তখন  ও এখন

 

গীতা দাস

 

(৪) 

  

 

ডিসেম্বর মাস। বিজয়ের মাস। আনন্দের মাস। বেদনার মাস। একাত্তুরে হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের মনে করার মাস। মুক্তিযুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি মনে করে ভেতরে ভেতরে জ্বলে পোড়ার মাস। কারো ত্যাগকে অবমূল্যায়ন করা দেখলে অন্য সময়ের চেয়ে এ মাসে একটু যেন বেশীই চোখে ঝাঁঝে — বুকে বাজে —কানে লাগে — হৃদয়ে দাগে।  মুক্তিযুদ্ধের গাঁথা — সংগ্রামের ব্যথা — ত্যাগের কথা এ মাসেই নাড়া দেয় — জ্বালা দেয় —- পীড়া দেয় বেশী। আজ এমনি এক ব্যথার পুঁথির পাতা খুলব।

 

একাত্তুরে হারিয়ে যাওয়া আমার এক স্বজন প্রমিলা দাস আমার ক্লাসে পরত, তবে বয়সে আমার চেয়ে বেশ বড় ছিল। আমি যখন খালি গায়ে নদীতে দাপাদাপি করতে পারি তখন প্রমিলাকে রীতিমত ওড়না পরে স্কুলে যেতে হত। এখন সর্বজনীন শিক্ষার প্রভাবে একই ক্লাসে বয়সের এত হেরফের চোখে খুবই কম পড়ে।

 

প্রমিলা আমার জেঠিমার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। যাওয়া আসার জন্যে কাছের মনে হত। এক ক্লাসে পড়লেও মাসি বলে ডাকতাম এবং বয়সে বড় বলে আমাকে আদর করত। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় আমাকে অনুপপ্রেরণা দিয়েছিল যেন আমি দৌড়ে অংশগ্রহণ করি, যদিও বাইরের খেলাধুলায় আমি কখনোই ভাল ছিলাম না। দৌড়ঝাঁপ, লাফালাফি এক আর প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ আরেক। তবুও প্রমিলা মাসির আদরের বহিঃপ্রকাশ ছিল আমাকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করানোর জন্যে উদ্ধুদ্ধকরণে।

 

 নরসিংদীর বৌয়াকূড় গ্রামের জগৎ দাসের মেয়ে প্রমিলা। স্বচ্ছল পরিবার। তবূও মেয়েকে দেরীতেই স্কুলে দিয়েছিল। তবে ঐ পরিবারের বড় দুইছেলে ও মেয়েরা স্কুলে যায়নি বললেই চলে। ছোট মেয়েটিও নয়। সবার ছোটটির বড় প্রমিলা ও তার বড় ভাইটিই শুধু পড়াশুনা করত। বাকী ভাইয়েরা বাবার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা দেখত ও বোনদের যথারীতি পাত্রস্থ করাই ছিল ঐ পরিবারের ঐতিহ্য।  প্রমিলার মা ছিল না বলে আমার জেঠিমাও অকে বেশ আদর করত।  প্রায়ই আমাদের বাড়িতে তার আসা যাওয়া ছিল।

 

আমার গ্রাম হাজীপুর আর তার গ্রাম বৌয়াকূড়। মাঝে নদী। পারাপারের জন্যে তখন নৌকা সহজলভ্য ছিল। খরচবিহীন যাতায়াত ব্যবস্থা। এখন গ্রামের অস্তিত্ত্ব নেই। হাজীপুর আর বৌয়াকূড় দুই মহল্লা।  মাঝে ব্রিজ। রিকসায় যাতায়াত। সময় কম লাগে। তবে যাওয়া আসাও খুব কম।

 

সংগ্রামের সময়  দেখতাম মা বাবা এ দেশে, অথচ মেয়েদের ভারতে পাঠিয়ে দিচ্ছে ভাই, কাকা, দাদু বা নিকট আত্মীয়ের সাথে। কারণ বুঝতে পারতাম না। পরে বুঝেছিলাম পাক হানাদার, রাজাকার ও আল বদরদের হিংস্রতা থেকে রক্ষা পেতেই এ ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রমিলাকেও ভারতে পাঠিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে দেরি হয়ে গিয়েছিল। বড্ড বেশি দেরি।

 

আমরা তৎকালীন কুমিল্লা জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এখনকার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়।  আশেপাশের গ্রাম জুড়েই নরসিংদীর লোকজন। হঠাৎ কানাঘোষা শুনলাম প্রমিলা মাসি কলেরায় মারা গেছে। কিন্তু ফিসিফাসে তা তাৎপর্যপুর্ণ মনে হয়েছিল। এ বিষয়ে প্রশ্ন করে সদুত্তর পাইনি বড়দের কাছ থেকে। কেউ কলেরায় মারা গেলে তা কেন ছোটরা শোনতে পারবে না — তা তখন বোধগম্য না হলেও পরে হয়েছিল। 

 

হায় রে দেশ। হায়রে সমাজ! আর হায়রে নারীর ভাগ্য। নারীর ত্যাগ — নারীর যুদ্ধ অস্বীকৃতই থাকল। যেখানে যোদ্ধা হিসেবে সম্মান পাবার কথা সেখানে অসুস্থতার অজুহাতে মৃত্যুর খবর রটাতে হল। সম্মানিত হবার বদলে লুকানো হল তার মৃত্যুর আসল কারণ। বানানো হল কাল্পনিক অসুখ।

 

এখন মুক্তিযুদ্ধ হলে কী হত! নারী তার ত্যাগের কথা সগর্বে বলতে পারত। অযাচিত অপ্রত্যাশিত সন্তানকে ধবংস করতে গিয়ে নিজের জীবন প্রমিলা মাসির মত বিসর্জন দিত না। কুমারী মায়েরা দেশের মুক্তির জন্যে জোরপূর্বক যুদ্ধ শিশুকে গর্ভে ধারণ করলেও গর্বিত হত। যুদ্ধ শিশুর মা তো অহংকারী পরিচয়।

 

বর্তমান নারী আন্দোলন তাদের সাথে থাকত। তখনও ছিল, তবে নারী সংগঠন সংখ্যায় এত বেশী, দেশজুড়ে ব্যাপৃত  এবং শক্তিশালী ছিল না।

 

এখন প্রজন্মান্তরে চিন্তা চেতনার —- প্রগতিশীলতার ধারাও বেগবান হচ্ছে। মূল্যবোধের ক্ষেত্র হচ্ছে প্রসারিত। স্রোতের বিরুদ্ধ দিকে নারী দাঁড়িয়ে থাকার মত সাহসী হচ্ছে। নারীর নিজস্ব মতামতে — বিশ্বাসে —- অবস্থানে অবিচল থাকার মত মেধাও নারী অর্জন করছে। এখন অনেক কুমারী মায়ের সাহস দেখি। তখন দেখিনি।

 

তখন — একাত্তুরে  প্রমিলা মাসি হাজীপুর আর বৌয়াকূড় গ্রামের দূরত্বে থাকলেও দেখা হয়নি। ভয়ে জড় পদার্থের মত ছিলাম। তাই মৃত্যুর আগে প্রমিলা মাসি কী ভেবেছিল —- কীভাবে ভেবেছিল — কী করেছিল আমার জানা হয়নি।

 

সখিনা বিবির কপাল ভাঙ্গল

সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর

 

সখিনা বিবি আর হরিদাসীর কথা জানি। তবুও অজানা রয়ে গেল কত প্রমিলাদের কথা।   

 

গীতা দাস

 ১ পৌষ, ১৪১৫/  ১৫ ডিসেম্বর, ২০০৮

[email protected] 

[46 বার পঠিত]