বৈচিত্র্যই সৃজনশীলতার চালিকাশক্তি। বিবর্তনের পথ ধরে অদ্ভুতুড়ে এই পৃথিবীর বুকে প্রথম যে চিন্তাশীল মানুষেরা ঘুম থেকে জেগে উঠেছিল তাদের প্রথম প্রশ্নের ইন্ধন জুগিয়েছিল বৈচিত্র্য। আকাশে সর্বশক্তির উৎস সূর্য, রহস্যময় চন্দ্র আর অসংখ্য তারার হাতছানিই মানুষকে করেছিল অনুসন্ধিৎসু। তবে অসীম আকাশে আমাদের কোন বিচরণ ছিল না, বিচরণ ছিল এই ভূ-প্রকৃতিতে। ভূ-প্রকৃতির সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল জীবন। জীবকূলের রহস্য উদঘাটন করতে করতেই আমরা স্বয়ং জীবনের রহস্য ভেদ করার পথে এগিয়ে চলেছি। এমনকি চার্লস ডারউইনও প্রকৃতির জীব-বৈচিত্র্য দেখেই প্রথম বিবর্তন নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন। তার “অন দি অরিজিন অফ স্পিসিস” বইয়ের প্রথম দুটি অধ্যায়ই বৈচিত্র্যের উদ্ভব নিয়ে। প্রথম অধ্যায়ে দেখিয়েছিলেন কিভাবে মানুষ বৈচিত্র্যের সৃষ্টি করেছে, আবার দ্বিতীয়টিতে লিখেছিলেন কিভাবে প্রকৃতির মধ্যেই এতো শত বৈচিত্র্যের সৃষ্টি হতে পারে।

জীবের বৈচিত্র্য বলতে মূলত প্রজাতির বৈচিত্র্য বোঝায়। তাই জীববৈচিত্র্য তথা বায়োডাইভার্সিটি বোঝার আগে দেখে নেয়া যাক প্রজাতি কাকে বলে। প্রজাতির অনেক ধরণের সংজ্ঞা রয়েছে, তবে সবচেয়ে সরলভাবে বলা যায়, যদি দুই জীবের অন্তঃপ্রজননের মাধ্যমে বংশধরের জন্ম হয় এবং সেই বংশধরের মাঝেও প্রজননের ক্ষমতা থাকে তাহলে জীব দুটিকে একই প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত করা যায়। অণুজীবের ক্ষেত্রে এই সংজ্ঞার অনেক হেরফের হয়, তারপরও সাধারণ ধারণার জন্য এটি উপযোগী। তো পৃথিবীতে প্রজাতির সংখ্যা কত? নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। বর্তমানে মাত্র ১৪ লক্ষের মত প্রজাতির তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে, যদিও অনুমান করা হয় প্রজাতির সংখ্যা ১ কোটি থেকে শুরু করে ১০ কোটি পর্যন্ত হতে পারে।

এই বিশাল বৈচিত্র্যের উদ্ভব কিভাবে হয়েছে ১৮৫৯ সালের আগে সে সম্পর্কে আমাদের সুস্পষ্ট কোন ধারণা ছিল না। পৌরাণিক কাহিনীতে বিশ্বাসী মানুষেরা ধারণা করতো, অসীম শক্তিধর কেউ সবগুলো প্রজাতিকে বর্তমান রূপেই পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। কিন্তু যত প্রজাতি জীবিত আছে অতীতে তার চেয়ে অনেক বেশি প্রজাতির বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এবং এদের মধ্যে নিয়ত পরিবর্তনশীলতা ভাবিয়েছে প্রাজ্ঞদের। ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব অবশেষে সমাধান এনে দিয়েছে। আমরা বুঝতে পেরেছি- এক প্রজাতি থেকেই বিবর্তিত হয়ে এক বা একাধিক নতুন প্রজাতির জন্ম হতে পারে, পথে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে অনেকে। এটি প্রকৃতির অন্ধ প্রক্রিয়া ডারউইন যার নাম দিয়েছিলেন প্রাকৃতিক নির্বাচন।

বিবর্তন তত্ত্ব মানুষকেও প্রকৃতির সাথে গেঁথে দিয়েছে এক সূত্রে, কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস আমাদেরকে প্রকৃতির কর্তা বানিয়েছিল, বিবর্তন কর্তা থেকে নামিয়ে আমাদেরকে প্রকৃতিরই অংশ করে দিল। আমাদের শেখালো: না প্রকৃতিকে শাসন করা নয়, বাস্তুতন্ত্রে মিশে যাওয়াই আমাদের জন্য সবচেয়ে লাভজনক। বায়োডাইভার্সিটি তথা জীববৈচিত্র্য নামের মাধ্যমে এক নতুন দার্শনিক চিন্তাধারার জন্ম হয়েছে যা সমাজ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। প্রকৃতির কাছে আমাদের যে অধিকার আপাত নগণ্য মাকড়সা বা সুন্দরবনের বাঘ এর অধিকার তার চেয়ে কোন অংশেই কম না। মস্তিষ্কের উন্নতি আমাদেরকেই একমাত্র প্রজাতি করেছে যাদের অধিকার-কর্তব্য বিষয়ক সচেতনতা রয়েছে। তাই প্রকৃতিতে সকলের সমানাধিকার প্রণয়নের দায়িত্বও আমাদের।

শিল্প বিপ্লব এবং প্রযুক্তির বিস্ফোরণের কারণে বিংশ শতাব্দীতে এমন কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে বাস্তুতন্ত্র, আশংকাজনকভাবে কমে যেতে শুরু করেছে জীববৈচিত্র্য। জনসংখ্যা বিস্ফোরণ প্রকৃতির অন্য সব জীবের অধিকার হরণ করেছে। কখনও আমরা সজ্ঞানে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছি, যেমন পশু শিকার, বন উজাড়, আবার কখনও নিজেদের অজান্তে বিলুপ্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছি। তাই সময় এসেছে প্রকৃতি রক্ষার, বায়োডাইভার্সিটির ব্যানারে সবার একত্রিত হবার, নয়তো ধ্বংস করতে করতে কবে আমরা নিজেরাই ধ্বংসের মুখে পতিত হব। নৈতিক দর্শন বলে, নিজেদেরকে ধ্বংস থেকে রক্ষার জন্য নয় বরং নিঃস্বার্থভাবে প্রতিটি প্রজাতিকে বাঁচতে দেয়াটাই সর্বোচ্চ নৈতিকতা এবং পরিবেশের প্রতি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব সেটাই হওয়া উচিত।

বিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা একমত যে প্রত্যেক প্রজাতির এক ধরণের অন্তর্জাত মূল্য রয়েছে যা তার বেঁচে থাকাকে যথেষ্ট মূল্যবান করে তোলে। সেই মূল্য বিচারের জন্যই ২০১০ সালকে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই সালের মধ্যে জীববৈচিত্র্য হ্রাসের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনার শপথ নেয়া হয়েছে। এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টির স্বপ্ন দেখছি আমরা যেখানে “জৈববৈচিত্র্যই জীবন, জীববৈচিত্র্যই আমাদের জীবন”- এই শ্লোগানের মাধ্যমে আমরা নিজেরাই নিজেদের নৈতিকতাকে এক নতুন স্তরে নিয়ে যেতে পারি।

তথ্যসূত্র:

পৃথিবীতে প্রজাতির সংখ্যা কতো?
জীববৈচিত্র্য একটি নতুন দার্শনিক ও নৈতিক চেতনার জন্ম দিয়েছে।

[লেখাটি মূলত সমকাল এর “কালস্রোত” এর জন্য লেখা। এজন্য বেশি ডিটেল করার সুযোগ ছিল না।]

[359 বার পঠিত]