বর্তমান কোরান সংস্কারকদের মতে, কোরানের আক্ষরিক ব্যখ্যা করা উচিত না, কারন আরবীতে এমন অনেক শব্দ আছে যার সমরুপ অন্য ভাষায় নেই। তাই কোরান ব্যখ্যায় root meaning এ ফিরে যাওয়া উচিত। আরো একটা সমস্যা হচ্ছে কোরান অনুবাদকারী ব্যখ্যার সময় নিজস্ব ধারনাও যুক্ত করে দেয়। এছাড়া biblical stories, legends, কিছু বিষয়ের Jewish version এমনভাবে আমাদের মাঝে মিশে গেছে যে সত্য-মিথ্যার বিবেচনা না করেই কোরান ব্যখ্যায় সেগুলো ব্যবহার করা হয়। যার ফলে কোরান অনুবাদ ও ব্যখ্যা পড়তে গিয়ে দেখা গেছে যে এর অনুবাদ ও ব্যাখ্যায় এত বেশী pitfall তৈরী হয়েছে যে এর সঠিক সাধারন অর্থটাই বদলে গেছে। অন্যদিকে বেশিরভাগ ব্যখ্যাকারীই নিজে নিজে কোরান বোঝার চেষ্টা না করে তার পূর্ববতীকে অন্ধভাবে অনুসরন করে। অনুবাদের ক্ষেত্রে আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিজ্ঞান-বিষয়ে সম্যক ধারনা। আমরা যত বেশী এই জগতের প্রাকৃতিক নিয়ম-কানুন সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করব তত বেশী আমরা আল্লাহ কতৃক নবীদের কাছে প্রেরিত মানবজাতির জন্য পাঠানো সামাজিক নিয়ম-কানুনগুলো বুঝতে পারব। এই উভয় (প্রাকৃতিক ও সামাজিক) প্রকার নিয়ম-নীতি একটি উৎস থেকে এসেছে এবং এই নিয়মগুলো অপরিবর্তনীয়। তাই যতই আমরা প্রকৃতিকে আবিস্কার করব ততই আমরা কোরানের প্রকৃতি বিষয়ক আয়াতগুলো পরিস্কার ভাবে বুঝতে পারব।
“In time We will show them Our signs in the utmost Horizons and within themselves, so that it will become clear to them that this Qur’an is indeed the Truth.— (41:53)
তাই বর্তমান কোরান সংকারকরা শুধু কোরানকে অনুসরন করে এর অনুবাদ এবং ব্যাখ্যার চেষ্টা করছেন এবং তাঁদের এই অনুবাদকে সতঃসিদ্ধ না ভেবে আরো গবেষনার জন্য আহবান করেছেন।

কিন্তু আমদের প্রচলিত ধর্ম মত (orthodoxy) বিজ্ঞান বিষয়ক ব্যপারে উদাসীন ও জ্ঞান আহরনে অনিচ্ছুক। যার ফলে, বিজ্ঞান বিষয়ক জ্ঞানের অভাবে কোরান ব্যখ্যাকারীদের ব্যাখ্যায় না থাকে কোন বাস্তবতা, না থাকে কোন যুক্তি সম্মত অর্থ। উদাহরণ হিসেবে সৈয়দ আবুল আলা মওদুদীর কথা বলা যায়। তার ব্যখ্যা সম্বলিত বই “তাফহিমুল-কোরান” প্রচলিত ইসলামিক সমাজে সমাদৃত। তার এই বইয়ে জীবন সৃস্টির যা ব্যখ্যা দেয়া হয়েছে তার সাথে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার অনেক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। প্রাণ বির্তনের ধারা বিভিন্ন আয়াতে যেভাবে বলা হয়েছে, বিজ্ঞান বিষয়ক জ্ঞানের অভাবে এবং প্রচলিত কাহিনীর সমন্বয়ে সম্পূর্ণ অন্যভাবে ব্যখ্যা করা হয়েছে। মওদুদী রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং বিবর্তনের প্রায় সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা করেছেন। উদাহরণ সরুপ বলা যায় যে কোরান বলেছে মানুষ তৈরী হয়েছে extracts of clay; কিন্তু ব্যাখ্যাকারী ব্যাখ্যা করেছে “clay itself”. এই জ্ঞানী ব্যক্তিরা আজও বিশ্বাস করেন মানুষকে প্রথমে মাটি দ্বারা মডেল হিসেবে তৈরী করা হয়েছে।

32:7-8 আয়েতে বলা হয়েছেঃ
“It is He who has made every thing which He has created in an appropriate form and initiated the creation of man from the inorganic matter of the earth; and made his progeny from an extract of (what may seem to you) a despised fluid.”

কোরান যেখানে মানুষ সৃস্টির পূর্ববর্তী রাসায়বনিক বিবর্তনের অবস্হা ব্যাখ্যা করেছে যা পরবর্তীতে বিভিন্ন স্তরে গাছ-পালা, জীব-জন্তুদের মধ্যে sexual reproduction এর মাধ্যমে মানুষ পর্যায়ে এসেছে সেখানে মওদুদী Old Testament এর মানুষ সৃষ্টির ঘটনার সাথে মিলিয়ে এই আয়াতের তাফহিমুল-কোরানের (Volume-4, Page 40) ব্যাখ্যা করেছেঃ
“If at all it is accepted that the first life cell was directly created, then where is the hitch in accepting that the first individual of every living species of animals came in to being by direct creation by the Creator and from then onwards its progeny proceeded by mean of procreation.”

এই ধরনের সরাসরি জীবন সৃস্টির ব্যাখ্যা বিবর্তনবাদ, এমনকি sexual appearance এর স্তরকেও অস্বীকার করে। যার ফলে আমরা মুসলমানরা এখনো বিশ্বাস করি, আদম হচ্ছে প্রথম ব্যক্তি যাকে সরাসর মাটি থেকে সৃস্টি করা হয় এবং ঈভকে আদমের পাঁজরের হাড় থেকে সৃস্টি করা হয়েছে। কিন্তু এই আদম শব্দের অর্থ হচ্ছে মানব জাতি, কোন ব্যক্তি বিশেষ নয়।

“He created you from a single life cell and made from it its opposite sex.” (39:6)
“Then from (the reproductive unit) we created علقه ‘Alaqa’.—-” (23:14)

‘য়ালাকা’ শব্দটি প্রায় সব ব্যাখ্যাকারী অনুবাদ করেছে জমাটবদ্ধ রক্ত হিসেবে যদিও early embryonic stage এ রক্তের কোন উপস্হিতি নেই। এই ‘য়ালাকার’ root meaning হচ্ছে a hanging object attached to a fixed object situated higher up।

জীবন সৃষ্টির ব্যাখ্যা ছাড়াও কোরান ব্যাখ্যাকারীরা মহাজগত সৃষ্টির উৎস সম্বন্ধে এমন ব্যাখ্যা প্রদান করেছে যা অপব্যখ্যায় পরিনত হয়েছে। কোরানের কিছু কিছু জায়গায় noun ব্যবহার না করে adjective principles ব্যবহার করেছে মূলতঃ ‘fundamental forms of energy’ সম্বন্ধে বর্নণার জন্য, যা পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়া ব্য্যখ্যা করা বেশ কঠিন। কোরান কিন্তু ১৪০০ বছর আগে উল্লেখ করেছে যে মানুষ ততদিন পর্যন্ত এই পৃথিবী ও আকাশমন্ডলীকে বুঝতে পারবে না যতদিন না তাকে ক্ষমতা দেয়া হয় অর্থাৎ যতদিন মানুষ পর্যাপ্ত জ্ঞান আহরন না করবে ততদিন এই প্রাকৃতিক শক্তিগুলোকে চিন্তে পারবেনা। অথচ ‘তাফহিমুল-কোরান’ ব্যাখ্যা করেছে যে মানুষ কখনও আল্লাহর এই সুমহান জ্ঞান বুঝতে পারবেনা, কারন এটা মানুষের বোঝার বাইরে (which doesn’t make any sense)।

“Say: Is it that you deny Him who created the earth in “Two Eras’ (41:9)
“So He completed them as seven (or a number of) heavens in Two Eras—“(41:12)

কোরানে বলা আছে এই পৃথিবী এবং আকাশমন্ডলী সৃস্টি হয়েছে “Two Eras” তে।
সাধারনতঃ আরবী ‘Yaumayn ’শব্দটি অনুবাদ করা হয়েছে এখানে ‘দিন’ হিসেবে ; কিন্তু Yaumayn অর্থ হতে পারে Two days= Two stages =Two Eras = Two Aeons = Indefinitely long periods, a very long period of time; যা আমাদের গননায় হাজার বছর (32:5) অথবা কখনো পঞ্চাশ হাজার বছর (70:4) হতে পারে। বছরের হিসাব specific ভাবে উল্লেখ করা নেই। বৈজ্ঞানিক ভাষায় জীবন সৃস্টির পূর্ববর্তী material worldকে বলা হয় ‘Azoic’ কোরান এই ‘Azoic’ সময়টাকেই দূ-ভাগে ভাগ করেছে এবং বলছে Two Eras। এখানে Era শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে কারন Era শুরু হয় কোন বড় ঘটনার সূচনা দিয়ে। কিন্তু আমাদের কোরানে বিজ্ঞ আলেমগন যারা বিজ্ঞানের ব না জেনেই এই সব আয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন এবং আমাদের মত অন্ধ-বিশ্বাসীরা সেই ভাবেই যুগ যুগ পার করে যাচ্ছি। মওদুদী এই শব্দটিকে (Yaumayn) ৪৮ ঘন্টা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কোরান জীবন সৃস্টির সময়টাকে ভাগ করেছেন Four Eraতে। তাই বলা হয় বিবর্তন চলেছে Six Eraতে (32:4)। Biblical storyতে উল্লেখ আছে এই পৃথিবী ছয় দিনে তৈরী হয়েছে আরেকদিন আল্লাহ বিশ্রাম (Sabath) নিয়েছেন যার জন্য ইহুদীরা শনিবারে বিশ্রাম নেয়; আর ব্যাখ্যাকারীরাও ছয়দিনে পৃথিবী সৃস্টি হয়েছে ধারনাটা মেনে নিতে একটুও দেরি করেনি।

প্রচলিত কোরান ব্যাখ্যাকারীদের আরো একটা বিষয় প্রভাবিত করেছে, আর তা হলো ইহুদীদের বর্তমান ধর্মঅপুস্তকের কাহিনী। সেক্ষেত্রে উদাহরন হিসেবে ৩৮ নম্বর সূরার দাউদ (আঃ) এর ঘটনাটি উল্লেখ করতে পারি। এখানে ২১থেকে ২৪ আয়াতে একটি caseএর বর্ননা আছে যেখানে তৎকালীন সময়ের আর্থ-সামকজিক অব্যস্হার কথা উল্লেখ আছে এবং দাউদ (আঃ) কিভাবে সেখানে সুব্যবস্হা করেছিলেন অর্থাৎ তখনকার প্রচলিত ব্যবস্হা না মেনে নিয়ে আল্লাহ নির্দেশিত পথে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু ব্যাখ্যাকারীরা এই আয়াতগুলো ইহুদী গল্পের প্রভাবে ব্যাখ্যা করেন যে তিনি কোন এক আর্মি অফিসারের স্ত্রীকে ধর্ষন করেন এবং আরো পরিকল্পনা করেন সেই অফিসারকে খুন করে তার স্ত্রীকে বিয়ে করবেন। কিন্তু পরবর্তীতে তার ভুল বুঝতে পারেন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। এই মিথ্যে ঘটনা Samuel-II (Chapter 11-12) এ উল্লেখ আছে। এমন কি মওদুদীর ‘তাফহিমুল-কোরানে’ এর বর্ননা করেছেন এবং সাদরে ঘটনাটি গ্রহন করেছেন। অন্যানরা এই ঘটনার কিছু অংশ গ্রহন করেছেন এবং ঘটনা মিথ্যা বলে বাদ না দিয়ে তাকে দোষমুক্ত করার জন্য দীর্ঘ আলোচনার অবতারনা করেছেন। কোরানেতো এই ঘটনার উল্লেখ নেই। তবে কি কোরানের ব্যাখ্যা কোরানের বাইরে বর্ননাকৃত ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করা উচিত? কোরানের মতে, দাউদ (আঃ) একজন pious man ছিলেন যিনি সর্বদা আল্লাহর দেয়া divine laws মেনে চলতেন। কোরান একটি ঘটনার মাধ্যমে তার সময়ের রাজত্বকালে একটা অর্থনৈতিক অব্যবস্হার কথা বলেছেন যার জন্য তিনি অনুতপ্ত ছিলেন এবং সঠিক পথে তা বিচার করে আল্লাহর পথে (to put things right)অনুগামী হয়েছেন। কোরান ব্যাখ্যায় মওদুদীর কি এ বিষয়টি কি একবারও বিবেচনায় আনেন নি? এতেই বোঝা যায় মওদুদীর মত আলেমরা কোরান নিয়ে কি খেলাই না খেলেছেন।

বিঃদ্রঃ আমার এই লেখার মূল বক্তব্য, উদাহরণ Dr. Sayed Abdul Wadud এর Gateway to the Quran, এবং Tanveer Hussain এর Ad-Deen ও Al-Islam আর্টিকেল থেকে সংগৃহিত। আমি শুধু বাংলায় সংক্ষিপ্তকারে বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র।

[692 বার পঠিত]