[বহুমাত্রিক ও প্রথাবিরোধী লেখক, ঔপন্যাসিক, কবি ও গবেষক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল আজ। ২০০৪ সালের আজকের দিনে জার্মানির মিউনিখ শহরে ঘুমন্ত অবস্থায় তিনি মারা যান। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হুমায়ুন আজাদের ওপর জমিয়াতুল মুজাহিদিনের জঙ্গিদের দ্বারা যে সন্ত্রাসী হামলা হয়, তাই পরবর্তীতে তাকে প্রলম্বিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। তার স্মরণে পুরনো একটি লেখা আবারো পাঠকদের জন্য সামনে নিয়ে এলাম। যারা লেখাটি আগে পড়েছেন তাদের কাছে ক্ষমা-প্রার্থী – অভিজিৎ]
:line:

 

স্মৃতিতে হুমায়ুন আজাদ

অভিজিৎ রায়

 

অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ ঢাকা শহরের যে এলাকায় থাকতেন, আমিও বড় হয়েছি সেখানেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার্স কোয়ার্টারে।  ফুলার রোডে।  কিন্তু এক সাথে থাকা হলেও  তার সাথে আমার আলাপ হয়নি কখনো। না হবার অনেক কারণ আছে। আমি তখন বয়সে ছোট।  লেখালিখিও শুরু করিনি। মূলতঃ পাঠক হিসবেই দিন কাটাচ্ছি। কলেজ শেষ করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির পায়তারা।  রিক্রিয়েশন বলতে সমবয়সী বন্ধু-বান্ধবের সাথে বিকেলে আড্ডা মারা। বইমেলা শুরু হলে বইমেলায় যাই।  হুমায়ুন আজাদকে দূর থেকে দেখি।  তিনি তখন দারুন জনপ্রিয় লেখক। ভক্ত পরিবেষ্টিত।  না, ‘নারী’ তখনো বেরোয়নি। তারপরেও জনপ্রিয়তার কমতি ছিলো না তার। সময়টা এরশাদের রাজত্বকাল। মাতাল তরণী নামে একটা কলাম  বিচিন্তা  কিংবা দেশবন্ধু -কোন একটা পত্রিকায় নিয়মিত বেরুতো। আর আমি গোগ্রাসে গিলতাম।  তার ক্ষুরধার কলমের কারণে সামরিক জান্তার নজরে পড়লেন খুব তাড়াতাড়ি।  পত্রিকাটি নিষিদ্ধ হল।  তাতে অবশ্য হুমায়ুন আজাদের কিছু এলো গেলো না।  তিনি আরেকটি পত্রিকায় কলাম লিখতে শুরু করে দিলেন। আমিও তার সাথে সাথে সেই পত্রিকা কিনতে শুরু করে দিলাম।

কিন্তু আমি ততদিনে জেনে গেছি তিনি শুধু পত্রিকার কলামিস্ট নন। তিনি কবিতা লেখেন, গল্প লেখেন, তিনি ভাষাবিদ। তিনি খুব উঁচু মানের একজন সমালোচকও।  উপন্যাস তিনি তখনো লেখা শুরু করেননি। প্রথম উপন্যাস লিখলেন অনেকদিন পরে – ১৯৯৪ সালে। নাম ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল।  কিনলাম উপন্যাস। এ ধরণের উপন্যাস মাথায় ঢোকাতে যে পরিমাণ ধী-শক্তি লাগে তা বোধ হয় তখনো আমার ছিলো না। উপন্যাসের গঠনের জন্যই হোক, আর ভাষারীতির জন্যই হোক, তার উপন্যাস তেমন একটা আমাকে টানলো না (বছর পাঁচেক পর উপন্যাসটা আবার পড়ি, তখন আমার মনে হয়েছিল সত্যই অসাধারণ) ।  ভাল লাগেনি তার পরের বছর বেরুনো ‘সব কিছু ভেঙ্গে পরে’ উপন্যাসটিও।  আসলে দেশের বাইরের গল্প উপন্যাসের সাথে পরিচয় ছিলো না আমার। হুমায়ূন আহমেদ জাতীয় মধ্যবিত্ত আবেগ সমন্বিত ‘অপন্যাস’ই গোগ্রাসে গিলি। ওটার স্ট্যান্ডার্ডেই সব কিছু বিচার করি। ফলে ‘ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আজাদ’ আমার মন থেকে একরকম হারিয়েই গেলেন। সেই সাথে লেখক আজাদও হয়ত।

কিন্তু হুমায়ুন আজাদ তো এত সহজে হারিয়ে যাবার মানুষ নন। তিনি  আবার ফিরে এলেন আমার মানসপটে।  ফিরে এলেন প্রবলভাবেই। তার গবেষণাধর্মী বই ‘নারী’র মাধ্যমে। বইটা যে বছর বেরোয় সেবছর আমি সেটা পড়িনি। যখন পড়লাম, তখন বুঝলাম হুমায়ুন আজাদকে আর অবহেলা করা যাবে না। আমি নতুন করে আবিস্কার করলাম হুমায়ুন আজাদকে । নারী বইয়ের বিষয়বস্তু আমাকে যতটা না টানলো, তার চেয়ে বেশী টানলো তার সাহস, মুক্তবুদ্ধি আর সর্বোপরি অসামান্য গদ্যরীতি। নারী পড়েই আমি বুঝলাম – অধ্যাপক আজাদ বাংলাদেশের সবচেয়ে শুদ্ধভাষী লেখক।  বলা বাহুল্য, ডঃ আজাদকে নিয়ে আমার এই ধারণা এখনো অটুট আছে পুরোমাত্রায়।

আমি ততদিনে তার কবিতারও ভক্ত হয়ে পড়েছি। মনে মনে আবৃত্তি করি –

আমার সন্তান আজো জন্মেনি। যদি জন্মে
সে কি জন্মেই পাবে স্বাধীনতা? আমার বাবার
স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়েছিল আমার জীবনে।
আমার স্বাধীনতা কী রকম হবে আমার সন্তানের জীবনে
নাকি তাকেও বলতে হবে আমার মতোই কোনদিন
‘এতদিনে স্বাধীন হলাম।’

কিংবা …

যখন আমরা বসি মুখোমুখি, আমাদের দশটি আঙুল হৃৎপিন্ডের মতো কাঁপতে থাকে
দশটি আঙুলে, আমাদের ঠোঁটের গোলাপ ভিজে ওঠে আরক্ত শিশিরে
যখন আমরা আশ্চর্য আগুনে জ্বলি, যখন আমরাই আমাদের স্বাধীন স্বদেশ
তখন ভুলেও কখনো আমাকে তুমি বাংলাদেশের কথা জিজ্ঞেস কোরো না
আমি তা মুহূর্তও সহ্য করতে পারি ন –  তার অনেক কারণ রয়েছে
তোমাকে মিনতি করি কখনো আমাকে তুমি বাঙলাদেশের কথা তুলে কষ্ট দিয়ো না।
জানতে চেয়ো না তুমি নষ্ট ভ্রষ্ট ছাপ্পান্ন হাজার বর্গ
মাইলের কথা: তার রাজনীতি
অর্থনীতি, ধর্ম, পাপ, মিথ্যাচার, পালে পালে মনুষ্যমন্ডলী
জীবনযাপন, হত্যা, ধর্ষণ
মধ্যযুগের দিকে অন্ধের মতোন যাত্রা সম্পর্কে প্রশ্ন
করে আমাকে পীড়ন কোরো না…

এ রকম অসংখ্য পক্তিমালা আমার মনে গেঁথে থাকে সর্বক্ষণ।

হুমায়ুন আজাদের সাথে আমার যোগাযোগ হয় আমি দেশের বাইরে এসে মুক্তমনা তৈরী করা পরে।  হঠাৎ তিনি একদিন আমাদের ইমেইল করেন তার বিখ্যাত ‘ধর্মানুভূতির উপকথা’ প্রবন্ধটি সংযুক্ত করে। অনুরোধ করেন মুক্তমনায় প্রকাশের জন্য। আমরা হই আনন্দিত এবং সেই সাথে আপ্লুত। আমরা লেখাটিকে পিডিএফ আকার আমাদের সাইটে রেখে দেই। পরে তিনি এটিকে ‘ধর্মানুভূতির উপকথা ও অন্যান্য’ বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করেন (আমরাও পরে এটিকে অন্তর্ভুক্ত করি আমাদের সংকলন গ্রন্থ ‘স্বতন্ত্র ভাবনা’ (২০০৮) তে)। আমরা গর্বিত যে, লেখাটি ছাপার অক্ষরে কোথাও যাওয়ার আগে আমরাই সেটিকে ইন্টারনেটে প্রকাশ করতে পেরেছিলাম। এর পর থেকে মুক্তমনার সাথে হুমায়ুন আজাদের ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠে। তিনি আমাদের সাথে অনিয়মিতভাবে যোগাযোগ রাখতেন। 

পাক সার জমিন উপন্যাসটি ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে দৈনিক ইত্তেফাকের ঈদ সংখ্যায়  ছাপা হবার পর থেকে মৌলবাদীরা তার জীবননাশের হুমকি দিচ্ছিলেন। সেটা জানিয়ে তিনি আমাদের ফোরামের মডারেটরদের কাছে ইমেইল করেন ২০০৪ সালের জানুয়ারীর ৬ তারিখে।  সেখানে তিনি লেখেন –

The Ittefaq published a novel by me named “Pak Sar Jamin Sad Bad” in the Eid Issue in December 03. It deals with the condition of Bangladesh for the last two years. Now the fundamentalists are bringing out regular processions against me demanding exemplary punishment. Attached two files with this letter will help you understand.

তিনি সেই ইমেইলের সাথে জুড়ে দেন মৌলবাদীদের আস্ফালনের কিছু ছবি –

ছবিঃ দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত মৌলবাদীদের আস্ফালনের ছবি (হুমায়ুন আজাদ নিজেই ছবিটি আমাদের কাছে পাঠিয়েছিলেন)।

আমরা সাথে সাথেই প্রতিবাদ করি। সরকারের কাছে আবেদন করি এই বহুমাত্রিক লেখকের নিরাপত্তা চেয়ে। ভেবেছিলাম সরকারের টনক নড়বে। কিন্তু ফলাফল হল ঠিক উলটো।

হঠাৎ করেই ঘনিয়ে এলো  সেই রক্তাক্ত দিনটি। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী। চাপাতির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হলেন হুমায়ুন আজাদ। আমরা সেইদিনই খবর পেলাম। ইন্টারনেটে রক্তাক্ত হুমায়ুন আজাদকে দেখে শিউরে উঠলাম —

ছবিঃ বাংলা একাডেমীর সামনে আক্রান্ত হুমায়ুন আজাদ (২০০৪)

তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে লিখলাম ‘হুমায়ুন আজাদ- আমরা তোমার পাশেই আছি‘ ।  অধ্যাপক অজয় রায় লিখেছিলেন কন্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে ।  ফতেমোল্লা লিখেছিলেন তোমার গল্প – ঘাতকাহত হুমায়ুন আজাদকে । ডঃ জাফর উল্লাহ লিখেছিলেন – Obscurantists hell bent on killing freethinkers in Bangladesh!আমাদের অন্যান্য সদস্যরাও সেসময় যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন তা রাখা আছে এখানে, এখানে এবং এখানে।  আমরা মুক্তমনা টিম থেকে একটি পিটিশন করেছিলাম এই শিরোনামে – Some societal reforms is what is urgently needed in Bangladeshআমরা সেখানে স্পষ্ট করে তৎকালীন খালেদা জিয়া সরকারকে কিছু ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তাব করেছিলাম –

1. Create congenial surroundings in Bangladesh so that people having diversified opinion can harmoniously exist side-by-side. Unfortunately, a group of religion traders is creating enough miasmas in Bangladesh to poison the proverbial air that we all breathe. No monolithic idea should dominate in a pluralistic society such as Bangladesh.

2. The judiciary and law-and-order enforcing department should be freed from politics. For a pluralistic society such as Bangladesh, the judiciary and allied departments should have a complete independence and free from executive branch. This separation is necessary. Please exercise your power and influence to make sure that Bangladesh’s judiciary and police are free from influence generated by the executive branch of the government.

3. Much is desired of Bangladesh’s antiquated primary and secondary education system. The future generations of Bangladesh who one day will rule Bangladesh should be groomed with a broad-based educational system that is so lacking in our motherland. The overhauling of the system is urgently needed. The archaic syllabus seriously lacks an upgrading. Students in their formative years should be exposed to more humanities subjects including anthropology, history of the world, European enlightenment movement in eighteenth and nineteenth centuries. Students graduating from our high schools have slightest ideas who are Hume, Mill, Marx, Emerson, Darwin, Russell, Aroj Ali Matubbar, Ahmed Shariff; never mind their creative works. For better or worse, the world we now live in is globalized. To live and compete in this environment one has to know the evolution of modern mercantile system and the underlying ideas that shaped everything from philosophy to modern biology. Unfortunately, Bangladesh’s educational system has failed miserably to truly educate our future generation. Instead of receiving a broad-based scientific, rational and liberal education, what the schools are teaching is a plethora of archaic subjects including the history of 6th century Middle East. The rest of the world is teaching their children modern science, history, philosophy; creating awareness of civil and human rights so that they can lead their life in an effective way to communicate knowledge. Bangladesh on the other hand is taking a retrogressive journey by promoting parochial schools. The sheer number of Madrassahs boggles one’s mind. Therefore, educational reform is what the nation needs very desperately.

4. Bangladesh is marred by fanaticism of a handful fringe groups and sectarian feuds have just started. These do not bode well for our impoverished motherland. We do not like to see Bangladesh treads the slippery slope religious intolerance as practiced by defunct Taliban regime of Afghanistan. By changing the course and curriculum of our primary and secondary schools and by saying no to religion traders we can help build a modern Bangladesh imbued with a modern spirit. Let science and rationalism be our guide. There is always a place for religion in our society but that should be a private matter. Freedom to practice religion should be an inalienable right of any individual but the state should maintain a healthy distance from it. Increasingly we see that religionists are making inroads into our public life and soon they will make demands that will infringe on civil rights that we esteem very much.

আমাদের পিটিশন শুধু ইন্টারনেটেই নয়, দেশ বিদেশের বিভিন্ন দৈনিকেও খুব গুরুত্ব দিয়ে প্রাকশ করা হয়েছিলো তখন। কিন্তু বাংলাদেশের অৎকালীন মৌলবাদের মদদপুষ্ট সরকার সেগুলোতে কান দিলেন না। তারা তখন ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ বাস্তবায়ন করতে ব্যস্ত। তারা প্রমাণ করতে চাইলেন হুমায়ুন আজাদের এই ঘটনার পেছনে মৌলবাদীদের কোন হাত নেই। সেক্যুলার লোকেরাই নাকি এই কান্ড ঘটিয়েছে। 

আর ওদিকে অধ্যাপক আজাদ জীবন বাঁচাতে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলেন।  দেশে চিকিৎসার পরে গেলেন বিদেশে। থাইল্যান্ডে চিকিৎসা করে দেশে ফিরলেন। আমরা ভেবেছিলাম যাক ফাঁরা তাইলে গেছে।  কিন্তু আমরা যে কত ভুল ছিলাম তা বুঝলাম কিছুদিনের মধ্যেই। ২৮ এ জুলাই অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের একটি হৃদয়স্পর্শী চিঠি প্রকাশিত হল দৈনিক সংবাদপত্রগুলোতে – প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী এবং দেশবাসীর কাছে খোলা চিঠি শিরোনামে। তিনি সে চিঠিতে প্রকাশ করেন কিভাবে তার পুরো পরিবারটিকে আতঙ্কগ্রস্থ করে রাখা হয়েছে। সেই চিঠি থেকেই আমরা জানলাম -২৪ এ জুলাই তার পুত্র অনন্যকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে, ২৫ এ জুলাই টেলিফোনে বোমার ভয় দেখানো হয়েছে। তিনি সে চিঠিতে বলেছেন – ‘আমার পরিবার ও আমি এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে আতঙ্কিত পরিবার ও ব্যক্তি, যাদের জীবন যে কোন সময় বিপন্ন হতে পারে।’ আমরা সে চিঠিটি মুক্তমনার পক্ষ থেকে ইংরেজীতে অনুবাদ করি, সেটি দেশে এবং বাইরে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ এক সময় সঞ্জীব দত্তের আঁকা তার একটি স্কেচ আমাকে পাঠিয়েছিলেন ইমেইলে। আমি ছবিটি আজ পাঠকদের সাথে শেয়ার করছি।

এ ছবিটি ছাড়াও কালো ব্যাকগ্রাউন্ডের উপর হুমায়ুন আজাদের প্রতিকৃতি হিসবে যে ছবিটি ইন্টারনেটে বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়, সেটিও আসলে আমাকেই তিনি প্রথম পাঠিয়েছিলেন ইমেইলে। আমি সেটি মুক্তমনায় প্রকাশের পর থেকেই বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পরে। মূল ছবিটি ছিলো এরকম –

আমাকে পাঠানো ডঃ হুমায়ুন আজাদের দুটো ছবি

ঠিক এ সময়ই প্রকৃত অবস্থা জানতে আমি অধ্যাপক আজাদকে ফোন করি – ৩০শে জুলাই ২০০৪ তারিখে । এই প্রথমবার তার সাথে কথা (কিন্তু তখন কি জানতাম সেটাই হবে শেষ কথাও?)।  মিনিট দশেকের কথোপকথোনে উঠে এসেছিল ধর্ম, রাজনীতি সমাজ নিয়ে নানা চালচিত্র। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম তিনি কোন অ্যাসাইলামের কথা ভাবছেন কিনা। সে রকম হলে আমরা মুক্তমনার পক্ষ থেকে চেষ্টা করে দেখতে পারি। অধ্যাপক আজাদ স্পষ্ট করে বললেন যে তিনি বাংলাদেশে থেকেই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান।  কোন ধরণের অ্যাসাইলামের কথা তিনি ভাবছেন না।  বললেন, রিসার্চের কাজে এক বছরের জন্য জার্মানী যাচ্ছেন। তারপর আবার ফিরবেন।  বললেন ‘জার্মানী গিয়ে তোমার সাথে যোগাযোগ করব ।’ কিন্তু সে যাওয়াই তার শেষ যাওয়া হল।

আমাকে অনন্ত প্রহেলিকার মধ্যে রেখে হারিয়ে গেলেন হুমায়ুন আজাদ।  আমি ১৪ কিংবা ১৫ তারিখে তার মৃত্যুর খবর পাই। হতবিহবল অবস্থায় লিখলাম – এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়, তেমন যোগ্য সমাধি কই? মুক্তমনার অন্যান্য সদস্যদেরও একই হতবিহবল অবস্থা। সেই হতবিহবল অবস্থা এই ২০০৯ সালেও কাটেনি। কেবলই আমাকে তাড়া করে ফেরে তার টেলিফোনে বলা শেষ কথা ক’টি – ‘জার্মানী গিয়ে তোমার সাথে যোগাযোগ করব’ ।

আজ ২০০৯ সালের ১২ ই আগাস্ট।  কিন্তু অবস্থা কি খুব একটা পাল্টেছে? আজও তার মেয়ে মৌলি আজাদকে তার পিতা হুমায়ুন আজাদের হত্যা প্রচেষ্টাকারীদের দ্রুত বিচারের দাবি জানাতে হয় প্রেসক্লাবে সমাবেশ করে।

হুমাযূন আজাদের হত্যা প্রচেষ্টাকারীদের দ্রুত বিচারের দাবি

ঢাকা, ১১ আগস্ট : ড. হুমায়ূন আজাদের হত্যা প্রচেষ্টাকারীদের দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছেন ড. হুমায়ূন আজাদের মেয়ে মৌলি আজাদ। আগামীকাল বুধবার হুমায়ন আজাদের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী এ উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১ টায় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি জানান। আগামী প্রকাশানার উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মৌলি আজাদ। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের জানান, ড. হুমায়ন আজাদের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে ড. হুমায়ন আজাদ কবিতা পুরস্কার-এর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আগামী ২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর প্রগতিশীল বাঙ্গালী তরুণ কবিদেরকে ড. হুমায়ন আজাদ কবিতা পুরস্কারে ভূষিত করা হবে। সম্মেলনে স্মিতা আজাদ, অনন্য আজাদ এবং আগামী প্রকাশনীর প্রকাশক ওসমান গণি উপস্থিত ছিলেন।

 আমরা কি সত্যই এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?

অভিজিৎ রায়।

আগাস্ট ১৬, ২০০৯