আমার দেখা পনেরই আগস্ট এবং পরের দিনগুলো

পনেরই আগস্ট প্রতিবারই আসে আমাদের সামনে দুঃখ, বেদনা, ক্ষোভ আর যন্ত্রণা নিয়ে। এদিনই বাংলাদেশের সামগ্রিক দৃশ্যপটের পরিবর্তন হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে। সেদিনের কথা মনে হলে শোকে আপলুত হই। আর ভাবি এই নির্মম হত্যাকান্ড আমাদের সামনে এগোবার প্রক্রিয়াকে পিছিয়ে দিয়েছিল।

আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র। সাংবাদিকতায় পড়ছি। ছাত্র রাজনীতিতে বেশ সক্রিয়। ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা নগরের সভাপতি। তাই স্বাভাবিক কারণেই সে সময় অনেক কিছু কাছ থেকে দেখবার ও জানবার সুযোগ হয়েছিল। প্রতিবারই ভাবি আমার অনুভূতির কথাগুলো লিখব। আজ ঢাকা থেকে একটা ফোন পেয়ে কিছু অন্ততঃ লিখবার তাগিদ অনুভব করলাম। গত বছর ঢাকাতে সেলিম ভাই (মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম) বলছিলেন,“ তুমি মাহবুব জামানকে সঙ্গে নিয়ে একবার অফিসে এসো। আমরা সবাই মিলে সেই সময়ের কিছু ঘটনাগুলো স্মরণ করি, তার ধারাবাহিকতাগুলো সর্ম্পকে নতুন করে পর্যালোচনার চেষ্টা করি। আমাদের চারদিকে যা ঘটছিল, যা ঘটতে আমরা দেখেছি – তার একটা সত্যচিত্র জনসমক্ষে উপস্থাপন করে সংরক্ষণ করা। পরে হয়তো এই তথ্যগুলো হেল্প করবে আমাদের বা অন্যদের পথ চলার দিকনির্দেশক হিসেবে। আমরা খুব শীঘ্রই ইতিহাস ভুলে যাই। তাই প্রয়োজন এটাকে সংরক্ষণ করা।” একটা ডিজিটাল রেকর্ডার কিনে ফেলেছিলাম তার জন্য। কিন্তু মাহবুব ভাইয়ের ব্যস্ততার জন্য সময় করে আর বসা হয়ে উঠেনি।

পনেরোই আগস্ট ছিল আমাদের জাতির জন্যই সত্যি একটি বিয়োগান্তক ঘটনা। নৃশংস হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে আমাদের স্বাধীনতার বিজয়কে মূলে আঘাত করা হয়েছিল। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আমি এবং আমার সহকর্মীরা সেদিনের তীব্র প্রতিবাদ করেছিলাম। নিজে একজন ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হয়ে আমরা সেদিন সবাই মিলে বেশ সাহসিকতার সঙ্গে রুখে দাঁড়িয়েছি। বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সে আমাদের ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলনে বলেছিলেন যে, “আমি মরব তবুও আমি সাম্রাজ্যবাদের কাছে মাথা নত করবো না।” প্রতিক্রিয়াশীল, দক্ষিণপন্থীদের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেই তিনি সাহস করে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশের কাক্সিক্ষত শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থার জন্য। মানুষ আর আমজনতার জন্যই তাঁর এই দৃঢ় প্রত্যয় আমাকে আর আমার বন্ধুদের তাঁর এই হত্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সাহস জুগিয়েছে এবং আমরা দাঁড়িয়েছিলামও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট তারিখে বঙ্গবন্ধুর আগমনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র জাতির পিতা এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আসবেন ছাত্র – শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে একটি দিকনির্দেশনা মূলক ভাষণ দিতে। একটা সাজ সাজ রব উঠেছিল। ডাকসুতে তখন আমাদের সেলিম ভাই ভিপি আর মাহবুব ভাই জিএস। স্বাভাবিক কারণেই কিছুটা বেশি দায়িত্ব পড়েছিল আমাদের উপর সমগ্র অনুষ্ঠান যাতে নিবিঘের্œ করা যায়। পুরো সপ্তাহ ধরে কাজ চলছে কলেজ, স্কুল এবং ইউনির্ভার্সিটিগুলোতে। আমি ও সৈয়দ নুরু (ছাত্রলীগের নগর সভাপতি) পুরো ঢাকা শহর চষে বেড়িয়েছি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যাপক জমায়েত আর সভা করেছি। ছাত্র শিক্ষকদের সম্প্রীতি সভা আয়োজন করেছি। যাতে সবাই মিলে নতুন দিনের জন্য একত্রে কাজ করতে পারি। সবশেষ পালা ঢাকা ইউনিভার্সিটির।

১৪ তারিখ রাতে আমাদের প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। হঠাৎ খবর পেলাম সায়েন্স এনেক্স বিল্ডিংএ একটি বোমা ফুটেছে। খবর পেয়ে আমরা দৌড়ে সবাই গেলাম। দেখলাম এর কিছু আসবাবপত্র নস্ট হয়েছে। সাধারণ ছাত্ররা একটু আতঙ্কিত। বুঝতে অসুবিধা হলো এটা আমাদের বিরোধীদের কাণ্ড। তারা আমাদের এই নবযাত্রাকে শুরুটাই বাধাগ্রস্থ করতে চায়। বেশ সতর্ক হয়ে গেলাম এবং খুব ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চললাম নেতৃবৃন্দের সঙ্গে।

চৌদ্দ তারিখ সারাদিন চলে গেল কলা ভবন আর সায়েন্স এনেক্স করে। কাজ করছি আর ভাবছি একটা কিছু চলছে ভেতরে ভেতরে যা আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। কিছু জানতে পারছি না। একটা কিছু আঁচ করা যাচ্ছিল যে, বিরোধীরা একটা ষড়যন্ত্র আঁটছে। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, মাহবুব জামান, শেখ শহীদ, নূহ উল আলম লেনিন, ইসমত কাদির গামাসহ অনেকেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং কাজ কর্মের তদারকি করছেন। সবাই একসঙ্গে কাজ করছি। সব সময় সঙ্গে আছে শেখ কামাল। তাকে আমরা বাসায় পাঠিয়ে দিলাম রাত ১২টার দিকে। অনেকটা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই। তাকে বলা হলো রাতে রেষ্ট নিয়ে খুব সকালে যেনো চলে আসে। তাকে আমরা নানা কাজে সবসময় সঙ্গে পেয়েছি।

অনেক রাত পর্যন্ত আমরা কজন থেকে গেলাম ইউনিভার্সিটিতে। সেটা হবে প্রায় রাত ১টা। লেনিন ভাইয়ের সঙ্গে অনেক রাত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে বটতলার পাশে রেলিং ধরে কথা বলছিলাম। আঁচ করার চেস্টা করছিলাম ঠিক কারা বোমাবাজির সঙ্গে জড়িত ? কেন যেন আমার মনে ভয় হচ্ছিল যে বঙ্গবন্ধুর একটা ক্ষতি করার চেষ্টা চলছে।
মনের শঙ্কার কথা লেনিন ভাইকে বললামও। একথাও বললাম মোশতাকের মত প্রতিক্রিয়াশীলদের নিয়ে পরিবর্তন তথা নবযাত্রা কতটা নির্বিঘেœ সফলভাবে করা যাবে ? ওদের নিশ্চয়ই একটা দূরভিসন্ধি আছে। এইসব নিয়ে আরো অনেক কথা হচ্ছিল। আমি এও বললাম বঙ্গবন্ধুর অতো প্রত্যয়ের কথা যা তিনি আমাদের জাতীয় সম্মেলনেই বলেছিলেন। যাই হোক, আমরা কজন রাত দু’টোর পরে চলে গেলাম হলগুলোতে। আমি সব কাজের সঙ্গী মটর সাইকেলটা নিয়ে সূর্যসেন হলে যাই। হলের নেতাদের বলাছিল কোন রুমে থাকব। যাতে খুব সকালে আমাদের উঠিয়ে দিতে পারে। বঙ্গবন্ধুর অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিটা দেখে নিতে হবে। সারাদিনের টানা কাজে ক্লান্ত শরীর। বিছানায় পিঠ ছোঁয়েই তলিয়ে যাই গভীর ঘুমে।


ভোরবেলা রুমের দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা “কামরুল ভাই উঠুন, সর্বনাশ হয়ে গেছে!” দরজা খুলে দেখি সূর্যসেন হলের খোকন দাঁড়িয়ে। কান্না ভেজা কণ্ঠে বলছে, “এইমাত্র রেডিওতে এ্যানাউন্স করলো বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে।” শুনে স্তম্ভিত হয়ে পড়ি। বিশ্বাস হচ্ছিল না – কিছু চিন্তা করতে পারছিলাম না – অনেকক্ষন মুখ দিয়ে কোন কথা আসছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সময় নেয়া গেরিলা প্রশিক্ষণও যেন মুছে গিয়েছিল মন থেকে। একটু ধাতস্থ হয়ে বললাম, “তোমরা হলেই সতর্ক থাকো, খোঁজ খবর নাও।” আমাদের কর্মীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে চলে গেলাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা সংলগ্ন পিলখানায় বিডিআর হেড কোয়ার্টারে। সেখানে আমার চাচা জেনারেল এনাম কাজ করেন। জেনারেল খলিলুর রহমান তখন বিডিআর প্রধান। উনিও আমাদের এলাকার লোক হিসাবে খুবই পরিচিত। ভাবলাম ওখানে সঠিক খবর পাওয়া যাবে। গিয়ে দেখি চাচা বাসায় নাই। বঙ্গবন্ধুর হত্যার খবর পেয়ে খুব সকালে গেছেন মিটিং করতে। আমার আসার খবর পেয়ে চাচীকে ফোনে জানালেন অপেক্ষা করতে।
প্রায় দু ঘণ্টা পর উনি এসে বললেন, “আমরা বিডিআর এখনও ওদের সঙ্গে জয়েন করিনি। আমরা কিছু একটা করার চেষ্টা করছি এই অপকর্মের বিরুদ্ধে। তুমি থাকো।” আমার কাছ থেকে উনি ইউনিভার্সিটি ও শহরের পরিস্থিতির অবস্থা জানলেন।


কয়েক ঘন্টার জন্য আটকা পড়ে যাই। ভীষণ অস্থির লাগছিল। আজকের দিনটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনন্দ উৎসবে কাটানোর কথা ছিল। কত দিনের প্রস্তুতি। কী উৎসাহ – কী উদ্দীপনা – গোটা অনুষ্ঠানটাকে স্মরণীয় – বর্ণিল করে রাখতে ছাত্র-শিক্ষকদের কী নিরলস পরিশ্রম। কত অপেক্ষায় কেটেছে গত কয়েকটা দিন। আর আজ ভোর না হতেই সব যেন মুহূর্তে ধ্বংশ হয়ে গেল!? অসহায় হয়ে ছটফট করছি। বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে খবর নেবার চেস্টা করছি। কিন্তু মনে হলো কেউ যেন কথা টেপ করার চেস্টা করছে। ফোনে কথা বলা নিরাপদ মনে হলো না । রেডিওর নব ঘোরাচ্ছি ক্রমাগত। মেজর ডালিম বিরতিহীনভাবে বঙ্গবন্ধুকে খুন করার ঘোষণা দিয়ে চলছে। শুনতে শুনতে চোখে পানি এসে গেল। সহ্য করতে পারছিলাম না কিছুতেই।

সকাল ১১টা হতে নেভি, এয়ারফোর্স, আনসার, পুলিশ হুমকির মুখে কুচক্রীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করলো। বিডিআর করলো সবশেষে। পরে বুঝলাম ওরা পুরো ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফেলেছে। আর্মি, পুলিশ, নেভি, এয়ারফোর্স, সবাই বন্দুকের মুখেই ওদের সঙ্গে চলে গেল।

দুপুরের পরে আর কিছুতেই বসে থাকলে পারলাম না। কিছুটা নিরাশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম পুরনো ঢাকার কয়েকটি বাড়িতে। কয়েকটি রাজনৈতিক কন্ট্যাক্ট পয়েন্ট ছিল সেখানে। সব জায়গাতে দেখলাম একটা চাপা ক্ষোভ এবং হতাশা। সবাই যেন একটা নির্দেশের অপেক্ষায় আছে। কিন্তু তেমন কোন একটা সাড়া এলো না কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছ থেকে। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই স্তম্ভিত। পরিস্থিতি বোঝার এবং করণীয় স্থির করতে সরে থাকার কৌশল নেয়া হয়। আমিও আলাপ করে তাই করবার সিদ্ধান্ত নিলাম। অন্তত ক’দিনের জন্য।
ঢাকা শহরের কিছু কর্মীদের নিয়ে আমরা ক’দিনের মধ্যেই একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তুললাম। শুরু হলো আবার নতুন করে প্রস্তুতি। ছাত্র ইউনিয়নের নগর কমিটির সভাপতি থাকার সুবাদে আমার ওপর দায়িত্ব পড়লো নারায়ণগঞ্জসহ বৃহত্তর ঢাকা জেলার। ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। শেখ শহীদ ভাইকে কোনভাবেই যোগাযোগ করা গেল না। সেলিম ভাই, লেনিন ভাই, মাহবুব ভাই, আকরাম ভাই ও ঢাকা ইউনিভার্সিটির নেতাদের সঙ্গে ভালো নেটওয়ার্ক গড়ে উঠল অল্প সময়ের মধ্যেই। ঠিক করা হলো যেভাবেই হোক একটা তারিখ ঠিক করে আমরা বড় ধরনের একটা বিক্ষোভ মিছিল করবো।

ছাত্রলীগ নেতাদের সাথে কথা হলো। ঠিক হলো আমরা ক’জন ওখানে বসে দিন তারিখ ঠিক করবো। মমতাজ ভাইয়ের নয়া পল্টনের বাসায় আমরা প্রায় জন দশেক ছিলাম মিটিংএ। এটাই ছিল প্রথম মিটিং। নূরুসহ আরো ক’জন নগর ও কেন্দ্রীয় নেতা ছিল। নূরু বললো, “ওদের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে লড়তে হবে। ওই খুনীদের অস্ত্র দিয়েই মোকাবেলা করতে হবে।” ভীষণ সাহসী কর্মী। আমাদের সৈয়দ নূরু। সে ছিল ছাত্রলীগের নগর সভাপতি। কিন্তু আমরা অনেককেই বললাম তা নয় আমাদের দেশের ভিতর থেকে ওদের মোকাবেলা করতে হবে সবাইকে নিয়ে। সবাই মত দিল আমাদের পক্ষে। নূরু বেশ উত্তেজিত হয়ে সভা থেকে চলে গেল । পরে জানলাম সে চলে গেছে খুনিদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ের জন্য। তার অনেক সহকর্মী তার সঙ্গে দেশের বাইরে প্রতিরোধ লড়াইয়ে অংশগ্রহণের জন্যে চলে গিয়েছিল। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু দেশপ্রেমিক তরুণদের নিয়ে সে চেষ্টা করেছিল তাদের সংগঠিত করতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে কোন ষড়যন্ত্রের জন্য দুর্ভাগ্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়। তার সাথে আর কোনদিনই দেখা হয় নাই।

এক মাসের মধ্যেই আমরা আবার নিয়মিত প্রকাশ্য জাযগায় আসা শুরু করলাম আমাদের কন্ট্যাক্ট পয়েন্টগুলোতে। উদ্দেশ্য একটা বড় ধরনের প্রতিবাদ সংগঠিত করা। কেউ বা ক্লাশে, কেউ বা খেলার মাঠে গিয়ে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করেছে। আমাদের এই কৌশল বেশ কাজে দিল। কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে কিছু শক্তি ছিল আকারে ছোট কিন্তু প্রকৃতিতে ভয়ানক। তারা ওৎ পেলে রইল কিভাবে আমাদের ভয় দেখিয়ে সরিয়ে দেয়া যায়। এজেন্সীগুলো অনেক টাকা ঢেলে চলছিল। আর নানা ভাবে হুমকি দেয়ার চেষ্টা হচ্ছিল। মূলত তথাকথিত উগ্রপন্থী কিছু দল আমাদের সাথে বিভিন্নভাবে ঝামেলা করতে লাগলো। যাই হোক কয়েকদিনেই মধ্যেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম যে আমরা একটা প্রতিবাদ মিছিল করবো এবং তা বের হবে মধুর ক্যান্টিন থেকে। যেই চিন্তা সেই কাজ। আমরা ইউনিভার্সিটি ছাত্র আর বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্রদের নিয়ে জড়ো করলাম মধুর ক্যান্টিনে। সকালে জমায়েত হয়ে দেখি হকি স্টিক নিয়ে কজন বসে আছে ক্যান্টিনের ভেতর।

আমাদের জমায়েত একটু বড় হতে দেখে ওরা প্রস্তুতি নিলো আমাদের হামলা করার। আর সঙ্গে সঙ্গে আমরা তাদের একসঙ্গে রণহুঙ্কার দিয়ে তাদের ইউনিভার্সিটি ছাড়া করছিলাম। সবাইকে নিয়ে প্রথম প্রতিবাদ সংহত করেছিলাম ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। কাজী আকরাম হোসেনের সে প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। সেদিন ওই প্রতিবাদ সংহত করার পর আমাদের দুঃখ, বেদনা যেন কিছু সময়ের জন্য তিরোহিত হলো। প্রতিনিয়ত বঙ্গবন্ধু হত্যার সংঘটিত হবার পর কোন প্রতিবাদ না করতে পরাই আমরা অনেকটা মনোবেদনায় ভুগছিলাম। সবাইকে নিয়ে এমনি একটি প্রতিবাদ করাতে দেশ জুড়ে খবর ছড়িয়ে গেলো। আরো প্রস্তুতি শুরু এমন সব কর্মসূচির। ছোট ছোট গোপন সভা আর লিফলেট, দেয়ালে পোষ্টারিংয়ের চেষ্টা হলো।


আমরা লিফলেট ছেপে ঢাকা শহরে বিলির প্রস্তুতি নিই। ঢাকা শহরকে কয়েকটি জোনে ভাগ করে কাজ করতাম। যথাসময়ে লিফলেট ছেপে বিভিন্ন কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হলো। বিতরণের কাজে মটরকার, বেবী ট্যাক্সি, মটর সাইকেল ব্যবহার করা হলো। আমাদের চাচা জেনারেল এনামের ভক্সওয়াগনটিও একাজে ব্যবহার করার সুযোগ পাওয়া গিয়েছিল। কয়েক লক্ষ লিফলেট পৌছে গেল মুহূর্তের মধ্যেই বিভিন্ন এলাকায়। একাজে মূলত ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীরাই ছিল সব চাইতে উদ্যোগী। লিফলেট বিলি করতে যেয়ে ধরা পড়লো ঢাকা নগর কমিটির শওকত হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজল বন্দ্যোপাধ্যায় ও চামেলীবাগ এর শাহ জামাল, সিদ্দিকসহ আরো অনেকেই। ওদের দীর্ঘদিন জেল খাটতে হয়েছে আর কঠিন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। ওদের আজকের দিনে স্মরণ করি শ্রদ্ধাভরে। তাদের সাহস আজ আমরা কিছুটা হলেও সামনে এগুতে পেরেছি।

কেন্দ্রীয় ভাবে বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদ করার জন্যে বেশ কটা তারিখ হলো। কিন্তু এবার ঠিক হলো একটু সময় নিয়ে করা হবে। যাতে ব্যাপক মানুষকে নিয়ে করা যায়। সর্বশেষ তারিখ ঠিক হলো ৩রা নভেম্বর। সিদ্ধান্ত হলো আমার শুধুই পদযাত্রা করে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে শ্রদ্ধা জানিয়ে ফুল দিয়ে আসবো। এ কর্মসূচীতে বিভিন্ন মহল থেকে ব্যাপক সাড়া মিলছিল। ক্রমশ এই বর্বর হত্যার বিরুদ্ধে মানুষ গণতান্ত্রিক ভাবে এগিয়ে আসছিল। খুব সকালেই শোক র‌্যালী হবে ৩রা নভেম্বরের। সব প্রস্তুতি শেষ। যোগাযোগ রক্ষা করে চলছি যাতে সুশৃঙ্খল ভাবে মিছিল করা যায়।

রেজাউল হায়াত ভাই ছিলেন ঢাকার ডি.সি। আমাদের কাছের মানুষ। ৭৪এ বিভিন্ন ক্যাম্পে এক সঙ্গে কাজ করেছি। ম্যাজিষ্ট্রেট আর ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা দুর্ভিক্ষ ক্যাম্পগুলো চালিয়েছে। আমি ছিলাম ডাকসুর পক্ষ থেকে কোঅর্ডিনেটর। যুদ্ধোত্তর দুর্ভিক্ষা পীড়িত বাংলাদেশে দীর্ঘদিন অক্লান্তভাবে কাজ করে আমরা মানুশরে সঙ্গে দাাঁড়িয়েছিলাম। সঙ্গে ছিল ইকরাম আহমেদ, এম. এম. আকাশ, শওকত হোসেন, খোন্দকার শওকত জুলিয়াস, আবু বকর এর মত আমাদের হাজারো কর্মী।


সে যাই হোক আমাদের কর্মসূচীর প্রস্তুতির কাজ প্রায় শেষ। ঠিক ওইদিন ৩ নভেম্বর তারিখ সকালে আমাকে ফোন করে সেলিম ভাই জানালেন,“ একটা খারাপ খবর শুনলাম। তুমি এখনই সেন্ট্রাল জেলে চলে যাও।” আমি খেন্দকার শওকত হোসেন জুলিয়াস (বর্তমানে ডিভিশনাল কমিশনার, ঢাকা)কে নিয়ে চলে গেলাম সেন্ট্রাল জেলে। ডেপুটি জেলারের বাসাতে গিয়ে চার নেতা হত্যার বিষয়টি কনফার্ম হলাম সেলিম ভাইয়ের কাছে খবর পৌঁছানোর জন্যে। পরে ওই শোকযাত্রা পরেই ঘোষণা দেয়া হলো চার নেতার নির্মম হত্যার বর্ণনা। দ্রুত সারা শহরে খবর ছড়িয়ে পড়ল। জাতীয় চার নেতাকে জেলের ভিতরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। ব্যপক জনসমাগমের খবর শুনে খুনিরা আমাদের জাতীয় নেতা তাজউদ্দিনসহ সবাইকে হত্যা করেছে। যাতে আমরা বিকল্প শক্তি গড়ে তুলতে না পারি।


এসব হচ্ছিলো ছক বাধা নক্সা অনুযায়ী। বঙ্গবন্ধু পরে চার নেতাকে হত্যা আমাদের সামনে চলার পথকেই রুদ্ধ করার চেষ্টা হচ্ছিলো। এমনি অনেক ঘটনার জন্য চেষ্টা চলছে আজও।


আমার আজও মনে পড়ে শেখ কামালের বিয়ের সময় আমরা রিসেপসনে গিয়াছিলাম। ছাত্র নেতৃবৃন্দ লাইনে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শেখ কামালকে অভিনন্দন জানাতে জাতীয় নেতারা সামনের দিকে যাচ্ছিলেন। এক সময় এলেন খন্দকার মোশতাক। সেলিম ভাই আমাকে “বাঙালী সিআইএ এজেন্ট দেখো” বলে মোশতাক এর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। উনি এতোটা ক্ষুব্ধ হয়ে বলছিলেন যে অনেকই তার কথাটা শুনতে পাচ্ছিল হয়তো। আমি ওনার পাঞ্জাবী ধরে টেনে বলেছিলাম,“ আস্তে বলেন শুনে ফেলবে।” শেখ কামলের বিয়ের রিসিপশনের এডজ্যাক্ট তারিখটা আমার মনে নেই। তবে সেটা ছিল বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর কদিন আগে। সবাই জানতো খন্দকার মোশতাক একজন সাম্রাজ্যবাদের ও প্রতিক্রিয়াশীলদের এজেন্ট এবং ভেতর ভেতর ষড়যন্ত্র আঁটছে। তবুও তাকে নিয়ে এবং তার মতো আরও কিছু লোকদের নিয়ে করা হয়েছিলো বাকশাল। তাদেরই হাতে শেষ পর্যন্ত প্রাণ দিতে হলো বঙ্গবন্ধু,তার পরিবার আর তার সহকর্মী বীর চার জাতীয় নেতাকে।

আজও যারা তোশামুদি করে বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা ও তার দলকে নানাভাবে দেশের ক্ষতি করতে অসহযোগিতা করতে চাচ্ছে তাদের ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন। যারা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের নামে সবকিছুর নামকরণ এর নামে বঙ্গবন্ধুকে ছোট করেছেন, অতিসত্তর তাদের ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন আছে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু শুধু বঙ্গবন্ধুর ক্ষতি করেনি পুরো জাতিকে অনেক পিছিয়ে দিয়েছে। যে শোষণহীন ,ধর্মনিরেপক্ষ একটি সমাজ এদেশের আপামর মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু প্রাণ দিলেন সেই আদর্শ থেকে যদি তার কর্মীরা বা দল সরে আসে তাহলে সেই আদর্শ বাদ দিয়ে শুধু জাতির পিতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে কী আমাদের আত্মতৃপ্তির সুযোগ আছে ? তাই ভাবী যদি সত্যি বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানাতেই হয় তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে তাঁর ঘোষিত নীতিকে অনুসরণ করেই এগুতে হবে। অন্যথাই আমরা কোন বিজয়কে ধরে রাখাতে পারবো না। বঙ্গবন্ধুর চয়ঁত্রিশতম মৃত্যু দিবসে আমাদের সবার প্রত্যাশা হোক – তার ঘোষিত নীতিমালা বাস্তবে কার্যকর করে আমরা তাঁকে সত্যিইকারের শ্রদ্বা জানাই। শুধু তাঁর নাম সর্বস্ব চাটুকারিতা করে আমরা তেমন কোন অর্জন করতে পারবো না। এবারের পনেরই আগস্ট হোক মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে সব ধরনের বাধা কে পরাভূত করে একটি সৃষ্টিশীল সাবলম্বি বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার।
————————————————————
কামরুল আহসান খান: প্রাক্তন সাধারন সম্পাদক: বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় সংসদ।। [email protected]
 

প্রাক্তন সাধারন সম্পাদক: বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় সংসদ।।

মন্তব্যসমূহ

  1. opu সেপ্টেম্বর 13, 2009 at 3:09 অপরাহ্ন - Reply

    This article touched me ! Thanks a lot !

  2. Jahangir Alam Akash আগস্ট 18, 2009 at 11:10 অপরাহ্ন - Reply

    Thanks for this write-up, after read it, tears was broken from my eyes. Thanks again.

  3. নুরুজ্জামান মানিক আগস্ট 18, 2009 at 9:58 পূর্বাহ্ন - Reply

    :yes:

মন্তব্য করুন