ডারউইনের ঈশ্বর

 
ডারউইনের ঈশ্বর

(উৎসর্গ-  বন্যা আহমেদকে, “বিবর্তনের পথ ধরে” বইটির মাধ্যমে বাংলা ভাষাভাষীদের পথচলা সুগম করে তুলতে তাঁর অনবদ্য প্রচেষ্টার জন্য।)

একঃ
দূরদর্শনের অতি উৎসাহী গসপেল প্রচারক জিমি সোয়াগার্ট ১৯৮৫ সালে তাঁর দর্শক-শ্রোতাদের বিমোহিত করে ফেলেন একটি ঘোষণার মাধ্যমে। তিনি জানান যে, মৃত্যুশয্যায় ডারউইন পুরোপুরি বদলে গিয়েছিলেন। বিবর্তন বিষয়ে নিজের তত্ত্বকে তিনি পরিত্যাগ করেছিলেন; এমনকি মারা যাবার পূর্বে একখন্ড বাইবেল চেয়েছিলেন যাতে যীশুর প্রেমে আবার মজতে পারেন। পরে জানা গেল, ওটি ছিল ডাহা মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি রটনা। সর্বপ্রথম এই অপপ্রচারের শুরু ১৮৮২ সালে যখন স্যার জেমস হোপ (এডমিরাল অব দ্য ফ্লিট)এর স্ত্রী প্রচার করেন, তিনি মৃত্যুশয্যায় শায়িত ডারউইনকে নাকি আফসোস করে বলতে শুনেছেনঃ “আমার বিবর্তনের তত্ত্ব লোকজনকে ওভাবে না জানালেই পারতাম!” এ অপপ্রচারে ক্ষুদ্ধ হন ডারউইনের মেয়ে। তিনি স্পষ্ট করে জানান যে, লেডি হোপ ডারউইনের মৃত্যুশয্যা তো দূরের কথা, কোন অসুস্থতার সময়ই উপস্থিত ছিলেন না। ডারউইনের সাথে তাঁর সাক্ষাত ঘটার সম্ভাবনা ও খুব ক্ষীণ। আর দৈবাতক্রমে তা ঘটে থাকলে ও ডারউইনের ওপর লেডী হোপের কোনই প্রভাব ছিল না। ডারউইনের মেয়ে সকল সংশয় ও বিভ্রান্তি নিরসনে এটা ও বললেন যে, মৃত্যুর পূর্বক্ষণে কিংবা তার ও আগে, ডারউইন কখনোই নিজের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব এবং মতামতসমূহ পরিত্যাগ করেননি। মারা যাবার পূর্বে ছেলের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলেন ডারউইন। তাঁর সর্বশেষ উক্তি ছিল “আমি মৃত্যু নিয়ে এতটুকু ও ভীত নই।“   

ধর্ম ও ঈশ্বর প্রশ্নে ডারউইনের অবস্থান নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হল এই যে, জীবদ্দশায় ডারউইন কখনোই নিজেকে নাস্তিক ঘোষণা দেননি। বিষয়টি চরমপন্থী নাস্তিক এবং বদ্ধমনা বিশ্বাসী- উভয়ের জন্যই খানিকটা অসুবিধার। তাই বলে ধর্ম ও ঈশ্বর প্রশ্নে ডারউইনের অবস্থান হেয়াঁলিপূর্ণ- এ কথা বলার সুযোগ নেই। পরিণত বয়সে লেখা আত্নজীবনীতে এসব বিষয়ে ডারউইন খোলাখোলি বক্তব্য দিয়েছেন। স্বঘোষিত নাস্তিক না হলে ও পরিণত বয়সে পৌঁছে ডারউইন যে প্রচলিত ধর্মে আস্থা হারিয়েছিলেন, সেটা নিয়ে বিতর্কের কোন অবকাশ নেই। তাঁর আত্নজীবনীর ভাষায়, “চল্লিশ বছর বয়সে পৌঁছার পূর্বপর্যন্ত খৃস্ট ধর্ম আমি মোটে ও পরিত্যাগ করিনি।“ বলাবাহুল্য, ১৮৪৯ সালে ডারউইন চল্লিশ বছরে পা দেন। তবে ধর্মের সাথে বিচ্ছেদ ডারউইনের জন্য মোটে ও সহজ ছিল না এবং সেটা হঠাৎ করে ঘটেনি। মুক্তচিন্তার মানুষ হিসেবে পিতা রবার্ট এবং পিতামহ ইরাসমাস-এর খ্যাতি থাকলে ও ডারউইন নিজে প্রথম জীবনে একজন যীশুবিশ্বাসী খৃস্টান ছিলেন। কেম্ব্রিজে তিনি পেলি(Paley)’-র প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করেন। তখন অবধি তাঁর জীবনে এমন কিছু ঘটেনি যাতে তিনি ঈশ্বর, যীশু বা বাইবেলে অনাস্থা প্রকাশ করতে পারেন। কেম্ব্রিজ থেকে পাশ করার পর তাঁর জীবনের লক্ষ্য স্থির ছিল যে তিনি একজন যাজক হবেন। তাঁর স্ত্রী এভা (রক্ত সম্পর্কে মামাতো বোন) ও ছিলেন ধর্মে গভীরভাবে বিশ্বাসী একজন মানুষ ।

১৮৩১ সালে বাইশ বছরের ডারউইন যখন এইচএমএস বিগ্‌ল জাহাজে চড়েন, তখন তাঁর কোন ধারণা ছিল না যে, ঐতিহাসিক এ সমুদ্রযাত্রা কেবল তাঁর নিজের জীবনের মোড় নয়, মানব জাতির নিজেদের ইতিহাস এবং ঈশ্বরের সাথে তাদের সম্পর্কের ভীত- এসব কিছুই নাড়িয়ে দেবে। বিগ্‌লে চড়ার সময় নিত্য ব্যবহার্য অন্যান্য জিনিসপাতির মাঝে ডারউইন সাথে নিয়েছিলেন একখন্ড বাইবেল। ধর্ম-দর্শনের প্রশ্নে তখন ও তিনি ছিলেন ঈশ্বরের ‘অমোঘ ও অলংঘনীয়’ বিধানে বিশ্বাসী। তাঁর সে সময়ের সাদামাটা বিশ্বাসের মধ্যে ছিলঃ প্রকৃতিতে সবকিছুর একটা চূড়ান্ত পরিণতির রয়েছে (অর্থাৎ তিনি ছিলেন পরিণতিবাদি); প্রকৃতির অপার লীলার আড়ালে রয়েছে মহাপ্রতিভাবান ও মহাসৃজনশীল কারো হাত (জ্বী-হ্যাঁ, তিনি নিজে ও ছিলেন একদা সৃষ্টিবাদী বা ক্রিয়েশনিস্ট) এবং প্রকৃতির সবকিছু আসলে ঈশ্বরের বিধানেরই প্রমাণ। “বিগলে আরোহন করার পরপর্যন্ত ও আমি ছিলাম খুবই রক্ষনশীল ধরনের। মনে পড়ে জাহেজের বহু অফিসার(যাঁরা নিজেরা ও রক্ষণশীল ছিলেন) আমাকে নিয়ে অনেক হাসাহাসি করতেন যখন নৈতিকতা বিষয়ে কোন কোন সময় আমি বাইবেলের বক্তব্যকে প্রশ্নাতীত হিসেবে উদ্ধৃত করতাম“ (ডারউইন আত্নজীবনী)।

দু বছরের সমুদ্রযাত্রা পাঁচ বছরে গিয়ে ঠেকে। ১৮৩৬ সালে বিগ্‌ল যখন ইংল্যান্ডের বন্দরে ফেরত আসে, ডারউইন তখন ১৮০ ডিগ্রী এংগেলে পালটে যাওয়া একজন মানুষ। কি ঘটেছিল বিগ্‌ল যাত্রার পাঁচ বছরে যা ডারউইনকে পুরোপুরি পালটে দিল? এ প্রসঙ্গে  আমার লেখা ‘ডারউইন যে ভাবে বিজ্ঞানী হলেন’ প্রবন্ধের কিছু অংশ তুলে ধরছিঃ    

“বিগ্‌ল জাহাজে পাঁচ দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রাকালীন সময়ে ডারউইন জীবনে প্রথম বারের মত প্রত্যক্ষ করেন পাহাড় ও অন্যান্য ভূ-তাত্ত্বিক বস্তুর গায়ে বিবর্তনগত পরিবর্তনের চিহ্ন। বিখ্যাত গেলাপাগস দ্বীপপুঞ্জ (ডারউইন ছিলেন সর্বপ্রথম বিজ্ঞানী যিনি সেই দ্বীপপুঞ্জ ভ্রমণ করেন) থেকে সংগ্রহ করেন হরেক রকমের জীবাশ্ম, ছোট-বড় উদ্ভিদ ও প্রাণির নমুনা। তাঁর সংগৃহীত অনেক জীবাশ্মই ছিল অবলুপ্ত প্রাণিসমুহের এবং ডারউইন জানতে প্রচন্ড আগ্রহী ছিলেন কি কারণে ঐ সব প্রাণি পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে তিনি অধ্যয়ন করেছিলেন প্রাণিকুলের মধ্যে বিরাজমান অংগসংস্থান ও অন্তর্গত তন্ত্রসমুহের পার্থক্য। বিশাল আকারে আর ও সংগ্রহ করেছিলেন হরেক প্রজাতির ফিংগে পাখি। এ সময় ক্যাপ্টেন ফিজ্‌রয়ের দেয়া চার্লস লিয়েল নামক জনৈক ভূ-তত্ত্ববিদের লেখা ’প্রিন্সিপলস্‌ অব জিওলজি’ বইটি বিশেষভাবে তাঁর অধ্যয়নে কাজে লাগে।। দেশে এসে বছরের পর বছর সংগ্রীহিত নমুনা নিয়ে একাগ্রচিত্তে অধ্যয়ন ও গবেষণা চালিয়ে যান ডারউইন। সে সময় তিনি বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ থমাস ম্যালথাসের জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে শিকারী প্রাণি, দূর্ভিক্ষ ও মহামারীর ভূমিকা সম্পর্কিত তত্ত্ব অবগত ছিলেন এবং এর দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন। ভিতরে ভিতরে অধ্যয়ন ও গবেষণা পুরোদমে চালিয়ে গেলে ও বহু বছর চার্লস ডারউইন তাঁর থিওরীর কথা কাউকে জানাননি।“

দুইঃ

বিগ্‌লযাত্রা পরবর্তী সময়ে ডারউইন এ কথা বুঝে গেছেন যে, বাইবেলের জেনেসিসে বর্ণিত সর্বমোট ছয়দিনে ঈশ্বর কর্তৃক পৃথিবী এবং জীবকূল সৃষ্টির কাহিনী ভ্রান্ত। বিষয়টি তাঁর নিজের জন্য ও স্বস্তিকর ছিল না। সারা জীবনের লালিত বিশ্বাসকে চুরমার করে দিল চাক্ষুস ও অনস্বীকার্য প্রমাণপাতি আর উপাত্ত যা তিনি সংগ্রহ করেছেন নিজ হাতে। মোহভংগের বেদনা কাটাতে এ সময় তিনি ডিয়িজম বা একাত্নবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন । এ মতবাদে বিশ্বাসীরা ঈশ্বর প্রশ্নে প্রচলিত ধর্মসমূহের গোড়াঁমি ব্যাখ্যাকে অগ্রাহ্য করে চলেন, তথাপি তাঁরা মনে করেন, জগতের ভারসাম্য বা ঐক্যতান কেবলমাত্র দৈব ঘটনার ফল নয়। তবে শেষ অবধি নিজের ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব’ বা থিওরী অব ন্যাচারাল সিলেকশনের মধ্যেই ডারউইন উত্তর খুঁজে পান সৃষ্টি সম্পর্কিত অনেক প্রশ্নের। ন্যাচারাল সিলেকশন থিওরী তাঁকে এমন একটি আভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় সন্ধান দিল যা একইসাথে জগতের ভারসাম্য ও শৃংখলা তৈরী করতে এবং তা অব্যাহত রাখতে সক্ষম।     

আস্তে আস্তে খৃস্ট ধর্ম ও বাইবেলে বর্ণিত ঈশ্বর থেকে ডারউইন নিজেকে গুটিয়ে নেন। ভিতরে ভিতরে বাইবেলে*১ বর্ণিত ঈশ্বরের কঠোর সমালোচক হয়ে ওঠেন তিনি। ঈশ্বর প্রশ্নে ডারউইনের বক্তব্যের সাথে পরবর্তীকালের কৃতি বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক আলবার্ট আইন্সটাইনের বক্তব্যের যথেষ্ট মিল পাওয়া যায়। নিজেদের সরাসরি নাস্তিক ঘোষণা না দিলে ও এঁদের দুজনেই এমন কোন ঈশ্বরের অস্তিত্ব মানতে রাজী হননি যিনি কি-না সর্বশক্তিমান এবং সর্বাধিক দয়ালু অথচ নির্দেশ অমান্যকারী (যেমনঃ সংশয়ী, অবিশ্বাসী) সৃষ্টিকূলকে তিনি কঠিন, ভয়াবহ এবং নির্মম নরকযন্ত্রণা দিতে পছন্দ করেন। তথাকথিত অলৌকিকত্ব বা মিরাকলে ও এঁদের আস্থা ছিল না। তবে ধর্ম ও ঈশ্বর প্রসংগে ডারউইনের বক্তব্য কেবল বাইবেলে বর্ণিত ঈশ্বরের সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিবর্তনের আলোকে তিনি ধর্ম ও ঈশ্বর বিশ্বাসের ভিত্তি খোঁজার চেষ্টা করেন। বাইবেলের Old Testament এ বর্ণিত পাষাণ ও নিষ্ঠুর ঈশ্বর এবং নৈতিকতা বিষয়ে খৃস্টান ধর্মের যে ব্যাখ্যা- ডারউইনের মতে এ সব বিশ্বাস হচ্ছে মানুষের আদিম সত্ত্বার শেষ চিহ্ন। জীবের বাঁচার সংগ্রাম, কষ্ট, ভোগান্তির কারণ ও অস্তিত্বের ব্যাখ্যা ‘সর্বদয়ালু এবং সর্বশক্তিমান’ কোন বিধাতার স্থলে নৈতিক বিচারে অন্ধ প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার সাথেই বেশি মানানসই। তাঁর মতে, ধর্মের ইতিহাস স্বয়ং একটি বিবর্তনশীল প্রক্রিয়া। প্রাণিদের পর্যবেক্ষন করে ডারউন তাদের মধ্যে কিছু সর্বপ্রাণবাদী (animist) আচরনের অস্তিত্ব লক্ষ করলেন যাকে তিনি ধর্মবিশ্বাসের এক প্রকার আদিম প্রকাশ বলে মত ব্যক্ত করেন। ডারউইন বিশ্বাস করতেন, নৈতিকতার মত ধর্ম ও বিবর্তনের একটি প্রোডাক্ট বা সৃষ্টি মাত্র ; ঐশী বাণী ব্যতিরেকে ও ধর্মের ধাপসমূহ এবং বিধিমালার পুনর্সন্ধান এবং পুনরাবিষ্কার সম্ভব।

তিনঃ
ধর্ম, নৈতিকতা এবং ঈশ্বর বিষয়ে ডারউইনের মনোজগতে এসব দৃষ্টিভংগিসমূহের উদ্ভব এবং বিকাশ ঘটেছিল খুবই ধীর গতিতে এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে। ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত আত্নজীবনীতে ডারউইন কথাটি বলেন এ ভাবেঃ “(ধর্মে) অবিশ্বাসের বীজ আমার মধ্যে খুবই ধীরগতিতে অংকুরিত হতে থাকে, তবে শেষের দিকে সেটা পূর্ণতা পায়।“ জীবদ্দশায় ধর্ম-ঈশ্বর নিয়ে প্রকাশ্যে যে কোন বাক-বিতন্ডা তিনি এড়িয়ে চলতেন। এর অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে- ‘অরিজিন অব স্পিসিজ’ বইটি প্রকাশের আগেভাগেই ইংল্যান্ডের রক্ষনশীল খৃস্টানদের বিরাগভাজন হতে চাননি তিনি। এ ছাড়া ঘরে তাঁর স্ত্রী এভা ছিলেন ধর্মবিশ্বাসে সম্পূর্ণ অন্য মেরুর মানুষ। তবে স্ত্রীর নিজের মত করে বিশ্বাসের অধিকারকে ডারউইন শ্রদ্ধা করে গেছেন জীবনভর। যা হোক, দীর্ঘ দুই যুগের ও বেশি সময় ধরে নিজেকে ‘অরিজিন অব স্পিসিজ’ রচনায় ব্যস্ত রাখেন ডারউইন । অবশেষে ১৮৫৯ সালে ‘অরিজিন অব স্পিসিজ’ এর প্রথম সংস্করন প্রকাশিত হয়। পূর্বে উল্লেখিত আমার প্রবন্ধের আবার ও কিছু অংশ তুলে ধরছিঃ

“ডারউইন দেখালেন, নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে এতদিন আমরা যা জেনে এসেছি, তা-ই চরম সত্য নয়। ঈশ্বর নামে কেউ মানুষসহ অন্যান্য প্রাণি এবং উদ্ভিদকুলকে হঠাৎ করে সৃষ্টি করে পৃথিবীতে পাঠাননি। বরং মিলিয়ন মিলিয়ন বছরের প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত পরিবর্তনের মাধ্যমে উদ্ভব হয়েছে এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতির। আপাত বিচারে তাই ভিন্ন হলে ও আসলে সকল প্রজাতির উদ্ভিদ এবং প্রাণিসমুহের উৎপত্তি হয়েছে একই প্রকার সরল কোষ থেকে।“

পরাক্রমশালী চার্চ অব ইংল্যান্ড*২ ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বে তুমুলভাবে ক্ষেপে গেল। তাঁরা ডারউইনের বক্তব্যকে ‘ভয়ংকর’, ‘ধর্মদ্রোহিতা’-র সামিল আখ্যা দিল। রক্ষনশীলদের চাপের মুখে ১৮৬০ সালে ‘অরিজিন অব স্পিসিজ’ এর দ্বিতীয় সংস্করন প্রকাশের প্রাক্বালে ডারউইন বইটির শেষের দিকে ‘দ্য ক্রিয়েটর’ অর্থাৎ ‘সৃষ্টিকর্তা’ শব্দটি পুনঃসংযোজন করেন। এদিকে ডারউইন মারা যাবার ছয় মাস পরে, ১৮৮২ সালের অক্টোবর মাসে, ডারউইনের ঈশ্বরভীরু স্ত্রী এভা স্বামীর নরকভোগের চিন্তায় শংকিত হয়ে ডারউইনের আত্নজীবনীর কিছু অংশ বাদ দেন। ওখানে ছিল ঈশ্বর কর্তৃক অবিশ্বাসীদের অনাদিকাল ধরে শাস্তিপ্রদানের বিষয়টির প্রতি ডারউইনের কঠোর তিরস্কার। ডারউইনের নাতনি নোরা বারলো ১৯৫৮ সালে দাদীমা কর্তৃক বাদ দেয়া অংশটি দাদার আত্নজীবনীতে পুনঃসংযোজন করেন।

চারঃ

ডারউইন কতটা নাস্তিক কিংবা কতখানি সংশয়বাদী ছিলেন- এটি গুরুত্বপূর্ণ কোন ইস্যু নয়। এককালে লালিত বিশ্বাসের সংকীর্ণতা এবং সীমাবদ্ধতার উর্দ্ধে তিনি ওঠে আসতে পেরেছেন; সেখানেই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব। নিজের মেধা ও সৃজনশীলতাকে এমন কোন বিশ্বাসের কাছে সমর্পন করতে রাজী হননি যার ভিত্তিমূল সেটি করলে নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। এ রকমই একটা কথা আমেরিকার অন্যতম ফাউন্ডিং ফাদার থমাস জেফারসন ১৭৮৭ সালে পত্রে লিখেছিলেন তাঁর ভাতিজাকে। “সাহসের সাথে প্রশ্ন করার বেলায় ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়ে ও পিছু হঠ না, কেননা প্রকৃতই সে রকম কেউ থাকলে তিনি নিশ্চয় অন্ধ ভীতির চেয়ে যুক্তির মনোভাবকেই বেশি পছন্দ করবেন।“   

ডারউইন ও তাঁর তত্ত্ব পড়তে এবং বুঝতে এ বিষয়গুলি মাথায় রাখতে হবে আমাদের। না হলে পুরো ব্যাপারটা কেবল আস্তিকতা-নাস্তিকতা বালখিল্যতার পর্যায়ে চলে যায়। আর তাতে ডারউইনের পক্ষের বা বিপক্ষের- যে কোন আলোচনাই অসার হতে বাধ্য।

—-

ফেব্রুয়ারী ১২, ২০০৯

পাদটীকা-
*১ আসলে একেশ্বরবাদী তিনটি ধর্মই যথাঃ খৃস্ট ধর্ম, ইহুদী ধর্ম এবং ইসলাম-এ ঈশ্বরের বর্ণনা প্রায় একইরকমের
*২সম্প্রতি ডারউইনের ২০০তম জন্মবার্ষিকী এবং বিখ্যাত ‘অরজিন অব স্পিসিজ’ প্রকাশনার ১৫০তম বার্ষিকীকে সামনে রেখে এককালে ডারউইনের কট্রর বিরুদ্ধাচারনকারী ‘দ্য চার্চ অব ইংল্যান্ড’ অতীত ভূমিকার জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে। 

তথ্যসূত্রঃ

1. Darwin and the Science of Evolution (Ch. 5)
২। The Autobiography of Charles Darwin

About the Author:

নিউ ইয়র্কে বসবাস। মুক্তমনার অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা; সূচনালগ্ল (২০০১) থেকে জড়িত, নিয়মিত-অনিযমিত ভাবে। অনালাইন ফোরামের বাইরে লিখেছেন যে সব পত্রিকা/ম্যাগাজিনেঃ বাংলাদেশে দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক যুগান্তর, যয় যায় দিন (সাপ্তাহিক), Free Inquiry (USA), The Daily Star, The New Age, The Bangladesh Observer; নিউইয়র্কে সাপ্তাহিক ঠিকানা, সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা এবং USA তে The METRO New York । বিশেষ দিকঃ হাইবারনেশন Facebook লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/worldcitizen73 ব্যক্তিগত ব্লগ ঃ TheRandomVoice.com

মন্তব্যসমূহ

  1. অভিজিৎ ফেব্রুয়ারী 16, 2009 at 8:40 অপরাহ্ন - Reply

    গুরুত্বপূর্ণ আর্টিকেল নিঃসন্দেহে। ডারউইন এমনিতেই ছিলেন একটু আত্মকেন্দ্রিক। আস্তিকতা-নাস্তিকতা নিয়ে প্রকাশ্যে বিতর্কে যেতে চাইতেন না তিনি। যে কোন কন্ট্রভার্স্রি তিনি খুব অপছন্দ করতেন (ঠিক এর বিপরীতটাই ছিলেন তার বন্ধু ‘ডারউইনের বুলডগ’ খ্যাত হাক্সলি)। আর ডারউইনের বউ ইভা ছিলো চরম ধর্মভীরু একজন মহিলা। তার ভয়ে ডারউইন ধর্মের বিরুদ্ধে তেমন একটা লেখালিখি করতেন না। তারপরও তার ঘনিষ্ঠ কিছু বন্ধবান্ধবের কাছে তিনি চিঠিতে সতাতন ঈশ্বর এবং ধর্ম সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করেছেন। আর নিজের অটোবায়োগ্রাফির একতা জায়গায় স্পষ্ট করে তিনি বচলেছেন কিভাবে তিনি বিশ্বাস হারিয়ে অজ্ঞেয়বাদী (Agnostic) হয়ে উঠলেন। প্রবন্ধটি পড়া যাবে এখান থেকে –

    My Religious Belief -Charles Darwin

    এই প্রবন্ধটি ছাড়াও আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ (সেই লেডি হোপের মিথ্যা কাইহিনী সহ আরো কিছু) আমাদের ডারউইন দিবসের ইংরেজী সেকশনে রাখা আছে।

  2. বন্যা ফেব্রুয়ারী 14, 2009 at 8:44 পূর্বাহ্ন - Reply

    আই জাহেদ, তোমার কি মাথামুথা খারাপ হয়ে গেল। এই সব উৎসর্গ আবার কি জিনিষ, মনে হইতেসে জানি মইরা গেসি বা যাইতেসি আমি তাই আমার আত্মারে উৎসর্গ করতেস। ফাজলামি করার জায়গা পাও না। তোমার লেখাটা কিন্তু দারুন হইসে।
    মুক্তমনা পাবলিকেশনে দেখলাম তুমি কইসো, একটা বিজ্ঞানের সিরিজ শুরু করবা, তাড়াতাড়ি শুরু কর আর অগাষ্টের মধ্যে শেষ কইরা ফালাও, যাতে ২০১০ সালের বই মেলায় বাইর কইরা ফালানো যায়, প্রকাশক পাওয়া কোন ব্যাপার না…। আমি আসলে ইরতিশাদ ভাইয়ের লেখা দেইখাও ভাবতেসি ওনারে কমু বিবর্তনের ভুল ধারণাগুলা নিয়া একটা বই নামায় ফালাইতে। এবারে ডারউইন দিবসে বিভিন্ন ব্লগ দেইখা বুঝলাম মানুষ তো বিবর্তন সম্পর্কে তেমন কিছ জানেই না, তাও বা যা জানে, তার বেশীরভাগই ভুলভাল জানে। এইটা মনে হয় বই হিসেবে বাইর করা জরুরী হয়ে গেসে…।

  3. শিক্ষানবিস ফেব্রুয়ারী 13, 2009 at 6:39 অপরাহ্ন - Reply

    খুব ভাল লাগল। প্রথাগত সবকিছু থেকে বেরিয়ে আসাটাই সবচেয়ে বড় সার্থকতা। যারা মুক্তিচিন্তা শুরু করেন তারা কিছুটা হলেও সেটা প্রকাশ করতে শুরু করেন। ডারউইন বা আইনস্টাইনের সেরকম কিছু বক্তব্য ও লেখাও তাই সভ্যতার অমূল্য সম্পদ।

মন্তব্য করুন