ভিক্ষুকমুক্ত বাংলাদেশ এবং মন্ত্রীর কথা প্রসঙ্গ

আবুল হোসেন খোকন

 

বেশ অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম ভিক্ষাবৃত্তি নিয়ে লিখবোকিন্তু সে লেখার আগেই আমাদের নতুন অর্থমন্ত্রী ভিক্ষাবৃত্তির উপর ভাষণ দিয়ে ফেলেছেনতিনি গত ৫ ফেব্রয়ারি ঢাকার একটি অনুষ্ঠানে ঘোষণা দিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে ভিক্ষাবৃত্তি চিরতরে শেষ করে ফেলবেনতিনি বলেছেন, আমাদের দেশ থেকে ভিক্ষাবৃত্তি খতম করতে হবে, পাঁচ বছর পর আমরা দেশে কোন ভিক্ষুক দেখতে চাই না, আশা করছি আমাদের সরকার পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকাকালেই আমরা ভিক্ষাবৃত্তি দূর করতে পারবোতিনি দেশে ভিক্ষুকের সংখ্যা বৃদ্ধির  একটা হিসেবেও দিয়েছেন এবং বলেছেন, এখন এ সংখ্যা আরও কিছুটা বেড়েছেএ ভিক্ষাবৃত্তির সমস্যা দূর করা তেমন কোন কঠিন কাজই নয়একটু আন্তরিক হলেই এটি দূর করা সম্ভবতিনি ভিক্ষাবৃত্তি দূর করতে একটি মডেল দাঁড় করার কথাও বলেছেন

 

অর্থমন্ত্রী কোথায়-কাদের সামনে এসব বলেছেন সে বিষয়ে পরে আসা যাকতার আগে ভিক্ষাবৃত্তি নিয়ে প্রসঙ্গ শুরু করা যাককথা হলো আমাদের দেশ থেকে, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলো থেকে ভিক্ষাবৃত্তি সত্যিই দূর করা দরকারআমাদের জন্য দরকার একটি ভিক্ষুকমুক্ত স্বদেশকিন্তু প্রশ্ন হলো আমাদের দেশে কারা ভিক্ষুক, তারা কতো প্রকার, কি কি এবং কীভাবে তাদের খতম করা যাবে ইত্যাদি সম্পর্কে পরিস্কার থাকা আগে দরকারআমাদের দেশে ভিক্ষাবৃত্তি কিন্তু প্রধানত দুই পর্যায়ে হয়অর্থা বাংলাদেশে ভিক্ষুক দুই প্রকারএক প্রকারে আছে এরা শীর্ণকায়-জীর্ণকায়এরা রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে, রাস্তায় বা বস্তিতে থাকেআর ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করেএদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিসার কোন সুযোগ বা অধিকার নেইএরা নিজেদের ঘরে বউ-বাচ্চা-স্বামী বা নিকটজনরা না খেয়ে আছেবলে ভিক্ষা চায়অবশ্য এটা ঠিক যে, এই শ্রেণীতে পেশাদার ভিক্ষুকের সংখ্যাও কম নয়এরা বউ-বাচ্চা-নিকটজনদের কষ্টের কথাবলে ভিক্ষা করেএটাই ওদের আয়ের পথ বা ব্যবসায়িক পেশাএজন্য এরা নানা ফন্দি-ফিকিরও করে থাকেআবার পেশাদার এইসব ভিক্ষুকদের অনেকের আবার ভাল সহায়-সম্পত্তিও আছেভিক্ষা করেই হয়তো ওরা এসব করেছেসহায়-সম্পদ থাকার পরেও এরা ভিক্ষা করে এবং এভাবেই চলেযাইহোক এসব নিয়ে বিস্তারিত বিবরণে যেতে চাই নামূল কথা হলো, ভিক্ষুকদের মধ্যে সত্যিকারের একটা শ্রেণী আছে যারা গরিব, অসহায় এবং তারা রাস্তা-ঘাটে থাকে

 

দুই শ্রেণীর ভিক্ষুকের আরেকটা শ্রেণীর অবস্থা পুরো উল্টোএরা রাস্তা-ঘাটে থাকে না, জীর্ণ-শীর্ণও নয়এরা পাজেরো-বিএমডাব্লু গাড়িতে চড়ে, আলিশান বাড়িতে থাকে চাকর-বাকর নিয়ে রাজার হালেএয়ার কন্ডিশন ছাড়া এরা চলতে পারে নাএদের পা কখনও মাটিতে পড়ে নাহ্যাঁ পড়ে, তবে তখন মিডিয়ার ক্যামেরা থাকতে হয়মাটিতে পা পড়লে, রাস্তায় নামলে, বিলে-ঝিলে নামলে সঙ্গে ওইসব ক্যামেরা থাকতে হয়, নামা অবস্থায় ছবি ধারণ করতে হয়ছবি ধারণ হওয়া শেষ কি তাদের চরণ পড়াও শেষএরা ভিক্ষা করে বিমানে চড়ে দেশ-বিদেশে গিয়ে বড় বড় ডোনারদের কাছেভিক্ষা করে ওই সাধারণ ভিক্ষুকদের মতোই নিজের দেশের মানুষ না খেয়ে আছে, কষ্টে আছেইত্যাদি বলেবলে এরা বিশাল অঙ্কের ডলার, পাউন্ড, ইয়েন, দিনার ইত্যাদি নিয়ে আসেএসে সেগুলোর বড় অংশ নিজেদের সেবার জন্য ব্যয় করেআর কিছু মিটিং-ফিটিং এবং তৃণমূল নামের জায়গাগুলোতে গিয়ে নানা কায়দায় বিলি করার কাজ করেআগেই বলেছি, এসব কাজের সময় মিডিয়ার ক্যামেরা থাকতে হয়না থাকলে চলে নাআর যে বিলি করা, সেটার মধ্যেও রাজ্যের মারেফতি আছেএসব বলে শেষ করা যাবে নাসৌভাগ্য যে এই ভিক্ষুকদের কিছু কৌশলের সঙ্গে নিজেও পরিচিত হতে পেরেছি একেবারে কাছে থেকেএকটা ভিক্ষাবৃত্তিতে দেখেছি যে, তারা ভিক্ষা নিয়ে এসে কমিউনিজমের প্রচার চালায়চালায় কিন্তু নিজেরা কমিউনিজমের কও বিশ্বাস করে নাবরং কমিউনিজমের নামে মানুষকে বিভ্রান্ত করে, সত্যিকারের কমিউনিজম থেকে মানুষকে সরিয়ে আনে, আর কিছু ভাল মানুষকে ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহার করে ফায়দার পর ফায়দা লোটেসাম্রাজ্যবাদী নেটওয়ার্কের ডোনারদের অর্থে এ ছাড়া আর কি-ই বা হতে পারে! সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ কি কখনও কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্র চায়? চায় নাবরং কমিউনিজম-সমাজতন্ত্র নাশ করতে মুখোশ পড়ে নানা তপরতা চালায়এখানেও সেটাই করা হয়এতো গেল একটা দিকআমি আরও ভাল ভাল নাম ব্যবহার করে এই কারবার করতে দেখেছিএছাড়া গরিবি দূর করা, দুর্গত মানুষকে সাহায্য করা, সচেতনায়ন করা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য সেবাসহ কতো নামে যে এসব কারবার চলছে তা একটু তাকালেই দেখা যায়যারা এসব করছে তারা সবাই ভিক্ষাবৃত্তি করে এগুলো করছে, স্রেফ নিজস্ব স্বার্থেএরা করছে, কিন্তু সত্যি সত্যিই মানুষ বা দেশের জন্য করছে নাকরলে এতোদিনে এদেশ থেকে যেমন গরিবিও দূর হয়ে যেতো, মৌলবাদ-সন্ত্রাসবাদ দূর হয়ে যেতো, যতোরকম সমস্যা-বিপদ-আপদ আছে সব দূর হয়ে যেতোভিক্ষাবৃত্তি বলে কোন কিছু আর থাকতো নাকিন্তু হচ্ছে উল্টোটাঅর্থা এদের কারণে সব ধরণের সমস্যা আরও বেড়েছে, বাড়ছে, আর বাড়ছেইচাই কি পুরো দেশটা শুধু ঋণের জালে জড়িয়েই যাচ্ছেমজার ব্যাপার হলো, দেশের মানুষের সমস্যা যতো বেড়েছে, ভিক্ষুকদের ভিক্ষাবৃত্তির সুযোগও ততো বেড়েছেএই বাড়ার জন্যই তো এতোসবএতে সাধারণ মানুষের কিছুই হয়নি, হবেও নাআসলে মানুষের কোন লাভ নেই মহা-ক্ষতি ছাড়া

 

ভিক্ষাবৃত্তির ওপর যারা বেঁচে থাকে, টিকে থাকে, বা এটাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে চলার লক্ষ্যে থাকেÑ তাদের অনেক রকম কৌশল করেই চলতে হয়মানুষকে ঠকাতে কৌশল ছাড়া উপায়ও নেইযেমন যে সাধারণ শ্রেণীর ভিক্ষুকের কথা বলেছিÑ তারা অনেকে শিশু জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই এদের দলে-পিশে বিকলাঙ্গ বানায়, যাতে ভবিষ্যতে একে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানো যায়কেও কেও আবার তাজা মানুষকে কাফনের কাপড়ে ঢেকে মৃত মানুষ বলে কারবার চালায়কেও আবার হাসাপতাল থেকে বেওয়ারিশ লাশ বাগিয়ে তা দিয়েও ফায়দা লোটেএরকম হরেকরকম কৌশল আছেঠিক একইভাবে পাজেরো-বিএমডাব্লুতে চড়া, এয়ারকন্ডিশনে থাকা ভিক্ষুকরাও তাদের মতো করে কৌশল করে এবং নিজেরা রাজকীয়হালে চলেএখানে আরেকটা কথা হলো, বিদেশি ডোনারদের কাছে যারা ভিক্ষে করে, তারা যে শুধু এদেশের একটা বিশেষ শ্রেণীর লোক তাই-ই নয়, সরকারী লোকেরাও এরমধ্যে আছেনতারাও ডোনারদের কাছে ভিক্ষাবৃত্তি করেনকরে তারাও কিন্তু দেশটার বারোটা বাজানসুতরাং এখানে যদি সরকারী-বেসরকারী মিলে যায়Ñ তাহলে কী অবস্থা হতে পারে ভাবাই যায় নাঅতএব সমস্যা বড় জটিল…………

 

হ্যাঁ, এবার দেখা যাক আমাদের অর্থমন্ত্রী কোথায় গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি খতমের ভাষণ দিয়েছেনতিনি ওইদিন রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে দেশের ৫০টি এনজিওকে অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে এ ভাষণ দিয়েছেনঅর্থা যাদের নিয়ে বলছি, সেই তাদের সঙ্গে বসেই অর্থমন্ত্রী ভিক্ষাবৃত্তি খতমের কথা বললেন! সত্যিই কী বিচিত্র…………তিনি বিদেশি ডোনার বা দাতাদের যারা গ্রাহক, যারা ভিক্ষাবৃত্তি করে দেশের বারোটা বাজাচ্ছেÑ সেই তাদেরই বললেন ভিক্ষাবৃত্তি দূর করতে ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন করতে হবেবললেন পাঠাগার স্থাপন, বস্তি সমস্যার সমাধান করতে! মনে হয়েছে মন্ত্রী বোধহয় জানেন-ই না কিছুজানেন না ওরা কিভাবে দেশকে ক্রমে গরিবির দিকে ঠেলে দিয়ে নিজেরা লালে লাল হয়, কিভাবে দেশের মানুষকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যের অনৈতিক কানাগলিতে ঠেলে দেয়, কিভাবে দেশকে সাম্রাজ্যবাদের বিচরণভূমিতে পরিণত করে, মৌলবাদের বিস্তার ঘটায়, সংঘাত-সহিংস্রতার জন্মদিয়ে বাইরের শক্তিকে নাক গলানোর ক্ষেত্র তৈরি করে দেয় এবং দেশকে বিদেশি পণ্যবাজারে পরিণত করে, দেশের মানুষকে সস্তা শ্রমিক ও পণ্যে পরিণত করেমন্ত্রী যদি কুমিরের কাছে গিয়ে কুমিরকে কবুতরের বাচ্চা লালন-পালনের কথা বলেন, তাহলে যে কী হবে সেটা বলে দেবার অপেক্ষা রাখে না

 

আসলে আমাদের যে জায়গা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার, যে ভিক্ষুকদের বিতাড়ন করা দরকারÑ সেই তাদেরই বা সেই জায়গায়ই যদি মিশে যাওয়া হয় তাহলে ভিক্ষাবৃত্তি খতমের কথা স্বপ্নই থেকে যাবেএভাবে বরং পাঁচ বছরে পাজেরো-বিএমডাব্লু চড়া ভিক্ষুকদের উপাতে দেশের মানুষকে আরও বেশী সর্বনাশের শিকার হতে হবে, চিড়ে-চ্যাপটা হয়ে যেতে হবেসুতরাং ভিক্ষাবৃত্তি সত্যিই খতম করা প্রয়োজন দেশের স্বার্থে, আত্মগৌরবের স্বার্থে, স্বনির্ভরতার স্বার্থে, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বার্র্থে এবং অগ্রগতি-উন্নয়নের স্বার্থেএজন্য রাঘববোয়ালদের আগে চিহ্নিত করতে হবেতাদের ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করতে হবেতাদেরকে সুপথে ফিরিয়ে এনে মানুষ বানাতে হবেউল্টো পথে না হেঁটে সোজা পথে হাঁটতে হবেঅর্থা সত্যি সত্যিই ভিক্ষাবৃত্তি দূর করতে হলে আগে এই পাজেরো-বিএমডাব্লু চড়া ভিক্ষুকদের কমাতের হবে, খতম করতে হবেতাহলে হারজিরজিরে এবং রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকা যেসব সাধারণ ভিক্ষুক বা ভিক্ষাবৃত্তি আছে তা আপনা-আপনিই খতম বা দূর হয়ে যাবেএরজন্য চেষ্টা করলে পাঁচ বছরও অপেক্ষা করতে হবে না

 

[৬ ফেব্রয়ারি ২০০৯ ঢাকা, বাংলাদেশ]

 

আবুল হোসেন খোকন : সাংবাদিক, লেখক ও কলামিস্ট

[60 বার পঠিত]