পলিন ওয়াইন্সটাইনের ডায়েরী

 

সোমবারঃ

 

গতকাল সদাপ্রভুর মাঙ্গলিক বার্তা পেয়েছিসে কারণেই গতকাল থেকে বাথররুমের ভেতরে বাথটাবে ঘুমুচ্ছি তিনি বললেন, দেখো পলিন তোমার সাথে পরামর্শ করা প্রয়োজন হেইতির ঘটে যাওয়া  প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে  কিন্তু ওরা তোমার ঘরে  তোমার অবর্তমানে রোজ ঢুকছে, তাই আজ থেকে বাথরুমের দরজা ভেতর থেকে আটকিয়ে বাথটাবেই ঘুমিয়ো রাতে ওই সময়ে আমরা কথা বলবো

 

মঙ্গলবারঃ

 

আজ অফিস থেকে ফিরে  গাড়ি পার্কিং এ আসতেই লক্ষ্য করলাম শাটশাট করে নীচের তলার  তিনটে  এ্যাপার্টমেন্টের  দরজা বন্ধ করে দেয়া হোলঅর্থাৎ ওরা আমার ফিরে আসার জন্যে অপেক্ষা করছিলআমি ভ্রুক্ষেপ না করেই দোতলায় আমার ঘরে চলে  এসেছিঘরে এসে দেখলাম আজো ওই একি কাজই করে গেছেইদানিং ওরা আমার এয়ারকন্ডিশনারের ভেন্ট দিয়ে  অথবা রেফ্রিজিরেটরের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে  এসে আমার ওষুধের কৌ্টোটা  থেকে  ষুধ গুলো নিয়ে  খালি  কৌ্টোটা  ফেরত দিয়ে  যাচ্ছে

 

বুধবারঃ

 

আজ আমার ম্যানেজারের ওপর ভীষণ বিরক্ত হয়েছিকিছুতেই বিশ্বাস করছে না যে ওরা আজ সকালে আমার টেবিলের ওপর রাখা ইন্ডেক্স কার্ডগুলো এলোমেলো করে রেখে গেছে  তার মানে ওরা আমার কাজের জায়গাতেও আসা শুরু করেছেআমার চেয়ারের কুশনটা শক্ত করে  টেপ দিয়ে চেয়ারের হাতলের সাথে আটকে রেখেছিলামদেখলাম ওরা ওটাও খুলে রেখে গেছেআমার দুপুরের লাঞ্চের নিউট্রা ড্রিঙ্কও ওরা নিয়ে গেছেম্যানেজার মহিলা বললো, প্রমাণ দাও যে কেউ আসলেই তোমার সাথে এগুলো করছে  আর এটা করে কার কি লাভ?”  আমি অবাক হয়ে বললাম, এটা একধরনের  নিম্নশ্রেনীর রসিকতা করছে ওরা আমার সাথেম্যানেজার বললো, ওরা কারা?  আমি  কঠিন স্বরে বললাম, আমি কী জানি ওরা কারা তবে মনে হচ্ছে ওরা একটা  সঙ্গবদ্ধ দল যারা চায় না আমি পৃথিবীর সকল সমস্যার সমাধান করিমহিলা মৃদু হেসে আমার হাতে একটা ফাইল ধরিয়ে বলল, এবারে ডেস্কে গিয়ে কাজ কর

 

বৃহষ্পতিবারঃ

 

আজ  কম্পিউটারে  কাজ করতে আঙ্গুলে ব্যথা করছিলোসকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি ওরা রাতে এসে আমার আঙ্গুলের নখগুলো ঊপড়ে  উঠিয়ে  রেখে গেছেনখের পাশের চামড়া গুলো ছিঁড়ে ফেলেছেএ সপ্তাহে ঘরের দরজায় আর জানালায় আরো একটা করে পাটাতন লাগাতে হবেএ নিয়ে ছয় নম্বর পাটাতন লাগানো হবেএখন ঘরে সুর্য্যের  আলো দেখা যায় নাতবুও ওরা কিভাবে যে ঘরে আসছে?  হ্যান্ডিম্যানকে আসতে বলেছি এই  রোববারেই

 

 

শুক্রবারঃ

 

মনটা ভালো চমৎকার ঘুম হয়েছে আজঅফিসের সহকর্মীরা আমার  জন্মদিনের জন্যে একটা কেক এনেছিলোম্যানেজারও  ভালো কাজের জন্যে ধন্যবাদ দিলোআমি সবার চোখের আড়ালে আমার কেকের টুকরোটা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলামবলা তো যায় না ওরা বিষ মিশিয়ে দিয়েছে কিনা কে জানেআর আমার সহকর্মীরাও যে  ওই দলের নয়, তা কী করে বলি  আমি কিছু ক্যান্ডি রেখেছিলাম গাড়িতেসহকর্মীদের কৃ্তজ্ঞতা জানিয়ে দিতে পারতাম সেগুলো। কিন্তু ওরা কীভাবে যেনো গাড়ির  ভেতরে ঢুকে  গ্লভস কম্পার্টমেন্টটাকে  আঠা দিয়ে আটকে রেখে গেছেকিছুতেই খুলতে পারলাম না

 

শনিবারঃ

 

দুপুরে রক্ত পরীক্ষা করতে দিয়ে এসেছিযে মেয়েটি রক্ত নিলো সে বারবার তার সেলফোনের দিকে তাকাচ্ছিল আর ওখানে একটা লাল আলো জ্বলতে দেখেছি আমি বুঝেছি ওরাই ওকে  পাঠিয়েছে, আমার কথা টেপ করছেআমি বুঝে  ফেলা মাত্র মুখ  বন্ধ করে দিলাম, কিছুতেই কোন কথা বলছিলাম না   আমার সরু  পা  টার জন্যে ফিসিকাল থেরাপিস্ট যে  ব্রেস টা বানিয়েছে , ওটাও ঘরে আনলাম আজকে  ভালো করে দেখে  নিয়েছি ওটায় কোন সিক্রেট ডিভাইস লাগিয়ে  দিয়েছে  কিনা  কেনো জানি না  কদিন আগে এই  ফিজিকাল থেরাপিস্ট  আমার সাইকিইয়াট্রিস্টের  টেলিফোন নম্বর নিয়েছেআমার  সাইকিয়াট্রিস্ট ভালো মানুষ আমায়  শুধু  এই একটা মানুষই বিশ্বাস করে ইনিই  একমাত্র যে জানেন যে ওরা আছে,  এবং ওরা আসে  উনি কিছুতেই মনে করেন না যে,  আমি   স্কিটজোফ্রেনিক প্যারানইড  হতে পারিসে জানে আমি মোটেও নখগুলো নিজে উপড়ে ফেলিনি বা ইন্ডেক্স কার্ডগুলো এলোমেলো করিনিআমার ম্যানেজার আর পুলিশের মত সে কখনই বলে নাপ্রমা দাও, প্রমা দাও

 

ওকে আমিও বিশ্বাস করি বলেই  ওর দেয়া  ষুধ খাই  তিনি কোন প্রমা চাননি শুধু অনুরোধ করেছে  একটাই তার অনুরোধ রাখতেই  রোজ আমার এই ডায়েরী  লেখা

 

রোববারঃ

 

আজ রোববার অফিস নেই বাইরে অন্য কোন কাজও নেইদিনের বেলায়  ঘরে থাকতে  ভীষণ ভয় হয়, যদি ওরা এসে পড়ে!

 

আজ ডায়েরী টা সকালেই লিখছিহ্যান্ডিম্যান এসেছেএসেই খাবারের টেবিলের ওপর পড়ে থাকা আমার ঘরের  চাবিটাকে চোখ দিয়ে  স্ক্যান করে নিলোহয়ত চোখের তারায় লাগানো আছে কোন ক্যামেরাবেটেঁ মত এই লোকটা ঘরে  ঢুকেই আৎকে  ঊঠে বলছে, কি করেছো এসবএ ঘরে আগুন  লাগলে বেরুবে কি করে? দরজায়  পাঁচটায় তালা কেনো?  বাথরুমের  বাথ টাবের ভেতরে  বিছানা কেনো”?

 

অসম্ভব মেজাজ খারাপ এখন আমারলোকটা এত্তো কথা বলেছে কেনো ? আগুনের  কথা ললো কেন? আমায় পুড়িয়ে মারবে না তো? আমার প্রচন্ড ভয় করছেঘাম হচ্ছে সারা গায়েহাতের কাছেই একটা মোটা বই ছিলো সজোড়ে ছুঁড়ে মেরেছি লোকটার দিকেহাঁপরের  মত নিঃশ্বাস পড়ছে আমার আমি ডায়েরী হাতেই দৌড়ে বারান্দায় চলে এসেছি, এই  শেষ কটা লাইন লিখতে

 

আমি  এখনি বারান্দা থেকে লাফিয়ে পড়বো, তার পর পাখী হয়ে ঊড়ে  যাবো সদা প্রভু আমায় উড়ে  যাবার  জন্যে শক্ত দুটো ডানা দেবেনশ্বর আজ আমার দোষে হেইতিতে ভুমিকম্প দিয়েছেন,  আরো দুর্যোগ দেবে…………

 

হলো না!  লাইনটা শেষ করার আগেই  ছয়জন  দৈত্যের মত  মানুষ এসে  দাঁড়িয়েছে বলছে আমায়, বেকার এক্ট  করা হোল

 

ডঃ সাইকিয়াট্রিস্ট আপনার কথা মত ডায়েরীটা লিখে রাখলামপ্রমা করার জন্যে যে ওরা সত্যি ই আমায়  ধ্বংস করতে চাইছে

 

আমি জানি এখন আবার সেই  ৭২ ঘন্টা নানা পরীক্ষা নিরীক্ষাতারপর সাইকিয়াট্রিক ওয়ার্ড আবার সেই রিহ্যাব, আবার সেই  সঙ্গীহীনতা,আবার সেই একলা আমির একাকীত্ব

 

————————————————————-

 

বেকার এ্যাক্ট: একে ফ্লোরিডা মেন্টাল হেলথ এ্যাক্ট ১৯৭১ ও বলা হয়এই এ্যাক্টের  আওতায় স্বেচ্ছা বা অনিচ্ছেয়  মানসিক  অসুস্থ্য কোন ব্যাক্তিকে মানসিক  অবস্থা  পরীক্ষার জন্যে কোন ফেসিলিটিতে নিয়ে যাওয়া যায়আশে পাশের মানুষ যদি লক্ষ্য করে যে উক্ত  ব্যাক্তি মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করার মত অবস্থায় নেই নিজের ক্ষতি করতে উদ্যত, চিকিৎসা নিতে রাজী নয় তখন আইন শৃংঙ্খলা কর্মীদের সাহায্য চাইতে পারে  এ সময়ে বিশেষ লক্ষণীহলো উক্ত ব্যাক্তি চোখের দিকে সরাসরি  তাকাতে সমর্থ কি না স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি  কথা বলছে কিনা, এক সাথে অনেক বিষয়ে  কথা বলছে কিনা প্রতি নিয়ত নড়াচড়া করছে কিনা মনযোগ দিতে অক্ষম, ক্ষণে খুশী ক্ষণে দুঃখে ভেঙ্গে  পড়ছে কিনা  সময় দিনক্ষণের হিসেব রাখতে পারছে  কিনা হঠাৎ  করে অসংলগ্ন কাপড় পড়লে বা বিবস্ত্র হয়ে  পড়লে,   হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করলে বা  সব কিছুতে নিজেকে দোষারোপ করলে, কল্পনা প্রসুত বিষয়কে সত্যি হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিক্রিয়া করছে কিনা  অথবা  আত্মহত্যার  ইচ্ছে পোষ করছে কিনা এই সময়ে ব্যক্তিটির মানসিক পরীক্ষার প্রয়োজন আছে বলেই এই  এ্যাক্টের সুচনা করা হয়এটি ব্যক্তি স্বাধীনতার বৈরী অবস্থান  কিনা  সে বিষয়েও অবশ্য তর্ক করা যেতে পারে

 

স্কিটজোফ্রেনিক প্যারানইড:  মানসিক  অসুস্থ্যতা, যাতে ব্যক্তি অসংলগ্ন বা ভ্রম কল্পনা করেন এবং ক্ষেত্র বিশেষে এর সাথে ভীতিও যুক্ত  হতে পারে 

 

 

 

[133 বার পঠিত]