আজ এতকাল পর মজ্জেলের সাথে দেখা। যতদূর মনে পড়ে, ও মারা গিয়েছিল ১৯৮৯ সালে- জুন কি জুলাই মাসে। সেই হিসেবে বছর পনের তো হবেই। অবশ্য ওর সাথে আমার শেষ দেখা হয় তারও বছর দুয়েক আগে। দু’বছর নিরুদ্দেশ থাকার পর আমাদের ব্যাঙগাড়ির মাঠে এক শ্যালো মেশিনের পাশে লাশটা মেলে। শরীরের কোনো অংশে কাটাছেড়ার দাগ ছিল না। লোকমুখে মৃত্যুর কত কারণ শুনেছি- কোন একটা ঠিক ছিল হয়ত, কিংবা কোনটাই না। এ নিয়ে পরে কোনো উচ্চবাচ্য না হওয়ায় এর কোনো একটা ভার্সন আমাদের মেনে নিতে হয়েছে। যেমন, আমাদের এক বাড়িতেই তিনটা ভার্সন তৈরি হল। বাবা বললেন, সবসময় মৃত্যুর কারণ থাকবে, এমনটি আশা করা ভুল। মা বললেন, মৃগীব্যারাম, কারণ ও মৃগী রোগী ছিল, এবং গরমে সমস্যা আরো বাড়ত। আমি মেনে নিয়েছি দাদির ভার্সনটা- দাদির ধারণা, মজ্জেল বাঁশিতে ফুঁ দিতে না পেরে দম আটকে মারা গেছে! মৃত মজ্জেলকে দেখতে যেতে আমার মন শায় দেয়নি। ওর লুঙ্গির কোরচে বাঁশিটা গোঁজা ছিল, আর কিছু ছিল না সঙ্গে। যারা দেখতে গিয়েছিল তাদের মুখে শোনা।
এভাবে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে দেখা হয়ে যাবে, ভাবতেই পারিনি। প্রথমটাই আমি ওকে চিনতে পারিনি। ওর বাঁশির সুর শুনে চেনা বলে আন্দাজ করেছিলাম মাত্র। মজ্জেলই আমাকে প্রথম চিনলো, তাও চাঁদনি রাতে এক সমুদ্র আলোয় আমার কাঁপা কাঁপা অবয়ব দেখে; অথবা হতে পারে আগে থেকেই ও আমাকে চিনতে পেরে অনুসরণ করছিল।
‘কি দাদাভাই, মিঠুন-কাট লাগবি নাকি?’ মজ্জেল বাঁশিটা মুখ থেকে নামিয়ে ওর সেই গালটানা হাসিটা হেসে বলল।
‘এখন আর তোমার মিঠুনের যুগ না। এটা হল রণবীরদের যুগ- এক রণবীর সিং আর এক রণবীর কাপুর! ওদের অবশ্য তুমি চিনবে না।’ আমিও যথারীতি হাসতে হাসতে উত্তর দিলাম। আমরা পাশেই একটি কাঠের গুঁড়ির ওপর দু’জন দু’দিকে মুখ করে বসলাম। ২০০৯ সালে আইলাতে সমুদ্রের শরীরের এদিকটাতে আরো কিছুটা জল ধরে, বেদখল হয় লোকালয়ের অংশবিশেষ, দু-একটা গাছের গুঁড়ি এখনো ভাটার সময় জেগে ওঠে।
‘তুমি এখানে যে?’ আমি জানতে চাইলাম।
‘গাংয়ের ধারে বসে বাপজানের কাছ সাগরের মেলা গল্প শুনছি। বাপজান শুনছে তার বাপজানের কাছে। হেই শুনছে আবার তার বাপজানের কাছে। চৌদ্দপুরুষে মিলে কেউ সমুদ্র দেকিনি। গাঙ শুকিয়ে খাল হল, খাল শুকিয়ে খটখটে মাঠ। মরার আগে বাপজান আমার হাতখান ধরি বুলিছিল, তুই দেখিস বাবা। তোর কাছে আর কিছুই আমার চাওয়ার নেই। মান্সে তার পুলার কাছে কতকিছু চায়- ছেলি ডাক্তার হবি, ব্যরিস্টার হবি, মাতব্বর হবি- দশ গায়ের মানুষ তাকে মান্য করি চলবি। আমার বাজান চে’ছিল, আমি সাগর দেখবু। গেল বছর একিনে আয়ছি। তার আগে কয়েকবছর কক্সবাজারে ছিলাম।’
‘সমুদ্র তোমার ভালো লাগে?’ আমি আনমনা হয়ে জানতে চাই।
‘কি জানি! তয় ডাঙায় আর মন টেকে না। মনটা খালি তড়পায়। জল বড় মায়া ডাক ডাকে রে ভাই।’
‘বাঁশিতে একটু ফুঁ দাও না মজ্জেল। কতদিন পানির পাশে বসে তোমার বাঁশি শোনা হয়নি। তুমি প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমাদের শান বাঁধানো পুকুড়পাড়ে বসে বাঁশি বাজাতে, আর আমরা তোমার পাশে গোল করে বসে তন্ময় হয়ে সেই বাঁশি শুনতাম- মনে পড়ে?’
মজ্জেল কোনো কথা বলে না। সমুদ্রের জলের মতো ওর চোখেও চাঁদের চিকন আলো গলে-মিশে একাকার হয়ে যায়। বাঁশিটা মুখে তোলে মজ্জেল। বাঁশি বাজায় চোখ বন্ধ করে, ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো গভীর মনোযোগ দিয়ে। সেই মজ্জেল, তেমনই আছে, তেমন সুরেলা বাজায় সে।
আমার বয়স যেদিন সাতদিন হল, সেদিনই আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ। আমার আতুরে চুল ফেলার জন্যে মা ডেকেছিল। তপ্ত দুপুরে গোলা ঘরের চালের তলে বসে আমার চুল কেটেছিল। আমি ছিলাম দাদির কোলে ধরা। শুধু আমি না, প্রথম চুলকাটা থেকে অনেক বড় হওয়া অবধি আমার আট ভাই-বোনের চুল কেটেছে মজ্জেল। গায়ের প্রায় সকল আবালবৃদ্ধবণিতার চুল মজ্জেলই কাটত। আমার চুল কাটা শেষ হলে মজ্জেল কাঠালের সার দিয়ে গরম ভাতে জল ঢেলে পান্তা বানিয়ে খেয়েছিল। ছেলের প্রথম চুল কাটা, মা বাড়ির পোশা মুরগীর ঝলমাংস রান্না করেছিল, মজ্জেল খায়নি। ক’টা টাকা বকশিস দিতে চেয়েছিল মা, তাও নেয়নি। বরাবরের মতো কেজিখানেক চাল গামছায় বেঁধে হাঁটা দিয়েছিল। এসব কথা আমার মায়ের মুখে শোনা। মজ্জেল যেদিন মারা গেছে বলে সংবাদ এলো, সেদিন মা আমাকে দুঃখ করে কথাগুলো বলছিল।
আমি বুদ্ধি হয়ে দেখতাম, কোনো এক শুক্রবারে মজ্জেলকে বাড়িতে ডাকা হত। আমরা পিঠাপিঠি দু’ভাই খালি-গা হয়ে বসে পড়তাম। মজ্জেল বাবার চাকু-কাস্তে ধার করা বেলিটে বালু দিয়ে তার খুর ধার দিত। আমরা বসতাম, মজ্জেল তার স্বভাবজাত ঢঙে জানতে চাইত – মিঠুন না অমিতাভ? আমি বলতাম, মিঠুন। মেজো ভাইয়ের পছন্দ ছিল অমিতাভ। মজার ব্যাপার হল, আমরা কেউই তখন অমিতাভ বা মিঠুনকে চিনতাম না। গায়ে তখনো টেলিভিশন ঢোকেনি। আমার ধারণা মজ্জেলও দেখিনি। তবে আমার ধারনা ভুলও হতে পারে- পাশের গায়ে চুল কাটতে গিয়ে হয়ত কারো বাড়ি দেখে থাকতে পারে। কারণ পাশের গায়ে তখন তিনটা টিভি আছে বলে আমাদের কাছে খবর ছিল। চুল কাটা হলে আয়নায় দেখতাম, দু’জনের চুলকাটার স্টাইল সেইম টু সেইম। মজ্জেলের চুলকাটার ভ্যারিয়েশনটা ছিল ওর মুখেই, কাচিতে না। সারা গায়ে একভাবেই চুল কেটেছে বড়-ছোট সবার। বৈচিত্র ছিল না ওর বাঁশির সুরেও। সন্ধ্যা থেকে শেষরাত পর্যন্ত একটানা একসুরে বাজত ওর বাঁশি। একসুরা হলেও বেসুরা ছিল না। প্রতিদিনই মনে হত নতুন করে শুনছি- এমনই মমতা দিয়ে বাজাত ও। ওর নাপিতগিরিতে আমরা সন্তুষ্ট ছিলাম না বটে, কিন্তু বংশীবাদক মজ্জেলে আমাদের কারোরই কোনো অতৃপ্তি ছিল না।
‘চল একটু হাঁটি।’ বাঁশিটা মুখ থেকে নামিয়ে বলে মজ্জেল।
আমরা হাঁটতে থাকি।
‘আচ্ছা, রাত বিশেষ হয়নি, ওদিকটাই মানুষ যা আছে একেবারে কম না। এদিকটা এমন ফাঁকা কেন?’ আমি জানতে চাই।
‘আমি থাকি বলে।’ সরলভাবে উত্তর করে মজ্জেল। ‘রাতে বাতাসে বাঁশির সুর শুনি কেউ আসবার সাহস পায় না। আমাকে তো আর কেউ দেখতি পায় না! ভয় দেখিয়ে বিশ্বজয়, বুঝলি নানা?’ মজ্জেল বাকা হাসি হেসে বলে।
‘সেদিন তুমিও যদি কোনো ভয় ওদের দেখাতে পারতে, তাহলে তো আর তোমাকে ঐভাবে নিরুদ্দেশ হতে হত না।’ আমি বলি।
‘ভয় তো ওরা দেখিয়েছিল। তুমাদের সব্বাইকে ভয় দেখালু আর তুমরা ভীষণ ভয় পেয়ি আমাকে গাছাড়া করলে।’
‘বিশ্বাস করো, আমি ওদের দলে কোনোদিনই ছিলাম না। সবাই একজোট ছিল বলে, আমি বিরোধিতা করতে পারিনি। তবে হ্যাঁ, যদি বলো নীরবতায় সম্মতির লক্ষণ হয়, তবে আমার অপরাধ মেনে নিতে আপত্তি নেই।’ আমি মজ্জেলকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি।
‘আমি সব জানি তো। তুমি আমার বাঁজানু ভালোবাসতি বুলিই তো আবার আমাদের ফের দেখা হয়িছে। আবার এতদিন পর আমি কারু জন্যি বাজাচ্ছি।’
‘তাহলে মাঝে এতদিন কার জন্যে বাজিয়েছ?’
‘নিজের জন্যি তো কুনোদিন বাজাইনি দাদাভাই। তখন বাজাতাম তুমাদের জন্যি, আর এখন ঐ তিনার জন্যি’। ওপরের দিকে মাথা তুলে বলে সে। ‘বাঁশির বাজনা আমার ভাষা, তিনার সাথে যোগাযোগের ভাষা; মানুষের মনের সাথে মন জুড়া দিয়ার ভাষা।’
‘বাহ! তুমি তো বেশ সুন্দর করে কথা বলো এখন! বেঁচে থাকতে তো তোমাকে এত সুন্দর করে কথা বলতে শুনিনি। অবশ্য তোমার সঙ্গে কথা আর বলেছি কই! সবসময় দেখতাম- তুমি হয় হাঁটছ, নয়ত বসে আছ জল কিংবা আকাশের দিকে বোবাদৃষ্টি দিয়ে। কথা তো ছিল একটাই- বাজাও না একটু!’ আমার কথায় হাসে মজ্জেল। বাঁশিটা আবার তুলে নেয় সে।
আমাদের সকলকে রাতে ঘুম পাড়িয়ে তবেই ঘুমাতে যেত মজ্জেল। আমার ঘুম আসত একটু দেরিতে। মজ্জেল যখন হেঁটে হেঁটে বাঁশি বাজাতে বাজাতে গায়ের ও প্রান্তে চলে যেত, তখন মনে হত অন্য কোনো জগৎ থেকে ভেসে আসছে সুরটা। একবার মনে হত, স্বপ্নের ওপাশ থেকে, আর একবার মনে হত, মনের কোনো গোপন স্থান থেকে। ফজরের আযানের কিছু আগে বিশ্রামে যেত সে। প্রতিদিনই দেরিতে ওঠার জন্যে মা’র বকা শুনতে হত। মজ্জেলকে একবার বলেওছিলাম সে কথা। ও হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘আমি তো অত রাতপর্যন্ত বাজাইনি দাদাভাই। এশার আযান হলিই আমার ফুঁ ফুরিয়ে যায় যে!’
বাতাস কমে আসার সাথে সাথে সমুদ্রের কন্ঠস্বরে খানিক পরিবর্তন আসে। আমার এমন শান্ত-নীরব সমুদ্র দেখলেই বেশি ভয় করত। এখন অবশ্য আর কিছুতেই ভয় করে না। এখন এই অবস্থায় একভাবে টানা কিছুক্ষণ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয়, সমুদ্র গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, যে শব্দটা আসছে, ওটা ওর নাক ডাকার শব্দ। আমি একটু একটু করে সমুদ্রকে বুঝে উঠতে শুরু করেছি।
‘গ্রামটা খুব বদলে গেছে, তাই না দাদাভাই?’ মজ্জেল বাজানো থামিয়ে জিজ্ঞেস করে।
‘হুম। অনেক বদলেছে। মানুষজন এখন ইমানী হয়েছে। নামাজপড়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। বাড়ি বাড়ি লম্বা প্রাচীর উঠেছে। আর চুরিও হয় না তেমন; মানুষের অভাব এখন পেটে না, অন্যখানে!’
‘বাহ। সুখের সংবাদ শুনালি দাদাভাই।’
‘এখন বাড়ি বাড়ি টেলিভিশন, কত গান-বাজনা হয়, অথচ বাঁশি বাজানোর অপরাধে তোমাকে গ্রামছাড়া করা হল। কোথা থেকে এসে সাফি হুজুর কি ফতোয়া দিল, আর অমনি গ্রামবাসী ঝাঁপিয়ে পড়ল। অথচ এই গ্রামবাসীই তুমি একরাত অসুস্থ হলে বাঁশি শুনতে পাবে না বলে বিচলিত হয়ে পড়ত। তোমার ত্বড়িৎ চিকিৎসার ব্যবস্থা করত। মনে পড়ে তোমার?’
‘পড়ে না আবার! একবার আমার জ্বর কিছুতেই বাগে আসছিল না। মিনু কবিরাজ তার চিকিৎসা ফেল মেরি গেলো দেখি রাজশাহীর এক বড় কবিরাজকে ধরি এনিছেল।’
‘অথচ তোমাকে গ্রামছাড়া করার মিছিলে নেতৃত্বস্থানে ছিল সেই মিনু কবিরাজ। মনে পড়ে তোমার?’
‘কি জানি, গায়ের মানুষ তো একটাও সেই মিছিলে দেখিনি, সবাই ভিনদেশের মানুষ ছেল। আমি ওদের কাউকে চিনতি পারিনি দাদাভাই।’
‘চিনতে পারোনি, না চিনতে চাওনি?’
‘সব কি আর খালি চোখে চিনা যায়? সাফি হুজুরকে গ্রামবাসী চিনতি পেরিছিল? এমন ধোকা খাওয়া দোষের কিছু না। আমরা হক্কলেই তো প্রত্যেকদিন কত ধোকা খাচ্ছি।’
আমরা হাঁটতে হাঁটতে আরো একটা গুঁড়ি পেয়ে যায়। দু’জনেই কিছুটা ক্লান্ত, বসে পড়ি আগপিছ করে। মজ্জেলকে বাঁশিটা ধরতে আবারো অনুরোধ করি। মজ্জেল ফুঁ দেয়। আমি চোখ বন্ধ করে অনুভব করি, বহুদূর থেকে ভেসে আসছে সুরটি। আমি বালিশ থেকে মাথা তুলে চেটেপুটে সমস্ত সুরটা উপভোগ করার চেষ্টা করছি। এটা ছিল আমার রোজকার কাজ। মজ্জেল বাঁশি বাজাতে বাজাতেই কোনো এক গাছের গুঁড়িতে বসে কিংবা কারো বাঁশের মাচানে শুয়ে অথবা কারো বাঁধানো পুকুরে পানির ভেতর চাঁদের প্রস্থান দেখতে দেখতে রাতটা কাটিয়ে দিত। ঘরসংসারহীন মানুষ সে ছিল না। মজ্জেল তখন ছয় সন্তানের বাবা- চার মেয়ে, দুই ছেলে। একটির সঙ্গেও মজ্জেলের চেহারার মিল নেই। মাঝরাতে মজ্জেলের বৌয়ের বিছানা থেকে এক একদিন এক এক জনকে উঠে আসতে দেখা যেত বলে রটনা আছে। বছর বিয়াতো মজ্জেলের বৌ। যদিও গায়েই বাড়ি তবুও বেশ কয়েকদিন পর পর নিজের বাড়ি যেত মজ্জেল। বাড়ি থেকে বের হত দুকাঁধে দুই মেয়েকে নিয়ে। সবসময় দুকাঁধে দুইজন থাকতো, একজোড়া বড় হলে পিঠাপিঠি অন্য জোড়া আসত। মজ্জেল গভীর মমতা দিয়ে ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে খানিকটা সময় বা গোটাদিন কাটিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ত বাঁশি আর ঝোলা নিয়ে। সংসারে তার অবদান বলতে ছিল, ছেলেমেয়েদের জন্যে মাঝে মধ্যে এক প্যাকেট লজেন্স নিয়ে যাওয়া। বৌ মেজাজ খিচিয়ে তার অর্ধেক ফেলে দিতো রান্নাঘরের ঝাপির ওপাশে গা ঘিন ঘিন করা কাদার ভেতর। ছেলে-মেয়েরা সেটাই কুড়িয়ে পুকুরের পানিতে ধুয়ে পলিথিন ছাড়িয়ে অন্য ছেলেদের লোভ দেখিয়ে দেখিয়ে চুষে বেড়াতো। মজ্জেলের সেজো মেয়েটা আট বছর বয়সে বাগানে রক্তাক্ত অবস্থায় মারা যায়। রক্তাক্ত কেন হল, সেটি নিয়ে গায়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। চেয়াম্যান চোখ রাঙিয়ে সবাইকে চুপ করে দিল। মেয়েটিকে কোলে তুলে মজ্জেলের সেকি কান্না- ঐ প্রথম এবং ঐ শেষ কাঁদতে দেখি তাকে। মজ্জেলের লাশ যেদিন পাওয়া যায়, ঠিক তার দিন সাতেক পরে মজ্জেলের বৌ এক পুত্রসন্তান প্রসব করে। অবিকল মজ্জেলের মতো দেখতে। গায়ের মানুষ ভেঙেছিল শিশুটিকে দেখতে। আমিও গিয়েছিলাম। নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। এগার দিনের মাথায় মারা যায় শিশুটি। ভাবলাম কথাগুলো মজ্জেলকে বলি। আবার মনে হল, থাক, এতদিন বাদ সেসব কথা না তোলায় ভালো। আছি যখন, অন্যদিন আরো কথা পাড়া যাবে।
মজ্জেল বাঁশিটা মুখ থেকে নামিয়ে লুঙ্গির ভাজে গোঁজে। ‘আমাকে তুমি ক্ষমা করো দাদা ভাই।’ মজ্জেল আমাকে বলে।
‘তুমি তো কোনো অন্যায় করোনি আমার কাছে। ক্ষমা চাচ্ছো যে?’ আমি জিজ্ঞেস করি।
‘জলের ¯্রােত যখন তুমাকে টেনি নি যাচ্ছিল, তখন আমি তুমাকে অনেক বাঁচানুর চেষ্টা করিছি। পারিনি। শরীরবিহীন ইচ্ছাশক্তি বড্ডই অকেজো।’
‘তোমাকে আর বলতে হবে না সেসব। এ কয়দিনে আমিও কিছুটা বুঝেছি।’
‘ওরা কারা? তুমাকে আধমরা করি, জলের মধ্যে ফেলি গেল যে?’ মজ্জেল জানতে চায়।
‘চিনি না। তোমার মতোই।’
‘তোমার অপরাধ?
‘ব্লগার।’ আমি উত্তর দিই।
‘ওটা আবার কেমন বাদ্য? মুখ দি বাজায় না হাত দি?’ মজ্জেল জানতে চায়।
‘ও তুমি বুঝবে না।’ আমি হাসতে হাসতে বলি।
আর কথা না বাড়িয়ে আমার আগে আগে পা বাড়ায় মজ্জেল। আমি দেখতে পাই, মজ্জেল মাথায় গামছা পাকিয়ে হেঁটে যাচ্ছে আপন মনে। কাঁধে চটের ব্যাগ। ব্যাগে চুলকাটার সরঞ্জাম, একটা ময়লা চিরুনি, একটা ভোতা খুর, আর একটা জংপড়া কাঁচি। হাতে তেল চকচকে বাঁশের বাঁশি। মাথার ওপর দিয়ে পথ কেটে কেটে বাড়ি ফিরছে একথালা চাঁদ।

কোনো এক জোছনা ঝরা রাতে
একজন বংশীবাদক অথবা অন্যসব মানুষের গল্প

আজ এতকাল পর মজ্জেলের সাথে দেখা। যতদূর মনে পড়ে, ও মারা গিয়েছিল ১৯৮৯ সালে- জুন কি জুলাই মাসে। সেই হিসেবে বছর পনের তো হবেই। অবশ্য ওর সাথে আমার শেষ দেখা হয় তারও বছর দুয়েক আগে। দু’বছর নিরুদ্দেশ থাকার পর আমাদের ব্যাঙগাড়ির মাঠে এক শ্যালো মেশিনের পাশে লাশটা মেলে। শরীরের কোনো অংশে কাটাছেড়ার দাগ ছিল না। লোকমুখে মৃত্যুর কত কারণ শুনেছি- কোন একটা ঠিক ছিল হয়ত, কিংবা কোনটাই না। এ নিয়ে পরে কোনো উচ্চবাচ্য না হওয়ায় এর কোনো একটা ভার্সন আমাদের মেনে নিতে হয়েছে। যেমন, আমাদের এক বাড়িতেই তিনটা ভার্সন তৈরি হল। বাবা বললেন, সবসময় মৃত্যুর কারণ থাকবে, এমনটি আশা করা ভুল। মা বললেন, মৃগীব্যারাম, কারণ ও মৃগী রোগী ছিল, এবং গরমে সমস্যা আরো বাড়ত। আমি মেনে নিয়েছি দাদির ভার্সনটা- দাদির ধারণা, মজ্জেল বাঁশিতে ফুঁ দিতে না পেরে দম আটকে মারা গেছে! মৃত মজ্জেলকে দেখতে যেতে আমার মন শায় দেয়নি। ওর লুঙ্গির কোরচে বাঁশিটা গোঁজা ছিল, আর কিছু ছিল না সঙ্গে। যারা দেখতে গিয়েছিল তাদের মুখে শোনা।
এভাবে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে দেখা হয়ে যাবে, ভাবতেই পারিনি। প্রথমটাই আমি ওকে চিনতে পারিনি। ওর বাঁশির সুর শুনে চেনা বলে আন্দাজ করেছিলাম মাত্র। মজ্জেলই আমাকে প্রথম চিনলো, তাও চাঁদনি রাতে এক সমুদ্র আলোয় আমার কাঁপা কাঁপা অবয়ব দেখে; অথবা হতে পারে আগে থেকেই ও আমাকে চিনতে পেরে অনুসরণ করছিল।
‘কি দাদাভাই, মিঠুন-কাট লাগবি নাকি?’ মজ্জেল বাঁশিটা মুখ থেকে নামিয়ে ওর সেই গালটানা হাসিটা হেসে বলল।
‘এখন আর তোমার মিঠুনের যুগ না। এটা হল রণবীরদের যুগ- এক রণবীর সিং আর এক রণবীর কাপুর! ওদের অবশ্য তুমি চিনবে না।’ আমিও যথারীতি হাসতে হাসতে উত্তর দিলাম। আমরা পাশেই একটি কাঠের গুঁড়ির ওপর দু’জন দু’দিকে মুখ করে বসলাম। ২০০৯ সালে আইলাতে সমুদ্রের শরীরের এদিকটাতে আরো কিছুটা জল ধরে, বেদখল হয় লোকালয়ের অংশবিশেষ, দু-একটা গাছের গুঁড়ি এখনো ভাটার সময় জেগে ওঠে।
‘তুমি এখানে যে?’ আমি জানতে চাইলাম।
‘গাংয়ের ধারে বসে বাপজানের কাছ সাগরের মেলা গল্প শুনছি। বাপজান শুনছে তার বাপজানের কাছে। হেই শুনছে আবার তার বাপজানের কাছে। চৌদ্দপুরুষে মিলে কেউ সমুদ্র দেকিনি। গাঙ শুকিয়ে খাল হল, খাল শুকিয়ে খটখটে মাঠ। মরার আগে বাপজান আমার হাতখান ধরি বুলিছিল, তুই দেখিস বাবা। তোর কাছে আর কিছুই আমার চাওয়ার নেই। মান্সে তার পুলার কাছে কতকিছু চায়- ছেলি ডাক্তার হবি, ব্যরিস্টার হবি, মাতব্বর হবি- দশ গায়ের মানুষ তাকে মান্য করি চলবি। আমার বাজান চে’ছিল, আমি সাগর দেখবু। গেল বছর একিনে আয়ছি। তার আগে কয়েকবছর কক্সবাজারে ছিলাম।’
‘সমুদ্র তোমার ভালো লাগে?’ আমি আনমনা হয়ে জানতে চাই।
‘কি জানি! তয় ডাঙায় আর মন টেকে না। মনটা খালি তড়পায়। জল বড় মায়া ডাক ডাকে রে ভাই।’
‘বাঁশিতে একটু ফুঁ দাও না মজ্জেল। কতদিন পানির পাশে বসে তোমার বাঁশি শোনা হয়নি। তুমি প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমাদের শান বাঁধানো পুকুড়পাড়ে বসে বাঁশি বাজাতে, আর আমরা তোমার পাশে গোল করে বসে তন্ময় হয়ে সেই বাঁশি শুনতাম- মনে পড়ে?’
মজ্জেল কোনো কথা বলে না। সমুদ্রের জলের মতো ওর চোখেও চাঁদের চিকন আলো গলে-মিশে একাকার হয়ে যায়। বাঁশিটা মুখে তোলে মজ্জেল। বাঁশি বাজায় চোখ বন্ধ করে, ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো গভীর মনোযোগ দিয়ে। সেই মজ্জেল, তেমনই আছে, তেমন সুরেলা বাজায় সে।
আমার বয়স যেদিন সাতদিন হল, সেদিনই আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ। আমার আতুরে চুল ফেলার জন্যে মা ডেকেছিল। তপ্ত দুপুরে গোলা ঘরের চালের তলে বসে আমার চুল কেটেছিল। আমি ছিলাম দাদির কোলে ধরা। শুধু আমি না, প্রথম চুলকাটা থেকে অনেক বড় হওয়া অবধি আমার আট ভাই-বোনের চুল কেটেছে মজ্জেল। গায়ের প্রায় সকল আবালবৃদ্ধবণিতার চুল মজ্জেলই কাটত। আমার চুল কাটা শেষ হলে মজ্জেল কাঠালের সার দিয়ে গরম ভাতে জল ঢেলে পান্তা বানিয়ে খেয়েছিল। ছেলের প্রথম চুল কাটা, মা বাড়ির পোশা মুরগীর ঝলমাংস রান্না করেছিল, মজ্জেল খায়নি। ক’টা টাকা বকশিস দিতে চেয়েছিল মা, তাও নেয়নি। বরাবরের মতো কেজিখানেক চাল গামছায় বেঁধে হাঁটা দিয়েছিল। এসব কথা আমার মায়ের মুখে শোনা। মজ্জেল যেদিন মারা গেছে বলে সংবাদ এলো, সেদিন মা আমাকে দুঃখ করে কথাগুলো বলছিল।
আমি বুদ্ধি হয়ে দেখতাম, কোনো এক শুক্রবারে মজ্জেলকে বাড়িতে ডাকা হত। আমরা পিঠাপিঠি দু’ভাই খালি-গা হয়ে বসে পড়তাম। মজ্জেল বাবার চাকু-কাস্তে ধার করা বেলিটে বালু দিয়ে তার খুর ধার দিত। আমরা বসতাম, মজ্জেল তার স্বভাবজাত ঢঙে জানতে চাইত – মিঠুন না অমিতাভ? আমি বলতাম, মিঠুন। মেজো ভাইয়ের পছন্দ ছিল অমিতাভ। মজার ব্যাপার হল, আমরা কেউই তখন অমিতাভ বা মিঠুনকে চিনতাম না। গায়ে তখনো টেলিভিশন ঢোকেনি। আমার ধারণা মজ্জেলও দেখিনি। তবে আমার ধারনা ভুলও হতে পারে – পাশের গায়ে চুল কাটতে গিয়ে হয়ত কারো বাড়ি দেখে থাকতে পারে। কারণ পাশের গায়ে তখন তিনটা টিভি আছে বলে আমাদের কাছে খবর ছিল। চুল কাটা হলে আয়নায় দেখতাম, দু’জনের চুলকাটার স্টাইল সেইম টু সেইম। মজ্জেলের চুলকাটার ভ্যারিয়েশনটা ছিল ওর মুখেই, কাচিতে না। সারা গায়ে একভাবেই চুল কেটেছে বড়-ছোট সবার। বৈচিত্র ছিল না ওর বাঁশির সুরেও। সন্ধ্যা থেকে শেষরাত পর্যন্ত একটানা একসুরে বাজত ওর বাঁশি। একসুরা হলেও বেসুরা ছিল না। প্রতিদিনই মনে হত নতুন করে শুনছি – এমনই মমতা দিয়ে বাজাত ও। ওর নাপিতগিরিতে আমরা সন্তুষ্ট ছিলাম না বটে, কিন্তু বংশীবাদক মজ্জেলে আমাদের কারোরই কোনো অতৃপ্তি ছিল না।
‘চল একটু হাঁটি।’ বাঁশিটা মুখ থেকে নামিয়ে বলে মজ্জেল।
আমরা হাঁটতে থাকি।
‘আচ্ছা, রাত বিশেষ হয়নি, ওদিকটাই মানুষ যা আছে একেবারে কম না। এদিকটা এমন ফাঁকা কেন?’ আমি জানতে চাই।
‘আমি থাকি বলে।’ সরলভাবে উত্তর করে মজ্জেল। ‘রাতে বাতাসে বাঁশির সুর শুনি কেউ আসবার সাহস পায় না। আমাকে তো আর কেউ দেখতি পায় না! ভয় দেখিয়ে বিশ্বজয়, বুঝলি নানা?’ মজ্জেল বাকা হাসি হেসে বলে।
‘সেদিন তুমিও যদি কোনো ভয় ওদের দেখাতে পারতে, তাহলে তো আর তোমাকে ঐভাবে নিরুদ্দেশ হতে হত না।’ আমি বলি।
‘ভয় তো ওরা দেখিয়েছিল। তুমাদের সব্বাইকে ভয় দেখালু আর তুমরা ভীষণ ভয় পেয়ি আমাকে গাছাড়া করলে।’
‘বিশ্বাস করো, আমি ওদের দলে কোনোদিনই ছিলাম না। সবাই একজোট ছিল বলে, আমি বিরোধিতা করতে পারিনি। তবে হ্যাঁ, যদি বলো নীরবতায় সম্মতির লক্ষণ হয়, তবে আমার অপরাধ মেনে নিতে আপত্তি নেই।’ আমি মজ্জেলকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি।
‘আমি সব জানি তো। তুমি আমার বাঁজানু ভালোবাসতি বুলিই তো আবার আমাদের ফের দেখা হয়িছে। আবার এতদিন পর আমি কারু জন্যি বাজাচ্ছি।’
‘তাহলে মাঝে এতদিন কার জন্যে বাজিয়েছ?’
‘নিজের জন্যি তো কুনোদিন বাজাইনি দাদাভাই। তখন বাজাতাম তুমাদের জন্যি, আর এখন ঐ তিনার জন্যি’। ওপরের দিকে মাথা তুলে বলে সে। ‘বাঁশির বাজনা আমার ভাষা, তিনার সাথে যোগাযোগের ভাষা; মানুষের মনের সাথে মন জুড়া দিয়ার ভাষা।’
‘বাহ! তুমি তো বেশ সুন্দর করে কথা বলো এখন! বেঁচে থাকতে তো তোমাকে এত সুন্দর করে কথা বলতে শুনিনি। অবশ্য তোমার সঙ্গে কথা আর বলেছি কই! সবসময় দেখতাম – তুমি হয় হাঁটছ, নয়ত বসে আছ জল কিংবা আকাশের দিকে বোবাদৃষ্টি দিয়ে। কথা তো ছিল একটাই- বাজাও না একটু!’ আমার কথায় হাসে মজ্জেল। বাঁশিটা আবার তুলে নেয় সে।
আমাদের সকলকে রাতে ঘুম পাড়িয়ে তবেই ঘুমাতে যেত মজ্জেল। আমার ঘুম আসত একটু দেরিতে। মজ্জেল যখন হেঁটে হেঁটে বাঁশি বাজাতে বাজাতে গায়ের ও প্রান্তে চলে যেত, তখন মনে হত অন্য কোনো জগৎ থেকে ভেসে আসছে সুরটা। একবার মনে হত, স্বপ্নের ওপাশ থেকে, আর একবার মনে হত, মনের কোনো গোপন স্থান থেকে। ফজরের আযানের কিছু আগে বিশ্রামে যেত সে। প্রতিদিনই দেরিতে ওঠার জন্যে মা’র বকা শুনতে হত। মজ্জেলকে একবার বলেওছিলাম সে কথা। ও হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘আমি তো অত রাতপর্যন্ত বাজাইনি দাদাভাই। এশার আযান হলিই আমার ফুঁ ফুরিয়ে যায় যে!’
বাতাস কমে আসার সাথে সাথে সমুদ্রের কন্ঠস্বরে খানিক পরিবর্তন আসে। আমার এমন শান্ত-নীরব সমুদ্র দেখলেই বেশি ভয় করত। এখন অবশ্য আর কিছুতেই ভয় করে না। এখন এই অবস্থায় একভাবে টানা কিছুক্ষণ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয়, সমুদ্র গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, যে শব্দটা আসছে, ওটা ওর নাক ডাকার শব্দ। আমি একটু একটু করে সমুদ্রকে বুঝে উঠতে শুরু করেছি।
‘গ্রামটা খুব বদলে গেছে, তাই না দাদাভাই?’ মজ্জেল বাজানো থামিয়ে জিজ্ঞেস করে।
‘হুম। অনেক বদলেছে। মানুষজন এখন ইমানী হয়েছে। নামাজপড়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। বাড়ি বাড়ি লম্বা প্রাচীর উঠেছে। আর চুরিও হয় না তেমন; মানুষের অভাব এখন পেটে না, অন্যখানে!’
‘বাহ। সুখের সংবাদ শুনালি দাদাভাই।’
‘এখন বাড়ি বাড়ি টেলিভিশন, কত গান-বাজনা হয়, অথচ বাঁশি বাজানোর অপরাধে তোমাকে গ্রামছাড়া করা হল। কোথা থেকে এসে সাফি হুজুর কি ফতোয়া দিল, আর অমনি গ্রামবাসী ঝাঁপিয়ে পড়ল। অথচ এই গ্রামবাসীই তুমি একরাত অসুস্থ হলে বাঁশি শুনতে পাবে না বলে বিচলিত হয়ে পড়ত। তোমার ত্বড়িৎ চিকিৎসার ব্যবস্থা করত। মনে পড়ে তোমার?’
‘পড়ে না আবার! একবার আমার জ্বর কিছুতেই বাগে আসছিল না। মিনু কবিরাজ তার চিকিৎসা ফেল মেরি গেলো দেখি রাজশাহীর এক বড় কবিরাজকে ধরি এনিছেল।’
‘অথচ তোমাকে গ্রামছাড়া করার মিছিলে নেতৃত্বস্থানে ছিল সেই মিনু কবিরাজ। মনে পড়ে তোমার?’
‘কি জানি, গায়ের মানুষ তো একটাও সেই মিছিলে দেখিনি, সবাই ভিনদেশের মানুষ ছেল। আমি ওদের কাউকে চিনতি পারিনি দাদাভাই।’
‘চিনতে পারোনি, না চিনতে চাওনি?’
‘সব কি আর খালি চোখে চিনা যায়? সাফি হুজুরকে গ্রামবাসী চিনতি পেরিছিল? এমন ধোকা খাওয়া দোষের কিছু না। আমরা হক্কলেই তো প্রত্যেকদিন কত ধোকা খাচ্ছি।’
আমরা হাঁটতে হাঁটতে আরো একটা গুঁড়ি পেয়ে যায়। দু’জনেই কিছুটা ক্লান্ত, বসে পড়ি আগপিছ করে। মজ্জেলকে বাঁশিটা ধরতে আবারো অনুরোধ করি। মজ্জেল ফুঁ দেয়। আমি চোখ বন্ধ করে অনুভব করি, বহুদূর থেকে ভেসে আসছে সুরটি। আমি বালিশ থেকে মাথা তুলে চেটেপুটে সমস্ত সুরটা উপভোগ করার চেষ্টা করছি। এটা ছিল আমার রোজকার কাজ। মজ্জেল বাঁশি বাজাতে বাজাতেই কোনো এক গাছের গুঁড়িতে বসে কিংবা কারো বাঁশের মাচানে শুয়ে অথবা কারো বাঁধানো পুকুরে পানির ভেতর চাঁদের প্রস্থান দেখতে দেখতে রাতটা কাটিয়ে দিত। ঘরসংসারহীন মানুষ সে ছিল না। মজ্জেল তখন ছয় সন্তানের বাবা- চার মেয়ে, দুই ছেলে। একটির সঙ্গেও মজ্জেলের চেহারার মিল নেই। মাঝরাতে মজ্জেলের বৌয়ের বিছানা থেকে এক একদিন এক এক জনকে উঠে আসতে দেখা যেত বলে রটনা আছে। বছর বিয়াতো মজ্জেলের বৌ। যদিও গায়েই বাড়ি তবুও বেশ কয়েকদিন পর পর নিজের বাড়ি যেত মজ্জেল। বাড়ি থেকে বের হত দুকাঁধে দুই মেয়েকে নিয়ে। সবসময় দুকাঁধে দুইজন থাকতো, একজোড়া বড় হলে পিঠাপিঠি অন্য জোড়া আসত। মজ্জেল গভীর মমতা দিয়ে ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে খানিকটা সময় বা গোটাদিন কাটিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ত বাঁশি আর ঝোলা নিয়ে। সংসারে তার অবদান বলতে ছিল, ছেলেমেয়েদের জন্যে মাঝে মধ্যে এক প্যাকেট লজেন্স নিয়ে যাওয়া। বৌ মেজাজ খিচিয়ে তার অর্ধেক ফেলে দিতো রান্নাঘরের ঝাপির ওপাশে গা ঘিন ঘিন করা কাদার ভেতর। ছেলে-মেয়েরা সেটাই কুড়িয়ে পুকুরের পানিতে ধুয়ে পলিথিন ছাড়িয়ে অন্য ছেলেদের লোভ দেখিয়ে দেখিয়ে চুষে বেড়াতো। মজ্জেলের সেজো মেয়েটা আট বছর বয়সে বাগানে রক্তাক্ত অবস্থায় মারা যায়। রক্তাক্ত কেন হল, সেটি নিয়ে গায়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। চেয়াম্যান চোখ রাঙিয়ে সবাইকে চুপ করে দিল। মেয়েটিকে কোলে তুলে মজ্জেলের সেকি কান্না- ঐ প্রথম এবং ঐ শেষ কাঁদতে দেখি তাকে। মজ্জেলের লাশ যেদিন পাওয়া যায়, ঠিক তার দিন সাতেক পরে মজ্জেলের বৌ এক পুত্রসন্তান প্রসব করে। অবিকল মজ্জেলের মতো দেখতে। গায়ের মানুষ ভেঙেছিল শিশুটিকে দেখতে। আমিও গিয়েছিলাম। নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। এগার দিনের মাথায় মারা যায় শিশুটি। ভাবলাম কথাগুলো মজ্জেলকে বলি। আবার মনে হল, থাক, এতদিন বাদ সেসব কথা না তোলায় ভালো। আছি যখন, অন্যদিন আরো কথা পাড়া যাবে।
মজ্জেল বাঁশিটা মুখ থেকে নামিয়ে লুঙ্গির ভাজে গোঁজে। ‘আমাকে তুমি ক্ষমা করো দাদা ভাই।’ মজ্জেল আমাকে বলে।
‘তুমি তো কোনো অন্যায় করোনি আমার কাছে। ক্ষমা চাচ্ছো যে?’ আমি জিজ্ঞেস করি।
‘জলের ¯্রােত যখন তুমাকে টেনি নি যাচ্ছিল, তখন আমি তুমাকে অনেক বাঁচানুর চেষ্টা করিছি। পারিনি। শরীরবিহীন ইচ্ছাশক্তি বড্ডই অকেজো।’
‘তোমাকে আর বলতে হবে না সেসব। এ কয়দিনে আমিও কিছুটা বুঝেছি।’
‘ওরা কারা? তুমাকে আধমরা করি, জলের মধ্যে ফেলি গেল যে?’ মজ্জেল জানতে চায়।
‘চিনি না। তোমার মতোই।’
‘তোমার অপরাধ?
‘ব্লগার।’ আমি উত্তর দিই।
‘ওটা আবার কেমন বাদ্য? মুখ দি বাজায় না হাত দি?’ মজ্জেল জানতে চায়।
‘ও তুমি বুঝবে না।’ আমি হাসতে হাসতে বলি।
আর কথা না বাড়িয়ে আমার আগে আগে পা বাড়ায় মজ্জেল। আমি দেখতে পাই, মজ্জেল মাথায় গামছা পাকিয়ে হেঁটে যাচ্ছে আপন মনে। কাঁধে চটের ব্যাগ। ব্যাগে চুলকাটার সরঞ্জাম, একটা ময়লা চিরুনি, একটা ভোতা খুর, আর একটা জংপড়া কাঁচি। হাতে তেল চকচকে বাঁশের বাঁশি। মাথার ওপর দিয়ে পথ কেটে কেটে বাড়ি ফিরছে একথালা চাঁদ।

By | 2015-06-25T23:04:07+00:00 June 25, 2015|Categories: গল্প|3 Comments

3 Comments

  1. ফুলবানু June 25, 2015 at 11:40 pm - Reply

    নাস্তিক ওয়েবসাইটে পরকাল নিয়ে গল্প, আসলেই কি পরকাল আছে?

    • আপনি বোধহয় বিষয়টি গুলিয়ে ফেলছেন। মুক্তমনা মুক্তমনাদের ওয়েবসাইট, স্পেসিফিক নাস্তিক ওয়েবসাইট না। সব নাস্তিক মুক্তমনা হন না। মুক্তমনার ধর্ম কেবলই ’মুক্তমনা’। ধন্যবাদ আপনাকে।

  2. রায়হান আবীর June 26, 2015 at 11:38 pm - Reply

    আজ এতকাল পর মজ্জেলের সাথে দেখা। যতদূর মনে পড়ে, ও মারা গিয়েছিল ১৯৮৯ সালে- জুন কি জুলাই মাসে। সেই হিসেবে বছর পনের তো হবেই।

    হিসাব মেলাতে গিয়ে মাথা ঘোরাচ্ছে গতকাল থেকে 🙁

Leave A Comment