জীবনানন্দ দাশের কবিতা “পাখিরা”

পূর্ব বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতা “পাখিরা” ও এটির ইংরেজী অনুবাদ এই ব্লগে দেয়া হলো।

অনুবাদটি আমারই করা। সত্যি বলতে কি জীবনানন্দের প্রায় সবক’টি কবিতাই অতি দুর্বোধ্য অন্ততঃ আমাদের মত সাধারণ পাঠকদের কাছে তো বটেই! তাঁর রচিত অন্যান্য কবিতার মত এটিতেও মৃত্যুর আভাষ সুস্পষ্ট ভাবে পরিলক্ষিত হয়। এই ব্যাপারে ইংরেজী কবি জন কীটস্‌ এর সাথে জীবনানন্দ দাশের অনেক মিল দেখা যায়। দুই কবিই মৃত্যুকে অত্যন্ত রোমান্টিক দৃষ্টিতে অবলোকন করেছেন। মৃত্যকে মোটেই ভয়ের দৃষ্টিতে দেখেন নি এই দুই কবি। কীটস্‌ তাঁর অন্যতম কবিতা “La Belle Dame Sans Merci” তে পাখিহীন জগৎকে মৃত্যুর দেশ বলে চিহ্নিত করেছেন। আর আমাদের কবি জীবনানন্দ ঠিক সেটিই করেছেন অনেক কবিতায়। আমি কীটস্‌ রচিত “La Belle Dame Sans Merci” কবিতার প্রথম ক’টি চরন এখানে তুলে ধরলাম যাতে পাঠকরা আমার এই ‘এনালজী’ টি অনুধাবন করতে সক্ষম হোন।
——————-
La Belle sans Merci
(John Keats 1795-1884)

O WHAT can ail thee, knight-at-arms,
Alone and palely loitering?
The sedge has wither’d from the lake,
And no birds sing.
——————-
কীটস্‌ রাজ-রাজড়াদের সন্তানদের উদ্দেশ্য করে বলছেন – এখানে একাকী ও ফ্যাকাশে মুখ করে পায়চারী করছো কেন? শৈবালগুলো বিবর্ণ হয়েছে হ্রদের কাছে, এখানে পাখির আর কলতান পর্যন্ত নেই।
——————-
এসব হবে কি করে? এটি যে মৃত্যুর দেশ!!!

কীটস্‌ এর অনেক কবিতা জীবনানন্দ দাশের মনকে আলোড়িত করেছে। এটিই আমার ব্যক্তিগত অভিমত। তাঁর জন্মের পনেরো-কুড়ি বছর আগে কীটস্‌ ইহধাম ত্যাগ করেন। তাই অপরিনত বয়সে জীবনানন্দ যে কীটসের কবিতা পড়েন নি, সেট বলা ভূল হবে।

কীটস্‌ ও জীবিনানন্দ দাশ এর তূলনামূলক কবিতা নিয়ে পরে বিষদ আলোচনা করা যাবে। এবারে দাশ কবির “পাখিরা” কবিতাটি পড়ে দেখুন। ইংরেজী অনুবাদটি আমার তবে সেটি পছন্দ হয় নি। তবে যারা বাংলা পড়তে পারেন না বা বাংলা বুঝেন না, তাদের জন্য এটি করা। জীবনানন্দ দাশের অনেক কবিতার মূল ভাব যে বুঝা বেশ কঠিন সেটি সবাই আমার সাথে একমত হবেন।

জাফর উল্লাহ
নিউ অর্লিয়ান্স
নভেম্বর ২৯, ২০০৯

————
পাখিরা
জীবনানন্দ দাশ
[‘ধূসর পান্ডুলিপি’ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া]

ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে –
বসন্তের রাতে
বিছানায় শুয়ে আছি;
– এখন সে কতো রাত !
ওই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর,
স্কাইলাইট মাথার উপর,
আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর।
তার পর চ’লে যায় কোথায় আকাশে?
তাদের ডানার ঘ্রাণ চারিদিকে ভাসে।

শরীরে এসেছে স্বাদ বসন্তের রাতে,
চোখ আর চায় না ঘুমাতে;
জানালার থেকে ওই নক্ষত্রের আলো নেমে আসে,
সাগরের জলের বাতাসে
আমার হৃদয় সুস্থ হয়;
সবাই ঘুমায়ে আছে সবদিকে-
সমুদ্রের এই ধারে কাহাদের নোঙরের হয়েছে সময়?

সাগরের ওই পারে – আরো দূর পারে
কোনো এক মেরুর পাহাড়ে
এইসব পাখি ছিলো;
ব্লিজার্ডের তাড়া খেয়ে দলে-দলে সমুদ্রের ‘পর
নেমেছিল তারা তারপর,
মানুষ যেমন তার মৃত্যুর অজ্ঞানে নেমে পড়ে।
বাদামি – সোনালি – শাদা – ফুটফুটে ডানার ভিতরে
রবারের বলের মতন ছোট বুকে
তাদের জীবন ছিল-
যেমন রয়েছে মৃত্যু লক্ষ-লক্ষ মাইল ধ’রে সমুদ্রের মুখে
তেমন অতল সত্য হ’য়ে।

কোথাও জীবন আছে, – জীবনের স্বাদ রহিয়াছে,
কোথাও নদীর জল র’য়ে গেছে – সাগরের তিতা ফেনা নয়,
খেলার বলের মতো তাদের হৃদয়
এই জানিয়েছে;
কোথাও রয়েছে প’ড়ে শীত পিছে, আশ্বাসের কাছে
তারা আসিয়াছে।

তারপর চ’লে যায় কোন্‌ এক খেতে;
তাহার প্রিয়ের সাথে আকাশের পথে যেতে-যেতে
সে কি কথা কয়?
তাদের প্রথম ডিম জন্মিবার এসেছে সময়।

অনেক লবণ ঘেঁটে সমুদ্রের পাওয়া গেছে এ-মাটির ঘ্রাণ,
ভালোবাসা আর ভালোবাসার সন্তান,
আর সেই নীড়,
এই স্বাদ – গভীর – গভীর।
আজ এই বসন্তের রাতে
ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে;
ওই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর,
স্কাইলাইট মাথার উপর,
আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর।
———

Those birds
Jibanananda Das
[From ‘Gray Manuscript’ book of poem collection]

Those slumber-laden eyes won’t shut –
in this vernal nighttime
On my bed I lay down.
– wee hours of night passes by!
Roaring waves of ocean one could hear,
Skylight at the zenith,
Birds chirping at each other in the sky.
Then, somewhere they vanish?
The waft of their feathers is everywhere.

I feel a sensation in this vernal nighttime,
My eyes are bereft of sleep;
Through the windows starlight descends,
My heart gets well
through moisture laden ocean breeze;
Folks slumbering everywhere –
Whose ship is about to cast its anchor on this Oceanside?

These birds were there,
Far far away, on the other side of ocean
On some hillside of a continent;
They then descended on the ocean
after blasted away by the blizzard, lots of them,
In the same vein, when people fall to their death trance.
Inside the almond – golden – white colored wing
Lays a vibrant petit rubber like breast full of life –
In the same fashion, there lies the death,
Million miles away on the mouth of the ocean,
Bearing the testament of truth.

Life is there somewhere, – so is sensation of life,
The river water is somewhere – not the bitter sea scum,
They tell us that
their hearts look just like the ball we play with,
The winter lays somewhere behind,
they came for consolation.

They then head for a field;
What do they talk so passionately
when they tread together in the skyway?
The time has come for their first egg to crack.
The smell of soil was found
After churning many a salt laden seawater
love and its offspring emanating from love,
And that nest too!

This sensation – deep – deep.
Tonight, in this vernal nighttime
those slumber-laden eyes won’t shut –
One could hear the roaring waves of ocean,
Skylight at the zenith,
Birds are chirping at each other in the sky.
————————
Translated by: A.H. Jaffor Ullah
নভেম্বর ২৮, ২০০৯

জাফর উল্লাহ্‌ একজন বৈজ্ঞানিক ও কলাম লেখক, লিখেন নিউওর্লিয়ান্স থেকে; ঢাকার বিভিন্ন ইংরেজী পত্রিকায় তিনি নিয়মিত উপ-সম্পাদকীয় লিখেন। মুক্তমনার উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য।

মন্তব্যসমূহ

  1. Keshab K. Adhikary নভেম্বর 30, 2009 at 5:42 অপরাহ্ন - Reply

    Fantastic translation Dr. A.H. Jaffor Ullah! Congratulations!

    Come and come and come for ever,
    The whispering of life
    Indeed of beauty of the nature.
    All the darks obscure and waive;
    Just as the chirping of birds,
    Sign of the enlighten hearts.

    Thanks.

  2. এ.এইচ. জাফর উল্লাহ নভেম্বর 30, 2009 at 11:08 পূর্বাহ্ন - Reply

    ধন্যবাদ সালাম সাহেবকে আমার গাফেলতির জন্য যে ভূল তথ্য আমি দিয়েছি তার সংশোধনের জন্য। আমরা সবাই এটা জানি যে কবি জীঃ দাশ ইরেজীর ছাত্র ছিলেন। তাই তিনি ইউরোপিয়ান কবিদের অনেক লিখার সাথে সম্যক পরিচিত ছিলেন। আমি যে কথাটি বলতে চেয়েছিলাম সেটি ঠিক করে উপাস্থপনা করিনি। কীটস্‌ আর জীবনানন্দ দাশ এর পয়েটিক্স যেন একই সুরে বাঁধা। এটি আমার একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত। কীটস্‌ এর মৃত্যু যে খুব কম বয়সে হয়েছিল তা সর্বজনবিদিত। তা সত্ত্বেও আমি ভূল করে ফেলেছি বয়স নির্ধারন করতে। বঙ্কিম বাবুকে দেখেছি কীটস্‌ এর কবিতা থেকে দু’চার লাইন তাঁর নভেলার শুরুতে এটে দিতে। আবারো ধন্যবাদ আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা কে মন দিয়ে পড়ার জন্য। Barring this faux pas of when John Keats was born as per my post, I think it is a fair game for any observer to pass judgment on the poetics and astounding similarities about the similarities between Keats and Das’s poems.

  3. সালাম নভেম্বর 30, 2009 at 10:04 পূর্বাহ্ন - Reply

    @ড.এ.এইচ. জাফর উল্লাহ,
    আপনার অনুবাদ সুন্দর।আমার ভালো লেগেছে।আমিও বলি,আপনি আপনার মত করে এ অনুবাদ কর্মটি করতেই পারেন।এখানে আপনি একশভাগ স্বাধীন।
    কিন্ত্ত কারো জীবনী বলার ক্ষেত্রে এই কাব্যিক স্বাধীনতা আপনার আছে কি?
    কবি জন কীটস্ ও কবি জীবনানন্দের ইতিহাস বানিয়ে বলতে গেলেন বলে মনে হচ্ছে।

    আপনি এ কী বললেন,
    ”তারঁ জন্মের পনেরো-কুড়ি বছর আগে কীটস্ ইহধাম ত্যাগ করেন।তাই অপরিনত বয়সে জীবনানন্দ যে কীটসের কবিতা পড়েননি,সেটা বলা ভুল হবে।”

    উল্লখ করা যায় যে, বাঙলা সাহিত্যের এই আধুণিক প্রধান কবি জীবনানন্দ দাস পরিনত বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ে জন কীটসের কবিতা পড়ে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক সন্মান সহ এম.এ ডিগ্রী লাভ করেন।এবং তিনি ইংরেজির অধ্যাপক হন। জীবনানন্দ গ্রুপ পঞ্চকবিরা কীটস্ বদলেয়ার প্রমুখের কবিতা
    বাঙলায় অনুবাদও করেন।

    কীটস্ জীবনানন্দের পনেরো-কুড়ি বছর আগে মারা গেলেতো খুব খুবই ভালো হতো! তখন আমরা আর হারাতাম না এই সেরা রোমান্টিক কবি কীটসরে মাত্র ২৬ বছর বয়সে!

    কীটস্ ১৮২১ সনে মারা যান।
    জীবনানন্দের জন্ম ১৮৯৯ সাল।
    তাই ‘পনেরো-কুড়ি’ নয়, ৭৮ বছর!

    তাছাড়া, তারঁ Ode to a Nightingale, Ode on a Grecian Urn, Ode to Psyche, Ode on Melancholy, Letters to Fanny Brawne কবিতায় ও প্রেম পত্রে কবি কীটস্ কবিতার দেশে, মৃত্যর দেশে যেতে চেয়েছেন,যেখানে বসন্তে বুলবুলিরা শুধু প্রেমের গান গায়।

    ধন্যবাদ আপনাকে।

  4. মুক্তমনা এডমিন নভেম্বর 30, 2009 at 2:30 পূর্বাহ্ন - Reply

    ডঃ জাফরউল্লাহ,
    আপনাকে অনুরোধ করা হচ্ছে, ব্লগে লেখা পোস্ট করার সময় যেন আপনি খেয়াল রাখেন শিরনামের ঘরে শিরোনাম প্রদান করা হয়েছে কিনা। আপনার পোস্ট দুটো সংশোধন করে দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতের পোস্টগুলোতে ব্যাপারটি খেয়াল রাখতে অনুরোধ করছি।

    মুক্তমনা বাংলা ব্লগে স্বাগতম।

মন্তব্য করুন