্ঞানীরা তাই করছেন।  তাই বুঝতে হবে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তে তাঁরা পৌঁছেছেন যে, বিবর্তনকে তত্ত্বের পর্যায় থেকে ফ্যাক্ট-এ উন্নীত করার মতো পর্যাপ্ত পরিমাণে নিশ্চিত সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে।  ডারউইনের সময়ে হয়তো একে থিওরি বলাটা সঙ্গত ছিল।  কিন্তু এখন বিবর্তনকে সত্য এবং বাস্তব বলে দাবী করছেন বিজ্ঞানীরাই।  আর সে দাবীর পক্ষে একটা দুটো নয়, ভুরি ভুরি সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করেছেন জেরি কোয়েন তাঁর এই বইয়ে।

 

বৈজ্ঞানিক গবেষণালদ্ধ সাক্ষ্যপ্রমাণের এক অপূর্ব সম্ভার এই বইটা। বংশগতিবিদ্যা (জেনেটিক্স) তো বটেই, শরীরতত্ত্ববিদ্যা (এনাটমি), অণুজীববিদ্যা, ভূতত্ত্ববিজ্ঞান, ভ্রুণতত্ত্ববিদ্যা, এমন কি পুরাতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব এবং বিজ্ঞানের আরো সব শাখা থেকে এই সাক্ষ্যপ্রমাণ আহরণ করেছেন কোয়েন।  দেখিয়েছেন, বিবর্তন এখন আর শুধু তত্ত্ব নয়, একটা বাস্তব প্রক্রিয়া।  কোয়েনের বইটা খোলা মন নিয়ে পড়লে এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই।   

 

তাই স্বনামধন্য রিচার্ড ডকিন্স এই বইটা সম্পর্কে বলেছেন,

 

আমি একসময় বলতাম, বিবর্তনে যারা বিশ্বাস করে না তারা হয় গবেট, নয়তো উন্মাদ, নতুবা অজ্ঞ; সাথে এও বলতাম যে অজ্ঞতা কোন অপরাধ নয়।  এখন আমার সেই বক্তব্যটাকে একটু সংশোধন করা দরকার।  বিবর্তনে যারা বিশ্বাস করে না তারা হয় গবেট, নয়তো উন্মাদ, নতুবা তারা জেরি কোয়েন (-এর এই বইটা) পড়ে নি।  এমন সুলিখিত চমৎকার  বইটা পড়ার পরেও কোন যুক্তিবোধসম্পন্ন মানুষ ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন বা তার মাসতুতো ভাই সৃষ্টিবাদের (ক্রিয়েশনিজম) মতো গাঁজাখুরি গালগল্পকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করতে পারে, আমার পক্ষে মেনে নেয়া অসম্ভব(১)।  

    

বিবর্তনের ওপরে ইংরেজিতে লেখা বইয়ের কমতি নেই বাজারে।  তবে একেকটা বই একেক রকমের।  খুব কম বইই সাধারণ পাঠকের জন্য লেখা।  বেশির ভাগ বই বিশেষজ্ঞরা লিখেছেন বিশেষজ্ঞদের বা বিশেষজ্ঞ হতে যারা উৎসাহী তাদের জন্য।  যারা সীমিত জ্ঞান নিয়ে জানতে ইচ্ছুক, আমার মনে হয়েছে এই বইটা তাদের জন্য লেখা।  জেরি কোয়েন নিজে কিন্তু একজন নামকরা জীববিজ্ঞানী এবং গবেষক, বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানে পিএইচডি করেছেন হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৭৮-এ(২)  বিবর্তন বিজ্ঞানের বিশেষ শাখা প্রজাতির উৎপত্তি বিষয়ে গবেষণা করছেন গত বিশ বছর ধরে।  কোয়েন বিবর্তনীয় বংশগতিবিদ্যা পড়ান ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে।   

 

বইটা আমি এখনো পড়ে শেষ করি নি। বেশ মোটাসোটা বই। রহস্যোপন্যাসের মতো হলেও রুদ্ধশ্বাসে শেষ করার মতো বই এটি নয়।  পড়ার সাথে সাথে হৃদয়ঙ্গম, মস্তিষ্কঙ্গম করার জন্য সময় নিতে হচ্ছে আমাকে।  এর মধ্যে কথা হচ্ছিলো বিবর্তনের পথ ধরে-র লেখিকা মুক্তমনার বন্যা আহমেদের সাথে।  আমরা দুজনেই একমত হলাম বাংলা ভাষার পাঠকদের জন্য জেরি কয়েন-এর এই বইটার মতো বই বা লেখার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।  তাই  ভাবলাম  মুক্তমনার পাঠকদের সাথে এই বইটার অন্তত পরিচয় ঘটিয়ে দেই।  তারই ফল এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।  

 

আজকের প্রবন্ধটি জেরি কয়েন-এর Why Evolution is True র প্রথম দুই অধ্যায় অবলম্বনে।

 

 

বিবর্তন একটি সোজাসাপ্টা তত্ত্ব।  

বিবর্তন তত্ত্ব আসলেই সোজা একটা তত্ত্ব।  এই তত্ত্বে তেমন কোন জটিলতা নেই।  বিজ্ঞানের অন্যান্য তত্ত্ব, যেমন আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের তুলনায় বিবর্তন তত্ত্ব মোটেও মৃম্ময় বা বিমূর্ত (abstract) কিছু নয়,  বরং অনেক বেশি সোজাসাপ্টা।  স্বাভাবিক বুদ্ধি ও যুক্তিবোধসম্পন্ন যে কোন মানুষের পক্ষে বিবর্তন তত্ত্বের মূলনীতি বোঝা এবং মেনে নেয়া স্বাভাবিকই একটা ব্যাপার হওয়া উচিত। ডকিন্সও বলেছেন, একবার ভালোভাবে বুঝতে পারলে এই পথটাকেই (বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা) অধিক যুক্তিসঙ্গত মনে হতে বাধ্য(৩)।  ডারউইনের বুলডগ নামে খ্যাত টমাস হাক্সলি অরিজিন অব স্পিসিজ পড়ে মন্তব্য করেছিলেন, আমি কতবড় গাধা, এই ব্যাপারটা আগে চিন্তা করি নি(৪)!

 

তবুও মেনে নিতে পারে না অনেকেই, কারণ যুগ যুগ ধরে মানুষ নিজেকে জীবজগতের অন্যান্য সদস্যদের চাইতে পৃথক ভেবে এসেছে।  শুধু তাই নয়, ভাবতে শিখেছে, জগতের সবকিছু, এমন কি এই বিশ্বব্রহ্মান্ড, মানুষের প্রয়োজনে সৃষ্টি করা হয়েছে।  মানুষ যে আসলে অন্যান্য জীবজন্তুর মতোই বিবর্তিত হয়েছে শুধু তাই নয়, তারা একই প্রাণের উৎস থেকে বিবর্তিত হয়েছে সহজে এই সহজ সত্যটা মেনে নিতে পারে না অনেকেই।  যুক্তি বা বিজ্ঞান নয়, ধর্ম আর কুসংস্কারের বিশাল প্রভাব মানুষের মনে।  বিবর্তনতত্ত্ব মেনে নেয়ার পথে ধর্মীয় চিন্তাধারা একধরনের প্রতিরোধ বা বাধার সৃষ্টি করে অনেকেরই মনে, মননে।  আরেকটা কারণ হলো, অনেকেই মনে করেন বিবর্তন মেনে নিয়ে আমরা নিজেদের জন্তু-জানোয়ারের পর্যায়ে নামিয়ে নিচ্ছি। আর সাথে সাথে মানুষের জীবনে নীতি-নৈতিকতার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করছি। এই ধরনের চিন্তা ভুল ধারণার ওপরে প্রতিষ্ঠিত।  বিবর্তন বিজ্ঞান আমরা কোথা থেকে কিভাবে এসেছি সেই প্রশ্ন নিয়ে, আমরা কোথায় যাবো বা যাচ্ছি তা নিয়ে নয়।  

 

তবুও হাজার হাজার বছর ধরে লালিত গল্পকাহিনীর প্রভাব সহজে যাওয়ার নয়।  তাই বিবর্তন বিজ্ঞানে উন্মোচিত সত্যটা ভয় পাইয়ে দেয় অনেককে। আবার সত্য উদঘাটনের প্রক্রিয়াটা দারুন রোমাঞ্চকর মনে হয় অনেকেরই কাছে। 

চার্লস ডারউইন ছিলেন এই দ্বিতীয় কিসিমের মানুষ।  ডারউইন যখন প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করছিলেন তখনই তাঁর মনে এই ধারণা জন্মে যে, বাইবেলে বর্ণিত আদম-হাওয়ার কাহিনীর সাথে বাস্তবে যা ঘটেছে তার কোন মিল নেই।  একই সাথে এটাও বুঝতে পেরেছিলেন, এই তত্ত্ব মানুষের আজন্মলালিত বিশ্বাস আর সংস্কার গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম।  এ নিয়ে একটু চিন্তিতও ছিলেন বৈ কি।  তা নইলে বলতেন না,   

আমি সব বিষয়ে মুক্তচিন্তার একনিষ্ঠ সমর্থক, তবুও আমার মনে হয় (আমার ধারণা ঠিকও হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে) ক্রিশ্চানিটি এবং ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধে সরাসরি তর্ক সাধারণ মানুষের ওপর তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না; মানুষের মন ক্রমশঃ আলোকিত করার মাধ্যমেই মুক্তচিন্তার পথ প্রশস্ত হবে – আর বিজ্ঞানের অগ্রগতির মাধ্যমেই তা হতে পারে।  তাই আমি ধর্ম প্রসঙ্গে লেখা থেকে নিজেকে সবসময় বিরত রেখেছি।  কিন্তু ধর্মের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণে সায় দিলে আমার পরিবারের কোন কোন সদস্য কষ্ট পেতে পারে, এই কথা ভেবে আমি হয়তো বা একটু বেশি সাবধানতা অবলম্বন করেছিলাম(৫)

ডারউইন ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন,  বিবর্তনের তত্ত্বে মানুষের স্বতন্ত্র সৃষ্টির (special creation) ধারণার কোন স্থান নেই। তাই লিখেছিলেন, আমি মনে করি, আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, মানুষ তার সব মহৎ গুণাবলী সত্ত্বেও, শরীর-কাঠামোর মাঝে বয়ে বেড়াচ্ছে তার হীন উৎসের (lowly origin) সুস্পষ্ট ছাপ(৬)

 

 

বিবর্তনের মূলকথা।  

একশত পঞ্চাশ বছর আগে  চার্লস ডারউইন তাঁর অরিজিন অব স্পিসিজ প্রকাশ করেন।  দুটো গুরুত্বপূর্ণ ধারণার সূত্রপাত ঘটান তিনি এই যুগান্তকারী গ্রন্থে।  এক, বিবর্তন; আর দুই, প্রাকৃতিক নির্বাচন।  বিবর্তনের ধারণাটা কিন্তু একবারে নতুন ছিল না।  ডারউইনের আগেও বিবর্তন নিয়ে অনেকেই ভেবেছেন।  প্রাণীকূল বিবর্তনের মাধ্যমে এ পর্যায়ে এসেছে এই ধারণা অনেকের কাছেই যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছিল।   ডারউইনের পিতামহ ইরাজমাস ডারউইনও বিবর্তন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পোষণ করতেন।     

 

কিন্তু প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণা ছিল একবারে নতুন।  ডারউইনের প্রায় সমসাময়িক আরেকজন বিজ্ঞানী, আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস এ নিয়ে ভাবছিলেন এবং প্রায় একই ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন। ডারউইন প্রায় বিশ বছর ধরে গবেষণা করেছেন তাঁর যুগান্তকারী বইটা প্রকাশ করার আগে। 

 

একবাক্যে, একটু দীর্ঘ যদিও, বিবর্তনের মূলকথাটাকে এভাবে বলা যেতে পারে –  

 

পৃথিবীতে প্রাণের বিবর্তন একটা ক্রম-প্রক্রিয়া,

যার শুরু এক আদিম প্রজাতি (species – স্পিসিজ) সম্ভবতঃ আত্ন-অনুলিপি তৈরিতে সক্ষম একটা অণু (self-replicating molecule) -থেকে, প্রায় সাড়ে তিনশো কোটি বছর আগে যার অস্তিত্ব ছিল;

এই আদিমতম প্রজাতি শাখা প্রশাখা বিস্তার করে কালক্রমে;

অনেক নতুন আর বিচিত্র সব প্রজাতির উদ্ভবের মাধ্যমে;  এবং

যে প্রক্রিয়ায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে (কিন্তু সব ক্ষেত্রে নয়) এই বিবর্তনীয় রূপান্তর ঘটেছে,

তা হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচন।    

 

ওপরের বাক্যে (ইচ্ছে করেই ভেঙ্গে লিখেছি, যাতে প্রত্যেকটা লাইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশটাকে লক্ষ্য করা যায় সহজে) ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ কথা রয়েছে।  

 

এক। বিবর্তন,

দুই। ক্রম-প্রক্রিয়া (gradual process, বা gradualism),

তিন। প্রজাতি উদ্ভবের প্রক্রিয়া বা স্পিসিয়েশন (speciation),

চার। সাধারণ পূর্বসুরি বা কমন এন্সেস্ট্রি (common ancestry),

পাঁচ। প্রাকৃতিক নির্বাচন, ও

ছয়। অন্যান্য প্রক্রিয়ায় ঘটা বিবর্তনীয় রূপান্তর।  

 

এবারে এক এক করে, এই ছয়টি কথার অর্থ বোঝার চেষ্টা করা যাক।   

 

প্রথমেই বিবর্তন। এর সাদামাটা অর্থ হলো, কালক্রমে কোন প্রজাতির জেনেটিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া।   মানে হলো, বংশ পরিক্রমায় একটা প্রজাতি সম্পূর্ণ পৃথক পৃথক প্রাণীতে বিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। এটা ঘটে, ডি এন এ-র ধারাক্রমে (DNA – deoxyribonucleic acid) পরিবর্তনের ফলে।  এই পরিবর্তন সূচিত হয় মিউটেশনের মাধ্যমে। (মিউটেশনের বাংলা করা হয়েছে, পরিব্যক্তি।  আমার মনে হয়, বাংলায় মিউটেশন লিখলেও মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না!  বরং বুঝতে সুবিধা হবে।)  মিউটেশন ঘটে অনুলিপি (copy) বা নকল তৈরি করতে গিয়ে এদিক-সেদিক হলে।  ডিএনএ-র  ধারাক্রমের (sequence in DNA molecule) অনুলিপি অবিকল তৈরি হয় না, না হওয়াটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়।  মিউটেশন কিন্তু র‌্যান্ডম, মানে একটা এলোমেলো, খাপছাড়া প্রক্রিয়া।   কোন্ মিউটেশন কখন ঘটবে আগে থেকে বলা যায় না।  র‌্যান্ডম মানে এটাও নয় যে, মিউটেশন ঘটতেও পারে, বা নাও ঘটতে পারে। মিউটেশন ঘটে এবং ঘটে চলেছে।  চোখের রং, চুলের রং-এর বিভিন্নতাও মিউটেশনের কারণে ঘটে। তবে, অভিযোজনের (adaptation) ওপরে মিউটেশনের প্রভাব ভালোও হতে পারে, খারাপও হতে পারে, আবার এর কোন প্রভাব নাও থাকতে পারে।  আসলে বেশির ভাগ মিউটেশন প্রভাবহীন বা নিরপেক্ষ।  মিউটেশনের প্রভাব ভালো, খারাপ না নিরপেক্ষ হবে তা নির্ভর করছে পরিবেশ, প্রতিবেশ আর পরিস্থিতির ওপরে। আগেই বলেছি পরিবেশ, পরিস্থিতি কিন্তু মিউটেশন ঘটার কারণ নয়।  ভালো  মিউটেশনের ফলে প্রজাতির কোন সদস্য বা জনপুঞ্জ টিকে থাকার জন্য অনুকূল সুবিধা পেতে পারে প্রকৃতির কাছ থেকে।  (এটাই আসলে প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রক্রিয়া।  এ নিয়ে দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করবো।)  আর ঠিক উলটোটা হতে পারে খারাপ মিউটেশনের ফলে। ক্যান্সার রোগ খারাপ মিউটেশনের একটা উদাহরণ।      

 

মিউটেশন এই ভালো-খারাপের বিষয়গুলো মাথায় রেখে ঘটে না। তাই জেরি কোয়েন একে র‌্যান্ডম না বলে ইন্ডিফারেন্ট বা নির্লিপ্ত বলাটাই সঙ্গত মনে করেন।    

 

ডারউইন কিন্তু ডি এন এ, মিউটেশনের ব্যাপারগুলো জানতেন না, কারণ ওই জ্ঞান তখনো আবিষ্কৃত হয় নি। কিন্তু তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ছিল অসাধারণ।  জেনেটিক্সের জ্ঞান না থাকা সত্বেও বুঝতে পেরেছিলেন বিবর্তনের প্রক্রিয়াটাকে, সাধারণ যুক্তিবোধ প্রয়োগের মাধ্যমে।

 

আজকের প্রাণীরা আগে ছিল না, এদের উৎপত্তি হয়েছে আগেকার প্রাণী থেকে। যেমন, বানরজাতীয় প্রাণী (বর্তমান বানর প্রজাতি নয় যদিও) থেকে আমাদের মানুষ প্রজাতির উদ্ভব।  এই সত্যটা ডারউইনের চোখে খুবই পরিষ্কারভাবে প্রতিভাত হয়েছিল।

 

সব প্রজাতির মধ্যে বিবর্তন ঘটলেও সব বিবর্তন কিন্তু একসাথে ঘটে না।  অনেক প্রজাতির মধ্যে কোটি কোটি বছরেও কোন বিবর্তন ঘটে নি।  বিবর্তন আদৌ ঘটবে কিনা বা কি রকম গতিতে ঘটবে তা নির্ভর করে কোন প্রজাতির মধ্যে বিবর্তন ঘটার মতো পরিবেশের চাপ রয়েছে কিনা তার ওপর।  যেমন তুলনামূলক বিচারে, মানুষ আর তিমি মাছের মধ্যে বিবর্তন ঘটেছে দ্রুত।  অনেক প্রাণীর মধ্যে আবার তেমন কোন বিবর্তন ঘটে নি, কোটি কোটি বছর ধরে তারা একই রকম আছে।  পরিবেশ যদি বৈরী না হয়, বিবর্তনের প্রয়োজন নাও হতে পারে।  তাই অনেক প্রজাতি কোটি কোটি বছর ধরে একই রকম রয়ে গেছে।  যেমন, কিছু শৈবাল এবং ছত্রাক, এমন কি কিছু হাঙ্গরজাতীয় প্রাণীর মধ্যে কোটি কোটি বছর পার হয়ে গেলেও তেমন কোন পরিবর্তন আসে নি। 

 

দ্বিতীয় ব্যাপারটা হচ্ছে বিবর্তন একটা ক্রম-প্রক্রিয়া।  অর্থাৎ, অনেক বছর, হাজার হাজার তো বটেই, এমন কি লক্ষকোটি বছর ধরে এই প্রক্রিয়া চলছে।  যে প্রজাতিগুলোকে আমরা, নিজেরা-সহ, আমাদের চারপাশে দেখতে পাই, তারা অনাদিকাল ধরে এমন দেখতে ছিল না, ধীরে ধীরে ক্রমান্বয়ে এই অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছে । সরীসৃপ থেকে পাখী, এবং পরে সরীসৃপ থেকে স্তন্যপায়ীতে বিবর্তিত হওয়াটা মানুষের একজন্মে চোখে দেখার মতো ব্যাপার নয়। 

 

একটা প্রজাতির দুটো প্রজাতিতে বিভক্ত হয়ে যাওয়াটা সাধারণতঃ, আমাদের চোখের সামনে ঘটে না।  কিন্তু তারও দুএকটা উদাহরণ দেখা গেছে, ইদানীং, বিশেষ করে উদ্ভিদ জগতে।   বন্যা আহমেদ (৭) উল্লেখ করেছেন, স্যালসিফাই নামে মূলাজাতীয় এক ধরনের উদ্ভিদের কথা।  তিনটি প্রজাতি দিয়ে চাষ শুরু হলেও, আরো দুটি নতুন এবং ভিন্ন প্রজাতির উদ্ভব ঘটে শস্যক্ষেত্রে দুই-তিন দশকের মধ্যে। 

 

এই কিছুদিন আগেই খবর পাওয়া গেল (৮),  চমকপ্রদ দেখতে নতুন কয়েকটা প্রজাতির ব্যাঙের খোঁজ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।  কলাম্বিয়ায়র এই অঞ্চলকে নোয়ার (নুহ নবী) জাহাজের সাথে তুলনা করেছেন বিজ্ঞানী রদ্রিগেজ-মাহেচা। বিজ্ঞানীদের কাছে ব্যাঙের এই প্রজাতিগুলো সম্পূর্ণ নতুন।  শুধু দশটি নতুন প্রজাতির ব্যাঙই নয়, সর্বসাকুল্যে তারা প্রায় ষাটটি নতুন ধরনের  উভচর, বিশটি সরীসৃপ এবং একশত বিশটি পাখী প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন।  এই প্রজাতিগুলোর উদ্ভব হয়েছে তুলনামূলক হিসেবে খুবই কম সময়ের মধ্যে।

 

কিন্তু তার চেয়েও মজার ব্যাপার জানা গেছে ল্যাবরেটরিতে ব্যাক্টেরিয়া নিয়ে গবেষণার ফলে। বিজ্ঞানী রিচার্ড লেনস্কি (৯) ও তাঁর সহকর্মীরা  ল্যাবরেটরিতে ই কোলাই (e. coli)ব্যাক্টেরিয়া ব্যাবহার করে যা জানতে পেরেছেন তা রীতিমত রোমহর্ষক।   ১৯৮৮-তে শুরু হওয়া এই পরীক্ষা সম্প্রতি ৫০,০০০ জেনারেশনে এসে পৌঁছেছে।  লেনস্কি পরীক্ষায় মিউটেশন, মিউটেশনের মাধ্যমে প্রাপ্ত বাড়তি সুবিধা, পরিবেশের কারণে ঘটা প্রাকৃতিক নির্বাচন, বংশবিস্তারের হারে বাড়া-কমা, এ সব কিছুরই দেখা পাওয়া গেছে, বংশের পর বংশ ধরে ব্যাক্টেরিয়া পর্যবেক্ষণের ফলে।

 

তবে ল্যাবরেটরিতে দুচার বছরে বিবর্তন ঘটুক বা প্রকৃতিতে লক্ষকোটি বছর ধরে ঘটতে থাকুক, বিবর্তন ঘটে পর্যায়ক্রমে, এ নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।  তাড়াতাড়ি ঘটবে না অনেক লম্বা সময় নিয়ে ঘটবে তা নির্ভর করছে কোন প্রজাতির মধ্যে বিবর্তন ঘটার মতো অনুকূল পরিবেশ বা চাপ রয়েছে কিনা তার ওপর। 

 

এবার আসা যাক তৃতীয় আর চতুর্থ বিষয়ে।  প্রজাতি-গঠন আর সাধারণ পূর্বসুরির ধারণা প্রসঙ্গে।  এই দুটো ব্যাপারের একটা আরেকটার সাথে সম্পর্কিত, বলা যেতে পারে একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। তাই এই দুটি প্রসঙ্গ একই সাথে আলোচনায় আসছে।  প্রজাতি-গঠন মানে হচ্ছে এক প্রজাতি থেকে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির উদ্ভব।  তাই প্রজাতির উদ্ভব  না হলে সাধারণ পূর্বসুরি থাকার প্রশ্নই ওঠে না।   

 

কিন্তু প্রজাতি-গঠন ঘটে কি ভাবে?  আর ঘটেই বা কেন?  কোন কারণে একটা প্রজাতির দুটো অংশের মধ্যে যদি আলাদা আলাদা ভাবে বিবর্তন ঘটে এবং পরে এই দুই অংশের একটা আরেকটার সাথে প্রজননে সক্ষম না হয়, তখন এই দুই অংশ ভিন্ন প্রজাতিতে পরিণত হয়।  প্রজননে সক্ষম না হওয়ার মানে হচ্ছে এই দুই অংশের মধ্যে জিন-প্রবাহ ঘটতে না পারা।  এই জিন-প্রবাহের ব্যাপারটা ডারউইন জানতেন না।  জিন সম্পর্কিত জ্ঞান-বিজ্ঞান খুব একটা উন্নত পর্যায়ে ছিল না সেই সময়ে।  তাই ডারউইনের পক্ষে প্রজাতির উদ্ভবের প্রক্রিয়াটা সঠিক ভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয় নি।    

 

প্রজাতি-গঠন  কিন্তু খুব সহজে ঘটে না। অনেক প্রজাতি আরো নতুন প্রজাতি  উদ্ভব হওয়ার আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।  আবার অনেক প্রজাতি আছে যাদের মধ্য থেকে নতুন কোন প্রজাতির উদ্ভব ঘটে নি।  কিন্তু প্রজাতি-গঠন ঘটে এক্সপোনেন্সিয়াল(exponential)  হারে, (একটা থেকে দুটো, দুটো থেকে চারটে, এই ধারায়) তাই আমরা পৃথিবীতে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও এত প্রজাতির দেখা পাই।

 

প্রশ্ন কিন্তু রয়েই গেল – কি কারণে এক প্রজাতির দুটো ভিন্ন অংশে ভিন্ন ধরনের বিবর্তন ঘটে?  একটা কারণ হতে পারে ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা (geographic isolation )। প্রজাতির উদ্ভবের পেছনে আরো কারণ আছে যদিও।  তবে এই ভৌগলিক কারণটা দিয়েই প্রজাতি-গঠন বোঝার সুবিধে।  ভৌগলিক ভাবে কোন প্রজাতির দুটো জনগোষ্ঠী আলাদা হয়ে গিয়ে দুটো পৃথক অঞ্চলে অনেক অনেক বছর ধরে বসবাস করতে থাকলে তাদের মধ্যে বিবর্তনও ঘটবে ভিন্ন ধারায়।  পরিণতিতে দুটো ভিন্ন প্রজাতির উদ্ভব হবে।  এই প্রক্রিয়াটাই হচ্ছে প্রজাতি গঠনের প্রক্রিয়া। ।  এই প্রক্রিয়াটাকে লক্ষকোটি বছর ধরে চলতে দেওয়া হলে, এবং বিদ্যমান প্রজাতিগুলো আরো অনেক প্রজাতিতে বিভক্ত হওয়ার সুযোগ পেলে, দেখতে পাওয়া যাবে বিচিত্র এবং নতুন নতুন সব প্রজাতি।  ঠিক তাই আমরা পৃথিবীতে দেখতে পাচ্ছি। 

 

এখন প্রজাতির উৎপত্তিকে গাছের শাখা-প্রশাখার সাথে তুলনা করা যাক।  যে কোন এক জোড়া প্রজাতির কথা চিন্তা করুন।  ধরুন, নেকড়ে আর শেয়ালের কথা। গাছের দুটো শাখাকে যেমন গোড়ার দিকে একটা শাখায় মিলিত হতে দেখা যায়, ঠিক তেমনি, এই দুটো প্রজাতিরও বিবর্তনের ইতিহাসে একটা সাধারণ পূর্বসুরির দেখা পাওয়া যায় । 

 

কাছাকাছি সম্পর্কের মানুষদের পূর্বসুরির যেমন নিকট অতীতে বসবাস, ঠিক তেমনি, কাছাকাছি প্রজাতিগুলোর পূর্বসুরির দেখাও মিলবে নিকট অতীতেই।  একই যুক্তিতে দূর সম্পর্কের প্রজাতিদের পূর্বসুরির খোঁজ পাওয়া যাবে দূর অতীতে।  এই কারণেই বলা হয়েছিল, বিবর্তন তত্ত্বে প্রজাতি-গঠনের প্রক্রিয়া আর সাধারণ পূর্বসুরির ধারণা একই মুদ্রার দুই পিঠ। ব্যাপারটা আসলেই খুব সরল।  সোজা কথায়, বিবর্তনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে (সাধারণতঃ জীবাশ্ম বা ডিএনএ-র সাহায্যে) যে কোন প্রজাতির পূর্বসুরির দেখা পাওয়া যাবে অতীতের কোন না কোন এক সময়ে।   

 

মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রজাতির এই যে গুচ্ছবদ্ধ বিন্যাসের (nested arrangement) ধারণা, এনিয়ে কিন্তু জীববিজ্ঞানীরা ডারউইনের আগেও চিন্তা-ভাবনা করেছিলেন। যেমন, ১৭৩৫-এ কার্ল লিনিয়াস (Carl Linnaeus)।  খুব সহজেই তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, উদ্ভিদ এবং জন্তু-জানোয়ারদের স্বাভাবিক শ্রেণীবিভাগ করা সম্ভব।  ডিএনএ-র জ্ঞান ছাড়াই, শুধু প্রজাতির মধ্যে চোখের দেখা মিল আর অমিলগুলো পর্যবেক্ষণ করেই তাঁরা এই শ্রেণীবিভাগ করেছিলেন। বোধগম্য কারণে তাঁরা নিজেদের মানুষ প্রজাতিকে এই শ্রেণীবিন্যাসের আওতা থেকে বাইরে রেখেছিলেন।  

 

আরো মজার ব্যাপার হলো বিজ্ঞানীরা আলাদাভাবে কাজ করেও একই ধরনের শ্রেণীবিভাগে উপনীত হয়েছিলেন। এতেই প্রমাণিত হয়, এই গুচ্ছবদ্ধতা প্রকৃতির বাস্তবতা এবং মৌলিক সত্যকেই প্রকাশ করে।  কেউ তখনো জানতেন না, প্রকৃতির এই বাস্তবতাই বিবর্তনের প্রক্রিয়া।  প্রজাতিসমূহের পূর্বসুরি সময়ের স্কেলে যতটা সাম্প্রতিক, পূর্বসুরির সাথে তাদের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ততটাই মিল।  আর যাদের পূর্বসুরির অস্তিত্ব যতটা দূর অতীতে, তাদের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সেরকমই অমিল।  এই সহজ-সরল সত্যটা বিবর্তন তত্ত্বকে একটা দৃঢ় ভিত্তির ওপরে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

 

(চলছে…)

     
তথ্যসূত্র।
 

() ডকিন্স, রিচার্ড। I once wrote that anybody who didn’t believe in evolution must be stupid, insane or ignorant, and I was then careful to add that ignorance is no crime. I should now update my statement. Anybody who doesn’t believe in evolution is stupid, insane, or hasn’t read Jerry Coyne. I defy any reasonable person to read this marvellous book and still take seriously the “breathtaking inanity” that is intelligent design “theory” or its country cousin, young earth creationism.

http://jerrycoyne.uchicago.edu/about.html#reviews

 

(২) কোয়েনের বই-এর ওয়বসাইট – http://jerrycoyne.uchicago.edu/index.html

 

(৩) ডকিন্স, রিচার্ড। “…there is another way and, once you have understood it, a far more plausible way, for complex “design” to arise out of primeval simplicity. The Blind Watchmaker, W. W. Norton & Company, Inc. New York, 1987, (Preface).

 

(৪) হাক্সলি, টমাস। How extremely stupid for me not to have thought of that!
(Thomas Huxley’s first reflection after mastering, in 1859, the central idea of Darwin’s Origin of Species)

http://www.spaceandmotion.com/Charles-Darwin-Theory-Evolution.htm

 

(৫) ডারউইন, চার্লস। I am a strong advocate for free thought on all subjects, yet it appears to me (whether rightly or wrongly) that direct arguments against christianity and theism produce hardly any effect on the public; and freedom of thought is best promoted by the gradual illumination of men’s minds, which follow[s] from the advance of science. It has, therefore, been always my object to avoid writing on religion, and I have confined myself to science. I may, however, have been unduly biased by the pain which it would give some members of my family, if I aided in any way direct attacks on religion.”  

http://www.darwin-literature.com/l_quotes.html

(৬) ডারউইন, চার্লস। “We must, however, acknowledge, as it seems to me, that man with all his noble qualities… still bears in his bodily frame the indelible stamp of his lowly origin.”  http://www.darwin200.org/more.html

(৭) আহমেদ, বন্যা। বিবর্তনের পথ ধরে। অবসর, ঢাকা, ২০০৬, পৃ ৬০।

 

(৮)Alan Boyle, “Exotic frogs found in Colombian Eden,” February 2, 2009.

http://www.msnbc.msn.com/id/28980688/wid/18298287/?gt1=43001

 

(৯)  লেনস্কি, রিচার্ড। লং টার্ম ইভ্যুলুশন এক্সপেরিমেন্ট,

http://myxo.css.msu.edu/ecoli/celebrate50K.html

[151 বার পঠিত]