লেখকঃ জান্নাতুন নাঈম প্রীতি

লাশকাটা ঘরে তার লাশ পড়ে আছে।
কয়েকটা মাছি উড়ছে… উড়ছে, বসছে… আবার উড়ছে… আবার বসছে।

মেয়েটির প্রেমিকটি মারা গেছে। দীর্ঘদিনের ডিপ্রেশান নামের মানসিক অশান্তি কাটিয়ে তাকে মরে যেতে হয়েছে। আত্মহত্যা বলাটা কি এইক্ষেত্রে শোভন হবে?
না বোধহয়। প্রেমিকটির ভাষায় তার এই মৃত্যুর নাম- স্বেচ্ছামৃত্যু।

মেয়েটির কাছে সে একদিন নক্ষত্র হতে চেয়েছিল।
বলেছিল- সমপ্রেম হয়না? মেয়েটি বলল- হয়, কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে হবেনা।
প্রেমিকটি আহত গলায় বলল- কেন হবেনা?
মেয়েটি ততোধিক কঠিন গলায় বলল- যে দেশে একাত্তর সালের যুদ্ধশিশুদের মায়েদের পাঞ্জাবীর বউ বলা হয় সেদেশে সমপ্রেম কে বুঝবে? আর তাছাড়া…
-আর তাছাড়া?
আর তাছাড়া, আমাদের উত্তরাধিকারী কে হবে?
-মানে?
মানে আমাদের সন্তান।
-তোমার সন্তানের খুব শখ?
খুউব!(মেয়েটির চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে)
-মা তো কতভাবে হওয়া যায়! আমরা বাচ্চা অ্যাডপ্ট করতে পারি?
তা পারি।
-তাহলে?
না কিছুনা।
-আমরা একটা আফ্রিকান বাচ্চা নিতে পারি? সোমালিয়া বা ইথোউপিয়া থেকে?
পারি।
-তুমি রাগ করছ?
না।
-হ্যাঁ।
বললাম তো, না।
-তাহলে হাসো!
পারবোনা।
-তাহলে আমার হাসি দ্যাখো!
হিহিহি!
মেয়েটি এই পর্যায়ে হেসে ফেলে হাসতে হাসতেই বলল- এমন কার্টূনের মতন হাসি শিখেছ কোথায়?
– আরেকটা কার্টুনের কাছ থেকে!
কোন কার্টুনের কাছ থেকে?
– কেন,তুমি!

না, মেয়েটি কথা রাখেনি। বাংলাদেশের মতন কোনো দেশে এধরনের কথা রাখা যায়না। জলজ্যান্ত একটা মেয়েকে নিজের প্রেমিক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া যায়না। প্রেমিকটির মতন তো আর সে ফ্যান্টাসিতে বাস করেনা, তাকে সমাজে বাস করতে হয়। সেই সমাজে সমকামিতার স্থান নেই।
এটা ইউরোপ নয়। এখানে সমকামিতাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি আইন করে। এখানে প্রেমের উদ্দেশ্য সন্তান জন্মদান, ভালোবাসা নয়।
এখানে ভালোবাসার শর্ত বিপরীত লিঙ্গের হওয়া, সমলিঙ্গের নয়।
এখানে সন্তানকে শুধু জন্ম দিলেই চলেনা, পিতৃ পরিচয়ও দিতে হয়।
এটা ফ্যান্টাসি নয়, এটা সমাজ… এটা সমাজ নয়, এটা তৃতীয় বিশ্বের সমাজ।

মেয়েটি তাই এসব ফ্যান্টাসি ছেড়ে সমাজে প্রবেশ করে ‘আশফাক’ নামের পুরুষটিকে বিয়ে করার মধ্য দিয়ে। দীর্ঘদিনের মেয়ে প্রেমিকটিকে ছেড়ে সে প্রেম থেকে পরিবারে প্রবেশ করে। পরিবার থেকে সমাজে প্রবেশ করে। তার আগে মেয়ে প্রেমিকটিকে সে দাওয়াত করে নিজের বিয়েতে।
প্রেমিক তাকে বলে- নাও। এই-ই আমার শেষ উপহার, তোমার শখের নীল জামদানী।
মেয়েটি বলে- শেষ উপহার বলছ কেন? আমাদের আর দেখা হবেনা?
প্রেমিক বলে- বা-রে! তোমার তো বিয়ে হচ্ছে যে!
মেয়েটি বলে- কে জানবে তুমি আমার কে?
প্রেমিকটি বলে- এভাবে কি হয়? যেতে তো একদিন হতই!

বড়ই করুন শোনায় প্রেমিকের গলাটা।

মেয়েটি বড় করে দম নেয়… সেই দমের বাষ্পকণায় মেঘ জমে ওঠে। মনের ভেতরের চোখের জলে ভিজে ওঠে তার সারাটা পৃথিবী। পৃথিবী শুদ্ধ হয়, পৃথিবী পবিত্র হয়। পৃথিবী সতেজ হয়।
সেই শুদ্ধতা প্রেমিকের উপস্থিতি ম্লান করে দেয়, সেই পবিত্রতা এই অপবিত্র প্রেমের স্মৃতি ম্লান করে দেয়। সেই সতেজতা পৃথিবীকে ফিরিয়ে আনে তার আপন আয়তনে, অক্ষ ও দ্রাঘিমারেখার সঠিক সংগঠনে।

মেয়েটি ভালো অভিনেত্রী।

না, মেয়েটির বিয়ের দিন প্রেমিকটি কাঁদতে চায়নি। মেয়েটি চেয়েছিল।

মেয়েটির চোখে জল আসে, আবার আসেনা…বিয়ের সাজের ভারী মেকআপ গলে গলে পড়বে যে!
প্রেমিকটির চোখে জল আসে, সে সেই জল গোপনের চেষ্টা করেনা। তাই দেখে মেয়েটির বাবা-মা- বলে, “বান্ধবীর প্রতি এটাই তো বান্ধবীর অকৃত্রিম ভালোবাসা!”

দূরে কোথাও গান বাজতে থাকে-

প্রেম বলে যে যুগে যুগে
তোমার লাগি আছি জেগে,
মরন বলে আমি তোমার জীবনতরী বাই…

বহুদূরের সেই গান ওই কোলাহলময় বিয়েবাড়িতে এসে পৌছায়না।

-তারপর?

অবশেষে ‘আমি’ নামের মাছিটির সাথে প্রেমিকটির দেখা হল। লাশকাটা ঘরে শুয়ে প্রেমিকটি আমার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করলো। তার অস্তিত্বহীন প্রেমের গল্প, তার ব্যাক্তিগত বিরহের গল্প, তার পরিকল্পিত স্বেচ্ছামৃত্যুর গল্প।
নির্জীব এই ঘরে সময়ের হিসেব কেউ কষেনা। তবুও যেন সময়জ্ঞানহীন সময়টুকুও ‘সময়’ হয়ে উঠেছিল তখন। একপর্যায়ে সে আহত গলায় বলল- যদি সে জানতো জীবনের নতুন রুপান্তর হবে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে, তাহলে কখনোই স্বেচ্ছামৃত্যুর কথা ভাবতো না। কেননা, তার এই রুপান্তরিত জীবনটিও কাটবে মেয়েটিকে ভাববার মধ্য দিয়ে।

তবে কি মেয়েটিকে সে ভুলতে চেয়েছিল?
মৃত্যুর মধ্য দিয়ে?
রুপান্তরের মধ্য দিয়ে?

না, এই প্রশ্নটি আমি তাকে করিনি।

আমার সঙ্গে এতসব গল্পের ফাঁকেফাঁকেই পোস্টমর্টেম শেষ হল। তার আগে পেটমোটা ডোমটি শিস্‌দিতে দিতে তার কোমল ত্বক চিরে ফেললো। তার থলথলে অন্ননালী বের করে আনলো। সে ব্যাথিত চোখে তার একসময়ের শরীরটিকে নিবিড় অবহেলায় ক্ষতবিক্ষত হতে দেখলো।

সময়গুলো ‘সময়’ হয়ে উঠলো।

একসময় অন্ননালীসহ তার জোড়াতালি দেয়া শরীরটিকে নিয়ে যাওয়া হতে লাগলো সমাহিত করতে। শরীরের পিছু পিছু তার আত্মাটিও গেল। আমিও যেতে চাইলাম। প্রেমিকটি আমাকে বলল- তুমি এখানেই থাকো। লাশের গন্ধ ছাড়া তোমার মৃত্যু হবে।

সে তো ঠিকই বলেছে!
আমি লাশঘরের মাছি।
আমার জন্মই তো এই লাশকাটা ঘরে। এই ঘরের ঘোলা জানালার ঘুলঘুলি দিয়ে আসা আলোতেই তো আমার বেড়ে ওঠা। তার এমন বিবেচনাবোধ আমাকে মুগ্ধ করলো।

তাই তার কথামতই আমি তাকে বিদায় জানালাম সজল চোখে। যেন কতদিনের পুরোনো বন্ধু চলে যাচ্ছে! এখনো আমি বিস্মিত হয়ে ভাবি- আমার আরেক বন্ধু ‘নাকাতা’ চলে যাবার সময়ও তো এতো কষ্ট লাগেনি!
সে শেষবারের মতন আমার দিকে চেয়ে করুণভাবে হাসলো। তারপর মুখ ঘুরিয়ে উড়ে যেতে লাগলো তার লাশ হয়ে ওঠা নিরুত্তাপ শীতল শরীরটির পেছনে।

অদ্ভুত কথা হল- সে চলে যাবার পর আমার হৃদয় দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে যেতে চাইলো। একে কি প্রেম বলে?
কিন্তু তা কি করে সম্ভব?
-আমি জানিনা।
তবে এখন পর্যন্ত তাকে ছাড়া আমার জীবনটা ঠিক তার প্রেমিকাবিহীন জীবনের মতো মনে হয়! কেমন যেন জমাট বাধা নিরেট শুন্যতা!
তাকে ছাড়া আমার জীবনটা প্রেমিকবিহীন মনে হয়!

লাশঘরে পড়ে থাকা শুভ্র-সুন্দর-কুৎসিত সব লাশের সঙ্গে আমি কথা বলি। তারা বলে আমি শুনি; তারা শেখায়, আমি শিখি। যেমন দুদিন আগেই একজন এসেছিল। বেঁচে থাকতে যে কিনা ছিল একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। আমি তার কাছ থেকে জাপানী ভাষার কয়েকটা শব্দ শিখলাম, যেমন- হানা মানে ফুল, চিচি মানে বাবা, হাহা মানে মা, সেনশেই মানে শিক্ষক…
তারা আসে, এবং চলে যায়। চলে যায় এবং আসে। কিন্তু সেই প্রেমিকটির মতন রেখাপাত করেনা কেউই।

অথচ আমার মতন তুচ্ছ পতঙ্গকে প্রেমের কথা বলার ক্ষমতা দেয়া হয়নি, যেমনটি দেয়া হয়নি তাকে।
তাই আমি মৃতের মতন বেঁচে থাকি লাশকাটা ঘরে, মৃত্যুর গন্ধ নিতে নিতে। একদিন হঠাৎ করে বেড়াতে আসা মৃত্যুর অপেক্ষায়।

আমার স্মৃতিশক্তি ভালো। সেই কবিতাটি তাই আজও আমার মনে আছে (প্রেমিকটি তার প্রেমিকার জন্য যে কবিতাটা লিখেছিল)। প্রেমিকটি যে কয়দিন এই লাশকাটা ঘরে ছিল তার প্রতিটাদিন আমি এই কবিতাটা শুনতে চেয়েছি তার মুখে। সে হয়ত বোঝেনি আমার মতন ক্ষুদ্র পতঙ্গ কেন বারবার এই কবিতাটা শুনতে চাইতো!
এখন এই লাশঘরে পোস্টমর্টেমের সুবাদে ঘুরতে আসা অন্যান্য লাশেদের নিয়মিত আমি সেই কবিতাটা শোনাই। মাঝে মাঝে নিজের মনে আওড়াই-

যদি একদিন আকাশের সমস্ত তারা নিভে যায়,
পৃথিবীর সমস্ত সঙ্গীত আর মূর্ছনারা নির্বাক হয়,
তবে সেই অনন্ত নিকষকালো আকাশ
আর সঙ্গীতহীন পৃথিবীর শপথ-
আমি চোখে ধারণ করবো তারাদের আলো,
শরীরে ধারণ করবো সঙ্গীতের মূর্ছনা।
একটি নির্বাক পৃথিবীকে সুর শেখাতে,
একটি নিকষ আকাশকে আলো চেনাতে-
আমি একদিন সঙ্গীত হবো,
আমি একদিন আলো হবো।
ভালোবাসা বোঝাতে,
আমি একদিন ‘তুমি’ হবো!

আমার মনে হয়, প্রেমিকটি ‘পুরুষ’ হতে চেয়েছিল। ‘নারী’ হতে যেমনটা চেয়েছিলাম আমি!

By | 2015-07-14T20:43:07+00:00 July 14, 2015|Categories: গল্প|7 Comments

7 Comments

  1. রায়হান আবীর July 15, 2015 at 3:04 am - Reply

    যদি একদিন আকাশের সমস্ত তারা নিভে যায়,
    পৃথিবীর সমস্ত সঙ্গীত আর মূর্ছনারা নির্বাক হয়,
    তবে সেই অনন্ত নিকষকালো আকাশ
    আর সঙ্গীতহীন পৃথিবীর শপথ-
    আমি চোখে ধারণ করবো তারাদের আলো,
    শরীরে ধারণ করবো সঙ্গীতের মূর্ছনা।
    একটি নির্বাক পৃথিবীকে সুর শেখাতে,
    একটি নিকষ আকাশকে আলো চেনাতে-
    আমি একদিন সঙ্গীত হবো,
    আমি একদিন আলো হবো।
    ভালোবাসা বোঝাতে,
    আমি একদিন ‘তুমি’ হবো!

    খুব ভালো লাগলো। মুক্তমনায় স্বাগতম। নিয়মিত লেখা পড়তে চাই 🙂

    • জান্নাতুন নাঈম প্রীতি July 19, 2015 at 11:29 pm - Reply

      অনেক ধন্যবাদ। আআর আগামী বই ‘এইসব উড়ে আসা দিন’- এ অনেক ক’টি গল্পের মাঝে এটিও থাকবে। 🙂

  2. সৈকত চৌধুরী July 15, 2015 at 3:32 am - Reply

    ভাল লেগেছে প্রীতি।

    নিয়মিত লেখবেন আশা করি।

    • জান্নাতুন নাঈম প্রীতি July 19, 2015 at 11:27 pm - Reply

      সৈকত, অসংখ্য ধন্যবাদ… 🙂 ভালো লেগেছে জেনে আনন্দিত হলাম। শীঘ্রই নতুন লেখা দেবো।

  3. নশ্বর July 15, 2015 at 9:00 am - Reply

    ভালো লেগেছে।

    • জান্নাতুন নাঈম প্রীতি July 19, 2015 at 11:20 pm - Reply

      ধন্যবাদ! অনুপ্রেরণা পেলাম 🙂

  4. Istiak Mim October 28, 2016 at 10:25 pm - Reply

    উপভোগ করেছি খুব! চলতে থাকুক আপনার কলম……..

Leave A Comment