প্রতিদিনের পত্রিকার পাতা ও টিভির পর্দায় রকমারি দাড়ি শোভীত একদল যুবকের ছবি দেখানো হচ্ছে। সংখ্যায় তারা প্রায়ই হাফ থেকে ফুল ডজনের মত। এই ডজেন ডজন যুবক ধরা পড়ছে আমাদের আইন শৃঙ্খ্লা বাহিনীর হাতে। তাদের কাছে পাওয়া যাচ্ছে গ্রেনেড, ডেটনেটর, বোমা তৈ্রীর নানা সরঞ্চাম এবং জিহাদী বই। তাদের এই ধরা পড়ার ঘটনা যতটানা স্বস্তির তার চাইতে অনেক বেশী উদ্বেগের। কারন এই ঘটনা প্রমান করছে, তারা যে সংখ্যায় ধরা পড়ছে, ধরা না পড়া সংখ্যাটা তার চাইতে বহুগুন বেশী। একটা বিশাল অয়োজন চলছে। তার সমস্ত আলামত এখন প্রকট হয়ে উঠছে। যে ভয়াবহ সংক্রামক ব্যাধিতে আমাদের সমাজ-রাষ্ট্র অদূর ভবিষ্যতে আক্রান্ত হতে যাচ্ছে তার পূর্ব লক্ষন, কারন, সম্ভাব্য পরিনতি ও প্রতিকার নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করবো।

পূর্ব লক্ষনঃ যেকোন প্রতিষ্ঠীত মতবাদ বা ধর্মের মত মুহাম্মদের ইসলামও প্রচারের শুরুর দিকে ছোট আকারে ছিল। ধীরে ধীরে এর আয়তন বাড়তে থাকে। ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুহাম্মদকে ছোট বাহিনী নিয়ে বড় বাহিনীর মোকাবেলা করতে হয়েছে। পরিমান যেহেতু তার পক্ষে ছিলনা ফলে গুনের উপর নির্ভর করা ছাড়া তার উপায় ছিলনা। যে জন্য, বাহিনীর মনোবল বাড়াবার প্রয়োজনে, জিহাদী জোস ছড়ানোর প্রানান্ত চেষ্টার ছাপ পাওয়া যায় কোরান ও হাদিসের পাতার পর পাতা জুড়ে এবং মুসলমান বাহিনী মধ্যযুগের একটা সময় পর্যন্ত দিগ্বিজয়ী বাহিনীর খেতাব ধরে রাখতে পারে। যদিও তাদের এই দিগ্বিজয়ী বাহিনীতে পরিনত হবার পেছনে আরো গুরুত্বপূর্ন উপাদান রয়েছে কিন্তু এই আলোচনার ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক বিধায় বাদ দিচ্ছি।

প্রথম থেকেই মুসলমান অভিযান মূলত আরব সাম্রাজ্যবাদের সমান্তরালে বয়ে চলে। বর্তমান জিহাদের সাথে পূর্ববর্তি আরব অভিযানের মূল পার্থক্যকারী বৈশিষ্ট হচ্ছে, পূর্বেরটা ছিল আগ্রাসী চরিত্রের আর বর্তমানেরটা রক্ষনাত্ত্বক। যারা এক্ষেত্রে বদরের যুদ্ধের নজির টেনে দেখাতে চাইবেন যে আসলে মুসলামানরাই প্রথমে আক্রান্ত হয়েছিল। তাদেরকে বলবো, দয়াকরে ইসলামের ইতিহাস আরেকটু গোড়া থেকে অধ্যয়ন করার জন্য। মদিনায় হিজরত করা মুসলমানদের একটা দল মক্কার বনিক কাফেলাকে লুট করেছিল। তার প্রতিশোধ নিতেই মক্কাবাসী; মুসলমানদের আক্রমন করে। মুসলমানদের মক্কা বিজয়ের পরের ইতিহাস পুরোটাই ধারাবাহিক আগ্রাসনের ইতিহাস।

ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের পরে যে নতুন মূল্যবোধ, উৎপাদন শক্তির যে বিপুল বিকাশ আর তার সাথে যে নতুন আগ্রাসী শক্তিগুলর উদ্ভব হয়, তাদের সাথে মুসলামানরা নিজেদের অন্তসারশূন্য শ্রেষ্ঠত্ত্বের অহমিকা নিয়ে প্রতিযোগীতায় ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে থাকে। তারা তাদের নবায়নের অযোগ্য জীবন বিধান ও মূল্যবোধের বন্ধ্যা অবস্থার বোঝা ক্রমশ ভারি করতে করতে কেবল ইউরোপ না বরং আজ তারা মানব জাতির অন্য সকল সম্প্রদায়ের থেকে হীন পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। অবক্ষয়ের অন্তিম দশা চূড়ান্ত পরিনতি পায় যখন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-গর্ভে আবিস্কৃ্ত হয় তেলের খনি। এটা তাদেরকে সব ধরনের জীবনমূখি উদ্যোগ থেকে কার্যত বিমূখ করে রাখে। অনায়াসলব্ধ প্রাচূর্যে ধনীর বখে যাওয়া বালকের দশা হয় তাদের। সীমাহীন ভোগ আর দরিদ্র মুসলিম দেশ সমূহে ইসলামিকী করনের উদ্দেশ্যে দান-খয়রাতের মধ্যে তাদের কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে। মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসারে অঢেল টাকা তারা খরচ করে। আর মাগনা পেলে আলকাতরা খাবার প্রবাদের মর্যাদা নিশ্চিৎ করতে, আমাদের সরকারগুলো অকাতরে এই খয়রাতি সাহায্য এনে, জাতীকে শিক্ষিৎ করার মহান দায়িত্ব অতি সর্ট-কাটে সেরে ফেলে, যথারিতী নিজেদের আখের গোছানো্র মোহময় কাজে পুনঃমনসংযোগ করেন।

কারনঃ আধুনিক মুসলিম উগ্রবাদের শুরু বলা যায় ফিলিস্তিন সমস্যা থেকে। ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরাইলের অন্যায় আচরন বিশ্বের সকল শান্তিকামী মানুষের দ্বারা নিন্দিত হওয়া সত্ত্বেও তা পশ্চিমা বিশ্বের কায়েমী স্বার্থের প্রকাশ্য মদদে চলতে থাকে। এবং এই সমস্যা সমাধানে আরব বিশ্বের নেতাদের ভূমিকা ঐসব দেশের সাধারন মানুষের বড় অংশের চোখে সব সময়ই সন্দেহযুক্ত থেকে যায়। ফলে ফিলিস্তিনিদের সাহায্যকল্পে প্রথম দিকে বেশ কিছু আরব কেন্দ্রীক জঙ্গিবাদী সংগঠন গড়ে উঠে। পরবর্তিতে এরা বিভিন্ন আরব দেশের সরকারের সরাসরি সমর্থন পেয়ে বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠে।

যদিও এর অনেকটাই যে আরবের তেল এবং অস্ত্র বানিজ্যের মত বিষয়ের কারনে সুপরিকল্পিতভাবে জিইয়ে রাখা একটা সমস্যা, সেটা বোঝার জন্য খুব বেশী কসরত করতে হয় না। ইরাকের গনতন্ত্রায়নের জন্য যে আমেরিকার এত মাথা ব্যাথা, সৌদি আরবের ব্যাপারে তারাই কত উদার। আসলে ইরাকের তেলের খনির লিজ আমেরিকার হাতে ছিলোনা ফলে তার এত মাথাব্যাথা। ইরানের ক্ষেত্রেও তাই। দেখুন সম্প্রতি সীদ্ধান্ত হয়েছে, ইরানের ইউরেনিয়াম স্বল্প মাত্রায় সমৃদ্ধ করে ফেরত দেবে ফ্রান্স ও রাশিয়া। কারন আমেরিকার দ্বারা ইরান আক্রান্ত হলে বর্তমান খনি চুক্তি গুলি বাতিল হবে যা ফ্রান্স ও রাশিয়া চাচ্ছে না। আমেরিকা, এই সাম্রাজ্যবাদী দানবটাকে না বুঝলে অমরা বর্তমান মুসলিম জিহাদকে কখনই পুরোপুরি বুঝতে পারব না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে বিরোধ যে নতুন মাত্রা পায়, সেখানে কমিউনিষ্ট বিরোধী শক্ত ঘাঁটি হিসাবে আমেরিকা মুসলমানদের ঘনিষ্ট মিত্রের মর্যাদা দেয়। এ পর্যায়ে আফগানিস্থানে রাশিয়ার আগ্রাসন ঠেকাতে মুজাহিদ বাহিনীকে সরাসরি সহায়তা করে আমেরিকা। পাকিস্থানের মাদ্রাসাগুলি জিহাদী তৈ্রীর ফ্যাক্টরিতে পরিনত হয় তখন থেকেই। সোভিয়েত রাশিয়ার পতনের পরে, আমেরিকার সাথে মুসলমানদের মিত্রতার স্বর্নযুগের অবসান হয়। সৌদি শেখ পরিবার এক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম। এই পরিবারের ভূমিকা এখন মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রধান দালালের।

আরব জাতীয়তাবাদের প্রতিনিধিত্ত্ব এই পর্যায়ে ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়েদার হাতে চলে আসে। দূর্ভাগ্যজনক ভাবে আল-কায়েদা কোন প্রগতিশীল উপাদানের পরিবর্তে সেই সার্বজনীন, সর্বকালীন, চীরনবীন, সর্বরোগের দাওয়াই মধ্যযুগীয় নুরানী গ্রথখানাকেই সম্বল করে লড়াইয়ে অবতীর্ন হয়েছে। ফলে তুরস্ক, আলবেনিয়া, মালয়শিয়া বা ইরানের মত অপেক্ষাকৃ্ত ধনী ও শিক্ষার হার যে সব দেশে বেশী, সেখানে এই জিহাদী উম্মাদনা কম। কিন্তু পাকিস্থান ও বাংলাদেশের মত দেশ, যেখানে শিক্ষার হার খুব কম ও জনগন দারিদ্র পিড়ীত, সেখানে এই রোগের প্রকোপ খুব বেশী। পাকিস্থানে যা ইতিমধ্যে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এটা আমাদের দেশেও ভয়াবহ মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ার জন্য যে সব কারন দরকার তার পটভূমী স্বাধীনতা পরবর্তী প্রতিটা সরকারই যে যার সাধ্যমত করে রেখে গেছেন। বিশ্ব প্রেমিক এরশাদের অবদান এক্ষেত্রে সবচেয়ে সুমহান। তিনিই বাংলাদেশকে সাংবিধানিক ভাবে ইসলামি রাষ্ট্র করে গেছেন। ইসলামী রাষ্ট্রে ইসলামী আইন না থাকাটাইতো আসলে অন্যায়। ফলে জিহাদীরের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এক ক্ষেত্র হচ্ছে বাংলাদেশ। ২১ আগষ্টে যা তারা করতে চেয়াছিলো, যদি তারা সেটাতে সফল হতো তবে আজকে হয়তো বাংলাদেশের ইতিহাস নতুন করে লিখতে হতো। তারা তাদের উদ্দ্যেশ্যের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। আবার যে কোন সময় তারা আঘাত হানতে পারে।

বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন গুলোর ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায় যে, মূলত রাশিয়ার আফগান আগ্রাসনের সময় থেকে বাংলাদেশ –আর্ন্তজাতিক জঙ্গি সংগঠন গুলোর সাথে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। এসময়ে বহু বাংলাদেশী যুবক পাকিস্থান হয়ে আফগান যুদ্ধে অংশ নেয়। যুদ্ধ শেষে তারা দেশে ফিরে এসে বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ত্ব জিইয়ে রাখে। এরকম সময়ে মায়ানমারের সীমান্ত দিয়ে রহিঙ্গারা শরণার্থী হয়ে হাজারে হাজারে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে থাকে। আফগান ফেরত জিহাদীদের এক অংশ তাদের নৈতিক দায় থেকেই রহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসে এবং দূর্গম পাহাড়ী অঞ্চলে জঙ্গি প্রশিক্ষন সহ নানা তৎপরতা শুরু করে। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে মতাদর্শিক বিভাজনের ফলে এই কার্যক্রম কেবল রোহিঙ্গা কেন্দ্রীক না থেকে নিশানা বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যাবস্থার দিকে ঘুরে যায়।

আর একটি অংশ দেশের পশ্চিম অঞ্চলের জেলা গুলোতে ৪ দলীয় জোট সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে সর্বহারা নিধনের জন্য গড়ে উঠে। এই অংশ ভয়ংকর ও রোমহর্ষক কর্ম-কান্ডের মাধ্যমে দ্রুত মিডিয়ার প্রধান সংবাদ হয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষন করে। শায়খ রহমান ও বাংলা ভাইয়ের ফাঁসি বা বলা উচিৎ তড়িঘড়ি ফাঁসি আসলে অনেক মূল্যবান তথ্য-প্রমান থেকে আমেদেরকে বঞ্চিত করেছে।

সম্প্রতি পাকিস্থানী জঙ্গিদের হাতে যেসব ব্যাপক বিধ্বংসী বোমা দেখা যাচ্ছে তা অচিরেই আমাদের দেশের জঙ্গিদের হাতে এসে যাবার সম্ভাবনা কোন ভাবেই উড়িয়ে দেয়া যায়না। এইসব ব্যাপক বিধ্বংসী বোমার প্রযুক্তি একবার তাদের হাতে চলে এলে পরিনতি কি হতে পারে তা এখন দেখানোর চেষ্টা করবো।

সম্ভাব্য পরিনতিঃ বিজয়ের সম্ভাবনা সবসময়ই মানুষকে উদ্দীপ্ত করে তোলে। এধরনের ব্যাপক বিধ্বংসী বোমা দ্বারা কিছু সফল আঘাত জঙ্গিদের দলভারি করার কাজে এক বিরাট অগ্রগতি আনবে।

নারীগনকে কোরানীয় মান-মার্যাদায় প্রতিষ্ঠীত করতে প্রথমে বস্তায়(বোরখায়)পরে গৃহে পুরে ফেলাই হবে তাদের প্রথম টার্গেট। স্কুল, কলেজগামী ও কর্মজিবী নারীদের নানা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা তাদের কার্যক্রম শুরু করবে। কো-এডুকেশন বন্ধের জন্য তারা ঐসব প্রতিষ্ঠানে বোমা হামলা চালাতে পারে।

তাদের প্রধান প্রধান হামলার লক্ষ্যবস্তু হবেঃ
প্রগতিশীল পত্রিকা ও সংগঠন ।
মাল্টি-ন্যাশনাল কম্পানিগুলোতে কর্মরত যারা ।
আদালত ও পুলিশ স্টেশন গুলো।
চার তারা ও পাঁচ তারা হোটেল।
মন্ত্রী, সংদদ সদস্য সহ রাষ্ট্রের অন্যান্ন গুরুত্ত্বপূর্ন ব্যাক্তিবর্গ।
NGO গুলোতে কর্মরত যারা।

ধীরে ধীরে তারা দেশের কোন একটা অঞ্চলে তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করবে। তাদের এইসব কর্মকান্ডে তারা প্রশাসনের এক অংশের পরোক্ষ সাহায্য পাবে। এবং আদালত ও পুলিশের প্রতি মানুষের শতাব্দী প্রাচীন ক্ষোভের ফলে জনগনের অসচেতন অংশের সমর্থন জঙ্গিদের পক্ষে যেতে পারে। সমস্যা হচ্ছে, আমাদের মত দেশে জনগনের মধ্যে অসচেতন অংশই সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে একটা দীর্ঘমেয়াদী ও অনিশ্চিৎ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাকে যারা ছোটকরে দেখছেন তাদের সাথে আমার পরিষ্কার দ্বীমত রয়েছে। বছর কয়েক আগেও পাকিস্থানের আজকের পরিনতি খুব কম লোকই আঁচ করতে পেরেছিলো। পাকিস্থানে জঙ্গিবাদের প্রজনন কেন্দ্র হিসাবে কাজ করেছে মাদ্রাসাগুলো। আমদের দেশের মাদ্রাসার শিক্ষা, শিক্ষার পরিবেশ এসবের সাথে পাকিস্থানের মাদ্রাসা শিক্ষার পার্থক্য খুব সামান্যই। আর জঙ্গি উৎপাদনে মাদ্রাসার ভূমিকা ইতিমধ্যে আমাদের দেশেও প্রতিষ্ঠীত সত্য।

সবচেয়ে মহান সম্ভাব্য পরিনতি হচ্ছে, একদিন সুন্দর সকালে হয়তো দেখা যাবে, এই যুদ্ধে আমাদের দূর্বল সরকারকে সহায়তা করতে আমেরিকান বাহিনী চালক বিহীন বিমান থেকে সন্দেহভাজন জঙ্গিদের উপরে বোমা ফেলছে।

প্রতিকারঃ এটাই আজকের লেখার সবচেয়ে জটিল অধ্যায়। আসলে আজকের এই জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে অভ্যন্তরীন ও বাজ্যিক দুটি কারনই বিদ্যমান। আর্ন্তজাতিক ঘটনা প্রবাহের উপরে আমাদের নিয়ন্ত্রনের কিছু নেই। মুসলমানদের উপরে আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে যে কোন ভাল-খারাপ ঘটনার প্রতিক্রিয়া অন্যান্ন মুসলিম দেশে হবে। এটা মুসলিম ভাতৃ্ত্ত্বের ধর্ম কেন্দ্রীক বন্ধনের জন্যই ঘটবে। তাই যা আমাদের হাতে নেই তা নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই। বরং যা আমরা করতে পারি তা নিয়ে আলোচনা করাই সময়ের স্বদব্যাবহার হবে।

এক্ষেত্রে জনগন ও সরকারের সুনিদৃষ্ট করনীয় আছে। জনগন বলতে আসলে জনগনের বিভিন্ন সংগঠন যেমন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, সংবাদ মাধ্যম ইত্যাদিকে বুঝতে হবে। কারন বিচ্ছিন্ন অবস্থায় জনগন কোন শক্তি না। জনগন যে সব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংঘবদ্ধ হয়, এখানে জনগন বলতে তাদেরকেই বুঝতে হবে। তবে আমি মনে করি, এব্যাপারে সরকারের ভূমিকাটাই মূখ্য। কারন, সরকারের সামর্থ জনগনের অন্য যে কোন সংগঠনের থেকে বেশী।

স্বল্প মেয়াদী ও দীর্ঘ মেয়াদী দুই ধরনের পরিকল্পনা নিয়েই সরকারকে ভাবতে হবে।

স্বল্প মেয়াদী পরিকল্পনাঃ জঙ্গিদের অর্থের উৎস বন্ধ করা সরকারের স্বল্প মেয়াদী এবং অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ন কাজের মধ্যে একটা। এক্ষেত্রে অভ্যন্তরীন উৎস খুব সহজে বন্ধ করা যাবেনা। কিন্তু বহিরাগত অর্থের জোগান বন্ধ করা তুলনামূলক সহজ। এ জন্য সন্দেহভাজন N.G.O গুলোর ফান্ডের ব্যাপারে আরো বেশী অনুসন্ধান প্রয়োজন।

সরকারের গোয়েন্দা তৎপরতা আরো বৃ্দ্ধি করা দরকার। একবার ধরা পড়ার পরে যারা ছাড়া পাচ্ছে, তারা পুনরায় জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়ে পড়ছে কিনা তার উপরে নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে।

মিয়ানমার ও ভারতের সাথে একযোগে কাজ করা দরকার। কারন সীমান্ত অঞ্চলগুলো বরাবরই যেকোন রাষ্ট্র বিরোধী তৎপরতাকারী দের জন্য প্রিয় স্থান হয়ে থাকে।

আসলে, স্বল্প মেয়াদে এর থেকে খুব বেশী কিছু করার নেই।

দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনাঃ যুগ যুগ থেকে গরীবের সন্তানদের জন্য শান্তনা শিক্ষা হিসাবে যে ধরনের মাদ্রাসা শিক্ষা আমাদের দেশে চলে আসছে তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই শিক্ষার উদ্দেশ্য কি?
তা সরকারকে অবশ্যই পরিস্কার করতে হবে। সামগ্রীক ভাবেই যেখানে শিক্ষার উদ্দেশ্য আজো নির্ধারন করা যায়নি, সেখানে মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য নির্ধারন সরকার বাহাদুরের জন্য বেশ দুরূহ বৈকি।
এখনো বিঞ্জানে স্নাতক ডিগ্রী নিয়ে মুদি দোকানদারি করতে হয় যে দেশে সেখানে মাদ্রাসা থেকে ডিগ্রী নিয়ে কে কি হবে তা নিয়ে সরকারকে ভাবতে বলা একটু বেশী চাওয়া হয়ে গেলেও বলবো, এটা এখন সময়ের দাবি। বেখেয়ালে, অবহেলায়, অযত্নে যে ফ্রংকেস্টাইন আমরা গড়ে চলেছি, এখনো সাবধান না হলে, এই দৈত্যই একদিন আমাদের ঘাঁড় মটকে দেবে।

আমার মতে, মাদ্রাসা শিক্ষার জাল থেকে মুক্ত হতে সরকারকে খুবই কৌশলী হতে হবে। প্রথমে সমস্ত স্কুল ও মাদ্রাসার জন্য ৪০% শিক্ষার্থীর পাস করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। অন্যথায় ঐসব স্কুল ও মাদ্রাসার জন্য সরকারী অনুদান বন্ধ করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে সমস্যা যেটা হবে, তা হলো, পরীক্ষায় অংশগ্রহনকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশংকাজনক ভাবে হ্রাস পেতে পারে। এটা ঠেকানোর জন্য নিয়মীত শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে নূন্যতম ৮০% এর পরীক্ষায় অংশগ্রহন বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর ফলে কয়েক বছরের মাথায় বহু মাদ্রাসা এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। মাদ্রাসার পাঠ্যসূচীর উপরে আরো বেশী নিয়ন্ত্রন আরোপ করতে হবে। দর্শন ও বিজ্ঞান পড়া বাধ্যতামূলক করতে হবে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের বর্তমান আগ্রহের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছাড়া জঙ্গিবাদের ভুত থেকে আমাদের সহজে নিস্তার নেই। কারন অসংখ্য বেকার যুবক শুধুমাত্র কিছু আয়ের উদ্দেশ্যে জঙ্গি বাহিনীতে নাম লেখাচ্ছে। এই বাস্তবতা অস্বীকার করা আসলে একধরনের উদাসিনতা। যার উৎস, নিজের সন্তান দের ইউরোপ, আমেরিকাতে নিশ্চিৎ নিরাপত্তা বিধান করতে পারা জনিত স্বস্তি থেকে উৎপন্ন।

ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে অনুপস্থিত ভুমি মালিকদের জমি খোদ কৃ্ষকদের মাঝে বন্টন করে কৃ্ষি বিল্পবের সূচনা করার ক্ষেত্রে সময় নষ্ট করা উচৎ হবে না।

বিশ্ব ব্যাঙ্ক, আই এম এফ এর প্রেস্ক্রিপশন অনুসরন করার আগে ক্ষমতায় অধীষ্ঠিতদের নিজেদের কমিশনের অংশের জন্য কিঞ্চিৎ কম ব্যাকুল হয়ে, জনগনের জন্য ওতে ক্ষতিকর কোন বড়ি আছে কিনা তা অন্তত আরেকটু সদয় ভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটা উদাহরন দিলে আশাকরি আমি কেন এটা বলছি তা পরিস্কার হবে। বিশ্বব্যাংক আমাদেরকে কপোতাক্ষের বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ নির্মানের জন্য ঋণ দিলো। এখন এর ফলে যে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে পরিত্রানের জন্য তারাই নাকি আবার বাঁধ কাটার জন্য ঋন দেবে। এরকম হরিলুটের চিত্র লিখতে গেলে এক মহাভারত হয়ে যাবে। কেবল একটা মজার তথ্য দিয়ে যাই। বাংলাদেশ দূর্নিতীতে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিল টানা ৫ বছর, এটা সবার জানা। বাংলাদেশকে এই শীর্ষস্থান হারাতে হয়েছে নীজের দূর্নিতী কমিয়ে নয় বরং অন্য দেশগুলি দূর্নিতীতে আমাদেরকে ছাড়িয়ে গেছে বলেই।

যতক্ষন না সত্যিসত্যি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে ততক্ষন আদালত প্রাঙ্গনে বোমা হামলাকে নিরুৎসাহিত করা বেশ কঠিন হবে। কারন যাদের ওখানে একবার যাবার সৌভাগ্য হয়েছে তারা জানেন
ওখানা কি বস্তু।

পুলিশকে মেরুদন্ডহীন বানিয়ে রেখে নিজেদের দূর্নিতীকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে রাখার কুমতলব ত্যাগ করতে হবে। বিচার বিভাগ সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য।

সব শেষে বলবোঃ ঘুনে ঝাজড়া আপনাদের মূল্যবোধ নিয়ে এই সমস্যার কতটা ভালভাবে মোকাবেলা করতে পারবেন সে ব্যাপারে সমস্ত সংশয় সত্ত্বেও যেটুকু আশার আলো এখনো দেখি তার কারন; হরিলুটের এই যে মহোৎসব, একে রক্ষার জন্য হলেও আপনারা সচেষ্ট না হয়ে পারবেন না। আর যদি অবস্থা বেগতিক দেখে পালিয়ে যান, যার সুন্দর ব্যাবস্থা করাই আছে, তবুও সমস্যা নাই। প্রকৃ্তির নিয়মেই আপনাদের শূন্যতা পূরন করতে কেউ না কেউ এগিয়ে আসবে। কারন, প্রকৃ্তি শূন্যতা অনুমোদন করে না। এজন্যই এখনো আশায় বুক বাঁধি। নিশ্চিই ভাল কিছু দিয়েই আপনাদের শূ্ন্যতা পূরন হবে। কারন খারাপের যে সূউচ্চ সীমা আপনারা স্পর্ষ করেছেন, তাকে ছাড়িয়া যাওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব হবে না। এই বিশ্বাস নিয়েই এখনো পথ চলা, ভালবাসা ও সন্তান জন্ম দিয়ে যাওয়া।

[891 বার পঠিত]