বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন -২

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন -২

-ম. আখতারুজ্জামান


পুর্ববর্তী পর্বের পর …

আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রদানকারী মাদ্রাসা, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান কেন আশাপ্রদ নয়, তার কারণগুলো বিশ্লেষণ না করে মানোন্নয়ন প্রচেষ্টা নির্ঘাত ব্যর্থ হবে। কোন একটি প্রবন্ধে বা সেমিনারে তা পুরোপুরি বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। তাই এখানে খুব সংক্ষেপে কিছু বিষয় উল্লেখ করছি।

মাদ্রাসা

আলোচনার শুরুতেই মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে দুটো তথ্য দিতে চাই। প্রথমত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে এর বৃদ্ধি হচ্ছে সর্বোচ্চ। ১৯৭৪ সালে ১৯৭৪টি মাদ্রাসা ছিল। ২০০৩ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৩০,০৪টিতে (বার্ষিক বৃদ্ধি হার ২৯%)। দ্বিতীয়ত, ২০০২-০৩ সালে ছাত্রপ্রতি বাৎসরিক ব্যয় ছিল সরকারী বিদ্যালয়ের (টাকা ৪৫৫১)। তুলনায় মাদ্রাসায় ব্যয় ছিল বেশী (টাকা ৫০৮৪)। বেসরকারী মাদ্রাসার বৃদ্ধি হয়েছে আরো অনেক বেশি।

মাওলানা হোসেন আলী (২০০১) বাঙালী মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সন্ধানে পুস্তকে এবং মুফতি এনায়েতুল্লাহকে নিয়ে আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষা সম্পর্কে দৈনিক সমকালে ২০০৬ সালের এপ্রিল থেকে বেশ কয়েক মাস যাবত প্রতি সপ্তাহে এক দিন বেশ কিছু প্রবন্ধ, আলোচনা, সাক্ষাৎকার, মতামত প্রভৃতি প্রকাশ করেন। এসব লেখায় আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষার হালচাল বেশ ভালভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁদের মতে, মোল্লা নিজামুদ্দিন (জন্ম ১৬৭৭-৭৮, মৃত্যু ১৭৪৮ খ্রি.) দরসে নিজামী তথা কওমী মাদ্রসা-র শিক্ষা পদ্ধতির প্রতিষ্ঠাতা। সামান্য পরিবর্তনসহ এ পদ্ধতির সিলেবাসই কওমী মাদ্রাসায় চালু আছে। আড়াই শ’ বছরের বেশি সময় ধরে এ শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠ্যসূচি অনুসরণ করা হচ্ছে। শিক্ষার মাধ্যম উর্দু, আরবী, ফার্সি। কামিল মাদ্রাসা-র দশা একই – আজ থেকে শত শত বছর আগের ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যেসব গ্রন্থ অধ্যয়ন করে শিক্ষাঙ্গন থেকে বের হতেন আজকেও তা করতে হয়। সব চেয়ে মারাত্মক কথা হলো  (দৈনিক সমকাল থেকে উদ্ধৃত -) : ‘কামিল শ্রেণী পর্যন্ত মাদ্রাসা শিক্ষা মুর্খ-সর্বস্ব এবং প্রায়ই নকল নির্ভর’ (সমকাল ২১-৬-০৬)। ময়না পাখির মতো বুলি কপচানোর মধ্যে এ শিক্ষা অনেকখানি সীমাবদ্ধ। ভারত ও পাকস্তানেও পরিস্থিতি প্রায় একই রকম (1. Amir U. Khan et al. Madrassah in India Pakistan : Past, Present and Future, 2. Salim S. Ali. 2005. Madrassah in Pakistan. 6. Salim S. Ali. 2006. Curriculum in Darse-Nizami )।

অতি সংক্ষিপ্ত এ আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, বিগত আড়াই শত বছরে বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে বিশাল অগ্রগতি হয়েছে, তা থেকে আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত। এক সময় ছিল যখন খৃষ্টান চার্চ দ্বারা পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও আমাদের মাদ্রাসার মত রক্ষনশীল ছিল। এখন সারা বিশ্বে পাদ্রীদের পরিচালিত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হয়। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেও এ কথাটি আমি বলতে পারি। আমি বিশ্বের সেরা ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকার নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেছি। সেখানে প্রতি তত্বীয় ক্লাশের শুরুতে, শুধু খ্রিস্টানরা, ১২টি শব্দের একটি ছোট প্রার্থনা বাক্য উচ্চারণ করত। বাকী সব পঠন-পাঠন, সব কিছু ছিল পুরোপুরি সেক্যুলার। এতদিনে আরো উন্নতি হযেছে। এখন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েরাও পড়তে পারে। প্রোটেস্টান্ট কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তো বটেই, নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সকল ক্যাথলিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিবর্তনবিদ্যা, মানব বিবর্তন পড়ানো হয়। নটডেমে এ বিষয়ে অনেক উঁচু মানের গবেষণাও করা হয়।

অতীতে মাদ্রাসাগুলো ছিল সেক্যুলার এবং এখনও অনেক দেশে তা আছে। আমাদের মাদ্রাসাগুলো যতদিন সেক্যুলার ও কো-এডুকেশনাল না হবে, যতদিন আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা না করা হবে, ততদিন এগুলো মানসম্মত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে না। অবশ্য ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার যথেষ্ট সুযোগ রেখেই আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান অর্থাৎ সেক্যুলার বিষয়গুলো মাদ্রাসাতে গ্রহন করতে হবে। তা না হলে মাদ্রাসাগামী দেশের মূলতঃ গরীব মানুষের সন্তানেরা আধুনিক শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়

আমাদের দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিছু সংখ্যক ধনী বা সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় বলতে যা বুঝায় এগুলোকে তা বলা চলে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। কারণ এগুলোতে অতি সীমিত সংখ্যক বিষয় পড়ানো হয়। দুই একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এগুলো একটু বড়সড় কোচিং সেন্টার। এগুরার মল লক্ষ্য মুনাফা। অথচ দুনিয়ার সবদেশে বিশ্ববিদ্যালয়কে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনেও তা লেখা থাকে। কিন্তু আমাদের দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আইনে তা লেখা নেই। এর সুযোগ নিয়েছে এসব বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু মুনাফা করা নয়, সার্টিফিকেট বিক্রির অভিযোগও উঠেছে কোন কোনটির বিরুদ্ধে।


২০০৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে ৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি’ গঠন করা হয়। তখন ক্ষমতায় বিএনপি-এর নেতৃত্বে চার দলীয় জোট। এ জোট সরকারই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গগনচুম্বি বৃদ্ধির জন্য দায়ী। আর উল্লিখিত পুরো কমিটি ছিল এ জোটের আস্থাভাজন লোকদের নিয়ে গঠিত। এ কমিটি যে রিপোর্ট দিয়েছে, তা থেকেও আমাদের উক্ত পর্যবেক্ষণ সমর্থিত হয়। নিম্নে এ প্রতিবেদন থেকে কিছু উদ্ধৃতি দিচ্ছি :

১. … অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই কমিশনের অনুমোদন ব্যাতিরেকে নতুন কোর্স, বিভাগ, এমনকি অনুষদও চালু করেছে’। (পৃ ৪)।

২. ‘এমনকি, কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি নিয়ে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অনৈতিকভাবে এইচএসসি পরক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য প্রচারণা চালাচ্ছে’ (ঐ)।

৩. ‘প্রায় সব বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ভাড়া-করা বাড়ি/ভবনে বা বাণিজ্যিক ভবনের ২/১টি ফ্লোরে স্থাপিত… ফলে ছাত্রছাত্রীদের ক্লাশ করা কঠিন। (ঐ)।

৪. ‘ …ফলে বিজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষার্থীরা যথাযথ ব্যবহারিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’ (পৃ ৫)।

৫. ‘উল্লেখ্য যে, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়-ব্যয় হিসাব ঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয় না।’ (ঐ)।

৬. মানসম্মত শিক্ষার অভাব : বিশ্ববিদ্যালয় অবাধ, মুক্তবৃদ্ধি এবং নিরপেক্ষ জ্ঞান চর্চার কেন্দ্রস্থল। কিন্তু দুঃখের বিষয় দেশের উচ্চ শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সংকটময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে। …নিয়ম অনুযায়ী পর্যাপ্ত সংখ্যক যোগ্য ও অভিজ্ঞ পর্ণকালীন ও খন্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ না করে অধিক সংখ্যক সবে মাত্র পাশ করা জুনিয়র শিক্ষক নিয়োগ করে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে’ । (পৃ ৯)।

৭. ‘ছাত্র বেতন/টিউশন ফি প্রতি ক্রেডিট সর্বনিু ২০০ থেকে সর্বোচ্চ ৭৫০০/-টাকা পর্যন্ত আছে। দেশের আর্থ-সামাজিক আবস্থার নিরিখে ছাত্রবেতন/টিউশন ফি নির্ধারণ করা উচিত’ (পৃ ৬)। উল্লেখ্য, নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০০ সালে এমবিএ ও বিবিএ ডিগ্রি করতে একজন ছাত্রের লেগেছে যথাক্রমে টাকা ৩,১২,০০০ (প্রতি ক্রেডিট ৫০০০ টাকা, মোট ৬০ ক্রেডিট) ও টা. ৪,৫৮,৮৭৬ (প্রতি ক্রেডিট ৩,৫৭৫, মোট ১২০ ক্রেডিট (Mahmudul Alam et al. 2007. Private Higher Education in Bangladesh)।

৮. ‘যে শিক্ষক দ্বারা পাঠদান করা হয় সেই শিক্ষকই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেন এবং উত্তরপত্রের মল্যায়ন করে থাকেন’ (পৃ ১০)।

৯. ‘অসচ্ছ পরীক্ষা পদ্ধতি: অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত সিলেবাসের সম্পর্ণ অংশ শেষ না করে পরীক্ষা নিচ্ছে। কোন কোন বিশবিদ্যালয় পূর্ণকালীন শিক্ষকের পরিবর্তে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ করে নির্ধারিত ক্রেডিটের স্থলে ক্রেডিট আওয়ার কমিয়ে নামমাত্র পরীক্ষা নিয়ে কোর্স শেষ করছে। ছাত্র-ছাত্রীর ভর্তি ও পরীক্ষার গ্রেডিং প্রদানে স্বচ্ছতা নেই। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিক নম্বর দিচ্ছে বলে পাবলিক ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফলে বৈষম্য দেখা যাচ্ছে, ফলে নানা জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান আহরণ ও জ্ঞানের উন্মেষ সাধন ব্যহত হচ্ছে। ‘ (পৃ ১১)

১০.’ অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যোক্তারাই প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁরা নিজেদের আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে সবকিছু সীমাবদ্ধ রেখে অনেক জটিলতার সৃষ্টি করেছেন।’ (পৃ ১২)

১১. ‘বিশ্ববিদ্যালয় অলাভজনক প্রতিষ্ঠান (non-profit organization)। কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তাগণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত অর্থ উন্নয়নমলক কাজে না ব্যয় করে তাঁরা ব্যক্তিস্বার্থে তা ব্যবহার করছেন। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরাসরি কোন পারিশ্রমিক না নিলেও পরোক্ষভাবে প্রতি মিটিং-এ ৫০০০ থেকে ১০০০০ টাকা পর্যন্ত সিটিং এলাউন্স বাবদ নিয়ে থাকেন। এমনও তথ্য পাওয়া গেছে যে, সপ্তাহে ৩/৪টি ঐ ধরনের মিটিং করেন। কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যোক্তাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থে ব্যয়বহুল যানবাহন কিনে ব্যবহার করা এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট নয় এমন কাজে অপ্রয়োজনে অর্থ ব্যয় করার অভিযোগও পাওয়া গেছে।…নিয়ম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়-ব্যয় হিসাব ঠিকভাবে সংরক্ষন করা হয় না। ফলে আর্থিক অনিয়ম প্রকটভাবে বিদ্যমান।’ (পৃ ১৩)

বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব অনিয়ম দর করার জন্য সরকার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে একটি নতুন আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। এ আইনটি যত দ্রুত সম্ভব পার্লামেন্টে পাশ করে বাস্তবায়ন করা দরকার।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় ৬৮১.০৪ কোটি টাকার একটি পঞ্চবার্ষিক (২০০৯-২০১৩) উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে এত কিছু জানা সত্ত্বেও কি কারণে মঞ্জুরি কমিশন ও সরকার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে এ প্রকল্পের আওতায় সাহায্য পাবার উপযোগী মনে করেছে, তা আমাদের জানা নেই। মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর নজরুল ইসলাম ১৪ মে, ২০০৯ তারিখে ঢাকার একটি হোটেলে প্রকল্পটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অবশ্য বলেছেন যে কিছু সর্ত পরণ না করতে পারলে এ সাহায্য প্রাইভেট বিশ্বদ্যিালয় পাবে না। তাঁর মতে, এ কারণে দুই একটির বেশি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় হয়ত এ সাহায্য পাবে না। কিন্তু আমাদের কথা হলো নীতিগত। যত দিন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ব্যক্তি মুনাফার উৎস ও উপকরণ হয়ে থাকবে, তত দিন এরূপ সরকারী সাহায্য পেতে পারে কিনা। কারণ, বিশ্ব ব্যাংকের এ টাকা অনুদান নয়, তথাকথিত ‘সাহায্য’। এ টাকা দেশের মানুষকেই পরিশোধ করতে হবে। আর যাদের টাকায় এ ঋণ পরিশোধ করা হবে, সে জনগণের অধিকাংশ হল গরীব মানুষ, যাদের সন্তানেরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার সুযোগ পাবে না। অথচ তারাই ঋণের সিংহ ভাগ পরিশোধ করবে। সুতরাং, আমাদের প্রস্তাব, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে এ প্রকল্পের আওতায় না রাখা।

 

 

(ক্রমশ: )

—————————————

প্রফেসর ড. ম. আখতারুজ্জামান,
সভাপতি, বাংলাদেশ কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস) এবং বিশ্ব শিক্ষক ফেডারেশন (
FISE-WFTU).

বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও লেখক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক।

মন্তব্যসমূহ

  1. আগন্তুক অক্টোবর 29, 2009 at 12:39 পূর্বাহ্ন - Reply

    রীতিমত অধীর আগ্রহে স্যারের লেখাটার ২য় পর্বের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।উচ্চ শিক্ষার অবস্থা তো রীতিমত ভয়াবহ।আমি বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি মেডিকেল কলেজে পড়ি।গাইনেকোলজির হেড ম্যাডাম এলেন।স্লাইডটা ভর ভর করে রিডিং পড়ে গেলেন।মাঝে পরীক্ষায় কি আসবে তা নিয়ে দু চারটে কথা বলে খেল খতম।শিক্ষার্থীদের সাথে কোন রকমের মত বিনিময় নেই।তাঁর একমাত্র যোগাযোগ স্লাইডটির সাথে।বুঝি না এই দ্রূতপঠন শোনার জন্য ক্লাসে যাওয়ার কি দরকার!ওটা তো যে কেউ পারবে।শিক্ষক নিয়োগ অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার।হয়তো ম্যাডাম ডাক্তার হিসেবে ভাল,কিন্তু শিক্ষক হিসেবে অধ্যাপক কেন,প্রভাষক হওয়ার যোগ্যতাও তাঁর নেই!প্রত্যেকটি বিষয়ে শিক্ষকদের সুনির্দিষ্ট যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া উচিত।আমি শুনেছি দেশের অধিকাংশ নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই একই হাল।তবে অনেক অসাধারণ শিক্ষকের ক্লাস করবার সৌভাগ্যও হয়েছে।কিন্তু তাদের সংখ্যা প্রায় উপেক্ষনীয়।প্রচুর ঝামেলা…আমাদের স্বেচ্ছাবসরগ্রহণকারী অধ্যক্ষ ফজলুর রহমান স্যার চরম বদ ও দালাল প্রকৃতির লোক ছিলেন।কিন্তু ভালো পড়াতেন।

    শিক্ষক নিয়োগ আমার মতে কঠিনতম একটি কাজ।স্যারের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা এ বিষয়ে আলোকপাত করার জন্যে।

    • আদিল মাহমুদ অক্টোবর 29, 2009 at 12:59 পূর্বাহ্ন - Reply

      @আগন্তুক,

      আমার মনে হয় আমাদের দেশে ভাল শিক্ষকের অভাবের মূল একটি কারন খুব গোড়ায় যেটা বিদেশে এসে বুঝেছি। তাহল, আমাদের দেশের মানুষের এক্সপ্রেশন পাওয়ার খুব দূর্বল। বিদেশে খুব ছোট বয়স থেকে বাচ্চাদের ক্লাসে সবার সামনে দাড়িয়ে কথা বলার শিক্ষা দেওয়া হয়। যেই কালচার আমাদের দেশে পুরোপুরি অনুপস্তিত। এতে ওদের গুছিয়ে কথা বলার অভ্যাস খুব ছোট বয়স থেকে ডেভেলপ করে।

      শুধু তাই না, বিদেশের শিশুদের টপিকগূলোও থাকে বেশীরভাগই ক্রিয়েটিভ। ছড়া, নামতা বা গরুর রচণা বলার মত নয়।

      যেমন, হয়ত ৫ বছরের বাচ্চাদের সবাইকে একটা মিকি মাউসের পুতুল দিয়ে দেওয়া হল একরাত করে রাখার জন্য। তাকে পরদিন ক্লাসে সবার সামনে এসে বলতে হবে সে এই পুতুল সম্পর্কে কি কি ভাবে।

      এছাড়াও আমাদের দেশে বেসরকারী জানি না, তবে সরকারী কোন বিদ্যালয়ে মনে হয় ছাত্রদের দ্বারা শিক্ষকের গ্রেডিং করার ব্যাবস্থা নেই। যে শিক্ষক জানেন যে তিনি যেমনই পড়ান না কেন তাতে তার চাকরী বা বেতনের কিছু আসবে যাবে না তখন তিনি আর কিসের গরজে মনোযোগি হবেন।

  2. কেশব অধিকারী আগস্ট 9, 2009 at 1:24 পূর্বাহ্ন - Reply

    শ্রদ্ধেয় জনাব আখতারুজ্জামান স্যার,

    ইদানীং ল্যবরেটরী এবং লেকচার তৈরীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় ইচ্ছে থাকা সত্যেও আলোচনায় অংশ নিতে পারছিনা নিয়মিত। তবে আপনার তথ্যবহুল লেখাটি আমার কাছে খুউবই আকর্ষনীয়। মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে যা বলেছেন,

    মোল্লা নিজামুদ্দিন (জন্ম ১৬৭৭-৭৮, মৃত্যু ১৭৪৮ খ্রি.) দরসে নিজামী তথা কওমী মাদ্রসা-র শিক্ষা পদ্ধতির প্রতিষ্ঠাতা। সামান্য পরিবর্তনসহ এ পদ্ধতির সিলেবাসই কওমী মাদ্রাসায় চালু আছে। আড়াই শ’ বছরের বেশি সময় ধরে এ শিক্ষাব্যবস্থা ও পাঠ্যসূচি অনুসরণ করা হচ্ছে। শিক্ষার মাধ্যম উর্দু, আরবী, ফার্সি। কামিল মাদ্রাসা-র দশা একই – আজ থেকে শত শত বছর আগের ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যেসব গ্রন্থ অধ্যয়ন করে শিক্ষাঙ্গন থেকে বের হতেন আজকেও তা করতে হয়।

    সেতো এক ভয়াবহ চিত্র! এ প্রকৃয়ায় যদি দিন দিন এ ধরনের শিক্ষার প্রসার বেড়েই চলে তাহলে তো ভযাবহ জ্ঞ্যান শূন্যতা এজাতিকে আর কোন দিন উঠে দাঁড়াতে দেবেনা! আমারতো মনে হচ্ছে হয় এই মাদ্রাসা শিক্ষাকে একেবারেই বাতিল করা দরকার নতুবা সাধারন শিক্ষার সঙ্গে একিভূত করে পূর্বতন মাদ্রাসার সিলেবাস হতে উপযুক্ত এবং প্রয়োজনীয় অংশ গুলোকে নিয়ে এক বা একাধিক কোর্স রচনা করা দরকার। তবে মাদ্রাসা শিক্ষার সিলেবাসে বিজ্ঞান, গনিত, ইতিহাস, সাহিত্য, ভূগোল এবং টেকনিক্যাল কোর্সের কিছু কিছু অন্তর্ভূক্ত করা উচিত। বিবর্তন সংক্রান্ত বিষয় গুলো সাধারন শিক্ষার সিলেবাসে অন্তর্ভূক্ত হলে সয়ংক্রীয় ভাবেই তা মাদ্রাসা শিক্ষার অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাবে।

    এদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে যা বলেছেন, তা নির্মম সত্য হলেও প্রকৃতপক্ষে এর থেকে বেড়িয়ে আসার পথ খোঁজা দরকার। আপনি বলেছেন,

    এগুরার মল লক্ষ্য মুনাফা। অথচ দুনিয়ার সবদেশে বিশ্ববিদ্যালয়কে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনেও তা লেখা থাকে। কিন্তু আমাদের দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আইনে তা লেখা নেই। এর সুযোগ নিয়েছে এসব বিশ্ববিদ্যালয়।

    আমার মনে হয় পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গুলো আলাদা নিয়মের অধীনে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ নেই। এতে নৈরাজ্য এবং বৈষম্য বাড়বে। তবে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে এক অকৃত্রিম এবং কঠোর নীতিমালার অধীনে আনা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রনালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন যৌথ ভাবে একটি সেল গঠন করে নিয়মিত এবিষয়ে খোজ খবর রাখতে পারেন। কারণ দেশের অসহনীয় শিক্ষা সংকটের কালে এসব ব্যাপারে সুনার্দ্দিষ্ট ভাবে এমন অভিন্ন নীতিমালা প্রয়োজন যেখানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গুলো দ্রুত উঠে দাঁড়াতে পারে অথচ যেকোন অনৈতিক এবং অব্যবস্থাপনা আস্তানা গেড়ে বসতে না পাড়ে।

    এমন আইন প্রনয়ন করা হউক যেনো,

    ‘এমনকি, কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি নিয়ে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অনৈতিকভাবে এইচএসসি পরক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য প্রচারণা চালাচ্ছে’ (ঐ)।

    এধরনের বা অভিযুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোকে উপরোক্ত আইন বলে চিরস্থায়ী ভাবে বন্ধ করে দেওযা যেতে পারে। তবে বিষয় টি ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। প্রথমতঃ এদের গড়ে উঠবার জন্যে পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া উচিৎ বলে আমি মনে করি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র হারিয়ে তা চলতে দেওয়া সমীচিন নয়।

    প্রত্যেকটি বিশ্ব বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের স্বছ্ছতা এবং ছাত্র-বেতন কাঠামো নির্ধারনের জন্যে একটি ফোরাম গঠন করা যেতে পারে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট এবং অভিভাবকবৃন্দের একটি প্যনেলের সমন্বয়ে। উন্নত বহুদেশে এমন পদ্ধতির প্রচলন রয়েছে।

    আপনার প্রতিবেদন থেকে উদ্ধৃতির আট এবং নয় নম্বর বক্তব্যের ব্যাপারে একটু বলতে চাই। একই শিক্ষকের পড়ানো এবং পরীক্ষা নেওয়াতে আমি দোষের কিছু দেখিনা। দোষ যদি থেকে থাকে তা শিক্ষক নিয়োগে ত্রুটি। এই ক্ষতটিকে সারানো গেলে আট নম্বর বিষয়টি সমস্যা হিসেবে বোধ করি দেখা দেবেনা। নয় নম্বর টির ক্ষেত্রে এবিষয়টি ভেবে দেখাযেতে পারে। প্রতিটি সেমেস্টারে একাডেমিক কমিটি সংশ্লিষ্ট সেমেস্টারের ভর্তিপরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে সংস্লিষ্ট সেমেস্টারে ঠিক কতো পারসেন্ট A, B C, D, E অথবা F দেবেন। এটি বাধ্যবাধকতায় এলেই নবম পয়েন্টে উল্লেখিত প্রবনতা সম্ভবতঃ হ্রাস পাবে। আর অর্ধ-পূর্ণকালীন শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় (বিশেষ করে প্রাইভেট) গুলোর উন্নয়নের সাথে সাথে কমে যাবে বলে আমার ধারনা।

    তবে ১০ এবং ১১ নম্বরের বিষয় দুটি গুরুত্বপূর্ন। প্রথমতঃ আমি মনে করি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা কোনক্রমেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনের অংশ হতে পারবেন না। তবে তিনি যদি যথেষ্ট মান সম্পন্ন হন, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের দ্বারা কোন পদে পদায়িত হন তবে উক্ত পদের বেতন ভাতা যৌক্তিক ভাবে তিনি গ্রহন করতেই পারেন। তবে আয় ব্যায়ের চূরান্ত নিকাশের পর উদভৃত্ত অর্থের কতো শতাংশ তিনি (প্রতিষ্ঠাতা ) পাবেন তা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন সদাসয় সরকারের শিক্ষামনত্রনালয়ের পরামর্শ ক্রমে প্রতি ২-বছরের জন্যে নির্ধারন করে নেয়া যেতে পারে।

    তবে দেশে উচ্চ শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে হলে কোন ভাবেই প্রাইভেট এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে আলাদা ফ্রেমে বাঁধা যাবেনা, বরং উচ্চতর গবেষনা, শিক্ষা এবং সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে একে অপরের সাথে মিশে গিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

    আপনার অতীব গুরুত্বপূর্ন প্রবন্ধটির জন্যে আবারও অশেষ ধন্যবাদ। পরবর্তি পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।

মন্তব্য করুন