ডারউইন বিবর্তনবাদের আলোকে মার্ক্সবাদ এবং গান্ধীবাদ  

বিপ্লব পাল


                          
ডারউইন বিবর্তনবাদের প্রভাব সমগ্র মানব দর্শনের ওপর এত সুগভীর, অরিজিন অব স্পেসিস লেখার পর থেকে, শুধু, ধর্মবাদিরাই ডারউইনকে আক্রমন করেন নি। মার্ক্স এবং এঙ্গেলেস দুজনেই ডারুইনের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন-অন্যদিকে তৎকালীন মার্ক্সবাদ বিরোধিরাও “সারভাইভাল অব ফিটেস্টকে” ধনতন্ত্রের বিজয় বলে আহ্লাদে আপ্লুত হয়েছেন ( এখনো এই ধরনের অজ্ঞলোকের অভাব নেই)। সমস্যা হচ্ছে এদের কেও প্রাকৃতিক নির্বাচন বোঝেন নি-জীবজগতের প্রক্রিয়াগুলি, মানব সমাজে প্রযোজ্য কি না, তাই নিয়ে খুব বেশী গবেষনা তখনো হয় নি।

তবে গত দেড়শো বছরে ডারউইনবাদ সমাজবিজ্ঞানে প্রযোজ্য কি না, তাই নিয়ে হাজারে হাজারে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ, বই লেখা হয়েছে এবং হচ্ছে। ডারউইনবাদকে সমাজ দর্শনে ঢোকানো মানেই লোকে চোখ কান বুঝে স্যোশাল ডারউইনিজমের কথা জানে-যা ঘৃণ্য, ডারউইনবাদের সাথে কোন সম্পর্ক নেই এবং পরিত্যক্ত। কিন্তু সেটাও আবার অতিসরলীকরন- স্যোশাল ডারউইনিজম যেমন একটি অবুঝ বিকৃতি, তেমন, প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রভাব মানব সমাজ, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসকে প্রভাবিত করে কি না-সেই নিয়ে গবেষনা অতি সজীব। পক্ষে বিপক্ষে গবেষনালদ্ধ ফলের অভাব নেই-বই এর অভাব নেই। পুরো সাবজেক্টটাকে বায়োলজিক্যাল রিডাকশনিজম বলে। অর্থাৎ সমাজবিজ্ঞানের সুত্রগুলির বেসিস বা হিউরিস্টিক, প্রানীবিজ্ঞান থেকে পাওয়া যেতে পারে কিনা-এই নিয়ে বিজ্ঞানী মহলেই রয়েছে বিরাট বিতর্ক-যা এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধে লেখা সম্ভব না। তার মধ্যে থেকেই আমরা নিরেপেক্ষ ভাবে বোঝার চেস্টা করবো, পথে ঘাটে ধনতন্ত্রবাদি, সমাজতন্ত্রীদের ডারউইনকে ভাঙিয়ে খাওয়ার চেস্টা বা গান্ধীবাদিদের ডারউইনবাদের বিরোধিতা, আদৌকি আধুনিক বিজ্ঞান সমর্থন করে?

তারও আগে আমরা দর্শন শাস্ত্রের গভীর থেকে বিষয়টিকে বোঝার চেস্টা করি। সমাজ বিজ্ঞান এবং সামাজিক বাস্তবিকতা-এই বিজ্ঞান বনাম বাস্তবের পার্থক্যটা বুঝতে হবে আগে। বৈজ্ঞানিক সুত্র আসলে কি? আমাদের চারিদিকে ঘটে যাওয়া সামাজিক সত্য যা আমরা দেখি বা বাস্তবে উপলদ্ধি করি, তার সবকিছুই কি কোন না কোন বৈজ্ঞানিক সুত্রের বহিঃপ্রকাশ? মানব সমাজে যা কিছু ঘটে যাচ্ছে বা ইতিহাস যেভাবে বিবর্তিত তার সব কিছুই কি কোন সুত্র ধরে হচ্ছে? যেমনটা মার্ক্সবাদিরা দাবি করেন? নিউটনের সুত্রের মতন, কিছু ‘ ল ‘বানিয়ে কি মানব সমাজ এবং সংস্কৃতির ইতিহাসকে বোঝা যায়? এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর, সমাজ, রাষ্ট্র এবং অর্থনীতিবিজ্ঞানে অতীব গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞান মানে কিছু পর্যবেক্ষন থেকে আমরা সুত্রে আসার চেষ্টা করি-অর্থাৎ কোন একটা সিস্টেমের মধ্যে নিয়মের সন্ধান। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে জলের ধর্ম বোঝার জন্যে জলের অনুগুলি দ্বারা সংখ্যাতত্ত্ব বিজ্ঞান আমর তৈরী করেছি। অর্থাৎ একটা পরীক্ষালদ্ধভাবে প্রমানিত মাইক্রোসায়েন্সকে ভিত্তি করে আমরা মাক্রোজগতের সত্যে উপনীত হই। সমস্যা হচ্ছে একই ভাবে মানব সমাজে সূত্রের সন্ধান করা সম্ভব? কারন প্রতিটি মানুষের ধর্ম, মনের গঠন আলাদা। জলের দুটি অনু সর্বদাই এক। সমস্ত মানুষ যদি আলাদা হয় যাদের প্রত্যেকের ব্যাবহার এবং চিন্তা স্বতন্ত্র, তাহলে মনুষ্য সমাজের পর্যবেক্ষনগুলি বা ইতিহাস কি করে সূত্রের আকারে ধরা যায়? বস্তুত এই প্রশ্নটি সমস্ত পোষ্টমর্ডান দর্শনের ভিত্তিপ্রস্তর।

তাহলে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের বুজতে হবে দুটি মানুষ কতটা এক এবং আলাদা। এখানেই মার্ক্সবাদ এবং বায়োলজিক্যাল রিডাকশনে যারা বিশ্বাস করেন-তাদের দৃষ্টিভংগী পোস্ট মর্ডানিস্টদের থেকে আলাদা । তারা দেখান, মানুষের নির্মানের যে মাইক্রোসায়েন্স-সেটা দুটো মানুষের জন্যে এক। সুতরাং সমাজবিজ্ঞানের সুত্রে সেই মাইক্রোসায়েন্সের লেজ ধরেই উপনীত হওয়া যায়। উদ্দেশ্য এক হলেও, মার্ক্সবাদী এবং বায়োলজিল্যাল রিডাকশনের মানব নির্মান এক নয়। মার্ক্সবাদে মানুষের নির্মান সামাজিক-সেখানে বায়োলজিক্যাল রিডাকশনের বিজ্ঞানীরা পরিবেশ নির্ভর জীন ভিত্তিক মাইক্রোগঠন অনুসন্ধান করেন। ফলে মানব ইতিহাস এবং সমাজের বিবর্তনকে দেখার দৃষ্টিভংগীতে উভয় দর্শনই সুত্র বা নিয়মের সন্ধান করলেও-সেই সুত্রগুলি আলাদা এবং অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পর বিরোধি।

মার্ক্সীয় মানুষ সম্পূর্ণ বস্তুবাদি এবং সমাজের অংশ। সমাজ ব্যাতীত তার অস্তিত্ব নেই। মার্ক্সবাদে মানব মন সমাজ এবং প্রকৃতির প্রতিফলন। স্বতন্ত্র মনের অস্তিত্ব মার্ক্সবাদে নেই। সেই মন সমাজের অংশ মাত্র। তাই সমাজ বিবর্তনের সুত্রে মার্ক্সবাদে একটি ক্লোজড সিস্টেম কল্পনা করা হয়। মানে সামাজিক বিবর্তনের ওপর পরিবেশের প্রভাব এখানে একে বারেই আসে না-বিবর্তন এখানে হচ্ছে সমাজের ভেতরে থাকা দ্বন্দগুলি থেকে [1]।

কিন্তু প্রাকৃতিক নির্বাচন একটা ওপেন সিস্টেম। ডারউইন ধরে এগোলে মানব সমাজের বিবর্তনের ইতিহাস সম্পূর্ণ পরিবেশ নির্ভর হওয়া উচিত। কারন প্রকৃতিই যোগ্যতম মিউটেশনটিকে নির্বাচন করে। মানুষের ভাষা, গায়ের রঙ এবং বেশ কিছু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অবশ্যই পরিবেশ নির্ভর। এটা খুব ভালো ভাবেই প্রমান করা যায় এবং স্বীকৃত ও বটে। ভাষার বিবতর্নের সাথে জীনের মাইক্রো-ইভল্যুশনও প্রমানিত। কিন্তু তার মানেই এটা মেনে নেওয়া যায় না-সমাজ বিজ্ঞানের সবকিছুই বায়োলজিল্যাল রিডাকশনিজম বা জ়ৈবিক সুত্রে বাঁধা যায় [2]। যেমন ধরুন রাশিয়াতে বা পশ্চিম বঙ্গে কমিনিউস্টরা কেন এসেছিল-তা কি পরিবেশ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়? তবে যেখানে খাদ্য উৎপাদন সহজ, ঐতিহাসিক ভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জল বেশী, সেখানে কি সমাজতান্ত্রিক চিন্তার প্রভাব বেশী? কারন লোকজন অলস এবং পরিশ্রমী নয়? এসবই হবে অতিসরলীকরন। কেন-তা নিয়ে পরে আলোচনা করছি।

ডারউইনিজমের বিরুদ্ধে কার্ল মার্ক্সঃ** মার্ক্স অরিজিন অব স্পেশিস পড়েন ১৮৬০ সালে। প্রথমে তার প্রতিক্রিয়া ছিল সদার্থক। ফার্দিনান্দ ল্যাজলেকে এক চিঠিতে লিখলেন (জানুয়ারী, ১৮৬১) :

 

Darwin’s work is most important and suits my purpose in that it provides a basis in natural science for the historical class struggle” (K. Marx and F. Engels, _Collected Works_, Vol. 41, p. 246; International Publishers, 1985)।

 

কিন্ত একবছরের মধ্যেই পালটি খেলেন-কারন তখন “সারভাইভাল অব ফিটেস্টের ” বিকৃত ব্যাখ্যাকে কাজে লাগিয়ে-সমাজতান্ত্রিক চিন্তার বিরুদ্ধে স্যোশাল ডারুইনিস্টরা প্রচারে নেমেছে। মার্ক্সও আসলে প্রাকৃতিক নির্বাচন ঠিক ঠাক তখনো বুঝে উঠতে পারেন নি-ফলে তিনি ভুল করে ডারুইনকেই আক্রমন করে বসলেন পরের বছরঃ

 

Darwin rediscovers among the beasts and plants, the society of England with its divisions of labour, competition, opening up of new markets, ‘inventions,’ and Malthusian ‘struggle for existence.’

 

আসলেই ডারউইন নিজে এমন কিছু লেখেন নি। হার্বাট স্পেন্সার, উইলিয়াম গ্রাহাম সামার এরাই ডারউইনের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে ধণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার সাফাই গাইছিলেন। এসবের সাথে যে প্রাকৃতিক নির্বাচনের সম্পর্ক নেই-তা মার্ক্স বোঝেন নি। ফলে ১৮৬৬ সালে প্রকাশিত পিয়ের ট্রীম্যাক্সের বিবর্তন তত্ত্বকে-যা বিবর্তনের পদ্ধতির মধ্যে থাকা র‌্যান্ডমনেসকে অস্বীকার করে এবং বহুদিন আগেই পরিতক্ত,তাকে স্বীকৃতি দিয়ে বসলেন![1]

 

Trémaux’s great improvement was that he placed progress at the center of his conception of evolution, whereas “Darwin regards [progress] as purely accidental …” (_Collected Works_, Vol. 42, p. 304).

 

আসলে মার্ক্সের ভয় ছিল-ডারউইনবাদের প্রভাবে তার তত্ত্বকে লোকে যদি অস্বীকার করে [3]! কারন তিনি তখন ধরেই নিয়েছেন-ডারউইনবাদ ধনতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা এবং সেই প্রতিযোগিতা ভিত্তিক সারভাইভাল অব দি ফিটেস্টকে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। এসবই ছিল হার্বাট স্পেন্সার কতৃক ডারউইনবাদের বিকৃতি-এবং সেটা মার্ক্স বুঝতে অসমর্থ হৌন।

 

বায়োলজিক্যাল রিডাকশনিজম কি সত্য?

 

এটা বুঝতে-এর বিরুদ্ধ মতকেই আমরা প্রথমে বিশ্লেষন করব। এই ধারনার মূলে প্রথম আঘাত হানেন ডেভিড হাল [(The Philosophy of Biological Science [1974])]। এদের মূল বক্তব্য হচ্ছে জেনেটিক্সের সাথে ফেনোটাইপের-অর্থাৎ জেনেটিক কোডের সাথে মানুষের নানান আচারন বা নির্মানের একটা যোগসুত্র তৈরী করা অসম্ভব। মনে রাখতে হবে সেটাও ত্রিশ বছরে আগের কথা। হিউম্যান জেনোম প্রজেক্ট বা সুপার কম্পিউটার বা মাইক্রোসায়েন্সের এই উন্নতি তখনও হয় নি [4]। ফলে জেনেটিক কোডের সাথে ফেনোটাইপের ম্যাপিং যত উন্নত হচ্ছে, ততই আমরা মানব প্রকৃতির সাথে জেনেটিক কোডের সম্পর্কটা আর ভাল বুঝতে পারছি। এবং সেটাই পরে জৈব সমাজবিজ্ঞানীরা লুফে নিয়ে, তাদের হিউরিস্টিক হিসাবে কাজে লাগাচ্ছেন। যেমন ধরুন-পুরুষ নারীর থেকে বেশী এগ্রেসিভ কি না-তা নিয়ে অনেক গবেষনা হয়েছে যা নারীবাদের ধারনাকেই পালটে দিতে পারে। জীবজগতে পুরুষ নারীর থেকে অনেক বেশী হিংসাত্বক এবং খাদ্য সংগ্রহের কাজেও অনেক বেশী রিস্ক এবং পরিশ্রম করে থাকে। এটা প্রমানিত সত্য। এটা মানব সমাজেও দেখা যায় বলে অনেক সমাজবিজ্ঞানীরা দাবি করছেন। এবং সামাজিক হিংসার গবেষনায় এসব তথ্য ব্যাবহৃত হচ্ছে। অনেক নারীবাদিরা এইসব জৈবসামাজিক গবেষনাকে মানতে চাইছেন না। তাতে অবশ্য গবেষনা থেমে নেই-তা নিশ্চিত ভাবেই পুরুষকে অনেক বেশী আক্রমনকারী হিংসাত্মক জীব হিসাবেই দাবী করে***। বায়োলজিল্যাল রিডাকশনিজমের সমর্থকরা বলছেন, মানব মনে মাইক্রোসায়েন্স বুঝতে-সেই বিবর্তনের গভীরেই যেতে হচ্ছে [2]। প্রথমত মানব মন নিয়ে গবেষনা এখনো শৈশবে-কোন নিউরোলজিক্যাল মডেল নেই, যা মানুষের মনোবিজ্ঞানের মাইক্রোসায়েন্স হিসাবে ধরা যেতে পারে। তাতে অবশ্য মার্ক্সবাদিদের হোলদোল নেই। কারন তারা সব দেড়শো বছর আগে থেকেই জেনে বসে আছেন! তাই মার্ক্সবাদিদের সাথে ধার্মিকদের কোন পার্থক্য নেই। হিন্দুরা যেমন মনে করে উপনিষদ হাজার বছর আগে মানব প্রকৃতি জেনে ফেলেছিল। মুসলমানরা আবার এক পা এগিয়ে বলে কোরানে গোটা পৃথিবীর জ্ঞান আছে। তেমন মার্ক্সবাদিরাও দাবী করে মানব মন মানুষের সামাজিক নির্মান মার্ক্সবাদ দিয়ে গেছে!! আসলে এদের সবাই মানসিক রুগী এবং অজ্ঞানের অন্ধকারে ডুবে আছে। বাস্তব সত্য হচ্ছে নিউরোবিজ্ঞানীরা মোটামুটি বুঝতে পারছেন-মূলত দুটি জিনিসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে মানব মন [2]। প্রথমটা স্যাইন্যাপসের স্ট্রাকচার এবং তার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত বিভিন্ন সিগন্যাল। দ্বিতীয়টি হচ্ছে নিউরোএক্টিভ পেপটাইড দ্বারা কৃত সিগন্যালের ট্রান্সমিশন, রিশেপশন এবং মডুলেশন। স্তন্যপায়ী প্রানীদের মনের গঠনের সাথে এব্যাপারে মানব মনের গঠনের খুব কম পার্থক্যই দেখা যায়। হবে হ্যাঁ-মানুষের মনে নিউরনের সংখ্যা অনেকটা বেশী-অর্থাৎ মানব মন যদি ২ গিগাবাইটের র‌্যাম আর ৪ গিগাহার্জের প্রসেসর হয়-শিম্পাঞ্জীদের মন হচ্ছে ১ গিগাবাইট র‌্যাম আর ২ গিগাহার্জের প্রসেসর। অনেকটাই সেই রকম। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতিগুলোর মেক্যানিজম এক-কিন্তু মানব মন অনেক বেশী বিবর্তিত বলে-‘হয়ত’ ফিডব্যাক লুপ অনেক বেশী। তাই মানব আচরন অনেক ভদ্র! কিন্তু হিটলার স্ট্যালিন বা ধর্মীয় দাঙ্গার সময়, আমরা দেখতে পাচ্ছি মানবমন পশুর থেকেও বেশী হিংসাত্মক হয়ে উঠছে। আবার এইসব ঘটনার পুরোটাই যে বায়োলজিক্যাল রিডাকশনিজম দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে তা নয়।

 

ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে কি বায়োলজিক্যাল রিডাকশনিজম নস্যাৎ করে?

 

মার্ক্সীয় ঐতিহাসিক বস্তুবাদের বিরুদ্ধে ডারুইনিয়ান ঐতিহাসিক বস্তবাদ নিয়ে বিতর্ক চলছে। আমি অবশ্য এটাকে বিতর্কের মর্যাদা দিতে চাইছি না। কারন ডারউইনিয়ান ঐতিহাসিক বস্তুবাদের বিরুদ্ধে যারা লিখছেন-সেইসব লেখা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোন জার্নাল পেপারনা। ইন্টারনেটে গলাবাজি করে, বৈজ্ঞানিক ভাবে বাতিল মর্গানের নৃতত্ত্ববিদ্যাকে আশ্রয় করে-নিজেদের অস্তিত্বকে টেকানোর চেস্টা। যা যুক্তিবাদিদের বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদি বা ইসলামিস্টরাও করে থাকে।

ডারুইনিয়ান ঐতিহাসিক বস্তুবাদ দাঁড়িয়ে আছে ” মানব সংস্কৃতির” প্রাকৃতিক নির্বাচনের ওপর। এবং এই নির্বাচনের পেছনে মানব সমাজের রিপ্রোডাক্টিভ ফিটনেস কাজ করে। অর্থাৎ মানুষ যে সংস্কৃতি তৈরী করে, তার মধ্যে সেইগুলিই বেঁচে থাকে, যা মানব সমাজের প্রজননগত বৃদ্ধিকে সেই পরিবেশে সাহায্য করে। এই তত্ত্বদিয়ে ধর্মীয় রক্ষনশীলতা এবং তাতে নারীর ক্ষুন্ন মর্যাদার খুব পরিষ্কার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। অথচ একই বিষয়ের ওপর, ঐতিহাসিক বস্তুবাদি ব্যাখ্যা এঙ্গেলেসের লেখা (The Origin of the Family, Private Property and the State, 1884)

মর্গানের রূপকথাকে আশ্রয় করে আরেকটি রূপকথা।

অর্থাৎ ফ্যামিলি, সমাজ, ধর্ম, নারীর রক্ষনশীল অবস্থান-এসবই যদি আমরা সমাজের রিপ্রোডাক্টিভ ফিটনেসের দৃষ্টিতে দেখি, তাহলে অনেক কিছু জলের মতন পরিষ্কার হয়ে যায়-এবং আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে আরো ভাল অবস্থান নিতে পারি।এবং তা আমাদের অভিজ্ঞতা দিয়েই বুঝতে পারি।

আমি কিছুটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেস্টা করছি।

(১) মানব সমাজের আদি থেকেই যুক্তিবাদি বা নাস্তিকরা ছিল। কিন্তু সমাজটা অতীতে বা এখনো রক্ষনশীলদের সমাজ হল কেন?এখনো সমাজে নাস্তিকরা নগন্য। শুধু বই পড়েই নাস্তিক হয় এমনটাও ভুল। শুধু স্বাভাবিক বুদ্ধি খাটিয়েই যে কেও নাস্তিক হতে পারে। তাহলে ধর্মীয় সমাজের উৎপত্তি হল কেন?

এর ব্যাখ্যায় শ্যেনান গবেষনা করে দেখান [5]

ক) সমাজ এবং ফ্যামিলির সংস্কৃতি পরবর্ত্তী প্রজন্মে স্বাভাবিক ভাবেই ঢুকে পরে। কারন, মানুষের সংস্কৃতি বা ধর্ম নিয়ে অবস্থান এইসব ব্যাপারগুলো কিশোর কিশোরীদের ১৪-১৫ বছরের মধ্যেই তৈরী হয়। ফলে আমরা দেখী মুসলিম সমাজের বিজ্ঞানীদের

৯২% ঈশ্বর বিশ্বাসী-হিন্দুবিজ্ঞানীদের ৫৪% আর আমেরিকাতে খ্রীষ্ঠানদের মধ্যে সেটা দাঁড়ায় ৮%। শৈশবে ঈশ্বরের ভাইরাস মাথায় ঢোকার পর সেটা থেকে উদ্ধার পাওয়া মুশকিল এমনকি বৈজ্ঞানিকদেরও! প্রশ্ন হচ্ছে ঈশ্বরের বিশ্বাসটা ভাইরাসের মতন ঢুকে গেল-অথচ যুক্তিবাদি নাস্তিকরা ঐতিহাসিক

ভাবে হেরে গেল! মৌর্য্য সম্রাজ্যের সময় ভারতীয় সমাজের একটা বড় অংশ ছিল নাস্তিক-জৈন বা বৌদ্ধ।

তাদের হারিয়ে প্রথমে সনাতনী হিন্দুরা এবং পরে ইসলাম, কিভাবে ভারত দখল করে?

খ) এর উত্তর অবশ্যই রিপ্রোডাক্টিভ ফিটনেসেই পাওয়া যাবে। সনাতন হিন্দুধর্ম এবং ইসলামের সাথে বৌদ্ধ এবং জৈনধর্মের পার্থক্য থেকে এটা আরো ভাল বোঝা যাবে।*****

(১) হিন্দু এবং ইসলামে হিংসা ও অহিংসা, দুটোকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। শুধু হিংসা বা শুধু অহিংসা, দুটোই সমাজের রিপ্রোডাক্টিভ ফিটনেসের জন্যে ক্ষতিকর। স্তন্যপায়ী সমাজে বেঁচে থাকার জন্যে হিংসা এবং অহিংসা-দুটোরই আশ্রয় নিয়ে থাকে। কোরান এবং গীতা- উভয় গ্রন্থেই হিংসা এবং অহিংসা নিয়ে অনেক উপদেশ আছে। গীতা যেহেতু ডায়ালেক্টিক পদ্ধতিতে লেখা,

অর্জুন অহিংসার পক্ষে এবং তার যুক্তি কেটে কৃষ্ণ হিংসার পক্ষে সওয়ার করেছেন। এসবই সমাজের রিপ্রোডাক্টিভ ফিটনেসের জন্যে। শুধু হিংসার আশ্রয় নিলে, সমাজই টিকবে না। আবার শুধু অহিংসা দিয়ে সমাজের শান্তি রক্ষা করা অসম্ভব। সেই সমাজ বহির্শত্রুর আক্রমনে ধ্বংশ হওয়া যাওয়াটাই স্বাভাবিক। যা বৌদ্ধদের ভাগ্যে ঘটেছিল। হিন্দু রাজা এবং মুসলমান আক্রমনকারীরা বৌদ্ধধর্মকে ভারতে সম্পূর্ন ধ্বংশ করে।

(২) বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মে মেয়েদের অবস্থান হিন্দু এবং ইসলামের থেকে অনেক উন্নত। হিন্দু এবং ইসলাম-উভয় ধর্মেই মেয়েদের মূলত “প্রজনন মেশিন” হিসাবেই দেখা হয়েছে এবং রক্ষনশীলতার বিধি নিশেধগুলি সেখান থেকেই এসেছে। এর কারনও সেই রিপ্রোডাক্টীভ ফিটনেস। কারন সেকালে শিশুমৃত্যুর হার ছিল অস্বাভাবিক বেশী। একজন নারীর ছয় থেকে আটটি বাচ্চা না হলে সেই সমাজের বৃদ্ধিত দূরের কথা, টিকে থাকাটাই হয়ত সম্ভব হত না। ফলে সব ধর্মেই, বিশেষত হিন্দুধর্মে নারীধর্মের আদর্শ হচ্ছে ‘মা’-এটাও সমাজের প্রজননকে সুরক্ষিত করার জন্যেই। এসব ব্যাখ্যা মার্ক্সবাদের সামন্ততন্ত্র বা পিতৃতান্ত্রিক সমাজ দিয়ে করতে গেলে একটা হাঁসজারু মার্কা ইতিহাস প্রসব হবে। রক্ষনশীলতার ব্যাখ্যায় শ্রেনীতত্ত্ব টানা অতীব হাস্যকর। মেয়েদের গর্ভের অধিকার অর্জন করতে রাজা-প্রজা-বুর্জোয়া-বিপ্লবী, সবাই সমান রক্ষনশীল।

কিন্তু এই রক্ষনশীলতা কি আজকের দিনে দরকার? এখনত শিশুমৃত্যু নেই! রাশিয়া মতন ফার্টিলিটি রেট একে নেমে এলে, মেয়েদের এস উ ভি বা অনেক টাকা পুরষ্কারের লোভ দেখিয়েও সমাজের প্রজনন বাড়ানো যায়। রাশিয়াতে এই ভাবেই ২০০১ সাল থেকে ২০০৮ সালে ফার্টিলিটি রেট দ্বিগুন করা হয়েছে। এর জন্যে মোটেও রক্ষনশীলতা বা ধর্মের ডোজের দরকার লাগে নি।

সুতরাং আমরা খুব পরিষ্কার ভাবেই বলতে পারি-রিপ্রোডাক্টিভ ফিটনেসের জন্যে আগে ধর্মের বা রক্ষনশীলতার প্রয়োজন ছিল। বিজ্ঞানের উন্নতিতে আজকে সেই প্রয়োজন অবলুপ্ত। সুতরাং বর্তমানে সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্যে ধর্মের আর ভালো কিছুই দেওয়ার নেই। তাই এইসব পুরানো ধারনা নিয়ে বসে থাকলে, সেই রাষ্ট্রএর রিপ্রোডাক্টিভ ফিটনেস আসলেই কমে যাবে।

 

 গান্ধীবাদ এবং রিপ্রোডাক্টিভ ফিটনেসঃ

জৈবসামাজিক গবেষনায়, এটা এখন বেশ হট কেক। আগেই লিখলাম রিপ্রোডাক্টিভ ফিটনেসের জন্যে হিংসা এবং অহিংসা দুটোই সমানভাবে লাগে। মহত্মা গান্ধী যদিও মনে করতেন জৈন্ বা বৌদ্ধধর্ম থেকেই তিনি এই অনুপ্রেরণা পেয়েছেন এবং তার ধারনা ডারউইনবাদের বিপক্ষে যায়। কারন গান্ধীর সমসাময়িক সময়ে হিটলার এবং স্ট্যালিন স্যোশাল ডারউইনিজমের উদ্ধুদ্ধ হয়ে,দেদারে মানুষ মারছেন পিঁপড়ের মতন। সেই ত্রিশ বা চল্লিশের দশকে সারভাইভাল অব ফিটেস্ট মানে হিংসা এবং প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বকে নিশ্চিত করাকেই বোঝাত-ফলে মার্ক্স থেকে গান্ধী-সবাই ডারউইন বুঝতে, স্যোশাল ডারউইনিজমই বুঝে গেছেন। এবং মার্ক্সের মতন গান্ধীও ডারউইনকে গালাগাল দিয়েছেন। ডারউইনের কি অসীম সৌভাগ্য-কার্ল মার্ক্স এবং গান্ধী,সহস্রাব্দীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিকরাও তাকে ভুল বুঝেছেন! তবে মনে রাখতে হবে, হিংসা এবং অহিংসার মিশ্রন যে দরকার, এবং শুধু অহিংসাতে বেঁচে থাকা যায় না, সেটা গান্ধী কিন্তু বলে গেছেনঃ Where choice is set between cowardice and violence, I would advise violence… I prefer to use arms in defense of honor rather than remain the vile witness of dishonor ..”  (1921) বিবর্তনের দৃষ্টিতে আলট্রুইজম বা পরোপোকারকে ব্যাখ্যা করার পর, গান্ধীবাদকে আমরা এখন বিবর্তনের দৃষ্টিতেই আরো ভালভাবে বুঝতে সক্ষম। আলট্রুইজমকে রিপ্রোডাক্টিভ ফিটনেস দিয়ে ব্যাখ্যা করেন উইলিয়াম হ্যামিলটন (১৯৬৪) [6]। উনি দেখান, একটি আলট্রুইস্ট জিন প্রাকৃতিক নির্বাচনে জয়ী হবে যখন, অন্যের উপকার করে, নিজে যে উপকার পাচ্ছে [B]]>(উপকার করার জন্যে তার খরচ [C]/ উপকারীর সাথে উপকৃতের সম্পর্ক[r]) অর্থাৎ বিশুদ্ধ উপকার বলে কিছু হয় না। সব উপকারীই ধান্ধাবাজ এবং বিনিময়ে সে কিছু চাইছে। উপকারীর সাথে উপকৃতের সম্পর্কের কতগুলো মান আছে। এবং তা নির্ভর করে উপকারীর সাথে উপকৃতের জেনেটিক সম্পর্ক কত কাছের।  যেমন বাবা-ছেলেদের সম্পর্কে বা দুই ভাইএর মধ্যে r=1/2, দাদু, নাতি r=1/4, কাজিন ভাইবোনেদের মধ্যে r=1/8,একই নৃতাত্ত্বিক গোষ্টিতে r=1/20. এর কাছাকাছি। অর্থাৎ ভাইবোন বা সন্তানের প্রতি আমাদের সহজাত একটা পরোপকার সব সময় কাজ করে। কারন তার আর আমার জেনেটিক কোড প্রায় এক। সে বাঁচলে, তার ছেলে-পুলে, নাতি নাতনির মধ্যে আমার জীনও বাঁচে!

 

আবার ধরুন, এই আমেরিকাতে, আমি দেখেছি, একজন ভারতীয়র সাথে বাংলাদেশী বা পাকিস্তানীদের অনেক বেশী বন্ধুত্ব হয়-দেশে হাজার শত্রুত্ব সত্ত্বেও। কারন আমরা একই জীনপুলের অন্তর্গত। আমার মনে আছে রোমে, আমি একজন বাংলাদেশি ফেরিওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম ভ্যাটিক্যান কোথায়? সে আমাকে সোজা ট্রামে করে ভ্যাটিক্যানে পৌঁছে দিল। সেই সময় তার ব্যাবসার ক্ষতি হল সে দেখল না। এর কারন বাঙালী হিসাবে আমরা একই জীনপুলের অন্তর্গত। আমার দৃঢ় বিশ্বাস বাঙালীদের মধ্যে ধর্মের ভাইরাস ঢুকিয়েও আমাদের হিন্দু মুসলমানে আলাদা করা যায় নি। হ্যামিলটনের তত্ত্বের পরবর্ত্তীকালে অনেক পরিবর্ত্তন হয়েছে। দুর্বল এবং সবল, লংটার্ম শর্টটার্ম, রেসিপ্রক্যাল, রিয়াল-ইত্যাদি নানান রকমের পরোপকারের তত্ত্ব আবিস্ক্বৃত হয়েছে। অবশ্য একথা ভাবার কারন নেই-পরোপোকারের সবকিছুই বিবর্তন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। ইচ্ছাশক্তি এবং স্বাধীন চিন্তা করার ক্ষমতা মানুষের মনের আছে-সুতরাং মানুষের ব্যবহারের অনেকটাই বিবর্তন মেনে হলেও, তার ব্যাতিক্রমও থাকবে। মানব মনের ইচ্ছাশক্তি এবং স্বাধীন চিন্তা-এই ব্যাতিক্রমের কারনেই মার্ক্সবাদ, গান্ধীবাদ থেকে শুরু করে হিন্দুত্ববাদ বা ইসলাম-কোন দর্শনই মানব সমাজের ভবিষ্যত নির্নয় করবে না। তা করবে একমাত্র মানুষ এবং তার সমাজের গণতান্ত্রিক বিবর্তন।  

 

**Karl Marx was originally excited about Darwinism. But as the social Darwinists, started using survival of fittest for argument against socialism, he turned against them. Later, when it was pointed out main difference between Darwinian and Marxist evolution is-Marxist evolution is deterministic, Marx turned against indeterminism in Darwinism.

*** In reality, evidence suggests, both males and females can be aggressive depending on social environment and age. More reference to biological reduction and male domination: 1.Masculinities and Crime: Critique and Reconceptualization of TheoryBy James W. MesserschmidtPublished by Rowman & Littlefield, 1993ISBN 0847678695, 97808476786932. 2.A 2004 PhD thesis http://www.pitt.edu/~pittanth/grad/research/putzphd.html

3.http://www.bio-medicine.org/medicine-news/Attitude-Of-Male-Dominance-May-Affect-Life-Expectancy-In-Men-4891-1/ 

 

****Religion and reproductive fitness
1.Religion is Not about God: How Spiritual Traditions Nurture Our Biological Nature and what to Expect when They FailBy Loyal D. Rue “Published by Rutgers University Press, 2005ISBN 0813535115, 9780813535111
2.http://www.jstor.org/pss/656398 
3.Correlation of Intergenerational Family Sizes Suggests a Genetic Component of Reproductive FitnessAnna Pluzhnikov:Am J Hum Genet. 2007 July; 81(1): 165–169. Published online 2007 May 2. The American Society of Human Genetics4. Reproductive fitness and North Indian Muslim society: Journal of Human Eco..http://www.krepublishers.com/02-Journals/JHE/JHE-19-0-000-000-2006-Web/JHE-19-2-000-000-2006-Abstract-PDF/JHE-19-2-107-112-2006-1364-Aarzoo-S/JHE-19-2-107-112-2006-1364-Aarzoo-S-Text.pdf
5. Standford Library: 4.Religion & Sciencehttp://plato.stanford.edu/entries/religion-science/

সুত্রঃ

[1] Geoffrey M. Hodgson, _Economics in the Shadows of Darwin and Marx: Essays on Institutional and Evolutionary Themes, Cheltenham, UK: Edward Elgar, 2006

[2] The Biological Roots of Human Nature: Forging Links Between Evolution and Behavior By Timothy H. Goldsmith Published by Oxford University Press US, 1994 

[3] Marxism and Darwinism By Anton Pannekoek, Nathan Weiser Translated by Nathan Weiser Published by C. H. Kerr & company, co-operative, 1913

[4]Darwinian Reductionism: Or, How to Stop Worrying and Love Molecular Biology. Alex Rosenberg. x + 263 pp. University of Chicago Press

[5]Nolan, Paul. 2002a. “A Darwinian Historical Materialism.” In Paul Blackledge and Graeme Kirkpatrick, eds.,  Historical Materialism and Social Evolution. Basingstoke: Palgrave Macmillan.

[6] http://plato.stanford.edu/entries/altruism-biological/

[186 বার পঠিত]