তখন ও এখন (৩৩)

By |2012-07-24T07:53:23+00:00অক্টোবর 30, 2009|Categories: সমাজ, স্মৃতিচারণ|3 Comments

আগে মুঠো ফোন ছিল না, এখন আছে এবং সেটা ব্যক্তিগত সম্পদ। প্রতি পরিবার পিছু প্রায় একটা সেট ।তবে একাধিক সীম। আর একটু স্বচ্ছল পরিবারে মাথা পিছু একটা সেট এবং সীমের সংখ্যা একাধিক।
আগে লাইন ফোন ছিল পারিবারিক এবং তা সহজলভ্য ছিল না। এখনো লাইন ফোনের ভোগস্বত্ব পারিবারিক, যদিও মালিকানা পরিবার প্রধানের নামে। কিন্তু মুঠো ফোন একান্তই ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় বন্ধু ভাবাপন্ন প্রযুক্তি। কে কাকে কখন কী নিয়ে ফোন করল তা অন্য কেউও জানতে পারে না। যদিও অপরাধ দমনে এর উপর নিয়ন্ত্রনের ব্যবস্থা হচ্ছে। সে তো অন্য অধ্যায়। এমনিতে স্বাভাবিক জীবন যাপনে ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে গোপনীয়তায় কোন ফ্যাসাদ নেই।

ব্যক্তিগত সম্পদ। ব্যক্তি স্বাধীনতার কাল। ব্যক্তির গোপনীয়তার রীতিনীতির জয় জয়কার। কাজেই মুঠো ফোনের আবিষ্কার সময়োপযোগী। আবার বহু সময় নিজের অনিচ্ছায় অনাঙ্ক্ষাকিত কলও গ্রহণ করতে হয়। অপ্রত্যাশিত ব্যক্তিবর্গকেও মিস কল দেখে কল ব্যাক করতে হয়। ফোনে মিস কল শুধু নয়, কথা বলে উত্যক্ত করা আরেক অপসংস্কৃতির চর্চা। জেনে শুনে বুঝে বিরক্ত করা, শাসানো, প্রেমের প্রস্তাব দেয়াসহ বহুবিধ ঝামেলার সৃষ্টি হয়। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও সহজবোধ্যতা ব্যবহৃত হচ্ছে অন্য অনেক কিছুর বিরুদ্ধের সাথে নারীর বিরুদ্ধেও।মুঠো ফোনের কল্যাণে প্রযুক্তির অপব্যবহারের নমুনার সাকষী আমার মতো মধ্যবয়সী এক নারীকেও হতে হয় ।
তথাকথিত দেশপ্রেমে উদ্বেলিতদের অনেকের মুঠো ফোনে কল আসলে শুনি জাতীয় সংগীত বাজছে, আবার ধর্মীয় উন্মাদনায় উন্মত্ত কাউকে কাউকে ফোন করেলে শুনি কোরাণের আয়াত শুনাচ্ছে। প্রযুক্তির এ সব অপব্যবহার রোধ কঠিন কী?
এখন আমার ভাইয়ের আড়াই বছরের মেয়েটিও জানে কল আসলে মুঠো ফোনের কোন বাটনে চাপ দিয়ে কথা বলতে হয়। আর আমরা বেশ বড় হয়ে বাস্তবে ফোন ধরতে পেরেছি। শৈশবে লম্বা গোনার দুই মাথায় দুটো দিয়াশলাই বাক্স গেঁথে টেলিফোন বানাতাম। আজকের শিশু মাটিতে পড়েই প্রযুক্তিতে ডুবে।আসলে শিশু এখন মাটিতেও পড়ে না, — প্রযুক্তিতেই পড়ে।

আমাদের ছাত্র জীবনে যখন সামসুন্নাহার হলে সিকি বুথে ফেলে টেলিফোন করতাম তখন সে বুথের ভোগস্বত্ব ছিল হলের সব মেয়েদের। লাইন ধরে ফোন করতাম। কারোই অনেক সময় ধরে কথা বলার সুযোগ ছিল না। সে জন্যে দু’য়েক জন রাত জেগে কথা বলতো। এতো সিকি কোত্থেকে যোগাড় করতো তা নিয়েও অনেকের গবেষণার বিষয় ছিল। আবার রাত জেগে কথা বলায় বাধ সাধার মেয়েও ছিল। অহেতুক পড়ার ফাঁকে টিভি রুমের কাছের বুথে গিয়ে বাগড়া দিতো। অগত্যা দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলায় ছেদ পড়তো। ফোন ছেড়ে দিতে হতো। তবে তারা কথা বলতো না। সিকি বুথে দিয়ে উলটা পালটা নম্বর টিপে বলতো – না,পাওয়া গেল না।
কখনো বুথ সিকি খেয়েও ফেলতো। তখন আফসোস। কারা রাত জেগে কথা বলতো আর কারা বাধ সাধতো তা চিহ্নিতই ছিল।
এখন মুঠো ফোনে কথা বলার কী স্বাধীনতা! বিছানায় ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও রাত ভর কথা চলে। এ সংস্কৃতি নিয়ে আবার জনপ্রিয় চলচ্চিত্রও তৈরী হয়। ফোন কোম্পানীগুলোও রাত জেগে কথা বলার জন্যে দিচ্ছে তথাকথিত সুবর্ণ সুযোগ। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কী উদ্ধুদ্ধ করছে না উন্মাদনা সৃষ্টি করছে! পারিবারিক টেলিফোন বলে ছেলেমেয়ের কথা গতিবিধি বুঝা যেতো। এখন আধুনিক যাপিত জীবনের কৌশলে পরে সবাই ঘোরের মধ্যে ঘুরছি। আমরা রূপান্তরিত হচ্ছি।আধুনিকতা, গোপনীয়তা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, ভিন্নতা, নিজস্বতা সমার্থক শব্দে পরিণত হচ্ছে।এ পরিণতি কোন দিকে ধাবিত!

ছোটবেলায় পাঠ্য বইয়ে বুদ্ধদেব বসুর ‘নদী- স্বপ্ন’ পদ্য পড়েছিলাম —-
“কোথায় চলেছ? এদিকে এস না! দুটো কথা শোন দিকি,
এই নাও — এই চকচকে, ছোট, নতুন রূপোর সিকি।
ছোকানুর কাছে দুটো আনি আছে, তোমারে দেব গো তা-ও
আমাদের যদি তোমার সঙ্গে নৌকায় তুলে নাও।
—————
আমারে চেনো না? মোর নাম খোকা, ছোকানু আমার বোন,
তোমার সঙ্গে বেড়াব আমরা মেঘনা- পদ্মা-শোন।
——-
অনেকরঙের পাল আছে, মাঝি। বাদামি? সোনালি? লাল?
সবুজ? তাহলে সেটা দাও আজ, সোনালিটা দিয়ো কাল।”
সবগুলো নদী দেখাবে কিন্তু। আগে চলো পদ্মায়,
দুপুরের রুদে রুপো ঝলমল শাদা জল উছলায়।

নদী দেখার স্বপ্নে আমিও বিভোর হতাম। বর্ষায় আমার গ্রামের পাশের হাঁড়িধোয়া ও মেঘনা জলে জলে একাকার আর এতে ভেসে যেত পাল তোলা সব নৌকা। তবে সে পাল এতো রঙিন ছিল না। বিভিন্ন রঙের কাপড়ে জোড়াতালিও ছিল। কাঠের দোতালার বারান্দায় বসে নদী-স্বপ্ন কবিতাটি উদ্ধুদ্ধ করতো দূরে — বহুদূরে — নাম না জানা নদীতে ভেসে যেতে। দুয়েকবার সে সাধ মিটিয়েছিও। কাকাদের শ্বশুর বাড়ি লঞ্চের পরিবর্তে নৌকায় গিয়ে। আমার সোনাকাকা নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে আমার স্বপ্ন পুরণের জন্যে নয়। বৈষয়িক কারনে। লঞ্চ থেকে ছলিমগঞ্জ নেমে অনেক হাঁটা পথ অথবা নৌকায়। নৌকা আবার সব সময় পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও অন্যদের সাথে মাথা গুণে পয়সা দিয়ে। আরাম করে বসার উপায় নেই। অনেক জিনিসপত্র নিয়ে এভাবে যাওয়া কষ্টকর। এর চেয়ে নিজেদের ঘাট থেকে একবারে নৌকায় যাওয়াই উত্তম।
আরেকবার মামাবাড়ি মতলব থেকে কুমিল্লা জেলার নাড়ারচৌ মাসিমার বাড়ি গিয়েছিলাম নৌকায়। এখন বাস। গাড়ি। ট্রাক সবই চলে।
চাকরি সূত্রে বিভিন্ন জেলার হার্ড টু রীচ এলাকার ই পি আই, জন্ম নিবন্ধন বা প্রাথমিক বিদ্যালয় দেখতে নৌকায় চড়ি। দাঁড় বাওয়ার ঝপাঝপ শব্দ উধাও হয়ে গেছে। ইঞ্জিনের ফটফটানিতে ভাটিয়ালীর কন্ঠরোধ, মাথা ধরে। নদীর স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত। নায়ে এখন পাল নেই, আছে শুধু হাল।মাল্লা নেই, মাঝি আছে।দাঁড় নেই, তবে ধার আছে।

ইদানিং সড়ক ও জনপথের একটা উদ্যোগ আমাকে আলোড়িত করে। বিভিন্ন নদীর উপর যে সব সেতু রয়েছে প্রায়গুলোতেই সেতুর মুখে নদীটির নাম লেখা। সিমেন্ট, পাথর আর বালির ভেতরে কাব্যিক চেতনা। ইতিহাসবোধ। ভ্রমণের সময় ড্রাইভারকে বলি– একটু আস্তে যাবেন। নদীর নাম দেখব। ড্রাইভার দুয়েকবার গতিরোধ করতে পারে না। আবার পিছিয়ে এনে নাম পড়ি। পাংশায় যেতে চন্দনা নদী।নরসিংদীর হাঁড়িধূয়া আর নেত্রকোনার সোমেশ্বরী । লেখা না থাকলে পথচারী কাউকে জিজ্ঞেস করে জেনে যাই ছলাৎ ছলাৎ কত নাম। স্বপ্নের নদী পাড়ি দেই গাড়িতে। যমুনা বাঁধা পড়ে গেছে। পদ্মাও পড়বে।
বিসিডিএম (ব্র্যাক সেন্টার ফর ডেভলপমেন্ট ম্যানেজমেন্ট) নামক ব্র্যাক এর রাজেন্দ্রপুরের প্রশিক্ষণকেন্দ্রে গেছি গত আগষ্ট মাসে,(২০০৯) পাঁচদিনের এক অফিসিয়েল কর্মশালায়। সন্ধ্যায় হাঁটাহাঁটির সময় দেখি জোনাকি পোকা। বহুদিন পর এ পোকা দেখার সৌভাগ্য হলো। আমার এক সহকর্মী আফসোস করলো তার বাচ্চাদেরকে এ পোকা এখনো দেখাতে পারেনি। এ পোকার গল্প বলেও তাদের বুঝাতে পারেনি। আমি অবশ্য আমার সৌভাগ্যের কথা জানিয়েছি। আমার ছেলেমেয়েকে নিয়ে মাঝে মাঝে গ্রামে থাকা হয়েছে। তারা গ্রামের অনেক বৈশিষ্ট্যের সাথে , ঐতিহ্যের সাথেই পরিচিত। আমরা ছোটবেলায় এ পোকা নিয়ে ছড়া কাটতাম –

‘জোনি পোকের পাছার মধ্যে
ইলেক্ট্রিকের বাতি
আল্লাগে না ভাল্লাগে না তাল্লাগে না রে।

জোনি পোকের মানে জোনাকি পোকা। আঞ্চলিক শব্দ জোনি পোক।জোনাকি পোকার মতো প্রকৃতির বৈচিত্র্য না দেখলেও এখনকার প্রজন্ম বিজ্ঞানের আরও বহুতর বৈচিত্র্য দেখে অভ্যস্ত। আমাদের মতো তারা অভিভূত হয় না, অবাক হয় না। আতকে উঠে না। আনন্দিত হয় শুধুমাত্র। আনন্দ পাওয়াটাই যেন তাদের জন্মগত অধিকার। আর আমরা শুধু আনন্দিত নয়, আশ্চর্যান্বিত হতাম — যে শব্দটি এখন বাস্তবেও নেই, লেখাজোখায়ও পড়তে পাই না। কালে আশ্চর্যবোধক চিহ্নটিই হয়তো অদৃশ্য হয়ে যাবে।
আমাদের পাড়ায় কয়েকটি ছেলেমেয়ে প্রকৃতিতে অবাধে বিচরণকৃত জোনাকি পোকা দেখেই তৃপ্ত ছিল না। কাঁচের বৈয়ামে পুরে অন্ধকার ঘরে বসে ঝিক ঝিকানি দেখতো পোকাদের অনিবার্য মৃত্যু জেনেই। এখনও আমরা প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের অবধারিত ধ্বংসকে জেনে নিয়ে — মেনে নিয়েই অনেক কিছু ভোগ করি — উপভোগ করি।

About the Author:

'তখন ও এখন' নামে সামাজিক রূপান্তরের রেখাচিত্র বিষয়ে একটি বই ২০১১ এর বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে।

মন্তব্যসমূহ

  1. গীতা দাস নভেম্বর 1, 2009 at 6:04 অপরাহ্ন - Reply

    কেয়া,
    দাগ কোনটা কাটলো তা না ভেবে আমরা মা হিসেবে য়তটুকু পারি করে যাব। বিপ্রই বেছে নেবে নিজেরটা তারমতো করে।

  2. কেয়া নভেম্বর 1, 2009 at 10:49 পূর্বাহ্ন - Reply

    গীতা দি,

    আমার ছ’ বছরের ছেলে বিপ্র তার গেইম খেলতে খেলতে সেদিন আমায় বললো, ‘মা, আমি ব্যাটল করতে পারলাম না কারণ আমি প্রোটোটাইপ ছিলাম, অরিজিনাল ছিলাম নাতো তাই’। আমি জানতে চাইলাম- ‘প্রোটোটাইপ হলে কী হয়?’ বললো- ‘এটা হলোগ্রামের মত বিষয়, আছে কিন্তু নেই। ওরতো পাওয়ার নেই’। আমি বললাম, ‘সর্বনাশ!! এখন উপায়?’ ও জবাব দিল- ‘এখন ডিকয়েড তৈরি করতে হবে, ক্যামোফ্লেজের কথা ভাবতে হবে’।

    আমি পরদিন, একথায় সেকথায় ওকে সহজ করে বলছিলাম- মলিকুলার কি, কীভাবে এর কার্যক্ষমতা, বিভিন্ন বিন্যাস পরিবর্তন করে ম্যাসপ্রোডাকশন করা যায়। আমি নেনো টেকনোলজীর দিকে এগুচ্ছিলাম- আমার পুত্র আমায় জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কি জেনেটিক এঞ্জিনিয়ারিং এর কথা বলছো?’ আমি বল্লাম ‘নাতো ঠিক নয়…… মানে নেনো… ও বললো, ‘ও নেনো? আই নো দ্য ওয়ার্ড’।

    আমি জানি না ও কতখানি বুঝে শব্দগুলো বলে কিন্তু বলতে শিখেছে গেইম আর মিডিয়া থেকে।

    আমাদের এখানে মাঝে মাঝে জোনাকী দেখা যায়, লজ্জ্বাবতী গাছ আছে। বৃষ্টি শেষে মাটিতে সোঁদা গন্ধ হয়। আমি ওগুলো বিপ্রকে চেনাই। শিশিরে পা ভিজিয়ে হাঁটতে শেখাই।। ঘরের পেছনে ঝিলের পাড়ে রোদ্দুরে ডানা মেলে দেয়া পাখি দেখাই, হাওয়ায় দোলা নারকোল পাতার শনশন আওয়াজ শোনাই।

    জানি না কোনটা ওর মনে কতটা দাগ কাটে।

  3. opu অক্টোবর 31, 2009 at 4:25 অপরাহ্ন - Reply

    নষ্টাল‍জিয়া ! ভালো লাগ‍লো। ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন