সহী আমিনী ও নুরানীনামা এবং আমাদের নতজানু সরকারসমূহ

 

জাহেদ আহমদ

 

একঃ

 

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে খতিবকে নিয়ে আবার ও মুসল্লীদের মধ্যে মারামারি হয়েছে। পত্রিকাতে যা পড়লাম তাতে এটাকে দুই পক্ষীয় সংঘর্ষ বলা বেমানান হবে। সদ্য বিদায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার মাওলানা সালাহ উদ্দিনকে নতুন খতিব হিসেবে নিয়োগ দেয়। এ নিয়ে উত্তেজনা-মারামারি বা জুতাজুতি হবার মত ঘটনা ঘটার কথা নয়। কিন্তু দেখা গেল, একদল জংগীবাদী মুসল্লি তাই করলেন। তাদের দাবী, নতুন খতিব নাকি একজন ‘বিতর্কিত ব্যাক্তি।‘ এতদূর পর্যন্ত পত্রিকায় পড়ে এ নিয়ে লেখার কোন কারণ দেখিনি। কৌতূহল বেড়ে গেল এ নিয়ে গন্ডগোলকারী একজন মাদ্রাসা ছাত্রের বক্তব্য পড়ে। পত্রিকার বিবরণ- ইদ্রিস হোসেন নামের যাত্রাবাড়ীর একটি মাদ্রাসার ছাত্র বলেন, ‘আমি নতুন খতিবকে চিনি না। তবে আমিনী হুজুর বলেছেন, তার নামাজ পড়ানোর যোগ্যতা নেই। তাই আমি মিছিল করতে এসেছি।‘

 

পাঠকদের এই ‘আমিনী হুজুর’-এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার দরকার আছে বলে মনে করি না। ব্রাম্মণবাড়িয়ার অখ্যাত এক মাদ্রাসার তথাকথিত প্রিন্সিপাল, সদা পানসুপারীময় বদনের অর্ধশিক্ষিত এই মুফতি প্রায়শই জাতীয় পত্রিকার পাতায় শিরোনাম হন ইসলাম ও আক্বিদা বিষয়ে নিজস্ব স্টাইলে দেশবাসীকে নসিহত দানের মাধ্যমে। আমিনীর দুঃসাহসিক অপকীর্তি, কূপমন্ডুকতা ও ত্রাসের কিছু নমুনা স্মরণ করা যাক।

 

সম্ভবত সর্বপ্রথম আমিনীর নাম দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে মানবতাবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিন বিরোধী মোল্লাদের আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে।‘তসলিমা নাসরিনের কোন লেখা আমি পড়িনি, তবে তার ফাঁসি চাই’- সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকার সাথে এক সাক্ষাতকারে আমিনী এ কথা বলে আলোচিত হয়েছিলেন। সে বেশ কয়েক বছর আগের কথা হলে ও আমিনীর হুঙ্কার দিয়ে কথা বলা থামেনি। এক সময় জামাত-বিএনপি-র চার দলীয় জোট সরকারের টিকেটে আমিনী এমপি নির্বাচিত হন। তিনি জাতীয় নেতার স্তরে ওঠে আসেন। ব্রাম্মণবাড়িয়াই নয় কেবল, স্বয়ং ঢাকার রাজপথ ও আমিনীর দখলে চলে আসে। বিগত জোট সরকারের শরীকদার হিসেবে দাপটের সাথে তিনি রাজত্ব চালিয়েছেন। বাংলাদেশে কারা পাক্বা মুসলমান, কারা ভেজাল মুসলমান, কারা ‘ইসলামের দুশমন’ কিংবা ক্বাদিয়ানীরা কেন মুসলমান নন- এসব ব্যাপারে আমিনী এবং তার সাংগপাংগরা সিদ্ধান্ত দেন।

 

 

আমিনী বাংলাদেশে ইসলামী হুকুমত ও শরীয়া আইনের বিধান চান। আমিনীর নেতৃত্বে কয়েক হাজার মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ঢাকার রাজপথে শ্লোগান ধরেছিল, ‘আমরা হব তালেবান, বাংলা হবে আফগান।‘ তালেবানদের আফগানিস্তানকে বাংলাদেশে আমদানী করার চিন্তা আমিনীর। প্রকাশ্যে সবাইকে জানিয়ে ও দেন সে কথা। ‘তালেবানরা আমাদের আদর্শ। তালেবানদের দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হয়েছি। আমরা তাদের সমর্থন করি। আমরা তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি। তারা ইসলামের জন্যে অনেক বড় কাজ করেছে। আমরাও সেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি।‘  ইসলামী হুকুমত কায়েম করতে আমিনী প্রয়োজনে মানুষ মারতে ও প্রস্তুত। ‘আমরা যেকোনও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের জন্য প্রস্তুত। এই সংঘর্ষে অনেক লোক মারা যেতে পারে। কিন্তু তারপরও আমরা আন্দোলন থেকে পিছিয়ে আসব না।’ এসব ঘোষণা দেয়া হয়েছে প্রকাশ্য দিবালোকে। ১৯৯৮ সালে আওয়ামীলিগ সরকারের আমলে ও আমিনী সদর্পে ঘোষণা করেছেন যে, ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে সেনানিবাসে নির্মিত ‘শিখা চিরন্তন’ তিনি ধ্বংস করে ফেলবেন। ‘শিখা চিরন্তনের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন। সরকার রাস্তার মোড়ে মোড়ে মূর্তি স্থাপন করছে। আমরা এগুলো হতে দেব না।’ আর স্পষ্ট করে আমিনী বললেন, ‘সরকার এগুলো বন্ধ না করলে আমরা নিজেরাই মূর্তি ভাঙার ব্যবস্থা করব। মানুষ মারা গেলেও আমরা এটা করব।’ যারা আমিনীকে মনে করতেন ভ্রাম্মণবাড়িয়ার অজপাড়া গাঁ থেকে ওঠে আসা কেবল একজন মোল্লা মাত্র, তাঁদের অনেকেই অবাক হয়েছিলেন সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরে অবস্থিত ও সেনাবাহিনী নির্মিত ‘শিখা চিরন্তন’ এর বিরুদ্ধে আমিনীর প্রকাশ্য আস্ফালনে।  

 

সদ্য বিদায়ী ডঃ ফখরুদ্দিন আহমদ সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সরকার গঠন করার পর রাজনৈতিক অংগনে বেশ কিছু পরিবর্তনে প্রগতিশীল ও সেক্যুলার ধারার অনেকে আশান্বিত হয়েছিলেন যে, এ সময়ে মোল্লারা আস্ফালন ও কিছুটা কমবে। বিধি বাম! রাস্তাঘাটে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ- এই মর্মে ফখরুদ্দিন সরকারের জারি করা জরুরী অবস্থাকে আমিনী ও তার পংগপালেরা তোড়াই কেয়ার করলেন। ২০০৮ সালে সরকারের ঘোষিত নারী উন্নয়ন নীতিমালা আমিনীর মনঃপুত হল না।আমিনী রাস্তায় জংগী মিছিল নামালেন। ঢাকার পল্টন থেকে দৈনিক বাংলা মোড় পর্যন্ত গাড়ি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিলেন। তার দাবী, সরকারের নারী ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদা চৌধুরীর পদত্যাগ। আমিনী আবার ও হুঙ্কার ছাড়লেন এই বলে যে, ‘দাবি বাস্তবায়ন না করা হলে আজকের পর পুরো দেশে আগুন লেগে যাবে।‘

 

ফখরুদ্দিন সরকারের আমলে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্থাপনাসমূহের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে সরকারের এভিয়েশন বিভাগের কর্মকর্তাদের মাথায় একটি চমৎকার আইডিয়া এল। বিমানবন্দরের চত্বরে তাঁরা মরমী সাধক লালন সাঁইসহ কয়েকজন বাউলের ভাস্কর্য স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলেন। কৃতি ভাস্কর মৃণাল হক কাজের দায়িত্ব পেলেন। ধর্মান্ধ গোষ্ঠি নন্দনতাত্ত্বিক এই ব্যাপারটি ভাল চোখে দেখল না। জংগীসর্দার  আমিনীর নামের পাশাপাশি এ সময় আরেকটি নাম পত্রিকার পাতায় উচ্চারিত হল। তিনি হলেন খতমে নবুওয়ত আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি নুর হোসাইন নুরানী। সরকারকে কড়া ভাষায় নুরানী জানিয়ে দিলেন, বাংলাদেশে এসব ইসলাম বিরোধী কাজ চলতে দেয়া যাবে না। সরকারের কাপুরুষত্ব ও সাহসহীনতার সুযোগে নুরানী তার সাগরেদদের নিয়ে চমৎকার বাউল ভাস্কর্যগুলি বলতে গেলে পুলিশ ও RAB-এর উপস্থিতিতে ভেংগে দিলেন। সরকারের সম্পত্তি যারা প্রকাশ্যে ধ্বংস করল, সরকার তাদের রুখে দাঁড়ানো দূরের কথা, বরং তোয়াজ করল। নুরানীর ভাষায়, সরকার এবং তাদের যৌথ উদ্যোগে মূর্তি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।  

 

          কে এই নুরানী? পত্রিকার সুবাদে জানা গেল নুরানীর ইতিহাস। আহমদিয়াবিরোধী উগ্র সংগঠন খতমে নবুয়ত আন্দোলন বাংলাদেশের নেতা এই মুফতি নূর হোসাইন নূরানী। আমিনীর মত তার ও শক্তির মূল উৎস মাদ্রাসার সহজ সরল ও কোমলমতি ছাত্ররা যারা আমিনী ও নুরানী হুজরদের নির্দেশে ইসলাম ও আক্বিদা রক্ষায় জান কুরবানী দিতে ও প্রস্তুত ।সাপ্তাহিক ২০০০ নুরানী সম্পর্কে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে লিখেছে, “২০০৫ সালে ‘ভারতের দালাল ও অর্থ আত্মসাৎকারী’ বলে অভিহিত করে মুফতি নূরানীকে ইন্টারন্যাশনাল খতমে নবুয়ত মুভমেন্ট থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর তিনি কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক মূলধারার ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলোচনার বাইরে চলে যান। আহমদিয়াবিরোধী নতুন সংগঠন করেও সুবিধা করতে পারেননি।……… শান্তির ধর্ম পবিত্র ইসলামকে ব্যবহার করে উগ্রতা সৃষ্টিতে পারঙ্গম এই তরুণ নেতার বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলায়। তবে তিনি রাজধানীর উত্তরার ফায়দাবাদ মসজিদে ইমামতি করেন। থাকেনও সেখানে। গত দুই বছর মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নূরানী ‘পীর বাণিজ্যে’ ব্যস- ছিলেন। তিনি নিজেকে পীর ঘোষণা দিয়ে নামের শেষে ‘মুন্সীগঞ্জের পীর’ লেখা শুরু করেন। স্বঘোষিত এই ‘পীর’ এর আগে ২০০৫ সালে নিজেকে ‘ইসলামী ব্যারিস্টার’ ঘোষণা দিয়েছিলেন।“

 

দুইঃ

 

বাংলাদেশে আমিনী-নুরানীর উত্থান ও পৃষ্ঠপোষকতার জন্য কারা দায়ী? এর উত্তর আমাদের একেবারে অজানা নয়। বাংলাদেশে ওহাবী ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রকল্পে পাকিস্তান, সউদী আরব এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ এ দেশীয় ইসলাম ভিত্তিক দলগুলিকে অর্থ ও সশস্ত্র ট্রেনিং এর যোগান দিচ্ছে বহু বছর থেকে। অন্যদিকে দেশের ভেতরে আলিয়া মাদ্রাসাগুলির জন্য সরকারী মাদ্রাসা বোর্ড থাকলে ও দেশের যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার হাফিজিয়া ও কওমী মাদ্রাসাগুলির ওপর সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। সেখানে কি পড়ানো হয় বা কি পড়ানো উচিৎ- সে বিষয়ে কওমী মাদ্রাসাগুলি সরকারের ধার ধারে না। যে যার খুশী মত দেশের যে কোন স্থানে আখেরাতের পুণ্য হাসিল করতে একটা মাদ্রাসা খুলতে পারে। এক খন্ড জমির ওপর একখানা ঘর আর কিছু হুজুর থাকলেই গ্রামে-গঞ্জে শুরু করা যায় একটি মাদ্রাসা। দ্বীন ইসলাম, আক্বিদা এবং আখেরাতের নামে ছাত্র-ছাত্রী যোগাড় করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। একবার শুরু করতে পারলে এ সব মাদ্রাসা ক্রমান্বয়ে বড় হতে থাকে যেহেতু একটা স্কুলের তুলনায় একটা মসজিদ-মাদ্রাসার অনুদান (দেশে এবং বিদেশে) পাওয়া অনেকখানি সহজ। এসব মাদ্রাসার কারিকুলামের প্রায় পুরাটাতেই থাকে মধ্যপ্রাচ্য, পাকিস্তান ও ভারতের দেওবন্দ থেকে আমদানীকৃত উর্দু এবং আরবী ক্বেতাবসমূহ। মাদ্রাসার ছেলেমেয়েরা বুঝে-না বুঝে এগুলি মুখস্ত করে পরকালে সওয়াবের আশায়। শিশু-কৈশোর ও যৌবনের মূল্যবান সময় কাটিয়ে এসব মাদ্রাসা থেকে ইহজীবনে বেঁচে থাকার জন্য তারা যা শেখে তা মূলত ফতোয়া, ইস্তেখারা, পানি পড়া  ও তাবিজ-ফুঁকের মন্ত্র।  এরা এগুলি আবার অন্যদের শেখায়।

 

মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক করার কথা বিভিন্ন সময় উচ্চারণ করলে ও এ ব্যাপারে বিগত সরকারগুলিকে আন্তরিক মনে হয়নি। একই দেশে দরিদ্ররা পড়ছে কওমী, হাফিজিয়া ও আলিয়া মাদ্রাসাতে, ধনীরা প্রাইভেট ইংলিশ মিডিয়াম-কিন্ডারগারটেনে এবং মধ্যবিত্তের বেশিরভাগ বাংলা মিডিয়ামে। ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যম থেকে পাশ করে বের হওয়া এসব ছেলেমেয়েদের মধ্যে মেধার বড় তারতম্য না থাকলে ও বিশাল ফারাক রয়েছে সমাজ, দেশ ও মানুষের প্রতি এদের দৃষ্টিভংগির বেলায়। কেউ বড় বেশি পরজাগতিক, কেউ ইহজাগতিক, কেউ বা বাংলাদেশবিমূখ; আবার কেউ জগতেরই কোন কাজে লাগছে না। এটা যে দেশের জন্য একটা মারাত্নক একটা দুঃসংবাদ সেটা আমাদের সরকার এবং রাজনীতিকরা ও বোঝেন, কেবল নেই কোন উদ্যোগ এই বৈষম্যের নিরসনে।

তবে আমিনী হুজুরদের উত্থানের পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ যেটি, আমার বিবেচনায় সেটি হচ্ছে রাজনীতিক, সরকার এবং  তথাকথিত প্রগতিশীল মহলের সুবিধাবাদ ও নতজানু মনোভাব। খুব পুরানো নয়, এরকম দুটি উদাহরণ দিচ্ছি।

 

ব্রাম্মণবাড়িয়ার আমিনী হুজুরের মত আরেক জংলি হুজুর হলেন সিলেটের কাজির বাজার (গরুর হাট বসে বিধায় স্থানীয়দের কেউ কেউ এটাকে ‘গরুর বাজার’ ও বলেন) দারুল উলম মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবিবুর রহমান বুলবুলি। ২০০৭ সালে যদি ওয়ান ইলেভেন না ঘটত এবং ইয়াজুদ্দিন সরকারের অধীনে দেশে পূর্ব ঘোষিত বাইশে জানুয়ারী নির্বাচন হয়ে যেত, তাহলে আওয়ামীলিগের সাথে ইসলামী ঐক্য জোটের সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী সিলেট-৬ আসনে চৌদ্দদলীয় প্রার্থী হতেন এই বুলবুলি হুজুর। স্বয়ং শেখ হাসিনা তখন দলীয় প্রার্থী নুরুল ইসলাম নাহিদ (বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী)কে বসিয়ে দিয়ে সেখানে নমিনেশন দিয়েছিলেন গরুর বাজার মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল বুলবুলি মোল্লাকে। পাঠক, চিন্তা করতে পারেন, ব্যাপারটা! দোষ-ত্রুটি সত্ত্বে ও ফখরুদ্দিন সরকারের কাছে আমাদের ঋণ কিন্তু অনেক।

 

প্রথম আলোয় প্রকাশিত সেই কার্টুনের কথায় আসা যাক। আরিফুর রহমান নামের একজন কিশোর সংবাদকর্মীর আকাঁ সামান্য একটি কৌতুক-কার্টুন তালেবান ধর্মী মোল্লাদের এতটাই ক্ষেপিয়ে তুলেছিল যে, প্রথম আলোর মাগসাইসাই পুরষ্কারপ্রাপ্ত প্রগতিশীল ও নির্ভীক (!) সম্পাদক মহাশয় ও সেদিন মৌলবাদী মোল্লাদের সর্দার শায়খুল হাদিস আজিজুল হকের কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা ভিক্ষা চেয়েছিলেন।

 

প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারার নেতা-কর্মীদের মাঝে মাঝে বলতে শুনি, আমিনীদের শায়েস্তা করা একটি কঠিন কাজ। আমিনীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে মানুষ সরকারকে ইসলাম বিরোধী ভাববে। এমন যুক্তিতে আমার ঘোর আপত্তি আছে। এই দেশে যে আমিনীর মত অর্ধ-শিক্ষিত একজন গেঁয়ো মোল্লা সাংসদ তথা জাতীয় নেতাতে পরিণত হয়েছে, এ জন্য জনগণকে দোষ দেয়া একটা বড় ধরণের ভুল কাজ। আমিনী, নুরানী, নিজামী, সাঈদী, বুলবুলিদের উথানের পিছনে আমাদের সুবিধাবাদী চরিত্র ও ক্ষমতার জন্য আপসের মনোভাব দায়ী। এবারের নির্বাচনে আমিনী তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্ধীর তুলনায় ৫০ শতাংশের ও কম ভোট পেয়ে হেরেছেন। আর ও হেরেছেন সাঈদী, নিজামীরা। ব্রাম্মণবাড়িয়া-২ (আশুগঞ্জ-সরাইল) আসনকে অনেকে আমিনী ও মৌলবাদীদের দূর্গ মনে করতেন। সাধারণ মানুষদের বেশিরভাগ ধর্মান্ধ হলে এটি ঘটত না।

 

তিনঃ

 

যে ঘটনা দিয়ে লেখাটি শুরু করেছিলাম।

 

বায়তুল মোকাররমের নতুন খতিব নিয়ে দ্বিতীয়বার গণ্ডগোল-মারামারি হলে ও শেষ পর্যন্ত সাধারণ মুসল্লীরা বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদের মসজিদ প্রাংগন থেকে বের করে দেন। মুসল্লিরা পরে নতুন খতিবের পিছনে নামাজ আদায় করে। এই যে সাধারণ মুসল্লিদের কথা বলা হল, এরা আওয়ামীলিগ, বিএনপি বা জামাতের লোক নয়। এরা গভীর ধার্মিক তবে শান্তি পরায়ন বাংলাদেশী মুসলমান। আমিনীর মত জংগীবাদী মোল্লাসর্দারদের পরাস্ত করতে এরাই হতে পারে সরকার ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলসমূহের সবচেয়ে বড় শক্তি। সাম্প্রতিক নির্বাচনে সে প্রমাণ মিলেছে। মৌলবাদ নিরসনে কেবল আঞ্চলিক টাস্ক ফোর্স গঠন বা সংসদে বিল পাশ করে কাজ হবে না। সরকারকে পাবলিককে সাথে নিয়ে এগোতে হবে।

 

          ভয় ও শঙ্কা তাই আমিনী বা আমিনীর কথায় অন্ধ বিশ্বাসী সরলমতি মাদ্রাসা ছাত্র ইদ্রিস হোসেনকে ঘিরে নয়। আমার সন্দেহ ও উৎকন্ঠা এ ক্ষেত্রে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের আপস ও সুবিধাবাদের চিরায়ত ধারাকে।

 

১৮ জানুয়ারী, ২০০৯

 

 

 

 

তথ্যসূত্রঃ সাপ্তাহিক ২০০০, দৈনিক প্রথম আলো এবং bdnews24.com

 

লেখকের পরিচয়ঃ নিউইয়র্ক স্টেট গভর্ণমেন্টে কর্মরত। মুক্তমনা (www.mukto-mona.com) হিউম্যানিস্ট ফোরাম এবং ঢাকা থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ ভিত্তিক ম্যাগাজিন ‘মুক্তান্বেষা’-র সাথে যুক্ত। ই-মেইলঃ [email protected] 

[120 বার পঠিত]