তর্পণ

 

ক্যাথেরীনা রোজারিও কেয়া

 

 

অলস দিনে আজ কেন যেন একটা বোধ তাড়না শুরু করল হৃদয়ের বোধ কলমের ডগায় এসে বাঙ্ময় হলোআমার আবেগের সাথে মিতালী করে হৃদতুলির আচড়ে লিখতে বসলাম আমার বাবা মায়ের কথা

 

আমার বাবা মা আমার বাসা থেকে মাত্র ঘন্টা খানেক দূরত্বে থাকেন প্রতিদিন তারা আশা করে বসে থাকেন আমি অফিস থেকে ফেরার পথে তাদের বাসায় যাবোবাস্তব কারনে তা আর হয় না তাঁদের বাসার ফ্রিজে দেখি এ বাটিতে কটা কাজলী মাছ, ও বাটিতে ঝিঙ্গে পোস্ত,  সে বাটিতে ডাল শুক্তো শুকিয়ে বসে আছে জিজ্ঞেস করলে বলে তোকে রেখে  খেতে ইচ্ছে হলো না তাই তুলে রেখেছিলামবাক্সের শেষ মিষ্টিটাও  পড়ে থাকে দিনের পর দিন কবে আমি আসবো এই আশায়

 

আমার রোজ আসা হয় নাসব দিক সামলিয়ে যেদিন তাদের বাসায় আসি ঘন্টা খানেকের জন্যে মা অস্থির করে তোলেন এটা খাও ওটা খাও বলেপ্রায়শই বিরক্ত হই,  প্রকাশও করিবাবা বলেন মায়ের ওপর রাগ করিস না, যখন থাকবে না বুঝবি একজন কত আদর করে খাওয়াতো  যখন ওদের বাসা থেকে চলে আসি, ওরা বারান্দায় এসে দাঁড়ায় বারান্দার ঠিক ওখানেই ছাদে একটা হলদে আলো আছে, ওটা দের মুখে এসে পড়ে আমি তাকাতে পারি নাবাবা মা তাদের সব অসুস্থতা ভুলে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে থাকে, আমার ভেতরটা হুহু করে ওঠেভাবি, কাল দেখা হবে তো?

 

আমার বাবামা দুজনেই  এখন বার্ধক্যবন্দীঅথচ বাবা সারা  জীবন বলতেন” A women is as old as she looks and a man is as old as he feels”   সে নিজেকে ৩৫ এর বেশী ভাবতেন না আমার বাবা কোলকাতায় বেষ্ট নাইনে ভলি খেলতেন, ভবানীপুরে ফুটবল। আর এখন চেয়ার ছেড়ে ঊঠে দাড়াতে বাবার কষ্ট হয় হাটাতো আরো কঠিন, এক গ্লাস জল ঢেলে খাওয়া তার জন্যে দুরুহ কাজ

 

বছর আগে এক অনুষ্ঠানে বাবাকে আবৃত্তি করতে আমন্ত্র জানানো হয়েছিল যে বাবা আর আমি  কর্ণ কুন্তি সংবাদ করতাম প্রান ঢেলে, সেই বাবা আর্ধেক আবৃত্তি করে খেই  হারিয়ে ফেললেন,  আয়োকরা আলো বাড়িয়ে দিলেন, বাবা বললেন চশমাটা সমস্যা রছে

 

না, শুধু চশমাই নয়।  আরো অনেক কিছুই এখন সমস্যাআমি তড়িঘড়ি দর্শকসারি থেকে উঠে বাবার বা হাতটা চেপে ধরে বাবার আর্ধেক করা কবিতাটার আবৃত্তি শেষ করলামঅথচ এই বাবার নির্দেশে কত  নাটক,  কত অনুষ্ঠান হয়েছে 

 

চোখের সামনে তাদের এই যে ভেঙ্গে যাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া দেখা যে কি কষ্টের বোঝানো যাবে না কিছুতেই

 

মনে আছে আমি তখন খুব ছোট, মা ব্যাংকক থেকে কোন একটা মিটিং শেষে ফিরছেন, আমরা এয়ারপোর্টে সবাই গেছি মাকে আনতেআমার টলমল কচি পায়ে হাটতে পারছিলাম না, কে যেন কোলে তুলে নিয়েছিলো মা হাসি মুখে হেটে আসছে আর আমি এ কদিনের বিচ্ছেদের অভিমানে কাদছি। । বাবামা এখন নিউ জার্সীতে যান  কয়েক মাসের জন্যহেটে প্লেনে উঠতে পারেন না   দুজনের জন্যেই এখন হুইল চেয়ার আসেএয়ারপোর্টের স্টাফ একটি ঠেলে , আমি ইচ্ছে করেই অন্যটা  ঠেলিবাবামা এর পাগুলো হুইল চেয়ারের পাদানীতে উঠিয়ে দেই হয়তো পা ছোয়ার আনন্দেই  ছোটবেলার সেই অভিমানের কান্না এখনও কাঁদিতবে অভিমানের কান্নাটা এখন ভিন্ন এখন কাঁদি জীবনের কৃপতা দেখেএক জ়ীবনে কেনো অনেক জীবন  বাচাঁ না তাই ভাবি

 

বাবা মা দুজনেই কানে শুনছেন কম, বুঝছেন কমএকটা কথা দুবার পুনরাবৃত্তি করতে গেলেই লক্ষ্য করেছি আমি হয় গলা মোটা করে কথা বলি অথবা বিরক্তিতে এড়িয়ে যাইঅথচ আজকে আমার যত শৈল্পিক প্রকাশ,  যত শৈলী তাদের কাছ থেকেই পাওয়া

 

র্ধমানের নরেন্দ্র মুখার্জী আর মণিকা চ্যাটার্জীর ছেলে আমার বাবা খৃষ্টফার রোজারীও আমার মা বরিশালের জীবন বাড়ৈ আর চারুলতা রায়ের মেয়ে লীলা রোজারীওর জীবনে আমরা চার বোন ছাড়া আর কেউ নেইবাবা ১৯৫২  তে কোলকাতার  সুরেন ব্যানার্জী রোডের বিলাসী জীবন ছেড়ে তারুণ্যের আবেগে চট্টগ্রামে আবাস গড়ে মা পড়াশুনো করতে তখন চট্টগ্রামেআকাশ প্রমা স্বপ্ন নিয়ে ওরা যৌথ জীবন শুরু করেসে অবধি তাদের জীবনের  পুরোটাই আমাদের জন্যে ব্যস্ত থেকেছেন তাঁরাতাঁদের সস্নেহ প্রশ্রয়ে আমাদের বেড়ে ওঠা

 

আমি এমন একটা সময় পা করেছি যখন আমার মাথার পর ছাঁদ ছিল না এক বেলা ডেকে ভাত দেবার মত মানুষ ছিল না কারো পাশে দুদন্ড বসতে পারি এমন কোন মানুষ ছিলো নাএর আগে  পরিবারকে কখনো মুল্য দেইনিসত্যি বলতে কি আমার সেই না পাওয়া বেদনার সময়ে আমি উপলব্ধি করেছি নিজের পরিবারের মত আত্মার আত্মীয় আর কেউ নেই 

 

 

আমার বাবা মা অপ্রতুল সম্পদে আমাদের বড় করেছেন তবে তারা জীবন যাপন করেছেন, করেন আনন্দ নিয়ে, তাদের স্ফুর্তি সব কিছুতেইআমরা চার বোন পালা করে তাদের কাছে এসে থাকি আমার সেজো বোন তাগাদা দেয় এভাবে জুবুথুবু বসে থাকলে চলবে না, হাটাহাটি করো এ বছর প্যারিস যাচ্ছো তোমরাপরের বছর রোম তারাও কষ্ট ভুলে মেতে ওঠে কিভাবে ভালো থাকা যায় এই চিন্তায় গত বছর তাদের ৫০তম বিবাহ বার্ষিকি ছিলো, ঘটা করে গীর্জায় তাদের বিয়ের মন্ত্র পড়ানো হলো আবার তারা তাদের বিশেষ দিনে লন্ডনের ওয়েস্ট মিনিস্টার ্যাবিতে  গিয়েছিলেন বহু দিনের শখ মেটাতে

 

আজকেও দুজনে বলছিলেন  আচ্ছা এবছর মিশরে গেলে কেমন হয় আমি দুজনের ক্ষয়ে যাওয়া ভগ্ন শরীর দেখছিলাম আর চোখের  জলে ভাসতে ভাসতে  তাদের মনোবল দেখছিলাম

 

যে কোন প্রতিযোগিতা বা পরীক্ষার আগে মা বলেন, যাহা বুনিবে তাহা কাটিবে, আসিবে আনন্দে আটি লইয়া জানি মনঃস্তাত্তিক নিয়ন্ত্র করেন তিনি,  পরিকল্পিত ভাবে উস্কে দেন কর্মস্পৃহাকে

 

জানি না যাপিত এ জীবনে কি বুনছি, কি বা কাটছি তবে এটুকু জানি, আমি আনন্দিত কারন তারা আনন্দে আছেন আমার এই আনন্দের চর্চা তাদের কাছ থেকেই শেখাতাদের আনন্দ আমার মধ্যে বিরাজমান

[49 বার পঠিত]