মারিয়ার গল্প :

 

 

১৯৮৮ সালের অলিম্পকের আয়োজনে যোগদানের প্রস্তুতি চলছে।  মারিয়া প্যাতিনো নামের স্পেনের শীর্ষস্থানীয় মহিলা হার্ডলার অলিম্পিকে যোগদানের শেষ প্রস্তুতিটুকু সেরে নিচ্ছেন।  মেয়েদের ইভেন্টগুলোতে যোগদানের নিয়ম হিসেবে তাকে একটি ছোট্ট পরীক্ষা সেরে ফেলতে হবে। সেই পরীক্ষায় দেখা হবে মারিয়া সত্য সত্যই মেয়ে কিনা।

 

সেটা নিয়ে অবশ্য মারিয়ার চিন্তা নেই। তিনি যে মেয়ে তা জন্মের পর থেকেই তিনি জানেন। যে কেউ তাকে দেখলেই মেয়ে বলেই মনে করবে। দেহকাঠামো, কাঁধের আকার, কটিদেশ নিতম্ব সব কিছুই বলে দেয় তিনি নারী।  আগে নারী এথলিটদের গায়নোকলজিস্টদের প্যানেলের সামনে দিয়ে নগ্ন হয়ে হেটে যেতে হত। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। এই অপমানজনক ব্যাপার স্যাপারের মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয় না। গালের পাশ থেকে সামান্য চামড়া নিয়ে জেনেটিক টেস্ট করে কিছুক্ষণের মধ্যেই ফলাফল জানিয়ে দেয়া যায়।

 

মারিয়া নির্বিঘ্ন চিত্তেই স্যাম্পল দিয়ে এলেন। কিন্তু ঘন্টাখানেক পরেই ডাক্তারের অফিস থেকে ফোন এল। কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে। মারিয়াকে আবারো পরীক্ষা দিতে হবে।  মারিয়া আবারো গেলেন। আবারো টেস্ট হল। এবারে আরেকটু ডিটেল পরীক্ষা। ডাক্তারদের মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই ঝামেলাটি কি ছিলো।

 

মারিয়া যখন পরদিন অলিম্পিকের ট্র্যাকে প্রথমবার দৌড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক তখনই খবরটি ফাঁস করা হল।  মারিয়া সেক্স টেস্ট-এ ফেল করেছেন। তিনি মেয়ের মত দেখতে হলেও ক্রোমোজমের গঠন অনুযায়ী তিনি পুরুষ।  তার দেহকোষে Yক্রোমজোমের অস্তিত্ব রয়েছে। তার দেহের ভিতরে সুপ্ত অবস্থায় পুরুষাঙ্গের উপস্থিতি আছে।  উপরন্তু,  তার কোন ডিম্বাশয় এবং জরায়ু নেই। ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিক কমিটির (IOC) সংজ্ঞা অনুযায়ী তিনি নারী নন।  কাজেই তাকে অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করতে দেয়া হবে না।

 

হতাশ মারিয়া স্পেনে ফিরে এলেন।  স্পেনে আসার পর তার জীবনে আক্ষরিক অর্থেই কেয়ামত নেমে এলো। স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ মারিয়ার আগের সমস্ত টাইটেল এবং পদক কেড়ে নিলো এবং পরবর্তী সকল প্রতিযোগিতায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করলো।  তার বয়ফ্রেন্ড তাকে ছেড়ে চলে গেলো। তার স্কলারশিপ  বাতিল করা হল এবং হঠাৎ করেই  মারিয়া নিজেকে দেখতে পেলেন অন্ধকারের এক অথৈ সমুদ্রে।  পরে মারিয়া সেই দুর্বিষহ অবস্থার কথা বর্ণনা করে বলেছিলেন এভাবে – আমাকে মানচিত্র থেকে স্রেফ মুছে ফেলা হল এমন একটা ভাব যেন আমি  কখনো ছিলামই না। অথচ আমি বারো বছর ধরে খেলাধূলার সাথে জড়িত ছিলাম, আর এই ছিলো তার প্রতিদান[১]

 

এর পরের ঘটনা আরো নাটকীয়।  মারিয়া তার গাঁটের হাজার হাজার ডলার খরচ করে ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হলেন। বহু ডাক্তারের সাথে তার মোলাকাৎ হল। ডাক্তারেরা অবশেষে তার এই অদ্ভুতুরে রোগের কারণ খুঁজে পেলেন।  তাকে জানানো হল,  মেডিকেলের পরিভাষায় এই অবস্থাটিকে বলা হয় – Androgen Insensitivity । যদিও মারিয়া অন্য সব স্বাভাবিক ছেলেদের মত Yক্রোমজোম নিয়েই জন্মেছিলেন, এবং অন্য সব পুরুষের মত  তার অন্ডকোষ থেকেও প্রচুর পরিমান পুরুষ হরমোন টেস্টোসটেরোন (এন্ড্রোজেন হরমোনের একটি স্টেরয়েড শ্রেনী) নিঃসৃত হয়েছিল, কিন্তু তার কোষগুলো শিশু বয়সে সেই নিঃসৃত হরমোনকে সনাক্ত করতে পারেনি। বিজ্ঞানীরা বলেন পৃথিবীতে বিশ হাজার পুরুষ শিশুর মধ্যে অন্ততঃ একজন এরকম এড্রোজেন গ্রাহক-জনিত সমস্যা নিয়ে পৃথিবীতে জন্মায়[২], যাদের কোষ এই নিঃসৃত এন্ড্রোজেন সনাক্ত করতে পারে না।  মারিয়ারও তাই হয়েছিলো। এর ফলে মারিয়ার দেহে পুরুষসুলভ বৈশিষ্টগুলো অনুপস্থিত ছিলো প্রথম থেকেই, যদিও তার ক্রোমোজমের গঠন ছিলো পুরুষেরই।  তারপর বয়ঃসন্ধিকালে এন্ড্রোজেন নিঃসৃত হলেও তার দেহে এন্ড্রোজেনের প্রতি কোন সংবেদনশীলতা না  থাকায় তার স্তন বৃদ্ধি পেল, কটিদেশ কমে আসলো, আর নিতম্ব ভারী হয়ে উঠলো, চারপাশের অন্যান্য নারীদের মতই। কাজেই মারিয়া দেখতে শুনতে এবং মন মানসিকতায়ও নারীই হয়ে উঠেছিলেন, তার ক্রোমজমে যাই থাকুক না কেন। নারীত্বের দাবী নিয়ে তার নিজের মনেও কখনোই সন্দেহের সৃষ্টি হয়নি।

 

মারিয়া আইওসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। কারণ, তিনি জানেন তিনি নারী, তিনি বড়ও হয়েছেন নিজেকে নারী হিসবেই দেখে।  হঠাৎ করে কেউ এসে বললো তিনি পুরুষ, আর হলো নাকি! তিনি স্ট্যনফোর্ড ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানী এলিসন কার্লসনের সাথে মিলে  তার নিজস্ব যুদ্ধ চালিয়ে যেতে  থাকলেন।  বিজ্ঞানীরা আজ জানেন নারী কিংবা পুরুষ হবার ব্যাপারটা শুধু ক্রোমোজমের গঠনের উপরই নির্ভরশীল নয়, তার চেয়ে বেশী নির্ভর করে হরমোনের উপর [৩]। অথচ অলিম্পিক কমিটির পরীক্ষায় হরমোন সংক্রান্ত ব্যাপার স্যাপারই নেই।  মারিয়া দাবী করলেন, তার পেলভিক কাঠামো এবং কাঁধের কাঠামোর গঠন এবং অন্যান্য দেহজ বৈশিষ্টগুলো দেখে যেন সিদ্ধান্ত নেয়া হয় নারীদের ইভেন্টগুলোতে প্রতিযোগিতা করা জন্য তার মধ্যে যথেষ্ট পরিমানে  নারীত্ব আছে কিনা! প্রায় আড়াই বছর ধরে যুদ্ধ চালানোর পর ইন্টারন্যাশনাল অ্যামেচার এথলেটিক ফেডারেশন [৪] (IAAF) মারিয়াকে পুর্বেকার পদে পুনর্বহাল করলো এবং ১৯৯২ সালে  মারিয়া আবার স্প্যানিশ অলিম্পিক দলে যোগদান করতে পারলেন।   ইতিহাসে এই প্রথম বারের মত কোন নারী আইওসির সেক্স টেস্ট সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে নিজের পরিচিতি নিয়েই  অলিম্পিক দলে যোগদানের যোগ্যতা অর্জন করলেন।  তবে আইএএফ মারিয়ার ব্যাপারে উদারতা   দেখালেও আইওসি এখনও সেই সনাতন  Y ক্রোমোজম দেখে সেক্স টেস্ট-এর রীতিতে বিশ্বাসী।

 

মারিয়ার মত ঘটনাগুলো আমাদের সামাজিক ক্ষেত্রে তৈরী করেছে যেমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতির, তেমনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে সেক্স নিয়ে আমাদের সনাতন ধ্যান ধারণাগুলোকে। এ ধরণের বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে আমরা অবশেষে বুঝতে ছিখেছি যে, শুধু বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দেখে এমনকি ক্রোমজোমের গঠন দিয়ে নারী-পুরুষকে সংজ্ঞায়িত করার দিন আর নেই। মানুষের লৈঙ্গিক পরিচিতি তুলে ধরতে হলে বাহ্যিক প্রকৃতির পাশাপাশি গণ্য করতে হবে মানুষের সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকেও।  আর এ জন্যই সেক্স জিনিসটার পাশাপাশি জেন্ডারের ধারণা থাকা, এবং জেন্ডার-সচেতনতা থাকা  এই একবিংশ শতাব্দীতে খুবই প্রয়োজনীয়।

 

সেক্স এবং জেন্ডার যে সমার্থক নয়, তা আমি আমার অগের একটি লেখায় ব্যাখ্যা করেছিলাম। বাংলা ভাষায় শব্দদুটির আলাদা কোন অর্থ নেই, এদের সঠিক প্রতিশব্দও আমাদের ভাষায় অনুপস্থিত। দুটোকেই আমরা লিংগ বলে অভিহিত করি। আসলে সঠিকভাবে বলতে গেলে – সেক্স একটি শরীরবৃত্তিয় ধারণা। আর জেন্ডার মুলতঃ সমাজ-মনস্তাত্বিক অবস্থা। এই প্রসঙ্গে ‘এনসাইক্লোপিডিয়া অব সাইকোলজিতে’ বলা হয়েছে –

 

 Sex refers to the physiological, hormonal and genetic makeup (XX or XY chromosome) of an individual; Gender is a cultural category that contains roles, behaviors, rights, responsibilities, privileges and personality traits assigned by that specific culture to men and women.

 

হেনরি বেঞ্জামিন তার ‘ট্রান্সেক্সুয়াল ফেনোমেনন’ প্রবন্ধে প্রায়শই বলেছেন : Gender is located above, and sex is bellow the belt. অর্থাৎ সোজা কথায়, সেক্স সমগ্র বিষয়টিকে ‘দেহ কাঠামো’ নামক ছোট্ট চৌহদ্দির মধ্যে আটকে ফেলতে চায়, যেখানে জেন্ডার বিষয়টিকে নিয়ে যেতে চায় অবারিত নীলিমায়। যা হোক – এত কচকচানির মধ্যে না গিয়ে আমরা আরেকটি উদাহরণ দেখি –

 

 

 

 

 

লেভি সুয়েদাম

 

 ১৮৪৩ সাল।  সেলসবুরির অধিবাসী  ২৩ বছরের লেভি সুয়েদাম নগর নির্বাচকদের কাছে স্থানীয় নির্বাচনে হুইগের[৫] প্রার্থী হিসেবে ভোট দেয়ার অনুমতি প্রার্থনা করলেন। সাথে সাথেই তিনি বিরোধী দল থেকে ঘোরতর সমালোচনার সম্মুখীন হলেন। সমালোচনার কারণটি আজকের যুগে শুনলে হয়তো অনেকেরই অবাক লাগবে। না সমালোচনার পেছনে লেভি সুয়েদামের কোন দুর্নীতি, চারিত্রিক দুর্বলতা কিংবা প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অযোগ্যতা বা এই ধরনের কিছু ছিলো না।  বিরোধী দলের প্রধান আপত্তি ছিলো লেভিকে দেখলে যতটা পুরুষসুলভ মনে হয়, তার চেয়ে বেশী নারী সুলভ।  আর সে সময় নারীদের কোন ভোটাধিকার ছিলো না। কাজেই লেভি সুয়েদামকে নারী প্রমাণ করতে পারলেই হয়তো কম্ম সাবার।  নির্বাচকেরা এই দ্বন্দের সুরাহা করতে একজন ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে আসলেন।  বিজ্ঞ ডাক্তার  উইলিয়াম বেরী সুয়েদামের দেহে লিঙ্গ এবং অন্ডাষয়ের অস্তিত্ব সনাক্ত করে রায় দিলেন লেভি সুয়েদাম পুরুষ।  কাজেই লেভি ভোট দেয়ার যোগ্য। লেভি সুয়েদামের ভোটে হুইগ নির্বাচনে জিতলো এক ভোটের ব্যবধানে।

 

কিন্তু কিছুদিন পরে ডাক্তার  উইলিয়াম বেরী লেভি সুয়েদামকে পরীক্ষা করতে এসে হতভম্ব হয়ে দেখেন তার নিয়মিত মাসিক হয়, এবং তার উন্মুক্ত যোনীদ্বার রয়েছে।  তার কাঁধ মেয়েদের কাঁধের মতই  অপ্রশস্ত,  নিতম্ব মেয়েদের মতই ভারী।  শুধু তাই নয়, লেভি সব সময়ই একটু রঙ চঙ্গা কাপড় চোপড় পছন্দ করতেন, কায়িক শ্রম অপছন্দ করতেন ইত্যাদি।  তার এই মেয়েলী বৈশিষ্ট্যগুলো’[৬]  ডাক্তারের চোখে ধরা পড়ে যাবার পরে তিনি আবারো ভোটের অধিকার  হারিয়েছিলেন কিনা তা কেউ বলতে পারে না। ফলাফল যাই হক না কেন লেভি সুয়েদাম কিংবা মারিয়া  প্যাতিনোর মত  ঘটনাগুলো  চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে মানুষকে কেবল নারী এবং পুরুষ এই দুইভাগে বিভক্ত করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা অনেকক্ষেত্রেই খুব সরল ।  যেখানে বিভক্তি এত স্পষ্ট নয়, সেখানে জোর করে লিঙ্গ আরোপকরণ সমস্যা কমায়নি, বরং আরো জটিল করে তুলেছে।

 

আসলে মুল সমস্যা হল – আমরা ‘নারী’, ‘পুরুষ’ ছাড়া আর কোন তৃতীয় লিঙ্গের স্বকৃতিতে বিশ্বাসী ছিলাম না অনেক দিন ধরেই। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়গুলোতে এই ধারণা অনেকটা পাল্টেছে। পশিমা বিশ্বে তো বটেই, হাওয়া লাগছে আমাদের দেশেও। মুক্তমনায় প্রকাশিত রণদীপম বসুর সাম্প্রতিক ‘হিজড়া, প্রকৃতির বিচিত্র খেয়ালের এক দুর্ভাগা শিকার ‘ এমনি একটি উদাহরণ যেখানে তৃতীয় লিংগ হিসবে হিজড়া বা উভলিংগ মানবদের স্বীকৃতি দাবী করা হয়েছে। পশ্চিমে যে কাজটি অনেক আগেই শুরু হয়েছে। সেখানে লিংগ বলতে কেবল নারী পুরুষ বোঝানো হয় না। গন্য করা হয় সাদা -কালো – এই দুই চরম সীমার মধ্যবর্তী ধূসর এলাকাগুলোকেও। এ প্রসঙ্গে ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী Anne Fausto-Sterling এর Two Sexes Are Not Enough কিংবা সায়েন্স পত্রিকায় প্রকাশিত The Five Sexes: Why Male and Female Are Not Enough প্রবন্ধ[৭] দুটি পড়া যেতে পারে। এ ছাড়া জোয়ান রাফগার্ডেনের Evolution’s Rainbow বইটিও এ ব্যাপারে পাঠকদের চিন্তার খোরাক যোগাবে। আর সে কষ্টটাও না করতে চাইলে অন্ততঃ আমার সমকামিতা (সমপ্রেম) কি প্রকৃতি বিরুদ্ধ? সিরিজটার ২য় পর্বে চোখ বোলাতে পারেন।

 

 

শিশু বয়সে সেক্স চেঞ্জই কি  উভলিংগ সত্ত্বা থেকে মুক্তির এক মাত্র সমাধান?

 

রণদীপম বসুর উভলিংগ মানবদের নিয়ে সাম্প্রতিক লেখাটার মানবিক দিক নিয়ে পাঠকদের কাছ থেকে অনেক প্রশংসাসূচক বাক্য প্রক্ষিপ্ত হলেও, জেন্ডার সচেতনতাবোধটি তেমনি ভাবে উঠে আসেনি। যেমন, একটি ব্লগে  একজন এই ‘হিজড়া’ সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে মত দিয়েছেন –

[এ ধরণের] শিশুকে জন্মের সময়ই প্লাস্টিক সার্জারি করে ছেলে বা মেয়ের দলে ফেলা যায় তাকে তখনই চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত।

আসলে আমাদের মত দেশ গুলোতে যেখানে লিংগ বৈষম্য খুব প্রবল, সেখানে এধরনের সমাধানই হয়ত মানবিক মনে হবে। পশ্চিমা বিশ্বেও কিছুদিন আগ পর্যন্ত ঢালাও ভাবে এটা ঠিক বলে মনে করা হত। হাসপাতালে উভলিংগ মানব শিশু (অর্থাৎ, একই দেহে নারী পুরুষের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন সন্তান) জন্মালে ডাক্তারের একটাই কাজ ছিল অভিভাবকদের  তাদের সন্তানদের এই বার্থ ডিফেক্ট অবহিত করে সেক্স চেঞ্জ (চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় সেক্সরিএসাইনমেন্ট)অপারেশন করে হয় ছেলে নয়ত মেয়ে বানিয়ে ছেড়ে দেয়া।  অভিভাবকেরাও যেহেতু উভলিঙ্গ সন্তান নিয়ে সমাজে ঝামেলা পোহাতে চেতেন না, তাদের কাছেও এটা একটা সবসমইয়ই খুবই আকর্ষনীয় একটা সমাধান  হিসেবে বিবেচিত হত।  কিন্তু আমেরিকায় ডেভিড রেইমার নামে এক রোগীর  বিয়োগান্তক পরিনতি সেক্সচেঞ্জ নিয়ে ধ্যান ধারণা  চিকিৎসকদের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে অনেকটাই পালটে দিয়েছে।

 

ডেভিড রেইমারকে নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন দুইজন যৌনবিশেষজ্ঞ। এদের একজন হলেন জন মানি, অন্যজন মিল্টন ডায়মন্ড।  চিকিৎসাবিদ্যায় এদের বিতর্ক  পরিচিত হয়ে আছে মানি ডায়মন্ড/ জন জোয়ান বিতর্ক নামে ।  জন মানি ছিলেন সেসময়কার জগদ্বিখ্যাত যৌন-বিশেষজ্ঞ; অধ্যাপনা করতেন জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে।  ষাট এবং সত্তুরের দশকে  জেন্ডার আইডেন্টিটি নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন সেসময়কার শীর্ষস্থানীয় কান্ডারী।  তার ধারনা ছিলো, মানুষ এ পৃথিবীতে জন্মায় জেন্ডার নিরপেক্ষ হিসেবে। জেন্ডার জিনিসটা যেহেতু পুরোটাই সাংস্কৃতিক, এর সাথে শরীরবৃত্তীয় মনস্তত্বের কোন যোগ নেই। অর্থাৎ জেন্ডার পরিচয় জন্মগত নয়, পুরোপুরি পরিবেশগত।  কাজেই জন্মের সময়  লৈঙ্গিক জটিলতা সম্পন্ন কোন শিশুকে যদি খুব কম বয়সেই সেক্স চেঞ্জ অপারেশনের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট জেন্ডার প্রদান করা হয়,  তাহলে শিশুটির ভবিষ্যত মানসগঠন ওই প্রদত্ত জেন্ডারের সাথে সহজেই খাপ খাইয়ে নিয়ে পারবে, কোন অসুবিধাই হবে বা।  তার তত্ত্বের সাপেক্ষে  ডঃ মানি  ডেভিড রেইমার নামে এক রোগীর দৃষ্টান্ত হাজির করতেন।  রেইমারের সত্যিকারের নাম ধাম পরিচয় প্রকাশ না করে জন্‌ হিসবে অভিহিত করে তিনি তার গবেষণাপত্র এবং পাঠ্যবইয়ে বলেছিলেন,  জন্‌ নামের শিশুটি জীবনের শুরুতেই একটি দুর্ঘটনায় যৌনাংগের একটা বড় হারিয়ে ফেলে।  তার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সেক্স রিএসাইনমেন্ট সার্জারির মাধ্যমে অবশিষ্ট পুরুষাঙ্গটি ছেদন করে তাকে নারীতে রূপান্তরিত করে ফেলা হয়েছিল।  অভিভাবককে পরামর্শ দেয়া হয়েছিল তাকে জোয়ান্‌ হিসেবে যেন বড় করা হয়।  জোয়ানের অভিভাবকেরা জন মানির কথামত তাই করে যাচ্ছিলেন।  জন মানিও তার এই সাফল্য ফলাও করে বৈজ্ঞানিক সাময়িকীগুলোতে প্রচার করে যাচ্ছিলেন। মানি তার পেপার আর বইগুলোতে দেখিয়েছিলেন – জোয়ান হিসবে বড় হতে জনের কোন অসুবিধেই হচ্ছে না।  কাজেই ডঃ মানি তর্কাতীত ভাবে সবার সামনে প্রমাণ করেছিলেন মানুষের জেন্ডার নির্ধারণে  প্রকৃতির কোন প্রভাব নেই, প্রভাব পুরোটুকুই পরিবেশ সঞ্জাত। জন মানি তার তত্ত্বের প্রমাণের জন্য বহু পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছিলেন।

 

তবে সবাই যে জন মানির কথা চোখ বুজে বিশ্বাস করছিলেন তা নয়।  এমনি একজন সংশয়ী ছিলেন মিল্টন ডায়মন্ড।  তিনি সে সময় কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছিলেন। তিনি এবং তার সুপারভাইজার  তাদের গবেষণার মাধ্যমে দেখালেন যে মানুষের মধ্যকার যৌনতার পার্থক্য আসলে পরিবেশ দ্বারা সূচিত হয় না, সূচিত হয় হরমোন দ্বারা।  অর্থাৎ, ডায়মন্ড দাবী করলেন, জন মানি যেভাবে জন্মের সময় জেন্ডার নিরপেক্ষ থাকে বলে মনে করছেন, তা মোটেই ঠিক নয়। ছেলে মেয়ের পার্থক্যসূচিত ব্যাপার স্যাপারগুলো অনেক আগেই প্রিনেটাল  হরমোনের প্রভাবে নির্ধারিত হয়ে যায়। 

 

শুধু ডায়মন্ডই নন, তখন  ডঃ বার্নাড জুগার্ড নামে আরেক মনোবিজ্ঞানীও তার ব্যক্তিগত কেস স্টাডি থেকে দেখাচ্ছিলেন যে,  ডঃ মানির অনুমান মোটেও সত্য নয়। কিন্তু ডঃ মানি ডায়মন্ড কিংবা জুগার্ডের গবেষণাকে গোনায় না ধরে নিজের প্রচারনাই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এমনকি ১৯৮২ সালের  পেপারেও তিনি জন/জোয়ান কেসের কথা উল্লেখ করে লিখেছিলেন to support the connection that sex roles and sexual identity are basically learned।  জন মানির এই দৃষ্টিভঙ্গি সেসময় প্রগতিশীল মহলে দারুন সমর্থন পেয়েছিলো, এমনকি নিউইয়র্ক টাইমসের মত পত্রিকা প্রায়ই জন মানিকে উদ্ধৃত করে পাঠকদের বিশ্বাস করাতে চাইতো আমাদের প্রবৃত্তির সবকিছুই পরিবেশগত, জন্মগত কিছু নয়। 

 

এ সময় বিবিসি থেকে জন-জোয়ান কেসের উপর ফিচার করে  একটি ডকুমেন্টরী করার পরিকল্পনা করা হয়। বিবিসির মূল লক্ষ্য আসলে ছিল  জন মানির কাজকে তুলে ধরা, এবং সামান্য সময়ের জন্য বিপরীত ধারণা হিসেবে ডায়মন্ডের কথাবার্তা  হাল্কা ভাবে দেখানো। কিন্তু ফীচার করতে গিয়ে বিবিসির অনুসন্ধিৎসু দল এক অদ্ভুত জিনিস আবিস্কার করলেন।  জন মানি তার তত্ত্বের স্বপক্ষে ডেভিড রেইমারের কেসকে সফল হিসবে প্রতিপন্ন করে এসেছেন, সেটা মোটেই সফল নয়।  তারা লক্ষ্য করলেন ব্রেন্ডা রেইমার নামে বড় হওয়া মেয়েটি হাটে ছেলেদের মত, গলার স্বরও মেয়েলী নয়। অভিভাবকের সাথে কথা বলে জানা গেল, মেয়ে হিসবে বড় হতে গিয়ে তাকে নানা ধরণের অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কখনই সে মেয়েদের পুতুল পছন্দ করতো না, মেয়েদের ড্রেস দু চোখে দেখতে পারতো না, এমনকি বাথরুমে গিয়ে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে চাইতো।  একটা সময় মেয়েলী সমস্ত কিছু করার প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে পড়লো সে।  দু তিন বার আত্মহত্যার প্রচেষ্টাও নিয়েছিল সে।  জন মানিকে এ বিষয়ে বিবিসির সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করলে  জন মানি সাংবাদিকদের সাথে এ নিয়ে কোন ধরনের কথা বলা থেকে বিরত থাকলেন।

 

এর পরের ঘটনা আরো নাটকীয়।   একটা সময় পর ব্রেন্ডার অভিভাবকেরা  তার মানসিক অস্থিরতা সহ্য না করতে পেরে তার  শিশু বয়সে সেক্স চেঞ্জ সংক্রান্ত অপারেশনের কথা  বলে দিলেন।  সেটা শুনে  ব্রেডা বুঝতে পারলো কেন তার মেয়ে হিসবে খাপ খাইয়ে নিতে বরাবরই সমস্যা হচ্ছিলো।  সে আসলে ছেলেই ছিলো বরাবরই মানসিকভাবে। বাবা মার কাছ থেকে আসল ঘটনা শোনামাত্র সে তৎক্ষনাৎ তার ব্রেডা নাম পরিত্যাগ করে পুনরায় ডেভিড হয়ে গেল।  চুল ছেটে ফেলল প্রথমেই।  সার্জিকাল অপারেশন করে স্তনের আকার কমিয়ে আনলো। পরে তার দাবী অনুযায়ী ডাক্তারদের সহাচর্যে নতুন করে পুরুষাঙ্গ গঠন করে পুনঃস্থাপন হল, এমনকি একসময়  জেন নামে চমৎকার একটি মেয়ের সাথে পরিনয়সূত্রে পর্যন্ত আবদ্ধ হয়ে পড়ল ডেভিড। 

 

 

চিত্রঃ  ক) মেয়ে হিসবে বড় হতে থাকা ডেভিড রেইমার

 

খ) বড় হয়ে পুনরায় ডেভিডে প্রত্যাবর্তন

 

এদিকে মিল্টন ডায়মন্ড ডেভিডের ঘটনা লোকমুখে জানতে পেরে তার সাথে একসময় দেখা করেন, এবং সব কিছু নিজের চোখে দেখে হতভম্ব হয়ে যান। তিনি ডেভিডকে অনুরোধ করেন ভবিষ্যত রোগীদের কথা ভেবে তিনি যেন তার ঘটনা মিডিয়ায় প্রকাশ করেন।  ডেভিড প্রথমদিকে অস্বীকৃতি জানালেও পরবর্তীতে রাজী হন এবং ১৯৯৭  সালে মিল্টন ডায়মন্ড  ডেভিড রেইমারের সুপারভাইজিং সাইক্রিয়াট্রিস্ট কেইথ সিগ্মুন্ডসনের সাথে মিলে একটি পেপার প্রকাশের মাধ্যমে ডেভিডের প্রকৃত অবস্থা সবার কাছে তুলে ধরে সমস্ত লুকোচুরি আর জারিজুরি ফাঁস করে দেন। ঠিক একই সময়ে বিজ্ঞান লেখক জন কলাপিন্টো রোলিংস্টোন ম্যাগাজিনে ডেভিড রেইমারকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ[৮] রচনা করেন এবং পরবর্তীতে আরো বিবর্ধিত করে একটি বই রচনা করেন As Nature Made Him: The Boy Who Was Raised as a Girl শিরোনামে।

 

As Nature Made Him: The Boy Who Was Raised as a Girl, John Colapinto

 

ডেভিডের এই ঘটনা একাডেমিক জগত শুধু নয়, সাধারণ মানুষের যৌনপ্রবৃত্তি নিয়ে চিন্তাভাবনা বদলে দারুনভাবে প্রভাব বিস্তার করে। ডায়মন্ড জন মানির তত্ত্বের মূল ভিত্তি পুরোপুরি ধ্বসিয়ে দেন আর প্রমান করেন যে,  কারো মনোযৌনতার ক্যানভাস নিরপেক্ষ হয়ে জন্মায় ন। শুধু তাই নয়, পুরুষাঙ্গ কিংবা ক্লাইটোরিসের কিংবা আকার, আকৃতি কিংবা বিকৃতি দেখে  চিকিৎসকদের তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্তে  সেক্স চেঞ্জ রোগীর পরবর্তী জীবনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে।  তবে অনেকেই মনে করেন যৌনপ্রবৃত্তি নিয়ে মানি এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের  ভুলের  পেছনে প্রধান কারণ ছিলো বিজ্ঞানমনস্ক যৌনসচেতনতার অভাব।  তারা সজ্ঞাতভাবে ধরেই নিয়েছিলেন

 

১। প্রকৃতিতে শুধুমাত্র দুইটি সেক্স থাকবে নারী এবং পুরুষ।

২। প্রকৃতিতে শুধুমাত্র হেটারোসেক্সুয়ালিটি বা বিষমকামীতাই স্বাভাবিক

৩। জন্ম মূহূর্তেই হার্মাফ্রোডাইট বা মিশ্রিত যৌনতা সম্পন্ন শিশুর জেন্ডার পরিবর্তিত করে দিয়ে মানসিক এবং শারীরিকভাবে সুস্থ্য মানুষ তৈরী করা যায়। 

                                    

ডেভিড রেইমারের বিয়োগান্তক পরিনতি[৯]  ডাক্তারদের এই সনাতন মনমানসিকতাগুলো বদলে ভীষণভাবে প্রভাব ফেলেছে। আগে মনে করা হত, মানুষের প্রবৃত্তি কিংবা জেন্ডারর গঠনে জিন কিংবা হরমোনের কোন প্রভাব নেই, পুরোটাই পরিবেশ নির্ভর। কিন্তু রেইমারের ঘটনার পর এই সংক্রান্ত চিন্তাধারা অনেকটাই বদলে গেছ। এর প্রভাব পড়েছে নারীবাদী, সমকামী, উভকামী, রূপান্তরকামীদের  আন্দোলনেও।  নর্থ আমেরিকান ইন্টারসেক্স সোসাইটি শিশু বয়সে সেক্স চেঞ্জ অপারেশনের তীব্র বিরোধিতা করে মতামত ব্যক্ত করেন যে, ডেভিড রেইমারের দৃষ্টান্ত থেকে সামাজিক জটিলতাগুলো বুঝতে ডাক্তারদের শিক্ষা নেয়া উচিৎ।  তারা মনে করেন, একটি শিশু বড় হয়ে যখন নিজের জেন্ডার আইডেন্টিটি সচেতন হয়ে উঠে, তার আগে সেক্স অপারেশন করা আসলে শিশু নিপীড়নের সমতুল্য।  যৌনতা পরিবর্তনের আগে আরো বেশী দরকার নারী-পুরুষের বাইরেও অন্যান্য লৈঙ্গিক পরিচয় এবং যৌনতাগুলোর সামাজিক স্বীকৃতি। এটাই এখন যুগের দাবী।

——————তথ্যসূত্র

[১] Sexing the Body: Gender Politics and the Construction of Sexuality, Anne Fausto-Sterling, Basic Books , November, 2000

[২] Eve’s Rib: Searching for the Biological Roots of Sex Differences, Robert Peel, Publishers, New York, 1994.

[৩] “Sex is much more a matter of hormones than of chromosomes. Indeed, the small Y chromosome, the root of all maleness, seems to do little besides turn on the “master male switch” to start the flow of hormones” see for details, Eve’s Rib: Searching for the Biological Roots of Sex Differences, Robert Peel, Publishers, New York, 1994.

[৪] বর্তমানে  International Association of Athletics Federations নামে পরিচিত।

[৫] One of the political party in the United States from about 1829 to 1856, opposed in politics to the Democratic party.

[৬] উল্লেখ্য, ঊনবিংশ শতকের ডাক্তারদের মাথায় সেক্স এবং জেন্ডারের মধ্যে কোন  পার্থক্য ছিলো না।

[৭] কিছু সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ফাউস্টো স্টারলিং তার সায়েন্স পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধটি সম্প্রতি কিছুটা পরিমার্জিত করেছেন। The five sexes, revisited দ্রঃ

[৮] The True Story of John/Joan“, Colapinto, John, Rolling Stone, 1997, pp. 54-97. 

[৯] ডেভিড রেইমার পরবর্তীতে ভাইয়ের মৃত্যু, নিজের বিবাহ বিচ্ছেদ এবং চাকরীগত সমস্যা সহ নানা কারনে জর্জরিত হয়ে আত্মহত্যা করেন। ডেভিডের অভিভাবকেরা ডেভিডের এই বিয়োগান্তক পরিণতির জন্য জন্ মানির সারা জীবনের  ভুল চিকিৎসাকে দায়ী করেন।  

[725 বার পঠিত]