প্রতিক্ষা

By |2009-04-08T18:37:13+00:00ফেব্রুয়ারী 21, 2009|Categories: গল্প|2 Comments

প্রতিক্ষা

যুথিকা বড়ুয়া

 

হঠাৎ ভয়ঙ্কর একটা দুঃস্বপ্নে ধড়্‌ফড়্‌ করে ওঠে মমতা। বুকটা ওর ধুক্‌ধুক্‌ করে উঠেছে। থর্‌থর্‌ করে কাঁপছে সারাশরীর। উঠে বসল বিছানায়। সকাল না সন্ধ্যে, মুহূর্তের জন্য ঠাহরই করতে পাচ্ছিল না। চোখ পাকিয়ে তাকায় চারিদিকে। তখনও আবছা অন্ধকার বাইরে। দিগন্তের পূর্ব প্রান্তর জুড়ে ঊষার ক্ষীণ আলোর আভায় ক্রমশ লাল হয়ে উঠছে। পিছন ফিরতেই দ্যাখে, খোকনের ঘরে আলো জ্বলছে। দরজা জানালা সব খোলা। পাশে বাথরুমে ঝর্ণার মতো প্রবল স্রোতে ঝিরঝির করে পাইপ কলের জল পড়ছে, শোনা যাচ্ছে। -“খোকা স্নান করছে নিশ্চয়ই! কিন্তু এতো ভোরে! খোকন আজ যাচ্ছে কোথায়!”

 

স্বগতোক্তি করতে করতে বিছানা থেকে নেমে মমতা দ্রুত গিয়ে ঢুকলো খোকনের ঘরে। ঢুকেই নজরে পড়ে, একটা কাপড়ের পোটলায় কি যেন বাঁধা, বিছানার পাশে টি-টেবিলে পড়ে আছে। হঠাৎ মনে হয়েছিল, কোনো জন্তু-জানোয়ার ঢুকে পড়েছে জানালা দিয়ে। টেবিল-ল্যাম্পের আড়ালে ঘুপচি মেরে বসে আছে। আকারে বেশ বড়।

খানিকটা বিস্ময় নিয়ে কাছে এগিয়ে গেল মমতা। গিয়ে  দেখল, কোন প্রাণী নয়, সেটি একটি বস্তু। খুব ভারী জিনিসই মনে হচ্ছে। আশ্চর্য্য, এভাবে বেঁধে রাখার মতো খোকার এমন কি জিনিস খাকতে পারে, যে ওর মা জানবে না!  বলল মনে মনে।

 

স্বাভাবিক কারণে পোটলাটা খুলে দেখার বড্ড কৌতূহল হলো মমতার। কিন্তু হাতে নিয়ে দেখতেই চমকে ওঠে।-“মা, তুমি এঘরে, কি করছ? সর্বণাশ! ওটা রেখে দাও শিগ্‌গির!”

 

বলে মাথা মুছতে মুছতে বাথরুম থেকে দ্রুত এগিয়ে আসে খোকন। চোখমুখে খানিকটা বিরক্তি প্রকাশ করে বাজপাখীর মতো ছোঁ মেরে কাপড়ের পোটলাটা কেড়ে নিলো। উপেক্ষা করে বলল,-“খামাখা ঘুম থেকে উঠে এলে! আজ আমাদের ইউনিভার্সিটিতে খুব জরুরী একটা মিটিং আছে। আর্লি-মর্নিংএ জয়েন করতে হবে সবাইকে, তাই! যাও যাও, গিয়ে শুয়ে পড় গে যাও!”

এমন স্বাভাবিক গলায় বলল, যেন কিছুই ঘটেনি! অথচ মনে মনে ভাবছে, নিশ্চয়ই জেনে গিয়েছে মা। এতক্ষণ ওয়াচই করছিল বোধহয় ওকে!

 

অপ্রস্তুত মমতা হঠাৎ থতমত খেয়ে গেলেও খোকনের আপাদমস্তক লক্ষ্য করে জিজ্ঞাস্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। স্তম্ভিত হয়ে যায় বিস্ময়ে। কিছু একটা যে ঘটতে চলেছে, সেটা টের পেয়েই অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে নিশ্চিত হয়। আবার পরক্ষণে ভাবে, নাঃ, বোধহয় ওরই বোঝার ভুল হচ্ছে হয়তো!

 

অথচ মমতা আদৌ জানেনা যে, ঐ পোটলাতে কি আছে! সেই মারাক্তক জিনিসটি কি! আর মায়ের অজান্তে তলে তলে খোকন এসব করছেই বা কি!

 

লক্ষ্য করলো, চেহারাটা মুহূর্তে বিবর্ণ হয়ে গেল খোকনের। গভীর তন্ময় হয়ে কি যেন ভাবছে ও’! কিন্তু একজন গর্ভধারিনী মায়ের মন, সত্য উদ্ঘাটন না হওয়া পর্যন্ত কখনো শান্তি পায়না। ভিতরে ভিতরে অস্বস্তিবোধ করে। কারণ অনুসন্ধ্যানে প্রচন্ড উদগ্রীব হয়ে ওঠে।

খোকনের মুখের দিকে গম্ভীর হয়ে তাকায় মমতা। চোখে চোখ পড়তেই বলল,-“খোকা, আমায় সত্যি করে বলতো, এতো সকালে তুই কোথায় যাচ্ছিস? কোন্‌ রাজকার্য্যে যাচ্ছিস, শুনি! তুই এমন করছিন কেন? কিরক অন্যমনস্ক, অস্থির অস্থিরভাব! এতো কিসের চিন্তা তোর? সংসারে আমাদের আর আছে কে, বলতো!”

খোকনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,-“মায়ের কাছে কিছু লুকোস নে বাবা! কি হয়েছে, আমায় খুলে বল!”

 

খোকন নিরুত্তর। পড়ে যায় বিপাকে। কাপড়ের পোটলাটা লুকাবার চেষ্টা করে। হঠামাকে উপেক্ষা করে আহাল্লাদে গদগদ হয়ে ওঠে। বাধ্যগত ছেলের মতো খুব নরম হয়ে, মোলায়েম করে বলল,-“তুমি না ঘুমিয়ে উঠে এলে কেন মা! আমি কি দুধের খোকা! ইউনিভার্সিটির ছাত্র আমি! হাট্টা গোট্টা তরুণ যুবক! সামান্য একটা বিষয়কে এতো সিরিয়াসভাবে নিচ্ছো কেন বলোতো! আমারও তো একটা প্রাইভেসি আচ্ছে, না কি!”

 

ভ্রু-যুগল কুঁচকে চেয়ে থাকে মমতা। ভিতরে ভিতরে খুব চটে যাচ্ছে। কিছু বলার ব্যকুলতায় ঠোঁট কেঁপে উঠতেই ফিক্‌ হেসে ফেলল খোকন। মাকে কনভিন্স করার চেষ্টা করে। বলল, -“ওঃ হোঃ, তুমি এতো টেনশন্‌ নিচ্ছো কেন বলোতো! রিল্যাক্স মা রিল্যাক্স, ডোন্ট ওরি, ক’মন!

আচ্ছা, উঠেই পড়েছ যখন, ফটাফট্‌ এক কাপ গরম চা নিয়ে এসো তো দেখি! শরীরটা একটু ঝরঝরে হয়ে যাক!”

 

মমতা তক্ষুণিই চলে গেল রান্নাঘরে। ইত্যবসরে খোকন তাড়াহুড়ো করে গা-হাত-পা মুছে, ঝটপট পড়ে নেয় জামা-প্যান্ট। মাথা আঁচড়াতে আঁচড়াতে রান্নাঘরের দিকে গলা টেনে একবার দেখলো। দেখে কি যেন ভাবল। আর তক্ষুণি কাপড়ের পোটলাটা হাতে নিয়ে পা টিপে নিঃশব্দে দ্রুত বেড়িয়ে গেল ঘর থেকে।

তার পরক্ষণেই চা নিয়ে আসে মমতা। ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়ায়। দ্যাখে, খোকন ঘরে নেই। গলা টেনে বাথরুমে দেখল, সেখানেও নেই। হঠাৎ নজরে পড়ে, কাপড়ের সেই পোটলাটাও নেই! কখন যে মায়ের অগোচরে খোকন ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল, টেরই পেলনা। -“আশ্চর্য্য, খোকা আজ দানা পানি মুখে না দিয়েই চলে গেল! যাবার পথে একবার দর্শণও দিলো না! কিন্তু পোটলায় বেঁধে ও কি নিয়ে গেল? কোথায় নিয়ে গেল?”

হাজার প্রশ্নের ভীঁড় জমে ওঠে মমতার। দুঃশ্চিন্তায়-দুর্ভাবনায় একটা মুহূর্তও স্বস্তি পায়না।

 

মমতা সহজ, সরল, সেকেলে মহিলা। স্বামী বিয়োগের পর একেবারে নরম হয়ে গিয়েছ! আজকাল কোনো বিষয়েই তেমন গভীরভাবে আর ভাবতে পারে না। অথচ আজ তার এক একটা মুহূর্ত কি অপরিসীম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় অতিবাহিত হচ্ছে। মায়ের মন, সব সময় কু-ই গায়! বাস করে তার নিজস্ব জগতে। গ্রামের বাড়িতে শ্বশুড় কূলের ভিটে বাড়ি সহ স্বল্প পরিমানে কিছু ধানি জমি ছিল। তাতে আনাচপাতীর চাষ করে। সম্প্রতি হাঁস-মুরগীর পল্ট্রিও খুলেছে। সেখান থেকেও প্রচুর আমদানি হয়। সব মিলিয়ে উপার্জন যা হয়, তা দিয়ে মায়ে-পুতের দিব্যি স্বচ্ছলভাবেই দিন চলে যায়। কখনো পয়সা কড়ির জন্য ভাবতে হয়না। এখন খোকনকে নিয়েই মমতার যতো চিন্তা-ভাবনা । অকাল বৈধব্যে একাকীত্বের দুঃখ-যন্ত্রণা ভুলে, প্রাত্যহিক জীবনের পারিপাশ্বির্ক কোন্দল-বিবাদ-বিচ্ছেদ-বেদনার কালো ছায়া থেকে দূরে সড়ে এসে খোকনকে এতকাল বুকে আলগে রেখে মানুষ করেছিল কি এই জন্য? মায়ের মনে কষ্ট দিতে বিবেকে ওর এতটুকু বাঁধলো না! দুঃশ্চিন্তায় মায়ের কি হাল হবে, একবারও ভাবল না! কিন্তু খোকন আজ গেল কোথায়?

 

খোকন ছোটবেলা থেকেই ধীর-স্থীর-গম্ভীর। বড্ড এক রোখা ছেলে। অনমনীয় ওর জেদ। বিরল সেন্টিমেন্টাল। প্রতিটা বিষয়ে ওর বিরোধীতা, আপত্তি, অভিযোগ। প্রখর সংগ্রামী মনোভাব। যেদিন শহরের রাজপথে প্রথম চাষা আন্দোলনের শুরুতে নবীন সদস্য আবদুল রশীদ বেকায়দায় পাকবাহীনির হাতে ধরা পড়ে গিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছিল, তাদেরই বন্দুকের গুলী বিদ্ধ করে। আর সেই ঘটনা জন মনে বৈপ্লবিক চেতনার সাংঘাতিক বিস্ফোরণ ঘটেছিল। সেই বৈপ্লবিক বাতাবরণে আরো গবীরভাবে স্বাধীনতা বিপ্লবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে খোকন। লোকের কানাঘূষোয় শোনা গেছে, -“খোকন বিপ্লববাদী স্বদেশী!”

 

তবু কখনও তেমনভাবে সন্দেহের দানা বাঁধেনি মমতার। বরং গর্ববোধ করতো মনে মনে। ভাবত, স্বদেশী মানেই তো, দেশকে ভালোবাসা, দেশের সেবা করা, দশের সেবা করা! আর জনগণের সেবা করা, সেটা তো একটা মহৎ কাজ, মহা পূর্ণ্যের কাজ! কিন্তু আজ!

 

মমতা অশান্ত, উদ্বেলিত, মর্মাহত! ক্ষণপূর্বের গহীন বেদনানুভূতির তীব্র দংশণ আর ভোর বেলার ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের প্রতিঃচ্ছবি তখনও ওর স্নায়ূকোষে ঘুরপাক খাচ্ছে। কখনো জীবন্ত হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠছে। তন্মধ্যে হঠাৎ অভাবনীয় খোকনের ব্যতিক্রম চাল-চলন, কথাবার্তা এবং বিবর্তন চেহারা শুধু সন্দেহই নয়, সন্দেহ ক্রমশ ঘণীভূত হতে থাকে। খটকা লাগল মমতার। ওকে প্রচন্ড ভাবিয়ে তুলল। সমুদ্রের ঢেউ-এর মতো বারবার একই প্রশ্ন ফিরে এসে আঘাত করতে লাগল, হ্রদয়ের গভীরে।-মায়ের চোখে ফাঁকি দিয়ে, মাকে ভাবনার সাগরে ডুবিয়ে, সম্পূর্ণ উপবাসে খোকা আজ গেল কোথায়?

 

সেই তখন থেকে চা-জল-খাবার নিয়ে বসেছিল মমতা। কিছুতেই মুখে ঢুকছে না। কখন থেকে কলিং বেলটা একটানা বাজজিল, এতক্ষণ খেয়ালই করেনি! হঠাৎ জানালার ধারে বসে থাকা হুলো বিড়ালটা মিঁয়াউ করে ডাক দিতেই চমকে ওঠে। বেলের আওয়াজ শুনে ভাবল, -খোকা ফিরে এসেছে।

দৌড়ে গেল দরজা খুলে দিতে। কিন্তু দরজা খুলে দেখল, একটি অচেনা, অজানা যুবতী মেয়ে দরজার ওপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। ওর চোখে-মুখে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।

 

ঘাবড়ে গেল মমতা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেয়েটি বলল,-“মাসিমা, আমি শান্তনা, খোকনের ক্লাসমেট্‌। কিছুক্ষণ আগে ওকে দেখলাম মনে হলো! গায়ে চাদর পড়া, রেললাইন ধরে খুব জোরে হেঁটে যাচ্ছিল। ও কোথায় গেল, আপনি জানেন?”

 

ভয়ার্ত কণ্ঠে মমতা বলল,-“কোথায় গেছে, তা তো জানি না! বলছিল, ইউনিভার্সিটিতে যাবে! কি একটা জরুরী মিটিং আছে! কিন্তু যাবার সময়…!”

 

-“এঁ, ইউনিভার্সিটিতে গেছে!” ভয়ার্ত চোখে তাকায় শান্তনা। কিছুক্ষণ থেমে বলল,-“আপনি আজ বেরুতে দিলেন কেন ওকে?” বলে ধপ্‌ করে বসে পড়ে সিঁড়িতে।

 

এ যেন মরার উপর পড়ল খাড়া! চিন্তাধারার গতীবেগ আরো তিনগুণ বেড়ে গেল মমতার। অজানা আশঙ্ক্ষায় বুকের ভিতরটা ধুক্‌ধুক্‌ করে কাঁপতে থাকে। বিচলিত হয়ে ওঠে। ভয়-ভীতিতে ওর বুক শুকিয়ে আসছে। চোখেমুখে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, মনে বিভীষিকা। হঠাৎ কাঁন্নাজড়িত কণ্ঠে আর্তনাদ করে ওঠে, -“কার কি সর্বণাশ হবে মা! আমি তো কিছুই বুঝতে পাচ্ছি নে!”

 

চোখ বড় করে তাকায় শান্তনা। বিরক্তির সুরে বলে,-“কেন, আপনি শোনেন নি? ইউনিভার্সিটির চারপাশে সরকার একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি করেছে। নোটিশ দিয়ে রেখেছে, ইউনিভার্সিটির ত্রিসীমানায় কোন মিটিং করা, মিছিল করা চলবে না। গন্ডোগোল হবার খুবই সম্ভাবনা আছে!”

 

শুনে আঁতকে ওঠে মমতা। -“হ্যাঁ, বলো কি! কিসের মিটিং? কাদের মিটিং? মিছিল কেন করবে ওরা? একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি করেছে, কেন? গন্ডোগোল হবে কিসের জন্য?”

 

অসন্তোষ গলায় শান্তনা বলল,-“সে কি! খোকন কি আপনাকে কিছুই বলেনি? রাষ্টীয় ভাষা বাংলা করবার দাবীতে ছাত্র-ছাত্রীরা সবাই আন্দোলন করছে, জানেন না! আজ ওরা একশো চুয়াল্লিশ ধারা লঙ্ঘন করে শ্লোগান দিতে দিতে এসেম্বলীতে যাবে। পুলিশ নিশ্চয়ই তখন লাঠিচার্জ করবে, কাঁদানি গ্যাস ছুড়বে। ব্যস, শুরু হয়ে যাবে গন্ডোগোল!”

 

শুনে বুক কেঁপেঁ ওঠে মমতার। ধপ করে বসে পড়ল সোফায়। অসহায়ার মতো বিষন্ন চোখে চেয়ে থাকে। কণ্ঠে হতাশার সুর। একটা ঢোক গিলে বলল, -“তাহলে কি হবে মা!”

 

-“না, না, কি হবে! কিচ্ছু হবে না! আপনি অযথা ভেঙ্গে পড়ছেন! আমি বলছিলাম, বিপদের কথা বলা যায়না! আর তাছাড়া, খোকন বিদ্যান, বুদ্ধিমান, চালাকচতুর ছেলে, আর যাই হোক, অন্তত ওর গায়ে কোনো আঁচড় পড়তে দেবে না! আপনি ওনিয়ে কিচ্ছু চিন্তা করবেন না মাসিমা। আমি দেখছি, ওদিকে কাউকে পাঠানো যায় কি না!”

 

শান্তনা চলে যেতেই ভারাক্রান্ত মনটা কিছুটা হাল্কা হলো মমতার। শারীরক ও মানসিক অবসাদ ঝেড়ে ফেলে স্বাভাবিক হয়ে উঠল। যথারীতিই ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজের কাজে।

 

ততক্ষণে বেলা প্রায় নটা বাজে। খোকন তখনও দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছিল, ওদের ইউনিভার্সিটির চারিদকে পুলিশ পাহাড়া। ছাত্র-ছাত্রীরা সবাই দলবেঁধে ইউনিভার্সিটির গেটের ভিতরে জটলা করছে। খুব হৈচৈ হচ্ছে সেখানে। মাঝে মধ্যে শ্লোগান শোনা যাচ্ছে,-“রাষ্টীয় ভাষা বাংলা চাই, বাংলা চাই!”

 

খোকন চেষ্টা করল, ইউনিভার্সিটির পিছন গেট দিয়ে ঢুকতে। কিন্তু তারও উপায় নেই! সেখানেও ঝাঁকে ঝাঁকে পুলিশ দাঁড়িয়ে। ততক্ষণে দলে দলে ছেলে-মেয়েরা মিছিল করতে করতে একেবারে গেটের বাইরে চলে এসেছে। পুলিশ তক্ষুণি হামলা চালায় ওদের উপর। লাঠিচার্জ করে। কয়েক জনকে ধরে তুলে নিলো গাড়িতে। আর তারপরই শুরু হয়, হট্টোগোল, বিশৃঙ্খল, ভাগ-দৌড়। চাদরের ভীতর থেকে খোকন এলোপাথাড়ী ছুড়তে লাগল, বারুদের গোলা। জ্বালিয়ে দিলো একটি পুলিশ ভ্যান। অন্যদিকে উত্তেজিত জনসমুদ্রের ক্রমাগত ঢেউ-এ ভেসে আসছে, শ্লোগানের তীব্র হুঙ্কার। পুলিশ ছুড়তে লাগল কাঁদানি গ্যাস। ছুটছে অনবরত বন্দুকের গুলী। ঘটছে একটার পর একটা হ্রদকাঁপানো বোমা-বারুদের বিস্ফোরণ। চারিদিকে ধোঁয়া। কিছু দেখা যাচ্ছেনা চোখে। ছাত্র-ছাত্রীরা দলভঙ্গ হয়ে আত্ম রক্ষায় ছুটতে লাগল, যার যার আপন গন্তব্যে।

 

যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীটা। গুমোট মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। বৃষ্টিও পড়ছে গুঁড়িগুঁড়ি। সকাল থেকে মন-মেজাজটাও একদম ভালো নেই মমতার। তন্মধ্যে চতুর্দিক থেকে ব্জ্রপাতের মতো বোমা বাজীর আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছে গায়ের উপরই এসে পড়লো বুঝি। এমন বিপর্যয়ে ছেলেটা কোথায় কি অবস্থায় আছে, এ চিন্তায় কিছুতেই স্বস্তি পায়না। বেরিয়ে আসে বারান্দায়। বেরিয়েই দ্যাখে, একদল যুবক ছেলে কাকে যেন কাঁধে চেপে উর্দ্ধঃশ্বাসে এগিয়ে আসছে। ওদের পিছনে অগণিত মানুষ। খুব হৈচৈ চিল্লাচিল্লি হচ্ছে।

শুনে নগ্ন পায়েই দৌড়ে আসে শান্তনা। দৌড়ে আসে পাড়া-প্রতিবেশী, বাচ্চা-বুড়ো সবাই! মুহূর্তে ভীঁড় জমে উঠল। যা ক্ষণপূর্বেও কল্পনা করতে পারেনি মমতা।

 

কিন্তু আপন গর্ভে লালিত সন্তান আর মায়ের নারীর চিরন্তন বন্ধন, সে এক অবিচ্ছেদ্য গভীর টান, এক অদৃশ্য শক্তি। তাকে রোধ করে, সাধ্য কার! স্বয়ং বিধাতারও নেই! আর সেই অদৃশ্য শক্তির প্রভাবেই মমতাকে টেনে নিয়ে আসে আঙ্গিনায়। যা ও নিজেও জানেনা। আর তক্ষুণি কর্ণগোচর হয়, খোকনের নাম ধরে কি সব বলছে ছেলেরা। সম্ভবত খোকনদের বাড়িই খুঁজজে ওরা। তখন বুঝতে আর কিছুই বাকী রইল না মমতার!

 

বিদ্যুতের শখের মতো হ্রদস্পন্দনে খুব জোরে একটা ধাক্কা লাগল মমুতার। ওর ঠোঁট কেঁপে ওঠে। বুক কেঁপে ওঠে। থর্‌থর্‌ করে কাঁপে সারাশরীর। অনুভব্য হয়, পায়ের তলা থেকে মাটি যেন ক্রমশ সড়ে যাচ্ছে। জমে হীম হয়ে আসছে ওর সারাশরীর।

মমতা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। স্থীর হয়ে আসে চোখের দৃষ্টি। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাটিতে উপুর হয়ে পড়তেই জড়িয়ে ধরে শান্তনা। ততক্ষণে চাদরে ঢাকা খোকনের রক্তাক্ত মৃতদেহটাকে শুইয়ে দিলো বারান্দায়। কারো মুখে কথা নেই। সবাই বাক্যাহত, বেদনাহত, মর্মাহত। বিমূঢ়-ম্লান হয়ে দাঁড়িয়ে। সবার চোখে জল। হঠাৎ ভীঁড়ের মধ্য থেকে একটি যুবক ছেলে এগিয়ে এসে বলল,-“খোকনের মা কোথায়? ওনাকে ডাকুন!”

 

কিন্তু কোথায় খোকনের মা! তখন ও আর ওর মধ্যে নেই। সম্পূর্ণ উদ্মাদ! সমানে আবোল-তাবোল বকছে। কখনো আপনমনে বিড়বিড় করে কি কি বলছে। শত চেষ্টা করেও মমতাকে ঘরের ভিতর নেওয়া গেল না। শুধু বলছে,-“তোমরা কেউ দেখেছ আমার খোকাকে? ও কোথায় গেছে জানো? আমার খোকা এখনো ফিরে আসেনি। তোমরা দাঁড়িয়ে আছো কেন সবাই? চলে যাও! আমি তো আছি এখানে!”

 

হঠাৎ মমতাকে বুকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ওঠে শান্তনা। বিলাপ করে বলে,-“খোকন আর ফিরে আসবে না মাসিমা! খোকন কোনদিনও আর আমাদের মাঝে ফিরে আসবে না!”

 

 

 

সমাপ্ত

যুথিকা বড়ুয়া- কানাডার টরোন্ট প্রবাসী লেখক ও সঙ্গীত শিল্পী।

 

 

[email protected]

 

 

অভিজিৎ রায় (১৯৭২-২০১৫) যে আলো হাতে আঁধারের পথ চলতে চলতে আঁধারজীবীদের হাতে নিহত হয়েছেন সেই আলো হাতে আমরা আজো পথ চলিতেছি পৃথিবীর পথে, হাজার বছর ধরে চলবে এ পথচলা।

মন্তব্যসমূহ

  1. Mausumi Pal ফেব্রুয়ারী 24, 2009 at 2:33 পূর্বাহ্ন - Reply

    Nice story.

  2. suman ফেব্রুয়ারী 21, 2009 at 2:43 অপরাহ্ন - Reply

    আমার ভাইয়ের রক্তে রাংগানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি? ধন্যবাদ যুথিকা বড়ুয়াকে ফেব্রুয়ারির লেখার জন্য।

মন্তব্য করুন