ভারতীয় ফ্রীগেট আইএনএস খুকরি

ভারতীয় ফ্রীগেট আইএনএস খুকরি

ক্যাপ্টেন নরেন্র নাথ মাল্লা, মহা বীর চক্র

ক্যাপ্টেন নরেন্র নাথ মাল্লা, মহা বীর চক্র

দিঊ দ্বীপে খুকরির ভাগ্যহত নৌসেনাদের সম্মানে নির্মিত স্বারক

দিঊ দ্বীপে খুকরির ভাগ্যহত নৌসেনাদের সম্মানে নির্মিত স্বারক

পাক সাবমেরিন হাংগর

পাক সাবমেরিন হাংগর

৯ ই ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখটা সম্ভবত ভারতীয় নৌবাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে বিষাদময় দিন। এদিন তারা গুজরাটের দিউ উপকুলের কাছে হারিয়েছিল তাদের ফ্রীগেট আইএনএস খুকরিকে। সাথে সলিল সমাধি ঘটেছিল ১৮ জন অফিসার ও ১৭৬ জন নৌসেনার। তবে এই বিপর্যয়ের বেদনাকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে খুকরির কমান্ডার ক্যাপ্টেন নরেন্দ্র নাথ মাল্লার কর্তব্যনিষ্ঠা ও আত্মত্যাগের অনন্য নিদর্শন।

৩রা ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে শুরু হয়ে যায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ভারত পাকিস্তানের সর্বাত্মক যুদ্ধ। বাংলার পাশাপাশি দুটি দেশ পশ্চীম রনাংগনেও নিয়োযিত হল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। যুদ্ধ শুরুর সাথে সাথেই ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের কচ্ছ উপকুলে পাকিস্তানী সাবমেরিনের অনুপ্রবেশের আশংকায় সতর্ক হয়ে উঠল। তাদের পর্যবেক্ষনে দিউ দ্বীপের দক্ষিন পশ্চীমে আরব সাগরে শত্রু সাবমেরিনের উপস্থিতি ধরা পড়ে গেল। দিউ দ্বীপের অবস্থান ভারতের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ন। এই দ্বীপ থেকে ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলি করাচী বন্দরের উপর (পাক নৌবাহিনীর হেড কোয়ার্টার) মিসাইল নিক্ষেপ করতে পারে। তাই এ এলাকার পানিতে পাকিস্তানী সাবমেরিন পশ্চীম রনাংগনের যুদ্ধের হিসাব নিকাশ পালটে দিতে পারে। ভারতীয়রা তাই মরিয়া হয়ে উঠল শত্রুর সাবমেরিনে ঘায়েলে।

বোম্বে বন্দরে অবস্থানরত ভারতীয় ১৪ ফ্রীগেট স্কোয়াড্রনকে এই সাবমেরিন শিকারের দায়িত্ব দেওয়া হল। এই নৌবহরে আছে ৩ টি একই শ্রেনীর ফ্রীগেট, খুকরি, কিরপান, আর কুঠার; যাদের সবার নামই কোন ধারালো অস্ত্রের সাথে সম্পর্কিত। এই নৌবহর ডিসেম্বরের ২ তারিখ বোম্বে থেকে রওনা হল। শুরুতেই ঘটল একটি বিপর্যয়। ডিসেম্বরের ৪ তারিখে কুঠারের বয়লার রুমে বিষ্ফোড়নের ফলে সে অকেজো হয়ে গেল। কিরপানের উপর দায়িত্ব পড়ল তাকে আবার টেনে বোম্বে বন্দরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। এই ফলেই শক্তির সাম্যতায় ঘটল বড় পরিবর্তন। মারাত্মক ঝুকি থাকলেও ভারতীয় নৌবাহিনীর পশ্চীমাঞ্চলীয় অধিনায়ক এডমিরাল কোহলী খুকরি এবং কিরপানকেই পাঠানো সাব্যস্ত করলেন। তাদের আর উপায়ও নেই, বাড়ির দুয়ারে শত্রুর সাবমেরিন মারাত্মক হুমকির ব্যাপার। তবে দুই ফ্রিগেটের ভার কিছুটা কমাতে এ অপারেশনে নৌবাহিনীতে সাম্প্রতিকতম সংযোজন সাবমেরিন শিকারে সমর্থ সী-কিং হেলিকপ্টারও যুক্ত করা হল। পরিকল্পনা হল যে সী-কিং হেলিকপ্টার শিকার খুজবে সার্চ এরিয়ার দক্ষিন দিকে বোম্বের কাছাকাছি, আর ফ্রীগেট খুকরি এবং কিরপানের দায়িত্ব হবে উত্তর অঞ্চলে দিউ দ্বীপের কাছাকাছি ৫৫ মাইল বাই ৫০ মাইলের এক বিস্তীর্ন এলাকা। খুকরির অধিনায়কত্বের দায়িত্বে আছেন ৪৫ বছর বয়স্ক ক্যাপ্টেন নরেন্দ্র নাথ মাল্লা।

তাদের প্রতিপক্ষ হল পাক সাবমেরিন পিএনএস হাংগর। এটা ফ্রেঞ্চ ড্যাফনে ক্লাস সাবমেরিন যা প্রযুক্তিতে সে যুগের অন্যতম একটি আধুনিক সাবমেরিন। এর দক্ষ কমান্ডার তাসনীম আহমেদ ৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে সাবমেরিন গাজীর সেকেন্ড কমান্ডার হিসেবে পদক পেয়েছেন। গাজীর মত দীর্ঘ পাল্লার যাত্রার জন্য উপযুক্ত না হলেও এই সাবমেরিনে আছে সেসময়কার সবচেয়ে আধুনিক সোনার ডিটেকশন সিষ্টেম (শব্দ তরংগ ছুড়ে শত্রু জাহাজের অবস্থান নির্নয় করার যন্ত্র) যার রেঞ্জ ২৫,০০০ মিটার। খুকরি ছিল অনেকটা পুরনো যুগের যুদ্ধজাহাজ, প্রতিপক্ষের তূলনায় তার সোনার রেঞ্জ মাত্র ১০ ভাগের এক ভাগ; ২,৫০০ মিটার। অর্থাত, কুকরির অনেক আগেই হাংগর কুকরির অবস্থান জেনে ফেলতে পারবে। তদুপরি, গোদের উপর বিষফোড়ার মত খুকরির এই কম শক্তির সোনার সিষ্টেমও ছিল পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। এই কম শক্তির সোনারও জাহাজের পূর্ণ গতিতে নিখুতভাবে কাজ করতে পারে না। গতিবেগ কমিয়ে দিতে হয়। এই অসম শক্তির খুকরিকে আদৌ এই অপারেশনে পাঠানো উচিত ছিল কিনা সে নিয়ে আজ পর্যন্ত বিতর্ক আছে। কারন চুড়ান্তভাবে সোনার সিষ্টেমের এই পার্থক্যই জয় পরাজয়ের ব্যাবধান গড়ে দেয়। অনেকে কমান্ডার নরেন মাল্লার গতি কমাবার সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেন যদিও সোনার নিখুতভাবে ব্যাবহারের জন্য তার গতি কমানো ছাড়া আর উপায়ও ছিল না। খুকরির প্রাচীন ও দুর্বল সোনার সিষ্টেম কিছুটা শক্তিশালী করার জন্য জাহাজের ইলেক্ট্রিক্যাল অফিসার লেফটেন্যান্ট জৈন একটি নুতন ডিভাইস উদ্ভাবন করেন, যা সোনার ক্ষমতা কিছুটা বাড়ায় কিন্তু তার বিনিময়ে জাহাজের গতি কমিয়ে দিতে হয়। কমান্ডার নরেন মাল্লা ব্যক্তিগতভাবে এই গতি কমানোর ব্যাপারটা পছন্দ না করলেও তার কমান্ডিং অফিসার এডমিরাল কোহলীর নির্দেশে এই যন্ত্র খুকরিতে লাগাতে বাধ্য হন।

ভারতীয়দের কাছে ডিসেম্বরের প্রথম থেকেই ওই অঞ্চলে সাবমেরিনের উপস্থিতির খবর আসছিল। কোথাও কোথাও পানির উপর পেরিস্কোপ দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু পজিশন নিখুতভাবে সনাক্ত করার যাচ্ছিল না। অবশেষে ৭/৮ তারিখ রাতে ভারতীয় নৌবাহিনী হাংগরের সাথে করাচী নৌসদর দফতরের রেডিও মেসেজ ইন্টারসেপ্ট করে দিউ দ্বীপের ৩৫ মাইল দক্ষিন পশ্চীমে হাংগরের অবস্থান পিন পয়েন্ট করতে সমর্থ হয়। শুরু হয় ভারতীয় ফ্রীগেটদ্বয় খুকরি/কিরপান এবং পাক সাবমেরিন হাংগরের এক অসম ধাওয়া পালটা ধাওয়ার যুদ্ধ। খুকরি/কিরপান উত্তর-পূর্ব দিক থেকে ছুটে যেতে থাকে হাংগরের শেষ ডিটেক্ট করা অবস্থানের দিকে। তবে যে ভয় করা হয়েছিল, হাংগরের অত্যাধুনিক লং রেঞ্জ সোনার খুকরি অনেক দূরে গুজরাটের কাঠিয়ার উপকুলে থাকতেই ৯ই ডিসেম্বর খুব ভোরে ২টি সিগনাল ডিটেক্ট করে ফেলে। এগুলি যুদ্ধজাহাজের সিগনাল নিশ্চিত হবার পরেই সাবমেরিন হাংগর শুরু করে পাল্টা ধাওয়া। খুকরির বেয়ারিং অনুযায়ী রওনা দেয় উত্তর পূর্ব দিকে। হাংগর খুকরির প্রথম অনুমান করা অবস্থানে অবশ্য তাকে পেল না। এর ফলে হাংগরের কমান্ডার কিছুটা ঝুকি নিয়ে হলেও বেশী স্পীড পাবার জন্য একে পানির নীচ থেকে সারফেসে তুলে স্নরকেলিং শুরু করলেন। খুকরি একটি নিয়মিত আয়াতাকার পথ ধরে হাংগরকে খুজে বেড়াচ্ছিল। যদিও তার কোনই ধারনা ছিল না যে সেই পালটা শিকারে পরিনত হতে যাচ্ছে। হাংগরের উন্নত সোনারে ডিসেম্বরের সন্ধ্যা নাগাদ খুকরির এই আয়াতাকার প্যাটার্ন সার্চও ধরা পড়ে যায়। ফলে হাংগর খুকরির ভবিষ্যত অবস্থান কি হতে পারে তার একটা ভাল অনুমান পেয়ে যায়।

সন্ধ্যা ৭ টা নাগাদ হাংগর ভারতীয় ফ্রীগেটদ্বয়ের সম্ভাব্য পথের উপর একটি সুবিধাজনক আক্রমনাত্মক অবস্থানে পৌছে যায়। সন্ধ্যা ৭ টা ১৫ মিনিট নাগাদ হাংগর আক্রমনের প্রথম প্রচেষ্টা নেয়। পানির গভীর তল থেকে সে পেরিষ্কোপ তোলার মত অগভীর পানিতে উঠে আসে। পেরিস্কোপ তুলে খুকরিকে খোজা শুরু করে, কিন্তু খুকরির সব আলো নেভানো থাকায় পেরিস্কোপে কিছু দেখা গেল না। যদিও রাডারে খুকরির অবস্থান ৯,৮০০ মিটার দূরে দেখাচ্ছিল। অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন তাসনীম পেরিস্কোপের ভরসায় আর না থেকে পানির নীচ থেকে সোনারের ভরষায় আক্রমনের সিদ্ধান্ত নিলেন। এ পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে হাংগর ৫৫ মিটার গভীরতায় নেমে গেল। খুকরি টেরও পেল না যে তার আয়ু আর মাত্র কয়েক মিনিট। খুকরি অল্প বেগে সরল রেখা ধরেই চলছিল, যদিও এটা সাবমেরিনের সাথে যুদ্ধের সাধারন নীতির পরিপন্থী। সাবমেরিনের আক্রমন ঠেকাতে জিগ জ্যাগ পথে চলাই নিয়ম। কিন্তু সেই দূর্বল সোনারের কারনেই খুকরিকে এই নিরাপত্তার সাধারন নিয়ম অমান্য করতে হয়। রাত ৭ টা ৫৭ মিনিটে হাংগর ৪০ মিটার গভীরতা থেকে উত্তরে থাকা কিরপানকে লক্ষ্য করে প্রথম টর্পেডো নিক্ষেপ করে। সৌভাগ্যক্রমে এই টর্পেডো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে কিরপানের নাকের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যায়। কিরপান টের পেয়ে যায় যে সে আক্রান্ত। সেও পালটা কয়েকটি মর্টার শেল ছোড়ে হাংগরের সম্ভাব্য অবস্থান লক্ষ্য করে। এই প্রতি আক্রমনে হাংগর কিছুটা পিছু হটে যায়। যদিও এই অবস্থায় দূর্ভাগ্যজনকভাবে কিরপানের মর্টার অকেজো হয়ে যায়। হাংগর এবার তার মনোযোগ নিবদ্ধ করে খুকরির দিকে। কারন সেসময় খুকরি সাবমেরিনের সিগনাল সোনারে শোনার আশায় খুব অল্প গতিতে চলছিল আর গোলাবর্ষনও শুরু করেনি। এ সুযোগটাই হাংগর নিয়ে ফায়ার করে তার দ্বিতীয় টর্পেডো, এটা আর মিস করল না, সরাসরি খুকরির তেলের ট্যাংকের নীচে বিষ্ফোড়িত হল।

এ একটি আঘাতই ছিল খুকরির জন্য অত্যন্ত মারাত্মক। খুকরিকে আক্রান্ত হতে দেখে কিরপান আবার ফিরে এসে হাংগরের লাইন অফ ফায়ারে পড়ে যায়। হাংগর তাকে লক্ষ্য করে তৃতীয় টর্পেডো নিক্ষেপ করে। কিরপান এটা লক্ষ্য করে গতি বাড়িয়ে দ্রুত তার কোর্স বদল করে রক্ষা পেতে সমর্থ হয়। যদিও পাকিস্তানীরা দাবী করেছিল যে এই টর্পেডো কিরপানকেও মারাত্মকভাবে আহত করে। হাংগর এসময় পালটা ডেপথ চার্জ হামলার আশঙ্কায় দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে চলে যায়। ডুবতে শুরু করে খুকরি। এ সময় কিরপান পড়ে সিদ্ধান্ত গ্রহনের সমস্যায়। তার সামনে দুটি পথ খোলা; খুকরির নাবিকদের উদ্ধারে এই এলাকায় থেকে যাওয়া অথবা দ্রুত নিরাপদ এলাকায় চলে গিয়ে অকেজো মর্টার মেরামত করে আরো সাহায্য নিয়ে ফিরে আসা। এ মুহুর্তে উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়ার মানে আবারো সাবমেরিন হামলার মারাত্মক ঝুকি। তাই কিরপানকে দ্বিতীয় পথটাই গ্রহন করতে হয়। কিরপানের এই সিদ্ধান্তও পরে অনেক আলোচনা সমালোচনার জন্ম দেয়।

এদিকে অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে ডুবছে খুকরি, সময় খুবই কম। তার নৌসেনাদের বেশীরভাগই ইস্পাতের ডেকের নীচের হ্যাচে। হ্যাচ থেকে বের হবার পথ মাত্র দুটি। জাহাজ বাচানোর কোন উপায় নেই নিশ্চিত হবার পর সময় খুব ঠান্ডা মাথায় উদ্ধার কাজ পরিচালনা শুরু করলেন ক্যাপ্টেন নরেন মাল্লা। সাধ্যাতীত চেষ্টা চালিয়ে গেলেন কিভাবে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক লোককে বাচানো যায়। তিনি নিজেও কিন্তু মারাত্মকভাবে আহত। টর্পেডো আঘাত হানার শকে তিনি ক্যাপ্টেনের চেয়ার থেকে ছিটকে পড়ে লোহার দেওয়ালে বাড়ি খান, ফেটে যায় তার মাথা। তিনি অত্যন্ত সূচারুভাবে লাইফ জ্যাকেট বিতরন, লাইফ বোট নামানো তদারকি করলেন। বেশ কিছু নবীন নৌসেনা বিপদের মাত্রা পুরো বুঝতে না পেরে অনিশ্চিত কালো সাগরের থেকে লোহার হ্যাচে থেকে যাওয়াই ভাল মনে করে সাগরে নামতে চাচ্ছিল না। তাদের তিনি ধমকে সাগরে নামিয়ে দিলেন। এদেরই একজনকে দিয়ে দিলেন নিজের লাইফ জ্যাকেটটিও। ঐ নাবিক তাকে জিজ্ঞাসা করল; স্যার আপনার কি হবে? তিনি ধমকে উঠলেন, আমার কথা চিন্তা করতে হবে না, আগে নিজের জান বাচাও। তার ধীর স্থির সুশৃখল উদ্ধার পরিচালনাতেই সেরাতে কোনরকম বিশৃখলতা ছাড়াই ৬ জন অফিসার ও ৬১ জন নৌসেনা জীবন রক্ষা করতে সমর্থ হয়।

কিন্তু তিনি নিজে নাবিকদের প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী জাহাজ ছাড়তে অস্বীকার করলেন। যে জাহাজ তিনি রক্ষা করতে পারেননি তিনিও তার সাথেই তলিয়ে যাবেন, একই ভাগ্য বরণ করে নেবেন। সাগরে ভেসে বেড়ানো নাবিকেরা দেখছে তাদের ক্যাপ্টেন খুব শান্ত স্বাভাবিক ভংগীতে যেন কিছুই হয়নি এভাবে ব্রীজের রেলিং ধরে দাড়িরে আছেন, মুখে সিগারেট। কোনরকম চাঞ্চল্য নেই। সাগেরর পানি দ্রুত এগিয়ে আসছে ব্রীজের কাছাকাছি, গ্রাস করে নেবে কয়েক মুহুর্ত পরেই। ক্যাপ্টেনের কোন বিকার নেই, তিনি গিয়ে বসলেন ক্যাপ্টেনের চেয়ারে। তার এই অন্তিম বিরোচিত যাত্রায় তাকে বিশ্বস্ততার সাথে সংগ দিলেন তার সেকেন্ড কমান্ডার মাত্র ৩৪ বছর বয়ষ্ক অবিবাহিত লেঃ কমান্ডার যোগিন্দর কিসেন সুরি। তাদের এই আত্মত্যাগ ও কর্তব্যবোধে শুধু ভারতীয়রাই নয় অনেক পাকিস্তানী নৌ অফিসারও বিচলিত হন।

টর্পেডোর আঘাত লাগার পর খুকরি মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডুবে যায়। এর কিছুক্ষনের মধ্যে কিরপান আবার কচ্ছ নামের আরেকটি উদ্ধারকারী জাহাজ সমেত ঐ এলাকায় ফিরে এসে সাগরে ভেসে বেড়ানো মোট ৬ জন অফিসার ও ৬১ জন নাবিককে উদ্ধার করে। ক্যাপ্টেন নরেন্দ্র মোহন মাল্লা সহ ১৮ জন অফিসার ও ১৭৬ জন নৌসেনার ঘটে সলিল সমাধি। এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের ঐ এলাকার সব জাহাজ ও হেলিকপ্টার প্লেনের সাহায্যে পরবর্তি ৪ দিন ধরে সাবমেরিন হাংগর শিকারের লক্ষ্যে অপারেশন ফ্যালকন চালায়। এ সময় সাবমেরিনের সন্দেহজনক অবস্থানে ফেলা হয় অসংখ্য ডেপথ চার্জ। সেগুলির দুটি হাংগরের কাছাকাছি ফাটলেও সামান্য ঝাকুনি ছাড়া আর তেমন কিছু করতে পারেনি। কমান্ডার তাসনীম ডিটেকশন এড়াতে গভীর পানির ভেতর দিয়ে খুব অল্প গতিতে সাবমেরিন চালিয়ে গেলেন, ধরা পড়ার আশংকায় এমনকি তিনি তাদের ঘাটিতে খুকরি ঘায়েলের সংবাদও কয়েকদিন পরে পাঠিয়েছিলেন, রেডিও সাইলেন্স ভাংতে চাননি। কমান্ডার তাসনীম আহমেদ করাচী নৌঘাটিতে পৌছান ১৮ই ডিসেম্বর। তার দেশ ইতোমধ্যেই ১৬ তারিখে পরাজয় বরন করেছে। তবে তাকে খুকরি ডোবানর পুরষ্কার স্বরুপ সীতারা-এ-জুরত পদক দেওয়া হয়।

ক্যাপ্টেন নরেন্দ্র নাথ মাল্লাকে মৃত্যুপরবর্তি মহা বীর চক্র পদকে ভূষিত করা হয়। খুকরির মৃত নাবিকদের সম্মানে দিউ দ্বীপের একটি ছোট টিলার উপর নির্মান করা হয় খুকরির একটি স্মারক মডেল।

সূত্রঃ

http://www.defence.pk/forums/military-history/7834-sinking-ins-khukri.html

http://www.rediff.com/news/2006/dec/03khukri.htm

http://www.indiadefence.com/khukri.htm

http://www.bharat-rakshak.com/MONITOR/ISSUE4-3/harry.html

[69 বার পঠিত]