হুমায়ুন আজাদ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ভাবে বলতেন, সততার সাথে লিখেছিলেনও যে,

“১৯৭১- এ দেশে এতো রাজাকার, এতো স্বাধীনতাবিরোধী ছিলনা, এখন পথে পথে রাজাকার, গাড়িতে গাড়িতে স্বাধীনতাবিরোধী।
ঠিক মৌলবাদকে পরাজিত করে আমরা স্বাধীন হইনি, পাকিস্তানী স্বৈরাচারকে পরাজিত করে স্বাধীন হয়েছিলাম। তখন মৌলবাদ শব্দটির জন্মই হয়নি , যদিও ইংরেজিতে ফান্ডামেন্টালিজম শব্দটি অনেক আগে থেকে ছিল। তখন জামাত ছিলো, কিন্তু জামাতের কোন স্থান ছিলোনা দেশে ও সমাজে, এখন বেশ স্থান আছে।
ইসলামি মৌলবাদ এখন একটি বড় ব্যাধি, এটা ছড়িয়ে পড়েছে দেশে দেশে , ইউরোপ-আমেরিকায়ও কাজ করছে ইসলামী মৌলবাদীরা , আমাদের দেশে তো প্রবলভাবে কাজ করছে ।

ধার্মিক মুসলমান মাত্রই খানিকটা মৌলবাদী , কেননা তারা মধ্যযুগ থেকে উঠে আসেনি; আর এ সুযোগটা নিচ্ছে জামাত। আওয়ামীলীগ নামাজ পড়বে, কিন্তু সওয়াবটা জমা হবে জামাতের খাতে; তাই হচ্ছে এখন দেশে । দেশে যতো দুর্নীতি বাড়বে , ঘুষ বাড়বে, যতো ধর্ষণ বাড়বে, যতো মাদ্রাসা মসজিদ বাড়বে,অশিক্ষা বাড়বে, বিজ্ঞান বিরোধিতা বাড়বে, মৌলবাদ ততো তীব্র হবে। এখন তাই হচ্ছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই এখন আংশিকভাবে মৌলবাদী।”

বড় সত্য কথা; কিন্তু সত্যেরও পেছনের সত্য থাকে, থাকে রুট-কজ। ইসলামিস্ট-মৌলবাদের এই যে উত্থান, তার পেছনের রুট-কজও হচ্ছে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের আকাঙ্ক্ষা; তারা সেটা করে অর্থের প্রলোভনে, ক্ষমতালিপ্সায়। তারা সেটা করে মৌলবাদ তোষণের মধ্য দিয়ে, মরুসাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদকে প্রশ্রয় দিয়ে, দর্শনাশ্রয়ী আধ্যাত্মিক ধার্মিকদের গৌণ করে তুলে, অসহিষ্ণু ধর্ম-অহং এবং আজ্ঞাধীন প্রাত্যহিক আচারকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবার মধ্য দিয়ে; সর্বোপরি রাজনৈতিক ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত হবার অবারিত সুযোগ সৃষ্টি করে।

৫২, ৬৯, ৭১ এর মত ইতিহাস সৃষ্টিকরা গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলো যেখানে ধর্মাদর্শকে পিছু ঠেলে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে স্থান দিয়েছিল মূল প্রেরনা হিসেবে, গণতান্ত্রিক চেতনা ও কর্মসূচীই ছিল জনতার ঐক্যের ভিত, সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার থাকবেনা, সেটাই ছিল প্রত্যাশিত।

কিন্তু বাস্তবে সেটা হয়নি। সংবিধানের উল্লেখিত ধর্মনিরপেক্ষতা হয়ে গেছে কাজীর গোয়ালের গরু; আবারো হুমায়ুন আজাদের ভাষাতেই বলি,
“অনেকের কাছেই এ নীতিটিই ছিলো ভীতিকর; সংবিধানপ্রণেতারাও অনেকে ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন না, সংবিধানে এটি রাখার সময় তাঁরা অনেকেই হয়তো দোজখের ভয়ে কাঁপছিলেন, তাই অবিলম্বেই ভয় পেয়ে তাঁরা বলতে শুরু করেছিলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়’, এবং নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তাঁরা উৎসাহের সঙ্গে যোগ দিতে শুরু করেছিলেন।”

“যেখানে কথা ছিল শিক্ষা ব্যবস্থায় মাদ্রাসা শিক্ষা তুলে দেওয়ার, সেখানে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় তাকে পুনরুজ্জীবিত করা হল। আর সরকারী মহলে আনুষ্ঠানিক ভাবে মিলাদ মাহফিল তো ছিল নিত্যকার ঘটনা। এবং ধর্মের এই রাজনৈতিক ব্যবহার আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত করেছে ধর্মনিরপেক্ষতার আবরণেই।”

সেক্যুলার বলে পরিচিত হওয়ার আপ্রান চেষ্টা করলেও এটা ভোলার কোনই অবকাশ নেই যে, আওয়ামী লীগ, এমনকি মুজিবের চিন্তা ও আচরণে সাম্প্রদায়িকতার বীজ চিরকালই ছিল সুস্পষ্ট। তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি নিজেই বলেছেন তিনি পাকিস্তান কায়েমের জন্য সক্রিয় ভাবে কাজ করেছেন, এমনকি কলকাতা দাঙ্গার সময়টিতেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন সাম্প্রদায়িক শক্তির পক্ষেই।

স্বাধীন বাংলাদেশেও তিনি কুখ্যাত শত্রু সম্পত্তি আইন পরিবর্তন করেননি, তাঁর সময়েও দেননি আদিবাসীদের স্বীকৃতি; বরং তাদের আত্মপরিচয় মুছে ফেলতে চেয়েছেন, তাদেরও করে তুলতে চেয়েছেন বাঙালি।

ইসলামী ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, অপরাপর ইসলামী দেশগুলোর মতই তীব্র ইহুদী বিরোধিতা থেকেই ইসরাইলকে স্বীকৃতি না দেওয়া, ইসলামি সম্মেলন সংস্থায় যোগ দেওয়া, মাদ্রাসা শিক্ষাকে প্রভূত সরকারী সাহায্য দেওয়া, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে সর্বধর্ম সমন্বয়ের দুষ্টচক্রকে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে তিনি বেছে নিয়েছিলেন মৌলবাদ তোষণের পথ।

বাংলাদেশের মত একটি দেশ, যার রয়েছে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য, সে দেশটিতেই ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারকে হাতিয়ার করে আওয়ামী লীগ প্রশস্ত করেছে মৌলবাদের বিকাশকে।

ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে যে দোদুল্যমানতা ছিল মুজিবের, জিয়া ছিলেন সে দ্বিধা থেকে মুক্ত। ক্ষমতায় বসেই ধর্মনিরপেক্ষতার বিধান সংবলিত অনুচ্ছেদটি সংবিধান থেকে মুছে দেন তিনি, প্রকারান্তরে যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিধ্বংস করা এক আঘাত। জামায়াতে ইসলামীর মত ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী দলকে প্রকাশ্য রাজনীতির অনুমতি দেওয়া, মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়নের নামে সকল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্র শিবিরকে অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া এবং প্রতিষ্ঠিত করা, রাজাকারদের বিচারে গঠিত ট্রাইবুনালগুলো বন্ধ করে দেওয়া, যুদ্ধাপরাধীদের গুরুত্বপূর্ণ সরকারী পদে, এমনকি প্রধানমন্ত্রী পদে বসিয়ে পুরস্কৃত করার অন্যায়টিও তার।

মোদ্দা কথা, ধর্মীয় লেবাসটিকে চিরকালই শাসক শ্রেণী নিজ স্বার্থে ব্যবহার করতে চেয়েছে; এই যে আজ কথিত সেক্যুলার, নব্য আওয়ামী লীগের হাতে বাঙালী মুজিব আরব বংশদ্ভুত বনে যাচ্ছেন, তাতেও আর আশ্চর্য হওয়ার কি আছে? তাঁরই সুযোগ্য কন্যা যে আজ ৭২ এর অনিন্দ্যসুন্দর সংবিধানটি ভুলে মদিনা সনদপন্থী হচ্ছেন, তাতেই বা আর অবাক হওয়ার কি আছে? আর রাজনৈতিক শিক্ষায় গণ্ডমূর্খ পৌত্রটি যে ইনিয়ে বিনিয়ে নানান ধান্ধায় “ইসলামী সেক্যুলারিজম” এর ধারনাকে গিলাতে চাইছে সেও মোটেই আশ্চর্যের নয়। কারণ জামাত বলি বা আওয়ামী লীগ বা বিএনপি বা জাতীয় পার্টি, তাদের সকলের স্বার্থের জড় সেই একই জায়গায়।

গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তির ঐক্য ছাড়া, সম্মিলিত প্রতিরোধ ছাড়া এই অচলায়তন চূর্ণ করবার আর কোন পন্থা নেই।

9 Comments

  1. উদার গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তির ঐক্যের মাধ্যমে একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে হবে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে একটি সেকুলার আধুনিক সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব নয়।

  2. প্রসূনজিৎ চৌধুরী May 26, 2015 at 7:26 am - Reply

    চূড়ান্ত ধান্দাবাজি, দলবাজি, স্বার্থপরতা, ধার্মিকতার আড়ালে ধর্মান্ধতা, কর্পোরেট নির্ভরতার সাথে সেকুলার ভেকধারী দলকানাদের নির্লজ্জ পদচারণার কালে এই স্বপ্ন দেখা দিবাস্বপ্নের মতই মনে হয়।

    • না বন্ধু, আপনার এ হতাশা আবার বর্তমান অপরাজনীতির সুবিধাভোগীদেরই পক্ষান্তরে উৎসাহী করবে। লড়াই আমাদের চালাতেই হবে।

  3. অসম্ভব সুন্দর বিশ্লেষন! তবে চোর তো কখনো ধর্মের কাহিনী শোনেনা, শোনাতে হয়। আমাদের সেই পথটাই এখন বার করতে হবে, যে পথে চোরেরা ধর্মের কাহিনী শুনবে এবং চৌর্যবৃত্তি ছেড়ে আধুনিক কল্যাণবৃত্তি গুলোকেই অগ্রাধিকার দেবে। যাতে আগামী শতাব্দীর অগ্রগামী স্রোতে যোগ্যতার নিরীখে সামীল হতে পারি আমরা।

  4. কাজী রহমান May 26, 2015 at 1:27 pm - Reply

    শাসক শোষকদের যা কাজ ওরা তা’ই করে। এসব নতুন কিছু নয়। প্রকাশ্যে মানুষ কুপিয়ে মারলেও বীর নাগরিক তা দুরে দাঁড়িয়ে অবলোকন করে মাত্র। খুনিদের ধরে তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিক বীর হিজড়ারা। বেশিরভাগ বীর বাঙালি যে আসলে ভ্যান্দা বাঙালি এইটা আগে বুঝতে হবে তাদের; তারপর নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন আসবে। এবং তারপর প্রশ্ন আসতে পারে নাগরিক অধিকার আদায়ের। বহুদূরের পথ। অনুকরণপ্রিয়, অলস, হুকুম শোনায় অভ্যস্ত আরামপ্রিয় বেশিরভাগ বাঙালি যদ্দিন না জেগে উঠে নাগরিক অধিকার আদায় করে নেবে; তদ্দিন ঐসব আবুল মাল তাদের বলতে থাকবে স্টুপিড, ইতর; গেটলস্ট এবং তারা তা নির্লিপ্ত নির্বিকারে মেনে নেবে।

  5. প্রদীপ দেব May 26, 2015 at 4:57 pm - Reply

    গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তির ঐক্য ছাড়া, সম্মিলিত প্রতিরোধ ছাড়া এই অচলায়তন চূর্ণ করবার আর কোন পন্থা নেই।

    কলম চলুক।

  6. তানবীরা May 28, 2015 at 1:41 am - Reply

    সরকার, প্রশাসন, রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভর্তি যেখানে মৌলবাদী লোকজন সেখানে আসলে কোন ভাবেই কোন পথ নেই

  7. অর্বাচীন June 2, 2015 at 2:23 pm - Reply

    ”জামাত বলি বা আওয়ামী লীগ বা বিএনপি বা জাতীয় পার্টি, তাদের সকলের স্বার্থের জড় সেই একই জায়গায়” – সত্যিই তাই।
    সুতরাং “গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তির ঐক্য ছাড়া, সম্মিলিত প্রতিরোধ ছাড়া এই অচলায়তন চূর্ণ করবার আর কোন পন্থা নেই”।

    চমৎকার লিখেছেন।

  8. নশ্বর July 10, 2015 at 1:32 am - Reply

    রাষ্ট্র মৌলবাদকে ব্যবহার করছে, এটা বাস্তব সত্য।

    মৌলবাদের বিরুদ্ধে গনতান্ত্রিক ঐক্য ছাড়া কোন সমাধান সহজে আসবে না।

Leave A Comment