(১)
গোকুর নাথ। না তিনি বাঙালী নন। ফ্লোরিডা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের ছাত্র ছিলেন- অতীতে নিজেকে র‌্যাশানালিস্ট বলে দাবী করতেন। গত দুই দশক ধরে ইস্কনের শিষ্য। আজ তিনি আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, কেন তিনি, ধর্মে বিশ্বাস হারিয়ে আবার ধর্মে ফিরে এলেন। এখানে আস্তিকতা বা নাস্তিকতা অপ্রাসঙ্গিক। কারন বৈষ্ণব ধর্ম ও এক ধরনের অদ্বৈতবাদ-তাই ঈশ্বর বিশ্বাস ফিরে পাওয়া কথাটা ব্যাবহার করাটা টেকনিক্যালি ভুল। কিন্তু ব্যাবহারিক দিক দিয়ে ঠিক।

আগে বাংলাদেশী ফোরামে কিছু ধার্মিকের সাথে পরিচয় হয়েছিল। যারা এক সময়ে র‌্যাশানিলিস্ট ছিলেন, কিন্ত আবার ইসলামে আস্থা ফিরে পেয়েছেন। একাধিক উদাহরন আমি নিজেই দেখেছি।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, বিজ্ঞান ভিত্তিক, যুক্তি ভিত্তিক একটা জীবন শুরু করেও অনেকে আবার সেই ধর্মের কোলেই ফিরে যাচ্ছে। যুক্তিবাদ কি তাহলে অসার? প্রবীর ঘোষের সংঠন সেই মুষ্টিমেয় কজন। তার থেকে রাম-শ্যাম যদু মার্কা গুরুদের ও অনেক বেশী বড় সংগঠন। ব্যাপারটাকে আমরা যুক্তিবাদিরা -ভাল জিনিসের কদর কম, বা খুব কম লোক বোঝে ইত্যাদি দিয়ে আত্মশান্তনা দিয়ে থাকি।

কিন্ত কেন লোকে ধর্ম ছাড়ছে না?

আমরা কি ঠিক বুঝছি? ঈশ্বরের সপক্ষে যুক্তিগুলো এতই হাস্যকর-সেটা আমি একদম প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বুঝে আসছি। আমার মাথার ওপর ঈশ্বরের দশমনি বোঝা কেও চাপায় নি ছোটবেলা থেকে। ফলে জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আদৌ কোন দিন আমি ঈস্বরে বিশ্বাস করতাম কিনা জানি না। ফলে আমার জীবনে ঈশ্বরের বিশ্বাস হারানোর হ্যাপা পোহাতে হয় নি কোনদিন-কারন ঈশ্বর বাবাজী কোনদিনই আমার বুদ্ধির প্রাচীর ভেদ করে ঢুকতে পারলেন না। ঈশ্বরের অনস্তিত্বের এই সামান্য যুক্তিগুলো সংখ্যা গরিষ্ঠ লোকে বুঝবে না-এটা কোন যুক্তিতে বুঝবো? বেঁচে থাকতে গেলে যথেষ্টই বুদ্ধির দরকার হয়। সাধারন মানুষের বুদ্ধি এত কম না, যে তারা বুঝবে না ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই। এতবড় গোজামিল, চোখে না পড়ার কিছু নেই।

তারপরেও কিছু কিছু যুক্তিবাদি আবার ধর্মে ফিরে আসছে কি করে? প্রশ্নটা নিয়ে আমাদের গভীরে ভাবা উচিত।

(২)
মানুষের নির্মানের মূলে যৌক্তিকতা না অযৌক্তিকতাবাদ? না মানবতাবাদ? শুধু যুক্তিবাদ দিয়ে কি জীবন ধারন করা সম্ভব? পৃথিবীর সেরা সেরা গান, সাহিত্য-সব কিছুই ত ঈশ্বরকেন্দ্রীক। যার পেছনে কোন যুক্তি নেই। অঙ্কুর নাথ যেমন বললেন, আমি হরে কৃষ্ণ নাম উচ্চারন করি হাজার বার-তাতে নাকি আষাঢ়ের বর্ষন ধারার মতন নেমে আসে পরম শান্তি। দুঃখ নেই। সে নাকি সচ্চিদানন্দ ( সদাই যে আনন্দে থাকে) । ধর্মপ্রান মুসলমানদের কাছেও, নামাজটা সেই সিগারেট বিড়ি টানার মতন অভ্যেস। একটু টান দিলে, মনটা চাঙ্গা থাকে। তার কি যাই আসে, ঈশ্বর আছে কি নেই? সেত প্রাণে খুশী। আর মৃত্যুত সবারই নিয়তি। সে যদি খুশী মনে মর‌তে পারে-ক্ষতি কি। মঠে থাকে, কোন কেলেঙ্কারী নেই জীবনে, নিষ্ঠাবান ব্রহ্মচারী। আমি যুক্তিবাদি, সে সচ্চিদানন্দ-আলটিমেটলি দুজনেই মারা যাব। ১৩ বিলিয়ান বছরের মহাবিশ্বে কি পার্থক্য হবে এতে? জীবনের উদ্দেশ্য যদি অন্যমানুষের ক্ষতির কারন না হয়, তাহলে কেন তার জীবনের উদ্দেশ্যে যুক্তিবাদ আসবে?

ইয়াং জেনেরাশনে অধিকাংশই যুক্তিবাদি হয় তাদের জীবনের স্বাধীনতার ওপর ধর্মের খবরদারি দেখে। কয়েকজন ব্রিলিয়ান্ট ইরানিয়ান ছাত্রকে চিনতাম-তারা যথেচ্চার মদ্যপান করত, আর শুয়োরের মাংস খেতে খেতে মোল্লাদের গালাগাল দিত। অনুমান করি, তাদের মূল ক্ষোভের কারন, মোল্লা ব্যাটাদের জন্যে তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিল না-যৌবনে প্রেমটেম করাও ছিল রাষ্ট্রের চোখে ভয়ংকর। অর্থাৎ ধর্মের কুপ্রভাবে, তারা যৌবন ধর্ম ঠিকটঠাক পালন করতে পারে নি বলে রাগ। দক্ষিন ক্যালিফোর্নিয়াতে বেশ কিছু বাংলাদেশী মেয়ে ধর্মকে গুলি মেরে আমেরিকান মেয়েদের মতন জীবন যাপন করত। তারা আস্তিক না নাস্তিক জানি না-তবে মোল্লাদের খপ্পর থেকে বেড়তে পেরে খুব খুশী।আবার ইন্টারনেটের কিছু পৌঢ় ধার্মিক দাবী করেন-তারা এককালে বামপন্থী যুক্তিবাদি প্রগতিশীল ছিলেন-ইদানিং ইসলামের মাহাত্ম্য বুঝে, আবার হাড়িকাঠে গলা দিয়েছেন। এর মধ্যে তারা নাকি পরম শান্তির সন্ধান পাচ্ছেন! হিন্দু বামপন্থীদের মধ্যেও এমন আকছার ঘটে। যৌবনে মার্ক্সিট ( অবশ্য সেটা মাছভাতের থেকে কি আলাদা জিনিস তা অধিকাংশ বাঙালী কমিনিউস্টই জানে না) , মধ্যযৌবনে সেনস্ট্রিস্ট, সেখান থেকে বার্ধক্যে রক্ষনশীল জ্যাঠামশাইদের সর্বত্রই দেখি।

ধর্ম সংক্রান্ত এই পরিবর্তনগুলো আমাদের জীবনে কেন আসে?
(৩)
এর সাথে ঈশ্বরের অস্তিত্ব অনস্তিত্বের সম্পর্ক নেই। আসলে সবাই একটা বস্তুবাদি ‘কমফর্ট জোন’ বা সুখের সন্ধানে। এর মূলে অবশ্যই আমি কে বা জীবনের উদ্দেশ্যকি এই প্রশ্নগুলি। তবে এইসব প্রশ্ন বিদ্ধ হয়ে কোন প্রানী কিছু করে না। সমাজ আর পরিবেশ এর উত্তরগুলো আমাদের জোর করে গিলিয়ে দিয়ে থাকে। মৌমাছিদের জৈবচক্রে “জীবনের উদ্দেশ্য কি” তাই নিয়ে নিশ্চয় প্সশ্ন ওঠে না। হাজারে হাজারে সবাই যা করছে, তারাও তাই করে। ক্যানোনিক্যাল ধর্মগুলো-মানে যে ধর্ম গুলো কখন কি করিতে হইবে তাহা লিপিবদ্ধ করিয়াছে-তাদের অনুসারিরা আচরনে পুরুষ মৌমাছি। “ব্যাক্তি-স্বাতন্ত্রের” প্রশ্ন সেখানে নেই-স্বাধীন অস্তিত্বের কথা সেখানে ভাবা নিষিদ্ধ-পুরুষ মৌমাছির মতন আচরনই সেখানে সিদ্ধ।

শিল্প বিপ্লবের আগে এসব নিয়ে সমস্যা ছিল না। নাস্তিক ছিল না যে তা না-কিন্ত যুথবদ্ধ জীবন ছাড়া একাকী বেঁচে থাকা ছিল অসম্ভব। অথচ আজ আমেরিকার যেকোন শহরে ৩০ বছরের নীচে অধিকাংশ নারী বা পুরুষ একাই থাকে। সবারই প্রায় একাধিক যৌন সঙ্গী। তাই নিয়ে কেও চিন্তিতও নয়। এবং এইসমস্ত দেশ সমূহ, প্রোডক্টিভিটিতে পৃথিবীর সবার ওপরে। পাশ্চাত্যের এই সব দেশ সমূহের সমস্যা হল-জন সংখ্যা হ্রাস। কারন, অনেক মেয়েরাই সন্তান ধারনে অনিচ্ছুক। তবে রাশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে সেটাও সমস্যা না। মূল কথা ফার্টালিটি রেট ২ এর ওপরে থাকা দরকার। রাশিয়াতে ১৯৯৫ সালে ১ এর নীচে নেমে গিয়েছিল। বর্তমান রাশিয়ান সরকার, মা হওয়ার জন্যে বিভিন্ন ইনসেন্টিভ চালু করে। তিন সন্তান হলে এস ইউ ভি, চার সন্তান হলে বিনা পয়সায় ফ্ল্যাট–এসব করে, বর্তমানে রাশিয়াতে ফার্টিলিটি রেট আবার দুই এর কাছাকাছি। সুতরাং ধর্মের ভয় দেখিয়ে, শুধু রক্ষনশীলতার মাধ্যমেই রিপ্রোডাক্টিভ ফিটনেস ধরে রাখা যায়, তা ঠিক না। মেয়েদের দোখজের ভয় না দেখিয়ে, শরিয়ার চাবুক না মেরে, লোভ দেখিয়েও রাষ্ট্রের জন সংখ্যা ধরে রাখা যায়।

তবে সন্তানের জন্ম দিলেই ত হল না-তাদের মানুষ করার ব্যাপারও আছে। রক্ষনশীলদের ধারনা, শক্তিশালী পরিবার থেকেই ভবিষ্যতের শক্তিশালী নাগরিক বেড়োবে। কথাটা আংশিক সত্য। ভারত বা চীনের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এখান কার ছাত্রদের সাফল্যের মূল কারন, তাদের পরিবার ছেলে মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে অনেক বেশী যত্নবান। সেই তুলনায় পাশ্চাত্য সমাজ অনেক পিছিয়ে পড়েছে। আমেরিকার সেরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে এশিয়ানরা এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ।

কিন্তু এর সাথে ধর্মের সম্পর্ক কোথায়? চীনারা ত ধর্ম মানে না। ভারতের সেরা ছাত্ররা-[যারা বিজ্ঞান বা প্রযুক্তিতে নিজেদের ছাপ রেখেছে]-তারা হয় নাস্তিক বা নাস্তিক্য হিন্দুধর্মের অনুসারী। আমি অবশ্য ভারতীয় সফটোয়ার ইঞ্জিনিয়ারদের এই ক্যাটেগরীতে রাখছি না-এদের অধিকাংশই বৌদ্ধিক বিষয়গুলিতে নিরক্ষর। মোদ্দাকথা পারিবারিক রক্ষনশীলতাকে ধর্মের সাথে গোলানো উচিত না। ধর্মহীন মানেই রক্কনশীলতার বিরোধিতা-এই ধারনাকে আমি ভূল বলে মনে করি। নাস্তিক চীনারাও রক্ষনশীল-আমি নিজেও ব্যাক্তিগত জীবনে রক্ষনশীল। কারন মূল কারন অনেক-
(১) আমাদের দেহ-মনের সিস্টেমটা একটা মেশিন-যা বিবর্তনের ফলে এসেছে। এবং আমাদের বিবর্তন হয়েছে সমাজবদ্ধ ডিসিপ্লিন্ড জীব হিসাবেই। ফলে দেহ বা মনের সঠিক যত্ন না নিলে-বা ডিসিপ্লিনড জীবন, যেমন অত্যাধিক মদ্যপান না করা, ধূমপান বা নেশা না করা, যথেষ্ঠ নিদ্রা, ঠিক ঠাক আহার-শারীরিক কসরৎ -ইত্যাদি না করলে, আমরা শীঘ্রই অসুস্থ হয়ে পড়ব। এর সাথে সাথে অহঙ্কারহীন, ক্ষমাশীল জীবন পালন করলে, আমাদের রক্তচাপটাও ঠিক থাকে। এতে কেও ধর্মের গন্ধ পেলে মুশকিল। আবার কেও যদি মনে করে এর জন্যে ধর্মে ফিরে যেতে হবে সেটাও মুর্খামি। খুব স্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক যুক্রিতেই আসে আমাদের অহঙ্কারহীন থাকা উচিত। কারন, আমরা যে ‘আমি’ ‘আমি’ করছি-সেটা ত স্বতন্ত্র কিছু না। বাবা-মা-বন্ধু-শিক্ষক-পুস্তক-লেখক-সমাজ-পরিবেশ আমাদের যা শিখিয়েছে তার থেকে একটা ‘আমি’ তৈরী হয়েছে। তাছারা সেই ‘আমি’ বাঁচেই বা কদ্দিন? ১০০ বছর? ১৩ বিলিয়ান বছরের মহাবিশ্বের কাছে, তা কতটুকু সময়? পলকের ও কম।
(২) অনেক লিব্যারালদের ধারনা-অন্যের ক্ষতি না হলে বা অন্যের অধিকার ক্ষুন্ন না হলে, আমাদের সব কিছু করার স্বাধীনতা আছে। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারনা। কারন এখানে ভাবা হচ্ছে ব্যাক্তি আমির স্বতন্ত্র অস্তিত্ব আছে। অর্থাৎ আমি বা আপনি সমাজ থেকে পৃথক এক স্বতন্ত্র সামাজিক জীব। এটি সম্পূর্ণ বস্তুবাদ বিরোধি আদর্শবাদি ধারনা-কারন সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট খাওয়া থেকে রাতে শুতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত আমার প্রতিটি কাজের জন্যে সমাজ এবং রাষ্ট্রকে দরকার হয়। আমার খাদ্য, শিক্ষা, চাকরি, বাসস্থান-এই ইন্টারনেট-সব কিছুই সমাজ বা রাষ্ট্রের উৎপাদন থেকে এসেছে। আমি নিজেও এই উৎপাদন ব্যাবস্থার অংশ-তার বাইরে আমার অস্তিত্বই নেই। সুতরাং এই উৎপাদন ব্যাবস্থাকে ক্ষতি করে, এমন কিছু করার স্বাধীনতা আমার থাকতে পারে না। এই উৎপাদন ব্যাবস্থাকে ক্ষতি না করে, সব কিছুই আমরা করতে পারি।

এই প্রসঙ্গে যেসব দম্পত্তি ইচ্ছা করে চাইল্ডলেস বাই চয়েস থাকেন বা সন্তান নিচ্ছেন না-তাদের স্বাধীনতার বিশ্লেষনে আসা যেতে পারে। এর অধিকার কি থাকা উচিত? কারন তারা এই উৎপাদন ব্যাবস্থার শরিক হয়েও, নিজেদের কর্তব্য করছেন না। লিব্যারালদের মতে, এই স্বাধীনতা থাকা উচিত পূর্ণাঙ্গ। এখন ভারত বা বাংলাদেশে দম্পতিরা এমন করলে, তাদের ট্যাক্স মকুব করা উচিত-কারন তারা জনসংখ্যা কমিয়ে রাষ্ট্রের সেবা করছেন। অন্যদিকে ইউরোপে এমন করলে, তাদের ওপর প্রচুর ট্যাক্স চাপানো উচিত। কারন সেখানে জনসংখ্যা হ্রাস হচ্ছে। বাস্তবে সেটাই হচ্ছে-ইউরোপে সন্তান না থাকলে প্রচুর ট্যাক্স দিতে হয়-স্বাধীনতা থাকলেও, পেনল্টি দিতে হয়। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে এই স্বাধীনতার ব্যাপারটা ভীষন ভাবে পোষ্ট-মডার্ণ। ধার্মিকদের মতন কোরান বা বাইবেলের ম্যানুয়াল ধরে এ খর্ব করা যায় না-আবার স্থান কাল পাত্র না বিবেচনা করে-এই নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ভারতের মতন জন বহুল দেশে, মুসলিমদের জন্মহার খুবই বেশী-যে কারনে-তারা সন্তান ঠিক ঠাক মানুষ করতে পারেন না। এবং বর্তমানে ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যে শিক্ষার হার ভারতের আদিবাসিদের থেকেও খারাপ। আমেরিকান মুসলিমদের মধ্যেও এই ধরনের গোঁড়া মুসলিম আছে-তবে তারা ব্যাতিক্রম। সেই জন্যে আমেরিকাতে মুসলিমরা , সাদা আমারিকানদের থেকেও ভাল করছে। কিন্ত ইউরোপ বা ভারতে তারা নিদারুন ভাবে পিছিয়ে। একই ধর্মের লোকেরা দুই দেশে দুই ধরনের পার্ফমান্স দিচ্ছে-কারন, ধর্মের আসলেই কোন ভূমিকা নেই। মূল কথা হল দেশ-কাল-পরিস্থিতি বুঝে লোকেরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কি না। সেটাই আসল কথা।

অর্থাৎ এই রক্ষনশীলতার ব্যাপারটা আমরা আমাদের সমাজের রিপ্রোডাক্টিভ সিস্টেমের ফিটনেসের জন্য উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। সেটাকে ত্যাগ করা বা গ্রহন করাটা-সম্পূর্ণ ভাবেই পরিস্থিতি নির্ভর সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। সার্বজনীন সর্বকালীন ধর্ম বা উদারপন্থা-এর কোনটারই কোন বাস্তব অস্তিত্ব নেই। যেকারনে কোরান বা বাইবেল, বর্তমান মানুষের জীবনে অর্থহীন-ঠিক একই কারনে উদারনৈতিক চিন্তাধারা বা লিব্যারালিজমও অর্থহীন। কারন প্রতিটি পরিস্থিতি স্থান কাল পাত্র ভেদে আলাদা। তাদের জন্যে কোন সার্বজনীন, সর্বকালীন আইন বা গাইডেন্স থাকতে পারে না।

কিন্তু তাহলে রাষ্ট্রের আইন কি হবে? সেখানে ত এই পোষ্টমডার্ন দর্শন চলবে না। তাহলে আইনের বই এর সাইজ, বহুতল বাড়ির সাইজকে ছাড়িয়ে যাবে! সেখানে কিছু গাইডেন্স আনতেই হবে। অর্থাৎ কিছুটা এম্পিরিসিজম বা সমাজবিজ্ঞানের গবেষনাকে কাজে লাগিয়ে, রাষ্ট্রকে তার স্বার্থের জন্যে পজিশন নিতেই হবে। সামাজিক আইনগুলি থেকে ধর্মের বিসর্জন একান্ত ভাবেই দরকার। সেখানে বিজ্ঞানের গবেষনা আসুক। আমাদের উদ্দেশ্যত নাগরিক এবং রাষ্ট্রের মঙ্গল।সেখানে পাশ্চাত্যের আইন, শরিয়া আইন এসব না বলে, সমাজ বিজ্ঞানের গবেষনার ওপর ভিত্তি করে আইন আনা হৌক। আমেরিকাতে আস্তে আস্তে তাই হচ্ছে। গোটা বিশ্বের যেকোন উন্নত দেশেই তাই হচ্ছে আস্তে আস্তে। সেখানে আল্লার আইনের নামে এক অন্ধকারযুগকে আনার কোন মানে নেই। অথচ মুসলীম বিশ্বে এই ভাবেই পুরুষের হাতে নিগৃহীত হচ্ছে অসংখ্য নারী। বিয়ার খাওয়ার জন্য যদি কোন নারীকে বেত্রাঘাত মারা হয়-তাহলে মানতেই হবে, মেয়েদের জন্যে শরিয়া আইনের চেয়ে জঙ্গলে গিয়ে বাস করা ভাল। সেখানে স্বাধীনতাটুকুত আছে। ভারতে হিন্দু পুরুষের হাতেও একই ব্যাপার আগে হত-কিন্ত রাষ্ট্র যেহেতু নারী পক্ষে, গত দুই দশকে শহরের কিন্ত অনেক পরিবর্তন এসেছে। গ্রামে অবশ্য এসব প্রগতি অনেক দূর। মৌলবাদিরা পাশ্চাত্যের আইন, পাশ্চাত্যের নগ্ন নারী-নারীর যৌনতার স্বেচ্ছাচারিতা ইত্যাদি ধুয়ো তুলে, শরিয়া আইনকে টেকাতে চাই। কিন্ত বাস্তব সত্য হচ্ছে পাশ্চাত্যে আইন গুলি আস্তে আস্তে সমাজ বিজ্ঞান নির্ভর হচ্ছে। এটা ঠিকই নারী স্বাধীনতার সাথে সাথে নারীদের মা হওয়ার ইচ্ছা কমেছে। কিন্ত তাতে ধর্মের মতন অন্ধযুগকে ফেরাতে হবে কেন? রাশিয়ার মতন ইন্সেন্টিভ স্কীম চালু করলেই ত মিটে যায়। আবার এটাও দেখা গেছে, কিছু কিছু আমেরিকান পরিবার, নিজেদের স্বার্থের জন্যে ছেলে মেয়েদের যথেষ্ট যত্ন নিচ্ছেন না। ওবামার বাবা ওবামাকে ছেড়ে পালিয়েছিলেন। আমেরিকায় বাবা-মা ছেড়ে পালানো খুব সাধারন ব্যাপার। কিন্ত এই ব্যাপারে মিডিয়া খুব সরব এবং আইনও সেই সব বাবা মাদের কঠোর শাস্তি দিয়ে থাকে, যদি দোষী প্রমানিত হয়। এর জন্যে কি ধর্মের আইন লাগে? জীবনের একটা পরিস্কার উদ্দেশ্য থাকলেই এসব এমনিতেই আসে। ধর্মের আফিং খাইয়ে দিয়ে এইসব করানো অর্থহীন। তাতে সাইড এফেক্ট অনেক বেশী।

(৪)

যাইহোক এবার কিছু ব্যাক্তিগত সমস্যার কথায় আসি। আমাদের উপমহাদেশে নাস্তিক হিসাবে পরিবার পরিজনদের মধ্যে বেশ অসুবিধায় থাকি প্রায় সকলেই। কোন মাসিমা পুজোর প্রসাদ দিলে, আমি নাস্তিক, তাই প্রসাদ খাই না-এমন সাধারনত আমি বা কোন বোধ সম্পন্ন নাস্তিকই বলবে না-কারন আমরা তাকে আঘাত করতে চাই না। কোন ধার্মিক মুসলমান বন্ধু যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছে, তাদেরকেও নিশ্চয় বলা ঠিক না, আল্লা নেই, তুমি বোকামো করছ। হ্যা, সে যদি আল্লার সপক্ষে প্রমান দিতে চাই, আমি তাকে পরিস্কার ভাবেই গাধা বলব। কিন্ত সে যদি মানসিক শান্তির জন্যে বা তার নিত্য কাজের মধ্যে স্বস্তির জন্যে নামাজ পড়ে, তাকে যেচে গিয়ে গাধা নিশ্চয় আমরা কেওই বলি না। উচিত ও না। পূজোর ব্যাপারটাও তাই। তিথি নক্ষত্র মেনে অনেকে পুজো করেন-আমেরিকায় যে এতটা হিন্দু রয়েেন, সেই নিয়েও অনেকে গর্ব করেন। আমি হাঁসি। হ্যাঁ বা না বলি না। কি বলব? এসব অনর্থক তর্কে জড়ানো অর্থহীন। এত ধেড়ে বয়সে যাদের বুদ্ধি হয় নি, তার বুদ্ধি কোনদিন হবে বলে আমার মনে হয় না। সে যদি তার তিথি নক্ষত্র নিয়ে সুখে থাকে, থাকুক। সুখী থাকাটাই যখন জীবনের ধর্ম, তথন কেও বোকামো করে সুখে আছে না বুঝে সুখে আছে-তা দেখে কি হবে? শুধু তার সুখের কারনে অন্যের দুঃখ না হলেই হল।

তবে হ্যাঁ কেও যদি তার ধর্ম পৃথিবীর সেরা বলে গর্ব করে, আনন্দ পেয়ে থাকে, তাতেও আমার আপত্তি নেই। যতক্ষন সেই আনন্দ, ব্যাক্তিটি নিজের মনের মধ্যে রাখতে পারবেন। যখন সে নিজের ধর্ম সেরা-এইসব নিয়ে বলতে আসবে, তাকে পরিস্কার বলা উচিত, আপনার বিষ্টার গন্ধ শুঁকে আপনি সচ্চিদানন্দ হোন-সেই দুর্গন্ধ আর বেশী ছড়াবেন না, তাহলেই হল। আমার ধর্ম আপনার ধর্মের চেয়ে ভাল-এই ধরনের যুক্তিগুলোর ভিত্তি আমার বিষ্ঠা আপনার থেকে ভাল-এই স্তরের। এইসব অর্থহীন সময় নষ্ট না করে, ধর্ম বা বিজ্ঞান, বিষয় যাই হোক না কেন-তা কি করে আরো মানব কল্যানে লাগানো যায়, সেই নিয়েই চর্চা করা উচিত।

[255 বার পঠিত]