[গত পর্বের পর]

অস্ট্রিয়া ছেড়ে জার্মানিতে

হতাশা থেকে উত্তরণকল্পে বোল্টস্‌মানের প্রথম চিন্তা ছিল গ্রাৎস ত্যাগ করা। গ্রাৎসে তার প্রতি তার সহকর্মীদের আচরণ পাল্টে গিয়েছিল; তিনি নিজেও মনে করতেন তার আরও ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার যোগ্যতা রয়েছে। এছাড়া গ্রাৎসের সাথে জড়িয়ে আছে তার সন্তানের মৃত্যুর স্মৃতি। সব মিলিয়ে গ্রাৎস তার কাছে বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল। ১৮৮৮ সালের জুলাইয়ে যেখানে কাইজার তার চুক্তিপত্র বাতিল করলেন সেখানে সে বছরেরই শেষ দিকে তিনি হেল্মহোল্টসকে চিঠি লিখে জানালেন, তিনি সুস্থ হয়ে গেছেন এবং বার্লিনে যেতে চান। এমনকি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার যত বন্ধু ছিল তাদের সবাইকে জানাতে থাকলেন যে তিনি গ্রাৎস ত্যাগ করতে চান। এই বন্ধুদের মধ্যে যিনি তাকে আনার সুযোগটি প্রথমে কাজে লাগালেন তিনি হচ্ছেন জার্মানির মিউনিখের Eugen von Lommel। তিনি Adolf von Baeyer এর (যিনি পরবর্তীতে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পাবেন) সহায়তায় মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে বোল্টস্‌মানের জন্য একটি পদের ব্যবস্থা করেন। মিউনিখে তখন এমন কোনো পদ ছিল না; কেবল তার জন্যই এটা তৈরি করা হয়েছিল। মিউনিখ কর্তৃপক্ষ যুক্তি হিসেবে দেখায়, তাত্ত্বিক ও পরীক্ষণমূলক পদার্থবিজ্ঞান দিনদিন আলাদা হয়ে যাচ্ছে এবং একজনের পক্ষে দুই বিষয়ে পারদর্শীতা অর্জন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে, বোল্টস্‌মান যেহেতু গণিতে খুবই দক্ষ সেহেতু তিনি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পারবেন যা ম্যাক্সওয়েল, Rudolf Clausius এবং হেল্মহোল্টসের গবেষণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।

গ্রাৎস ত্যাগের সময় বোল্টস্‌মানের সম্মানে একটি বিদায়ী অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। স্ট্রাইনৎস ও নতুন রেক্টর তাদের বক্তৃতায় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বোল্টস্‌মান আবার অস্ট্রিয়ায় ফিরে আসবেন। উত্তরে বোল্টস্‌মান বলেন,

এই সম্মান ব্যক্তি আমার প্রতি নয় বরং আমার চিন্তাধারার প্রতি হিসেবে গ্রহণ করছি, যে চিন্তাধারা আমার মন এবং কর্মের জগৎ জুড়ে বিরাজ করে। এই সম্মান আবিষ্কৃত সেই সব তত্ত্বের প্রতি, কোনো মহান বিসর্জন দিয়েই যেগুলোকে যথেষ্ট মহিমান্বিত করা সম্ভব নয়। তত্ত্বই যেহেতু আমার জীবনের সবকিছু সেহেতু এই তত্ত্বই হোক আপনাদের উদ্দেশ্য বলা আমার ধন্যবাদ।

মিউনিখে বোল্টস্‌মান প্রতি সপ্তাহে হোফব্র্যাউহাউসে বিয়ার নিয়ে বসে সহকর্মীদের সাথে বৈজ্ঞানিক আলোচনা করতেন। এই আড্ডায় যোগ দিতেন গণিতবিদ Walther von Dyck, Alfred Pringsheim, পদার্থবিজ্ঞানী লোমেল ও Leonhard Sohnke, রসায়নবিদ বাইয়ার, জ্যোতির্বিজ্ঞানী Hugo von Seeliger এবং প্রকৌশলী Carl von Linde। এ সময় তিনি পরিবার নিয়ে থাকতেন মাক্সিমিলিয়ান স্ট্রাসে তে; বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার প্রিয় অপেরা দুটোই ছিল বাসা থেকে কাছে। প্রায়ই ভাগনারের সঙ্গীত শুনতে যেতেন।

দিনদিন তার চোখের অবস্থা আরও খারাপ হতে শুরু করে, অনেক সময় বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র বা বই তার স্ত্রী পড়ে শোনাতেন যাতে তার চোখ অধিক পরীশ্রম থেকে রেহাই পায়। তবে বাভারিয়ার (মিউনিখ যে প্রদেশের রাজধানী) সরকার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কোনো পেনশন দেয় না বলে তখন থেকেই বোল্টস্‌মান তার পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। চোখের অবস্থা ভালো নয় দেখেই ১৮৯৬ সালের মধ্যে তার বিখ্যাত বই Lectures on Gas Theory লিখে ফেলেন। ১৮৯২ সালে লশমিটকে লেখা এক চিঠি থেকে জানা যায় ততদিনে তার আবার দেশের বাড়ির জন্য খারাপ লাগতে শুরু করে। তিনি লিখেন যে, ভাল আছেন কিন্তু অস্ট্রিয়ার চেয়ে ভাল নয়। এই বছর তার পুরনো শিক্ষক ইয়োসেফ স্টেফান মারা যান। ভিয়েনা কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করে স্টেফানের পদে বোল্টস্‌মানকে নিয়ে আসতে। কিন্তু এদিকে মিউনিখ তার বেতন বাড়িয়ে দেয় এবং তার জন্য একজন ব্যক্তিগত সচিবের ব্যবস্থা করে দিয়ে তাকে থাকতে অনুরোধ করে। তিনি ভিয়েনাকে বলেন, আপাতত অন্তত ১ বছর মিউনিখে থাকতে চান।

এ সময় বোল্টস্‌মানের জীবনের একজন উল্লেখযোগ্য সাক্ষী হচ্ছেন জাপানে পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা উন্নয়নের অন্যতম ব্যক্তিত্ব Hantaro Nagaoka (১৮৬৫–১৯৫০)। তার একটি চিঠি থেকে জানা যায়, বোল্টস্‌মান মিউনিখে পড়াচ্ছেন জেনেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। এতেই বোঝা যায় বোল্টস্‌মান তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে কতটা সুপরিচিত হয়ে উঠেছিলেন।

কখনো অস্ট্রিয়া কখনো জার্মানি

১৮৯৪ সালে মিউনিখে থাকা অবস্থায় বোল্টস্‌মান অক্সফোর্ড থেকে সম্মানসূচক পিএইচডি ডিগ্রি পান। অক্সফোর্ড থেকে তিনি আসলে প্রভূত সম্মান পেয়েছিলেন। এ বছরের বসন্তে ভিয়েনা এবং মিউনিখের মধ্যে তার পছন্দ ঘন ঘন পরিবর্তিত হতে থাকে। অবশেষে জুনে মিউনিখ ছেড়ে ভিয়েনা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। তখন তিনি অস্ট্রিয়ার সেরা বিজ্ঞানী। ভিয়েনায় তাকে গ্রহণের জন্য বিশাল আয়োজন করা হয়েছিল। দর্শন অনুষদ রাসায়নিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি পদ বাতিল করে তাকে অর্থ যোগান দেয়। এবং তার পক্ষ থেকে শর্ত থাকে, তিনি হঠাৎ দায়িত্ব পালনের অযোগ্য বিবেচিত হলে তাকে পূর্ণ অবসরকালীন ভাতা দিতে হবে।

বোল্টস্‌মানকে ভিয়েনাতে আনার জন্য অস্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ যে মহাযজ্ঞের আয়োজন করেছিল তার মোহ অচিরেই কেটে যায়। বোল্টস্‌মান বুঝতে পারেন, ১৮ বছর ভিয়েনার বাইরে থাকার কারণে এখন এখানে তার কোনো বন্ধুমহল নেই। তার উপর আছে আর্নস্ট মাখের তীব্র বিরোধিতা। মাখের দর্শন ছিল বোল্টস্‌মানীয় দর্শনের একেবারে বিপরীত এবং আরও সমস্যা ছিল এই যে, একটি সঠিক হলে অন্যটি সঠিক হতে পারে না। মাখ মনে করতেন, পরমাণু দেখা যায় না বলে তাকে বাস্তব বস্তু হিসেবে নয় বরং কেবল একটি গাণিতিক অ্যানালগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এর বদলে তিনি শক্তির আদান-প্রদানের মাধ্যমে সব ব্যাখ্যা করতে চাইতেন। তার এই দর্শনের নাম হয়েছিল শক্তিবাদ বা এনার্জেটিক্স। তবে বর্তমানে একে বিজ্ঞান না বলে ছদ্মবিজ্ঞান বলা হয়। বোল্টস্‌মান মাখের বিরোধিতার সাথে মানসিকভাবে পেরে উঠতেন না, কারণ হয়ত ব্যক্তিত্বের বিচারে তিনি মাখের চেয়ে দুর্বল ছিলেন।

১৮৯৫ সাল থেকে মাখ ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন ও বিজ্ঞানের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছিলেন। তার সাথে বোল্টস্‌মানের সরাসরি কোনো বিতর্ক না হলেও মাখ বোল্টস্‌মানকে মূল্য দিতেন না, নিজেকে বোল্টস্‌মানের তুলনায় বুদ্ধিমান মনে করতেন। এমনকি বোল্টস্‌মানের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েও তিনি নেতিবাচক মন্তব্য করতেন। একবার দার্শনিক Theodor Gomperz কে লেখা একটি চিঠিতে তিনি বলেন,

বোল্টস্‌মান ক্ষতিকর নয়, তবে প্রচণ্ড কাঁচা এবং খাপছাড়া। কোথায় সীমারেখা টানতে হবে এ নিয়ে তার কোন ধারণাই নেই। তার ব্যক্তিগত জীবনের অনেক বিষয় সম্পর্কেও এই কথা খাটে, এগুলো তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

শক্তিবাদ নিয়ে মাখ, অস্টভাল্ড ও হেল্মহোল্টস দের সাথে বোল্টস্‌মানের বিতর্ক আলাদা আলোচনার দাবী রাখে।

এসব বৈজ্ঞানিক বিতর্কের কারণে বোল্টস্‌মান ভাবতে শুরু করেন, জার্মানিতে তার কাজ খুব কম মূল্য পাচ্ছে। তিনি একা হয়ে যান। তার এইচ-উপপাদ্যের বিরোধিতা করে Ernst Zermelo (১৮৭১–১৯৫৩) যে মন্তব্য করেছিলেন তার জবাবে তিনি লিখেছিলেন, “জেরমেলোর গবেষণাপত্র প্রমাণ করে যে আমার লেখা সবাই ভুল বুঝছে। অবশ্য এই ভেবে আমি সন্তুষ্ট যে, এটা অন্তত প্রমাণ করে জার্মানিতে আমার লেখা কেউ কেউ পড়তে শুরু করেছে।” এর মাঝে ভিয়েনা নিয়ে তার অসন্তুষ্টি বেড়েই চলে। তিনি গবেষণাগারের কোর্স থেকে অব্যাহতি চান। কিছুদিন পর অস্টভাল্ডকে লিখেন, জার্মানির চেয়ে এখানে অনেক কম ছাত্র গবেষণা করতে চায়, এখানে বৈজ্ঞানিক আলোচনাও খুব কম হয়। পরবর্তীতে একবার তার স্ত্রী বলেছিলেন, ভিয়েনায় তার কাজ ছিল স্কুল-মাস্টারের মতো যাকে অবশ্যই তার মেধার প্রতি সুবিচার বলা যায় না। এছাড়া বোল্টস্‌মান অস্ট্রিয়ার রাজনীতি নিয়েও অসন্তুষ্ট ছিলেন।

১৯০০ সালে বোল্টস্‌মান জার্মানির লাইপৎসিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার একটি পদ গ্রহণ করেন। এখানে ভৌত রসায়নবিদ অস্টভাল্ড ইতিমধ্যে গবেষণার একটি চমৎকার পরিবেশ গড়ে তুলেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেয়ার সময় তাকে জার্মানি এবং বহির্বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। নিয়োগপ্রাপ্তির সম্ভাবনা যখন দেখা দিচ্ছিল তখন বোল্টস্‌মান খুশিই হয়েছিলেন। কিন্তু প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে গিয়ে তার প্রচণ্ড মানসিক ধকল যায়; তিনি মানসিক ভারসাম্য হারাতে বসেন, এমনকি কিছুদিন একটি মানসিক হাসপাতালে অবস্থান করেন।

যথারীতি লাইপৎসিগেও বোল্টস্‌মানের শান্তি আসেনি। অস্টভাল্ড ব্যক্তিগত জীবনে তার বন্ধু হলেও মাঝে মাঝে তাদের বিতর্ক এত চরমে উঠে যেত যে কেউই ভারসাম্য রাখতে পারতেন না। এসব কারণে বোল্টস্‌মানের অবস্থা ভিয়েনার চেয়েও খারাপ হয়ে পড়ে। একসাথে কাজ করতে তিনি পছন্দ করতেন, কিন্তু অস্টভাল্ডের সাথে প্রতিনিয়ত বিতর্ক করতে গিয়ে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন। এখানেই প্রথম আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। এক পর্যায়ে স্বাস্থ্যহানির কারণ দেখিয়ে প্রাদেশিক সরকারের কাছে চাকরি থেকে অব্যাহতি চান। এরপর আবার তার মধ্যে ভিয়েনায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা জাগে। উল্লেখ্য পদত্যাগ করার পরও ভিয়েনায় তার পদটি খালিই ছিল। তাই ১৯০২ সালে আবার সেখানে ফিরে যেতে সক্ষম হন। এর মধ্যে ১৯০১ সালে স্ট্রোক করার কারণে মাখ অবসরে চলে গিয়েছিলেন।

ভিয়েনায় ফিরে আসলেও, লাইপৎসিগ যাওয়ার কারণে অস্ট্রীয় সরকার বোল্টস্‌মানকে পুরোপুরি ক্ষমা করেনি। উপরন্তু তার মানসিক ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে বিভিন্ন গুঞ্জন ছড়াচ্ছিল। অনেকে বলছিল, তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ এবং দায়িত্ব পালনের অযোগ্য। গবেষণা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে তাই রাজা ও ভিয়েনা কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। মন্ত্রী বোল্টস্‌মানের ডাক্তারদের সাথে কথা বলেন এবং তাকে এই মর্মে একটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে হয়েছিল যে তিনি পুনরায় অস্ট্রিয়া ত্যাগের চেষ্টা করবেন না। স্বভাবতই তিনি হয়ে পড়েছিলেন অস্ট্রিয়ার বৈজ্ঞানিক স্বাধীনতার প্রতীক।

তবে এখানেও সুখে থাকতে পারেননি। তার ইনস্টিটিউটের জন্য অর্থ সংস্থান কমে যায়। এমনকি তাকে পুনরায় অস্ট্রিয়ার বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির সদস্য হতে ঝামেলা পোহাতে হয়; মিউনিখে যাওয়ার কারণে তাকে এই সদস্যপদ ত্যাগ করতে হয়েছিল। ১৯০৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার স্ত্রী লাইপৎসিগে রয়ে যাওয়া কন্যা ইডাকে লিখেন, “তোমার বাবার অবস্থা দিনদিন আরও খারাপ হচ্ছে। সে আমাদের ভবিষ্যতের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। আমি ভেবেছিলাম ভিয়েনায় জীবন ভাল হবে।” চোখের অবস্থার অবনতির কারণে বেশ কিছুকাল ধরে তার স্ত্রীই বিভিন্ন গবেষণাপত্র পড়ে শোনাতেন। কিন্তু এ সময় অবস্থা এতই খারাপ হয়ে যায় যে তাকে টাকা দিয়ে গবেষণাপত্র পড়ে শোনানোর জন্য একজন সেক্রেটারি রাখতে হয়, আর তার গবেষণাপত্রগুলো লিখে দেন স্বয়ং তার স্ত্রী। পাশাপাশি মাঝেমাঝেই তার হাঁপানির সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে, বেশি কাজ করতে গিয়ে প্রচণ্ড মাথা ব্যথায় ভুগেন। এ সময় শিক্ষকতার কাজ ছিল এমন: তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি কোর্সের জন্য সপ্তাহে ৫ ঘণ্টা, একই বিষয়ে একটি সেমিনার, এবং প্রতি ২ সেমিস্টার পরপর সপ্তাহে ১ ঘণ্টার আরেকটি কোর্স। উপরন্তু, ১৯০৩ থেকে তিনি সপ্তাহে দুই ঘণ্টার দর্শনের কোর্সটিও পড়ানো শুরু করেন, যেটি আগে মাখ পড়াতেন। এত চাপ তার সইছিল না।

সে সময় বোল্টস্‌মানের দর্শন বিষয়ক লেকচারগুলো সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিল। তিনি ভেবেছিলেন, দর্শনই তার আসল জায়গা। প্রথম লেকচারে তার অভাবনীয় সাফল্য আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় মিলনায়তন নির্বাচন করার পরও অনেককে আসন না পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। লেকচার উপলক্ষে কক্ষটি সাজানো হয় এবং লেকচারের পর শিক্ষার্থীরা প্রচুর সম্ভাষণ জানাতে থাকে। সকল সংবাদপত্রই খবরটি ছাপে। অস্ট্রিয়ার ফিরে আসার কারণে খুব খুশি হয়ে সম্রাট Franz-Josef I (১৮৩০–১৯১৬) বলেন, খবরের কাগজে তার লেকচার সম্পর্কে জেনেছেন। অবশ্য দু-তিনটি লেকচারের পর তার উৎসাহে ভাটা পড়ে, সেই সাথে শিক্ষার্থীদেরও। এতে তার মধ্যে ব্যর্থতার অনুভূতি আসে। এ সময় জার্মান দার্শনিক Franz Brentano কে লেখা কিছু চিঠি থেকে জানা যায় লেকচারগুলো তার কাছে কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উল্লেখ্য, ব্রেন্টানো ভিয়েনায় দর্শন পড়াতেন, কিন্তু ক্যাথলিক ধর্মযাজক হওয়া সত্ত্বেও বিয়ে করার কারণে তাকে অস্ট্রিয়া ত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। বোল্টস্‌মান যখন চিঠিগুলো লিখেছেন তখন ব্রেন্টানো ইতালিতে ছিলেন। বোল্টস্‌মান একবার এমন ভাব নিয়ে ফ্লোরেন্সে তার সাথে দেখা করার জন্য গিয়েছিলেন যে মনে হচ্ছিল তিনি তার মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাচ্ছেন।

তখনও তিনি সন্ধ্যায় বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডা দিতেন। আবার মাঝে মাঝে ভোর ৫ টায় উঠে কাজ করা শুরু করতেন। এটিও চরম হতাশার রোগে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ। এই রোগে আক্রান্তরা যখন ম্যানিক তথা পাগলামির দশায় থাকে তখন ভোরে ঘুম থেকে উঠে অনেক কাজ করে, আর হতাশার দশা আসার সাথে সাথে তাদের মাঝে অবসাদ ও ঘুম ঘুম ভাব নেমে আসে। এমনটি হলে তারা কাজের উৎসাহ হারিয়ে ফেলে, প্রত্যুষে তাদের চোখ খুব ঘুমকাতর দেখায় এবং তারা এমনকি আত্মহত্যারও চেষ্টা করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ

বোল্টস্‌মান তিন বার যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে গিয়েছিলেন। ১৮৯৯ সালে প্রথম বারের মতো যান স্ত্রীকে সাথে নিয়ে। ব্রেমেন থেকে “কাইজার ভিলহেল্ম ডের গ্রোসে” জাহাজে চড়ে ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন এবং ফ্রান্সের শেরবুর হয়ে নিউ ইয়র্কে পৌঁছান। প্রথমে ম্যাসাচুসেটসের ক্লার্ক ইউনিভার্সিটি ইন ওরচেস্টারে বলবিদ্যার মৌলিক নীতি ও সূত্র নিয়ে চারটি লেকচার দেন। ক্লার্ক ইউনিভার্সিটি তখন ১০ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করছিল। এখানে তিনি সম্মানসূচক পিএইচডি ডিগ্রিও গ্রহণ করেন। এই ভ্রমণের সময় বোল্টস্‌মান তার সন্তানদের উদ্দেশ্যে ৬টি চিঠি লিখেছিলেন। লিখেছিলেন, নিউ ইয়র্ক সিটি দেখে তিনি এবং হেনরিয়েটা দুজনেই মুগ্ধ, এখানে আছে ঘন ঘন ইলেকট্রিক ট্রাম, উপরে বাষ্প ইঞ্জিনের ট্রেন আর নিচে সুন্দর রাস্তা। বস্টন কে তাদের বেশ ধূলিময় মনে হয়েছিল। এছাড়া তারা মন্ট্রিয়ল, বাফেলো, ওয়াশিংটন ডিসি, বাল্টিমোর এবং ফিলাডেলফিয়া গিয়েছিলেন।

শারীরিক ও মানসিক অবস্থা খারাপ থাকা সত্ত্বেও বোল্টস্‌মান ১৯০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইসে একটি সম্মেলনে যোগ দিতে যান। এবার সাথে নেন ছেলে আর্টুর লুডভিগকে। উল্লেখ্য ১৯০১ সালে স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য তিনি এই ছেলেকে নিয়েই ভূমধ্যসাগরে জাহাজ ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। এবার নিউ ইয়র্ক যান হামবুর্গ থেকে “বেলগ্রাফিয়া” নামক একটি জাহাজে করে। ১০ দিনের এই ভ্রমণ তার জন্য খুব কষ্টের ছিল, মূলত হর্নের আওয়াজে ঘুমাতে না পারার কারণে। এ সময় তারা ডেট্রয়েট ও শিকাগো যান, ফিরে আসেন “ডয়েচলান্ড” জাহাজে করে। ১৯০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র যান শেষবারের মতো, একা। এবার ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলি-র একটি গ্রীষ্মকালীন স্কুলে ৩০টি লেকচার দেন। অস্টভাল্ড এবং তিনি দুজনেই এই স্কুলের দাওয়াত পেয়েছিলেন। বোল্টস্‌মানের Reise eines deutschen Professors ins Eldorado (এলদোরাদো-তে এক জার্মান অধ্যাপক) নামক রচনায় এই ভ্রমণের একটি চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায়। শেষবার আমেরিকায় থাকাকালে তিনি আবারও হাঁপানিতে আক্রান্ত হতে শুরু করেন। ক্যালিফোর্নিয়ার আবহাওয়া তার সহ্য হয়নি।

বোল্টস্‌মানের আগমন সম্পর্কে মার্কিন সংবাদপত্র The Daily California এ ধরণের খবর ছাপে:

প্রেসিডেন্ট হুইলার গ্রীষ্মকালীন স্কুলে নামীদামী অধ্যাপকদের আনার ব্যাপারে যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা সাদরে গৃহীত হয়েছে। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক লুডভিগ বোল্টস্‌মান তার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। তার গবেষণার ক্ষেত্রে বোল্টস্‌মান পৃথিবীর সেরা বিজ্ঞানীদের অন্যতম। ভৌত রসায়নের জন্য অধ্যাপক আরহেনিয়ুস যা করেছেন, গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানের জন্য তিনি তাই করেছেন।

বোল্টস্‌মান তার ইংরেজি নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু তার ইংরেজি লেকচার যারা শুনেছেন তাদের মন্তব্য সে কথা বলে না। অনেকেই তার ইংরেজির সমালোচনা করেছেন। একজন লিখেছেন, “তিনি জার্মান ভাষায় কথা বললে অধিকাংশ শ্রোতাই তাকে বুঝতে পারত। কিন্তু সপ্তাহে ৪ দিন করে তথাকথিত ইংরেজিতে বলেছেন এবং বলার বিষয়টিও ছিল Mechanical Analogies of Thermodynamics with Special Reference to the Theorems of Statistical Mechanics“। বার্কলির সবাই এখনও তার ব্যাপারে খানিকটা ক্ষুব্ধ, এর একটি কারণ ছিল তার খাপছাড়া আচরণ এবং একজন জার্মান অধ্যাপক হয়ে দর্শকদের অতিরিক্ত মুগ্ধ করার জন্য বলা ইংরেজি।

করুণ মৃত্যু

মহাবিজ্ঞানী বোল্টস্‌মান ১৯০৬ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর ইতালির ত্রিয়েস্তের নিকটে দুইনো নামক একটি ছোট গ্রামে আত্মহত্যা করেন। এই গ্রামটি অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের তীরে অবস্থিত। এখানে এসেছিলেন মূলত স্বাস্থ উদ্ধারের জন্য বেড়াতে, সপরিবারে। ৬ তারিখেই তাদের ভিয়েনা ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। সম্ভবত, দুইনোতে এতদিন থেকেও স্বাস্থ্যের বিশেষ কোনো উন্নতি না হওয়ার কারণে তিনি আবার সেই চরম হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছিলেন, নিজের বৈজ্ঞানিক কর্মদক্ষতা নিয়ে শংকিত হয়ে পড়েছিলেন এবং সেই তাড়না থেকেই নিজেকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু যে ঘটনার সাথে এই আত্মহনন একেবারেই মেলানো যায় না তা হচ্ছে, মাত্র এক মাস আগেই তিনি ক্যালিফোর্নিয়া ভ্রমণ নিয়ে রসাত্মক একটি লেখা লিখেছিলেন।

তবে সম্ভবত তিনি শেষ যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে আরও হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। বার্কলির গ্রীষ্মকালীন স্কুল বা ভিয়েনার দর্শনের ক্লাস, কোথাওই লেকচারগুলো তার মনমত হয়নি। ছাত্রদের বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, তিনি শিক্ষক হিসেবে খুবই উঁচু মানের ছিলেন এবং শিক্ষার্থীরা মনে করত লেকচার দিতে তার খুব ভাল লাগে। কিন্তু তার সেক্রেটারি স্টেফান মায়ারের ভাষ্য থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়, বোল্টস্‌মান লেকচার দেয়াকে খুবই কষ্টকর মনে করতেন এবং হঠাৎ কোনো লেকচার বাতিল হলে খুশিই হতেন। কিন্তু প্রতিটি লেকচারেই নিজের সর্বোচ্চটা দেয়ার চেষ্টা করতেন, এবং বক্তৃতাটি সফল না হলে ভেঙে পড়তেন। ভিয়েনায় দর্শনের লেকচারগুলোর ক্ষেত্রে বোধহয় তার এমনটিই হয়েছিল। ক্যালিফোর্নিয়া ভ্রমণ নিয়ে লেখা রম্যরচনাটি ছিল তার জীবনের শেষ আনন্দের ছটা। কিন্তু বাইপোলার ডিসর্ডারের রোগীদের ক্ষেত্রে প্রায়ই আনন্দের পর হঠাৎ তীব্র হতাশা নেমে আসে। এক মাসের মধ্যেই তিনি এমন হতাশা এবং কষ্টে ভুগতে শুরু করেছিলেন যে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন।

তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, সে সময় ভিয়েনার বুদ্ধিজীবীদের আত্মহত্যার ঘটনা খুব বেশি বিরল ছিল না। একটি অস্থির সময়ে নড়বড়ে রাজতন্ত্রের শাসনের ভেতরে থেকে ভিয়েনায় গড়ে উঠেছিল একটি শক্তিশালী স্বাধীন বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী। বোল্টস্‌মানের মৃত্যুর বেশ কিছুকাল পরে এখানেই জন্মেছিল “ভিয়েনা সার্কেল”। কিন্তু এই বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আত্মহত্যা করেছিলেন অনেকেই। যেমন, অস্ট্রিয়ার রাজপুত্র রুডলফ যিনি সস্ত্রীক আত্মহত্যা করেছিলেন; বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা দার্শনিক লুডভিগ ভিটগেনস্টাইনের তিন ভাই; Otto Weininger যিনি আত্মহত্যার কিছুদিন পূর্বেই সেক্স অ্যান্ড ক্যারেক্টার নামের একটি অসামান্য বই লিখেছিলেন; গীতিকবি Georg Trakl; সুরকার Gustav Mahler এর ছোট ভাই অটো মালার; গুপ্তচর Alfred Redl; এবং স্থপতি Eduard van der Nüll যিনি নিজের বানানো রাজকীয় অপেরা হাউজের সমালোচনা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিলেন।

তবে বোল্টস্‌মানের আত্মহত্যার পূর্বের কিছু সুনির্দিষ্ট ঘটনা উল্লেখ করা যায় যেগুলো হয়ত তার হতাশায় ইন্ধন যুগিয়েছিল। ((Coveney & Highfield. The arrow of time. W. H. Allen, New York. 1991. এই বইয়ে বোল্টস্‌মানের মৃত্যু পূর্ববর্তী ঘটনাগুলো আলোচিত হয়েছে।)) ১৯০৬ সালের মে মাসে ভিয়েনার দর্শন অনুষদের প্রধান মন্ত্রণালয়কে চিঠি লিখে জানান যে, বোল্টস্‌মান নিউরাস্থিনিয়ায় ভুগছেন এবং তার বৈজ্ঞানিক কাজ চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়। তার চোখের অবস্থাও ভাল যাচ্ছিল না। একজন বেনামী সাংবাদিকের বক্তব্য থেকে জানা যায়, ১৯০৫ সালের শেষ দিকে বোল্টস্‌মান মিউনিখে একটি মানসিক হাসপাতালে গিয়েছিলেন, কিন্তু তার পরপরই মিউনিখ ছেড়ে ভিয়েনা চলে আসেন। তার ছাত্র লুডভিগ ফ্লাম (যিনি তার মেয়ে ইডাকে বিয়ে করেছিলেন) বলেন,

ছাত্র হিসেবে আমার বোল্টস্‌মানের দেয়া শেষ লেকচারটি শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল, ১৯০৫-০৬ মৌসুমের শীতকালীন সেমিস্টারে। মানসিক সমস্যার কারণে তিনি লেকচার বন্ধ করে দেন। আমি এবং আরেকজন ছাত্র তার ভেরিং-এর বাসায় মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেছিলাম। পরীক্ষা শেষে আমরা যখন ফিরে আসছি তখন তার কাতর গোঙানির শব্দ শোনা যাচ্ছিল।

এ বছরেরই গ্রীষ্মকালীন সেমিস্টারে স্বয়ং মাখের মুখে শোনা যায়,

বোল্টস্‌মান ১৯০৬ এর গ্রীষ্মকালীন সেমিস্টারের জন্য তার লেকচার ঘোষণা করেছিল। কিন্তু মানসিক ভারসাম্যহীনতার জন্য তাকে সেগুলো বাতিল করতে হয়েছে। পরিচিত মণ্ডলে সবাই জানত, তার পক্ষে আর কোনদিন অধ্যাপনা করা সম্ভব হবে না। যেহেতু সে এর আগে একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল সেহেতু সবাই বুঝত যে, তাকে সার্বক্ষণিক চিকিৎসায় রাখা কতটা জরুরী।

তিনি সপরিবারে দুইনো গিয়েছিলেন তার স্ত্রীর একটি বহু পুরনো ইচ্ছা পূরণের উদ্দেশ্যে। বোল্টস্‌মানের প্রতি লেখা হেনরিয়েটের প্রথম দিককার একটি চিঠিতে এই ইচ্ছার কথা জানা যায়। তবে এ সময়ও তার অবস্থা খুব একটা ভাল ছিল না। Die Zeit পত্রিকার ৭ই সেপ্টেম্বর, ১৯০৬ এর একটি নিবন্ধে বলা হয়েছিল, “দুইনোতে বোল্টস্‌মান খুব চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন ছিলেন, বিশেষত ভিয়েনা ফিরে আসার জন্য। তবে এছাড়া তার অবস্থা ছিল আগের তুলনায় ভাল। মৃত্যুর দিন তাকে খুব উৎফুল্ল দেখা গিয়েছিল। তার স্ত্রী এবং মেয়ে সাঁতার কাটতে গেলে তিনি আত্মহত্যা করেন।” ((Anon. (1906), Weitere Nachrichten die letzen Tage. Die Zeit (Vienna), no. 1420, Abendblatt, 7 Sept., p.l.))

ডি ৎসাইটেরই আরেকটি লেখা থেকে জানা যায় যে তিনি কেইসমেন্ট জানালার আড়াআড়ি দণ্ডের সাথে একটি ছোট রশি ঝুলিয়ে তার মাধ্যমে আত্মহত্যা করেছিলেন। তাকে প্রথম মৃত অবস্থায় আবিষ্কার করেছিল তার মেয়ে। তবে কোথায় আত্মহত্যা করেছেন তা নিয়ে দুই ধরণের কথা আছে। অধিকাংশের বর্ণনামতে তার হোটেল রুমে, তবে অস্ট্রীয় গণিতবিদ Auguste Dick এর ভাষ্যমতে, বোল্টস্‌মানের সহকর্মী গণিতবিদ মের্টেন না কি বলেছেন, বোল্টস্‌মান দুইনোর গীর্জায় আত্মহত্যা করেছিলেন। তার মৃত্যুর পরও হেনরিয়েটা অনেকদিন বেঁচে ছিলেন, ১৯৩৮ সালের ৩রা ডিসেম্বর তিনি মারা যান।

বোল্টস্‌মানের মৃত্যুতে প্রচণ্ড আহত হয়েছিলেন এরভিন শ্রোডিঙার (Erwin Schrödinger); তখন তার বয়স ছিল ১৯ বছর। তিনি বোল্টস্‌মানের কাছে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান পড়ার ব্যাপারে খুব আগ্রহী ছিলেন। প্রচণ্ড আশাহত হয়েছিলেন দার্শনিক লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন; তিনিও ১৯০৬ সালে লিনৎস ছেড়ে বোল্টস্‌মানের কাছে শেখার পরিকল্পনা করছিলেন। উল্লেখ্য ভিটগেনস্টাইন তার সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ Tractatus Logico-Philosophicus (১৯২১) এ হের্ট্‌স ও বোল্টস্‌মানের পদার্থবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের দর্শনের সাথে সারেন কিয়ের্কেগর ও লিয়েভ তলস্তয় এর নীতিবিদ্যা মেলানোর চেষ্টা করেছিলেন। দুইনোতে বোল্টস্‌মানের মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে ডব্লিউ মুর তার Schrödinger: Life and Thought নামক বইয়ে দুইনো’র-ই বিখ্যাত কবি রাইনার মারিয়া রিলকে-র লেখা কয়েকটি চরণ উদ্ধৃত করেন: ((R.M. Rilke (1939). Duino elegies, transl. J.B. Leishman and S. Spender. Norton, New York.))

Consider: the Hero continues,
even his fall
was a pretext for further existence,
an ultimate birth.

সত্যিই তার মৃত্যু ছিল তার “পুনর্জন্মের” উপলক্ষ্য মাত্র। তিনি যে বছর মারা যান তার আগের বছরই, ১৯০৫ সালেই আইনস্টাইন তার বিখ্যাত গবেষণাপত্রগুলো প্রকাশ করে ফেলেছিলেন, এবং আর কয়েক বছর বেঁচে থাকলে বোল্টস্‌মান হয়ত দেখে যেতে পারতেন যে প্রতিপক্ষ আর্নস্ট মাখ বা অস্টভাল্ড দের শক্তিবাদ পরিত্যক্ত হয়ে তার পরমাণুবাদই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তার সকল গবেষণার পুনর্জন্ম হয়েছে বারে বারে।

মৃত্যুর প্রতি বোল্টসমান

বোল্টসমান সাহিত্য ও সঙ্গীত অনুরাগী ছিলেন। ধ্রুপদী জার্মান সাহিত্য সম্পর্কে অনেক কিছু জানতেন। মাঝেমাঝে বিভিন্ন সাহিত্যিকের লেখা থেকে উদ্ধৃতিও দিতেন। তার Populäre Schriften (জনগণের প্রতি) নামের বইটি উৎসর্গ করেছিলেন বিখ্যাত জার্মান কবি ফ্রিডরিশ শিলারের উদ্দেশ্যে। শিলারই সম্ভবত লুডভিগের প্রিয় কবি ছিলেন। কারণ শিলার ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা বলতেন এবং সৌন্দর্য্যকে কখনও নৈতিকতা থেকে আলাদা করতেন না। সঙ্গীতজ্ঞদের মধ্যে তার প্রিয় ছিল লুডভিগ ফান বেটোফেন। বেটোফেনের গান পিয়ানোতে বাজাতে খুব পছন্দ করতেন তিনি। ছেলে আর্টুরকে সাথে নিয়ে কখনও কখনও চেম্বার সঙ্গীত বাজাতেন। কনসার্টে যেতে পছন্দ করতেন এবং ভিয়েনার অপেরা মঞ্চের নিয়মিত দর্শক ছিলেন। জীবনের শেষ ৫-৬ বছরে বোল্টস্‌মান বেটোফেনকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন যার নাম বেটোফেন ইম হিমেল (Beethoven im Himmel—স্বর্গে বেটোফেন)। কবিতাটির বিষয়বস্তু ছিল মানব জীবনের কষ্ট এবং মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা। একে তিনি Scherzgedicht তথা ব্যঙ্গাত্মক কবিতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

কবিতাটিতে প্রথমে দেখা যায়, বোল্টস্‌মান পৃথিবীর দুঃখ-কষ্ট এবং পীড়ন আর সহ্য করতে না পেরে মৃত্যু কামনা করছেন। দেখা যায়, তার প্রার্থনা ঈশ্বর শুনেছে, তিনি মারা গেছেন। মৃত্যুর পর তার আত্মা স্বর্গে আরোহণ করছে। তার ভাষায়:

আর কক্ষনো মনে আনতে চাই না এমন এক যাতনায়
আমার আত্মা অবশেষে আমার নশ্বর দেহ ছাড়ল।
তারপর স্থানমাঝে শুধু ঊর্ধ্বারোহণ! কী সুখের সে উড্ডয়ন,
বিশেষ করে তার জন্য, যে এত দুর্দশা ও কষ্ট সহ্য করেছে।

ঊর্ধ্বারোহণের পথে তিনি আরও অনেক বিশ্বের সন্ধান পান, কিন্তু স্বর্গই মূল লক্ষ্য হওয়াতে ভ্রুক্ষেপ করেন না সেদিকে। অবশেষে স্বর্গে পৌঁছানোর পর পরী ও ঈশ্বরের বার্তাবাহকেরা তাকে গান গেয়ে শোনায়। সেই গান তার কাছে বড় একঘেয়ে লাগে। তার একঘেয়েমি দেখে পরীদের কথা তার ভাষায় এভাবে প্রকাশিত হয়:

তারা হাসে: “এই না হলে জার্মান আত্মা!
তোমাদের সঙ্গীতকলা এখানে জাগায় ঈর্ষা।
‘God praise eternity’ গানটা শুরু করো সবে
তবে ও বুঝবে আমরা এখানে কত কি পারি
কিন্তু ধীরে, সমবেত কণ্ঠে যাতে গাইতে পারি!”

গানটি আরও কিছুক্ষণ শোনার পর তিনি এর সাথে বেটোফেনের সুরের সামঞ্জস্য লক্ষ্য করেন। পরীদের কাছ থেকে জানতে পারেন, গানটি ঈশ্বরের আদেশে বেটোফেনই লিখেছেন। এই প্রেক্ষিতে বোল্টস্‌মান বেটোফেনের সাথে দেখা করতে চান এবং পরীরা তাকে বেটোফেনের কাছে নিয়ে যায়। সাক্ষাতে বেটোফেন তাকে জিজ্ঞেস করেন গানটি তার ভাল লেগেছে কিনা। তিনি নিরব থাকেন। বেটোফেন বলতে উৎসাহ দিলে তিনি জানান, তার এখানকার গানগুলো পৃথিবীর মতো ভালো লাগছে না। উত্তরে বেটোফেন বলেন, তিনি স্বর্গে এসে গান লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কারণ এখানে তার সৃজনশীলতা নষ্ট হয়ে গেছে, তার গান এবং সুরের মূল অনুপ্রেরণা ছিল মানুষের বেদনা। সেই বেদনাই যখন নেই তখন গানও নেই। কেবল শেষ বিচার বলে কিছু একটা আছে বলেই তিনি ঈশ্বরের আদেশ অমান্য করাকে ভয় পান, এবং ঈশ্বর আদেশ করেছেন বলেই এই গানটি লিখেছেন। বোল্টসমানের ভাষায় বেটোফেন মানুষের দুঃখের মহিমা কীর্তণ করেন এভাবে:

কোন আদেশবলে মা সন্তানকে ভালোবাসে?
নিঃসন্দেহে সেই অকথ্য যন্ত্রণার বলে
যা সে অনন্ত রাত ধরে ভোগ করেছিল
যখন কেবল সে আর ঈশ্বরই ছিল শিশুটির সহায়।
কখনো কি তোমার স্ত্রীর সাথে একত্রে কাঁদোনি?
যদি না কেঁদে থাকো, তবে আজীবন একত্রিত রাখার সে বন্ধন বুঝোনি;
তোমরা একসাথে যে বেদনা ভাগাভাগি করেছ তা-ই সেই বল,
সে বেদনার স্মৃতি তোমার দেবদূত হয়ে সর্বদা পাশে রবে।
যে সন্ত বেদনা ও মর্মপীড়ায় ভোগে
নির্বাণরশ্মি তারই পথ আলোকিত করে।
সে মানুষ কখনো বীরোচিত জাগতিক খ্যাতি পায় না
যে নিজের সর্বশক্তি বলে নিজেকে চালনা করে না;
এবং সেই শক্তির চাপ যতই তার বেদনার্ত হৃদয় কাঁপায়
তার মহাকীর্তি ততই গানে গানে অমরত্ব পায়।
প্রভু নিজে যখন আমাদের মাঝে থাকতেন তখন
কি তিনি রাজা ছিলেন, বা কোনো ধনী ব্যক্তি?
তিনি ছিলেন বেদনায়ই ভরা এক মানব সন্তান!

এসব শোনার পর অবশেষে বোল্টস্‌মান মানব জীবনের আয়রনি বুঝতে পারেন। বিস্ময়ের সাথে তার মোহভঙ্গ ঘটে:

প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে আমি তার মুখপানে চেয়ে রইলাম।
“এই পার্থিব জীবন সত্যিই কত বিস্ময়কর!
এই ঘণ্টা কয়েক আগেই আমি আবার মৃত্যু কামনা করছিলাম,
‘ওহ, আমার হৃদয়কে বেদনা ও ভোগান্তি থেকে মুক্তি দাও’
কিন্তু এই স্বর্গে কামনার বস্তু হচ্ছে সেই বেদনা,
হায় মানব হৃদয়, তোমার পথ কোনোদিন বুঝা সম্ভব নয়।” ((F. Rohrlich (1992), A poem by Ludwig Boltzmann, American Journal of Physics, 60, 972-3 এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলা অনূদিত।))

[সমাপ্ত]

6 Comments

  1. আমরা অপরাজিত April 28, 2015 at 1:44 am - Reply

    এসব শোনার পর অবশেষে বোল্টস্‌মান মানব জীবনের আয়রনি বুঝতে পারেন। বিস্ময়ের সাথে তার মোহভঙ্গ ঘটে:

    প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে আমি তার মুখপানে চেয়ে রইলাম।
    “এই পার্থিব জীবন সত্যিই কত বিস্ময়কর!
    এই ঘণ্টা কয়েক আগেই আমি আবার মৃত্যু কামনা করছিলাম,
    ‘ওহ, আমার হৃদয়কে বেদনা ও ভোগান্তি থেকে মুক্তি দাও’
    কিন্তু এই স্বর্গে কামনার বস্তু হচ্ছে সেই বেদনা,
    হায় মানব হৃদয়, তোমার পথ কোনোদিন বুঝা সম্ভব নয়
    ।”4

    কি ঘটনাবহুল ও করুণ মহাবিজ্ঞানী বোল্টস্‌মানের জীবন। তাঁর জীবনের উত্থান-পতনের ঘটনা পড়তে পড়তে মনে হলো কোনো মানুষের জীবনই তার জীবতদশায় জীবন শুধু সোনার থালা নয় এবার সে একজন সর্বহারা হউক আর লুডভিক বোল্টসমান হউক।

    সবচাইতে খারাপ লেগেছে তার আত্বহত্যার ঘটনাটি।একদিকে এতো চতুরমুখী জ্ঞানের কর্নধার অন্যদিকে শাররিক ও মানসিকভাবে মাল্টি অসুখের সাথে সারাক্ষন যুদ্ধ করে বেঁচে থেকে শেষতঃ স্ব-ইচ্ছায় মৃত্যুযাত্রাটি কি ট্যাজিক জীবনের পরিনতি। খুব ভাল লেগেছে এমন বড় বিজ্ঞানীকে আমাদের সামনে হাজির করে চেনানোর জন্য।আর জীবন যে সবসময়ই একটি জটিল বিষয় সেটা আরেকবার জানা গেল।

    লেখাটি দুই পর্বে দিলে মনে হয় আরো বেশী ভাল হতো।

    ভাল থাকবেন সততঃ।

    কলম যুদ্ধের দ্বারা আমাদের জংধরা ভোতা মাথা চূর্ন-বিচূর্ন হয়ে যাক………

    • শিক্ষানবিস April 30, 2015 at 1:47 am - Reply

      ধন্যবাদ। আসলে দুই একসাথে বড় লেখা দেখতে ভালো লাগে আমার যার ফলে লেখা যথাসাধ্য বড় করার চেষ্টা করি। 🙂

  2. প্রদীপ দেব April 28, 2015 at 5:46 pm - Reply

    ভালো লাগলো। ধন্যবাদ শিক্ষানবিস।

    তখনও তিনি সন্ধ্যায় বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডা দিতেন। আবার মাঝে মাঝে ভোর ৫ টায় উঠে কাজ করা শুরু করতেন। এটিও চরম হতাশার রোগে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ। এই রোগে আক্রান্তরা যখন ম্যানিক তথা পাগলামির দশায় থাকে তখন ভোরে ঘুম থেকে উঠে অনেক কাজ করে, আর হতাশার দশা আসার সাথে সাথে তাদের মাঝে অবসাদ ও ঘুম ঘুম ভাব নেমে আসে। এমনটি হলে তারা কাজের উৎসাহ হারিয়ে ফেলে, প্রত্যুষে তাদের চোখ খুব ঘুমকাতর দেখায় এবং তারা এমনকি আত্মহত্যারও চেষ্টা করতে পারে।

    এই লক্ষণগুলি তো অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। তারা সবাই কি আত্মহত্যাপ্রবণ?

    কলম চলুক।

    • শিক্ষানবিস April 30, 2015 at 1:48 am - Reply

      হ্যাঁ, এই অংশটুকু পড়ে আসলেই মনে হচ্ছে বোল্টস্‌মানের সমস্যাটা অন্য অনেকের মাঝেও দেখা যায়। বোল্টস্‌মানের মধ্যে যে এই লক্ষণগুলো খুব প্রকট রূপ ধারণ করেছিল সেটা বুঝানো যায়নি। ভবিষ্যতে সংশোধন করতে হবে এই অংশটা।

  3. দীপেন ভট্টাচার্য April 30, 2015 at 2:41 pm - Reply

    খুব ভাল লাগল। বোলৎজমানের ওপর লেখা অনেককেই ঐ সময় সম্পর্কে আগ্রহী করবে। অনেক আগে আমি ভাবতাম মাখের চরম postivism ও তার থেকে পরমাণুর বাস্তবতার বিরোধিতাই বোলৎজমানের হতাশার মূল। আপনার এই লেখা থেকে এবং ১৮ শতকের শেষে ১৯ শতকের প্রথম কয়েক বছরে ইলেকট্রন ও তেজস্ক্রিয়তার হাত ধরে পরমাণুর চিত্রটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছিল। এটা বোলৎজমান ঠিকই বুঝেছিলেন। তাই তার depressionটা মনে হয় clinicalই ছিল যার জন্য স্ত্রী বা মেয়ের সঙ্গে ছুটি কাটাতে গিয়ে আত্মহত্যা করলে তাদের যে কি মানসিক অবস্থা হবে সেটা তাকে ভাবায় নি। ভাবলে হয়তো তাদের জন্য অন্ততঃ একটা চিরকুট রেখে যেতেন।
    এই লেখাটি পরবর্তীকালে বড় করতে চাইলে মাখ, ওস্টভাল্ড ইত্যাদি লোকের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব ও ঐ সময়ের সার্বিক বিজ্ঞানের পটভূমিটা একটু দিলে হয়তো ভাল হবে। আমাদের কাছে পরিচিত এনট্রোপীর আধুনিক সমীকরণ S = k ln(W) নাকি প্রথম মাক্স প্ল্যাঙ্ক বোলৎজমানের সংজ্ঞা অনুযায়ী প্রবর্তন করেছিলেন (বোলৎজমান একটি সিসটেমের সকল সম্ভাব্য দশার, Wর, লগারিথম নেবার কথা ১৮৭৭য়েই বলেছিলেন), আর আইনস্টাইন নাকি এই সমীকরণের সমালোচনা করেছিলেন এই বলে যে Wকে পুরোপুরি জানা একটি পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক তত্ত্ব ছাড়া সম্ভব হবে না। আমাদের কাছে আজ সেটি আছে। লেখাটির জন্য আবারো ধন্যবাদ এসব মনে করিয়ে দেবার জন্য।

  4. তানবীরা May 2, 2015 at 1:06 am - Reply

    হতাশা থেকে আত্মহত্যার চিন্তা আসে তবে আত্মহত্যা করা আসলে অনেকটা সাহসের ব্যাপার। মায়া ছিন্ন করতে অনেক গাটস লাগে।

    এ পর্বটা পড়ে দুঃখ লাগলো। গুনী লোকেরা যথাযোগ্য কদর অনেক জায়গাতেই পান না আর তা থেকে বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন যা দুঃখজনক

Leave A Comment