ত্রিশ-দশকে আবির্ভূত একদল শিক্ষিত মেধাবী কবির হাতে ‘স্থূলতা, মেকিত্ব ও প্রাকৃত আবেগ ছেড়ে বাঙলা কবিতা আলিঙ্গন করলো সূক্ষ্মতা, স্বাভাবিকতা ও রুচিশীলতাকে’১ ; মহাপরাক্রমশালী রবীন্দ্রনাথের প্রভাব বলয়ের বাইরে প্রবাহিত হতে শুরু করলো বাংলা কাব্য-নন্দনের এক নবস্বাদধারা। যেখান থেকে বাংলা কবিতায় ‘আধুনিক যুগের ব্যাপকায়তন যাত্রাপাত। ক্ষুদ্রায়তনে ‘আধুনিক’ শব্দটির প্রয়োগ এর আগে মাত্র একজন কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হয়েছিল। সে ‘আধুনিকতা’ এবং ত্রিশের সূক্ষ্মতা, স্বাভাবিকতা আর রুচিশীলতা সূচক ‘আধুনিকতা’ এক নয়। চল্লিশ-পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর-আশি বাহিত হয়ে এখনোও অবধি প্রবহমান যে ‘আধুনিকতা (উত্তর-আধুনিকতার কথা মনে রেখেই), তা মধুসূদনের নয়, ত্রিশের। ত্রিশের পাণ্ডবগণের জীবনবাদিতা ছিল ভিন্নরকম। ‘তাঁরা রাজনীতিনিরপেক্ষ, সমাজবিমুখ, ব্যক্তিবাদী কিন্তু জীবনবাদীও এ-অর্থে যে তাঁদের হাতেই বাঙলা কবিতা এই প্রথম স্বপ্নীল ভাবলোকের নিকুঞ্জ ছেড়ে হৈ হৈ করে ঢুকে পড়ল জনজীবনের আনাচে-কানাচে, গৃহিণীর হেঁসেলে, গেঁদু মোড়লের সালিশী বৈঠক থেকে নগরীর ফুটপাত, অলিগলি এমনকি পতিতালয়ের নিষিদ্ধ প্রকোষ্ঠে। কিন্তু এত জীবনলগ্ন হয়েও এসব কবিতার অধিকাংশ নির্গত হয়েছে ব্যক্তিমানসের নিঃসঙ্গ অন্তর্লোক থেকে। এই নিঃসঙ্গতা আধুনিক বিশ্বের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে জাত ; এই চেতনা যত না কবির স্বসৃষ্ট তারও চেয়ে বেশি বিনষ্ট সময় ও সমাজের দান।’২ –এই যে অস্থিরতার সাথে কবিতা কর্মীদের আত্যন্তিক সাক্ষাৎ ত্রিশ-দশকীয় গবাক্ষপথে ; একটিমাত্র দশকান্তরে সেই অস্থির পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে অস্থিরতর। বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের পাশাপাশি ভারতভূমিতেও এ সময়ে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এমনসব ঘটনাবলি সমুপস্থিত হয়েছে যে চল্লিশদশক আধুনিক ভারতবর্ষের সবচেয়ে কম্পমান, অনিশ্চয়তামণ্ডিত দুর্দশক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এর প্রতিক্রিয়া স্পর্শ করেছে লেখককুলকেও। নির্মাণ প্রক্রিয়ায় নিঃসঙ্গ হয়েও বাইরে তাঁরা হয়ে উঠেছেন সঙ্গপরিবেষ্টিত। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনেক কবিই যুক্ত হয়ে পড়েছেন বঞ্চিত মানুষের আন্দোলনে। কবিতার বিষয় হিসেবে সময়, সমাজ, মানুষ, মানুষের বঞ্চনার ইতিহাস হয়ে উঠেছে ব্যক্তিক নৈসঃঙ্গতার চেয়েও বড়ো। লিখিত হয়েছে প্রচুর উচ্চকণ্ঠ শ্লোগানও। আহসান হাবীব (১৯১৭-১৯৮৫) এই উত্তুঙ্গ আন্দোলনমুখর বিনষ্ট সময়েই তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাত্রিশেষ’ (১৯৪৭)-এর প্রকাশের মধ্য দিয়ে কবি আহসান হাবীব হিসেবে স্বয়ম্প্রকাশিত।

সুতরাং ‘রাত্রিশেষ’-এর মূল্যায়ন প্রয়াস পুরোটাই অর্থহীনতায় পর্যবসিত হবে, যদি না তৎকালীন ভারতবর্ষের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতটি সামনে নিয়ে আসা হয়। সেটা হবে অসঙ্গত এবং অযৌক্তিকও। এখানে কাজেই রাত্রিশেষের গান শোনবার আগে খতিয়ে দেখা দরকার আঁধারাধার সেই রাত্রির চারিত্র্যপট, যেখানে ঘাপটি মেরে ছিল নবপ্রভাতের রক্তিম সম্ভাবনা।

ছুঁয়ে দেখি সময়ের ত্বক

হিটলারের অট্টহাসি তখন কাঁপাচ্ছিল পৃথিবী। সে কম্পনের দোলা এসে লাগছিল ভারতবর্ষেও। ততদিনে নানাভাবে বিব্রত ব্রিটিশ ক্ষত্রিয়কুল যুগপৎ হতবিহ্বল ও মরিয়া। রাজনৈতিক আকাশে অশনি, ঘনঘটা। ১৯৪০-এ ফরোয়ার্ড ব্লকের আন্দোলনে ভারতীয় রাজনীতিতে জাগল অভূতপূর্ব এক চাঞ্চল্য। ব্রিটিশের রক্তচক্ষু নেতাজীর প্রতি কুপিত। কিন্তু চৌকষ ও লোকপ্রিয় নেতা সুভাষ বোস ব্রিটিশের আণুবীক্ষণিক-চোখকে ফাঁকি দিয়ে আফগানিস্তান হয়ে জার্মানিতে অন্তর্ধান করলেন। লাগল বাঙালি তারুণ্যে এক অসামান্য নাড়া।

‘৪১-এ ঘটল বাংলার সাহিত্যাকাশের অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্র রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ। চারদিক থেকে ধেয়ে আসা দুঃসময়ে এ বটবৃক্ষ নানাভাবে ছায়া বিস্তার করে ছিলেন ভারতবাসীর ওপর। তিনি নতুন করে প্রস্তুতও হচ্ছিলেন মানুষের পাশে দাঁড়াবার জন্যে। ফলে এ সময়ে এই ছায়াদায়ী বৃক্ষের বিলয় ব্যথিত করে তুলল বাঙালি মাত্রকেই।

‘৪১-‘৪২ জুড়ে জার্মান ও জাপানের হাতে দুর্দান্ত মার খাচ্ছিল ব্রিটিশ। কলকাতায় আমেরিকান সৈন্যের পদপাত, জাপানের বোমা। বোমাতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে মানুষ। ক্রিপস মিশনে কংগ্রেসের সাথে ব্রিটিশ ক্যাবিনেটের আলোচনা এবং তার ফলাফল ব্যর্থতায় পর্যবসিত। স্বদেশী খ্যাত মহাত্মাজীর অহিংস আন্দোলন রূপলাভ করলো সহিংস ‘ভারত ছাড়ো’তে। মাতঙ্গিনী হাজরার বীরত্বপূর্ণ মৃত্যু। গান্ধীজীসহ ওয়ার্কিং কমিটির সকল সদস্য গ্রেফতার। ডাক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা, সরকারি অফিস ও থানা ব্যাপকভাবে আক্রমণের শিকার। বিহার, উত্তর প্রদেশ ও মেদিনীপুরের কোনো কোনো অংশে ইংরেজ শাসনের অস্তিত্ব বিলোপ। বামপন্থার সমর্থকদের নেতৃত্বে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি গঠন ও ব্রিটিশ বিরোধী ব্যাপক তৎপরতা।

যুদ্ধের প্রয়োজনে খাদ্য শস্যের ব্যাপক পাচারের ফলে ‘৪৩-এ ভারতবর্ষে নজীরবিহীন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। বেসরকারি মতে ৩৫ লক্ষ লোকের অনাহারে মৃত্যু।৩ মতান্তরে ৫০ লক্ষ।৪ প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে শতসহস্র ছিন্নমূল মানুষের শহরমুখীনতা। নারীসমাজের উপর বেদনাকরভাবে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব-পতন। অল্পবয়সী নিঃস্ব রমণীদের বেশিরভাগেরই ব্যতিক্রমহীনভাবে দেহব্যবসার শিকারে পরিণত হওয়া। ‘কলকাতার ১ লক্ষ ২৫ হাজার নিঃস্বের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজারের স্থান হয়েছিলো পতিতালয়ে। এদের মধ্যে প্রতি চার জনের একজন ছিলো নাবালিকা।’৫ এ পরিণতি শুধু কলকাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে মেদিনীপুর, রংপুর, চট্টগ্রামেও সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ‘ম্যালেরিয়ার পরে যৌনরোগ হয়ে ওঠে বৃহত্তম জনস্বাস্থ্য সমস্যা।’৬ পাশাপাশি ভারতবর্ষ জুড়ে ভয়াবহ বস্ত্র-সংকট। শতচ্ছিন্ন বস্ত্রাচ্ছাদিত পাঁচ হাজার নারীর এক ভুখামিছিলের আইনসভা ভবনের সামনে জমায়েত।৭ কলকাতায় জাপানি বোমারু বিমান থেকে মারণাঘাত।
‘৪৪-এ আবার বোমা।
‘৪৫-এ হিটলারের আত্মহত্যা। জাপানের হিরোশিমা, নাগাসাকিতে অ্যাটম বোমার ধ্বংসযজ্ঞের পর যুদ্ধাবসান। আজাদ-হিন্দ ফৌজের মুক্তির দাবিতে উদ্বেল আন্দোলন। মিছিল। গুলি। রামেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় নামক এক ছাত্রের মৃত্যু। ময়মনসিংহে হাজং বিদ্রোহ।
‘৪৬-এ নৌ-বিদ্রোহ। রক্তপাত। আন্দোলনকামীদের পরাজয়। ফসলের ন্যায্য ভাগ প্রাপ্তির দাবিতে খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে কৃষক আন্দোলনের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত। তেভাগা, নানকার, তেলেঙ্গানায় নিম্নবিত্তের অন্যরকম জেগে ওঠা। ‘১৯ টি জেলার ৬০ লক্ষ মানুষের কৃষক আন্দোলনে অংশগ্রহণ।’৮ অজস্র শহীদ। ব্রিটিশদের ইন্ধনে ভারতে সম্প্রদায়গত বিভেদ। মানুষ কিংবা দেশের চেয়ে ধর্মের বড়ো হয়ে ওঠা। প্রধান শত্রু ইংরেজ রইল আড়ালে। হিন্দুর শত্রু প্রতিপন্ন হয়ে উঠল মুসলমান, মুসলমানের হিন্দু। ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে-তে কলকাতায় সংঘটিত ভয়াবহ দাঙ্গায় মুসলমান পান করল হিন্দুর রক্ত, হিন্দু মুসলমানের। নিহত হলো ৫০০০, আহত ১০০০০।৯ কলকাতা ছাড়িয়ে তার জবাবে নোয়াখালী, বিহার, গড়মুক্তেশ্বরেও ঝরল উভয়পক্ষের রক্ত। শুভবুদ্ধি হলো অন্তর্হিত।
‘৪৭-এ ধর্মভিত্তিক এক বিভাজনে লর্ড মাউন্টব্যাটেন দু’খণ্ডে কর্তন করলেন ভারতবর্ষকে। যার ডাকনাম হলো স্বাধীনতা।
–এই আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা ‘রাত্রিশেষ’ পর্বে আহসান হাবীবের দৈনন্দিনের সঙ্গী। ১৯৩৬ থেকে শুরু করে এ সময়ের পুরোটাই তিনি কলকাতায় অতিবাহিত করছেন। চাকুরি করছেন দৈনিক তকবীর, দৈনিক আজাদ, মাসিক বুলবুল, মাসিক সওগাত, শিশু সওগাত, দৈনিক কৃষক এবং ‘৪৩ থেকে অল ইন্ডিয়া রেডিওর কলকাতা কেন্দ্রের স্টাফ আর্টিস্ট ও একই সঙ্গে দৈনিক ইত্তেহাদের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে।১০ একজন সাংবাদিকের এসব ঘটনা পরম্পরার কোনোটাই অজ্ঞাত থাকবার কথা নয়। এছাড়াও একজন কবির প্রস্তুতিপর্বে, তাঁর বেড়ে ওঠার কালপরিসরে যেসব বড়ো বড়ো উত্থান-পতন সংঘটিত হয়– তা-ও কবিচিত্তে রেখে যায় অনিবার্য ছাপ। সুতরাং তাঁর (কবির) আত্মপ্রকাশের যে সময়, তার বাইরে নিকট অতীতের ঘটনাবলিও এক্ষেত্রে গুরুত্ববহ। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনাক্রম ১৯২৮-এ ৫০৬৮৫১ জন১১ শ্রমিকের অংশগ্রহণে সংঘটিত শ্রমিক ধর্মঘট, বিলাতি দ্রব্যাদি বর্জন আন্দোলন। ‘৩০-এ সত্যাগ্রহ, লবণ আইন অমান্যকরণ আন্দোলন ও মাস্টার দা সূর্যসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন এবং জালালাবাদ পাহাড়ের আক্রমণ, ‘৩১-এ শ্রমিক ধর্মঘট, ‘৩২-এ ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মোৎসর্গ, দিনাজপুরে সাঁওতাল বিদ্রোহ। ‘৩৪-এ সূর্যসেন ও তারকেশ্বরের ফাঁসি কার্যকর। ‘৩৫-এ ইউরোপে শিল্পী সাহিত্যিকদের ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলন। ‘৩৭-এ মণিসিংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত টঙ্ক আন্দোলন এবং পাট ও সূতাকলের শ্রমিকদের ধর্মঘট। ‘৩৮-এ চট ও ইস্পাতকল শ্রমিকদের ধর্মঘট ইত্যাদি। (চলবে)

দোহাই

১. প্রসঙ্গ বাংলাদেশের সমালোচনা সাহিত্য, আবিদ আনোয়ার, বাংলা কবিতার আধুনিকায়ন, ১৯৯৭, ঢাকা
২. মধ্যদিনের জানালা, আবিদ আনোয়ার, বাংলা কবিতার আধুনিকায়ন, ১৯৯৭,, ঢাকা
৩. ডঃ মধুসূদন চক্রবর্ত্তী : বাঙলাদেশের (পূর্ববঙ্গের) আধুনিক কবিতার ধারা (১৯৪১-১৯৭১), ১৯৮২, কলকাতা
৪. সন্দীপ দত্ত : বাংলা কবিতার কালপঞ্জি ১৯২৭-১৯৮৯, ১৯৯৩, কলকাতা
৫. দারিদ্র্য ও পতিতাবৃত্তি, পিটার কাস্টার্স : তেভাগা অভ্যুত্থানে নারী,
৬. দারিদ্র্য ও পতিতাবৃত্তি, পিটার কাস্টার্স : তেভাগা অভ্যুত্থানে নারী,
৭. জাগ্রত নারী সমাজ : এসেম্বলীর পথে ভুখা মিছিল, পিটার কাস্টার্স : তেভাগা অভ্যুত্থানে নারী,
৮. আন্দোলনের সূত্রপাত, পিটার কাস্টার্স : তেভাগা অভ্যুত্থানে নারী,
৯. সন্দীপ দত্ত : বাংলা কবিতার কালপঞ্জি ১৯২৭-১৯৮৯, ১৯৯৩, কলকাতা
১০. আহমদ রফিক : আহসান হাবীব রচনাবলী (১ম খণ্ড), ১৯৯৫, ঢাকা
১১. সন্দীপ দত্ত : বাংলা কবিতার কালপঞ্জি ১৯২৭-১৯৮৯, ১৯৯৩, কলকাতা

[53 বার পঠিত]