ঈশ্বর কী আছে? ক্রেইগ-ফ্লু বিতর্ক

 

ফরিদ আহমেদ

 

ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে হইহল্লা এবং ঝগড়া ফ্যাসাদ আস্তিক এবং নাস্তিকেরা করে আসছেন সেই সুপ্রাচীনকাল থেকেই। আস্তিকেরা যেমন সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্বপক্ষে সাফাই গেয়ে গেছেন গদগদ ভক্তিভরে, ঠিক একইভাবে নাস্তিকেরাও দ্বিধাহীন চিত্তে তুড়ি দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন সেই সর্বশক্তিমানকে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ঈশ্বর যদি সত্যি যদি থেকে থাকেন, তবে একমাত্র তিনিই পারেন এই বিতর্কের উত্তপ্ত আগুনে জল ঢেলে দিতে। কিন্তু অসীম শক্তিমান ঈশ্বরের মনে হয় সেই আগ্রহটুকু বিন্দুমাত্রও নেই।

 

সুপ্রাচীনকালে মানুষের জন্যে কিছু রূপক গ্রন্থ টুপ করে মর্তধামে ফেলে দিয়ে তিনি যে কোথায় অদৃশ্য হয়েছেন কে জানে।  তন্ন তন্ন করে হারিকেন দিয়ে খুঁজেও তার টিকিরও দেখা পাওয়া যাচ্ছে না আর কোথাও। এতে অবশ্য বিশ্বাসীদের তেমন কোন সমস্যা নেই। তিনি থাকলেও তারা বিশ্বাস করবে যে তিনি আছেন, না থাকলেও তিনি আছেন বলেই বিশ্বাস করে যাবে তারা। যত সমস্যা ওই গোড়া নাস্তিকদের নিয়ে। জ্বলন্ত প্রমাণ ছাড়া আর কোন কিছুতেই বিশ্বাস নেই তাদের। তবে নাস্তিকদের ক্ষেত্রে একটা সুবিধা হচ্ছে যে, তারা আস্তিকদের মত ঈশ্বর না বিশ্বাসে অন্ধের মত আটকে নেই। ঈশ্বরে না বিশ্বাস মূলত ঈশ্বরের স্বপক্ষে প্রমাণের অভাবের কারণে হয়েছে। কাজেই, কোন এক শুভক্ষণে যদি ঈশ্বরের সুমতি হয় এবং তিনি ভাবেন যে, যাই একটু দেখা দিয়ে আসি নাস্তিক ব্যাটাদের। ওরা নাকি বড় গলায় বলে বেড়ায় আমি নেই। এখন দেখুক আমি আছি কি নেই। আমি সত্যি কি মিথ্যা। সেক্ষেত্রে আমার ধারনা, কোন নাস্তিক, তা সে যতই গোড়া নাস্তিক হোক না কেন, কোনরকম আর গাঁইগুই করবে না ঈশ্বর নেই বলে।  প্রমাণ প্রমাণ বলেইতো যত চেঁচামেচি তাদের। কাজেই ঈশ্বরকে চাক্ষুস দেখার পর নিশ্চয়ই আর কোন প্রমাণ বাকী থাকবে না তাদের কাছে।

 

তবে কথা হচ্ছে যে, সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের এই সামান্য সদিচ্ছা এবং সুমতির অভাবের কারণেই তার অস্তিত্ব বিষয়ক বিতর্ক এখনো কই মাছের মতো জিইয়ে আছে মানুষের মধ্যে। যত্রতত্র আস্তিক এবং নাস্তিকেরা অদৃশ্য ঈশ্বরকে নিয়ে গলা ফাটিয়ে তর্ক-বিতর্ক করে যাচ্ছে অহরহ। কিন্তু এই বিতর্ক খুব কম সময়ই সুনির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় সমান সুযোগ সুবিধা নিয়ে সমতল ভূমিতে হয়েছে। যে যার মত নিজের আঙ্গিনায় লম্ফঝম্প করে চলেছেন আস্তিক এবং নাস্তিকেরা। আস্তিকেরা তাদের বিপুল সংখ্যাধিক্য এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আনুকূল্য পেয়ে ইতিহাসের প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই নাস্তিকদেরকে বেশ একহাত নিয়ে ছেড়েছে। অন্যদিকে, সংখ্যায় কম হলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিজ্ঞান এবং যুক্তিবিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে নাস্তিকেরাও কম ঘোল খাওয়ায়নি আস্তিকদের, কম নাজেহাল করেনি বেচারাদের।

 

সুনির্দিষ্ট কাঠামোর উপর ভিত্তি করে কোন বিতর্কই যে েকেবারেই হয়নি তা অবশ্য নয়। এরকমই এক বিতর্কের আয়োজন করেছিল বিবিসি ১৯৪৮ সালে, ফাদার ফ্রেডারিক কপলস্টোন এবং দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের মধ্যে। রাসেল-কপলস্টোন বিতর্ক নামে তা বিখ্যাত। এই বিতর্কের পঁঞ্চাশ বছর পুর্তি উপলক্ষে ১৯৯৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে কি নেই সেই বিষয়ে এক একাডেমিক বিতর্কের আয়োজন করে ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন। বিতর্কে অংশ নিতে সম্মতি জানান ট্যালবট স্কুল অব থিওলজীর রিসার্চ প্রফেসর উইলিয়াম লেইন ক্রেইগ (William Lane Craig) এবং ইউনিভার্সিটি অব রেডিং এর দর্শনের এমেরিটাস প্রফেসর এন্টনি ফ্লু (Antony Flew)। ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিনের প্রায় প্রায় চার হাজার ছাত্র এবং শিক্ষক এই বিতর্ক উপভোগ করে। এই বিতর্কের মডারেটর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন প্রফেসর কীথ ইয়ানডেল (Keith Yandell)।

 

চার ধাপের সহজ সরল ফর্ম্যাটে বিতর্কটি অনুষ্ঠিত হয়। দুই বিতার্কিকের জন্য  বিশ মিনিট করে বরাদ্দ করা হয় সূচনা বক্তব্যের জন্য। পরবর্তীতে বারো মিনিট করে বরাদ্দ করা হয় সূচনা বক্তব্যের উপর মন্তব্য করার জন্য। এর পর আট মিনিট করে দেয়া হয় সেই বক্তব্যকে খণ্ডন করার জন্য এবং পাঁচ মিনিট করে দেয়া হয় তাদের বক্তব্য সমাপ্ত করার জন্য। সব শেষে আধাঘন্টা সময় আলাদা করে রাখা হয় প্রশ্নোত্তর পর্বের জন্য।

 

আমার ভয়াবহ অপছন্দের কাজের মধ্যে অনুবাদ অন্যতম। পারতপক্ষে কোন ধরনের অনুবাদ করার কোন ইচ্ছাই কখনো আমার হয়নি। বড্ড গ্যাড়াকলের কাজ এই অনুবাদ। অনেক হ্যাপা এর। আমার মত আলসে মানুষের জন্যে সে হ্যাপা আরো বেশি। ন্যাড়া নাকি একবারই বেলতলায় যায়। কথাটা যে সত্যি না তা নিজেকে দিয়ে বুঝতে পারছি। একবার অভির পাল্লায় পড়ে বেলতলায় গিয়েছিলাম। মাইকেল শারমারের একটি প্রবন্ধ অনুবাদ করেছিলাম। সে যে কি দুঃসহ যাতনা, সে আমি জানি। তারপরই পণ করেছিলাম যে এই রাস্তায় আর নয়। কিন্তু সেই পণ ভেঙে আবারো বেলতলার রাস্তায় হাঁটা ধরেছি আমি। আগেরবার না হয় অভিকে গালমন্দ করে মনের ঝাল মেটানো গিয়েছিল। এবার আর সে সুযোগও নেই। স্ব-ইচ্ছায় কর্ম যে।

 

অনুবাদের ক্ষেত্রে আমি মুক্ত পথ বেছে নেবার চেষ্টা করেছি। বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে বিতর্কটি মিহি, কোমল এবং মসৃনভাবে উপস্থাপনার জন্য যতখানি স্বাধীনতা নেবার প্রয়োজন বলে মনে করেছি ততখানিই নিয়েছি আমি। তারপরও লেখাটি কোথাও নিরস বা কাঠখোট্টা মনে হলে নির্দ্বিধায় আপনারা আপনাদের মন্তব্য জানাতে পারেন। আপনাদের সুচিন্তিত পরামর্শ পেলে আমার পক্ষে  অনুবাদ কর্মটিকে গতিশীল, পেলব, সহজবোধ্য এবং আকর্ষনীয় করা সহজতর হবে।

 

 

পর্ব – ১

 

প্রফেসর ক্রেইগের সূচনা বক্তব্য

 

শুভ সন্ধ্যা! অনুষ্ঠানের শুরুতেই আমি আয়োজকদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কপলস্টন রাসেলের (Copleston–Russel) বিখ্যাত বিতর্কের ঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করার সুযোগ করে দেবার জন্যে। ডক্টর ফ্লুর সাথে আজ রাতে একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিতর্ক করতে পারাটা আমার জন্য বিশেষ সম্মানকর

 

প্রফেসর উইলিয়াম লেন ক্রেইগ

 

ঈশ্বর কি আছে না নেই তা যৌক্তিকভাবে সিদ্ধান্তে আসতে গেলে আমাদেরকে যুক্তিবিদ্যার মৌলিক নিয়মানুযায়ী অনুসন্ধান করা দরকার এবং নিজেদেরকে দুটো মৌল প্রশ্ন করা প্রয়োজন (১) ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকার ব্যাপারে যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ আছে কি? এবং (২) ঈশ্বর না থাকার ব্যাপারে শক্তিশালী কোন যুক্তি আছে কিনা?

 

দ্বিতীয় প্রশ্নটা আমি ডক্টর ফ্লুর উপরই ছেড়ে দেব। কেন তিনি মনে করেন যে ঈশ্বর নেই, সেই কারণসমূহ উপস্থাপনা করার জন্য। কিন্তু একটা জিনিষ খেয়াল করে দেখবেন, যদিও নাস্তিক দার্শনিকেরা শত শত বছর ধরে ঈশ্বরের অনস্তিত্ব প্রমাণের জন্য চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। কিন্তু কেউই এখন পর্যন্ত ফলপ্রসু কোন যুক্তি নিয়ে এগিয়ে আসতে পারেন নাই। কাজেই হাওয়ায় তলোয়ার না ঘুরিয়ে আমি বরং দেখি ঈশ্বর নেই তার স্বপক্ষে কি কি যুক্তি আছে? এই প্রশ্নের উত্তরে ডক্টর ফ্লু কী বলেন।

 

আসুন, তাহলে আমাদের প্রথম প্রশ্ন ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্বপক্ষে কি কি যুক্তি আছে? সেটা নিয়ে আলোকপাত করি। আস্তিকতা কেন নাস্তিকতার চেয়ে যুক্তিসঙ্গত সে বিষয়ে পাঁচটি যুক্তি বা কারণকে আজকে আমি উপস্থাপনা করবো। এর একেকটিকে নিয়েই গোটা গোটা বই লেখা হয়েছে। কাজেই আমি এখানে সেগুলোকে সংক্ষেপে আলোচনা করবো এবং সেগুলোর বিষয়ে ডক্টর ফ্লুর মতামত পাবার পর বিস্তারিত আলোচনায় যাবো হয়তো। এই যুক্তিগুলো একে অন্যের থেকে স্বাধীন এবং আলাদা। কিন্তু যখন সবগুলোকে একসাথে সমন্বিত করা হয় তখন তারা সমষ্টিগতভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্বপক্ষে শক্তিশালী কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

 

. মহাবিশ্বের সূত্রপাত

 

কখনো কি ভেবে দেখেছেন যে, এই মহাবিশ্ব কোথা থেকে এসেছে? নিঃসীম শূন্যতার বদলে কেন সব কিছু বিদ্যমান? নাস্তিকেরা সাধারণত বলে থাকেন যে, মহাবিশ্ব অনন্তকাল ধরে আছে এবং কোন রকম কারণ ছাড়াই তৈরি হয়েছে। রাসেল যেমন কপলস্টনকে বলেছিলেন, মহাবিশ্ব সবসময়ই বিদ্যমান ছিল, এর বাইরে আর কোন কথা নেই, ব্যাস। কিন্তু এটাই কী আসল বাস্তবতা? মহাবিশ্বের যদি কোন সূচনা না থেকে থাকে তাহলে বলতে হবে যে মহাবিশ্বের অতীত ইতিহাসের ঘটনাসমূহর পরিমাণও অসীম। কিন্তু গণিতবিদরা দেখিয়েছেন যে, সত্যি সত্যি অসীমের উপস্থিতি আমাদেরকে স্ববিরোধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।। উদাহরণস্বরূপ, অসীম থেকে অসীমকে বিয়োগ করলে কি থাকে? গাণিতিকভাবে আপনি পরস্পরবিরোধী উত্তর পাবেন। এর অর্থ হচ্ছে অসীম কোন বাস্তবতা নয় বরং এটা মূলত আমাদের মস্তিষ্কের একটি ধারণা মাত্র। এই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট বলেন যে, বাস্তবে কোথাও অসীমকে খুঁজে পাওয়া যায় না। এটা প্রকৃতিতেও নেই, আবার যুক্তিসঙ্গত চিন্তার বৈধ ভিত্তিও জোগান দেয় না……… অসীমের জন্য যে ভূমিকাটি পড়ে থাকে তা হচ্ছে একমাত্র ধারণা। কিন্তু এর অর্থ দাড়াচ্ছে যে, যেহেতু অতীত ঘটনাসমূহ ধারণা নয় বরং বাস্তব, কাজে অতীতের ঘটনাসমূহ অবশ্যই সসীম হতে বাধ্য। ফলে, অতীতের ঘটনাসমূহ অতীতের দিকে অনন্তকাল পর্যন্ত যেতে পারে না। বরং, বিশ্বজগত কোথাও না কোথাও থেকে শুরু হয়েছে।

 

এই উপসংহার এস্ট্রোনমি এবং এস্ট্রোফিজিক্সের অসাধারণ সব আবিস্কার দিয়ে সমর্থিত হয়েছে। এস্ট্রোফিজিক্যাল প্রমাণসমূহ ধারণা দেয় যে এই বিশ্বজগত ১৫ বিলিওন বছর আগের মহা বিস্ফোরণ বিগ ব্যাং থেকে সূত্রপাত হয়েছে। সময় এবং স্থানসহ বিশ্বজগতের সকল পদার্থ এবং শক্তিও তৈরি হয়েছে ওই ঘটনা থেকেই। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, জোতির্বিজ্ঞানী ফ্রেড হোয়েল যেমন বলেছেন, বিং ব্যাং তত্ত্ব এই মহাবিশ্ব শূন্য থেকে তৈরি হয়েছে সেই ধারণাকে সমর্থন করে। এর কারণ হচ্ছে যে, আপনি যখন সময়ের বিপরীতে যেতে থাকেন একটা পর্যায়ে যেয়ে হোয়েলের ভাষ্য অনুযায়ী বিশ্বজগত সংকুচিত হতে হতে শূন্যতে পরিণত হয়ে যায়। অর্থাৎ বিগ ব্যাং মডেল অনুযায়ী বিশ্বজগত কোন এক সময়ে সৃষ্টি হয়েছিল এবং তা তৈরি হয়েছিল শূন্য থেকে।

 

এই বিষয়টা নাস্তিকদের জন্য খুবই বিব্রতকর। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির এন্থনি কেনি (Anthony Kenny) আবেদন জানিয়েছেন এই বলে যে, বিং ব্যাং এর সমর্থক কেউ যদি নাস্তিকও হয়, তাহলেও তাকে বিশ্বাস করতে হবে যে বিশ্বজগত শূন্য থেকেই এবং শূন্যের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই বক্তব্য কোন অর্থ বহন করে না। শূন্য থেকে কোন কিছু তৈরি হতে পারে না। শূন্যের বদলে বিশ্বজগত কেন উপস্থিত হয়েছে? কোথা থেকে এসেছে এই বিশ্বজগত? নিশ্চয়ই এমন কোন কারণ রয়েছে যার ফলে বিশ্বজগত তৈরি হয়েছে?

 

আমরা আমাদের যুক্তিকে সারসংক্ষেপ করতে পারি এভাবেঃ

 

1. যা কিছু তৈরি হয়েছে তার পিছনে কারণ রয়েছে

2. বিশ্বজগত তৈরি হয়েছে

3. কাজেই বিশ্বজগতের পিছনেও কারণ রয়েছে

 

স্বাভাবিক ব্যবস্থা অনুযায়ীই স্থান এবং কালের কারণ অবশ্যই কারণহীন, সময়হীন, পরিবর্তনহীন এবং অকল্পনীয় শক্তি যা এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছে তার । অধিকন্তু, আমি বলবো যে, এটা ব্যক্তিগতও হতে বাধ্য। তা না হলে কিভাবে একটা সময়হীন কারণ (timeless cause) বিশ্বজগতের মত একটা সাময়িক প্রতিঘাত (temporal effect) সৃষ্টি করতে পারে? এই কারণ যদি প্রয়োজনীয় এবং পর্যাপ্ত অবস্থার নৈর্ব্যক্তিক সমষ্টি হতো, তবে প্রভাব ছাড়া কারণ কখনোই থাকতে পারতো না। কারণ যদি সময়হীনভাবে থেকে থাকে তবে প্রভাবও থাকবে সময়হীনভাবেই। মাত্র একটাই কারণে কারণ হতে পারে সময়হীন এবং প্রভাব শুরু হতে পারে সময় দিয়ে। আর তা হচ্ছে যদি কোন ব্যক্তিগত প্রতিভূ কোন পূর্ব শর্ত ছাড়াই মুক্তভাবে সময়যুক্ত প্রভাব তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। কাজেই এইখানে আমরা শুধু বিশ্বজগতের যৌক্তিক কারণই খুঁজে পাচ্ছি না, সেই সাথে একজন ব্যক্তিগত সৃষ্টিকর্তারও অস্তিত্ব টের পাচ্ছি।

 

খুব অবাক ব্যাপার না যে, বিং ব্যাং এর তত্ত্ব খ্রীস্টান আস্তিকেরা সবসময় যা বিশ্বাস করে এসেছে আদিতে ঈশ্বর স্বর্গ এবং পৃথিবী তৈরি করেছেন তাকেই সমর্থন দিচ্ছে? আমি আপনাদের জিজ্ঞেস করতে চাই, কোনটা বেশি যুক্তিসঙ্গত- আস্তিকেরা সঠিক নাকি নাস্তিকদের ভাষ্য অনুযায়ী মহাবিশ্ব কোন কারণ ছাড়াই শূন্য থেকে টুপ করে তৈরি হয়ে গিয়েছে? আমার অবশ্য বিকল্পগুলোকে মূল্যায়ন করতে তেমন কোন আপত্তি নেই।

 

. বিশ্বজগতের জটিল বিন্যাস

 

গত তিরিশ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে, বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্ব যে সূক্ষ্ণ এবং জটিল বিন্যাসের  উপর নির্ভর করে তা বিগ ব্যাং নিজেই জোগান দিয়েছে। আমরা এখন জানি যে প্রাণ-অবান্ধব বিশ্বজগতের সৃষ্টির সম্ভাবনা আমাদের মত প্রাণ-বান্ধব বিশ্বজগতের তুলনায় বেশিই ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে যে সেটা কতখানি বেশি ছিল? এর উত্তর হচ্ছে বিশ্বজগত প্রাণ-বান্ধব হওয়ার সম্ভাবনা এতই ক্ষুদ্রাদপিক্ষুদ্র যে তা অচিন্তনীয় এবং  অপরিমেয়। উদাহরণস্বরূপ, স্টিফেন হকিং (Stephen Hawking) হিসাব করে দেখেছেন যে, বিগ ব্যাং এর এক সেকেণ্ড পর মহাবিশ্বের বিস্তৃতির হার যদি কয়েক হাজার মিলিওন মিলিওনের চেয়ে ছোট হত তাহলে মহাবিশ্ব জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড হয়ে ধ্বংস হয়ে যেত। পল ডেভিসের (Paul Davies) হিসাব অনুযায়ী, নক্ষত্র বিন্যাসের জন্য উপযোগী ( নক্ষত্র ছাড়া গ্রহ থাকতে পারে না) প্রাথমিক পরিবেশ থাকার সম্ভাবনা হচ্ছে হাজার বিলিওন বিলিওন ভাগের একভাগ। ডেভিস আরো বলেছেন যে, মহাকর্ষের ১০১০০ ভাগের একভাগ পরিবর্তন হলেই তা প্রাণ-বান্ধব মহাবিশ্বের জন্য বিপুল বাঁধা হয়ে দাঁড়াতো। মহাবিশ্বকে প্রাণ-বান্ধব হওয়ার জন্য বিগ ব্যাং এ প্রায় পঞ্চাশটার মত চলক (quantities) এবং ধ্রুবককে (constants) সূক্ষ্ণ-সমন্বিত (fine-tuned) হতে হয়েছে। শুধুমাত্র চলকগুলোকেই যে, সূক্ষ্ণ-সমন্বিত হতে হয়েছে তাই নয়। তাদের অনুপাতগুলোকেও সেই সাথে দারুণভাবে সূক্ষ্ণ-সমন্বিত হতে হয়েছে। কাজেই অসম্ভাব্যতা ক্রমবর্ধিত হয়ে পরিণত হচ্ছে এরূপ কোন অসম্ভাব্যতায় যতক্ষণ না আমাদের মনন কোন অচিন্তনীয় সংখ্যার মুখোমুখি হচ্ছে।

 

এই চলক এবং ধ্রুবকগুলোর যে মান, কেন সেগুলো সেই মান পেল সেই সম্পর্কে কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।  অজ্ঞেয়বাদী পদার্থবিজ্ঞানী পল ডেভিস একবার মন্তব্য করেছিলেন যে, আমার বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আমি ক্রমাগত এই দৃঢ় বিশ্বাসে উপনীত হচ্ছি যে,  মহাবিশ্ব এমন বিস্ময়কর বিচক্ষণতার সাথে তৈরি হয়েছে যে একে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক বাস্তবতা হিসাবে মেনে নেওয়া কঠিন। একইভাবে, ফ্রেড হোয়েল বলেছেন যে, তথ্যসমূহের সাধারণ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ধারণা দেয় যে, কোন এক অতি-প্রাকৃতিক বুদ্ধিমত্তা পদার্থবিজ্ঞানকে নিয়ে খেলা করেছে। নাসার গডার্ড ইন্সটিটিউট ফর স্পেস স্টাডিজের প্রধান রবার্ট জাস্ট্রো (Robert Jastrow) একে বিজ্ঞান থেকে আগত ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্বপক্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

কাজেই, আবারো দেখা যাচ্ছে যে, খ্রীস্টান আস্তিকেরা সবসময় যে দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে আসছেন যে – এই বিশ্বজগতের একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন – তা নাস্তিকদের দৃষ্টিভঙ্গি, এই মহাবিশ্ব কোন কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে  শূন্য থেকে উদ্ভব হয়েছে এবং এমনভাবে সূক্ষ্ণ সমন্বিত হয়েছে যে এখানে বুদ্ধিমাণ প্রাণের উদ্ভব ঘটেছে- তার তুলনায় অধিকতর অর্থবহ।

 

আমরা আমাদের যুক্তিকে নিচের মত করে সারসংক্ষেপ করতে পারিঃ

 

1. মহাবিশ্বের প্রাথমিক অবস্থার সুক্ষ্ণ সমন্বয় প্রাকৃতিক নিয়ম, দৈবতা বা পরিকল্পনার মাধ্যমে হয়েছে

2. সেটা প্রাকৃতিক নিয়ম বা দৈবতার কারণে হয়নি

3. কাজেই তা হয়েছে পরিকল্পনার মাধ্যমে।

 

 

 

চলবে……

 

 

মুক্তমনার মডারেটর, মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে গ্রন্থের লেখক

 

 

 

[2213 বার পঠিত]