আমরা কিছু বিষয় নিয়ে বিভ্রান্ত থাকি সবসময়, কিছু ব্যাপারে অযৌক্তিক পক্ষপাত বা বিরাগ দেখাই। এরকম একটা ব্যাপার হচ্ছে ‘ন্যাচারাল’।

কোনো কিছু ‘ন্যাচারাল’ মানেই সেটা গ্রহণযোগ্য, অবশ্যই উত্তম আর ‘আনন্যাচারাল’ মানেই অগ্রহণযোগ্য এবং ক্ষতিকর।
এই হেত্বাভাস/ফ্যালাসিকে বলা হয় appeal to nature (Argumentum ad Naturam)

nature-1

কিছু দিন আগে সমকামিতা বিতর্কে এই ফ্যালাসির ব্যাপক প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা গেছে। অনেকেই এক কথায় বলেছেন, সমকামিতা প্রকৃতি-বিরুদ্ধ। এখানে আমরা অবশ্য সমকামিতা নিয়ে কোনো আলোচনাই করব না, এটা শুধু উদাহরণ হিসেবে এসেছে।

‘ন্যাচারাল’ মানেই সবসময় মানুষের পক্ষে উপকারী এমন নয় আবার যাকে প্রকৃতি-বিরুদ্ধ বলে মনে হয় সেটাও সবসময় মন্দ বা ক্ষতিকর নয়।

প্রকৃতিতে মানুষের বা অন্যান্য প্রাণির পক্ষে ক্ষতিকর এমন বস্তু ও ঘটনা অগণিত। যেমন, গাঁজা, কোকেইন। বিছুটি পাতা, গোখরা সাপের বিষ, ধুতুরার বিষ এগুলোই ধরেন। বিষাক্ত গাছগাছালির তালিকা দেখেন। শতভাগ ‘ন্যাচারাল’ বলেই তা আমাদের দেহের জন্য ভাল মনে করতে পারি না।

ন-৩

আর্সেনিক কিন্তু ‘ন্যাচারাল’, তাই আমরা মেশিনে রিফাইন করা পানির তুলনায় কি আর্সেনিক যুক্ত ‘ন্যাচারাল’ পানি পান করাকে যুক্তিযুক্ত মনে করব? আর টিউবওয়েলের পানির তুলনায় পুকুরের দূষিত পানি অধিক ‘ন্যাচারাল’ নয়কি? ব্লগ লেখার তুলনায় গাছের পাতায় লেখা যেমনটি এক সময় মানুষ লেখত তা-ই অধিক ‘ন্যাচারাল’? দাড়িগোঁফ-নখ না কেটে নিজের মত করে কতটুকু লম্বা হতে দিলে ‘ন্যাচারাল’ দেখাবে? রান্না-বান্না ছাড়াই যদি কাঁচা খেয়ে ফেলি সবকিছু সেটাই বা কতটা ‘ন্যাচারাল’?

ব

কিছু প্রাকৃতিক ঘটনা যেমন ভূমিকম্প, বন্যা, খরা, দাবানল, সুনামি, ঘূর্ণিঝড় মানুষের জন্য প্রাণঘাতি হয়। প্রকৃতি জড়, তাই প্রকৃতিতে যখন কোনো ঘটনা ঘটে তখন তা মানুষের জন্য শুভ নাকি অশুভ তা বিবেচনা করে ঘটে না।

আবার মানুষ যেহেতু প্রকৃতির বাইরে কিছু নয় তাই কৃত্রিম কিছু মানেই তা ‘প্রকৃতি বিরুদ্ধ’ বলাটাও সমীচীন নয়।

আমাদের কাছে ন্যাচারাল মানেই ভাল ও উপকারী বলে মনে হয় কারণ আমরা নিজেরা যে ধরণের প্রকৃতিতে বিবর্তিত হয়েছি তাকে সুবিধাজনক মনে করি, সে প্রকৃতির আকস্মিক বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন দুর্যোগ ডেকে আনতে পারে। এই ধরনের পরিবর্তনও আবার প্রকৃতির জন্য স্বাভাবিক ঘটনা অথচ আমাদের কাছে তা ‘প্রকৃতি বিরুদ্ধ’ মনে হতে পারে। আমরা যে প্রকৃতিতে লক্ষ-লক্ষ বছর ধরে বিবর্তিত হয়েছি সে প্রকৃতিকেও কিন্তু নিজের মত পরিবর্তন করে নিয়েছি। আট থেকে দশ হাজার বছর আগে মানুষ যখন কৃষিকাজ শুরু করল তখন থেকেই শস্য-ফল-মূলের বিবর্তন মানুষের উপযোগিতার উপর নির্ভর করে হয়েছে। বীজহীন কলা কিন্তু বেশিদিন আগের নয়। গৃহপালিত প্রাণিদের বেলায়ও একই কথা। কুকুরের বিবর্তনে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ রয়েছে, বিশেষ করে এর অসংখ্য প্রজাতির উদ্ভাবনে। আর আমাদের দৈহিক পরিবর্তনও হয়েছে সাথে সাথে। রান্না করে খাওয়ার ফলে শ্বদন্তের উপর নির্ভরতা কমেছে, দাঁতের গঠন পরিবর্তিত হয়েছে। উপযোগিতা না থাকায় দেহের লোমের পরিমাণ কমেছে।

আমরা ‘প্রকৃতি’ মানেই মনে করি সবুজ গাছগাছালি, বন, ফলজ বৃক্ষ, পাখিডাকা বাগান ইত্যাদি। ভাল করে ভাবলেই দেখা যায় সেটা একটা উদ্ভট ভাবনা। মরুভূমি, বরফাচ্ছাদিত মরু, অন্যান্য অগণিত মনুষ্য বসবাসের অনুপযোগী গ্রহ সবকিছুই প্রকৃতির অংশ।

আধুনিক ওষধ, অস্ত্রোপাচার ব্যবস্থা মানুষকে অনেক রোগব্যাধি থেকে মুক্তি দিয়েছে, জীবনকে করেছে সহজ। কিন্তু অনেকের কাছে এগুলোকে ‘ন্যাচারাল’ মনে হচ্ছে না, তারা ঝুঁকছেন অল্টানেটিভ মেডিসিনের দিকে, হার্বাল-কার্বাল-হোমিওপ্যাথেটিক গাঁজাখুরি চিকিৎসার দিকে। এর ফল কী সেটা সহজেই বোধগম্য। একদল আছেন Genetically engineered শুনলেই চেচিয়ে উঠেন জাত গেল, জাত গেল বলে। অথচ এগুলোর প্রয়োজন আছে কিনা সেটা যাচাই করার অনেক কারণ আছে।

একসময় লাঙ্গল আর গরু দিয়ে চাষাবাদ হত বিশ্বব্যাপী। ছিল না কীটনাশকের ব্যবহার। ব্যাপারটি খুব ‘ন্যাচারাল’ ছিল বৈকি! কিন্তু বর্তমানে কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার, অধিক ফলনশীল বীজের উদ্ভাবন কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছে। পুরনো পদ্ধতিতে চাষাবাদ বহাল থাকলে তা অতি অল্প সংখ্যক মানুষকে খাদ্যের যোগান দিতে পারত। উন্নত প্রজাতির পশু-পাখি-মাছ এর উদ্ভাবন ও এর আধুনিক পালন পদ্ধতি মানুষকে অনেকাংশে খাদ্যে স্বনির্ভর করে তুলছে। টিকার প্রয়োগ মানুষসহ সকল প্রাণীকে অনেক রোগ থেকে রক্ষা করছে।

এক সময় মহামারীতে গ্রাম থেকে গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। মাতৃ-মৃত্যুর হার ছিল ব্যাপক। চোখের সমস্যায় চশমার কোনো বালাই ছিল না। প্রচুর মানুষ দাঁতের ব্যাধিতে ভুগত, দন্তক্ষয়ের চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল বিভৎস। ক্ষয় হওয়া দাঁত তোলা হত হাতুড়ি-সাঁড়াশি সদৃশ যন্ত্রপাতি দিয়ে। অস্ত্রোপচারে ব্যথামুক্ত করার বালাই ছিল না। এসব ব্যাপার আর যাই হোক অধিকতর ‘ন্যাচারাল’ ছিল, কোনো সন্দেহ নাই!

এরপরও যারা ‘ন্যাচারাল’ এর অন্ধ ভক্ত তাদের জন্য একদম ন্যাচারাল আমেরিকান স্পিরিট সিগারেট দেই (নিচে বিজ্ঞাপন দেখেন)

TASTE NATURE.
AND NOTHING ELSE.
You’ll never find any additives in our tobacco. What you see is what you get. Simply 100% whole-leaf natural tobacco. True authentic tobacco taste. It’s only natural.

ন

ভিডু

9 Comments

  1. নীলাঞ্জনা July 25, 2015 at 9:20 pm - Reply

    যারা সমকামিতাকে প্রকৃতি বিরুদ্ধ ব’লে ঘৃণা করে তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, বিষমকামিতা কেন প্রকৃতি বিরুদ্ধ নয়? সমকামিতা যদি তাদের কাছে ঘৃণ্য হয় তবে বিষমকামিতা কেন নয়?
    লেখাটি ভাল লেগেছে, সৈকত।

    • সৈকত চৌধুরী July 25, 2015 at 10:59 pm - Reply

      আপনাকে ধন্যবাদ।

  2. জাহিদ রাসেল July 26, 2015 at 11:28 am - Reply

    লেখা ও ভীডু দুইটাই ভালো পাইলাম।

    • সৈকত চৌধুরী July 26, 2015 at 1:41 pm - Reply

      ধন্যবাদ।

  3. জান্নাতুন নাঈম প্রীতি July 27, 2015 at 1:16 am - Reply

    আগাগোড়াই ভালো লাগলো… তথ্পূর্ণ সুন্দর লেখা।

    • সৈকত চৌধুরী July 27, 2015 at 8:05 am - Reply

      ধন্যবাদ

  4. Sazzad Sabbir July 28, 2015 at 2:54 am - Reply

    হেডলাইনটা কেমন জানি – ‘প্রকৃতি বিরুদ্ধ’ মানেই মন্দ বা ক্ষতিকর?’ । প্রকৃতি বিরুদ্ধ কিছু অবশ্যই ক্ষতিকর, কোন যুক্তি প্রমানের দরকার আছে কি? হও্যা উচিত ছিল ‘কৃত্রিম’ মানেই মন্দ বা ক্ষতিকর? এরকম কিছু।

    • সৈকত চৌধুরী July 28, 2015 at 12:41 pm - Reply

      আসলে সবকিছুই প্রকৃতির অংশ। তাই ‘প্রকৃতি বিরুদ্ধ’ বলতে সুনির্দিষ্ট কিছু বুঝায় না। এই ‘প্রকৃতি বিরুদ্ধ’ কথাটা আমার না, যারা এরকম প্রচার চালায় তাদের। এখানে ‘প্রকৃতি বিরুদ্ধ’ কথাটাকে Apostrophe দিয়ে আলাদা করে দিয়েছি এজন্যই।

      তবে আপনি ‘প্রকৃতি বিরুদ্ধ’ কথাটি দ্বারা কি বোঝেন?

      • কাওসার July 30, 2015 at 7:32 pm - Reply

        ” ‘প্রকৃতি বিরুদ্ধ’ বলতে সুনির্দিষ্ট কিছু বুঝায় না।” পেরিয়ড। খুব পরিস্কার করে এটা বুঝতে হবে, বলতে হবে , প্রচার করতে হবে, বুঝাতে হবে ।

Leave A Comment