কুয়ার ব্যাঙ

By |2009-04-08T18:45:22+00:00ডিসেম্বর 24, 2008|Categories: গল্প|Tags: |8 Comments

 

কুয়ার ব্যাঙ

 

অনন্ত বিজয় দাশ

 

আজ আমি আপনাদের একটি গল্প বলবো, এক কুয়ার ব্যাঙের গল্পভাবছেন নিশ্চয়ই, আপনাদের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট করে ঠাকুমারঝুলির রূপকথার গল্প শুনাতে বসেছি, আসলে মোটেই তা নয়আবার রূপকধর্মীবাস্তব কিছু নয়এটি শুধু গল্প, নিছক গল্পই; এর বেশি বা কম কিছু নাতবে বলে রাখি, আমি ভাই সুন্দর করে লিখতে পারি নাজানি আমার গল্প বলার ঢঙ বা স্টাইল আকর্ষণীয় নয়আপনাদের ভালো না লাগতে পারেফলে আগেভাগে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছিঅনুমতি দিলে শুরু করি এবারকিন্তু গল্প শুরু করার আগে তো ব্যাঙটির নাম-বয়স ইত্যাদি বলতে হবেজানি না, ব্যাঙেরা মানুষের মতো নাম রাখে কি-না? না রাখলে না-রাখুকআপনারাই যে কোনো একটি ঠিক করে নিন, রাম-শ্যাম-যদু-মধু যা ইচ্ছে; আর বয়স? ব্যাঙেরা কতদিন বাঁচে, সেটাও তো জানি নাতবে আপাতত ধরে নিন ব্যাঙটি ব্যাঙজাতির হিসেবে প্রাপ্তবয়স্কইথাকে সে এক মরা কুয়াতেমরা কুয়া বললাম এই কারণে, সাধারণ কুয়াতে যে পরিমাণ জল থাকার কথা, সেই কুয়াতে এরকম জল নেইখুবই অল্প পরিমাণ জল, ব্যাঙটির হাটু-কোমর ডুবে যায় কোনোরকমেগলা পানিতে ভয় পেলেও কোমর পানিতে নেমে সে মাঝেমাঝে কোনোরকমে ডুব দেয়; পানির নীচে চোখ খুলে কালচে-সবুজ রঙের দুনিয়াকে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেকত কিছু ভাবে আকাশ-পাতালকূল খুঁজে পায় নাপানিতে বাস করা পোকা-মাকড় আর কীট নিয়ে নিজে নিজে কাহিনী তৈরি করে, গল্প বানায়বলতে ভুলে গেছি, আমাদের এই ব্যাঙ আবার সাতার জানে নাহাসছেন নিশ্চয়ই! কি সব আলতু-ফালতু কথা বলছি! ব্যাঙ সাতার জানে না, এটা কি করে হয়? হয়, হয়ভাইরে এই দুনিয়াতে অনেক কিছুই হয়যদিও কুয়ার মধ্যে এই ব্যাঙের সাথে আরো অনেক ছোট-বড় ব্যাঙ থাকে, তবে তারা প্রত্যেকেই মোটামুটি সাতার জানেখুব ভালো জানে এরকম কিছু নাসাতার জানা ব্যাঙগুলির মধ্যে কেউ কেউ তাকে পছন্দ করে, কেউবা খুবআর কেউবা পছন্দ করা তো দূরের কথা, সহ্যই করতে পারে নাএ্যানিওয়ে, যেসব ব্যাঙ তাকে পছন্দ করে, তাদের সাথে তার খুব ভাবসকাল-সন্ধ্যা শুধু আড্ডা আর গল্প, গল্প আর আড্ডাবন্ধুদেরকে সে পোকামাকড়ের গল্প শোনায়; বন্ধুরাও তাকে কুয়ার ভেতরের দুনিয়াদারি নিয়ে অনেক কিছু বলেএভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিনআচমকা একদিন কুয়াতে হাজির হয় এক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যাঙসাক্ষাও হয়ে যায় তাদের দুজনের মধ্যেআস্তে আস্তে বন্ধুত্ববয়োজ্যেষ্ঠ ব্যাঙটি বয়স-জ্ঞান-অভিজ্ঞতায় সবকিছুতেই পরিণতখাল-বিল-নালা-ডোবা-নদী পাড়ি দিয়ে সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছেছেঅনেকের সাথে মিশেছে, অনেক কিছু দেখেছে, অনেক কিছুই বোঝেকিন্তু ছোটটির তো সেই তুলনায় কোনো বোধ-বুদ্ধি নেইবয়োজ্যেষ্ঠর কাছে সাত সমুদ্র তের নদীর গল্প সে মুগ্ধ হয়ে শোনেশুনতে শুনতে সে ভেবে পায় না তাদের এই কুয়ার থেকেও বড় কুয়া আছে! এটা কিভাবে সম্ভব? খাল-বিল-নদী-সমুদ্র এগুলো আবার কি? কুয়ার যে হাটু জলে সে প্রায়ই ডুব দেয়, এরকমই কিছু একটা হবে হয়তোতবে পুরোপুরি আন্দাজ করতে পারে নাস্বপ্ন দেখতে শুরু করে সেও একদিন পাড়ি দিবে কুয়া, নালা-ডোবা-নদী পার হয়ে পৌঁছুবে তার রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া সমুদ্রেঅপেক্ষার প্রহর গুণতে থাকে

 

বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যাঙটি তাকে বলে, বন্ধু তুমি এই কুয়া থেকে বের হতে চাও, ভালো কথাকিন্তু তোমাকে তো আগে সাতার শিখতে হবেসাতার না জানলে তো তুমি নালাই পার হতে পারবে না, সমুদ্র তো অনেক দূর

 

ছোটটি হাসেহবে, হবেসব হবে

 

বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যাঙটি একবার ছোট ব্যাঙটিকে হাত ধরে কাছেরই নালা-ডোবাতে বেড়াতে নিয়ে যায়, সেখানে বন্ধুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়বন্ধুরা অনেকে সমুদ্র বেড়িয়ে এসেছে, কেউবা সমুদ্র না গেলেও নদী পর্যন্ত গিয়েছেরাতভর খাওয়া-দাওয়া আড্ডা-ফুর্তির পাশাপাশি একেকজন তার সমুদ্র ভ্রমণের কথা বললো, কেউবা নদী ভ্রমণের কথাছোট ব্যাঙটি তন্ময় হয়ে যায়ইস! একবার যদি সমুদ্রে যাওয়া যেত, তবে কি মজাই না হতো!

 

বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যাঙটি বারেবারে বলে, বন্ধু তুমি সাতার শিখোনইলে কোথাও একা একা যেতে পারবে নাকুয়াতেই পড়ে থাকতে হবে

 

ছোট ব্যাঙ হাসেহবে, হবেসব হবে

 

নালা-ডোবা বেড়িয়ে যখন ছোট ব্যাঙটি নিজের মরা কুয়োতে ফিরছিল, তখন ক্লান্ত হয়ে পড়েবয়োজ্যেষ্ঠ ব্যাঙ তাকে কাধে তুলে নেয়বন্ধুকে বাড়ি পৌঁছে দেয়

 

মরা কুয়াতে ফিরে এসে ব্যাঙটি তার আগের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে, অনেক গল্প হয় ডোবা-নালার, সমুদ্র ভ্রমণের পরিকল্পনার কথা জানায়বন্ধুরা জিজ্ঞেস করে, তুমি তো মিয়া সাতারই জান নাএই কুয়া বর্ষার সময় ভরে গেলে পার হবে কি করে? ডুবে মারা যাবে, নয়তো লতা-পাতা ধরে ঝুলে থাকতে হবেগতবার তো তাই করলা, এবারও কি তাই করবা?

 

ব্যাঙটি হাসেহবে, হবেসব হবেস্বপ্ন দেখতে থাকে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যাঙ তাকে পার করে দিবে মাথায় করেতারপর সমুদ্রে গিয়ে রাত-দিন ঘুরাবেচক্কর খাবে ঢেউয়ের কোলেইস! কত আনন্দ! কত সুখের দিন সামনে অপেক্ষা করছে!

 

কিন্তু হঠা করেই বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যাঙটির সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়খুব চিন্তায় পরে যায় ছোট ব্যাঙবর্ষা চলে আসছেযে করেই হোক বর্ষার আগে বেরোতে হবেনয়তো নির্ঘা মৃত্যুগতবার কোনোরকমে বেঁচে গিয়েছিল, এবার সে চান্স নাও পেতে পারেসে বার্তা পাঠায় নানাজনের মাধ্যমেবড় ব্যাঙটি কেন আসে না, কেন কোনো বার্তার উত্তর দেয় নাঅবশেষে একদিন উত্তর এল, বন্ধু আমি অসুস্থনানা দিকে ব্যস্ততারওপর বর্ষা চলে আসছেআমি তোমার ওখানে আসতে পারবো নাতুমি ভালো থাকোপরে কথা হবে

 

বর্ষার প্রথম বৃষ্টির ফোটা পরতে লাগলো কুয়াতেপানি ছিটকে পড়ছে ব্যাঙের গায়েকুয়ার মধ্যে জন্মানো লতা-পাতা গাছের কোণে ব্যাঙটি চুপটি মেরে আছেএবার সে স্থির করেছে সাতার শিখতেই হবেকিন্তু পানি যে পরিমাণে বাড়ছে তাতে সাহস হচ্ছে না এই পানিতে নামার

 

[email protected]

——————————————————-

 

বিশেষ দ্রষ্টব্য : গত কোনো এক রাতের কোনো এক ঘটনার তাক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এই (অ)গল্পটির যাত্রাআজ হতে কিছুদিন পর যদি কোনো কারণে এটি নজরে আসে, তবে কেন, কখন, কি অবস্থায় এটি লেখা হয়েছিল তা যেন মনে করতে না পারি, তাই কোনো তারিখ উল্লেখ করলাম নাধন্যবাদ সবাইকে

অভিজিৎ রায় (১৯৭২-২০১৫) যে আলো হাতে আঁধারের পথ চলতে চলতে আঁধারজীবীদের হাতে নিহত হয়েছেন সেই আলো হাতে আমরা আজো পথ চলিতেছি পৃথিবীর পথে, হাজার বছর ধরে চলবে এ পথচলা।

মন্তব্যসমূহ

  1. suman ডিসেম্বর 27, 2008 at 2:53 পূর্বাহ্ন - Reply

    মামুন ভাই, ব্যাঙে সোনার হরিণ দিয়া কি করবো?!!!

  2. মামুন ডিসেম্বর 26, 2008 at 12:11 পূর্বাহ্ন - Reply

    স্হির যেহেতু হইছে সাতার কাটার তাইলে দেখবা ছোট ব্যাঙটি একদিন সাতার কাটতে কাটতে ভাইসা ভাইসা সমুদ্রে পৌঁইছা গেছে।আর যদি পৌঁছে যায়-এ তখন ব্যাঙ-এর বুঝ অইবো এটার যে কোনো কুল-কিনারা নাই,নাই কোনো স্বপ্ন-রাংগা সুখ বা সোনার হরিনও।
    সোনার হরিন চাই আমার সোনার হরিন চাই, তোরা যে যা বলিস ভাই…………………
    ছোট ব্যাঙ সাতার কাটতে সফল হইবে এ আশা রইলো।

  3. suman ডিসেম্বর 25, 2008 at 11:45 অপরাহ্ন - Reply

    ফরিদ ভাই, প্রথমে রসিকতাই করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু মন ঘুরে গেলো সিরিয়াসনেসে। রসিকতা করি কি করে, আপনাদের কল্যানেইতো আজ সত্যটাকে জানার সাহস পাচ্ছি, সাহস করছি। আপনারা ক’জন নিবেদিতপ্রান যেভাবে স্রোতের বিপরীতে গিয়ে উদাহরন রেখেছেন সেটার কথা না বললে আপনাদের সাথে অবিচার করা হবে। পাঠককুল ভাববেন না আমি স্তুতি করছি, আমি যেটা অনুভব করেছি সেটাই লিখলাম। সব্বাই ভালো থাকুন, ধন্যবাদ।

  4. ফরিদ ডিসেম্বর 25, 2008 at 9:13 অপরাহ্ন - Reply

    খুব লজ্জা পেলাম সুমন। সেই সাথে বেশ বিব্রতও। রসিকতার বিপরীতে রসালো কোন মন্তব্য আশা করেছিলাম আমি আপনার কাছ থেকে। এতো সিরিয়াস কিছু শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।

    নারে ভাই, আমরা কেউই সাঁতার জানা লোক না। না আমি, না অভি, না জাহেদ। অনিচ্ছায় জলে পড়ে ডুবে যাবার ভয়ে নিঃসঙ্গ কিছু মানুষ আমরা হাত পা ছুড়ছি এই যা। শ্যাওলার মতো স্রোতের অনুকুলে ভেসে যাওয়ার পক্ষপাতী নই বলেই হয়তো আমাদের এই অনিচ্ছুক দাপাদাপি।

    আপনারা কেন কুয়ার ব্যাঙ হতে যাবেন? আমাদের সবটুকু শক্তি যে আপনাদের কাছ থেকেই ধার করা। আপনারা হয়তো নিজেরাও জানেন না যে, আপনাদের মত অসংখ্য অদেখা, অচেনা এবং অজানা কিন্তু বড্ড আপন লোকজনেরাই আমাদের কণ্টকময় বন্ধুর চলার পথে বন্ধু হয়ে রসদ জুগিয়ে যাচ্ছেন নিরন্তর। আমাদের যাত্রাকে মসৃন করার জন্য গভীর মমতায় নিরলসভাবে সাফ সুতরো করে দিচ্ছেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পথের কাঁটাগুলোকে।

    আমাদের প্রতি আপনাদের এই অসামান্য অবদান, এই অসীম ভালবাসা আমরা ভুলি কি করে?

  5. suman ডিসেম্বর 25, 2008 at 7:31 অপরাহ্ন - Reply

    আবার কে? সিনিয়র মুক্তমনারা। এই যেমন আপনি, অভিজিতদা, জাহেদ ভাই… সাঁতার জানা লোক। যারা কিনা সাগর, ডোবা, নালা ইত্যাদি ঘুরেছেন আর তার গল্প আমাদের শুনিয়েছেন, আপনাদের কথা ভাবলে নিজেরে সত্যি কুয়ার ব্যাঙ মনে হয়। এবার ক্লিয়ার?

  6. ফরিদ ডিসেম্বর 25, 2008 at 10:15 পূর্বাহ্ন - Reply

    ফরিদ ভাই এ্যান্ড কোংটা যেন কে সুমন? মহামতি কিং কোং এর ভাই টাই নাকি? ঠিকমতো চিনতে পারতেছি না যে।

  7. suman ডিসেম্বর 25, 2008 at 9:56 পূর্বাহ্ন - Reply

    হ, ফরিদ ভাই, আমিওতো কিছুই বুঝলাম না। অনন্ত বিজয়, বড় চিন্তায় ফালাইলেন ভাই। তয় মনে লয়, কুয়ার ব্যাঙ; আংগুলটা নিজের দিকেই বেশি উঠছে আর বুড়ো ব্যাঙ; ফরিদ ভাই এ্যান্ড কোং। কি, ঠিক ধরছিনা?

  8. ফরিদ ডিসেম্বর 25, 2008 at 9:30 পূর্বাহ্ন - Reply

    অনন্ত,

    গল্পতো মজাদারই হইছে। খালি বুইড়া ব্যাঙ আর কুয়ার ব্যাঙটারে ঠিকঠাক মতো চিনতে পারলাম না এই যা একটু অসুবিধা। কিছুদিন পরে ভুলে যাওয়ার আগেই একটু বলে টলে দিলে ভাল হতো না ব্যাপারটা। তাইলে আর মনের মধ্যে খচখচানিটা থাকতো না রে ভাই।

মন্তব্য করুন