স্বপ্নাদের সাথে সাথে স্বপ্নরাও হারিয়ে যায়

 

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা ছিল অনন্যসাধারণ। এই বেতার কেন্দ্র থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়ানোর জন্য অসংখ্য অবিস্মরণী গান সৃষ্টি করা হয়েছে। সেই সব গান এখনো আমাদের মুখে মুখে ফেরে। আমার মতে ওই সব অবিস্মরণী গানের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ গানটি হচ্ছে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে। গানটি গেয়েছিলেন স্বপ্না রায়। কুমিল্লার মেয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় মাত্র একুশ বা বাইশ বছরের তরুণী ছিলেন  তিনি।

 

আমার কেন যেন যে কোন গানই প্রথমবার রেকর্ড করা প্রথম শিল্পীরটাই সবচেয়ে ভাল লাগে। ওই গান পরে আরো বড় কোন শিল্পী গাইলেও আর ভাল লাগে না। এমনকি সেই শিল্পী নিজে গাইলেও না। সাবিনা ইয়াসমিন তার বেশ কিছু জনপ্রিয় গান আবার গেয়ে একটা সিডি বের করেছেন। আমার মোটেও ভাল লাগেনি। তার প্রথমবার গাওয়া গানগুলোই আমার বেশি পছন্দের।

 

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে গানটার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। স্বপ্না রায়ের পর অসংখ্য শিল্পী এই গানটি গেয়েছেন। কিন্তু আর কারো কন্ঠেই আমি স্বপ্না রায়ের সেই আবেগ খুঁজে পাইনি। হয়তো সময় একটা বিশাল ফ্যাক্টর। আবেগ হয়তো সময়ের উপর বিপুলভাবে নির্ভরশীল।

 

গোবিন্দ হালদার নামের কলকাতা আয়কর দপ্তরের এক কর্মী, যিনি ছিলেন একজন গীতিকবি, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে একগাদা অসাধারণ গান লিখে দিয়েছিলেন। আমরা কত কত আলতু ফালতু লোককে সম্মাননা দিয়েছি। অথচ এই সাদাসিধে মানুষটিকে সম্মান জানাতে পারিনি, দিতে পারিনি তার প্রাপ্য মর্যাদাটুকু।

 

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে গানটির সুর দিয়েছিলেন আপেল মাহমুদ। রেকর্ডিং এর সময়  গায়ে ১০৪ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে গানটি গেয়েছিলেন স্বপ্না রায়।

 

কেউ কি জানেন স্বপ্না রায় এখন কোথায়? কোথায় হারিয়ে গেলেন তিনি? বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন? স্বপ্না রায়ের কোন হদিস এখন পর্যন্ত আমি পাইনি। কী আশ্চর্য তাই না। এরকম অবিস্মরণীয় একটি গানে যিনি কণ্ঠ দিলেন, তিনি কোন স্বপ্নের মাঝে হারিয়ে হারিয়ে গেলেন তার কিছুই আমরা জানি না।  

 

অবশ্য জেনেই বা কী হবে  আমরাতো সবকিছুই ভুলতে চলেছি। যে মুক্তিযোদ্ধারা একদিন জানপ্রাণ দিয়ে যুদ্ধ করে আমাদের একটা স্বাধীন দেশ দিয়ে গেছে তাদেরকেই ভুলতে চলেছি আমরা। কদিন পরে হয়তো ভিনদেশী পরম বীর চক্রদেরকেই মাথায় নিয়ে নাচবো আমরা। তারা না থাকলে কী আর স্বাধীন হতাম আমরা?

 

আমাদের হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন স্বপ্না রায়। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে যারা আমাদের স্বাধীনতা এনেছেন আমরা তাদেরকে কোনদিন ভুলবো না। সেই প্রতিশ্রুতি থেকে অনেক দূরে সরে এসেছি আমরা। আমরা শুধু ভুলিইনি। এখন কোমর বেধে মাঠে নেমেছি তাদেরকে অপমান করার জন্য। স্বাধীনতার সূর্যকে বন্দী করার জন্য একদিন যারা জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিল, আজ তাদেরকেই শুনতে হচ্ছে ভারতীয় বীরদের বীরত্বগাঁথার কথা।

 

হোসেন ফরিদ নামের একজন নৌ-কমান্ডো দ্বিতীয় অপারেশন জ্যাকপটের সময় চট্টগ্রামে ধরা পড়েছিলেন পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে। পাকিস্তানীরা তার অর্ধেক শরীর ম্যানহোলের মধ্যে ঢুকিয়ে বাকী অর্ধেকে উলটো দিকে চাপ দিয়ে মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিয়ে তাকে হত্যা করেছিল নির্মমভাবে। কোন জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী তারা এটা করেছিল কে জানে? 

 

ভারতীয়রা যখন তাদের লোকক্ষয় হবার ভয়ে পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পণ করানোর ফন্দিফিকির খুঁজছিল,  তোমরা তখন অকুতোভয়ে জানবাজি রেখে প্রস্তুত হচ্ছিলে নিয়াজীর সদরদপ্তর আক্রমণ করার জন্য। ধূর্ত ভারতীয় জেনারেল শুধু মাথামোটা পাকিস্তানী জেনারেলকেই ব্লাকমেইল করেনি তোমাদের ভয় দেখিয়ে, তোমাদেরকেও ধাপ্পাবাজি দিয়ে আক্রমণ থেকে বিরত রেখেছিল। নইলে যে তোমাদের সাজানো মঞ্চে দাঁড়িয়ে গলায় ফুলের মালা পরা যেত না। বন্ধু ভেবে তোমরা যাকে নিয়ে এসেছিলে বিয়ের বরযাত্রীতে, সেই বন্ধুই তোমাদের ঠেলে সরিয়ে দিয়ে নির্লজ্জ্বের মত মাথায় পাগড়ী পরে কনের পাশে গিয়ে বসে পড়েছে আকর্ণ বিস্তৃত হাসি নিয়ে।

 

এই মুক্তমনার প্রথম পাতাতেই উইকিযুদ্ধ নামে একটা প্রবন্ধ আছে। উইকিতে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মহাযজ্ঞ শুরু করার কথা বলা হয়েছে। অনেকেই দেখলাম সেখানে তাদের জানপ্রাণ দিয়ে দিতে চেয়েছেন। অথচ মুক্তমনায় যখন মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় অবদান স্বীকার করার নামে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা করা হয়, ভারতীয়দের হাইলাইট করার মাধ্যমে আমাদের বীরত্বগাঁথাকে বুঝে অথবা না বুঝে খাটো করা হয়, তখন কাউকে পাওয়া যায় না এক লাইনের একটা প্রতিবাদ জানাতেও।

 

হোসেন ফরিদসহ অসংখ্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আমার আর কিছু নেই। তোমাদের কথা দিয়েছিলাম কোনদিন ভুলবো না, কিন্তু সেই কথা রাখতে পারিনি আমরা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আর কখনো কিছু লিখবো কিনা সে বিষয়েও গভীরভাবে চিন্তা করছি আমি। হৃদয়ে এত রক্তক্ষরণ আর সহ্য হয় না। একা একা আত্মহত্যা করা যায়, যুদ্ধ করা যায় না।

 

স্বপ্না রায়ের মত  আমাদের স্বপ্নগুলোও যে হারিয়ে গেছে তেপান্তরের মাঠে। 

 

 

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA
 

 

 

[68 বার পঠিত]