একজন সগীরউদ্দিন এর দিনকাল

By |2009-04-08T18:48:21+00:00নভেম্বর 30, 2008|Categories: গল্প|6 Comments

 

একজন সগীরউদ্দিন এর দিনকাল

 

তানবীরা তালুকদার

 

 

চারপাশ নিঃশব্দ, সন্ধ্যে না হতেই ঝুপ করে কেমন যেনো রাত নেমে গেলো। রাত মাত্র নটা কিন্তু মনে হচ্ছে যেনো কতো গভীর। একটানা ঝি ঝি পোকার ডাক ছাড়া আজকাল আর আশে পাশে কোন শব্দ পাওয়া যায় না। ভয়ে জোনাকীগুলোও আলো জ্বালে না। মনে হলো কাছেই কোথাও ফুটল কিছু ঠুস ঠুস শব্দে। সামান্য শব্দেও আতংক ছড়িয়ে পড়ে। সারাদিন এক রকম যায় বটে কিন্তু সন্ধ্যে হলেই কেমন যেনো এক নাম না জানা মৃত্যুর আতংক ঘিরে থাকে সবাইকে। মুখে কেউ প্রকাশ করে না বটে কিন্তু সবার মনেই একই ভাবনা থাকে আজকের রাত ভোর হয়ে আগামী প্রভাতের সূর্য দেখতে পাবোতো? সগীরউদ্দিন ভয়ে কাটা হয়ে থাকেন আজকাল সারা বেলা। রাত গভীরে খুব কম আওয়াজ দিয়ে রেডিওর নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সর্বশেষ খবরটা জানার চেষ্টা করেন কি হচ্ছে বাংলাদেশ থুক্কু পূর্ব পাকিস্তানে? এসব বিচ্ছু পোলাপালগুলা যা শুরু করেছে না। তিনি নির্বিরোধী সাধারন মানুষ, কারো সাতে পাচে থাকেন না, অকারন ঝামেলা তার সহ্য হয় না। কতোগুলা পোলাপান শেখের সাথে জিকির তুলছে স্বাধীনতা চাই স্বাধীনতা, আরে চাইলেই হলো? এটা কি মুখের কথা? এখন বুঝ ঠ্যালা। পাকিস্তানী আর্মি হলো ট্রেনিং প্রাপ্ত বিশ্বের সেরা দু একটা আর্মীর মধ্যে একটা, আরে শালার হিন্দু মালাউন ইন্ডিয়ারে ঘোল খাওয়াইয়া ছেড়ে দেয়, আর এরাতো অসংগঠিত, ট্রেনিং ছাড়া, কিছু আবেগী হুজুগে পোলাপাল। পাকিস্তানের সাথে এখন আবার জড়িত হচ্ছে মার্কিন মুল্লুকের সপ্তবহর, সোজা কথাতো না। বাঘের লেজ দিয়ে কান চুলকানোর মজা টের পাবে তবে তারা ছাড়বে, হু বাবা।

 

তবে তার মনে যাই থাকুক তিনি মুখে তা কারো কাছে প্রকাশ করেন না। তিনি সরকারী পদস্থ কর্মকর্তা, নিষ্ঠার সাথে তার দ্বায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। অফিসে অবশ্য কিছু স্বাধীন বাংলার লোকজন আছে, ফিসফাসে বাংলাদেশ – বাংলাদেশ, শেখ মুজিব শেখ মুজিব করে কিন্তু তিনি তাদের সযতনে এড়িয়ে চলেন। নিয়ম করে অফিস যান, কাজ করেন, মাসের শেষে বেতন নেন। এই তার দেশের প্রতি সেবা বলে তিনি জানেন ও মানেন। তারতো এসব ঝামেলায় জড়ালে চলবে না। বাপজান তাকে কতো কষ্ট করে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। তিনি সংসারে সকলের বড়। তার নীচে আরো ছয় ভাইবোন আছে। মাত্র এতোদিনে একবোনের বিয়ে দিলেন তিনি। বর্ষা – গরম, জল – কাদা ভেঙ্গে তিন মাইল রাস্তা রোজ হেটে পাশের গ্রামের স্কুলে যেয়ে পড়াশোনা করেছেন কি তিনি এই করার জন্য? দশ বিঘা ধানের জমি আর তারা এতোগুলো লোক। মানী বংশের সম্মান বাচিয়ে কতো কষ্টে বাপজান সব ম্যানেজ করেছেন তা তিনি নিজের চোখে কি দেখেননি? বাপজান এখন বৃদ্ধ তার মুখের দিকে চেয়ে আছেন। আর তিনি নিজে ভালো করে পড়াশোনা করেছেন, দশগ্রামের মুখ উজ্জল করে ভালো ফলাফল করেছেন বলেই না মীর্জা বাড়ির মতো বাড়িতে বিয়ে করতে পারলেন। সাধারন কোন ছেলে কি পারে?

 

সারা ঢাকা জুড়ে থমথমে ভাব। কখন কি হয় তা কেউ বলতে পারে না। নির্দোষ লোকজনদেরকেও আজকাল আর পাকিস্তানী মিলিটারীরা রেহাই দিচ্ছে না। তাদের কি দোষ? তাদেরকে অকারনে খুচিয়ে বিরক্ত করলে কি তারা ছেড়ে দিবে লোকজনদেরকে? ঘর থেকে বেরোনোর সময় তিনি নিয়ম করে আয়াতুল কুরসী পড়ে, বুকে ফু দিয়ে পাক সাফ হয়ে বেরোন কিন্তু আজকাল আর আয়াতুল কুরসীর উপর ভরসা রাখতে পারছেন না। শহরের যা পরিস্থিতি তাতে অনেকেই তাদের পরিবার পরিজনদেরকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। কোথাও তেমন নিরাপত্তা না থাকলেও, গ্রামের দিকটা আজকাল অপেক্ষাকৃত শান্ত। তিনিও ভাবছেন তার তিন বছরের পুত্র সন্তান শুদ্ধ স্ত্রীকে গ্রামে পাঠিয়ে দেয়ার কথা। তার শ্বশুর বাড়িতে সুযোগ সুবিধা ভালো। মেয়েদের গোসল – বাথরুমের ভালো পর্দা ব্যবস্থা আছে, সেখানে তাদের তেমন কষ্ট হবে না। তিনি একা মানুষ শহরের বাড়িতে কোন রকম চালিয়ে নিবেন। গন্ডগোল থেমে গেলে আবার তাদের নিয়ে আসবেন। শেখ সাহেবের উপড় তিনি চরম বিরক্ত, প্রথমে স্বায়ত্ত্বশাসন চায় আর এখন স্বাধীনতা চায়। আরে বাঙ্গালী কি সেই জাতি? মাথার উপড় ডান্ডা মারার কেউ না থাকলে এরা কখনই সিধা থাকে না। সাথে যোগ হয়েছে নেহরুর বেটী ইন্দিরা। সগীরউদ্দিন সব বুঝতে পারেন, হিন্দুদের সব চক্রান্ত। মুসলমানদের উন্নতি ইন্দিরা গান্ধীর সহ্য হবে কেনো? আর স্বাধীন বাংলা বেতার না একটা কি যোগ হয়েছে আজকাল। কোথাকার সব ভুয়া খবর দিয়ে বিচ্ছুগুলোকে আরো উসকায়। পাকিস্তানী আর্মীদের মারবে বাংগালী ছেলে ছোকড়ারা, এও কি সম্ভব? যদি হয় পাচ তাকে পঞ্চান্ন বানানো বাংগালী জাতিকে কি তিনি চিনেন না? কিন্তু তিনি সব ঝামেলা নীরবে এড়িয়ে চলেন।

 

* -*-*-*-*-*

 

 

আজ সগীরউদ্দিন সাহেবে বড়ই আনন্দের দিন। নিজের মন্ত্রনালয়ের যুগ্ম সচিব হিসেবে আজ তিনি অবসর নিচ্ছেন। নাহ, স্বাধীন বাংলাদেশ নিয়ে তার মনে আজ আর বিশেষ খেদ নেই। স্বাধীন বাংলাদেশ তার নিষ্ঠার মূল্য দিয়েছে। যুদ্ধের সময় তার উধ্বর্তন পাক অফিসারের সাথে তার আলাদা খাতির কিংবা স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি তার অবহেলা উন্নাসিক আচরনের জন্য তাকে কোন দায়ই মেটাতে হয়নি। কেউ সেগুলো নিয়ে তাকে বিব্রত করেনি। প্রথমে কিছু দিন অবশ্য ভয়ে ভয়ে থাকলেও খুব শীঘ্র সেই ভয় তার কেটে গেছে। শেখ মুজিব সাধারন ক্ষমাই শুধু ঘোষনা করেননি, তার উধ্বর্তন পাক অফিসার চলে যাওয়াতে সেই শুন্য পদে তাকে অগ্রীম প্রমোশোন দিয়ে গৌরাবান্বিত করেছেন। মনে মনে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে থাকতেই পারেন তাতে কি? তিনিতো আর কাউকে খুন করেননি এমনকি কোন খুন খারাবীতে সাহায্যও করেননি, তাহলে? তিনি এখনও বিশ্বাস করেন মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই। ইসলামের জন্মের পর থেকে শয়তান এর পিছে লেগে আছে। যারা মুসলিম উম্মাহ, ব্রাদার হুড এর শত্রু তারা দেশের শত্রু, ইসলামেরও শত্রু। সমস্ত কিছুর বিনিময়ে দুনিয়ার সমস্ত মুসলমান ভাইদেরকে এক থাকতে হবে।

 

 

জীবন নিয়ে কর্ম নিয়ে তার কোন খেদ নেই। যথেষ্ঠ করেছেন তিনি এক জীবনে। বাবা মায়ের জন্য গ্রামের বাড়িতে তিনি একতলা বিল্ডিং করে দিয়েছেন আধুনিক সব সুযোগ সুবিধা দিয়ে। ইলেকট্রিসিটি, লাইট – ফ্যান কিছুই বাদ রাখেননি। গ্রামের লোক বাড়ির পাশ দিয়ে হেটে যায় আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে ছেলে বটে সগীরউদ্দিন, কি করেনি বাবা মায়ের জন্য? সুদূর মক্কায় আল্লাহর ঘর পর্যন্ত দেখিয়ে এনেছে বাবা মাকে। তবে সগীরউদ্দিন আর্দশ লোক, গ্রামের সন্তান হয়ে গ্রামের জন্য তিনি কিছু করবেন না, তা কি হয়? স্বয়ং মন্ত্রী সাহেবের সাথে কথা বার্তা পাকা করে গ্রামে একটি স্কুল করিয়েছেন, গ্রামের রাস্তা পাকা করিয়েছেন বলেই আজকাল গাড়ি বাড়ি পর্যন্ত পৌছে যায় একটানে। গ্রামের ছেলেদের আর তার মতো তিন মাইল রাস্তা ভেঙ্গে পাশের গ্রামে পড়তে যেতে হয় না। আজকাল গ্রামে শিক্ষিত ছেলের হারও তাই বেশী। সবইতো তার জন্যেই। কিন্তু এগুলো করতে যেয়ে সগীরউদ্দিন কিন্তু নিজের ছেলে মেয়ের পড়াশোনার কোন অবহেলা করেন নি। ছেলে মেয়েদেরকে ভালো স্কুলে পড়িয়েছেন তিনি, বাসায় ভালো টিউটর দিয়ে ভালো গাইড করিয়েছেন। সব ছেলে মেয়ে তার এক একটি রত্ন মাশাল্লাহ। বড় ছেলে তারই মতো মেধাবী। বুয়েটের শেষ বর্ষে আছে, তারপরই বাইরে চলে যাবে। স্কলারশিপও ঠিক করাই আছে, এখন এটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। বড় মেয়ে ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে, তার অন্য কলিগের ছেলের সাথে বিয়ে এক রকম পাকা করাই আছে, পি।এইচ। ডি করতে ছেলে বাইরে গেছে, ফিরলেই শুভকাজ সমাধা করে দিবেন। ছোট ছেলে – মেয়ে বাকী দুজনও ভালো ছাত্র – ছাত্রী, তাদের রাস্তাও মোটামুটি তৈরী করাই আছে, সময়ের সাথে সাথে তাদেরও প্রতিষ্ঠা করে দিবেন। চিন্তা নেই, গোছানোই আছে তার সব কিছু। চাকরীর সাথে সাথে জীবন গুছিয়ে নিয়েছেন। বড় ছেলে বাইরে যাচ্ছে, তাকে ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছেন দ্বীনের পথে থাকবা, আল্লাহকে স্মরন রাখবা, তাকে ভুলবা না। তুমি তাকে স্মরন করলে তিনিও তোমাকে নজরে রাখবেন।

 

বড় ছেলেও বাবার মতোই আর্দশ ছেলে হয়েছেন। সব সময় সমস্ত ঝুট ঝামেলা থেকে দূরে দূরে থেকেছেন। তার সাথে পড়া কতো মেধাবী ছেলে কতো রকম ঝামেলায় জড়িয়ে নিজের উজ্জল ভবিষ্যত নষ্ট করল তা কি সে নিজের চোখে দেখেননি? সেসব দেখেই আরো সাবধান হয়েছেন। কিছুতেই কোন ঝামেলায় জড়াবেন না তিনি। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে দেশ উত্তাল হয়েছে, কতো সহপাঠী বন্ধুর লাশ রাস্তায় পড়েছে কিন্তু তিনি আজ পর্যন্ত কোন মিছিলতো দূরের কথা, কোন মীটিং এও যাননি পড়া নষ্ট করে। কি দরকার বাবা এসবের? দুটো মিছিল করলে আর হরতাল করে কয়টা গাড়ি পোড়ালেই দেশের সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? তারচেয়ে ভালো করে পড়াশোনা কর, বিদেশে চলে যা, নিজের উন্নতি কর, না তা না আছে শুধু ভেজালের তালে। সাধারন পোলাপাল মরে মরুক, তাতে কি আসে যায় কিন্তু বুয়েটের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছেলেরা কেনো এসবে জড়ায় আজও তিনি তা বুঝতে পারেন না। তারা হলেন দেশের সম্পদ, দেশের ভবিষ্যত। তদুপরি ছাত্রদের কাজ হলো পড়াশোনা করা, ছাত্রদের রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাতে কে বলেছে? দেশের কি হলো, আরে ব্যাটা তাতে তোদের কি? স্বৈরাচার থাকুক আর আমের আচার থাকুক, আমাদের কি? আমাদেরতো খাওয়া পরায়তো কোন সমস্যা নেই। দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে, যতো সব কথা, কেউ কি দেখেছে নিজের চোখে, আর টাকা থাকলে পাঠাবে না বিদেশে?

এসব কথা বার্তা তার একদম দুচোখের বিষ যাকে বলে।

 

 

পি।এই।ডি করতে বিদেশে আছেন। কিন্তু সব সময় তিনি সর্তক। তার ডিপার্টমেন্টে কিছু ইন্ডিয়ান ছেলে আছে তারমধ্যে আবারতো দুজন একদম বাঙ্গালী। তাহলেও কি হিন্দু, খুটে খুটে ইলিশ মাছ খায় তাদের সাথে তার বনবে না। সেদিন মাংস কিনতে যেয়ে এক পাকিস্তানী ফ্যামিলির সাথে আলাপ হয়ে তার খুবই ভালো লাগলো। এই নাছাড়ার দেশে এমন ঈমানদার পরিবারের সাথে যোগাযোগ হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সব হালাল খান তারা। যদিও বাত চিত করতে একটু সমস্যা হয় কিন্তু তাতে কি? মদ খাওয়া, শুয়োড় খাওয়া হিন্দু বাংগালীদের থেকেতো ভালো। ঈমান ঠিক থাকবে। তাদের সাথে যেয়ে তিনি মসজিদ চিনে এলেন। এই বিদেশ বিভূইয়ে এরকম আল্লাহর ঘর দেখলে মনটা অন্যরকম এক শান্তিতে ভরে যায়। তবে আজকাল বাংলাদেশীদের মধ্যেও সেই ঈমানের জোর দেখা যায় না। এই যে সেদিন এক ছেলের সাথে সিটি সেন্টারে পরিচয় হলো, যাওয়ার সময় বলে খোদা হাফেজ, আরে খোদা হাফেজ কি, বল আল্লাহ হাফেজখোদা আর আল্লাহ কি এক হলো? দুনিয়াদারী করতে যেয়ে আখিরাতকে ভুলে গেলে চলবে? দেশ থেকে সগীরউদ্দিন ছেলেকে চিঠি পাঠিয়েছেন। চিটাগাং এর ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পরিবারের সুন্দরী, সুশীলা, ধার্মিক পাত্রীর সাথে তার বিয়ে ঠিক করেছেন। ছুটি নিয়ে তাকে দেশে যেতে বলেছেন যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব। ছেলের মামা মানে সগীরউদ্দিন এর শালার মাধ্যমে এ বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। মেয়ের বাবা ব্যবসায়ের সূত্রে তার বহুদিনের পরিচিত। মেয়ে পক্ষও এমন উচ্চ শিক্ষিত ধার্মিক পাত্র পেয়ে যার পর নাই বিগলিত।

 

বিগলিত হবেনই না বা কেনো? ছেলে একদম আর্দশ – বিশ্বস্ত। কোন ঝামেলায় নেই, নিজের কাজ নিয়ে আছেন। তারা খোজ নিয়ে জেনেছেন কোন ধরনের রাজনৈতিক দলতো দূরের কথা দেশের বন্যা – খরায় কিংবা স্বাধীনতা দিবসের যে প্রশেসন হয় বিদেশে তাতেও ছেলে যায় না। তার গন্তব্যস্থল অফিস আর বাড়ি। তার সময় কোথা সময় নষ্ট করার? প্রবাসে যেয়ে কতো ছেলে নষ্ট হয়ে যায়, বাংলাদেশ, বাংলাদেশ হৃদয়ে বাংলাদেশ করতে থাকেন, বন্যা – খরা কিংবা দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় শো ডাউন করে, চাদা তুলে, বিদেশীদের ধরে দেন দরবার করে, কিন্তু এই ছেলে একদম খাটি সোনা, এ সমস্ত ফালতু কাজে সে নেই। বাংলাদেশের সংবাদপত্র পড়ার সময়ও তার হয় না, সে সময়টাতে ইউনিভার্সিটির কাজ কিছুটা এগিয়ে রাখলে ক্যারিয়ারের কাজ দিবে।

 

* -*-*-*-*-*

 

আজকাল সগীরউদ্দিন চোখে ভালো দেখতে পান না। বড়োই আফসোস হয় তার। বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় তার বড় ছেলের বিভিন্ন লেখা ছাপা হয়। এমন সৌভাগ্য কজন পিতার হয়? ছেলে তার মস্ত কৃতী। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে দাওয়াত করে নিয়ে যাওয়া হয় দেশ – বিদেশে, তার পেপার শোনার জন্যে। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও তার ছেলেকে কথা বলতে হয়। বিশ্বের দরবারে ছেলে তার আজ বাংলাদেশকে উপস্থাপন করছে। বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতরা তাদের বাসায় তার ছেলেকে নিয়মিত আমন্ত্রন করে নিয়ে যাচ্ছেন। ছেলে এখন তারই মতো দেশ ও দশের উপকারে লাগছে। চোখে ভালো দেখতে না পারলেও কানে এখনও ভালো শুনতে পান। বিবিসি কিংবা ভোয়া থেকে মাঝে মধ্যে যখন তার ছেলের কথা শোনেন তার বুকটা জুড়িয়ে যায়। আর এমনিতে সগীরউদ্দিন সারাদিন ইবাদত বান্দেগীতেই সময় কাটান। ধার্মিক বই পড়েন, টিভিতে জাকির নায়েকের বির্তক অনুষ্ঠান দেখেন। কি সাংঘাতিক ঠাসা ঠাসা উত্তর দেন তিনি সব্বাইকে। শুনে তার মতো নিরীহ লোকেরও শরীরের রক্ত চনমন করে উঠে। দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ওয়াজের কথা তার মনে পড়ে যায়, তার বাপজান শুনতো। এরকম একটা ধার্মিক, নূরানী লোককে নিয়ে যখন কিছু কুফরী লোকজন আলতু ফালতু কথা বলে মনে হয় তখন তাদের কানের নীচে থাবড়া দিয়ে বয়রা বানিয়ে দেন। আরে এরকম একটা আলেম লোককে নিয়ে যে ফালতু বকিস, নাউজুবিল্লাহ আসতাগফিরুল্লাহ, আখেরাতের ডর নাই তোদের কলিজায়, মরতে হবে না? এরকম একজন আল্লাহ উল্লাহ ব্যাক্তি যখন স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলেন তখনতো তিনি কিছু বুঝেই করেছিলেন নাকি না? তারা কি নিজের থেকে কিছু করেন, তারা হলেন আল্লাহর খাস লোক, আল্লাহর ওলি, তারা চলেন তার ইশারায়।

 

শুধু বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ। আছেটা কি এই দেশে? পুরোতো হিন্দু বানিয়ে ছাড়ছে। হিন্দুদের মতো নাচ – গান, পহেলা বৈশাখ, শহীদ মিনারে ফুল, কবরে ফুল, সব বেদাতী কান্ড কারখানা। আজ যদি পাকিস্তানের সাথে থাকতাম পারতো আমাদের উপড় বন্যার পানি ছাড়তে? আজকে আমরাও পাকিস্তানের পারমানবিক বোমা বানানোর গৌরবের অংশীদার হতে পারতাম কিংবা ক্রিকেটের। বাংলাদেশ হয়ে পেলি টা কি? বি এস এফের গুল্লী আর ফারাক্কা বাধ। বাংগালীর নির্বুদ্ধিতায় যার পর নাই বিরক্ত। অলি – আউলাদের নিয়ে সমালোচনা।

 

যৌবন কালে বাপজানের সাথে তিনিও যেতেন তেনার ওয়াজ মাহফিল অনুষঠানে। আহা কি সেই অনুভূতি, তা কি ভোলার? কি সেই নূরানী চেহারা, গাল ভরা দাড়ি। যেনো সাক্ষাত রাসুল (সাঃ) এর প্রতিনিধি তিনি। জ্যোতি বের হয় দাড়ি আর চোখ দিয়ে। তার সেই গম গম করে উঠা ভরাট গলার স্বর। তিনি যখন মিহি সুরে নারীরা যে দুনিয়ার অধঃপতনের কারন, গন্ধম খাইয়ে সেই প্রথম মানব আদমকে কাত করে শুরু করেছে, আজো তা বিভিন্ন ভাবে চালিয়ে যাচ্ছে বর্ননা করতেন, চোখে পানি এসে যেতো, আহা। শয়তান নারী রূপ ধারন করে মুসল্লী ভাইদের আশে পাশেই সর্বনাশ হয়ে ঘুর ঘুর করছে। বেগানা বেপর্দা নারীদের থেকে সব সময় সাবধান করে দিতেন। বেপর্দা নারীরা নাভীর নীচে শাড়ী পড়ে কিভাবে তাদের সুরত – সারত প্রদর্শন করে সরলমতি পুরুষদেরকে জেনার পথে, দোজখের পথে নিয়ে যায় তার বর্ননা করতেন নিখুতভাবে। এইযে পৃথিবীর সবাই জানে সগীরউদ্দিন এতো নিরীহ তারও শরীরের রক্ত চনমন করে উঠতো ওয়াজ শুনে। এই ওয়াজ শুনেই না তিনি তক্ষনাত সিদ্ধান্ত নিলেন তার স্ত্রীকে পর্দা পুশিদায় থাকতে হবে, বাইরে যাওয়া, বেগানা পুরুষের সাথে মেশা, কাজ করা চলবে না। ছেলের বিয়ের পর ছেলেকেও বলে দিয়েছেন বাবা, বউ কে বউ করে রাখবা, বাইরে বের করবা না। নারী হলো পরিবারের অলঙ্কার তাকে পরিধান করে, আবার তাকে বাক্সেই রাখবা। হুমম তিনি আজ গর্ব করে বলতে পারেন, সারা জীবন বিদেশ করা ছেলে আর তার বউ তার কথার বাইরে যায় নি। দুজনেই পাচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, বউমা মাথায় হিজাব পড়ে, হালাল খাবার খায়। বউমা চাকরী বাকরী করার কথা ভুলেও ভাবেনি। অথচ কতো ভালো রেজাল্ট করা মেয়ে সে। ভাবলেই বুকটা আনন্দে ভরে উঠে।

 

 

(কিছু সগীরউদ্দিনের গল্প এভাবে শেষ হয় আর কিছু কিছু দের একটু অন্যভাবে)

 

* -*-*-*-*-*

 

 

সগীরউদ্দিন ভাবছেন ছেলে মেয়েরা কেউ কাছে নেই, সবাই যার যার মতো ব্যস্ত। অবসর জীবনটা বাগানের কুমড়া আর পুইশাকের তদারকি করে কতো কাটাবেন। আজকাল তাই সগীরউদ্দিন ঘন ঘন গ্রামে যাচ্ছেন, এলাকার হাওয়া বাতাস বুঝার চেষ্টা করছেন। ইলেকশন আসছে, দু একটা রাজনৈতিক দলের সাথে প্রাথমিক কথাবার্তাও হয়ে আছে। চূড়ান্ত কথা তিনিই দেননি, যাদের বাজার ভালো, ঠিক সময়ে তাদের দলে টুপ করে ভীড়ে যাবেন। জুম্মাবারে জুম্মাবারে গ্রামের মসজিদে সবার সাথে এক কাতারে নামায আদায় করেন। এলাকাবাসী, গ্রামবাসীর সাথে ইসলামী চাল – চলন, রীতি নীতি, রাসুল্লুল্লাহর সুন্নত নিয়ে আলোচনা হয়। দেশের কিছু মানুষের বেদাতী কাজ কারবারের কারনে যে দেশের উন্নতি হচ্ছে না, আল্লাহর খাস রহমত আসমান থেকে আসতে গিয়ে মাঝ পথে আটকে যায়, গজব এসে পড়ে সেই আলোচনাও হয়। সহজ সরল গ্রামবাসী তার মুখ থেকে জ্ঞানের বানী পেয়ে যার পর নাই চরম আনন্দিত। এতোদিন তেমন গ্রামমুখী না হলেও তাদের খোজ খবর সেভাবে না করলেও এখন ঘরের সাওয়াল ঘরে ফিরে আসছে। কিভাবে এলাকার উন্নয়ন করা হবে সবাই মিলে সেই পরিকল্পনাও আকা হয়। আসলে আগে কেউ এই গ্রামের লোক সরকারে ছিল না বলে এলাকার দিকে গ্রামের দিকে অন্যরা তাকায় নাই। সবাই নিজ নিজ লোকের দিকেই তাকায়। এলাকার উন্নয়নের জন্য চাই নিজের লোক ঘরের লোক সেটা তিনি এখান সবাইকে বুঝিয়েছেন। এলাকার বাতাস ভালো, তার নিজ্বস্ব লোকজন তাকে খবর দিয়েছে। সগীরউদ্দিন ভাবছেন এখন কোন দলের হয়ে খেলবেন।

 

সগীরউদ্দিনের দিন কাল এখন এরকম সুখেই কাটে।

 

(এই লেখাটির কোন চরিত্রের সাথে এই পৃথিবীর জীবন্ত বা মৃত কোন ব্যাক্তির কোন সম্পর্ক নেই, এই লেখাটি নিতান্তই লেখিকার নিজের অনুভব মাত্র)

 

তানবীরা

২৪.১১.২০০৮ 

অভিজিৎ রায় (১৯৭২-২০১৫) যে আলো হাতে আঁধারের পথ চলতে চলতে আঁধারজীবীদের হাতে নিহত হয়েছেন সেই আলো হাতে আমরা আজো পথ চলিতেছি পৃথিবীর পথে, হাজার বছর ধরে চলবে এ পথচলা।

মন্তব্যসমূহ

  1. তানবীরা ডিসেম্বর 2, 2008 at 3:33 পূর্বাহ্ন - Reply

    সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ আমার লেখাটি নিয়ে আগ্রহ দেখানোর জন্য। তালাত সাহেবের জন্য ছোট একটি কথা, মুক্তমনা নারীদেরও চাকরী,সংসার সন্তানের দাবী মিটাতে হয়। সে ভারসাম্য যতোদিন পুরুষরা অনুধাবন করে নিজের হাত না প্রসারিত করবেন, ততোদিন অনেক সৃজনশীল কাজেই মুক্তমনা – অমুক্তমনা নারীরা পিছিয়ে থাকবেন।

    ভালো থাকুন সবাই।

  2. অগ্নি ডিসেম্বর 1, 2008 at 9:45 অপরাহ্ন - Reply

    talat সাহেবের কথা তো সত্যি। এটা তো এতদিন খেয়াল করি নাই। তাইতো, মুক্তমনা নারীরা এত কম লেখে কেন? নারীরা কি মুক্তমনা হতে চায় না? নাকি মুক্তমনা নারীর সংখ্যা কম?

  3. Talat ডিসেম্বর 1, 2008 at 4:53 অপরাহ্ন - Reply

    মুক্তমনা ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রগতি, নারী-পুরুষের সাম্যের কথা বলে থাকে। বিশেষ করে নারীমুক্তি, নারী স্বাধীনতা, নারীর সমান অধিকার নিয়ে মুক্তমনায় কম লেখা প্রকাশ হয় নাই। আথচ মুক্তমনার মধ্যেই যে পুরুষতন্ত্র তা কি কেঊ খেয়াল করেছে?মুক্তমনার লেখকদের মধ্যে নারী খুব কমই চোখে পরে। তানবীরা তালুকদার, বন্যা আহমেদ, নন্দিনী হসেন, লুনা শিরিন ছাড়া তেমন কাঊকে দেখা যায় না। যাদের নাম বললাম তাদের মধ্যে লুনা শিরিন ছাড়া আর সবাই প্রায় আনিয়মিত। মোদ্দা কথা লুনা শিরিনই মুক্তমনায় একমাত্র active লেখিকা। আমরা যতই নারী-পুরুষের সাম্যের কথা বলি না কেন, আমাদের নিজেদের অজান্তেই যে পুরুষতন্ত্র আমাদের উপর ভর করছে তা কি কেউ লক্ষ করেছেন?

  4. Mamun ডিসেম্বর 1, 2008 at 1:19 অপরাহ্ন - Reply

    এই সগির উদ্দিন এর মত সফল না হলেও আচার আচরনে, চিন্তা ভাবনায় এই সগির উদ্দিন এর মত লোকের অভাব নাই দেশে

  5. Biplab Pal ডিসেম্বর 1, 2008 at 1:36 পূর্বাহ্ন - Reply

    আমি ত ভাবছিলাম তানবীরা বিরাগী হয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে!

  6. অভিজিৎ ডিসেম্বর 1, 2008 at 12:01 পূর্বাহ্ন - Reply

    যাক অনেকদিন পরে আমাদের মডারেটরের লেখা দেখলাম মুক্তমনায়। লেখা তো যথারীতি ভালো হইছে। আশা করি বৈরাগ্য কাটিয়ে মুক্তমনাতেও সরব হয়ে উঠবেন।

মন্তব্য করুন