মীর হোসেন মৌসাবী। আহমেদাঞ্জীর বিরুদ্ধে ৬৫ বছরের এই ভদ্রলোক এবার ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন। না ইরানের মোল্লাতন্ত্রকে শেষ করতে না-কট্ট্রর পন্থীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। তাকে ভোটে হারানো হল বা সত্যি সত্যিই তিনি হয়ত হেরেছেন-কিন্ত আহমেদাঞ্জির বিরুদ্ধে ফেটে পরেছে গোটা ইরান। মৌসাবী যেসব দাবীগুলি নিয়ে জনগণের কাছে গিয়েছেন, সেগুলি ইরানিয়ানদের মনের কথা-ফলে ইরানের অত্যাচারি মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রকৃত গণতন্ত্রের দাবিতে ফুঁসে উঠেছে ইরানের আপামর জনগণ।

মৌসাবীর দাবিতে কেন ফেটে পরেছে ইরান? কারনটা খুব সহজ। প্রথমটা তেলের দাম। তেলের দাম যদ্দিন খুব বেশী ছিল, ইরানের আর্থ-সামাজিক পরিকাঠামোর চালানো সমস্যা হয় নি আহমেদিঞ্জার। তেলের অর্থেই চাপা পরে যাচ্ছিল ইরানে শিক্ষিত যুবকদের ২৫% বেকার। ইনফ্লেশন সাংঘাতিক বেশী-সেটাও সমস্যা হয় নি-তেলের বর্ধিত অর্থেই শ্রমিকদের মাইনে বাড়িয়েছেন আহমেদাঞ্জি। কিন্ত তেলের দাম ক্রাশ করতেই সেই ম্যাজিক শেষ। ইরান প্রায় দুর্ভিক্ষের সামনে। তেলের বর্ধিত অর্থে অর্থনীতিকে না বাড়িয়ে মিলিটারী আর সমর সজ্জাকে বাড়িয়ে চলেছিলেন আহমেদাঞ্জি। আমেরিকার সাথে টেক্কা নিতে হবে। ভাল কথা। ওই টেক্কা নিতে গিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ানও উলটেছে। এবং সেই একই কারন। মানুষের খাদ্য, স্বাস্থ্য বাসস্থান এবং শিক্ষার দাবীগুলী না মিটিয়ে জঙ্গীপনা করতে গেলে, তা বেশীদিন টেকে না। অভুক্ত জনগনের গনবিপ্লবেই সেই ফ্যাসিস্ট জমানা ধ্বংশ হতে বাধ্য। এই কারনেই ধ্বংশ হয়ে গেছে যাবতীয় অত্যাচারী কমিনিউস্ট সরকার-এবার মোল্লাদের পালা।

মৌসাবীর দাবীগুলি ইরানের জনগনের অনেক দিনের দাবী-


(১) নর-নারী সমানাধিকার। শাহ পল্লবির আমলে ইরানের নারীরা ছেলেদের সমান অধিকার ভোগ করত। কিন্ত ১৯৮০ সাল থেকে তাদের অধিকার কমতে কমতে আজ এমন জায়গায় এসেছে, যেকোন পুরুষ তিন তালাকে বিনা খোরপোশে বৌ তাড়াতে পারে। শুধু তাই না-নিজের ছেলেমেয়েদের ওপর ইরানের মেয়েদের কোন অধিকার নেই। যেকোন পুরুষ তার বৌকে ছেলে মেয়ের কাছ থেকে যেকোন দিন তাড়াতে পারে-কোন খরপোশ ছারাই।

এইসব ড্রাকোনিয়ান শরিয়া আইনের বিরুদ্ধে ইরানের মেয়েরা রাস্তায় নেমেছে-কিন্ত ২০০৭ সালে ৬৪ জন নারীনেত্রীকে কারাগারে পাঠিয়ে মেয়েদেরকে আদিম পুরুষতন্ত্রের দাসী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আহমেদাঞ্জি। ফলে দেখা যাচ্ছে বর্তমান বিক্ষোভে, একদম প্রথম সারিতে আছে ইরানিয়ান মেয়েরা।

(২) অর্থনৈতিক সংস্কার-আগেই লিখলাম। তেলেরা দাম যদ্দিন বেশী ছিল-কেও ভাবে নি। তেলের দাম কমাতে সব থেকে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ ইরান-কারন আহমেদাঞ্জী সব কিছুই প্রায় জাতীয়করন করেছেন। অর্থাৎ ইরাণে প্রায় সবকিছুই পাবলিক কোম্পানী চালায়-সেটা এমনিতে খারাপ না। কিন্ত সব পাব্লিক কোম্পানীই লসে চলে। সেই লস পুরন হত তেলের টাকায়। এবার তেলের কোম্পানীগুলো লস করা শুরু করলে, তখন সমাজতন্ত্র কোথায় পালাবে? ফ্রি লাঞ্চত দীর্ঘদীন চলে না। এর ওপর সবার মাইনে বাড়িয়েছেন আহমেদাঞ্জি। কিন্ত টাকাটাত আসে তেলের লাভ থেকে। ফলে বর্তমানে ইরানে ভয়াবহ ইনফ্লেশন। বেকারত্ব।

(৩) নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের হাতে মিলিটারী এবং পুলিশঃ ইরানের গণতন্ত্র আজব বস্তু। এখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা পার্লামেন্টের হাতে মিলিটারী ক্ষমতা নেই। তা আছে মোল্লাদের নির্বাচিত অভিভাবক কাউন্সিলের হাতে। অর্থাৎ তারাই দন্ডমুন্ডের কর্তা।যেকোন মুহুর্তে ফেলে দিতে পারে নির্বাচিত সরকারকে। কারন মিলিটারী তাদের হাতে। অর্থাৎ দেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের এখানে মোল্লাদের পুতুল হয়ে কাজ করতে হয়। এই জন্যেই ইরানের গণতন্রকে বর্হিবিশ্ব ঠাট্টা করে মোল্লাতন্ত্র বলে।

(৪) দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই-খাটামি আহমেদিঞ্জার কাছে হেরেছিলেন এই ইস্যুতেই। খাটামি বিদেশীদের চোখে সংস্কারপন্থী বটে -কিন্ত ইরানীদের চোখে চোর। আহমেদিঞ্জা কাটমোল্লা হলেও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অসৎ না। কিন্ত সমাজতান্ত্রিক কোন রাজনৈতিক সিস্টেমকে সৎ রাখা অসম্ভব। ইরানেও তাই হয়েছে। আমি যদ্দুর জানি ওখানে সরকারি হাসপাতালে বেড পাওয়া থেকে শুরু করে-স্কুলে ভর্ত্তি-সর্বত্রই ঘুঁশ চালু আছে। ফলে আহমেদাঞ্জি নিজে দুর্নীতি বিরুদ্ধে লড়াই করে এলেও এই ইস্যুতে, এবার সবাই তার বিরুদ্ধে।

যাইহোক যেভাবে কমিনিউজম ভেঙে পড়েছিল-সেই ভাবেই আরেকটি সেমি ফ্যাসিস্ট সিস্টেম ইরানের মোল্লাতন্ত্রের ও পতন হবে। কারন হুবহু এক। মানুষের মৌলিক দাবী-খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, শক্তি-এসব নিশ্চিত না করতে পারলে, সব পলিটিক্যাল সিস্টেমই ব্যার্থ হবে। আর ঠিক এই কারনেই গণতন্ত্র এবং ধণতন্ত্র জিতে যায়। কারন যখনই কোন ফ্যাসিস্ট সিস্টেম মৌলিক দাবীগুলি পূরণ করার সমস্যায় ভোগে- অর্তাৎ ক্রাইসিস ফেস করে-তারা মানুষকে টুটি চেপে রেখে তাকে অভুক্ত রাখে। কিন্ত গণতন্ত্রে মানুষ ভোটবাক্সের মাধ্যমে, সিস্টেমকে তাও একটু হলেও শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

সেই কারনে ইরাণের গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষকে জানায় সংগামী অভিনন্দন। গনতন্ত্রের জোয়ারে পৃথিবীর সব ফ্যাসিস্ট সিস্টেমের পতন হৌক।

[26 বার পঠিত]