আজকের আজকালেই পড়লাম। সিপিএমের বিতর্কিত মন্ত্রী আব্দুল রেজ্জাক মোল্লা আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলমান ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তিমূলক পেশাদারি শাখার উদ্বোধন করতে গিয়ে বলেছেন-মুসলমানরা ভাগ্যবান-কারন তাদের জীবনের পরম প্রাপ্তি কোরানে জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ আছে।

মন্ত্রী বলতেই পারতেন ইসলাম জ্ঞানার্জন করতে নির্দেশ দিয়ে থাকে। আমাদের ও মাথাব্যাথা থাকত না। কিন্ত ভোটের বাজারে সংখ্যালঘু তোষনের তাড়নায় এই প্রবীন কমিনিউস্ট নেতাটিও বলে বসলেন মুসলীমদের জীবনে সব থেকে বড় প্রাপ্তি কোরান! কোরান যেহেতু খাবার জন্য কোন মিস্টি না বা পাছা মোছার ন্যাপকিন না-এই কথাটির একটিই মাত্র অর্থ হয়। মুসলমানদের কোরান অনুসরন করে জীবন ধারন করা উচিত-এবং তারা খুবই ভাগ্যবান যে তাদের জীবনাদর্শ ঠিক করার জন্যে পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ তাদের আছে!

জামাত বা বুর্জোয়া পার্টির নেতারা ইসলামি মনন তোষন করে ভোট পাওয়ার জন্যে এরকম কথাবার্ত্তা এই উপমহাদশে আবাহমানকাল থেকে বলে আসেন। কিন্ত যখন কোন বর্ষীয়ান কমিনিউস্ট নেতা এবং মন্ত্রী এই ধরনের প্রতিক্রিয়শীল কথাবার্ত্তা বলেন তখন বিষয়টি একটু গভীরে না গেলে বোঝা যাবে না কিভাবে এইধরনের ধর্মীয় তোষন দক্ষিনএশিয়ার রাজনীতিকে সাম্প্রদায়িক কুম্ভীপাকে আবদ্ধ রাখে। এবং ধর্মীয় ধারনাগুলির সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিই মৌলবাদের আসল আঁতুর ঘর।

ক্ষমতার উৎস কি? কিসের বলে কোরান বা ধর্মগ্রন্থগুলি আজ বলীয়ান? বা সভ্যতার চাকা উলটোদিকে ঘোরাতে চাইছে? এই প্রশ্নটির মূলে আমাদের আঘাত করতে হবে। এইসব গুটিকয় মৌলবাদিদের এত ক্ষমতা আসে কি করে?

গত শতাব্দিতে “ক্ষমতা” এবং তার উৎ স নিয়ে সব থেকে বেশী দার্শনিক কাজ করেছেন মাইকেল ফুঁকো। তার বিখ্যাত গ্রন্থের নাম “ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশ” । ফুকোর কাজের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল জ্ঞান এবং ক্ষমতার মধ্যে সম্পর্ক। ফুকো এই প্রসঙ্গে “সাধারন জ্ঞান” বলে একটি সামাজিক প্যারামিটার চালু করেন-যার অর্থ- যত বেশী লোক কোন একটা বিলিফ সিস্টেমের ( ধরুন এই হিন্দুত্ববাদি, ইসলামিস্ট বা কমিনিউজম) বিশ্বাসগুলিকে সাধারন জ্ঞান হিসাবে গ্রহন করবে, সেই বিলিফ সিস্টেম সমাজের ওপর তত ছড়ি ঘোরাবে। এমন নয় যে ব্যাপারটা আমরা জানি না। কিন্ত এইসব বিলিফ সিস্টেমের ক্ষমতার উৎস সন্ধান করতে হলে-আমাদের ইতিহাস থেকে দেখতে হবে কি ভাবে একটি বিলিফ সিস্টেমের কিছু বিশ্বাস সাধারন জ্ঞানে পরিণত হচ্ছে। সাধারন জ্ঞান বলতে এক্ষেত্রে আমরা বুঝবো-জন সাধারন যে জ্ঞানগুলিকে নর্ম বা স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করেছে।

যেমন ধরুন -কমিনিউস্টদের রাজনৈতিক বিশ্বাস হচ্ছে একদিন সাম্যবাদি কমিনিউস্ট সমাজ আসবে। যতবেশী লোক এটাকে বিশ্বাস করবে-প্রমান্য সত্য হিসাবে দেখবে, কমিনিউস্টদের তত শক্তি বৃদ্ধি হবে। সোভিয়েতের পতনের আগে, অনেক অনেক বেশী লোকের কাছে এটা ছিল একটি স্বতসিদ্ধ প্রমানিত বিশ্বাস-তাই সাধারন জ্ঞান। কারন তারা মনে করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ানে সত্যিকারের সমাজতন্ত্র -সাম্যবাদি সমাজ আছে। কিন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ান ভেঙে গিয়ে সাম্যবাদের নরকগুলজার ক্রমশ প্রকাশ্য হতে, আজকের সমাজের খুব অল্প লোকের কাছেই এটা বিশ্বাস্য যে কমিনিউজম বলে আদৌ কোন সমাজ কোন দিন আসতে পারে। ফলে ধণতন্ত্রের এই চরম দুর্দিনেও কমিনিউস্টরা প্রতিটা দেশে মাটি হারাচ্ছে! কারন সেই সাধারন জ্ঞানের ভিত্তিটা-অর্থাৎ জনসারাধন যে মনে করত সাম্যবাদী স্বর্গীয় সমাজের অস্তিত্ব আছে-সেই জায়গাটাই আজ ভীষন দুর্বল। কোন তত্ত্বের নির্ভুলতা বা বৈজ্ঞানিক সত্য সেই তত্ত্বের শক্তির উৎস না। তত্ত্বের পেছনের ক্ষমতার উৎসের আসল নাম মানুষ। তারা বিশ্বাস করেছিল বলেই একদিন কমিনিউস্ট গাঙে জোয়ার ছিল।

ঠিক একই ব্যাপার কোরানের জন্যেও সত্য। কোরান আল্লা প্রেরিত নির্ভুল এবং শ্রেষ্ঠ জীবন দর্শন–এটাই মুসলমান সমাজের সাধারন জ্ঞান। বিশ্বাস না। কারন ইসলামের জন্ম লগ্ন থেকেই যেসব বুদ্ধিজীবিরা এই বিশ্বাসের বিরোধিতা করতে গেছে, তাদের প্রায় সবাইকেই খুন করা হয়েছে। কোরানে অবিশ্বাসীদের প্রতি অভিশাপ, ঘৃণা, ভয়দেখানো কি নেই! দাস প্রথার সমর্থন থেকে বৌ পেটানোর অনুমতি সব কিছুই পাওয়া যাবে। আবার বিদ্যান, বুদ্ধিমান দয়ালু ক্ষমাশীল হওয়ার উপদেশ ও আছে। বাকী ধর্মগ্রন্থগুলির মতন কোরান ও একটি ভাল-খারাপ উপদেশের ককটেল। এবং বাকী ধর্মগ্রন্থগুলির মতন এটিও একটি প্রতিক্রিয়াশীল গ্রন্থ কারন এর রাজনৈতিক তত্ত্বগুলি সপ্তম শতকের আরবদেশের উপযোগী। মোদ্দা কথা বাকী ধর্মগ্রন্থগুলির ন্যায় অতীতের নৃতাত্ত্বিক প্রয়োজন মেটানোর জন্যেই কোরান লিখেছিলেন সম্ভবত ২০ জন জ্ঞানী ব্যাক্তি। কিন্তু এইসব সত্য ইসলামিক ব্যাটারীর চার্জার হতে পারে না। “কোরান শ্রেষ্ঠ জীবন দর্শন” এটাকে বিশ্বাস না-একদম সাধারন জ্ঞানের পর্যায়ে নিয়ে এলে তবেই এই ইসলামি মৌলবাদের আসল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। এবং মাননীয় কমিনিউস্ট মন্ত্রী মহোদয় ঠিক সেটিই করলেন-তিনিও সেই গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে মৌলবাদিদের ক্ষমতার উৎসেই রাবার স্ট্যাম্প মারলেন। মুসলামানদের শিক্ষিত করতে যদি এই ভাবে কোরানের সাহায্য নিতে হয় তাহলে প্রক্ষান্তরে সেই মৌলবাদেরই বীজ চাষাবাদ করা হয়। কারন “কোরান শ্রেষ্ঠ জীবন দর্শন” সেই তত্ত্বকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে যা মৌলবাদের আসল শক্তি। বা ঘাঁটি।

[296 বার পঠিত]