বাসুনকে মা, পর্ব ৪৯

বাসুনকে, মা

লুনা শীরিন

পর্ব ৪৯

বাসুন,

দীর্ঘ, দিন/রাত্রি, ঘন্টা মাস,বছর চলে যেতে থাকে তোর আমার জীবনে হয়তো আরো যাবে বা যাবে না, আমরা জানি না, কিছুই জানি না, শুধু জানি যতদিন বেঁচে আছি বেঁচে থাকতে হবে । ইদানিং খুব মৃত্যু চিন্তা আসে সোনা। তোকে একদিন বললাম, কি করবি বাবু আমি মরে গেলে? তুই অবুঝ শিশু, সাথে সাথে উত্তর, কেন আম্মু ৯১১ কল করবো । আমি নিশ্চুপ, রাত গভীর হয় আমি তুই আবার একটা দিন শুরু করি সোনা । এরই ভিতর যা ঘটার ছিলো তাই ঘটে যায় , দেশের খবর বিচলিত করে, অসহায় বোধটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠবার আগেই নিত্য কাজের ফাঁকে শোক সয়ে যায় । কিন্তু জানিস বাবু, কোন কোন মুহুর্ত আসে আমি অস্থির হয়ে পড়ি, আমার হঠাৎ কথা বলবার মানুষ নেই শেয়ার করার মানুষের অভাবই বল আর একাকিত্বই বল আমাকে কিছু একটা করতে হয়। তোকে লেখা এই ডাইরিটা আমাকে অনেক কষ্ট/ ভালোবাসা / আনন্দকে প্রকাশ করতে বন্ধুর মতো সাহায্য করে । এই যে ডাইরীটা লিখি, আমি ভাবতে থাকি, আমি কথা বলছি একজন মানুষের সাথে । জানিস সোনা তোকে আগেও বলেছি আবার বলছি কোন কোন নির্জন দুপুর আমাকে উন্মাদ করে আমি বরফ ঢাকা টরোন্টো শহরে বসেই চলে যাই অন্যপৃথিবীতে । তাহলে কাকে বলবো ? কি করে প্রকাশ করবো এই অনুভুতি? হয়তো গান চলতে থাকে ”আজি বিজনও ঘরে নিশীথ রাতে আসবে যদি —–” আমার হাতে বই, প্রিয় কথাশিল্পী শাহাদুজ্জামানের পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ, মুন্না ভাই এর মুখটাকে চোখের সামনে আনবার চেষ্টা করি, অদ্ভুদ সব অনুভুতি হয় আমার, মানুষ এত শক্তিশালী? এত গভীর করে মুন্নাভাই লেখেন কি করে? বইটাতে একটি গল্প কাগজের এরোপ্লেন এ তিনি লিখছেন ” একটাই জীবন আমাদের । তুলনা করবার মতো পুর্ববর্তি কোন জীবন আমাদের হাতে নেই, হাতে নেই শুধরে নেবার মতো পরবর্তি কোন জীবন । তাহলে কি করে বোঝা যাবে জীবনের কোন সিদ্ধান্তটি সঠিক, কোনটি ভুল?”

ভরা দুপুর , আমার শহর শুনশান, কি নীরব এই শহরের প্রকৃতি, আমার জানালার বাইরে তাকালে মাইনাস তিরিশে ডাকা শীতার্ত শহর চোখে পড়ে। বইটা হাতে নিয়ে আমি যেন দেখতে পাই ধানমন্ডিতে আমার মায়ের বাড়ি, বৃদ্ধ বাবার অলস শুয়ে থাকা, আমার শহর ঢাকা যেখানে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে আছে মানুষের লাশ, চারিদিকে মানুষের হাহাকার । আমি আবার বইটার দিকে মনোযোগ দেই। লেখক জীবনের গভীর সত্য ও একান্ত ভাবনা কে বলে চলেছেন এবার একটি বেবুনের গল্প হুবহু তুলে দিলাম বই থেকে। ” একটি বেবুন তার মা শিশুকে জড়িয়ে নদী পাড় হবার চেষ্টা করছে। নদীতে তখন জোয়ার আসে হঠাৎ । স্রোত বাড়তে থাকে, বেবুন মা তখন একটি পাথর খন্ডেরউপর গিয়ে দাড়ায় বুকে শক্ত করে চেপে রাখে তার শিশুটিকে, কিন্তু নদীর পানি বাড়তে থাকে । পাথর ডুবে যায়, পানি বাড়তে বাড়তে ডুবে যায় বেবুনের বুক । বেবুন তখন তার শিশুটিকে কাধের উপর বসিয়ে দেয়, কিন্তু পানি তবুও বাড়ছে । বেবুন মা তখন শিশুটিকে দুহাতে মাথার উপর উঁচু করে শুন্যে ধরে রাখে বাচাঁতে হবে ভবিষ্যত প্রজন্মকে, তার সন্তানকে, তবে পানি যখন আরো বাড়তে থাকে তখন সহসা বদলে যায় সবকিছু। পানি বাড়তে বাড়তে যখন বেবুন মায়ের গলা ডুবে যায় এবং যে মুহুর্তে পানির স্তর তার নাক স্পর্শ করে ওমনি সে একটানে শিশুটিকে নিয়ে আসে পায়ের নীচে । জলমগ্ন পাথরের উপর শিশুটিকে রেখে তার উপর দাড়ায় সে। এবার তার নাক থেকে পানি যথেষ্ট উচুঁতে, নিরাপদ দুরত্বে । বেবুন প্রানভরে নিশ্বাস নেয় এবার”
গত দুসপ্তাহ হলো বাংলাদেশে বিডিআর আর সেনাবাহীনিতে হত্যাযজ্ঞ চলছে, প্রবাসে প্রতিনিয়ত নানান খরবে আমরা বিচলিত হয়ে পড়ি, সেরকম একটা খবর, সেনাবাহীনি প্রধান শাকিলের স্ত্রীকে নাকি পাশবিকভাবে নির্যাতন করেছে বিডিআর, দুটো সন্তান আর স্বামীর সামনেই নাকি চলেছে এই পৈচাশিকতা, বেবুন মায়ের মতো শিশুদুটোও নাকি বেঁচে আছে কোন এক অমোঘ ইশারায়।

আমি নির্জন দুপুরে সারা ঘরময় ঘুরতে থাকি বাবু, আমার অসহায়ত্ব দিয়ে কি আঁচ করতে পারবো কি দৃশ্য বুকে নিয়ে বাচঁবে নাজনীনের সন্তানেরা? কোন তদন্ত বা বিচারেই কি মুছে যাবে এই স্মৃতি?

তোর মা
২ মার্চ ২০০৯।

About the Author:

লুনা শীরিন, ক্যানাডা প্রবাসী লেখক

মন্তব্য করুন