ছাত্রসমাজের প্রতি: জগদীশচন্দ্র বসু

By |2009-08-08T00:07:47+00:00আগস্ট 8, 2009|Categories: বই, বিজ্ঞান, শিক্ষা|0 Comments

ভূমিকা: আমাদের কাছে জগদীশচন্দ্র বসুর মূল পরিচয় একজন বিজ্ঞানী হিসেবে; যিনি প্রথম প্রমাণ করেছেন প্রাণীর মতো উদ্ভিদেরও সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা আছে। এছাড়া বেতার যন্ত্রের মূল আবিষ্কারক হিসেবে অনেকেই তাঁর নাম উচ্চারণ করেন যদিও যোগাযোগ প্রযুক্তি ও পাশ্চাত্যে থাকার সুবিধা কারণে এর আবিষ্কারক হিসেবে বিজ্ঞানী মার্কনির নাম এখন সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এগুলোর পাশাপাশি বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রের আরেকটি পরিচয় ছিলো- তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক। প্রথাগত অর্থে হয়তো তাঁকে শিক্ষাবিদ বলা যাবে না, কিন্তু শিক্ষা নিয়ে তিনি যে সমস্ত কাজ করেছিলেন, যেভাবে চিন্তা করেছিলেন, তাতে শিক্ষাচিন্তক হিসেবে তাঁর নাম সামনের কাতারে থাকবে। শিক্ষার আদর্শ ও বিভিন্ন দিক নিয়ে সে সময়ে তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রচুর বক্তৃতা দিয়েছিলেন।

তাঁর এই বক্তৃতাগুলো পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জায়গায় ছাড়াছাড়াভাবে গ্রন্থিত হলেও এক মলাটে সবগুলো বক্তৃতা পাওয়া যায় না। অনেকের ধারণা- তাঁর বেশকিছু বক্তৃতা হারিয়ে গেছে এবং অনেক বক্তৃতা এখন দুর্লভ। শিক্ষা বিষয় নিয়ে কাজ করার সুবাদে তাঁর বক্তৃতার অনেকগুলো পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, তবে এই বক্তৃতাটি আগে আমার চোখে পড়ে নি।

আকষ্মিকভাবে ব্ক্তৃতাটির একটি ফটোকপি আমি পাই নীলক্ষেতের এক ফটোকপির দোকানে, আরও অন্যান্য কাগজের সাথে ধুলায় লুটাচ্ছিলো। অক্ষরের টাইপ দেখে মনে হচ্ছে এটি সম্ভবত বাংলা একাডেমী থেকে বের হওয়া কোনো বইয়ের অংশ ছিলো। পরবর্তী সময়ে বাংলা একাডেমীতে গিয়ে নিজে খুঁজে এবং একাডেমীর বিক্রয়কেন্দ্রের দায়িত্বরত কর্মীদের সাহায্য নিয়েও মূল বইটির হদিস করতে পারি নি, কারণ ফটোকপিতে উপরে-নিচে শুধু পৃষ্ঠা নম্বর ছাড়া আর কিছুই লেখা ছিলো না। সচলায়তনে লেখাটি প্রকাশের পর শিক্ষানবিস জানালেন- বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত অব্যক্ত গ্রন্থে বক্তৃতাটি রয়েছে। তবে কলকাতার দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত অব্যক্ত গ্রন্থে আবার এ বক্তৃতাটি নেই। মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছি, প্রথমদিককার কোনো সংস্করণেই অব্যক্ত গ্রন্থে এই বক্তৃতাটি রাখা হয় নি। যা হোক, বক্তৃতার পুরোটাই ফটোকপি থেকে কম্পোজ করে ওয়েবে সংরক্ষণের জন্য এবং এ কালের পাঠকদের জন্য এখানে দিয়ে দিলাম।

আমি নিশ্চিত নই, তবে বক্তৃতার ধরন এবং আমার আগে পড়া জগদীশচন্দ্রের বক্তৃতাগুলোর কথা স্মরণ করে ধারণা হচ্ছে- এটি সম্ভবত সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের অন্তর্গত শিক্ষার্থীদের সভায় পাঠ করা বা বলা হয়ে থাকবে।

ছাত্রসমাজের প্রতি: জগদীশচন্দ্র বসু

ছাত্রসমাজের সভ্যগণ,

তোমাদের সাদর সম্ভাষণে আমি আপনাকে অনুগৃহীত মনে করিতেছি। তোমরা আমাকে একান্ত বিজ্ঞ এবং প্রবীণ মনে করিতেছ। বাস্তব পক্ষে যদিও জরা আমার বাহিরের অবয়বকে আক্রমণ করিয়াছে কিন্তু তাহার প্রভাব অন্তরে প্রবেশ করিতে পারে নাই। আমি এখনও তোমাদের মত ছাত্র ও শিক্ষার্থী। এখনও স্কুলে যাইবার পুরাতন গলিতে পৌঁছিলে স্মৃতিদ্বারা অভিভূত হই। তবে তোমাদের অপেক্ষা শিক্ষার জন্য দীর্ঘতর সময় পাইয়াছি; অনেক ভুল সংশোধন করিতে পারিয়াছি এবং অনেক বার পথ হারাইয়া পরিশেষে গন্তব্য পথের সন্ধান পাইয়াছি। আজ যদি কোন ভুলচুক কিম্বা দুর্বলতার বিরুদ্ধে তীব্রভাষা ব্যবহার করি তবে মনে রাখিও যে সে সব কষাঘাত হইতে নিজেকে কোনদিন বঞ্চিত করি নাই। কুসুমশয্যায় সুপ্ত থাকিবার সময় অতীত হইয়াছে; কণ্টকশয্যাই আমাদিগকে এখন জাগরিত রাখিবে।

এখন আমাদের দেশে সচরাচর দুই শ্রেণীর উপদেষ্টা দেখিতে পাওয়া যায়। কেহ কেহ আমাদের জাতীয় দুর্বলতার চিত্র অতি ভীষণ রূপে চিত্রিত করেন। যে দেশে এরূপ জাতিভেদ ও দলাদলি, যে দেশ দাসত্বসুলভ বহু দোষে দোষী, যে দেশে পরস্পরে এত হিংসা ও পরশ্রীকাতরতা দেখা যায়, সে দেশে কি কোনদিন উন্নতি হইতে পারে? আশ্চর্যের বিষয় এই যে এইরূপ ভয়ানক ভবিষ্যদ্‌বাণীর পর তাহাদের নিদ্রার কোন ব্যাঘাত হয় না। যদি যথার্থই বুঝিয়া থাক যে দেশে এরূপ দুর্দিন আসিয়াছে তবে কন বদ্ধপরিকর হইয়া তাহার প্রতিবিধান করিতে চেষ্টা কর না। আমি দেখিতে পাই ছাত্রদের মধ্যে, আমাদের নেতারা কেন এ কাজ করিলেন, কেন এ কাজ করিলেন না, এরূপ বচসা দ্বারাই সময় অতিবাহিত হয়। পরের কর্তব্য কি তাহা নিষ্পত্তি করিবার আমি কে? আমি কি করিতে পারি ইহাই কেবল আমার ভাবিবার বিষয়।

আবার অন্যদিকে এক দল আছেন যাহারা অতীত কালের কথা লইয়া বর্তমান ভুলিয়া থাকেন। ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞানে আমাদের পূর্বপুরুষের কিছুই অবিদিত ছিল না।’ আমাদের পূর্ব ঐশ্বর্য যদি এতই মহান তবে আমাদের অধঃপতনের হেতু কি? ইহার প্রতিবিধান কি নাই? আমরা যদি সেই মহান পূর্বপুরুষের প্রকৃত বংশধর হই তাহা হইলে আমরা নিঃসন্দেহে পূর্বগৌরব অধিকার করিতে পারিবই পারিব।

পৃথিবীব্যাপী ভ্রমণ উপলক্ষে আমি দ্বিবিধ জাতীয় চরিত্র লক্ষ্য করিয়াছি। একজাতীয় চরিত্র এই যে, তাঁহারা গতকালের স্মৃতি লইয়া বৃথাগর্বে ভুলিয়া আছেন। পৃথিবী যে স্থাবর নয়, ইহা যে চিরপরিবর্তনশীল এ কথা তাহাদের বোধগম্য হয় না। এইসব -ধর্মাক্রান্ত জাতির চিহ্ন পর্যন্ত পৃথিবী হইতে মুছিয়া যাইতেছে। ইজিপ্ট আসীরিয় এবং বাবিলন- ইহাদের গত স্মৃতি ছাড়া আর কি আছে?

চীনদেশে ভ্রমণকালে সে স্থানের বিখ্যাত কয়েকজন পণ্ডিতের সহিত আমার পরিচয় হয়। তখন জাপান মাঞ্চুরিয়া গ্রাস ব্যাপারে প্রবৃত্ত ছিল। আমি আমার চীনা বন্ধুদিগকে জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনারা কী করিয়া চীনের স্বাধীনতা রক্ষা করিবেন? তখন তাঁহারা বলিলেন, চীনদেশের মত যে দেশ বহু প্রাচীন কাল হইতে সভ্যতার শীর্ষস্থান অধিকার করিয়া রহিয়াছে, সে দেশকে কি সেদিনের জাপান পরাভূত করিতে পারে! বরঞ্চ আমাদের সভ্যতাই জাপানকে পরাস্ত করিবে। এইসব কথা শুনিয়া বুঝিতে পারিলাম যে শীঘ্রই চীনের সৌভাগ্যসূর্য অস্তমিত হইবে।

অন্যদিকে তাঁহাদের প্রতিদ্বন্দ্বী জাপান পুরাতন কথা বলিয়া সময় অপচয় করিতে চাহেন না। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ লইয়া তাঁহারা যথেষ্ট ব্যস্ত। তাঁহাদের নিকট শুনিলাম যে মানবসমাজের নিয়ম আর law of hydrostatic pressure একই। যে স্থানে pressure বেশি সে স্থান হইতে জলস্রোত অল্প pressure-এর দিকে ধাবিত হয়। জীবন স্রোতও সজীব হইতে নির্জীবের দিকে। পৃথিবীতে সজীব নির্জীবের স্থান অধিকার করিবে।

অথচ সেই জাপানে অনুসন্ধান করিয়া জানিতে পারিলাম যে বিদ্যা ও বুদ্ধিতে ভারতবর্ষীয় ছাত্র সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে জাপানীদেরও উপরে উচ্চস্থান অধিকার করিয়াছে। বিদ্যাবুদ্ধির ত্রুটি নাই, তবে এরূপ দুর্দশা কেন।

আমি আজ ত্রিশ বৎসর যাবৎ শিক্ষকতার কাজ করিতেছি। ইহার মধ্যে ন্যূনকল্পে দশ হাজার ছাত্রের সহিত আমার পরিচয় হইয়াছে। তাহাদের চরিত্র কি কি গুণ তাহা জানি আর কি কি দুর্বলতা তাহাও উপলব্ধি করিতে পারিয়াছি। প্রধানতঃ, তাহাদের স্বভাব অতি কোমল, সাধারণতঃ তাহারা নম্রপ্রকৃতি, অতি সহজেই তাহাদের হৃদয় অধিকার করা যায়; এক কথায় তাহারা বড় ভালমানুষ, একবার পথ দেখাইয়া দিলে অনেকেই সেই পথ অনুসরণ করিতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ জলপ্লাবন, ম্যালেরিয়া ইত্যাদি দুর্ঘটনার সময় ছাত্রদের মধ্যে অদ্ভুত কার্যপরায়ণতা দেখা গিয়াছে। এতগুলি ছেলে কি সুন্দররূপে নিজেকে organise করিয়াছে। বেশি কথা না বলিয়া অতি সংযতভাবে কি সুন্দররূপে লোকসেবা করিয়াছে। এরূপ শুশ্রুষা করিবার ক্ষমতা, এরূপ ধৈর্য, এরূপ কষ্টসহিষ্ণুতা, এরূপ অসন্তুষ্টির অভাব সচরাচর দেখা যায় না। আমি যেসব গুণ বর্ণনা করিলাম তাহা পুরুষে প্রায় দেখা যায় না, সচরাচর নারীজাতিই এসব মহৎ গুণের অধিকারিণী।

ইহার বিপরীত কেন্দ্রে কোন কোন পুরুষ দেখিতে পাওয়া যায় যাদের চরিত্র সম্পূর্ণ বিভিন্ন প্রকার। তাঁহাদের ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা একেবারেই নাই, তাঁহারা কিছুই মানিয়া লইতে চাহেন না, তাঁহারা সর্বদাই অসন্তুষ্ট, তাঁহাদের হৃদয় দুর্জয় ক্রোধে পূর্ণ। এইরূপ লোকের জাতীয় জীবনে স্থান কোথায়?

আমি এইরূপ প্রকৃতির একজনকে জানিতাম তিনি চিরস্মরণীয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। সমাজের নির্মম বিধানে তাঁহার ক্রোধ সর্বদা উদ্দীপ্ত থাকিত। আশ্চর্য এই যে ক্রোধ ও মমতা অনেক সময় একাধারেই দেখিতে পাওয়া যায়। বিদ্যাসাগরের ন্যায় কোমলহৃদয় আর কোথায় দেখিতে পাওয়া যায়? তিনি কোন বিধানই মানিয়া লইতেন না; অসীম শক্তিবলে তিনি একাই সমাজের কঠিন শৃঙ্খল ভগ্ন করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন।

এই প্রকার দুর্দান্ত ও ক্রোধপরায়ণ লোক কখন কখন জন্মগ্রহণ করিয়া থাকেন। তাহাদের জীবন নিষ্ফলতাতেই পর্যবসিত হয়, তাহাদের ধৈর্য নাই, তাহাদের সহিষ্ণুতা নাই। দেশব্যাপী রোগের সেবা ও পরিচর্যা? পীড়ারও অন্ত নাই, শুশ্রুষারও অন্ত নাই, এরূপ কতকাল চলিবে? ইহার কি প্রতিবিধান নাই? কি করিয়া ম্যালেরিয়া দেশ হইতে দূর করা যায়? এরূপ জঙ্গল ও ডোবার মধ্যে মানুষ কি করিয়া বাঁচিতে পারে? ইহার প্রতিকার নিশ্চয়ই আছে।

তাছাড়া আরও শত শত কার্য আছে, সাধারণের মধ্যে শিক্ষা প্রচার, জ্ঞান প্রচার, শিল্প ও বিজ্ঞানের উন্নতি, দেশে বিদেশে ভারতের মহিমা বৃদ্ধি করা। দুর্বল ভালমানুষের দ্বারা এসব হইবে না, এইসবের জন্য বিক্রমশীল পুরুষের আবশ্যক, তাহাদের পূর্ণ শক্তির আঘাতে সব বাধাবিঘ্ন শূন্যে মিশিয়া যাইবে।

আর যে শান্তির ক্রোড়ে আমরা এতদিন নিশ্চেষ্ট ও সুপ্তভাবে জীবন যাপন করিয়াছি, জগৎ হইতে সেই শান্তি অপসৃত হইয়াছে। শান্তি কোন জাতির পৈতৃক অথবা চিরসম্পত্তি নহে; বল দ্বারা, শক্তি দ্বারা, জীবন দ্বারা শান্তি আহরণ করিতে এবং রক্ষা করিতে হয়। বলযুক্ত হও, শক্তিমান্‌ হও এবং তোমাদের শক্তি দেশের সেবায় এবং দুর্বলের সেবায় নিয়োজিত হউক।

About the Author:

অনিশ্চয়তার মধ্যে আমার বসবাস। পৃথিবীর কোনো কিছু সম্পর্কেই আমি নিশ্চিত নই। এমনকি যা লিখি, যা পড়ি, যা বলি, সেগুলো সম্পর্কেও নয়। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে মোহ আছে, তবে সমাজের তান্ত্রিকদের কাছ থেকে দূরে থাকতে চাই। আমার লেখার সব লাইসেন্স ক্রিয়েটিভ কমন্সের by-nc-nd-এর আওতায় রক্ষিত। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চাইলে অবশ্যই আমার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে হবে।

মন্তব্য করুন