তারা সন্ধিপত্র তৈরি করতে থাকুন, ইতিমধ্যে আসুন দেখা যাক, যুদ্ধের মাঠে ও যুদ্ধের নিকটবর্তী সময়ে কে, কোথায়, কী বলেছিলেন। হজরত আম্মার (রাঃ) তাঁর অধীনস্থ আলির একদল সৈন্যকে যুদ্ধে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ভাষণ দিচ্ছিলেন-

‘বন্ধুগণ, তোমরা কি শুনো নাই, নবীজি জীবিতকালে বহুবার বলেছেন, যে লোক আমার আলিকে দুঃখ দেবে, মনে করো সে আমাকেই দুঃখ দিল, যে লোক আমার আলির বিরুদ্ধাচরণ করবে, মনে করো সে আমারই বিরুদ্ধাচারণ করলো। তোমরা কি জানো না এই মুয়াবিয়া একজন বিধর্মী, ইসলামের শত্রু, সে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের প্রেমে ইসলাম গ্রহণ করে নাই? তার রাজপ্রাসাদে অমুসলিম নারীদের আনাগোনা, বিধর্মীদের সাথে তার মেলামেশা। আমরা জেহাদ করছি নবীজির শত্রুদের বিরুদ্ধে, বিধর্মী শাসকের হাত থেকে ইসলামকে বাঁচাতে।’

হজরত আম্মারের (রাঃ) কথা সম্পূর্ণই সত্য। মুয়াবিয়া এবং তাঁর পিতা আবু-সুফিয়ান স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন নাই। ঘটনাটি ছিল এরকম : মক্কা বিজয়ের পরপরই নবি মুহাম্মদ (দঃ) কোরায়েশ নেতা আবু সুফিয়ানকে তাঁর একটি খাস কামরায় তলব করলেন। বুদ্ধিমান আবু সুফিয়ান ঘরে ঢুকেই ঘরের পরিবেশ দেখে অনুমান করতে পারলেন, কী জন্যে তাঁকে ডাকা হয়েছে? মুহাম্মদের (দঃ) ডানে বামে দুইজন লোক দাঁড়িয়ে আছেন। হজরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) তাদের একজন। ইবনে আব্বাসের চাদরের নিচে তলোয়ার লুকানো। কোরায়েশ নেতার বুঝতে বাকি রইলো না, মুহাম্মদ (দঃ) তাকে কী প্রশ্ন করবেন। মাথা দেবে, না মুহাম্মদের অধীনতা মেনে নেবে? আবু সুফিয়ান অধীনতা মেনে নিলেন। ঘরে গিয়ে পুত্র মুয়াবিয়াকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পরামর্শ দিলেন। মুয়াবিয়া বললেন- ‘এ কী বলছেন আপনি? এই সেদিন বদরের যুদ্ধে আপনার চোখের সামনে মুহাম্মদ আমার দুই ভাইকে খুন করেছেন। আপনি নিজের হাতে আপনার ছেলেগণকে দাফন করেছেন। পুত্রশোকে মা আমার পাগলবেশে মক্কার অলিতে-গলিতে গড়াগড়ি করেছেন। ইসলাম গ্রহণ করবো না, আমি এর প্রতিশোধ নেবো।’ আবু সুফিয়ান বললেন- ‘শত্রুকে শক্তিবলে পরাজিত করতে না পারলে, তার দলে যোগদান করা বুদ্ধিমানের কাজ, প্রতিশোধ নেয়ার সময় একদিন আসতেও পারে’।
হজরত ওবায়দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) মুয়াবিয়ার সৈন্যদলের এক সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। ওবায়দুল্লাহ, দ্বিতীয় খলিফা সাহাবি হজরত ওমরের (রাঃ) সেই সন্ত্রাসী পুত্র, যিনি উসমানের শাসনামলে, তিনটি নিরপরাধ মানুষের খুনের আসামী, যাকে জনতার আদালতে হজরত আলি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন, আর উসমান তাকে বেকসুর মুক্তি দিয়েছিলেন। আজ সিফফিনের ময়দানে সাহাবি হজরত ওমরের (রাঃ) পুত্র ওবায়দুল্লাহ ও সাহাবি হজরত আবুবকরের (রাঃ) পুত্র মুহাম্মদ একে অপরকে বধ করতে অস্ত্র হাতে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। হজরত ওবায়দুল্লাহ ইবনে ওমর তাঁর সৈন্যদেরকে বলেন-

‘আমিরুল মোমেনিন হজরত মুয়াবিয়ার সমর্থক সিপাহী সাথীরা, আমার চক্ষের সামনে হজরত উসমানের খুনীকে (মুহাম্মদ ইবনে আবুবকরকে ইঙ্গিত করে) স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি। যে সকল খুনীদের বিচার আলি করতে পারেননি, আজ এই মাঠে তাদেরকে হত্যা করে আমরা খলিফা উসমানের হত্যার প্রতিশোধ নেবো, আমরা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবো’।

ওবায়দুল্লাহর সেই সাধ পুরণ হয়নি। কিছুক্ষণ পরেই আলির সৈন্যের তীরের আঘাতে তার সর্বাঙ্গ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। উবায়দুল্লাহর মরদেহ কেউ না তুলেই পলায়নের পথ খুঁজছিল। ওবায়দুল্লাহ যা বলছিলেন, তা আংশিক সত্য। মুহাম্মদ ইবনে আবুবকর, উসমান হত্যায় জড়িত ছিলেন কিন্তু আলির ৯০ হাজার সৈন্যদলের সবাই উসমান হত্যার পক্ষে ছিলেন না। সত্য কথা হলো, মুয়াবিয়ার দলেও উসমান হত্যায় জড়িত অনেক লোক ছিলেন। মুয়াবিয়া অতি কৌশলে কিছু লোককে সোনা-দানা, টাকা-পয়সা ইত্যাদি দিয়ে, যাকে যেভাবে পারেন লোভ-প্রলোভন দেখিয়ে তার পক্ষে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। সুতরাং হজরত আলি (রাঃ) উসমান হত্যার বিচার করলেও সিফফিন যুদ্ধ এড়াতে পারতেন না।

মোহরম মাসে যুদ্ধ বিরতির সময়ে মুয়াবিয়ার এক যোদ্ধাকে হজরত হাশিম ইবনে উৎবা (রাঃ) বলেন-

‘তোমাদের হয়েছেটা কী? তোমরা কেন বুঝতে পারছ না, উসমানকে কেন আমরা হত্যা করেছি? উসমান নিজের পছন্দের লোক দিয়ে কো্রান লিখিয়েছেন। নবী পরিবার ও কোরানের অবমাননা করেছেন, আগুন দিয়ে কোরান পুড়িয়েছেন। যারা জালিম খলিফা উসমানকে হত্যা করে নবীর শরিয়ত প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তারা তো নবীর বিশ্বস্ত লোক। তোমরা কি নবী পরিবারের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে’?

হজরত আলি একে একে বেশ কয়েকজন সাহাবির নাম উল্লেখ করে তাদের চারিত্রিক পরিচয় দিলেন। তন্মধ্যে মুয়াবিয়া, হজরত আমর ইবনে আ’স, হজরত আবি মুয়্যাত, হজরত ওবায়দুল্লাহ ইবনে ওমর, হজরত আব্দুল্লাহ বিন সা’দ ইবনে-আবি সারাহ, ও হজরত হাবিব মাসলামাহ অন্যতম। আলি বললেন-

‘মুয়াবিয়া বিধর্মী, ওবায়দুল্লাহ সর্বজন নিন্দিত সন্ত্রাসী-খুনী, আমর ইবনে আস লুটেরা ডাকু স্বৈরাচারী, ইবনে আবি সারাহ নিজে কোরান লিখে এখনো কোরান আল্লাহর বাণী বলে বিশ্বাস করে না, আবি মুয়্যাত ও হাবিব মাসলামাহ্ দেশদ্রোহী, মিথ্যাবাদী, বিশ্বাসঘাতক। তোমরা সবাই এদেরকে না চিনলেও আমি ছোটবেলা থেকে এদেরকে চিনি, জানি। তোমরা বিশ্বাস করো, এ জেহাদ মিথ্যের বিরুদ্ধে সত্যের জেহাদ, এ জেহাদ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জেহাদ।’

শেষ পর্যন্ত ৭০ হাজার মানুষের প্রাণনাশের পর যুদ্ধ থামলো। এবার সন্ধিপত্র লেখা হবে। মক্কা, মদিনা, কুফা, সিরিয়ার বড় বড় প্রবীণ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত। লেখক লিখলেন- ‘পরম করুণাময় আল্লাহর নামে, এই মর্মে আমিরুল মোমেনিন হজরত আলি (রাঃ) ইবনে আবি তালিব ও হজরত মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান…’ থামুন! বজ্রকণ্ঠে আমর বিন আস লেখককে থামিয়ে দেন। কী ব্যাপার? লেখক জিজ্ঞেস করেন। আমর বিন আস বলেন- ‘আমিরুল মোমেনিন হজরত আলি (রাঃ) লাইনটি কেটে ফেলা হউক। আলি তোমাদের আমিরুল মোমেনিন হতে পারেন, আমাদের নন’। সঙ্গে সঙ্গে হজরত আলির বুকটা ছ্যাত করে ওঠে! যেন একটা বিষ-মাখানো তীর তাঁর বুক ভেদ করে পৃষ্ঠদেশ দিয়ে বেরিয়ে গেলো। আলি বুঝলেন, মুয়াবিয়া বহুদিনের পুরনো একটি ঘটনার হুবহু পুনরাবৃত্তি ঘটালো। সেদিন মুহাম্মদ (দঃ) ও কোরায়েশদের মধ্যকার ঐতিহাসিক ‘হুদাইবিয়া-সন্ধি’কালে একই ঘটনা ঘটেছিল। ঐ দিন কলম ছিল আলির হাতে। আলি লিখছিলেন, ‘পরম করুণাময় আল্লার নামে, এই মর্মে আল্লাহর রসুল মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ্ ও …’ থামুন! কোরায়েশ প্রতিনিধি সুহায়েল ইবনে আমর ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর রসুল কথাটি বাদ দিয়ে শুধু মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ লেখা হউক, মুহাম্মদ তোমাদের রসুল হতে পারেন, আমাদের নয়’। হজরত আল আহনাফ (রাঃ) বললেন, ‘দোহাই আপনাদের, হজরত আলির নাম থেকে ‘আমিরুল মোমেনিন’ উপাধিটি মুছে ফেলবেন না, নবি বংশকে জগত থেকে চিরদিনের জন্যে মুছে ফেলার এ এক জঘন্য ষড়যন্ত্র’। নবিজির কথা মনে পড়ায় আলির চোখের জলের বাধ ভেঙে যায়। ফোটা দু-এক অশ্রু গাল বেয়ে তার দাড়ি ভিজিয়ে দিল। জীবনে নবিজি দুজন মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, একজন আলি, আর একজন হজরত ফাতেমা (রাঃ)। বহু কষ্টে নিজেকে সংযত করে, ‘হুদাইবিয়া-সন্ধি’ কালে নবিজি যেভাবে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর রসুল কথাটি বাদ দিয়ে শুধু মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ লেখা হউক’ ঠিক সেভাবেই আলি বললেন- ‘ঠিক আছে ‘আমিরুল মোমেনিন’ কথাটি কেটে দিয়ে ‘আলি ইবনে আবু তালিব’ হোক।’ উভয়পক্ষের প্রতিনিধি প্রধানগণ পরামর্শ দিলেন, যতদিন পর্যন্ত কমিটি তাদের সিদ্ধান্ত ব্যক্ত না করেছেন, ততদিন পর্যন্ত আলির লোকজন আলিকে ও মুয়াবিয়ার লোকজন মুয়াবিয়াকে তাদের খলিফা হিসেবে মেনে চলবে। কেউ কাউকে আক্রমণ করতে পারবে না। কমিটি সিদ্ধান্ত প্রকাশ করার সময় নিলেন কমপক্ষে ছয় মাস। এবার নিজ নিজ লাশ গ্রহণের পালা। মানুষের রক্তে পিচ্ছিল মাঠ, হাটতে গিয়ে অনেকেই বারবার হোঁচট খেল। উভয়পক্ষের সত্তর হাজার মানুষ আর গৃহে ফিরে এলো না। স্বামীহারা বিধবাদের আর্তচিৎকার, পিতৃহারা শিশুদের ক্রন্দনরোল শুনা গেল আরব দেশের ঘরে ঘরে বহুদিন।

কয়েক মাস পর আজ তত্ত্বাবধায়ক কমিটি কোরান নিয়ে বসেছেন কোরানিক ফয়সালা দিতে। হায়রে জগতের অভাগা মুসলমান! মুয়াবিয়ার প্রতিনিধি প্রধান সিংহরূপী আমর ইবনে আস-এর সামনে, আলির প্রতিনিধি প্রধান আবু মুসা ‘মুষিক ছানা’র সমান। প্রবীণ নেতা আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) আবু মুসাকে ধূর্ত আমর ইবনে আস সম্পর্কে সতর্ক করে দিলেন। তিনি বললেন- ‘সাবধান আবু মুসা, এই ধূর্ত মানুষটা মিশরের গভর্নর থাকাকালীন সময়ে খলিফা উসমানও তাঁকে ভয় পেতেন। খলিফার নিযুক্ত মিশরের গভর্নর আব্দুল্লাহ বিন সা’দকে বাধ্য করেছিল তার সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে’। আমর ইবনে আস হজরত আবু মুসাকে এক গোপন বৈঠকে আহ্বান করলেন। মুয়াবিয়ার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আমর, আবু-মুসাকে মাত্রাতিরিক্ত সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখালেন। শাহি ভোজন ও আপ্যায়ন পর্ব সমাপন করে আমার ইবনে আস আবু-মুসাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার কি মনে হয় আলি কোনোদিন উসমান হত্যার বিচার করবেন?’ আবু মুসা উত্তর দেন, ‘উসমান হত্যা পূর্ব সময় থেকে এ পর্যন্ত যা কিছু হয়েছে, আমি মনে করি এসব কিছুর জন্যে হজরত আলি ও মুয়াবিয়া সমভাবে দায়ী’। এ উত্তরটাই হজরত আমর ইবনে আস কামনা করেছিলেন। তারিখ ঘোষণা করে সমাবেশ ডাকা হলো বিচারকদের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হবে। সমাবেশে আমর ইবনে আস খুব নম্র ভাষায় বিনয় সহকারে অনুরোধ করলেন, আবু-মুসা যেন প্রথম বক্তব্য প্রদান করেন। আবু-মুসা ঘোষণা দেন :

‘আমারা তত্ত্বাবধায়ক কমিটি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, আজ থেকে আলি ও মুয়াবিয়া উভয়ের খেলাফত অবৈধ ঘোষণা করা হলো। সাধারণ নির্বাচানের মাধ্যমে জনগণ নতুন খলিফা নির্বাচিত করবেন।’ তারপরই আমর ইবনে আস তার বক্তব্যে ঘোষণা দেন: ‘আবু মুসার সাথে আমিও একমত। রাজনীতিতে আলি সম্পূর্ণই নতুন। খলিফা হওয়ার যোগ্যতা তাঁর এখনও হয়নি। কিন্তু এই মুহূর্তে রাজ্যের আইন প্রশাসন বলতে কিছুই নেই। জাতি আজ এক অশুভ রাহুগ্রস্থ। এই সঙ্কটময় দিনে আমীরুল মোমেনীন হজরত মুয়াবিয়ার মতো একজন বিচক্ষণ, দক্ষ রাজনীতিবিদ আমাদের প্রয়োজন’। 

বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো আবু মুসার মাথায়। গালি দিয়ে উঠলেন অশ্লীল ভাষায়। শুরু হলো কোরানের ‘কালাম-যুদ্ধ’। দুনিয়ার যত অশ্লীল গালি আছে তারা ছুঁড়তে থাকলেন একে অপরের প্রতি। আলির প্রতিনিধি দল চিৎকার করে তেলাওত করলেন কোরানের ৭নং সুরা ‘আল আলাফে’র ১৭৫নং আয়াত : ‘আর তাদেরকে পাঠ করে শুনাও ওর বৃত্তান্ত, যাকে আমি আমার নির্দেশাবলী পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু সে ওসব থেকে দূরে সরে যায়, আর শয়তান তার পিছু নিল, কাজেই সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়’। আলির সমর্থকগণ মিছিল বের করে শ্লোগান দিতে থাকলেন ‘মুয়াবিয়া শয়তান! মুয়াবিয়া শয়তান!’ অপরপক্ষে মুয়াবিয়ার লোকজন নিয়ে এলো ৬২নং সুরা আল জুমুআ’র ৫ ও ৬ নং আয়াত দুটো : ‘যাদের তাওরাতের ভার দেয়া হয়েছিল তারপর তারা তা অনুসরণ করেনি, তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে গাধার মতো, সে শুধু গ্রন্থরাজির বোঝাই বইছে। কত নিকৃষ্ট সে জাতির দৃষ্টান্ত যারা আল্লাহর নির্দেশাবলী প্রত্যাখ্যান করে। আর আল্লাহ অন্যায়কারীকে সৎ পথে চালান না, এবং বলো, ওহে, যারা ইহুদি-মত পোষণ করো, যদি তোমরা মনে করো যে, লোকজনকে বাদ দিয়ে তোমরাই আল্লাহর বন্ধু-বান্ধব তাহলে তোমরা মৃত্যু কামনা করো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’।

কোরান থেকে ‘কালাম-যুদ্ধ’ করতে করতে তারা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারলেন না। সম্মেলন ভঙ্গ হয়ে যায়। শান্তি প্রদানে ব্যর্থ কোরান বুকে নিয়ে তারা বাড়ি ফিরলেন। হজরত আলি কুফায় বসে সম্মেলনের এ সংবাদ শুনে খুবই আহত হলেন। আকাশ পানে দু-হাত তুলে লম্বা একটি দোয়া করলেন: ‘হে দয়াময়, মহা-শক্তিমান প্রভু, তোমার সর্বনিকৃষ্ট গজব অর্পিত করো তাদের ওপর, বিশেষ করে মুয়াবিয়া, আমর ইবনে আস, আবুল আওয়ার আল সুলাইমি, আবি সারাহ, হাবিব ইবনে মাসলামাহ, আব্দুর রহমান বিন খালিদ, জাহাক বিন কায়েস আর অলিদ বিন উকবার ওপর।’ আলির এই দোয়া আল্লাহর কাছে পৌঁছিল কি না জানা যায়নি, তবে মুয়াবিয়ার কানে যথা সময়েই পৌঁছিল। মুয়াবিয়া জুমার নামাজের জন্যে খুতবায় নতুন কিছু আয়াত সংযোজন করতে তার সেক্রেটারিকে নির্দেশ দিলেন। মুয়াবিয়া সেদিন থেকে আইন করে প্রতি শুক্রবার খুতবায়, নবি পরিবার অর্থাৎ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, হজরত হামজাহ, হজরত আলি, হজরত ফাতেমা, হজরত হাসান ও হোসেনকে অভিশাপ দেয়া বাধ্যতামূলক করে দেন। হুজুর ইবনে আদি নামে একজন মুসলমান মুয়াবিয়ার এ আদেশ অমান্য করায় মুয়াবিয়া তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ঘটনাটা হজরত মৌলানা আবুল আলা মওদুদি (রঃ)-তাঁর ‘খেলাফত ও মুলকিয়াত’ কেতাবের ৪র্থ অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন (আমরা এখানে সংক্ষিপ্ত করে তুলে ধরছি) :

“হুজর ইবনে আদি নবীজির প্রিয়ভাজন একজন ধর্মভীরু মুসলমান ছিলেন। হজরত মুয়াবিয়ার (রাঃ) শাসনামলে যখন মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে হজরত আলিকে ভর্থসনা ও অভিশাপ দেয়ার প্রচলন শুরু হয়, মৃত্যু ভয়ে অনেকেই প্রতিবাদ করার সাহস পেলো না। কুফা নগরীতে হজরত হুজর ইবনে আদি (রাঃ) মুয়াবিয়াকে প্রত্যাখান করতঃ আলির (রাঃ) প্রশংসা করতে লাগলেন। হজরত মুগিরা (রাঃ) কুফার গভর্নর থাকালীন সময়ে ইবনে আদির কোন অসুবিধা হয়নি কারণ তখনো কুফায় খুতবায় অভিশাপ দেয়ার প্রচলন শুরু হয়নি। কিন্তু বসোরার গভর্নর হজরত যিয়াদের (রাঃ) আমলে কুফাকে যখন বাসারার অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যিয়াদ (রাঃ) জুমআর খুতবায় হজরত আলিকে অভিশাপ দেয়া শুরু করে দেন। হুজর ইবনে আ’দি (রাঃ) এর প্রতিবাদ করলেন। একদিন ইবনে আদি (রাঃ) হজরত যিয়াদকে জুমার নামাজে দেরি করে না আসার জন্য সতর্ক করেন। হজরত যিয়াদ (রাঃ) ইবনে আদি ও তাঁর ১২জন সঙ্গী-সাথীর ওপর মিথ্যা দেশদ্রোহিতা ও খলিফা মুয়াবিয়াকে অভিশাপ দেয়ার অভিযোগ এনে তাদেরকে গ্রেফতার করে মুয়াবিয়ার নিকট সিরিয়া পাঠিয়ে দেন। মুয়াবিয়া অভিযুক্ত ৮জনকে মৃত্যুদণ্ড শাস্তি দেন। তাদের একজন সাথী হজরত আব্দুর রহমান ইবনে হাসানকে জীবিত মাটিতে পুঁতে হত্যা করা হয়।”

সম্মেলনের সংবাদ শুনে কুফার জনগণ কয়েক দলে বিভক্ত হয়ে যায়। হজরত আলি চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলেন। মুয়াবিয়ার সাথে সন্ধি স্থাপনের অজুহাতে ‘খোরাইজ’ গোত্র সরাসরি আলির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে দিলো। মধ্যপথে বিজয়ক্ষণে যুদ্ধ থামিয়ে দেয়ায় আরেক দল অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলো। অনেকে প্রকাশ্যে বলাবলি করতে লাগলো মুয়াবিয়া একজন সুদক্ষ, শক্তিশালী শাসক। দিন যত যায়, মুয়াবিয়ার দল বড় ও শক্তিশালী হতে থাকলো আর আলির খেলাফতের প্রাচীর ভেঙে একটি একটি করে ইট খসে পড়তে থাকলো। কিন্তু আলি থেমে যাওয়ার পাত্র নন। মুহাম্মদের (দঃ) রক্ত তাঁর শিরা-উপশিরায়। হজরত আলি মরণপণ প্রতিজ্ঞা করলেন, এ অপমানের প্রতিশোধ নেবেন। বিদ্রোহী চরমপন্থী মৌলবাদী ‘খোরইজ’ বা খারিজি দল আলি ও মুয়াবিয়া উভয়কে প্রত্যাখ্যান করে নিজস্ব একটি দল গঠন করলো। তারা আল্লাহর হুকুমত, কোরআনের শাসন কায়েম করতে চায়। তাদের মতে আলি ও মুয়াবিয়া দুজনই কোরআন-বিরোধী শাসক। সিফ্ফিনের যুদ্ধ পর্যন্ত এরা আলির পক্ষেই ছিল। যেহেতু আলি, মুয়াবিয়ার মতো একজন বিধর্মীর সাথে শান্তি-চুক্তিতে দস্তখত করেছেন এবং রাজ্যে শরিয়ার আইন প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছেন, সুতরাং তাদের দৃষ্টিতে হজরত আলিও একজন বিধর্মী। খারিজি দল ‘হারোরা’ নামক একটি গ্রামে সমেবেত হয়ে তাদের মতাদর্শ প্রচার করতে লাগলো। কিছুদিনের মধ্যেই তারা এক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী জঙ্গিবাদী দলে পরিণত হলো। তাদের সাথে ভিন্নমত পোষণকারীদের বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে, মানুষের গলা কেটে, জীবন্ত মাটিতে পুঁতে, নির্বিচারে হত্যা করে সারা এলাকায় ত্রাসের সৃষ্টি করে দেয়। হজরত আলি দিন-রজনী কষ্ট করে, বাড়ি বাড়ি ঘুরে তাবলিগ করে কিছু লোককে পুনরায় সিরিয়া আক্রমণের জন্যে রাজি করিয়েছিলেন। তিনি দেখলেন, এখন তাঁর সামনে সিরিয়া আক্রমণের চেয়ে বিদ্রোহী খারিজি দলকে দমন করা আবশ্যক হয়ে গেছে। এদিকে খারিজিরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে, মুয়াবিয়া, আলি ও আমার ইবনে আস এই তিনজনকে হত্যা না করা পর্যন্ত তারা ঘরে ফিরবেন না। তাদের শ্লোগান হলো ‘লা হুকমা ইল্লা লিল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহর শাসন ছাড়া কোনো শাসন নাই। হজরত আলি তাদের কাছে লোক পাঠালেন, বুঝাতে চেষ্টা করলেন যে, তিনি কোরআনের খেলাফ কোনো কাজ করেন নাই। ব্যক্তিগত পত্র লিখলেন- ‘রাজ্যে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে সকল আগে মুয়াবিয়াকে ধ্বংস করতে হবে। আর এ জন্যে তোমাদেরকে আমার সাথে যোগদান করে মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে যেহাদে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানাচ্ছি’। তারা পাল্টা উত্তর দিল, ‘আলি আপনি কোরআন অমান্যকারী, আপনিও কোরআন বুঝেন না’।

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওয়াহাবের নেতৃত্বে বিদ্রোহী খারিজি দল, তাদের ঘাঁটি স্থাপন করলো বাগদাদ থেকে ১২ মাইল দূরে ‘নাহরাওয়ান’ নামক স্থানে। বসোরাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে কিছু লোক এসে তাদের সাথে যোগদান করলো। ১২ হাজার সদস্যের খারিজি জঙ্গি দল এখান থেকেই রাষ্ট্রের সর্বত্র খাটি ইসলামি আইন বাস্তাবয়ন করবে। তাদের মূল মন্ত্র হলো রাজ্যের সকল সমস্যার ফয়সালা করবে একমাত্র কোরআন। খারিজিদেরকে নিজ দলে আনতে সকল প্রকার চেষ্টা করে হযরত আলি (রাঃ) ব্যর্থ হয়ে ৬০ হাজার সৈন্য নিয়ে সিরিয়া আক্রমণের যাত্রা পথে ‘নোখাইল’-এর উপত্যকায় এসে তাবু ফেল্লেন। আলির কাছে সংবাদ এল, সন্ত্রাসী খারিজিরা ‘নাহরাওয়ান’-এর গভর্নর হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে খাববাব (রাঃ) কে মুরগিকাটা কেটে খুন করেছে, সাথে গভর্ণরের অন্তসত্তা ক্রীতদাসী ও বনু-তায়ি গোত্রের তিনজন নিরপরাধ মহিলাকেও অত্যন্ত নির্মমভাবে তারা হত্যা করেছে। বিষয়টা তদন্ত করতে আলি, হজরত হারিস ইবনে মুররাহকে ‘নাহরাওয়ান’ প্রেরণ করলেন। খারিজিরা ইবনে মুহরাহকেও হত্যা করে ফেলে। আলির সন্দেহ হলো এই মুহূর্তে সিরিয়া আক্রমণ করতে গেলে খারিজিরা কুফা দখল করে নিতে পারে। হজরত আলি খারিজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন। ৩৮ হিজরীর সফর মাসের ৯ তারিখ খারিজিদের সাথে আলির যুদ্ধ হয়, যা ইতিহাসে ‘যুদ্ধে নাহরাওয়ান’ বা ‘খাল-যুদ্ধ’ নামে অভিহিত। আলির শক্তিশালী সৈন্যগণ অতি অল্পসময়ের মধ্যেই খারিজিদের ১২ হাজার সদস্যকে তাদের তলোয়ারের নিচে কতল করতে সক্ষম হলেন। মাত্র ৯জন খারিজি পলায়ন করে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল। দুই বছর পর ৪০ হিজরিতে এই ৯জনের তিন জন মিলে হজরত আলিকে মসজিদ প্রাঙ্গণে খুন করে। খারিজিদেরকে হত্যা করে আলি ভেবেছিলেন একটা আপদ গেলো, এবার সিরিয়া আক্রমণ করতে আর কোনো অসুবিধে নেই। কিন্তু বিধি বাম, আলির সৈন্যগণ আর কোনোমতেই যুদ্ধ করতে রাজি হলো না। হজরত আলির বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের অধিপতি হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ভগ্ন হৃদয়ে কুফায় ফিরে গিয়ে আলি নিজের লোকজনকে ভীরু-কাপুরুষ বলে ধিক্কার দিয়ে শান্ত হয়ে যান। এদিকে আলির এই নীরবতা হজরত মুয়াবিয়ার মোটেই ভাল লাগলো না। মুয়াবিয়ার দৃঢ় সংকল্প, ‘আমি সেই দিন হবো শান্ত, যেদিন জগতের মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেয়ার মতো হাশেমি বংশের কেউ থাকবে না।’

মুয়াবিয়া জানেন এখন আলি ও মুয়াবিয়ার মধ্যে সিংহ ও ছাগলের ব্যবধান। মুয়াবিয়ার বাবা আবু সুফিয়ান বলেছিলেন, ‘শত্রুর প্রতি প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ একদিন আসতেও পারে’। পূর্ণ প্রতিশোধ নেয়ার এখনো কিছুটা বাকি। সুতরাং দুর্বল ছাগলের শক্তিও আলির আছে কিনা পরীক্ষা করতে মুয়াবিয়া দিকে দিকে ছোট্ট ছোট্ট সেনাদল পাঠালেন। আজ থেকে কয়েক যুগ পূর্বে ঠিক যেভাবে নবি মুহাম্মদ রাতের অন্ধকারে একটি একটি করে আরব অমুসলিম গোত্রের ওপর অতর্কিতভাবে হামলা করে তাদের সহায়-সম্পত্তি, বাড়ি-ঘর দখল করেছিলেন, মুয়াবিয়ার সৈন্যগণ সেভাবেই একের পর এক আলির প্রদেশসমূহ দখল করতে লাগলো। ইসলামের জন্মভূমি ও নববি মুহাম্মদের রাজধানী মদিনা আক্রমণ করার জন্যে সাহাবি হজরত মুয়াবিয়া (রাঃ) হজরত বাশারকে সেনাপ্রধান করে একটি শক্তিশালী দল মদিনা পাঠালেন। হজরত বাশারের সৈন্যবাহিনী দানবের মতো আক্রমণ করে বসে মদিনার মানুষের ওপর। তারা ক্ষণিকের মধ্যেই সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ভেঙে তছনছ করে দেয়। ভীত-সন্ত্রস্ত মদিনাবাসী বিনা যুদ্ধেই মুয়াবিয়ার সৈন্যবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করলো। বিজয়ী বাশার মদিনাবাসীর উদ্দেশ্যে বললেন- ‘মদিনার লোক, যদি আজ খলিফা মুয়াবিয়ার নির্দেশ নিয়ে না আসতাম, আল্লাহর কসম মদিনার একটা পুরুষও আমি জীবিত রাখতাম না’। সেনাপতি বাশার, নবী মুহাম্মদকর্তৃক বনি মুত্তালিক গোত্রের ওপর আক্রমণের তুলনায় মদিনাবাসীর ওপর অশেষ করুণাই করলেন। সেদিন নবী মুহাম্মদ বনি মুত্তালিক গোত্রের একটা পুরুষকেও জীবিত রাখেন নাই, উপরন্তু তাদের সকল নারীদেরকে বন্দী করে তাঁর সেনাবাহিনীদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। মদিনা জয় করে বাশার, তার দল নিয়ে ইয়েমেন দখল করতে রওয়ানা হলেন। মদিনা পতনের সংবাদ পেয়ে হজরত আলি কাগুজে বাঘের মত কিছুক্ষণ গর্জন করলেন। কেউ তাঁর কথায় কর্ণপাত করলো না। মদিনার মত একই পদ্ধতিতে আক্রমণ করে সেনাপতি বাশার ইয়েমন দখল করে নেন। তবে সেখানকার গভর্ণর হজরত ওবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বাধা প্রদান করায় তাঁকেও তাঁর ছোট ছেলেকে বাশার হত্যা করেন।

ছোট ছোট রাজ্যগুলো দখল করে হজরত মুয়াবিয়া (রাঃ) এবার দৃষ্টি ফেললেন মিশরের ওপর। সেনাপতিকে নির্দেশ দিলেন, ‘তোমরা মিশরের গভর্নর আবুবকরের পুত্র মুহাম্মদকে হত্যা করতে পারবে না। তাকে বন্দী করে আমার কাছে নিয়ে আসবে, আমি নিজ হাতে তার বিচার করবো’। উল্লেখ্য, আবুবকর মদিনার খলিফা হওয়ার পর, হজরত আবু সুফিয়ান তাঁর পুত্র মুয়াবিয়াকে বলেছিলেন, ‘এই আবুবকর তোমার দুই ভাইয়ের হত্যাকারী, আমার বিশ্বাস তুমি একদিন এর প্রতিশোধ নেবে’। মুয়াবিয়ার সন্দেহ ছিল আলি কুফা থেকে সৈন্য পাঠিযে মিশর রক্ষা করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু আলির পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। সুতরাং মিশর দখল করতে মুয়াবিয়ার সেনাবাহিনীর তেমন বেগ পেতে হলো না। আবুবকরের পুত্র মুহাম্মদকে বন্দী করে মুয়াবিয়ার কাছে নিয়ে আসা হলো। মুয়াবিয়া ঠাণ্ডা মাথায় মুহাম্মদকে বলেন, ‘তোমাকে এমন মৃত্যু উপহার দেবো যা খলিফা উসমান হত্যার চেয়ে ভয়ঙ্কর, তরবারি ও বর্শার আঘাতে মৃত্যুর চেয়েও কষ্টদায়ক’। হজরত মুয়াবিয়া আবুবকরের পুত্র মুহাম্মদকে শুকনো খড়কুটা দিয়ে মুড়িয়ে বস্তাবন্দী করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেন। মুয়াবিয়ার মনে আছে, বদরের যুদ্ধে তার পিতা আবু সুফিয়ানের বিরুদ্ধে এই আবুবকর, তার পুত্র মুহাম্মদ ও তার কন্যা আয়েশা অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ কারণেই মুয়াবিয়া সেদিন ‘জামাল যুদ্ধে’ আলির বিরুদ্ধে আয়েশাকে সাহায্য করেননি।

হিজরি ৪০ সনের রমজান মাস। খারিজি দলের তিনজন লোক হজরত আলিকে হত্যার উদ্দেশ্যে মসজিদের পাশে অবস্থান নেয়। আলি মসজিদ থেকে বেরিয়ে, দ্বারপ্রান্থে আসামাত্র শাবির ও আব্দুর রহমান ইবনে মুলজাম, হজরত আলির মাথায় তলোয়ার দিয়ে সজোরে আঘাত করে। কিছুদিন পরেই ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে হজরত আলি কুফায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পিতৃশোকে কাতর আলির পুত্র হজরত হাসান (রাঃ) বাবার শোকসভায় বলেন- ‘আজ এমন একটি পবিত্র মাসে নবিজির শ্রেষ্ট মানুষটিকে ঘাতকরা হত্যা করলো, যে মাসে কোরআন শরিফ নাজিল হয়েছিল। যে মাসে হজরত ঈসাকে (আঃ) আল্লাহ আকাশে তুলে নেন, যে মাসে হজরত মুসা (আঃ) তুর পাহাড়ে আল্লাহর সাথে কথা বলেন। কোরআনের শাসন প্রতিষ্ঠার নামে সন্ত্রাসীরা কোরআন লেখককেই খুন করে ফেললো।’ উল্লেখ্য, হজরত আলী নবি মুহাম্মদের পাশে পাশে থেকে কোরআনের বাণী লিখতেন। হজরত উসমান যখন কোরআন সংকলন করেন, হজরত আলিকে সংকলন কমিটি থেকে বাদ দেয়া হয়। ৩৩ সন্তানের জনক, হজরত আলি জীবনে তাঁর প্রথম স্ত্রী ফাতেমার মৃত্যুর পর আরো ৮ জন রমণীর পাণি গ্রহণ করেছিলেন।

৬ষ্ঠ পর্ব-

আকাশ মালিক, যুক্তরাজ্য নিবাসী মুক্তমনা সদস্য। ধর্ম, রাজনীতি এবং সমাজ নিয়ে নিয়মিত লিখে আসছেন। ই-মেইল : [email protected]

[1224 বার পঠিত]