ভৃঙ্গু কোবরেজ

tree_woman_from_apilague

tree_woman_from_apilague

ধারণা করা হয ভৃঙ্গু কোবরেজের নামটা তাঁর পিতৃ-প্রদত্ত নাম নয়। তবুও এই নামটাই তাঁর আদিনাম ছাপিয়ে কী করে যে দশ গ্রাম পেরিয়ে বহু দূর দেশেও খ্যাতি পেয়ে গেলো, এর কোষ্ঠি বিচার করার বয়েসী কেউ আর জীবিত নেই এখন। কিংবা আদৌ তাঁর কোন আদিনাম ছিলো কিনা সেটাও কোবরেজের নির্বিকার ঘোলা চোখ পাঠ করে কোন সুরাহা মেলে না। তাই সবক্ষেত্রে যা হয়, ক্লু হারিয়ে নাম নিয়ে আগ্রহ বা কৌতুহলগুলো তাঁর বয়সটার মতোই বহুকাল আগেই থমকে গেছে।

আর বয়সের কথা বললে, সেই যেবার তাঁর সদ্য বিয়ে করা বড় ছেলেটা অজানা মাড়িতে ভুগে ঘরের খুঁটির সাথে বাঁধা থাকা অবস্থায় মরে গেলো, সেবার মালোপাড়ার দক্ষিণ চাতালে মেয়ে বিয়োতে গিয়ে মরে যাওয়া আবিয়ত্তা মেয়েটার পিতৃপরিচয়হীন সদ্যজাত যে অভাগা মেয়েটাকে ভৃঙ্গু কোবরেজই কোলে করে নিয়ে এসে নিজেই লালন পালন করতে থাকে, কী আশ্চর্য, সেই মেয়েটাই লকলকিয়ে বেড়ে ওঠে কবে থেকে যে বছর বছর মরা বাচ্চা প্রসব করে যাচ্ছে, অথচ কোবরেজের কাচাপাকা চুলগুলো ঠিক সেরকমই রয়ে গেছে আজো ! কেউ বলে কোবরেজের অপ্রকৃতিস্থ ছোট ছেলেটা, যে নাকি মাঝে মাঝেই কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গিয়ে আবার ফিরেও আসে, তার সাথেই মেয়েটার বিয়ে হয়েছিলো, কেউ বলে হয় নি। তবে এ নিয়ে গ্রামের কাউকেই খুব একটা মাথা ঘামাতে দেখা যায় না।

গ্রামের একপাশে নির্বিবাদে পড়ে থাকা কোবরেজের আদিবাস নিয়েও কেমন একটা ঘোরপ্যাঁচ রহস্য রয়ে গেছে। কবে কোন্কালে কিভাবে কোবরেজি চিকিৎসায় দত্তবাড়ির কাকে সারিয়ে তোলার সৌজন্যে দানস্বত্বে পাওয়া একটুকরো জংলা জমিতে ছোট্ট একটা ঘর তুলে বসবাসের পত্তন করে পসার জমিয়ে তুলেছিলো, সেকালের সাক্ষী কেউ বেঁচে থাকলে হয়তো তা জানা যেতো। সাথে এটাও জানা যেতো, যে বউটি যুবতীকালে দুটো বাচ্চা বিইয়ে রেখে একদিন কোথায় হারিয়ে গেলো, তাকে কি কোবরেজ সত্যি সত্যি বিয়ে করে এনেছিলো, না কি ভাগিয়ে এনেছিলো ?

পরতে পরতে এমন রহস্য জমে থাকাটা চিকিৎসা পসারের ক্ষেত্রে অনুকূল হবে নিশ্চয়ই। নইলে কালেভদ্রে দুয়েকটা অসমর্থিত খবরের বাইরে কোথাও কোনো আরোগ্য সংবাদ পাওয়া না গেলেও ধন্বন্তরি তাবিজের খোঁজে এই অজপাড়াগাঁয়ে দূরাগত রোগীদের পুরনো কাৎড়ানো শুনা যাবে কেন ! বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, মরে যাবার আগেও মৃত্যুপথযাত্রী এই সব রোগীরা তাবিজের অলৌকিক গুণে এতটুকু অবিশ্বাস বা অশ্রদ্ধা তো দেখায়ই না, বরং কুদরতি তাবিজের শর্ত না মানার দোষে নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করতে করতেই এরা পরপারের মিছিলে দিব্যি সামিল হয়ে যায় ! এইসব গরম খবর কিছুদিন পরই ঠাণ্ডা হয়ে চাপাও পড়ে যায় দ্রুত।

কেউ কেউ বলেন, ভৃঙ্গু কোবরেজের মতো তাঁর তেলেসমাতি তাবিজের কার্যপ্রণালী বুঝি আরো বেশি রহস্যাবৃত। তা জানতে হলে প্রকৃতই জটিল কোন রোগী হয়ে তাঁর কাছে হন্যি দেয়া ছাড়া অন্য কোন পথ খোলা আছে কিনা জানা নেই। কেননা কাক-পক্ষিরও অগোচরে রাখা তাবিজের অবশ্য পালনীয় গুপ্ত শর্তটি শেষপর্যন্ত রোগীর সাথেই স্বর্গ কিংবা জান্নাতবাসী হয়ে গেলে ইহলোক থেকে সংযোগরক্ষার প্রচেষ্টায় কাউকে আর আগ্রহী হতে দেখা যায় না। আর নিতান্তই আরোগ্যবাসী কোন রোগী আরোগ্যকালের দীর্ঘস্থায়ীত্বের জন্য মরে গেলেও গুপ্তকথা ফাঁস না করার শর্ত ভেঙে ঝুঁকি নেবার নজির স্থাপন করেছে এমনটাও এযাবৎ দেখা যায় নি।

তবু কিছু কিছু কাহিনী যেভাবে নিজস্ব শক্তিমত্তা বা কৌতুকের উৎস হয়ে আকাশে বাতাসে কিছুকাল ছড়িয়ে থাকে, তা কি কারো কৌতুহলসৃষ্ট গুজব, না কি লিক হয়ে বেরিয়ে আসা কোন গুপ্তকথা, এর সত্যাসত্য নির্ণয় করার উপায় কারোরই থাকে না। কেননা পড়শিগঞ্জের বিদেহী রোগীটি সব কূল সেরে শেষচেষ্টা হিসেবে প্রথম যেদিন ভৃঙ্গু কোবরেজের ডেরায় এসে হামলে পড়েছিলো, কোবরেজ তাকে সত্যি সত্যি সর্বোচ্চ হাদিয়ার বিনিময়ে এক হপ্তায় সম্পূর্ণ আরোগ্য হবার একশতভাগ গ্যারান্টিসহ সর্বরোগহরা তেলেসমাতি তাবিজটি হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলো দ্রুত। শর্ত অনুযায়ী অক্ষরে অক্ষরে প্রতি প্রত্যুষ আর প্রদোষের ব্রাহ্মমুহূর্তে কাঁসার গেলাসে তাবিজের তিনচুবা পানি একনিঃশ্বাসে পান করে গেছে ঠিকই। কিন্তু তাগুদে পানি পান করার সময় কিছুতেই কোন ইতর বানরের কথা মনে না আনার পুনঃপুন সতর্কবাণী নিজের দোষেই চাপা পড়ে গেলো গেলাস হাতে নিয়েই। চোখের সামনে শুধু বানর আর বানরের ছবিই ভাসতে থাকলো। কিছুক্ষণ চুল ছিঁড়ে, কিছুক্ষণ নিজের বাপান্ত শাপান্ত করতে করতে রোগী বাবাজী দ্বিতীয়বার কোবরেজ পর্যন্ত আর পৌঁছতে পারলো না। পথেই মরে রইলো। এ খবর আস্তানায় এসে পৌঁছালে তাবিজের এমন জীবন্ত ক্ষমতার প্রমাণ হাতেনাতে পেয়ে তাবিজের প্রতি অপেক্ষমান রোগীদের আস্থা আরো বহুগুণ বেড়ে গেলো।

এসব তো বহু আগেকার কথা ! তাবিজের জীবন্ত তেজ তো চোখের সামনেই অনেকে দেখেছে ! এক্কেবারে নিজের ঘরে হলে কী হবে, তাবিজ অমান্য করায় কোবরেজের বড় ছেলেটি রাতের খাবারটাও শেষ করতে পারলো না, মাথা ঘুরে পড়ে আবোল-তাবোল বকতে লাগলো। এক্কেবারে উন্মাদ দশায় খুঁটির সাথে বেঁধে রেখেও শেষপর্যন্ত সারানো গেলো না। ভাগ্যিস কোবরেজ তাঁর গুণীন মন্ত্র দিয়ে ঠিকই ধরে ফেলেছিলো, বৌ’টি যে ভয়ঙ্কর একটা উপরি আছর নিয়ে কোবরেজ বাড়িতে ঢুকেছিলো। যে কিনা দেশগ্রামে অন্যের আলগা-আছড় আর কু-প্রভাব সারিয়ে বেড়ায়, তার ঘরেই হানা ! সাংঘাতিক ব্যাপার ! এটা যে গোটা গ্রামের জন্যই ঘোর অমঙ্গল !

অতঃপর রাত-বিরেতে বৌটির আর্ত চিৎকারে আশেপাশের সবাই আশ্বস্ত হতে শুরু করলো যে, কোবরেজের গুণীন শক্তির কাছে অপশক্তিটি ধীরে ধীরে নিরস্ত হচ্ছে। দিনের পর দিন এই অতিলৌকিক শক্তি-লড়াই শেষে কু-আছরটিকে গ্রামছাড়া করা হলো ঠিকই, তবে যাবার আগে সে কোবরেজের বড় ক্ষতিটি করে গেলো। ভোর রাতে দেখা গেলো বৌটি পেছনের গাব গাছে ঝুলে আছে অনেকটা উদোম হয়ে। গাঁয়ের লোক ভেঙে পড়লো কোবরেজ বাড়িতে। অবাক বিস্ময়ে সবাই দেখলো, অপশক্তির আছর কিভাবে একটি তন্বী নারীর নরম শরীর নির্বিচার ফালাফালা করে দিয়ে যায় ! মেয়ের মতো লক্ষ্মী বৌটির এহেন দুর্দশায় বিমর্ষ কোবরেজের মুখে বহুদিন স্থিরতা দেখেনি কেউ। পালিত কন্যাটি সেবা শুশ্রূষা করার মতো ডাঙর হয়ে ওঠলে বহুদিন পর কোবরেজের মুখে হাসি ফিরে আসে।

অচিনপুর গ্রামের নিস্তরঙ্গ জীবনে এসব ঘটনার ঢেউ মাঝে মাঝে একঘেয়েমীর পাথরটাকে একটু আধটু নাড়া দিয়ে যায় বলেই জীবনটা এখনো বহমান তাদের কাছে। একেকটি ঘটনার লবণ তাদের পানসে জিহ্বায় অনেকদিন ধরে যে নোনা স্বাদটুকু ধরে রাখে তার একমাত্র উৎস ওই কোবরেজ বাড়িটাতে আবার একদিন গ্রামের লোক ভেঙে পড়লো। বহু রহস্যের জন্মদাতা ভৃঙ্গু কোবরেজই এবার আজব এক অচেনা রোগের শিকার !

সেই যে পিতৃপরিচয়হীন পালিত কন্যাটি, যে কিনা ফি বছর মৃত সন্তান বিয়ানোতে কখনোই ক্ষান্ত দেয়নি, কখন যে কোবরেজের সমস্ত গুণীনবিদ্যা আয়ত্ত করে নিয়েছে কেউ খেয়ালও করে নি ! খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা ভাঙাচোরা চেহারার ভৃঙ্গু কোবরেজকে অচেনা অপশক্তিটি যে সত্যি সত্যি কাবু করে ফেলেছে, তা তাঁর ঝুলে পড়া চেহারা দেখেই স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। পাশেই চেলাকাঠ হাতে দাঁড়ানো কোবরেজের অপ্রকৃতিস্থ ছোট ছেলেটি কার চিকিৎসায় হঠাৎ সুস্থ হয়ে ওঠেছে তা নিশ্চিৎ হওয়া না গেলেও ভৃঙ্গু কোবরেজকে সারিয়ে তোলার সর্বাত্মক চেষ্টায় মেয়েটির কোন খামতি দেখা গেলো না।
তাঁর মুখের কাছে পানি ভর্তি গেলাসটি ঠেলে দিয়ে চিৎকার করে বলছে সে- বল্, এই তাবিজের পানি খাবার সময় কার চেহারা মনে আনা যাবে না, বল ?
বজ্রপাতের তীব্রতায় ঝলসে যাওয়া বৃক্ষের ভেঙে পড়া শব্দের মতো কোবরেজের কণ্ঠ ভেঙে মড়মড় আওয়াজ বেরিয়ে এলো- ‘…স্ত্রীলোকের চেহারা !’

Image: from internet

About the Author:

‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। তা প্রকাশ করতে যদি লজ্জাবোধ হয়, তবে সে ধরনের চিন্তা না করাই বোধ হয় ভাল।’ -- প্রাচীন গ্রীক কবি ইউরিপিডিস (৪৮০-৪০৬ খ্রীঃ পূঃ)

একটি মন্তব্য

  1. রণদীপম বসু মে 13, 2009 at 8:50 অপরাহ্ন - Reply

    ধন্যবাদ, অভিজিৎ দা’। আমাকে পুনঃ না জানালে হয়তো আমার অন্যমনষ্কতা আরো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারতো।

মন্তব্য করুন