নবী মুহাম্মদ (দঃ) লিখতেও পারতেন, পড়তেও পারতেন। কিন্তু নিজে কোরআন লেখেন নাই। তাঁর মুখনিঃসৃত কথা, স্বর্গীয় বাণী বলে দাবিকৃত বিধায় উপস্থিত শ্রোতা যে যেভাবে পারেন স্মরণ রাখার চেষ্টা করতেন। কেউ কেউ তাঁর কথা পাথরে, খেজুর পাতায়, গাছের পাতা থেকে বিশেষভাবে তৈরি কাগজে, পশুর চামড়ায় ও কাঠের টুকরোয় লিখে রাখতেন, এমনকি মুখস্তও করে রাখতেন। তাওরাত, জবুর ও ইনজিল কেতাব অনুসারীদের কাছ থেকে মুহাম্মদের (দঃ) শুনা ঘটনাবলী ও মুহাম্মদের (দঃ) কাছ থেকে মানুষের ঐ শুনা কথা, বিভিন্ন বস্ততে, বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্নভাবে লিখিত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাক্যসমূহই পবিত্র কেতাব ‘আল-কোরআন’। কোরআন সম্পাদনায় মুহাম্মদকে (দঃ) যারা সাহায্য করেছিলেন তাদের কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। কোরানের কাব্যিক ছন্দ, শব্দ-বিন্যাস, তৎকালীন এবং ইসলাম পূর্ববর্তী আরবিয় একাধিক কবি সাহিত্যিকদের কাছ থেকে ধারকৃত। একদিন নবীজির কনিষ্ঠ কন্যা হজরত ফাতিমা (রাঃ) কোরআনের ‘সুরা ক্বমর’ (চাঁদ) আবৃত্তিকালে আরবের বিখ্যাত কবি ইমরুল কায়েসের মেয়ে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কায়েসের মেয়ে রাগান্বিত হয়ে হজরত ফাতিমাকে বললেন : ‘সর্বনাশ, এটাতো আমার বাবার লেখা একটি কবিতার পংক্তি। তোমার বাবা, আমার বাবার কবিতা নকল করে আল্লাহর বাণী বলে কোরআনে ঢুকিয়েছেন।’ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ইমরুল কায়েসের ধর্মীয় ভক্তিমূলক কবিতাগুচ্ছ মুহাম্মদের (দঃ) জন্মের পূর্বে লেখা এবং কবি ইমরুল কায়েস মুহাম্মদের জন্মের পূর্বেই মারা যান কিন্তু তার কবিতাগুলো আরবে মোটামুটি জনপ্রিয় ছিল। মুহাম্মদ (দঃ) কখন কিভাবে ঐ কবিতা সংগ্রহ করেছিলেন তা আমাদের এই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় নয়। ইতিহাস থেকে জানা যায়, গ্রন্থাকারে কোরআন তৈরি করার ধারণাটা প্রথম আসে হজরত ওমরের মাথায়। হজরত ওমর খলিফা আবুবকরকে এ ব্যাপারে প্রস্তাব দিলে আবুবকর প্রথমে রাজি হননি। আবুবকর (রাঃ) জানতেন বিষয়টা স্পর্শকাতর ও কষ্টসাধ্য ব্যাপার। খলিফা উসমান যখন পুনরায় এ উদ্যোগটা নিলেন, তখন খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, সিরিয়া, কুফা, বসোরা, আজারবাইজান, মিশরসহ বিভিন্ন এলাকার কোরআন আর মদিনায় হজরত ওমরের নির্দেশে তৈরি, তাঁর মেয়ে হাফসার কাছে গচ্ছিত কোরআনের মধ্যে বিস্তর তফাৎ। স্বেচ্ছাচারী, স্বৈরাচারী, জগতজুড়ে মুসলমানদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের উচ্চাবিলাসী, কোরায়েশ শাসকগণ তাঁদের প্রজা নির্যাতন, অপশাসন ও শোষণের বৈধতা যখন কোরআনিক নির্দেশ বলে দাবি করতেন, তখন নির্যাতিত শোষিতেরাও একই কোরআন দিয়েই প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন, শাসকেরা তাদের স্বার্থানুযায়ী কোরআনে পরিবর্তন-পরিবর্ধন এনেছে এবং তাঁরা কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা করছেন। সাহাবি হজরত আবু জওহর গিফ্ফারি (রাঃ) সিরিয়ার স্বৈরশাসক হজরত মোয়াবিয়াকে সরাসরি ‘কোরআন-বিরোধী শাসক’ বলে অভিযোগ করেন। আবু জওহর কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে বললেন : ‘আপনি যে জনগণের সম্পদ দিয়ে রাজপ্রাসাদ গড়ে তুলেছেন এবং রাজকীয় বেশে বিলাসবহুল জীবন কাটাচ্ছেন তা কোরআনের পরিপন্থি।’ মোয়াবিয়া (রাঃ) আবু জওহর গিফ্ফারীকে (রাঃ) ধমক দিয়ে বললেন : ‘বেকুবের দল, রাষ্ট্রীয় আয় ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদের মালিক জনগণ নয়। সকল সম্পদের মালিক একমাত্র আল্লাহ এবং আল্লাহই আমাকে তাঁর সম্পদের রক্ষক হিসেবে মনোনীত খলিফা করেছেন। সম্পদ ব্যবহার হবে জনগণের নয়, খলিফার ইচ্ছানুযায়ী।’

জনগণের কাছে যখন সারা মুসলিম সাম্রাজ্যের সকল প্রাদেশিক গভর্নরসহ স্বয়ং খলিফা উসমান কোরআন-বিরোধী, অনৈসলামিক শাসক বলে বিবেচিত, তখন হজরত উসমানের কোরআন সংকলন মানুষের কাছে কতটুকু সমাদৃত হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। হজরত উসমান যায়িদ বিন সাবিত (রাঃ)-কে সর্বপ্রধান করে আব্দুল্লাহ ইবনে যোবায়ের, সাদ ইবনুল আস এবং আব্দুর রহমান বিন হারেসসহ ১২ সদস্য বিশিষ্ট একটি কোরআন সংকলন কমিটি গঠন করলেন। নির্দেশ দিলেন মদিনার ওহি লেখকদের সাথে যদি ভাষাগত মতানৈক্য দেখা দেয় তাহলে কমিটি যেন কোরায়েশদের ভাষা অনুসরণ করে। খলিফা আরো বললেন : ‘এই কমিটিকর্তৃক প্রণীত কোরআনই হবে সরকার অনুমোদিত পরিপূর্ণ বৈধ কোরআন এবং রাজ্যের অন্যান্য সকল কোরআন অবৈধ বলে গণ্য হবে।’ কোরআনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে লেখা ও সম্পাদনা হলো। হজরত উসমান কমিটিকে কোরআনের ৭টি কপি তৈরি করতে আদেশ দিলেন। ৭টি রাজ্যে কোরআনের ৭টি কপি পাঠিয়ে তখনকার প্রচলিত বাকি সব কপি আগুনে পুড়িয়ে ফেলার হুকুম দিলেন। বেসরকারিভাবে প্রচলিত সকল কোরআন পুড়িয়ে ফেলা হলো। এবারে আরব-অনারব, হাশিমি-উমাইয়া, কোরায়েশ-অকোরায়েশ নয়, রাজ্যের সকল প্রদেশের সকল এলাকা থেকে, সকল সমাজের সর্বস্তরের মানুষ, খলিফার বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠলো। খলিফা উসমান ১২টি বছর খেলাফত কালের পূর্ণ ১০টি বছর যুদ্ধবিগ্রহ করে কাটিয়েছেন। অন্যায়ভাবে বিরাট ভূখণ্ড দখল করা হলো, যশ-মান-পদোন্নতি-জগতের অফুরন্ত ধন-ভাণ্ডার-সম্পদ- দাস-দাসী সবই পদানত করা হলো। তবু হায়! হায়রে শান্তির ধর্ম! হায়রে সাম্যের ইসলাম! অগণিত নিরপরাধ নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরের প্রাণ সংহার করে, এতসব মানবরক্ত পান করেও তার রক্তপিপাসা নিবারণ হলো না। ইসলাম এবার নিজেরই রক্তপান করতে উদ্যোত হলো। রাজ্যের সকল এলাকা থেকে সরকার-বিরোধী সংগঠন গড়ে উঠলো। তাদের এক দফা, এক দাবি : স্বৈরশাসনের পতন হউক। সর্বদলীয় সংগ্রামের নেতৃত্বে যারা এগিয়ে আসলেন তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিচে দেয়া হলো :

হজরত মুহাম্মদ ইবনে আবুবকর (রাঃ) : মুহাম্মদ ইবনে আবুবকর (রাঃ) ছিলেন ইসলামের প্রথম খলিফা নবী মুহাম্মদের (দঃ) অতি প্রিয়ভাজন সাহাবি হজরত আবুবকরের কনিষ্ঠ পুত্র এবং নবী মুহাম্মদের কনিষ্ঠ স্ত্রী আয়েশার ভাই। খলিফা আবুবকরের (রাঃ) মৃত্যুর পর তাঁর বিধবা স্ত্রী, শিশু পুত্র মুহাম্মদকে নিয়ে হজরত আলিকে (রাঃ) বিয়ে করেন। আবুবকরের (রাঃ) স্নেহের সন্তান মুহাম্মদ ছিলেন যথেষ্ট জ্ঞানবুদ্ধি ও বিচক্ষণতার অধিকারী। হজরত আলির পোষ্যপুত্র মুহাম্মদ, তৃতীয় খলিফা নির্বাচনে, হজরত ওমরের নির্বাচন কমিটির ওপর চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ করেছিলেন। উসমানের (রাঃ) খেলাফত লাভের পরপরই তাঁর অদক্ষ রাষ্ট্রপরিচালনা, অন্যায় শাসন সহ্য করতে না পেরে মুহাম্মদ ইবনে আবুবকর (রাঃ) মদিনা ছেড়ে মিশর চলে যান।

হজরত মুহাম্মদ ইবনে আবু হুজাইফা (রাঃ) : রসুল মুহাম্মদের (দঃ) বিশেষ সম্মানিত সাহাবি হজরত আবু হুজাইফার (রাঃ) পুত্রের নামও ‘মুহাম্মদ’। তাঁর পিতা ইয়ামামার যুদ্ধে (আবুবকরের আমলে) মৃত্যুবরণ করার পর থেকে তিনি খলিফা উসমানেরই গৃহে প্রতিপালিত হতে থাকেন। বড় হয়ে মুহাম্মদ ইবনে আবু হুজাইফা বুঝতে পারলেন, ইসলাম প্রচারের নামে জগত জুড়ে যে অত্যাচার-অনাচার চলছে তা কোনোভাবেই ধর্ম-সমর্থিত হতে পারে না। স্বদেশ ত্যাগ করে মুহাম্মদ ইবনে আবু হুজাইফা (রাঃ) মিশরে চলে আসেন। মিশরের আদিম অধিবাসী ‘কীবতি সম্প্রদায়’ কোরায়েশদের প্রভুত্ব সহ্য করতে পারতো না। মুহাম্মদ ইবনে আবু হুজাইফা (রাঃ) মিশরের নির্যাতিত নিপিড়িত মানুষের পাশে এসে দাঁড়ালেন। তিনি মিশরের গভর্নর আব্দুল্লাহ বিন সাদ বিন আবি সারাহর দিকে ইঙ্গিত করে, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন শাসকদের বিলাসিতাপ্রিয় আসল চেহারা। মিশরে এসে ‘মুহাম্মদ ইবনে আবুবকর’ ও ‘মুহাম্মদ ইবনে আবু হুজাইফা’ এই দুই মুহাম্মদ, সুদীর্ঘ ১২টি বছর অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলতে থাকেন।

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা (রাঃ) : হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা বিলাসবহুল জীবন ঘৃণা করতেন। ক্ষমতা ও অর্থের প্রতি তাঁর কোনো লোভ ছিল না। তিনি হজরত আলিকে ভীষণ শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল হজরত আলির ভেতর নবী মুহাম্মদের সকল প্রকার গুণাবলী বিদ্যমান বিধায় নবীর মৃত্যুর পর হজরত আলিই প্রথম খলিফা হবেন। পরপর তিনজন খলিফা জবরদস্তি ও অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখল করেছেন। বসোরায় আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা তাঁর এই বিশ্বাসের পক্ষে প্রচারণা করতে থাকেন। বসোরার গভর্নর আব্দুল্লাহ বিন আমির, আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাকে তার দেশ থেকে বহিস্কার করে দেন। আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা কুফায় চলে যান। সেখানে আগে থেকেই হজরত আলির বহু সমর্থক ছিল। বসোরা ও কুফায় তাঁর বিশ্বাসের প্রতি প্রচুর লোক সমর্থন জানায়। অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা সিরিয়া গমন করেন। সিরিয়ায় তখন হজরত উসমানের উমাইয়া বংশীয় সরকার হজরত মোয়াবিয়ার যাঁতাকলে, হাশিমি বংশের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। পরিশেষে সিরিয়া ত্যাগ করে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা মিশরে মুহাম্মদ ইবনে আবুবকর ও মুহাম্মদ ইবনে আবু হুজাইফার সাথে মিলিত হন। এখানে তিনি ‘সাবায়ি’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত করেন।

সারা মুসলিম বিশ্বে যে স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে প্রজাদের বিদ্রোহ তীব্র আকার ধারণ করেছে, হজরত আলি (রাঃ) তা আঁচ করতে পেরে খলিফা উসমানকে কতগুলি সূক্ষ্ম পরামর্শ দিলেন। ক্ষমতা ও সম্পদের লোভে মানুষ যে কতো অন্ধ হতে পারে ৮০ বছর বয়স্ক হজরত উসমান তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। তিনি আলির (রাঃ) পরামর্শ গ্রাহ্য তো করলেনই না বরং বিদ্রোহের প্ররোচণাকারী বলে হজরত আলিকে অপবাদ দিলেন। দেশের পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হতে থাকে। সমগ্র দেশটা গণ-আন্দোলনের বিস্ফোরণ অবস্থায় দেখেও হঠাৎ করেই হজরত উসমান নতুন একটি প্রথার উদ্ভব ঘটালেন : ‘প্রজাস্বত্বের হস্তান্তর, জায়গীরদারি ও জমিদারী প্রথা’। দুটি উদ্দেশ্যে হজরত উসমান এ কাজটি করেছিলেন যথা :
এক, স্বগোত্রীয় বিত্তশালী লোকদের সমর্থন অর্জন.
দুই, গরিব প্রজাদেরকে নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর, আর কৃষকদেরকে ভূমিহীন করা।
তাঁর ধ্বংসমুখী আইনের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করালেন এই বলে- ‘দেশে মাত্রাতিরিক্তভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। অভিজাত শ্রেণীর তুলনায় নিম্নশ্রেণীর লোকের সংখ্যা বেশি হয়ে যাচ্ছে এবং এর ফলে নাগরিক সভ্যতা ও শালীনতা বিপর্যয়ের সম্মুখীন। দেশে নবাগত মুসলিম অধিবাসীদের বেশিরভাগই যাযাবর-বেদুইন কিংবা গ্রাম্য অনারব। এরা মূর্খ ও বর্বর। এদের রুচি-আচরণ কদর্য, অভদ্র ভাষা, অসভ্য ব্যবহার ও রীতিনীতি ঔদ্বত্যপূর্ণ। এদের দ্বারা দেশের শান্তি বিপন্ন হচ্ছে।’

আসলে এ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল ক্রমাগত যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলে। ধর্ম প্রচারের নামে খুন, লুট, ডাকাতিকে আরবগণ পেশা হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। ডাকাতি শুধু লাভজনক একটি বৈধ ব্যবসাই নয়, পূণ্য কাজ বলেও শাসকগণ প্রচারণা করতেন। সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার উপায় হিসেবে ইসলাম ধর্ম কবুল করে দস্যুতা গ্রহণ ছাড়া কোনো গতি ছিল না। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ দলে দলে মুসলমান হলো, সৈনিক দলে যোগদান করে লুটকৃত সম্পদের অংশীদার হলো, সাথে নিয়ে আসলো কুসংস্কার, বিশৃঙ্খলা, অশ্লীলতা, উচ্ছৃঙ্খলতা, অজ্ঞতা ও অরাজকতা। তাছাড়া ক্ষমতাশীল, বিত্তবান সাহাবিগণের যৌনক্ষুধা নিবারণের লক্ষ্যে গণিমতের মাল হিসেবে রক্ষিতা, যুদ্ধবন্দী নারীগণ, তাঁদের গর্ভজাত জারজ-সন্তানাদি সমাজ ও শাসকদের জন্য উপদ্রব হয়ে দাঁড়ায়।

খলিফা উসমানের ‘প্রজাস্বত্বের হস্তান্তর, জায়গীরদারি ও জমিদারী প্রথা’ নৈতিকতার চরম অবক্ষয়ে নিমজ্জিত একটা জাতিকে নিশ্চিত ধ্বংস থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে চালু করা হয় নাই, সে কথা বুঝতে কারো বাকি রইলো না। বেশ কয়েকজন সাহাবি এর প্রতিবাদ করলেন। প্রাক্তন বিশিষ্ট সাহাবিগণ অভিমত প্রকাশ করলেন, শরিয়ত বিরোধী এ সরকারকে উৎখাত করতে না পারলে মুসলিম জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে এবং সর্বোপরি ইসলাম দুনিয়া থেকে বিলীন হয়ে যাবে।

এবারে নবীজির আমলের খ্যাতনামা সাহাবি দেশের বরেণ্য উলামাগণ বিদ্রোহী দলে যোগ দিলেন। এমনকি এককালে উসমানের ডান হাত বলে পরিচিত হজরত তালহা (রাঃ), হজরত যোবায়ের (রাঃ), কুফার কোষাধ্যক্ষ সাহাবি ইবনে-মাসউদ (রাঃ)-সহ বহুসংখ্যক সাহাবি ও সরকারি কর্মচারী খলিফার বিরুদ্ধে চলে যান। হজরত উসমান কঠোর দমননীতি অনুসরণ করলেন। কয়েকজন সাহাবিকে দেশ থেকে বিতাড়িত করে দেন, কিছু লোককে প্রসাদে ডেকে এনে স্বহস্তে অমানুষিক নির্মম শাস্তি প্রদান করেন। বিদ্রোহীদের প্রতি হজরত উসমানের ভাষা ছিল অত্যন্ত অশ্লীল, অকথ্য, অমার্জিত। হজরত আলিও উসমানের অকথ্য ভাষায় গালাগালি থেকে রেহাই পাননি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, সাহাবি হজরত আব্দুর রহমান বিন আউফ (রাঃ) যিনি হজরত ওমর কর্তৃক খলিফা নির্বাচন কমিটির প্রধান হয়ে মিথ্যা প্রবঞ্চণার মাধ্যমে উসমানকে খলিফা নির্বাচিত করেছিলেন, সাহাবি হজরত যায়িদ বিন সাবিত (রাঃ) যাঁকে উসমান তাঁর ‘কোরআন সংকলন কমিটি’র প্রধান বানিয়েছিলেন, সাহাবি হজরত আমর ইবনুল আস, যাঁর কথায় উসমান (রাঃ) হজরত ওমরের খুনী পুত্র উবায়দুল্লাহকে বিনা শাস্তিতে মুক্ত করে দিয়েছিলেন, এঁরাসহ হজরত আলি (রাঃ) বিদ্রোহী দলের প্রথম সারিতে এসে অবস্থান নেন। গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে রাজধানী সর্বত্র বিক্ষোভের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। অবস্থা বেগতিক দেখে সিরিয়ার গভর্নর মোয়াবিয়া খলিফাকে বার্তা পাঠালেন- ‘আমিরুল মোমেনিন, আপনি অতিসত্তর সিরিয়া চলে আসুন, মদিনায় আপনার প্রাণের নিরাপত্তা আর নেই, নতুবা সামরিক আইন জারি করুন, আমি সৈন্য দিয়ে সাহায্য করবো।’ খলিফা কোনোটাই করলেন না। গণঅভ্যুত্থানের হাওয়ায় মদিনা উত্তপ্ত। উসমান টের পেলেন বিপদ আসন্ন। তিনি হজরত আলির স্মরণাপন্ন হলেন। হজরত আলিকে ডেকে এনে উসমান (রাঃ) নিজের ভুল স্বীকার করলেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আসলে কিন্তু ভুল স্বীকার করেননি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে হজরত আলিকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। উসমান বললেন : ‘আলি, এখন থেকে আমি শুধু তোমার কথাই শুনবো। মোয়াবিয়া, মারওয়ানের পরামর্শ নেয়া আমার ঠিক হয়নি। আজ থেকে তুমি যেভাবে বলবে রাষ্ট্র সেভাবে চলবে।’ আলির মনে পড়লো ক্ষমতা ও সম্পদ লোভী, আত্মম্ভরী, স্বেচ্ছাচারী উসমানের সুদীর্ঘ ১২ বছর শাসনের কলঙ্কিত দিনগুলোর কথা। খলিফা উসমান তিনটি নিরপরাধ মানুষের খুনী সাহাবি হজরত ওমরের পুত্র হজরত ওবায়দুল্লাহকে শাস্তি না দিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন। কোরআন সংকলন-সম্পাদনা করে রাজ্যের সর্বত্র মানুষের হাতে লেখা ‘কোরআন’ আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছেন। সেগুলোতে কি লেখা ছিল পৃথিবীর মানুষ কোনোদিন জানতে পারবে না। গরিব কৃষকেদর জমি জবরদস্তি দখল করে মদিনার মসজিদ সম্প্রসারণ করে মানুষকে ভিটেহীন করেছেন। ঘোড়ার ওপর ট্যাক্স আরোপ করে নবীর আদর্শকে কলংকিত করেছেন। ‘প্রজাস্বত্ব হস্তান্তর’ আইন প্রণয়ন করে নিজের আত্মীয় উমাইয়া বংশের মানুষকে জমিদার বানিয়ে সাধারণ মানুষকে ভিখারী করেছেন। মাদকাসক্ত, ব্যাভিচারী, মিথ্যাচারী, দেশের স্বঘোষিত নামকরা সন্ত্রাসী, যাদের মধ্যে চরিত্রের বালাই নেই তাদেরকে গভর্নর পদে নিযুক্ত করেছেন। বায়তুলমাল থেকে টাকা আত্মসাৎকারী কুফার গভর্নর কুখ্যাত অলিদের কথায় তার কোষাধক্য সাহাবি ইবনে-মাসউদকে সকলের সম্মুখে জঘন্য ভাষায় গালাগালি করেছেন। এই তো সেদিন ইবনে-মাসউদকে মসজিদে দেখে উসমান বলেছিলেন- ‘ঐ দেখো বাঁদির বাচ্চা নষ্টের কীট এসেছে, সে যে পাতে খায় সেই পাতে মলত্যাগ করে’।

ইতিপূর্বে ইবনে-মাসউদ (রাঃ) কুফার গভর্নর হজরত অলিদের অন্যায় অবিচার সহ্য করতে না পেরে পদত্যাগ করে মদিনায় চলে এসেছিলেন। হজরত আয়েশা, মসজিদ সংলঘ্ন ঘর থেকে উসমানের গালিগালাজ শুনে বেরিয়ে এসে বলেছিলেন, আপনি নবীর বিশ্বস্ত সাহাবিদেরকে এমনভাবে গালাগালি করছেন? আয়েশার কথায় খলিফা ভীষণ রাগান্বিত হয়ে ইবনে-মাসউদকে (রাঃ) এমন লাথি মেরেছিলেন যে, সাহাবি মাসউদের কোমরের একটি হাড় ভেঙ্গে গিয়েছিল। অজ্ঞান অবস্তায় মাসউদকে সেদিন উসমান টেনে হিঁচড়ে ‘মসজিদে নববী’ থেকে বের করে দিয়েছিলেন। কিছুদিন আগে সাহাবি হজরত আম্মার ইবনে ইয়াসের (রাঃ) খলিফা উসমানের অর্থনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদ করেছিলেন। কারণ খলিফার বিরুদ্ধে বায়তুলমাল থেকে যুদ্ধলব্ধ গনিমতের মাল, কিছু স্বর্ণালংকার ও মণি-মুক্তা চুরির অভিযোগ এনেছিলেন মদিনার কিছু লোক। খলিফার বেশ কয়েকজন আত্মীয়ের গায়ে সেই অলংকারের প্রমাণও তারা দেখিয়েছিলেন। উসমান (রাঃ) মোয়াবিয়ার ভাষায় বলেছিলেন, ‘বায়তুলমালের সম্পদের মালিক আল্লাহ। আমি আল্লাহর মনোনীত খলিফা। আল্লাহর মনোনয়ন ছাড়া খলিফা হওয়া যায় না। সম্পদ ব্যবহার হবে আমার ইচ্ছায়, তোমাদের তাতে কিছু বলার কোনো অধিকার নেই’। আম্মার ইবনে ইয়াসের ও হজরত আলি একসাথে সমস্বরে বলেছিলেন- ‘খলিফা, আল্লাহর কসম, আমি হবো আপনার প্রথম প্রতিবাদী, বায়তুলমালের সম্পদের জবাবদিহি আপনাকে করতেই হবে’। খলিফা উসমান, আম্মার ইবনে ইয়াসেরকে বন্দী করে এমন শাস্তি দিয়েছিলেন যে, তিনদিন তাঁকে বেহুশ হয়ে মৃত অবস্থায় উম্মে সালমার (রাঃ) গৃহে পড়ে থাকতে হয়। আয়েশাও সে ঘরে উপস্থিত ছিলেন। হজরত উসমান সেদিন হযরত আলিকেও বলেছিলেন: ‘বেশি বাড়াবাড়ি করলে তোমারও আম্মারের অবস্থা হবে’। আলিও রক্তবর্ণ চোখ দেখিয়ে বলেছিলেন- ‘আত্মম্ভরী উসমান, আল্লাহর কসম, আমার পিতা তোমার পিতার চেয়ে উত্তম, আমার মা তোমার মায়ের চেয়ে উত্তম, নবীর কাছে আমার মর্যাদা তোমার চেয়ে অনেক বেশি। আমাকে দেশ ত্যাগের নির্দেশ দিয়ে একবার চেষ্টা করে দেখতে পারো কোথাকার জল কোথায় গড়ায়!’ এসব কিছু স্মরণ করে আলি আরো বললেন, ‘আজ আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারবো না। এর আগে বহুবার আপনাকে সতর্ক করেছি, পরামর্শ দিয়েছি, আপনি তো কানেই তোলেননি। বরং কিছুদিন আগে একজন বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু জওহর গিফ্ফারিকে (রাঃ) বিনা অপরাধে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিলেন। আমি এর প্রতিবাদ করায় আপনি আপনার মন্ত্রী মারওয়ানের পক্ষ নিয়ে আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে প্রায় গলা ধাক্কা দিয়ে প্রসাদ থেকে বের করে দিয়েছিলেন।’ উসমানেরও মনে আছে সেদিন হজরত আলিও কম বলেননি। উসমান জানেন কোথায় আলির পিতা আবুতালিবের হাশিমি বংশ আর কোথায় উসমানের উমাইয়া বংশ। কিন্তু আজ তিনি নীরবে শুধু আলির কথা শুনতে থাকলেন। উসমান বললেন- ‘আলি, আমি জনগণের সকল অভিযোগ স্বীকার করে তাদের দাবি মেনে নেবো, তুমি তাদেরকে মদিনা থেকে ফিরিয়ে দাও।’ হজরত আলি, তার কাছে ইতিপূর্বে বিদ্রোহীদের দেয়া অভিযোগ ও দাবিসমূহ উসামানকে এক-এক করে শুনালেন। অভিযোগগুলো শুনে হজরত উসমান, সকল দোষ তাঁর পূর্ববর্তী দুই খলিফার ওপর, বিশেষ করে হজরত ওমরের ওপর চাপিয়ে দিলেন। তিনি আঙুলে গুণে কয়েকজন দুধর্ষ দুষ্কৃতিকারী সাহাবির নাম উল্লেখ করে বললেন,
‘দেখো আলি, এদেরকে দ্বিতীয় খলিফা ওমর গভর্নর পদে নিয়োগ করে গেছেন। সিরিয়ার গভর্নর মোয়াবিয়া কেমন মানুষ তুমি তো জানো। তার মতো মানুষকে সরিয়ে আমার খেলাফত কি একদিনও টিকবে?’ অতি নম্র ভাষায় উসমান আরো বললেন, ‘দেখো, বিগত দুই খলিফাও অনেক ভুল করেছিলেন কিন্তু কেউতো কোনোদিন তাদের পদত্যাগ দাবি করেনি, আমার বেলায় কেন এমন হচ্ছে? আমি শুধু একটি দাবি বাদে জনগণের বাকি সব দাবি মেনে নেবো। আমি ক্ষমতা ত্যাগ করতে পারবো না’। হযরত আলি বললেন : ‘ ঠিক আছে, আপনি যে জনগণের দাবি মানতে রাজি তার একটি প্রমাণ দিন’। কিছুদিন পূর্বে নবীপত্মী আয়েশাও উসমানকে বলেছিলেন, ‘খেলাফত ত্যাগ করে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করুন এবং আমার ভাই মুহাম্মদকে মিশরের গভর্নর পদে নিযুক্ত করুন।’

নবীপত্মী আয়েশা তার ভাই মুহাম্মদকে সরকারি কোনো পদ না দেওয়ায় উসমানকে সেই প্রথম থেকেই ঘৃণার চোখে দেখতেন। আয়েশা এবং তাঁর ছোট বোনের স্বামী হজরত তালহা (রাঃ) ও বড় বোনের স্বামী হজরত যোবায়ের (রাঃ) যে বিদ্রোহীদের সমর্থনকারী খলিফা উসমান তা টের পেয়েছিলেন। সবকিছু বিবেচনা করে উসমান ঘোষণা দিলেন যে, আজ থেকে মিশরের নতুন গভর্নর মুহাম্মদ ইবনে আবুবকরকে (আয়েশার ভাই) নিযুক্ত করা হলো। সরকার জনগণের সকল অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছেন এবং সকল দাবি-দাওয়া মেনে নিয়ে ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়েছেন। ঘোষণা পত্রে উসমান দস্তখত করলেন। মুহাম্মদ ইবনে আবুবকর কিছু গণ্যমান্য নেতৃস্থানীয় লোককে সঙ্গে নিয়ে মিশরের পথে রওয়ানা হয়ে যান। মদিনায় জড়ো হওয়া বিক্ষুদ্ধ জনতা খলিফার ঘোষণা বাস্তবায়নের আশা বুকে ধারণ করে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যেতে থাকলেন। মুহাম্মদ ইবনে আবুবকর, মিশর পৌঁছার আগেই খলিফা উসমানের প্রতারণামূলক প্রতিশ্রুতি জনসমক্ষে ধরা পড়ে যায়। উসমান তাঁর নিজস্ব গুপ্তচরকে একটি চিঠি দিয়ে মিশর প্রেরণ করেছিলেন। চিঠিতে লেখা ছিল, ‘মুহাম্মদকে তার দল নিয়ে মিশর পৌঁছামাত্র যেন হত্যা করা হয় এবং পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত বিদ্রোহীদেরকে বন্দী করে রাখা হয়।’ কিন্তু গুপ্তচর মুহাম্মদের দলের হাতে ধরা পড়ে যায়। সকলে মদিনায় ফিরে আসলেন। বিচার ডাকা হলো। বিচারের ভার দেয়া হলো হজরত আলির হাতে। হজরত আলি খলিফা উসমানকে জিজ্ঞেস করলেন-
-এই গুপ্তচর কি আপনার?
-জ্বি, আমার।
-এই উট কি আপনার?
-জ্বি, আমার।
-এই চিঠির সীলমোহর কি আপনার?
-হ্যাঁ, আমার।
-এই চিঠির নিচে স্বাক্ষর কি আপনার?
-হ্যাঁ, তাই তো মনে হয়।
-এই চিঠি আপনি লিখেছেন?
-আল্লাহর কসম, আমি লিখি নাই।
-আপনি কাউকে লিখতে বলেছিলেন?
-আল্লাহর কসম, আমি কাউকে লিখতে বলি নাই।

হজরত আলি লেখা পরীক্ষা বিশেষজ্ঞগণকে চিঠির লেখা পরীক্ষা করতে অনুরোধ করলেন। বিশেষজ্ঞগণ একমত হলেন, চিঠির লেখা মারওয়ানের হাতের। হজরত আলি মারওয়ানকে বিচারে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিলেন। উসমান বাধা দিলেন, মারওয়ানকে এখানে আনা যাবে না। গর্জে উঠলো উপস্থিত জনতা। মদিনার আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে বজ্রধ্বনি উঠলো, আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!, ইনতেকাম! ইনতেকাম! (প্রতিশোধ! প্রতিশোধ!)। মুহূর্তে সে আগুন ছড়িয়ে পড়লো মদিনার অলিতে গলিতে। অবস্থা আয়ত্বের বাইরে দেখে হজরত আলি, হজরত তালহা ও হজরত যোবায়েরসহ অনেকেই স্থান ত্যাগ করে চলে গেলেন। জনতা খলিফার গৃহ অবরোধ করলো। চার হাজারেরও বেশি মানুষের গৃহ অবরোধের শেষ পরিণতি আন্দাজ করতে পেরে নবীপত্মী হজরত আয়েশা চলে গেলেন মক্কায় আর হজরত আলি শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। স্বপরিবারে পূর্ণ বিশদিন অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকার পরও উসমান ক্ষমতা ছেড়ে দিতে রাজি হলেন না। তাঁর একটি আশা ছিল সিরিয়া ও বসোরা থেকে সৈন্যবাহিনী এসে তাঁকে উদ্ধার করবে। হিজরি ৩৫ সালের ১৭ই জিলহাজ্ব, শুক্রবার। মুহাম্মদ ইবনে আবুবকর (রাঃ) প্রাসাদের ছাদের ওপর দিয়ে জানালা ভেঙে খলিফা উসমানের কক্ষে ঢুকে পড়েন। হাতে উন্মুক্ত শাণিত তরবারি, সঙ্গে আরও ৪জন। উসমান আসন্ন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনের শেষ মিনতি, বেঁচে থাকার শেষ প্রতারণা করলেন। বুকের ওপর দুই হাতে কোরআন ধরে বসে রইলেন। নবীজির দোহাই দিলেন, মুহাম্মদকে তাঁর পিতা আবুবকরের দোহাই দিলেন, কোরআনের দোহাই দিলেন। মুহাম্মদ ভীষণ শক্ত হাতে উসমানের সাদা ধবধবে দাঁড়িতে ঝাপটে ধরে টান দেন, উসমান মাটিতে পড়ে যান। উপর্যুপরি খঞ্জরের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায় উসমানের সর্বাঙ্গ। ঘরের মেঝের ওপর দিয়ে বয়ে গেল ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত উসমানের দেহনিঃসৃত রক্তের স্রোতধারা। তলোয়ারের আঘাতে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল কোরআনের পাতাগুলো। উসমানের রক্তে সিক্ত, লাল রঙে রঞ্জিত, কোরআনের ছিন্ন পাতাগুলোর সাথে তাঁর প্রাণহীন দেহটিও মেঝেতে পড়ে রইলো তিন দিন, তিন রাত্রি। চতুর্থ দিন রাতের অন্ধকারে, গোপনে হজরত আলি কতিপয় যুবককে নিয়ে লাশটি সংগ্রহ করে, জনবিরল এক গলিপথে শহরের বহির্ভাগে নিয়ে জান্নাতুল-বাকির পার্শ্ববর্তী ফাঁকা জমিতে সমাহিত করেন।

৪র্থ পর্ব-

২য় পর্ব-

১ম পর্ব-

আকাশ মালিক, যুক্তরাজ্য নিবাসী মুক্তমনা সদস্য। ধর্ম, রাজনীতি এবং সমাজ নিয়ে নিয়মিত লিখে আসছেন। ই-মেইল : [email protected]

[1561 বার পঠিত]