এক ষোড়শীর জন্মোৎসবে

কল্যানীয়া জাহিন, জাহিনের বন্ধুরা ও উপস্থিত সুধিবৃন্দ,

শুভ সন্ধ্যা। জাহিন, তোমার এই বিশেষ জন্ম দিনে আমরা সবাই তোমাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। আপনাদের জন্যে যেমন, আমার জন্যেও আজ একটি বিশেষ দিন। আমার বিশেষ দিন কেন, কেউ কি বলতে পারেন?……। আমার জন্য এটি একটি বিশেষ দিন কারণ আমি আজকে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি, আর মাইক্রোফোন হাতে আছে বলে আপনারা সবাই আমার কথা শুনছেন। কারণ, বাড়িতে আমি যতই কথা বলি না কেন, আমার স্ত্রী আমার কথা শোনেন না, কাজে ব্যাস্ত হয়ে থাকেন! আগে শুনতেন, যখন আমার বয়স কম ছিল, অবশ্যই, জাহিন, তোমার থেকে অনেক বেশি বয়স ছিল। এখন অবশ্য তিনি আমার ছেলেদের কথাই বেশি শোনেন। তাই বলছি, জাহিন, তোমার মা এখন তোমার কথা আগের চেয়ে অনেক বেশি শুনবেন। তুমি সত্যিই খুব ভাগ্যবতী, তোমার এতোগুলো বন্ধু এখানে, তোমার বয়সে আমার এর সিকিভাগও ছিল না। যাই হোক, যেহেতু মা তোমার কথা বেশি শুনবেন, এই সুযোগে তাকেও তুমি একজন ভাল বন্ধু বানিয়ে নিতে পার। এর লাভটা এখন না বুঝলেও আরো বড় হয়ে বুঝতে পারবে।

আমার জন্য এটি একটি বিশেষ দিন কারণ আমি তোমার মত একটি বিশেষ মেয়ের জন্মদিনে কথা বলতে পারছি। তোমার জন্ম হয়েছিল বাংগালির বিজয়ের মাসে, ১৪ তারিখে। সত্যি বলতে কি, এদিনটিতে বাংলাদেশের বেশির ভাগই পাক হানাদার মুক্ত হয়ে গিয়েছিল, শত্রুর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ শুধু দুদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। দীর্ঘ নয় মাস পাকি পৈশাচিকতার খোয়াড়ে আবদ্ধ থেকে আমরা মুক্তির অপেক্ষায় ছিলাম। কাজেই তুমি আমাদের বিজয়ের প্রতীক। এই দিনে বহু বিশ্ববরেন্য ব্যাক্তি জন্মগ্রহণ করেছেন। পাঁচশত বছর আগে এইদিনে, অনেকের মতে, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ঐন্দ্রজালিক (wizard) নষ্ট্রডমাস জন্মেছিলেন ফ্রান্সে। প্রায় সোয়া’শ বছর আগে ষষ্ঠ জর্জ জন্মেছিলেন এই দিনে, বড় ভাই এর ভাগ্যের সিকা ছিড়ে যাওয়াতে তিনি হয়েছিলেন বিলাতের সম্রাট, দীর্ঘ চব্বিশ বছর পর্যন্ত। আর ইদানিং কালের পেন্সিলভানিয়ার সুপ্রিম কোর্টের জাষ্টিস থমাস সেয়লার ও জন্মেছিলেন এই দিনে। আমরা কামনা করি তাঁদের মতই তোমার মাঝে প্রকাশ হোক খ্যাতিমান, ভাগ্যবান, নেতৃত্ব ও ধীশক্তি সম্পন্ন ন্যায়পরায়ণ ব্যাক্তিত্ব। আমরা অতিশয় আনন্দিত যে তোমার প্রশংসনীয় বিশেষত্বের স্বাক্ষর ইতিমধ্যেই তুমি রেখেছো স্কুলের প্রতিটি পরীক্ষায় ‘এ’ পেয়ে, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অসংখ্য ট্রফি ও সনদ পেয়ে। আমরা সত্যিই তোমার জন্য গর্বিত।

জাহিন, তুমি একটি বিশেষ মেয়ে (স্পেশ্যাল গার্ল), কারণ তোমার জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত বেড়ে ওঠার প্রতিটি মুহুর্ত তোমার মা-বাবার কাছে ও আমদের কাছে বিশেষ মুল্যবান হয়ে আছে ও থাকবে। এই মুহুর্ত গুলো বিশেষ অর্থবহ এই জন্য যে এর পরিমাপ বা তুলনা করার মত কোন মুহুর্ত আর সষ্টি হয় নাই ও কোন দিন আর হবেও না। তাঁদের কাছে এই মুহুর্ত গুলো শুধু তোমার জন্যই সৃষ্টি হয়েছিল, শুধু তোমার কল্যানের জন্যেই নিবেদিত ছিল, তোমার অন্য কোন ভাই-বোন বা পৃ্থিবীর কোন প্রাণীর প্রয়োজনের অংশীদার ছিল না। আমরা দেখেছি জন্মের পর থেকে কিভাবে তাঁরা তোমার প্রথম হাসিতে, প্রথম মা প্রথম বাবা শব্দ শব্দ উচ্চারণ শুনে আনন্দ পেয়েছেন, যেদিন প্রথম নিজে বসতে শিখেছিলে, নিজে টলতে টলতে দাড়াতে শিখলে, দু’কদম হাঁটতে শিখলে – তাদের সে স্বর্গীয় আনন্দ তুমি দেখলেও তোমার মনে থাকার কথা নয় – আমাদের মনে আছে, তোমার অসুখে বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন – ডাক্তারের কাছে ছুটে গিয়েছেন, তোমার খেলার সাথি যোগাড় করে দিয়েছেন, ভাল স্কুলে পাঠানোর জন্যে চাকুরি ও বাড়ি বদল করেছেন। আজ সেসব সিড়ি ডিংগিয়ে তুমি ষোড়শীর মঞ্ছে উঠে বসেছো। শারিরিক ও মানসিক দিক থেকে তুমি বাল্যকাল ও কৈশোরের সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছো। তোমার মাঝে শিশুসুলভ চপলতা যেমন রয়ে গেছে, তেমনি একটু গম্ভির ভাবও যেন আমরা দেখতে পাচ্ছি। তোমার এই দুটো রূপই আমরা আনন্দের সাথে উপভোগ করি। তোমার চোখেমুখে বহির্বিশ্বের স্বাধিনতার হাতছানি, নিজেকে আবিস্কারের ঔৎসুক্য, নিজের ক্ষমতা যাচাই এর অভিগ্রহ। এই বিবর্তন সবার জীবনেই এসেছে, পৃথিবীতে শত কোটিবার, কিন্তু প্রতিবারেই নুতন ভাবে, প্রতিবারেই একটি স্বকীয়তা নিয়ে। তোমারটিও তাই অতুলনীয়। এ সত্যিই এক দারুণ বয়স! আমি ও তোমার চেয়ে বয়সী সবাই সেটি পার হয়ে বা হাড়িয়ে এসেছি। হাড়ানো দিনের আমেজ নিতে ও তোমাকে অভিনন্দন জানাতে আমরা তোমার এই সুখময় দিনে আসতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত।

আজকের এই বিশেষ দিনে তোমার জন্য আমার একটি উপহার আছে। সেটি একটি গল্প, আরো বিশেষ ভাবে বলতে গেলে, একটি গল্পের তিনটি অংশ। গল্প নয়, এটি ব্রাজিলের ‘পাওলো কোয়েহলো’ নামে এক লেখকের ‘দি আলকেমিষ্ট’ নামে একটি বিখ্যাত উপাখ্যান, তা থেকে নেয়া। মধ্যযুগের পটভুমিতে গত শতাব্দির শেষ দিকে লেখা। এটি যদি তোমার পড়া হয়ে গিয়ে থাকে তবে ধরে নিও একই জিনিসের দুটো উপহার তুমি পেয়েছো। ভাল জিনিসের দুটো উপহার পেতে তো ভালই লাগে, তাই না? প্রায় তোমার বয়সেরই সান্তিয়াগো নামে স্পেনের একটি ছেলে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে বাবাকে বললো সে পরিব্রাজক হয়ে দুনিয়া ঘুরে দেখতে চায়। বাবা বললেন, আমাদের দেশটি কত সুন্দর, সারা দুনিয়ার লোক আমাদের দেশ দেখতে আসে, তুমি এর বাইরে কি দেখতে চাও? ছেলে নাছোড় বান্দা দেখে বাবা তার সম্বল তিনটি স্বর্ণমুদ্রা ওর হাতে দিয়ে বলেছিলেন, তুমি পৃথিবীর যেখানেই যাও না কেন, মনে রেখো এটিই তোমার বাড়ি, এটিই তোমার দেশ। আষ্চর্য্যের ব্যাপার কি জান? বহু বছর অনেক দেশ ঘুরে ছেলেটি বাবার শেষ কথাটিই সত্যি বলে প্রমাণ পেয়ে ঘরে ফিরে এলো! আসলে কি জান? ছেলেটির বাইরে যাওয়া যেমন প্রয়োজন ছিল, বাবারও ঘরের কথা মনে করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন ছিল।

উপাখ্যানের দ্বিতীয় ঘটণা হল, স্বপ্নে পাওয়া গুপ্তধনের খোঁজে সান্তিয়াগো এক পৌরাণিক বুড়োর কাছে গিয়ে হাযির হোল। বুড়ো বললেন, শোন ছোকড়া, কেউ যদি সর্বান্ত করণে কোন কিছু চায়, তবে বিশ্বব্রম্মান্ডের সবাই মিলে যুক্তি করে তাকে সেটি পেতে সাহায্য করে। ছেলেটি বুঝতে পারলো, চাওয়ার ও পাওয়ার ক্ষমতার সমন্বয় করার মাঝেই তার সাফল্য নির্ভর করবে। জাহিন, আমিও বলতে চাইছি, জীবনে তুমি যাই হতে চাও বা পেতে চাও, সেটি তোমার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে, প্রয়োজন তোমার একাগ্রতা ও প্রস্তুতি।

যাওয়ার আগে সেই পৌরাণিক বুড়ো সান্তিয়াগোকে গায়ে পড়ে একটি গল্প শুনালেন। এক লোক তার ছেলেকে পাঠালেন পৃথিবীর সবচেয়ে জ্ঞ্যানী লোক খুঁজে তার থেকে সুখী হওয়ার রহস্য জেনে আসতে। চল্লিশ দিন ধরে মরুভুমি, সমুদ্র, বন বাদাড় পারি দিয়ে ছেলেটি এক পাহাড়ের গোড়ায় এসে দাড়ালো। পাহাড়ের চূড়ায় এক বিশাল প্রাসাদে থাকেন তার মালিক, পৃথিবীর সেই সবচেয়ে জ্ঞ্যানী লোক। অনেক অপেক্ষার পর যখন দেখা মিললো, সব শুনে তিনি বললেন, আমি তো এখন খুব ব্যাস্ত, কথা বলার খুব সময় নেই, তুমি বরং আমার প্রাসাদটা ভাল করে ঘুরে দেখে এসো, অনেক মজার জিনিস দেখার আছে, তোমার খুব ভাল লাগবে। আর হ্যা, শোন, আমি ক’ফোটা তেল এই চামচটাতে ঢেলে দিচ্ছি, এটি হাতে রাখবে আর সাবধান, যেন তেল মাটিতে পড়ে না যায়। সমস্ত প্রাসাদ ঘুরে দু’ঘন্টা পর ছেলেটি ফিরে আসলে তিনি বললেন, কেমন লাগলো? যাদুকরের তাসের খেলাটি খুব মজার না? দক্ষিনের সেই বড় হলঘরের দেয়ালে ঝুলানো পারস্য থেকে আনা আমার সতরঞ্ছিটা দেখেছো, আর পাঠাগারটি তোমার কেমন লাগলো? ছেলেটি খুব লজ্জা পেয়ে জানালো সে সবখানেই গেছে, কিন্তু সর্বদা চামচের তেলের ওপর দৃষ্টি রাখাতে প্রাসাদের কিছুই উপভোগ করতে পারে নাই। মহাজ্ঞ্যানী বললেন, আরে বোকা, আমার কাছে সুখী হওয়ার উপায় জানতে হলে প্রথমে আমাকে জানতে, বিশ্বাস করতে হবে। আর আমাকে জানতে হলে আমার কাজ, আমার ভাল লাগা, মন্দ লাগা, তোমার জানতে হবে। যাও আবার ঘুরে দেখে এসো। কয়েকঘন্টা পর ভীষণ খুশি মনে ফিরে আসলে মহাজ্ঞ্যানী জিজ্ঞেস করলেন, আরে তোমার চামচের তেলটা কোথায় গেল? সান্তিয়াগো এবারও লজ্জা পেল, তন্ময় হয়ে প্রাসাদের সব কিছু দেখতে গিয়ে কখন চামচ থেকে সব তেল গড়িয়ে পড়ে গেছে খেয়ালই ছিল না। মহাজ্ঞ্যানী বললেন, দেখ ছেলে, তোমাকে শুধু একটি উপদেশই আমি দেব। তুমি সুখি হবে তখনই যখন পৃথিবীর সব সৌন্দর্য দুচোখ ভরে দেখবে অথচ একবারও চামচের তেলের কথা ভুলবে না।

জাহিন, আজকে তোমার ষোলতম জন্মদিনে আমি এই আশির্বাদ করি যে, জীবনে সুখী হওয়ার সব সুযোগ গুলো তোমার কাছে ধরা দিক। একই সাথে চামচের তেলের মতোই তোমার বিশেষত্ব, তোমার ঘর, তোমার বাড়ী, তোমার সমাজ ও দেশচিন্তা অটুট থাকুক এবং আরো সবুজ হোক।
তোমার জন্মদিন শুভ হোক।

আমেরিকা নিবাসী মুক্তমনা সদস্য। বিজ্ঞান গবেষক।

মন্তব্যসমূহ

  1. প্রদীপ দেব ডিসেম্বর 23, 2009 at 8:05 অপরাহ্ন - Reply

    শুভ জন্মদিন জাহিন

  2. অভিজিৎ ডিসেম্বর 22, 2009 at 10:29 পূর্বাহ্ন - Reply

    শুভ জন্মদিন জাহিন! :rose2:

    তার গর্বিত পিতাকেও অভিনন্দন।

  3. ফরিদ আহমেদ ডিসেম্বর 22, 2009 at 7:06 পূর্বাহ্ন - Reply

    আপনার মেধাবী কন্যার জন্য জন্মদিনের বিলম্বিত শুভেচ্ছা রইলো। :rose2:

মন্তব্য করুন