প্রস্তাবিত শিক্ষা-নীতিঃ আমার ভাবনা

By |2009-09-26T21:19:31+00:00সেপ্টেম্বর 26, 2009|Categories: ব্লগাড্ডা, শিক্ষা|3 Comments

আজকে আমার সৌর শক্তি সংক্রান্ত অনুবাদের কিছু অংশ প্রকাশের ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু কম্পিউটার বিষয়ে বিশেষ অজ্ঞতা জনিত কারনে বিলম্ব, শাপে বর হয়ে দেখা দিল। অনেক দিন হতেই হাত নিশ্‌পিশ্ করছিলো সাম্প্রতিক প্রকাশিত বহুল আলোচিত বাংলাদেশের খসড়া শিক্ষানীতির বিষয়ে কিছু লেখার জন্যে। সুযোগটা পেয়ে গেলাম বলে বসে পরলাম দু’কলম আপনাদের সাথে শেয়ারের উদ্দ্যেশ্যে। আর তা সম্ভব করে দিলো পূর্বোক্ত ফাইলটিকে বাগে আনতে না পারা। কাজেই ও’কাজে সাময়িক য্যোতি!

দেশের বর্ত্তমান সরকারের কাছে বিশেষতঃ তরুণ প্রজন্মের দুটি বিশেষ আকাঙ্খা হলো, এক. আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিরুদ্ধচারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আর দুই. একুশ শতকের উপযোগী গতিশীল শিক্ষানীতি। আরোও বিশেষ দাবীযে, এই দু’টি অবশ্যই আমাদের অর্জন করতে হবে এবছরের স্বাধীনতা দিবসের আগেই। দেশের আপামর জনগনের কোন দ্বিধা নেই যে এ আমাদের যৌক্তিক অর্জন এবং পেয়ে হাড়ানো কে খুঁজে পাওয়া! জনগন এই অর্জনকে হাড়াতে চায়না। যদি আবার হাড়ায় তো সব ব্যর্থতা হবে চলমান সরকারের। এব্যপারে সম্ভবতঃ কারো কোন দ্বিমত নেই। আর যদি থাকেও তো ধোপে আদৌ টিকবে না, একদম চোখ বন্ধকরে(?) বলে দিতে পারি!

সবার প্রথমেই আমি বলবো, যা পেয়েছি, স্বাধীনতার পরে যদি মূল্যবান আর কিছু থাকে তো তা এই শিক্ষানীতি। এ নিয়ে এবার যাঁরা কাজ করলেন প্রত্যেকেই নমস্যঃ এবং এজাতির কাছে প্রাতঃস্মরনীয় হয়ে থাকবেন চিরকাল; তবে যদি নীতিটি সত্যিই আলোর মুখ দেখে তবে। যদিও এর দায় দায়িত্ত্ব প্রণেতাবৃন্দের উপরে পড়ে না, পড়ে সরকারের সদিচ্ছার উপরে। তবুও এই কর্মস্পৃহা এই মনন, দূরদর্শীতা তো ডঃ কুদরাত ই খুদার পরে আর দেখা যায় নাই তাই সংশয়ে সদা টলি। আমি যতদূর খসড়া নীতিটিতে চোখ বুলিয়েছি, মনে হয়েছে অনন্য যদিও কিছু কিছু বিষয়ে ভাবান্তর দেখাদিয়েছে। তবুও বলবো যুগোপযোগী এবং শুরু করা যায়, যেহেতু কমিশন একটি স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা কমিশনের প্রস্তাব করেছে, সুতরাং আগামীতে পর্যায়ক্রমে একে আরোও উন্নততর এবং যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা সম্ভব এবং পথ তো উন্মুক্ত রইলোই। যাইহোক, এবার কোথায় কোথায় কিঞ্চিৎ খটমট মনে হচ্ছে একটু দেখি।

আমাদের দেশের প্রত্যন্ত এলাকার প্রান্তিক নাগরিক বৃন্দের সন্তানেরা প্রায়শঃই শিক্ষার আলো বঞ্চিত। যেমন যে শিশুটিকে মাঠে বাবার সাথে কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে হাটে, ঘাটে, রেস্তোরায়, লোহা-লক্করের কারখানায় কিংবা টার্মিনালে দিনান্ত খাটতে হয় তার অভিভাবককে কি করে শিশু শিক্ষায় উদ্দীপিত করা যায় সে বিষয়ে বিশেষ দিক নির্দ্দেশনা নেই প্রস্তাবিত খসড়া নীতিতে। শিক্ষাকে যদি নাগরিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করতেই হয় তবে এবিষয়ে যথাযথ করনীয় স্থির করা জরুরী বলে মনে করি।

আরোও একটি বিষয় আমার মনে হয়েছে, দেশে যে ক্যাডেট কলেজ গুলো রয়েছে সেগুলোর নিয়ন্ত্রন যদি বর্তমানের মতোই অটুট থাকে তবে দেশে বৈষম্যহীন শিক্ষার প্রসার কিকরে সম্ভব? খসড়া শিক্ষানীতিতে এবিষয়ে কোন উল্লেখ নেই! এখানে মূল বিষয়টি হচ্ছে শিক্ষা-সামগ্রীর এবং সামগ্রীক সুষ্ঠ পরিবেশের প্রতুলতা বনাম অপ্রতুলতার দ্বন্দ্ব। অর্থাৎ শিক্ষা-ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে সরকারের দ্বিমুখী নীতির বহিঃপ্রকাশ। দেশের প্রতিটি কর্নারে যে সব স্কুল-কলেজ রয়েছে প্রত্যেকটিকে কিকরে ক্যডেট কলেজ গুলোর মতো করে আর্থিক এবং বাস্তু তান্ত্রিক সহযোগীতা দেওয়া যায় তার ব্যবস্থা করা হোক। অথবা কোন বিকল্প। এব্যপারে আমার ‘মুক্তমনা’য় পূর্বপ্রকাশিত প্রবন্ধে কিছু প্রস্তাব ছিলো।

খসড়া শিক্ষানীতির ভূমিকায় উল্লেখিত “যোগ্যতমের টিকে থাকা কথাটা বিজ্ঞানীর কল্পনা নয়. অতি নির্মম, কঠিন বাস্তব সত্যবটে” যে অর্থেই ব্যবহৃত হোক না কেনো, সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীর কর্মকান্ড এবং তাঁর গবেষনার ধারাবাহিকতাও জরুরী। জরুরী পাঠ্যসূচীতে এতদ্‌সংক্রান্ত পাঠ-অধ্যায় অন্তর্ভূক্ত করা। ভবিষ্যতের সৃজনশীল মানব সম্পদ উন্নয়নে, মুক্তচিন্তার সমাজ বিনির্মানে এর কোন বিকল্প নেই। যা বিগতদিনের পশ্চাদপদতায়, কূপমন্ডুকতায় দৃশ্যতঃ অপসৃয়মান।

শিক্ষা কমিশনের খসড়া রিপোর্টের প্রথম অধ্যায়, শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যঃ এ অংশে উল্লেখিত তাগিদ ছাড়াও নিম্ন-লিখিত নীতিগত তাগিদ সম্ভবতঃ প্রযোজ্য-
 # দেশের ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়া গুলোকে শিক্ষা-বিস্তারের সহায়ক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলা।
 # দেশের অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠান, ঔষধ, খাদ্য, রাসায়নিক, স্পোর্স-আ্যথলেটিকস, পরিবেশ ও বন, কৃষি এবং প্রকৌশল-প্রতিষ্ঠান সমূহে উচ্চতর গবেষনার দ্বার উন্মুক্ত করা।
 # গৃহকর্মী এবং শিশুশ্রম নিরুৎসাহীত করা এবং প্রয়োজনে আইনের দ্বারা নিষিদ্ধ করা।
 # মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত অন্ততঃ শিক্ষাকে অধিকারে রূপান্তরিত করা।

রিপোর্টের দ্বিতীয় অধ্যায়, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষাঃ এ অংশের শিক্ষা সামগ্রী সাব হেডিং এর আওতায় নিম্নলিখিত পয়েন্ট গুলো সম্ভবতঃ সংযুক্ত করা যায়-
 # কমিশন কর্তৃক একটি নির্ধারিত ফরমেট পাঠ্যপুস্তকের জন্যে এখানে প্রযোজ্য।
 # লেখকবৃন্দের ন্যুনতম যোগ্যতা নির্ধারিত থাকা বাঞ্ছনীয়।
 # একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল থাকা উচিৎ পাঠ্যবই চূড়ান্ত করনার্থে। প্রাথমিক পর্যায়ে উক্ত বিশেষজ্ঞ প্যনেলে বর্ত্তমান শিক্ষাকমিশনের অন্ততঃ একজন সদস্য অন্তর্ভূক্ত হবেন। স্তর অনুযায়ী একাধিক প্যানেল হতে পারে।

ঝরে পড়া সমস্যার সমাধান কল্পে গৃহীত ব্যবস্থাদির পাশাপাশি নিম্নলিখিত ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে-
ভোটার আইডি কার্ড বা জাতীয় পরিচয় পত্র অনুযায়ী যেসব শিক্ষার্থীর অভিভাবক প্রান্তিক কৃষি, হস্ত-শিল্প, মৃৎ-শিল্প, তাঁত-শিল্প এবং রেশম শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের অভিভাবক বৃন্দকে বিশেষ আর্থিক সুবিধার আওতায় আনা যেতে পারে। এতেকরে শিল্প, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক সকলেই উপকৃত হতে পারেন। হতে পারেন উৎসাহীত। কারন, এধরনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীবৃন্দ সাধারনতঃ পারিবারিক ভাবেই সংশ্লিষ্ট শিল্পকর্মের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে, যা স্বভাবতঃই সংশ্লিষ্টদের পারিবারিক আয়ের উৎস।

এপর্যায়ে বিদ্যালয়ে র উন্নতি ও শিক্ষার মানোন্নয়নে তদাররকি এবং তাতে জনসম্পৃক্ততাঃ উপশিরঃনামে যে অভিভাবক-শিক্ষক কমিটির কথা বলা হয়েছে, কোন কারনে ছাত্র-বেতন বৃদ্ধি বা কোন ধরনের ফিস্ নির্ধারনের ক্ষেত্রে এ কমিটিই তাৎক্ষনিক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। কমিটির মেয়াদকাল হওয়া উচিৎ অনধিক দুই বছর। কমিটিতে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন অবশ্যই কোন অভিভাবক। কমিটির মোট সদস্য সংখ্যার শতকরা পঞ্চাশ ভাগ আসবেন অভিভাবক বৃন্দ হতে।আর সে সব সম্মানিত অভিভাবক বৃন্দই সদস্য হিসেবে অন্তর্ভূক্তির অধিকার সংরক্ষন করবেন যাঁদের সন্তান গন স্ব স্ব শ্রেণীতে সর্ব্বোচ্চ অগ্রসর শিক্ষার্থী হিসেবে বিবেচিত হবে।

শিক্ষক নির্বাচন উপশিরঃনামে বলা যায় যে, প্রকৃয়াটি অধিকতর জটীল করা সম্ভবতঃ বাঞ্ছনীয়ই হবে। দীর্ঘমেয়াদী নির্বাচনী পরীক্ষা এবং সাময়িক নিয়োগ অন্ততঃপক্ষে দুই বছর প্রযোজ্য হওয়া উচিৎ বলে আমি মনে করি। এতে করে প্রতিষ্ঠান গুলো সম্ভাব্য প্রকৃত শিক্ষক খুঁজে পাবে এবং প্রকৃত শিক্ষানুরাগীরাই তাদের প্রকৃত জায়গা খুঁজে নিতে সচেষ্ট হবে। তবে সাময়িক নিয়োগ কালীন সময়ে প্রার্থীর জ্যোষ্ঠতা বিবেচনায় রাখতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর মানসিকতা এবং শিক্ষানুরাগী মনোভাব যাচাই যথাযথ হওয়া বাঞ্ছনীয়, প্রয়োজনে মনোবৈজ্ঞানিক যাচাই প্রযোজ্য।

এখানে অন্যান্য সাব হেডিং এর ৩৪ নম্বর পয়েন্টে শুধুমাত্র কিছু প্রায়োগীক দিক নিয়ে বলা হয়েছে, আমার মতে শিক্ষক প্রশিক্ষন আরো আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগীকরন প্রয়োজন। অর্থাৎ, দৃষ্টিভঙ্গীগত উৎকর্ষতা সাধন, যেখানে উদার, মুক্তচিন্তা, মননশীলতার প্রসার ঘটবে। ব্যাপক বিজ্ঞান ভিত্তিক কৌশল এবং মনোবৈজ্ঞানিক কৌশল রপ্ত করা প্রয়োজন।

তৃতীয় অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে বয়স্ক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা। এর উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অনুশিরঃনামে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত শ্রেনীতে ভর্তি হতে পারার ক্ষেত্রে সম্ভবতঃ একটি সর্ব্বোচ্চ সীমারেখা বাঞ্ছনীয়। যেমন শুধুমাত্র প্রাথমিক শিক্ষার সর্ব্বোচ্চ শ্রেণী পর্যন্ত এটিকে সীমাবদ্ধ রাখা যায়। অথবা মাধ্যমিক এবং কারিগরী শিক্ষায় ঠিক কোন স্তরে সীমানা টানা যায় তা বিবেচ্য।

চতুর্থ অধ্যায়ের মাধ্যমিক শিক্ষা এক অতিশয় গুরুত্বপূর্ন অংশ। এ অধ্যায়ের কৌশল উপশিরোনামের অন্যান্য অনুশিরোনামের ১৫ নম্বর পয়েন্টে যা বলা হয়েছে, তার সাথে আমি আংশিক দ্বিমত পোষন সহ অসম্পূর্ন মনেকরি। আমি মনে করি ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল সহ অন্যান্য যে বিদেশী কারিকুলা সমন্বয়ে দেশে এক শ্রেণীর লোকজন শিক্ষাকে ব্যাবসা হিসেবে নিয়ে দেদার প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন তাদের নিরুৎসাহিত করা উচিৎ এবং জরুরী। শুধুমাত্র বিদেশীদের স্বার্থে এধরনের শিক্ষাক্রম স্ব স্ব দেশের দূতাবাস বা কালচারাল সেন্টারের মাধ্যমে সরকারের যথাযথ অনুমোদনক্রমে পরিচালিত হতে পারে। এর জন্যে যদি কোন প্রতিষ্ঠান খুলতে হয় তবে তা সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থায়নেই হওয়া উচিৎ। সরকার শুধুমাত্র আইন মোতাবেক তাদের নিরাপত্তা এবং অন্যান্য প্রাপ্য সহযোগীতা দিতে পারেন।যেমন এখানে ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল এর কথা বলা হয়েছে। ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল পরীক্ষার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্তৃপক্ষের অনুমতি অবশ্যই নিতে হবে আর সরকারের নির্দ্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যথাসময়ে প্রোটকল মোতাবেক ফলাফল হস্তান্তর করতে হবে। ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল-কে ঘিড়ে যাতে কোন শিক্ষা-বানিজ্য সৃষ্টি না হয় তাই এ সংক্রান্ত স্কুল গুলোকে হয় বন্ধ করে দিতে হবে নতুবা দেশীয় কারিকুলার ইংরেজী ভার্সনের জন্যে অপরাপর স্কুল গুলোর মতোই পরিচালনার জন্যে অনুমিত হতে পারে। সম্ভবতঃ এ ব্যবস্থার বাইরে শিক্ষার বৈষম্য এবং শিক্ষা-কেন্দ্রিক ব্যাবসা সংকোচন নীতির আর কোন সুরাহা নেই। আমাদের দরকার প্রকৃত শিক্ষার প্রসার আর শিক্ষা-ব্যাবসার সংকোচন। এসংক্রান্ত ব্যপারে ‘মুক্তমনা’য় আমার পূর্বোক্ত লেখাটি দ্রষ্টব্য।

সপ্তম অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষাকৌশল উপশিরোনামে বিভিন্ন ধর্মের জন্যে বিভিন্ন বিষয়ে জোর দেবার কথা বলা হয়েছে। মনে হয়েছে, বিভিন্ন ধর্মের করনীয় পালনীয় গুলো যত্নে মমতায় বিশ্বাসে এবং জ্ঞান গরিমায় অনুশীলন যোগ্য। আমি এব্যপারে বুদ্ধিবৃত্তিকতায় নির্ভরশীলতা আশাকরি। অর্থাৎ মানবতাকে উর্ধ্ধে তুলে ধরার জন্যে ধর্মাশ্রয়ী মূল্যবোধ সৃষ্টি করা হবে উদ্দ্যেশ্য। প্রকৃত পক্ষে, ধর্মীয় শিক্ষার (যদি দিতেই হয়) ক্ষেত্রে সব ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি সাধারন নীতিমালা দরকার, যার আলোকে সিলেবাস প্রণীত হবে এবং সেই আলোকেই প্রত্যেক প্রচলিত ধর্ম এবং প্রান্তিক ধর্ম সমূহের মূল্যবোধের চর্চা হবে।

অষ্টম অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে উচ্চশিক্ষা । এই অধ্যায়ের কৌশল উপশিরোনামের ৭ নম্বর পয়েন্টে যা বলা হয়েছে তা আমাদের প্রচলিত মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী যথারীতি ৮ থেকে ১০ বছর চর্চা করে এসেছে। এই স্তরে যদি ইংরেজী শিক্ষা গ্রহন প্রযোজ্য হয় তবে তা হওয়া উচিৎ ব্যবহারিক শিক্ষা। আমার প্রস্তাব হলো ১০০ নম্বরের বাধ্যতা মূলক প্রচলিত রীতির ইংরেজীর বিপরীতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে TOEFL অথবা IELTS স্কোর জমা দিতে হবে বাধ্যতামূলক ভাবে নিজ নিজ ডিগ্রী নিশ্চিতকরনার্থে। যেহেতু এই স্কোরের মেয়াদকাল ১ বছর, সুতরাং অনার্স কোর্স সমাপনান্তে কিংবা মাস্টার্স কোর্স সমাপনান্তে একাজটিও শেষ করতে হবে। এদিকে ৩ ক্রেডিটের সময়টুকু শিক্ষার্থী তার নিজ বিষয়ে অধিকতর চর্চায় মনোনিবেশ করতে পারবে বলে আমি মনে করি। আর এই TOEFL কিংবা IELTS এর স্কোর সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্যে প্রয়োজনে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবে।

গত ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০০৯ দৈনিক প্রথম আলোতে জনাব শরিফুজ্জামানের “উচ্চাকাঙ্খী শিক্ষানীতির ব্যয় ৬৮ হাজার কোটি টাকা” শিরঃনামের সংবাদ ভাষ্যটি পড়লাম। কতিপয় বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে সদ্যপ্রকাশিত আমাদের কাঙ্খিত শিক্ষা নীতিকে ঘিড়ে, যা অনভিপ্রেত। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ কথাটি নিয়ে তোলা হয়েছে বিতর্ক। বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি এবং বহু জাতি সমন্বয়ে গঠিত গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ দেশের শিক্ষানীতি ধর্মনিরপেক্ষ হবে এটিই স্বাভাবিক। এখানে যারা প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা উদ্দ্যেশ্য নিয়েই তুলছেন। অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেছেন,” সংবিধান পরিবর্তন না করা পর্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষ কথাটি ব্যবহার করা উচিৎ নয়। শিক্ষানীতিকে বিতর্কিত করতে এটি করা হয়েছে।“ খুবই যুক্তির কথা, কিন্তু এদেশের আপামর জনসাধারন কার্যতঃ সেক্যুলার, স্বভাবতঃই তাঁরা চাইবেন একটি কার্যকর গতিশীল ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতি। অতীতে দেশ কে, এর প্রতিটি কম্পোনেন্টকে বিতর্কিত করা হয়েছে। আজ বিভিন্ন প্রশ্নে বিভিন্ন অজুহাতে এজাতির অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত করার অপকৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। এর হাত থেকে নিষ্কৃতির উপায় কি? অধ্যাপক আহমদের কাছে আমার সবিনয় প্রশ্ন, তিনিকি বাংলাদেশের সেক্যুলার রাষ্ট্র-চরিত্র দেখতে চান? যদি চান তাহলে একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে আজকের তরুন সমাজকে তাদের প্রতিবন্ধকতা হতে রেহাই পাবার দিক নির্দ্দেশনা দিন। এটিই এখন এদেশের তরুন সমাজের একান্ত কাম্য।

এই একই ভাষ্যে আর একটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে। অবশ্যই প্রস্তাবিত নীতিতে এখানে একটি অস্পষ্টতা দেখা দিয়েছে। এব্যপারেও আমার পূর্বোক্ত প্রবন্ধে খানিকটা আলোক পাত করা হয়েছিলো।

সবশেষে, আমি বলতে চাই, আমাদের আকাঙখা অনেক বড়। আমরা যেতে চাই অনেক দূরে! আসুন সেই দূরের আলোর নিশানাকে স্হির করি এবং যথাসম্ভব বিতর্ক এড়িয়ে এগিয়ে যাবার পথের অনুসন্ধান করি। কারণ, আপনার আমার পেছনেই দীর্ঘ যাত্রীর সারি। আমরা ভীত হলেও দুর্বল হলেও ঐ নতুনেরা মোটেও নয়। ওদের আগ্রযাত্রায় সহায়তা না করতে পারি সামাজিক, সাংস্কৃতিক কিংবা ব্যক্তিগত অপারগতায় কিন্তু নিজেরা প্রতিবন্ধক যেনো না হয়ে উঠি। ভবিষ্যতের হাতে যেনো অস্পৃশ্য হিসেবে পরিগনিত না হই।

মুক্তমনা সদস্য। পেশায় শিক্ষক।

মন্তব্যসমূহ

  1. Keshab Adhikary সেপ্টেম্বর 28, 2009 at 9:05 পূর্বাহ্ন - Reply

    প্রথমেই ধন্যবাদ জনাব আগন্তুককে তাঁর চমৎকার মন্তব্যের জন্যে। আমি সত্যি উৎসাহ বেধ করছি এজন্যে যে আজকের তরুণ সমাজেও গুটিকয় মানুষ এই প্রতিকুলতার মধ্যেও টিমটিমে প্রদীপ হাতে দৃঢ়প্রত্যয়ে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত। এই আলো এতো তীক্ষ্ণ যে টিমটিমে হওয়া সত্যেও বহু অসার হৃদয়কে মুহূর্তে ভাবনা তাড়িত করে। কারন মানুষ অনাদিকাল থেকেই অনুসন্ধিৎসু। আর তাই আজকের প্রসঙ্গগুলোর অবধারিত আত্মপ্রকাশ।

    এ ধরনের কোন প্রচলিত ধর্মের অস্তিত্ব আছে কি?

    ধর্মাশ্রয়ী মূল্যবোধ মূলতঃ সমাজ প্রগতির ধারাবাহিকতায় প্রচলিত ক্ষয়িষ্ণু ধর্মীয় দর্শনের যে ধারা-উপধারা গুলো কোন বিতর্ক-বিভেদ ব্যতিরেকেই মানবতার আজকের মানদন্ডে সাময়িক স্থিতিশীল, সংশ্লিষ্টদের (বিশ্বাসী) ক্ষেত্রে সেগুলোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকেই বুঝায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অবধারিত ভাবেই সেই ক্ষয়িষ্ণু ধর্মীয় মূল্যবোধকে পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। আবার সেই পাঠ্যক্রমের মধ্যদিয়ে তালিবান কিংবা রামসেনাদের অভ্যূদয় ঘটুক সেটাও সমাজের কাম্যনয়। সুতরাং বিকল্প হলো ধর্মাশ্রয়ী মূল্যবোধ।

    – এ কথাটা আপনি ঠিক কি অর্থে ব্যবহার করেছেন আমি জানি না।যদি রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধর্মহীন করার প্রসঙ্গে জনমতের কথা বলে থাকেন,তবে বলব ,হ্যাঁ,অধিকাংশ মানুষই ইসলামিক দেশ চায় না।কিন্তু যদি বলেন ‘কার্যত’ আপামর জনসাধারণ ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ -তবে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছি।

    “এদেশের আপামর জনসাধারন কার্যতঃ সেক্যুলার” আমার প্রবন্ধের এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে আপনার উপরোক্ত জিঙ্গাসা। নটরডেম কলেজে আপনি জরীপ চালিয়ে দেখেছেন এবং সিদ্ধান্তে এসেছেন। আপনার জরীপের ফলাফল থেকে আপনি সংশয়ী হয়েছেন যে এদেশের মানুষ ধর্মনিরপেক্ষ কিনা। কিন্তু এটাও তো সত্যি যে নটরডেম কলেজ ক্যাম্পাস গোটা বাংলাদেশ কে রিপ্রেজেন্ট করে না। আমি আসলে বলতে চেয়েছি এদেশের আপামর মানুষ সাম্প্রদায়িক নয়।দেশের প্রান্তিক মানুষ জনের কাছে যান দেখবেন, তাদের মাঝে অনেক অগ্রসর চিন্তার মানুষের দেখা মিলে যাবে। এরা লেখাপড়া করার সুযোগ পায় নি কিন্তু মননে অনেক উচ্চ ডিগ্রিধারীকে ছাড়িয়ে যাবে। আফগানিস্তানের সমাজে এমনটি পাবার আশা করা যায় না। এ তথ্য আমার এক আফগানিস্তানী ছাত্রের দেওয়া। সেখানে সেকুলার চিন্তাধারার মানুষ আছেন, তবে তাঁরা সমাজের শিক্ষিত এবং আপাতঃ প্রভাবশালী আংশের সদস্য। তবে এরাও বিস্তর চাপের মুখে নিরাপত্তাহীনতায় দোদুল্যমান। সেকারনেই আফগানিস্তানের সমাজ ননসেক্যুলার কিন্তুআমাদের সমাজ সেই বিবেচনায় অন্যমেরুতে। প্রকৃতপক্ষে আমাদের সমাজে রক্ষনশীলতা এবং ধর্মীয় গোড়ামীর বীজ সাম্প্রতিক কাল গুলোতে আমদানী করা হয়েছে। এ হচ্ছে এক ধরনের আরোপিত জঞ্জাল। এ মাটির সতঃস্ফূর্ত উৎপাদন নয়। একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন, নটরডেম কলেজের যারা ছাত্র, তারা সমাজের কোন শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ত্ব করে? সমাজের উচ্চবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীকে। এই শ্রেণীটি আসলে সমাজের সুবিধাভোগী একটা অংশ এবং আপাততঃ অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের চালক বা শাসক গোষ্ঠীকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। সুতরাং ধর্মব্যাবসায়ী গোষ্ঠীর লক্ষ্যও কিন্তু এরা। সেই কারনেই দেখবেন দেশের মৌলবাদী গোষ্ঠীর অতৎপরতা কিন্তু সমাজের এই অংশেই বেশী। সেই কারনেই মৌলবাদী ছাত্রগ্রুপটির তৎপরতা দেখাযাবে, বুয়েটে, মেডিক্যাল কলেজ গুলোতে বেশী।
    দেশের আপামর মানুষ যদি মৌলবাদের প্রশ্নে নিরুত্তপ্ত হতো তাহলে বিগত সরকার আমলের ঘটনা গুলের পৌনঃপৌনিকতা দেখা যেতো। তা কিন্তু নেই। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই যে এটি একটি আপাতঃ স্থিতাবস্থা, তাহলে অতীতের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। মূলতঃ যে সামান্য সাম্প্রদায়িক হানাহানির ইতিহাস আছে তার বেশীর ভাগই অন্ততঃ এই পলিময় ব-দ্বীপ দেশে উদীয়মান এলিট শ্রেণীর স্বার্থে আরোপিত ঘটনা ছাড়া কিছুই নয়। কাজেই বলাযায় যে সাম্প্রদায়ীকতা, আমরা যা দেখি, তা নগর কেন্দ্রিক এবং সমাজের প্রভাববলয়ের ভেতরে সীমাবদ্ধ। দেখুন, বিগত দিন গুলোতে এদের প্রশ্রয় দিতে গিয়ে বি এন পি নামের রাজনৈতিক দলটি আসলে মৌলবাদের পাকস্থলীতে হজম হয়ে যাচ্ছে! তার মানে কিন্তু এই নয় যে বি.এন.পি.-র রাজনীতিতে বিশ্বাসীরাও লাইন ধরে মৌলবাদের পেটে হজম হয়ে যাচ্ছে। তারও আগে এরা আওয়ামীলীগকেও টার্গেট করেছিলো, কিন্তু সতর্ক অবস্থান নেওয়ায় আপাততঃ রাহুমুক্ত। যেকোন অসতর্ক মুহূর্তে আবার টার্গেটে পরিনত হতেও পারে! সুতরাং উক্ত জরীপের ফলাফলের সাথে সম্ভবতঃ সমগ্র জনগোষ্ঠীর চেতনার সম্পর্ক অতো জোড়ালো নয়। আরোও একটা বিষয় এখানে শ্রদ্ধার সাথে স্মরন না করলে অপরাধ হবে। এই যে আমাদের আবহমান পল্লী বাংলার নিখাদ মাটির রূপে, রসে, গন্ধে বেড়ে উঠা স্ববিকশিত যুক্তিবাদী দার্শনিক আরোজ আলী মাতুব্বর; নাতো, জন্মাননিতো কোন এলিট ফ্যামিলিতে! এ এক অভাবনীয় বিকাশ! কাজেই আপামর বাঙালীর সার্বিক পরিচয় নিঃসন্দেহে সেকুলার!

    “উদার সুফিবাদের স্থানে প্রতিষ্ঠা হয় কায়েমি স্বার্থবাদী শরিয়তী ইসলাম ; উপনিষদ,চার্বাক ও বৈষ্ণব দর্শনকে পরাভূত করে নোংরা ব্রাহ্মণ্যবাদ।কাজেই বলা উচিত “বাংলাদেশের জনসাধারণ একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত অসাম্প্রদায়িক।”

    এই যে শরীয়তী আইন এই যে ব্রাক্ষ্মন্যবাদ এসবই হাল আমলের কথা। যদিও ব্রাক্ষ্মন্যবাদের উত্থান কাল আরোও কয়েক শতক আগে, তবুও আজকের রামসেনাদের মতো রূপ তখনো নেয়নি। হালে ইসলামী মৌলবাদ আমাদের এখানে আস্তানা গেড়েছে ; যেহেতু আমদানী করা হয়েছে। সেটি সম্ভব হয়েছে উপমহাদেশের রাজনৈতিক বলয়ে ঢুকেপরা প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের প্রভাবে। সাথে যুক্ত হয়েছে পাশ্চাত্যের শক্তি বলয়ের প্রভাব। আমার কেনো যেনো মনে হয় যে এ সবই এক সাময়িক প্রতিক্রিয়া, এদের স্থায়ী রূপ পাবার কোন সুযোগ নেই। কারন মাটি এবং মানুষের একটা সম্পর্ক আছে, সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে তা স্থায়ীত্ব পায় না। সাময়িক উন্মাদনা জাগে বটে কিন্তু টেকে না। সেই বিচারে পরিবর্তনশীল সমাজে তার উপরে বঙ্গীয় ব-দ্বীপে তাই ধর্মনিরপেক্ষতার আবহই মানান সই। এখানে আমরা কেউ কোরো দূরের নই। তাই আমাদের মনের নিগূড়তম দেশে এক ধরনের বন্ধন আছে, সেই বন্ধনেই আমরা সবার আগে বাঙালী বাংলা ভাষী, তার পরে অন্যকিছু যদি থাকে।

    সবশেষে,

    আমার একান্ত অনুরোধ স্যার যেন আমার এই মন্তব্যকে ‘ভুল ধরা’-র মত ধৃষ্টতা হিসেবে জ্ঞান না করেন।

    প্রশ্নই উঠেনা। আমিতো আমার কথা বলেছি। চেষ্টা করেছি আমার অনুভূতিকে প্রকাশের। এই মুক্তমনায় যাঁরা লেখেন, বলেন; মুক্তমনেই সে কাজ করেন। একই আলয়ে আমাদের বাস। তাই সবার অনুভূতি গুলোই শ্রদ্ধার সাথে বিবেচনা করি আমি।
    আবারো ধন্যবাদ সুন্দর বিশ্লেষনের জন্যে।

  2. Supa সেপ্টেম্বর 28, 2009 at 7:23 পূর্বাহ্ন - Reply

    A very important topic. Just like “we are what we eat”, “we do what we are taught” or in computer term – “garbage in garbage out (GIGO)”.

    The main problem is the lack of self education within the ruling party policy makers. I have serious doubt in their ability or willingness in promoting secular, scientific minded, pro-people education system. An average Chhatra League worker does not understand what secularism is or why it is good for mankind and the progression of a nation and why it needs to be defended (few individuals excepted who take the effort or interest to study and research). Other than Islami Chhatra Shibir, no major student front have their own idelogical education policy. To me that is their promary source of success among the young generation, despite their past stand in 1971.

    My point is a child does not become a terrorist or saint by birth – they need to be initiated. The so called “progressive” minded parties expect everything just happens. However, they need to keep in mind that the reacxtionary forces are active too and they are feeling the vacuum for the jobs required from the progressives.

    Shibir should be a model to others for their organisational processes and ability to produce future leadership with strong “iman”.

  3. আগন্তুক সেপ্টেম্বর 27, 2009 at 1:59 অপরাহ্ন - Reply

    একটি সুচিন্তিত ও পরিশীলিত প্রবন্ধের জন্য স্যারকে ধন্যবাদ জানাই।আমিও ভেবেছিলাম যে একজন তরুন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার চিন্তাগুলো নিয়ে কিছু লিখতে।তবে তা কখনোই এত সম্পূর্ণ হত না।

    আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা একটি সম্পূর্ণ লক্ষ্যহীন,সেকেলে ও গঁতবাঁধা শিক্ষাব্যবস্থা।এতে করে মাঝারি মানের স্মৃতিসম্পন্ন ‘মুখস্থবিদ কম্পিউটার’ তৈরী হতে পারে,মানুষ হওয়ার সুযোগ থাকে না।

    “অর্থাৎ মানবতাকে উর্ধ্ধে তুলে ধরার জন্যে ধর্মাশ্রয়ী মূল্যবোধ সৃষ্টি করা হবে উদ্দ্যেশ্য।”

    স্যার, এ ধরনের কোন প্রচলিত ধর্মের অস্তিত্ব আছে কি?এটা ঠিক যে ধর্মীয় শিক্ষা না থাকলে ধর্মের ফাঁকিগুলো ধরা পড়ে না,কিন্তু বল্গাহীন ধর্মশিক্ষাই মানুষকে অমানুষ করে।মানবতার ইতিহাসে বেদ,বাইবেল,কুরানের চেয়ে অমানবিক কোন গ্রন্থ লেখা হয়েছে বলে তো মনে হয় না।

    “এদেশের আপামর জনসাধারন কার্যতঃ সেক্যুলার”

    – এ কথাটা আপনি ঠিক কি অর্থে ব্যবহার করেছেন আমি জানি না।যদি রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধর্মহীন করার প্রসঙ্গে জনমতের কথা বলে থাকেন,তবে বলব ,হ্যাঁ,অধিকাংশ মানুষই ইসলামিক দেশ চায় না।কিন্তু যদি বলেন ‘কার্যত’ আপামর জনসাধারণ ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ -তবে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছি।নৎর দাম কলেজে ছাত্র থাকাকালীন আমি আমার বন্ধুমহলে একটা ‘আন-অফিশ্যাল’ জরিপ চালাই।তাতে বেরিয়ে আসে
    ১।অধিকাংশ ছাত্র মনে করে যার যার ধর্ম তার তার কাছে শ্রেষ্ঠ।
    ২।প্রায় সমান অংশই মনে করে যে,ইসলামই একমাত্র মনোনীত ধর্ম।
    ৩।সবগুলো প্রধান ধর্মই সমান – এ কথা বিশ্বাস করে এমন ছিলাম আমি ও আমার একটি বন্ধু যে ছিল মৌলভি!

    ১নম্বর শ্রেণীভুক্তদের কোনভাবেই ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলা চলে না।এরা কেবলমাত্র একটা নির্দিষ্ট লেভেল পর্যন্তই ‘অসাম্প্রদায়িক।’তা নইলে ২০০১ সালের অত্যাচার এমন নিস্পৃহভাবে সহ্য করা হত না।সেই অনাচারের বিপক্ষে যাঁরা আওয়াজ তুলেছিলেন,রাষ্ট্রযন্ত্র তাঁদের ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দেয়।

    বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িকতার বাস্তব রূপটি ধরা পড়েছে শুধুমাত্র তসলিমার ‘লজ্জায়’ এবং প্রয়াত শ্রদ্ধেয় ডঃ হুমায়ুন আজাদের ‘পাক-সার-জমিন সাদ-বাদ’-এ।স্বাপ্নিক ও মানবহিতৈষী ডঃ মুহাম্মদ জাফর ইকবালের কলামে যদিও বঞ্চিত সংখ্যালঘুদের জন্য সমবেদনা ঝরে পড়ে,তবুও তিনিও আপামর মানুষকে সেক্যুলার ভাবার ‘বিলাসিতা’ করেন।

    সম্রাট আকবরের আমলে এদেশে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি ছিল।তাছাড়া সুফিজম ও বৈষ্ণব ধর্ম মানুষকে ভেদাভেদ ভুলতে সাহায্য করে।কিন্তু যত দিন গিয়েছে আমরা বর্বরতার পথে হেঁটেছি।উদার সুফিবাদের স্থানে প্রতিষ্ঠা হয় কায়েমি স্বার্থবাদী শরিয়তী ইসলাম ; উপনিষদ,চার্বাক ও বৈষ্ণব দর্শনকে পরাভূত করে নোংরা ব্রাহ্মণ্যবাদ।কাজেই বলা উচিত “বাংলাদেশের জনসাধারণ একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত অসাম্প্রদায়িক।”

    আমার একান্ত অনুরোধ স্যার যেন আমার এই মন্তব্যকে ‘ভুল ধরা’-র মত ধৃষ্টতা হিসেবে জ্ঞান না করেন।
    আবারো অশেষ ধন্যবাদ জাতির সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করার জন্য।

মন্তব্য করুন